সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

যে দিন পৃথিবীতে প্রবেশ করলুম সেইদিন থেকেই শুরু হল অপমানিত হওয়ার পালা। পদে পদে অপমান। অপমান আমাদের জীবন সাথী। পারস্পরিক ব্যাপার। হয় আমি অপমান করব, না হয় কেউ আমাকে অপমান করবে। হয় আমি কারোকে কাটা কাটা বাক্যবাণে জর্জরিত করব, না হয় কেউ আমাকে করবে। পৃথিবী থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার মুহূর্তেও শরীরে লেগে থাকবে একটা জ্বালা, মনে একটা ক্ষোভ, জীবনের হাতে কী জুতোপেটাই না খেলুম! উঠতে কোস্তা বসতে কোস্তা।
যখন অবোধ শিশু, কান্নার পর্যায়ে আছি, তখন কেউ না কেউ বলেছে, চেল্লাচ্ছে দেখ, কানের পোকা বের করে ছাড়বে। এই কে আছিস, দূর করে বাইরে ফেলে দিয়ে আয় জানোয়ারটাকে। ধৈর্যের শেষ সীমায় মা বলেছেন, কেঁদে না মরে গেলে মরো না। এই শয়তানটা আমার হাড়-মাস কালি কালি করে ছাড়লে। মাঝে মাঝে মনে হয় গলা টিপে শেষ করে দি! পুত্রের অপমান পিতাতেও সময় সময় বর্তায়, যেমন বাপ তার তেমন ছেলে। বাপ বকাসুর, ছেলে ঘটোৎকচ।
জ্ঞান হল। পড়তে বসলুম। অক্ষরের জগৎ, সংসার জগৎ। একই 'ইউ'। আমব্রেলার আগে 'অ্যান', ইউনিভার্সিটির আগে 'এ'। শুরু হয়ে গেল খ্যাচাখেচি, ধস্তাধস্তি। এ, অ্যান, দি, দ্যাট, হ্যাজ, হ্যাভ, ইজ, অ্যাম, আর। বলো, পীড়িত বানানা কী! লেখো, লেখো, স্লেটে লেখো। আহা, মানিক আমার। দ্যাখ, দ্যাখ, দুটোতেই দীর্ঘ ঈ মেরে বসে আছে। একটু বেশি পীড়া। ট্রিটমেন্ট করে পরের দীর্ঘ-ঈ-টা ছাড়াতে হবে। এই, উসকো কান পাকাড়কে ইধার লাও। এই ই, ঈ, উ, ঊ-এর ঠেলায় বাঁ কানটা ডান কানের চেয়ে দু সুতো বড়ো হয়ে গেল। যতদিন না গোঁপ গজাল, ততদিন প্রহরে প্রহরে প্রহার আর নির্বিচার টানাটানি। ভূপতিত আর ভূপাতিত, কী তফাৎ! বল গাধা! দশ সের সরু চালে কুড়ি সের মোটা চাল পাইল করে পাঁচ সিকে দরে বিক্রি করলে লাভ কত হবে! হাঁ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘুড়ি দেখলে ওরে বাঁদর সারাটা জীবন যে রিকশা টানতে হবে! এবম্বিধ তিরস্কারের পর এমন অঙ্ক কষলুম, পুত্রের বয়স পিতার চেয়ে দশ বছর বেশি হয়ে গেল। শিক্ষকমহাশয় এক হাতে ডাস্টার এক হাতে বেত নিয়ে রুদ্রনৃত্য শুরু করলেন। বিনীতভাবে যেই বলেছি, স্যার! এত উত্তেজিত হচ্ছেন কেন সামান্য ব্যাপারে! উলটে নিলেই তো হয়, যার বয়েস বেশি সে পিতা, যার বয়েস কম সে পুত্র। সঙ্গে সঙ্গে গাধার টুপি হাতে ছুটে এল স্কুলের দারোয়ান। গাধাটার মাথায় চাপা। জিভ বের কর, কান ধর। শুরু হল স্কুল পরিক্রমা। দৃশ্য দেখে পণ্ডিতমশাই ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ঘোর কলি! এরপর দেখবে, মেয়ের গর্ভে মা জন্মাবে!
এরপর চাকরি। পাহাড়ের যেমন চড়াই উতরাই থাকে, মাঝে মাঝে উপত্যকা বিস্তীর্ণ। সেইরকম চাকরি জীবন হল অপমানের উপত্যকা। দশটা থেকে পাঁচটা অপমানের তাঁবুতে সার্কাসের খেলা। বড় প্রভু, মেজ প্রভু, ছোট প্রভু, প্রভুর প্রভু, যার কাছেই যাওয়া যাক, সেই বুঝিয়ে দেবে তুমি অন্নদাস। প্রতি মুহূর্তে বোধ হবে, ওরে পেট, তোর জন্যে করি আমি মাথা হেঁট।
তুলসীদাস একটি বাস্তব পরামর্শ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন,
তুসলী উহা যাইয়ে, যাঁহা আদর না করে কোই।
মান ঘাটে, মন মরে, রামকো স্মরণ হোই।।
হে তুলসি! যেখানে গেলে তোমাকে কেউ আদর করবে না, তুমি সবসময় সেইখানেই যাবে। কেন যাবে! সেখানে যাবে এই কারণে, উপেক্ষা আর অপমানে তোমার মন অহংকারমুক্ত করে, মরমে মরে যাবে, আর তখনই তোমার মনে জগৎপিতার চিন্তা আসবে।
কীভাবে মানুষকে অপমান করা যায়, তারও একটা শাস্ত্র আছে, সেটাও একটা আর্ট। গ্রাম্য মানুষ গোদা গালাগাল দেবে, আর বড়ো মানুষ, শিক্ষিত মানুষ, বুদ্ধিজীবী মানুষ, তাঁদের কায়দাটা অন্যরকম। সূক্ষ্ম, কিন্তু ভয়ংকর। ছুরি মারলে রক্ত বেরোবে। সেরে গেলে স্মরণে থাকবে না। বাক্যের চোট সাংঘাতিক। মনে রক্তপাত। কোনও ওষুধ নেই। বাক্যের খোঁচা অতি ভয়ংকর। তুলসীদাস বললেন, 'মারে শব্দেসে।'
আর্টিস্টিক অপমানের নমুনা :
হুইস্টলার ছিলে বিখ্যাত চিত্রশিল্পী। ততোধিক বিখ্যাত ছিল তাঁর মুখ। ছবি আঁকার ক্লাসে এক ছাত্রীকে প্রশ্ন করলেন,
'তুমি ন্যু ইয়র্ক থেকে এসেছ?'
'ইয়েস স্যার!'
'দেখি কী আঁকলে?'
মেয়েটি ক্যানভাস নিয়ে এগিয়ে এল। শিল্পগুরু দেখে প্রশ্ন করলেন,
'হাতটা আঁকলে লাল রঙে, কনুইয়ের কাছে সবুজ ছায়া মারলে কোন আক্কেলে?'
'স্যার, আমি যা দেখি, ঠিক সেই ভাবেই আঁকি।'
শিল্পী বললেন, 'বেশ বেশ, খুব ভালো, বাট মাইডিয়ার দি শক উইল কাম হোয়েন ইউ সি হোয়াট ইউ পেন্ট।' যা দেখ, তাই আঁকো, অতি উত্তম কথা, তবে নিজের আঁকা ছবি যখন দেখবে তখন ভিমরি খাবে।' ক্লাস ভরতি ছাত্রছাত্রী। মেয়েটির মাথা হেঁট।
আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়েছে। কলেজের প্রথম দিনের প্রথম ক্লাস। অধ্যাপক সকলের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছেন, 'তোমার নাম?' নাম বললুম। 'নিবাস?' বললুম, 'বরাহনগর'।
অধ্যাপক রসিকতা করলেন, 'আশা করি, তোমার থেকে তোমার বন্ধুদের কোনও ভয় নেই!' সামনের সরিতে ছাত্রীরা। তারা আমার এমন হেনস্থায় খিলখিল করে হেসে উঠল।
সঙ্গে সঙ্গে আমার উত্তর, 'আজ্ঞে না স্যার, বরাহরা আমার তালুকের প্রজা। আমি নগরপাল মাত্র।' জন ড্রাইডেন, আমাদের পরিচিতি নামকরা কবি। ছাত্র জীবনে সকলেই পড়েছেন ড্রাইডেন। ড্রাইডেন খুব পড়ুয়া ছিলেন। তাঁর নিভৃত স্টাডিতে সারাদিন বইমুখে বসে থাকতেন। একদিন তাঁর ক্ষুব্ধ স্ত্রী আক্ষেপের সুরে বলছেন, 'লর্ড মি: ড্রাইডেন, সারাদিন ওই পুরোনো বইগুলো নিয়ে অমন মশুগুল থাকো কী করে! মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে একটা বই হয়ে যাই, তাহলে খানিক তোমার সঙ্গ পাওয়া যেত!'
কবি উত্তরে বললেন, 'বই হবে তো বেশ ভালো কথা! একটাই অনুরোধ, বই যদি হও, তো একটা পাঁজি হয়ো, তাহলে বছর বছর পালটাতে পারব।'
বিখ্যাত লেখক, সমালোচক কারলাইয়ের কথা আমরা সবাই জানি। কারলাইয়ের দাম্পত্যজীবন সুখের ছিল না। সকলেই তা জানতেন। লাগাতার দ্বন্দ্ব। স্যামুয়েল বাটলার একদিন বলে বসলেন, 'ঈশ্বর করুণাময়! কী ভালোই না করেছেন দুজনের বিয়ে দিয়ে। তা না হলে চারজনের জীবন অতিষ্ঠ হত।'
কী ভাব! দুজনেই সমান। কারলাইল যদি আর একটি মেয়েকে বিয়ে করতেন, আর শ্রীমতী কারলাইল যদি অন্য একটি পুরুষকে বিয়ে করতেন তাহলে চারজনেই জীবনেরই বারোটা বেজে যেত।
স্যার থমাস বিচাম ছিলেন একজন বিখ্যাত বাদক ও সংযোজক। একটা কনসার্টের জন্যে বিভিন্ন বাদকের পরীক্ষা নিচ্ছেন। এক যুবতী চেলো বাজাচ্ছে। বিচাম তাকে একটি টুকরো বাজাতে দিয়েছেন। বিচাম লক্ষ করছেন, মেয়েটি অনেকক্ষণ লড়াই করে কিছুতেই বাগে আনতে পারছেন না। যাই হোক কোনওরকমে শেষ করে মেয়েটি প্রশ্ন করল,
'এরপর কী করব স্যার?'
বিচাম বললেন, 'গেট ম্যারেড!' আর কিছু করতে হবে না। বিয়ে করে ফ্যালো।
লুই দ্যা ফোরটিনথ-এর রাজত্বকালে ফ্রান্স আর ইংল্যন্ডের সম্পর্ক ভেতরে ভেতরে খুবই তিক্ত ছিল, কারণ ধর্ম। ক্যাথলিক উগ্রতা, পোপের ক্ষমতা, ইংল্যান্ডের প্রাোটেস্টান্টদের কাছে অসহ্য মনে হত। এক ইংরেজ এসেছেন রাজদরবারে। রাজা লুই তাঁকে নিয়ে গেছেন রয়্যাল আর্ট গ্যালারিতে। অতিথিকে দাঁড় করিয়েছেন একটি ছবির সামনে। লুই জানতেন ছবির সামনে দাঁড়ালেই যে কোনও প্রাোটেস্টান্ট বেশ একটু ধাক্কা খাবে, আর সেইটাই তাঁর উদ্দেশ্য।
রাজা বললেন, 'এই হলেন ত্রুশবিদ্ধ যিশু। আর ডানদিকের ছবিটা হল পোপের, আর বাঁদিকেরটা আমি।'
অতিথি বললেন : ‘I humbly thank your majesty for this information. আমি প্রায় শুনতাম, আমাদের প্রভুকে যখন ত্রুশবিদ্ধ করা হয়, তখন তাঁর দুপাশে দুটো চোর দাঁড়িয়েছিল। আমি এই ছবিটা দেখার আগে পর্যন্ত জানতুম না, সেই চোর দুটো কে, কে। এখন জানা গেল ইওর ম্যাজেস্টি। ধন্যবাদ!' বিখ্যাত ড: জনসন যে কোনও কারণেই হোক নারী-বিদ্বেষী হয়ে পড়েছিলেন। সকলেই তা জানত। তিনি মনে করতেন, মেয়েরা সব মহানির্বোধ। একদিন বিরক্তিকর রকমের বাচাল এক মহিলা জনসনকে পাকড়েছে। কিছুতেই সঙ্গ ছাড়ল না। মহিলা এক সময় প্রশ্ন করছে,
'ডক্টর, শুনেছি, আপনি না কি মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের সঙ্গ বেশি পছন্দ করেন!'
জনসন বললেন, 'ম্যাডাম ! আপনার ধারণা খুব, খুব ভুল। আমি নারীর সঙ্গ খুবই পছন্দ করি, তাদের সৌন্দর্য, প্রাণচাঞ্চল্য এবং তাদের নীরবতা। আই ভেরি মাচ লাইক দেয়ার সাইলেন্স।'
তুলসীদাসের একটি দোঁহা আছে :
ভাটকে ভালা বোলনা চলনা বহুড়কে ভালা চুপ।
ভেককে ভালা বর্ষাবাদর, অজকে ভালা ধুপ।।
যারা ভাট, তারা অনেক কথা বলবে, বহু পথ চলবে, কিন্তু বধূরা স্বল্পভাষী হবে। সেইটাই শোভন। সেইটাই কাম্য। ব্যাঙের কাছে যেমন বর্ষা, ছাগলের কাছে যেমন রোদই আনন্দের কারণ। নারীর নীরবতা অন্যতম একটি সৌন্দর্য। জনসন সেইটিই বললেন,
জনসন আর ডিকেনস রজানই খুব মজার ছিলেন। কথা দিয়ে কামড়াতে পারতেন মোক্ষম। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ লেখকের পাণ্ডুলিপি ফেরত দিলেন জনসন এই মন্তব্য লিখে, your manuscript is both good and orginal. But the part is good is not original and the part that is original is not good. চার্লস ডিকেনন্সের কাছে একটি কবিতা সংকলন এল, নাম ‘Orient Pearls at Random Strung’। ঔপন্যাসিক ছোট্ট একটি চিরকুট লিখলেন কবিকে—Dear Blanchard, too much string. yours C.D.
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন