সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

'তুমি কী, আমি কী?
পাগলা আর পাগলী।'
আমরা বেঁচে আছি এইটাই যেন একটা বড় কথা—মরে যাইনি বেঁচে আছি। সবাই বাঁচতে চায় একমাত্র শ্যামাপোকা মরতে চায়। আলোই তার খাদ্য, আলোর তৃষ্ণায় তার মৃত্যু। মানুষের উলটো। মানুষ যেন অন্ধকারের উপাসক, একালের শ্রেষ্ঠ সাধনা হল পাশবিকতা।
হাতে সেলফোন, পরনে পশ্চিমি পোশাক, পেটে আধুনিক খাদ্য আর মনে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম পশুপালন। আমাদের যেন কোনও ইতিহাস নেই। আর এই বিস্মৃতিটাই যেন আধুনিকতা। যদি কারুকে প্রশ্ন করা যায় তোমার পিতার নাম কী? বলতে পারবে হয়তো। পিতামহের নাম? সেটিও হয়তো স্মরণে আসবে। প্রপিতামহ? আর স্মৃতি কাজ করবে না। তার কারণ চর্চা নেই—ধারাবাহিকতার অভাব। অনেকটা এইরকম দাঁড়াবে দিনকতক পরে—আমগাছকে যদি জিগ্যেস করা হয় তোমার বাবার নাম কী? সে বলবে আম গাছ। আরও গোটা কতক প্রজন্ম চলে যাওয়ার পর কোনও মানুষকে যদি জিগ্যেস করা হয় তোমার বাবা কে? সে বলবে মানুষ! মানুষের ছেলে মানুষ।
সেদিন এক মহিলাকে, তিনি আধুনিকা, প্রশ্ন করেছিলুম—আপনার স্বামীর নাম কী? তিনি পালটা প্রশ্ন করলেন— কোন স্বামী? আমি ঘাবড়ে গেলুম। আমাদের কালে একজন মহিলার একজনই স্বামী থাকত। আমার মায়ের একজনই স্বামী ছিলেন, তিনি আমার বাবা।
একটি ইংরেজি কাগজে এক সুন্দরী মহিলার ছবি। অবশ্যই তিনি বিদেশিনী। তাঁর ছবির তলায় এইরকম একটা বায়োডাটা বা আত্ম-পরিচিতি; একজন পুরুষের নাম—১৯৯১ সালে তাঁর সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। ৯৩ সালে ছাড়াছাড়ি, ৯৪ সালে আর একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। ৯৯ সালে ছাড়াছাড়ি। ৯৭ সালে আর একজনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। ৯৯ সালে ছাড়াছাড়ি। এই ২০০১ সালে তিনি মুক্ত আছেন। কেউ ইচ্ছে করলে চেষ্টা করে দেখতে পারেন যদি আধুনিকা সুন্দরী কয়েক বছরের জন্যে তার স্ত্রী হতে রাজি হন। এর মাঝে বহুজাতিক সংস্থার মতো তাঁর দুটি বহুজাতিক পুত্র সন্তান বিদেশের কোন রাজপথে ড্যাংগুলি খেলছে—তা এই মহীয়সী মহিলাই জানেন। এক নম্বরের পিতা কে? আর দু'নম্বরের পিতাই বা কে? জয়েন্ট ওনারশিপের মতো জয়েন্ট ফাদারশিপ কি না কে বলবে! আমরা ক্রমশই যেন আবার মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দিকের এগিয়ে চলেছি। মায়ের পরিচয়ই সন্তানের পরিচয় হবে। একটা বাছুরকে যদি জিগ্যেস করা হয়—বাবা! তোমার বাবার নাম কী? সে বলবে, সাদামতো একটা গোরু।
এই সেলফোনধারী শর্টস পরা গোঁফদাড়িঅলা লোকগুলো বড়ো বেকায়দায় আছে। এরা আজ এই সংসারে তো কাল ওই সংসারে। সেই কারণেই এখন আর বিয়ে নেই—বলে ওর সঙ্গে থাকি। এই সভ্যতা অনেকটা বেদে বা যাযাবরের সভ্যতার মতো। অর্থবিত্তের অভাব নেই। ভোগেরও শেষ নেই। একটা জিনিসেরই অভাব যার ইংরেজি হল 'অ্যাঙ্কার'। কোনও মানুষের কোনও ঘাট নেই। হিন্দি প্রবাদের মতো—না ঘরকা না ঘাটকা।
বরিস বেকার একজন নামকরা টেনিস প্লেয়ার। তিনি প্রশান্ত মহাসাগরের গোটা কতক দ্বীপ কিনে ফেলতে পারেন। প্রেম করে বিয়ে করলেন। প্রেমের চোটে টেনিস গেল। এখন তিনি আবার প্রেমে পড়েছেন। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ মামলা চলছে। সেদিন উভয়পক্ষের আইনজীবী এই দম্পতিকে নিয়ে অতি নামকরা এক হোটেলে খানা খেতে গিয়েছিলেন। আমি ভাবলুম যাক দুজনের বোধহয় পুনর্মিলন হবে। না, তা নয় আদালতের বাইরে একটা সমঝোতার জন্যে—ছেলে কার অধিকারে থাকবে এবং স্ত্রী কত মিলিয়ান ডলার পাবেন এবং কোন সম্পত্তি।
এরপর এইরকম হবে—বড়লোক পুরুষ বিয়ে করবে বিচ্ছেদ মামলায় কোটি কোটি ডলার ভরণপোষণের জন্যে দেবে, আবার বিয়ে করবে, আবার দেবে, এই করতে করতে একদিন ছেঁড়াখোঁড়া বারমুডা পরা এক নি:স্ব ভিখারি। আর ওদিকে এক একটি মেয়ে বারে বারে বিয়ে করতে করতে বিশাল ধনী!
এক আমেরিকান সমাজতত্ববিদ বলছেন যে, পৃথিবীতে একটা নতুন কাণ্ড ঘটতে চলেছে। সেটি হল নারীদের প্রাধান্য। এইবার মেয়েরাই সব নিয়ন্ত্রণ করবে। অর্থাৎ সেই মাতৃতান্ত্রিক সমাজের পুনরাগমন। সমস্যা একটাই—বিয়ে তো শুকনো বিয়ে হয় না, বিয়ের ফল হল সন্তান। সে বেচারাদের কী হবে! মা বলে কার কোল গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে, বাবা বলে কার গলা জড়িয়ে ধরবে! গোরুদের বা পশুদের অপত্য স্নেহ আছে। স্রষ্টা সেটি বসিয়ে দিয়েছেন সন্তান পালনের জন্যে। মানুষের মধ্যে সেই অপত্য স্নেহ থাকলেও আর থাকবে না। কারণ মানুষ ভুলতে জানে। নিজেকে অকারণে নিষ্ঠুর করতে জানে। মানুষ ভোগ পেলে যোগ ভুলে যায়। তখন সে শুধু 'বিয়োগের' সাধনাই করে। মানুষ তখন হয়ে ওঠে—ট্র্যানজিট পয়েন্ট। সেটা কেমন? হাওয়া মোরগের মতো এই দক্ষিণে। আরও উদাহরণ দেওয়া যায়—একটা কাটা ঘুড়ি গাছের ডালে দুলছে। যখন নড়ছে, তখন সে নড়ছে না বাতাস তাকে নাড়াচ্ছে! রোদে ঝলমল করছে, আবার বৃষ্টিতে দিনকতক ভিজে ছেতরে যাচ্ছে। দিনকতক বললুম এই কারণে ঘুড়িরও বিবর্তন ঘটেছে। আগে ঘুড়ি তৈরি হত ঘুড়ির কাগজে। এখন তৈরি হয় প্লাস্টিক দিয়ে। তার ফলে জল কিছুকাল সহ্য করতে পারে।
বিবর্তনের ধারায় আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়ায় মানুষ ঘুড়ির মতো কিছুটা ঘাতসহ হলেও তার বিনাশ তো কেউ ঠেকাতে পারবে না! সেকালের চেয়ে একালের মানুষের কাছে মৃত্যু খুব সহজ হলেও, 'আমি'র বিনাশ কিছুক্ষণের জন্যে একটা ধাক্কা মারবেই। ভোগই হোক আর দুর্ভোগই হোক অনেকদিনের বেঁচে থাকাটা এক ঝটকায় যখন ছিনিয়ে নিতে চায় মৃত্যু, তখন একটা ধাক্কা লাগবেই—সে গুলিতেই মরি আর ক্যানসারেই মরি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন