সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি একবার আমার স্ত্রীকে খুব দু:খ দিয়েছিলুম। কোনও কারণে একমাস কথা বলিনি। যতবারই সে কিছু বলতে এসেছে আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছি। একবার আমি আমার পিতার সঙ্গে খুব দুর্ব্যবহার করেছিলাম। আমাকে কোথাও যেতে বলেছিলেন জরুরি কোনও কাজে, আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলুম, পারব না, আমার সময় নেই। আসল ব্যাপারটা এই ছিল, সেদিন আমার এক বান্ধবীর সঙ্গে সিনেমায় যাওয়ার কথা ছিল। বান্ধবীকে পিতার ওপরে স্থান দিয়েছিলুম। তারপর কী হল? সেজেগুজে বেরুলুম। মাথায় নানা পরিকল্পনা। যেই হলের আলো নিভে যাবে, সঙ্গে সঙ্গে যতটা পারা যায় ঘনিষ্ঠ হব। দুটো ঘণ্টা কীভাবে কত আনন্দে কাটবে। তারপর আমরা একটা রেস্তোরাঁয় বসব। শেষ ট্রামে বাড়ি ফিরে আসব।
রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটছি, ভেতরে শুনছি আমার বিবেকের শাসন। ছি ছি, এটা তুমি কি করতে চলেছ। পিতার আদেশ আর বান্ধবীর প্রেম, দু-পাল্লায় বসাও, কোনটা ভারী। প্রেমের চেয়ে বড় কিছু আছে। আদেশ পালনীয়, প্রেম লোভনীয়। শেষ পর্যন্ত আমার সংস্কারে বিবেকের জয় হল। বাড়ি ফিরে এলুম। এসে শুনলুম, বাবা নিজেই বেরিয়ে গেছেন অপটু শরীর নিয়ে। অনেক রাতে ফিরে এলেন ক্ষতবিক্ষত হয়ে। স্কুটার ধাক্কা মেরেছে। মনে হল, স্কুটারটা আমাকেই মরণ ধাক্কা মেরেছে। এই ঘটনার পর আমি এক মাস বাবার সামনে দাঁড়াতে পারিনি।
অপরদিকে আমার বান্ধবীর কি হল। সে সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে চলে গেল। এই দাঁড়িয়ে থাকার সময় দু-চারটে বদ লোক কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। আমি সেদিন কেন আসতে পারিনি, বানিয়ে বানিয়ে একটা মিথ্যা অজুহাত খাড়া করার চেষ্টা করেছিলুম। দেখলুম প্রেম একশোভাগ পবিত্র, আধ্যাত্মিক জিনিস, সেখানে মিথ্যার স্থান নেই। আমার সেই বান্ধবী বড় সৎ আর সরল ছিল। তার একটাই অভিযোগ, অমন একটা বিশ্রী জায়গায় দাঁড়াতে বলে আমি কেন এলুম না। আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙে গেল। সে যতটা বিশ্বাস নিয়ে এগিয়েছিল ঠিক ততটাই অবিশ্বাস নিয়ে সরে গেল।
আমার বোন একবার খুব বিপদে পড়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে লিখেছিল, দাদা আমাকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠাবি। আমি তোকে এক বছরের মধ্যে শোধ করে দোব। তোর বাঁড়ুজ্যেমশাইয়ের একটা অপারেশন হবে। আমি চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলেছিলুম। পরে বলেছিলুম, আমি তোর কোনও চিঠিই তো পাইনি। পরে আমার সরল বোন আমার এই মিথ্যাভাষণ বিশ্বাস করে বলেছিল, 'আমি তাই ভাবি, চিঠি পেলে দাদা যেভাবেই হোক টাকাটা আমাকে জোগাড় করে দিতই, এই পৃথিবীতে দাদার মতো আমাকে কে আর ভালোবাসে।' আমি আবার এতটাই শয়তান, কায়দা করে বললুম, 'তুই আমাকে আর একটা চিটি লিখলি না কেন?' আমার বোন বলেছিল, 'তখন এমন অবস্থা চিঠি লেখারও সময় ছিল না। সে একটা ঝড় বয়ে গেল, কোনওরকমে সামলে নিয়েছি।'
আমার সেই বোন আর নেই। একমাত্র আমিই তাকে ভালোবাসি এই বিশ্বাস নিয়েই সে এই অবিশ্বাসের পৃথিবী থেকে আমার আগে চলে গেল। এখন আমি বসে বসে ভাবি, আমার জীবনটা এইরকম নানা শয়তানির কারুকার্যে ভরা। আয়নায় নিজের মুখের দিকে নিজেই তাকাতে ভয় পাই। চোখ দুটো সাপের মতো। ঠোঁট দুটো ব্যাঙের মতো। গলাটা গিরগিটির মতো। বুকটা লেটারবক্সের মতো। হাফ আয়না, শরীরের বাকিটা আমি দেখতে পাই না। তবে তখন হাঁটি তখন যে শব্দটা হয়, সেটা অনেকটা ওই টিনের চালে কাক হাঁটার মতো।
আমি তো এমন হতে চাইনি। আমি সুখে বাঁচতে গিয়ে শয়তান হয়ে গেছি। খেয়েছি অনেক, অনেক টাকা জমিয়েছি, ঘুরেছি, দেখেছি অনেক; কিন্তু অনেক দু:খও জমিয়েছি। আমি নিজেকেই নিজে বিশ্বাস করি না! অক্লেশে এত মিথ্যা বলি যে সময় সময় সন্দেহ হয় আমি আমি কি না!
আবার আমি শুরু থেকে শুরু করতে চাই। ডিম ফুটে ছোট্ট একটি পাখির মতো উঁচু কোনও গাছের ডালে। একটি একটি করে সদিচ্ছার পালকে আচ্ছাদিত গান গাওয়া একটু সবুজ পাখি!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন