সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শীত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। এখন শুধু রাতের দিকে হাওয়ায় একটু কামড় থাকে। তা না হলে দিনের বেলায় বেশ গরম। ধুলো উড়ে চারিদিক ঝাপসা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। গাছেরা এখন সব সবুজে সবুজ। এদিককার বনানীতে আগুন ধরে যাবে।
এদিকে ট্রেন কখনই সময়ে আসে না। এক আধ ঘণ্টা লেট তো কিছুই নয়। মাঝে মাঝে তিন চার ঘণ্টাও লেট থাকে। আজ বোধহয় সেইরকম একটা দিন। ঘড়িতে এখন রাত একটা। কালো বোর্ডের সাদা খড়ির লেখায় বোঝা গেল, রাত তিনটের আগে এখান থেকে ছেড়ে যাওয়ার কোনও আশা নেই। নিঝুম স্টেশান। এইসব স্টেশানের তেমন গুরুত্ব নেই। লাইনের পাশে পড়ে থাকে। সারাদিনে একটা দুটো ট্রেন কিছুক্ষণ থেমেই চলে যায়। একজন দুজন যাত্রী কখন নামে, কখন ওঠে। কোনও কোনও দিন যাত্রী থাকেই না। ট্রেনের থামা নিয়ম তাই প্রথামতো থামে। অথচ এইরকম একটা জায়গায় জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে যাচ্ছি ভাবতেও বিস্ময় লাগে।
টিনের চালা গৌরবে যার নাম ওয়েটিং রুম, সেখানে আজ দুজন যাত্রী, কী ভাগ্য! ফাঁক ফাঁক কাঠের বেঞ্চিতে বিছানার পুঁটলি ভর করে নাক ডাকিয়ে ঘুমুচ্ছে। দূরে বকুল গাছের তলায় বাঁধানো বেদিতে আপাদমস্তক সুতোর কম্বল জড়িয়ে কে একজন শুয়ে আছে। সে বোধহয় যাত্রী নয়। ভবঘুরে মানুষ। তাই টিকিটকাটা যাত্রীদের ওয়েটিং চালার বেঞ্চি দখলে নৈতিক সংকোচ।
ঘণ্টা দুয়েক মাত্র মেয়াদ। তারপর আমি চলে যাব। আর কি কোনওদিন আসব এখানে? মনে হয়, না। কেন আসব এখানে! কী করতে আসব! এ তো বেড়াতে আসার জায়গা নয়। অথচ ছেড়ে যেতে এখন যেন কেমন মায়া লাগছে। প্রথম যখন এসেছিলাম তখন কী ভীষণ খারাপ লাগত! কলকাতার ছেলে। মন বসত না কিছুতেই। মনে হত যেন নির্বাসন। তারপর সব কিছুই কেমন সয়ে গেল।
একটু মুচকি হাসলুম। অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের সঙ্গেই যেন অনেক কালের পুরোনো কথা! অনেক দূর থেকে কে যেন নাম ধরে ডাকল—অশোক! চমকে উঠলাম। গলাটা মনে হল খুব চেনা। তারপর বুঝলাম, এ আমারই গলা। আমার সেই তরুণ বয়েসের গলা। তরুণ অশোক, প্রৌঢ় অশোককে ডাকছে। একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দিলুম—কী বলছ? বলেই যেন হাসতে ইচ্ছে করল, কী পাগলামি! ফেলে আসা জীবন কী কখনও ডাকতে পারে! মানুষ কি কখনও সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে টুকরো টুকরো হয়ে যেতে পারে! এক একটা টুকরো কী ফুলের মতো কিংবা খড়কুটোর মতো ভাসতে ভাসতে সময়ের স্রোতের ভাঁটি পথে সঙ্গমের দিকে এগিয়ে চলে! কী জানি। আমি কিন্তু স্পষ্ট শুনেছি, কে আমাকে ডেকেছে!
সারা প্ল্যাটফর্মে একটা কি দুটো আলো জ্বলছে, মিট মিট করে। গাছের তলায় একটা খালি বেঞ্চি। কতক্ষণ দাঁড়ানো যায়! কতক্ষণ পায়চারি করা যায়। বসে পড়লুম! বসার সঙ্গে সঙ্গেই মনে হল পাশে যেন আর একজন কেউ বসল, শুধু বসল না, বসেই একটা হাত রাখল আমার কাঁধে। কে তুমি? তুমিও অশোক। অশোক আবার হাসল। বকুল গাছের পাতার ছায়া নিয়ে আলো কাঁপছে তার মুখের ওপর।
—তোমাকে তো বেশ সুন্দর দেখতে ছিল!
—বলছ? তাহলে সুন্দরই ছিলাম হয়তো! এককালে শরীর চর্চা করতুম তাছাড়া তোমার মাও তো ডাকসাইটে সুন্দরী ছিলেন।
—ঠিক বলেছ! কেয়াতলার বাড়িতে হয়তো এখনও তাঁর ছবি ঝুলছে! তোমার মুখে এখনও কিন্তু আমার মুখের ছাপ লেগে আছে! তবে চুলগুলো তোমার ভীষণ পেকে গেছে!
—তা বয়েস হয়নি আমার! বয়েসে ওসব হবেই।
—অশোক শরীরটা তোমার বেশ দুর্বল হয়ে গেছে, তাই না!
—তা ঝড় ঝাপটা তো জীবনের উপর দিয়ে কম গেল না হে। তোমার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে তুমি যেন আমার ছেলে!
—আপত্তি কী! তাই না হয় ভাবলে। তবে তোমাকে দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে।
—সে কী। কষ্ট হচ্ছে কী! এ অশোক তো তোমারই সৃষ্টি। এক অর্থে বলতে গেলে তুমিই তো আমার আর এক পিতা। হাসছ কেন? আজকের আমি তো কালকের আমিরই সৃষ্টি। তাই না? আমি তোমাকেই দায়ী করছি। তুমি, তুমি, তুমিই তো!
—উত্তেজিত হয়ো না। তোমার সিগারেট নিভে গেছে। ধরিয়ে দেব।
দুই অশোক পাশাপাশি বসে আছি সেই নির্জন স্টেশনে ট্রেনের অপেক্ষায়।
আচ্ছা অশোক তোমার কি মনে হয় না, তুমি জীবনে অনেক ভুল করেছ। এমন সব রাস্তায় মোড় নিয়েছ, যার ফলে তোমার আজ এই অবস্থা।
—হাসালে অশোক। ভুল করি আর যাই করি না কেন সব তো তোমাতেই ফেলে গেলাম। আমি এখুনি চলে যাব, এক ঘণ্টা কি দু'ঘণ্টা পরে। আমি তো তোমাকে ছেড়েই চলেছি, বাকিটা পথ তো আমাকেই যেতে হবে। ভুল করি আর ঠিক করি তোমার তাতে কী এসে যায়!
—অশোক, তুমি একবার এই অশোকের দিকে ফিরে তাকাও, দ্যাখো এক সময় তুমি কীরকম ফুলের মতো টাটকা নবীন ছিলে। তোমার আশাগুলোকে কী একবার তোমার সামনে ছড়িয়ে দেব তাসের মতো!
—না, না এই অন্ধকার রাতে ওই সব পুরোনো জিনিস নিয়ে নাই বা আর ঘাঁটাঘাঁটি করলে। সব গাছেই কি সব ফুল ফোটে? সব পাখিই কি আর মিঠে সুরে গান গায়!
—আচ্ছা, আচ্ছা তোমার কথাই না হয় মানছি। তোমাকে আজ বড় ক্লান্ত দেখছি। বড় ইচ্ছে করছে তোমার মা হয়ে তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দি।
সে কী অশোক? তোমার মধ্যে একসময় এতো মমতা ছিল? এখন তো সে কথা বিশ্বাস করাই শক্ত।
—মানুষের স্মৃতি বড় বিশ্বাসঘাতক অশোক! শক্ত মাটির দিকে তাকালে একবারও কি মনে হয় গভীরে স্বচ্ছ শীতল জলের ধারা আছে।
—তা ঠিক, তা ঠিক অশোক, কিন্তু তুমি যে এককালে এত গভীর তাত্বিক ছিলে তা তো জানতুম না।
—সেইটাই তো মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি, অশোক। তোমার মনে পড়ে কি? আমি একটা গান গাইতুম যার লাইন ছিল এইরকম—'আমি নয়নে বসন বাঁধিয়া আঁধারে মরি গো ঘুরিয়া।'
—ঠিকই তো। একসময়ে তুমি গান গাইতে, অভিনয় করতে, কবিতা, গল্প লিখতে, এমনকি প্রেম করতে!
—তোমাকে দেখে এখন কিন্তু তা মনে হয় না। কী তোমার চেহারা হয়েছে। সামনের চুল পাতলা, গাল ঢুকে গেছে, চোখ বসে গেছে। থেকে থেকে ব্রঙ্কাইটিসের কাশি কাসছ।
—তোমার কিন্তু একটা ভীষণ দোষ ছিল অশোক, সব কিছুই তুমি মাঝপথে ছেড়ে দিতে কেন? পড়াশোনায় ভালো ছিলে অথচ যতদূর লেখাপড়া করা উচিত ছিল করলে না। নিজের কেরিয়ারটা নষ্ট করলে। যার ফলে এই পাণ্ডববর্জিত দেশে আমাকে এনে ফেললে। সামান্য মাইনেতে জীবন কাটালে কোনওরকমে।
—আপশোস করছ কেন? তখন তুমিও তো ঘুরতে ফিরতে বলতে কনটেন্টমেন্ট, কনটেন্টমেন্ট।
—কী করবে, তখন ওই বলেই নিজেকে ঠান্ডা রাখতুম।
—তাই নাকি! কী সাংঘাতিক কথা। তোমার মধ্যে তাহলে ফ্রাসট্রেশন এসে গিয়েছিল, আর সেইটাই তুমি এখন আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে।
—তুমি তো আমারই সৃষ্টি। অস্বীকার করার কোনও উপায় আছে কি! পাছে ভুলে যাও তাই যাওয়ার আগের মুহূর্তে তোমার পাশে এসে কাঁধে হাত রেখে বসেছি।
—আমি কিন্তু তোমাকে ভুলে যেতে চাই। তুমি আমার ভুল, তুমি আমার হতাশা, তুমি আমার আলস্য।
—সে কী! এখন এ কথা বলছ কী করে! স্টেশানের অদূরে ওই টিনের ঘরে জীবনের এতগুলো বছর ফেলে যাচ্ছ, তখন তো নিজের মধ্যে কেমন একটা সুখ সুখ ভাব ফুটিয়ে তুলতে! তুমি তা হলে একজন অভিনেতা ছিলে বলো!
—তোমার দিকে তাকিয়ে আমার তো তাই মনে হচ্ছে। তোমার সেই চন্দ্রা এপিসোড! ভাবলে হাসি পায়। সারাটা জীবন একটা মেয়ের জন্য অপেক্ষা করে করে কাটিয়ে দিলে! কী তোমার অদ্ভুত রোমান্টিকতা। এখন কেমন লাগছে। এই তোমার নি:সঙ্গ জীবন, একা একা ঘুরে বেড়ানো।
'তোমার' বলছ কী, বলো আমার। তুমিই তো আমাকে উপহার দিয়েছ আমার এই জীবন। আমি এখন যা সে তো তোমারই খেয়ালের সৃষ্টি। তুমি তো চলতে চলতে আমাকে এইখানে এনে ফেলেছ। তোমার ওপর এখন আমার অসহ্য রাগ হচ্ছে। তুমি আমাকে এতদিন ধাপ্পা দিয়ে এসেছ, আজ এসেছ আমার সঙ্গে রসিকতা করতে! তোমার হাতটা আমার কাঁধ থেকে সরিয়ে নাও।
—এখন আর রাগারাগি কেন? নিজেকে এইভাবে বোঝাও না—পাস্ট ইজ পাস্ট, অতীত অতীতই। অতীতের জন্যে অনুশোচনা কেন?
—আমার কি মনে হচ্ছে জানো, আমি তোমার হাতেই বন্দি ছিলাম এতকাল, এখন মুক্তি পেয়েও বন্দি। এ বন্ধনদশা আমার ঘুচবে না। আমি যেখানেই যাই না কেন তুমি আমার পাশে পাশেই থাকবে।
চেষ্টা করো আমাকে ভুলতে, আমার কাছ থেকে পালাতে। তুমিই তো বলতে, না আমি বলতাম। মুক্তির সাধনাই শ্রেষ্ঠ সাধনা। ক'টা বাজল?
—তাই তো বাজল ক'টা? এতক্ষণ ঘড়ি দেখিনি। একটার বেশি সিগারেট খাইনি। শীত শীত করছে, তবুও ব্যাগ থেকে চাদর বের করে গায়ে জড়াইনি। অল্প আলোয় ঘড়ি দেখে মনে হল সময় প্রায় কাটিয়ে এনেছি। এখুনি দূরে আউট সিগন্যালের কাছে ইঞ্জিনের লাল চোখ দেখা যাবে।
—অশোক?
এ কী? কখন যে পাশ থেকে উঠে চলে গেছে। এই তো একটু আগে সে কাঁধে হাত রেখে বসেছিল।
—অশোক?
রাতের হাওয়ার ঝাপটায় বকুল কাঁপল। কোথায় কোনও ঝোপ থেকে পেঁচা ডাকল। দূরে স্টেশানের ওপার থেকে একটা কুকুর কেঁদে উঠল। চারিদিক কাঁপিয়ে ট্রেন এসে ঢুকল স্টেশানে। অশোকের কোনও সাড়া পেলুম না। সে কখন নি:শব্দে উঠে কতদূর চলে গেছে। ট্রেনে উঠে জানলার ধারে বসে শেষবারের মতো বাইরে তাকাতেই দেখলুম, বকুল গাছের আলো আঁধারিতে দাঁড়িয়ে অশোক হাসছে। দূরে পশ্চিম আকাশে একফালি চাঁদ হেসে আছে।
—এসো উঠে এসো তুমিও। আমি একলা যাব নাকি!
অশোক শব্দ করে হাসল, তাতে কী হয়েছে! আমি তো একলাই এসেছিলাম, একলাই থেকে যাব তোমার স্মৃতি নিয়ে।
ট্রেন ছেড়ে দিল। সে চেঁচিয়ে বলল, চন্দ্রাকে বোলো আমি তোমাকে উপহার দিলাম তার কাছে।
—কোথায় তার দেখা পাব?
—যদি কোনওদিন কোনও মানুষের মিছিলে তাকে খুঁজে পাও এই কথা বোলো। যদি চিনতে পারো নি:শব্দে তার সামনে দু-দণ্ড দাঁড়িয়ো তাহলেই সে বুঝে নেবে ঠিক।
এরপর আর কিছু শোনা গেল না। ট্রেন একটা ব্রিজে উঠে গমগম শব্দে চারিদিক কাঁপিয়ে অন্ধকারের বুক চিরে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন