সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীটা ক্রমশই কেমন যেন বিশ্রী হয়ে যাচ্ছে। আর যেন বাঁচতেই ইচ্ছে করে না। কে একজন বললেন, 'আর ভাই কোনওরকমে বেঁচে আছি। মরতে পারছি না বলেই বেঁচে থাকা।' 'কেন মশাই? এই অ্যাতো সুন্দর পৃথিবী! গাছপালা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, ফুল ফল! আয়োজনের তো অভাব নেই। তবু কেন এই বিতৃষ্ণা!'
'তাহলে বলি শুনুন। জন্মালুম হেমন্তের এক সকালে। সদ্যোজাত শিশু দেখেছেন?'
'আজ্ঞে হ্যাঁ। দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।'
'অ্যাতোটুকু একটা লালমাংসের ডেলা। তার চোখ ফোটেনি, মুখের আদল খোলেনি। সবই থ্যাবড়া, যেন একটা গিরগিটির ঠ্যাং ধরে ঝুলিয়ে, চড়চাপড় মেরে তাকে কাঁদাবার চেষ্টা। না কাঁদলে ফুসফুস ফুলবে না। ভাবুন পৃথিবীতে প্রথম ঢোকার কী সুন্দর আপ্যায়ন! তারপর মুখে আঙুল পুরে কিছুটা লালা বের করে দিয়ে গরমজলের গামলায় নাকানিচোবানি। অবশেষে একটা টিকিট মেরে পাঠিয়ে দিলে শিশুদের খাঁচায়। যেন কয়েদি। এইবার দোলনায় পড়ে পড়ে হয় চেল্লাও না হয় ঘুমোও। তার মানে পৃথিবীটা আমাদের কারাগার। চার মাসের আগে চোখ ফোটার আশা নেই। জ্ঞান তো দূরের কথা। একেবারে অসহায়। পরের দয়ায় বেঁচে থাকা। কে কখন দয়া করে খাওয়াবে। কে কখন দয়া করে ভিজে কৌপিন পালটে দেবে। অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণের একমাত্র ভাষা তারস্বরে কান্না। আবার যদি বেশি কেঁদে ফেলি সাতকাজে ব্যস্ত মা বিরক্ত হয়ে হয়তো দু-এক ঘা চড়চাপড়ই মেরে দিলেন। পৃথিবীতে মানুষের কী অসহায় প্রবেশ। ছত্রী সৈন্যের অজানা প্রান্তরে অবতরণের মতো। কী অপেক্ষা করে আছে কে জানে! মা যদি শিশুটিকে তোয়ালে মুড়ে রেলের প্লাটফর্মে, কি পথের পাশের ডাস্টবিনে ফেলে রেখে যান, পৃথিবীতে পা রাখার খেল আরও জমে যায়। মরে গেল তো ল্যাঠা চুকেই গেল, নয়তো কেউ কুড়িয়ে নিয়ে জমা করে দিল উদ্ধার আশ্রমে। সে তবু মন্দের ভালো! অনেক সময় বেওয়ারিশ শিশু চলে যায় অপরাধীদের হাতে। সেখানে জালায় পুরে বিকলাঙ্গ করে বড় করা হল, অথবা হাত-পা কেটে নেওয়া হল নিখুঁত করে। এইবার সারাজীবন পথের পাশে বসে ভিক্ষে করো। কার বরাতে কী নাচছে কে বলতে পারে। এর নাম আমাদের বাহারের পৃথিবী। সব কিছুই যে কোনও একজন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যদিও এটা মানুষেরই পৃথিবী। মানুষই ফেঁদে রেখেছে চক্রান্তের জাল। যার চক্র আছে চক্রান্ত আছে, পেশিবল, অর্থবল আছে, তারা সবাই মিলে মানুষকে সরষের মতো পিষছে। গলায় চেন বেধে গাছ তলায় হাটের মাঝে দাঁড় করিয়ে মধ্যযুগে মানুষ বিক্রি করা হত। ক্রীতদাস হয়ে সারা জীবন বলদের মতো কাটাও। সেই দাস ব্যাবসা আজও চলছে ভদ্র ও সভ্যভাবে। আমরা সবাই অন্নদাস। মালিকের মর্জিতে জীবন চলছে। আমরা সংসারের দাস। শোনো নি সেই ক্ষোভের গান—লোহারই বাঁধনে বেঁধেছে সংসার, দাসখত লিখে নিয়েছে হায়।
'সুস্থ পরিবারে শৈশব কাটলেও, যৌবনের চালচিত্র কী দাঁড়াবে জানা নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যতই গোটাক, মাথা না থাকলে প্রতিষ্ঠা পাওয়া কঠিন। পৃথিবীটা এইরকমই, হয় মাথা ভাঙিয়ে খাও নয় মাথা ভেঙে খাও। সর্বত্র খেয়োখেয়ি, অসুস্থ প্রতিযোগিতা, একপেশে সমাজ ব্যবস্থা। যুদ্ধের কথা মনে পড়ে। বিশালপ্রান্তরে একা হেঁটে চলেছে সৈনিক, চারপাশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসছে মেশিনগানের গুলি। লাগল তো হয়েই গেল, না লাগলে রয়ে গেল আপাতত। অদৃশ্য গুলির দিকে পাতা রয়েছে আমাদের বুক।
কতরকমের গুলি, শুনবে? শিশুটি পিতামার আদরে বেশ বড় হচ্ছিল, হঠাৎ হয়ে গেল পোলিও। পড়ে গেল একটা পা। বিকলাঙ্গ। সম্পূর্ণাঙ্গ হয়েই কূল পাওয় যায় না, বিকলাঙ্গের পৃথিবী অনেক সংকীর্ণ। এও এক অদৃশ্য গুলি। শিশুটি সুস্থ শরীরে যদিও বা কিশোর হল, এক চোটে মারা গেলেন তার মা-বাবা। অনাথ কিশোরে সামনে হৃদয়হীন পৃথিবী। এইবার হয় সে চায়ের দোকান, কি মিষ্টির দোকানের বালক কর্মচারী। অথবা কারোর গৃহভৃত্য। আমাদের দেশ, সে দেশ নয় যে, মুদির মেয়ে প্রধানমন্ত্রী হবে, ছুতোরের ছেলে প্রেসিডেন্ট হবে। এদেশের ঝোল কোলে টানছে বড়লোক। মুরুব্বি ধরে ডাক্তারি কি ইঞ্জিনিয়ারিং শিখতে হয়। আইন পাস করে ধরতে হয় বাঘা সিনিয়ার। ভালো ছেলে হলেই ভালো চাকরি জুটবে না, যোগাযোগ থাকা চাই উপর মহলের সঙ্গে। ভাগ্য বিপাকে ফেললে সে পুরুষকার লাখে একজনেরই থাকে উঠে দাঁড়াবার। বালক ভৃত্য খিস্তি শিখবে, অল্প বয়সেই নেশা ধরবে, শিখবে চুরি করতে। এই হল জীবনের রাজপথ। এই ফাঁপরে না পড়লেও অন্য গোরা আছে। ঢুকল কলেজে, মেধাবী ছাত্র, পরিবার স্বপ্ন দেখছে, বাছা আমার বিজ্ঞানী হবে, রিসার্চ করবে, ভিয়েনা যাবে। অপ্সরার সঙ্গে বিয়ে হবে। বাছাটির সহপাঠী বললে, এই নে সাদা গুঁড়োটা রাংতায় ফেল, আমি তলায় দেশলাই কাঠি ধরছি, ধোঁয়াটা নাকে টেনে নে। দেখবি মজা কাকে বলে। ব্যাস, তিন দিনেই বাছা আমার মাদকের শিকার। জোড়া জোড়া স্নেহের চোখের সামনে দিয়ে সোনার চাঁদ চলে গেল খরচের খাতায়। চোখের জলে বিদায়।
এসব যদি না-ও হল, ছাত্রজীবনেই প্রেম ধরল। প্রেমের আবার গুলি নয় চোখা তির। লেখাপড়া লাটে উঠে গেল। পিতার অন্ন ধ্বংস করে ললিতার করমর্দন। পার্কই হল কলেজ। নারীর গোবরে জোনাক জ্বলে। পরীক্ষা আসে, পরীক্ষা চলে যায়। একদিন ললিতা মেরে দিলে কাঁচি। প্রেমিক নীল আকাশে লাট খাওয়া ঘুড়ি। হয় ঘুমের বড়ি খাও, নয় ঝুলে পড়ো গলায় দড়ি লাগিয়ে। আজকাল তো মরলেই শহিদ। বাছা হয়ে গেল প্রেমের শহিদ।
সব বেড়া টপকে যে মোটামুটি জীবন সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত হল, পিতা হল, গুলি তার দিকেও আসবে। পৃথিবীতে চলেছে অদৃশ্য শিকারির শিকার খেলা। কর্তা হঠাৎ মদ ধরলেন। মদের সঙ্গে আর এক মা। টাকা উড়ে গেল পায়রার ঝাঁকের মতো। সঙ্গে হয়তো ঘোড়াও ধরলেন। টাকার প্রবাহ পথ ঠিক রাখতে ধরলেন ঘুষের পথ, কি কর্মস্থলের ক্যাশ ভাঙলেন, সোনার সংসার ফেঁসে গেল। শেষে লিভারে পচ ধরে পটল।
আর যে এসবও পেরিয়ে এল, তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরল হরেক অসুখ—রক্তে চিনি, গাঁটে গাঁটে বাত, হৃদয়ে কাঁথা সেলাই, ফুসফুসে জল, রক্তে চর্বি, চোখে চালসে, পাকস্থলীতে ফুটো, শ্বাসনালীতে শ্লেষ্মা কিংবা রোগের সেরা কর্কট। তার ছায়ায় ছায়ায় জীবনের শেষ প্রান্তর পেরোনো। জীবনের শেষ দশ বছর বিষণ্ণ এক তীর্থযাত্রা। বলো এরপর কী বলি? বিদায় পৃথিবী। আবার যেন ভাসি। সাহসী সৈনিক আমি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন