সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীতে এমন কোনও মানুষ আছে কী, যে ছুটতে ছুটতে একবার থমকে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করে না—ওহে! তুমি কী করছ? 'আমি সারাটা দিন কী যে করে বেড়াচ্ছি তা আমি নিজেই জানি না।' এই আত্মপ্রশ্নের উৎসেই বসে আছেন তিনি। তাঁকেই বলি ভগবান, গড আল্লা। একজন হঠাৎ ভ্যাঁচ ভ্যাঁচ করে হাঁচতে লাগল। 'কী হল ভাই হঠাৎ?' বললে, 'নাকের ভেতর কী যেন সুড় সুড় করে উঠল।' সেইরকম দেহের ভেতরে মনেরও এইরকম ফাইবার আছে। এই সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ফাইবার মাঝে মধ্যেই উসখুশ করে বলতে চাইছে, 'ওহে বাছা! কীসের পিছনে হে রে, রেরে করে ছুটছ!'
এ যেন শঙ্করাচার্যের কণ্ঠস্বর!
'কস্ত্বং কোহহং কুত আয়াত: কা মে জননী কো মে তাত:।
ইতি পরিভাবয় সর্ব্বমসারং, বিশ্বং ত্যক্তা স্বপ্ন বিচারম।'
তুমি কে? আমিই বা কে? কোথা থেকে এলে? আমিই বা এলুম কোথা থেকে? আমার জননী কে? আমার পিতাই বা কে?
জীবন গলগল করে ছুটছে, যেন বন্যার জল। রাস্তায় রাস্তায় ফুটকড়াইয়ের মতন লোকের ছড়াছড়ি। ভোঁ ভোঁ, প্যাঁ পোঁ, গাড়ি ছুটছে। দৈত্যের মতো লরি। অটোর কারসাজি। এই গেল, এই গেল! কে চাপল ঘাড়ে! কে হল চিঁড়ে চ্যাপ্টা! লাগাতার নৃত্য। এই মোচ্ছবে হঠাৎ দেখা গেল, কেউ একজন বসে আছে, হাতে চায়ের কাপ। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। নির্দিষ্ট কিছু দেখছে না। অন্যমনস্ক চুমুক একটু একটু। কী এত ভাবছেন ভাই? হিসাব মিলছে না বুঝি! এই কবিতাটা শুনুন। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কে এমন লিখবেন।
বিরাট সৃষ্টির ক্ষেত্রে
আতশবাজির খেলা আকাশে আকাশে
সূর্য তারা ল'য়ে
যুগযুগান্তের পরিমাপে।
অনাদি অদৃশ্য হতে আমিও এসেছি
ক্ষুদ্র অগ্নিকণা নিয়ে
এক প্রান্তে ক্ষুদ্র দেশে কালে।
প্রস্থানের অঙ্কে আজ এসেছি যেমনি
দীপশিখা ম্লান হয়ে এল
ছায়াতে পড়িল ধরা এ খেলার মায়ার স্বরূপ
শ্লথ হয়ে এল ধীরে
সুখ-দু:খ নাট্যসজ্জাগুলি।
দেখিলাম, যুগে যুগে নটনটী বহু শত শত
ফেলে গেছে নানারঙা বেশ তাহাদের
রঙ্গশালা-দ্বারের বাহিরে।
দেখিলাম চাহি / শতশত নির্বাপিত নক্ষত্রের নেপথ্যে প্রাঙ্গণে
নটরাজ নিস্তব্ধ একাকী।
এ কী, এ তো বিষাদের কথা! চলে যাওয়ার কথা। মৃত্যুর কথা!
আমরা কী বেঁচে আছি! বেঁচে আছে আমাদের অভ্যাস। বলো সকাল থেকে চব্বিশ ঘণ্টা তোমার বেঁচে থাকার একটি হিসাব দাও। এই যে দিচ্ছি—সকাল ছ'টা নাগাদ তেড়েফুঁড়ে উঠলুম। ঘুম ঘুম চোখে ঘেঁসোর ঘেঁসোর দাঁত ব্রাশ। চোখে জলের ঝাপটা। এক চিলতে আকাশ। আকাশ নোংরা নয়। শার্সির কাচটা নোংরা। বাইরে ইলেকট্রিক তারে দুটো কেলে কাক। গাছের ডালে কালচে ক'টা পাতা। দূরে দূরে বাড়ির পর বাড়ি।
ঘড়ি ঘুরছে, আমি ছুটছি। বাজার। দেখাদেখি নেই, দরাদরি নেই। ব্যাগে মাল ভরো, দাম মিটিয়ে বাড়ি। কাগজ। হেডলাইনে বিচরণ। স্যাটাস্যাট দাড়ি শেষ। হুড়মুড় চান। মুখ হাঁ। এক চুমুক জল। রান, রান। অ্যাজ ফাস্ট অ্যাজ ইউ ক্যান।
ব্যাংকের কাউন্টার। এপাশে আমি, ওপাশে তুমি। টাকা জমা, টাকা তোলা। সাতটা ঘণ্টা, পৃথিবীটা শুধু টাকা তোলা আর টাকা জমা। এদিকে উঠছে। ওদিকে পড়ছে। দিনের শেষে কমপিউটারে হিসাব। কোটি, কোটি। পৃথিবীতে এত টাকাও আছে। এরই মাঝে কিছু খ্যাচাখেচি, একটু হাসাহাসি। ফুড়ুত ফুড়ুত কথা, যেন উড়ো পাখি!
আবার রাস্তা! পৃথিবীটা যেন গুঁতোগুঁতির, ছোটাছুটির। বাস, মিনিবাসের লাইনে সার সার, পেঙ্গুইনের মতো ঘোষ, বোস, মিত্তির। আবার বাড়ি। চা-চানাচুর। দুর্ভাবনা সব সিকেয় তোলা ছিল। টপাটপ নেমে এল। বউয়ের মাথা ধরা। মায়ের জ্বর। ফুলবাগানে ফুলুমাসির ক্যানসার। ছেলেটা একদম পড়ছে না। মেয়েটা বড় হচ্ছে। পাশের বাড়িতে একটা কার্তিক আছে।
এক রাউন্ড টিভি। কোনও একটা পত্রিকার দু-এক পাতায় নজরদারি। ছেলেটা পড়ছে না, মেয়েটা বড় হচ্ছে। টিভিতে সর্বনাশ। কোনওরকমে খাওয়া। মায়ের কপালে হাত। জ্বর। শ্বাসকষ্ট। যাওয়ার সময় হল। কাশী আর যাওয়া হল না। পরের বার হবে মা! সব আলো নিবে গেল। মশারিতে আমরা দুজন। পাশাপাশি শুয়ে আছি। সময়ের নদী। পালঙ্ক পাল তুলে ভেসে চলেছে। আজ থেকে কালে। ছাতটা ভেঙে দিলে মাথার ওপর তারা ভরা কালো আকাশ। চাঁদের নৌকো পশ্চিমতটের দিকে চলেছে। সূর্য ঝেড়েঝুড়ে ও-আকাশ থেকে এ-আকাশে একটু পরেই উঠবে।
বউ দু:স্বপ্ন দেখছে। ঘুমের মধ্যেই বলছে, 'কী হবে ভাই।'
আমার তন্দ্রালু উত্তর, 'যা হওয়ার তাই হবে বোন।'
তারপর?
আবার একটা দিন, আবার ওই ওই।
তারপর?
তারপর চুলে পাক। চোখে ছানি। রোগের বাসা, একদিন টাঁসা।
তা হলে বলি—
রে রে দীপ তিরস্কৃতাখিলতম:স্তোমারিবর্গস্য তে
রাত্রৌ গূঢ় নিজাঙ্গপাতিশলভাঘাতেন কিং পৌরুষম।
তৎকর্মাচর যেন তাবকযশো ভূয়াৎ প্রভাতে পুন-
র্ন স্নেহো ন চ সা দশা নহি পরং জ্যোতি: পুন: স্থাস্যতি।
ওরে প্রদীপ, তুমি যখন অন্ধকারে নীত হও, তখন তুমি সমস্ত অন্ধকাররূপ শত্রুবর্গকে তিরস্কার করো। কিন্তু ভাই দীপ তোমার শিখায় যে পতঙ্গরা পুড়ে মরে, এতে তোমার কী পৌরুষ প্রকাশ পায়। অতএব ভাই, তুমি এমন কর্ম করো যাতে এই রাতের বেলায় তোমার ওই ঘৃণ্য ব্যবহারের প্রতিকারস্বরূপ তোমার কোনও যশ প্রকাশ পায়। তোমার মধ্যস্থ তেল স্নেহ। পলতে হল দশা, এমনকি জ্যোতি এদের কোনওটাই চিরস্থায়ী নয়। অতএব এমন কোনও কাজ করে যাও যা মানুষ চিরকাল মনে রাখবে। প্রদীপ হয়ে জ্বলছ পতঙ্গ হয়ে পুড়ছ। এখন, কুছ তো করো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন