সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মাংসের দোকানের নাম, জীবসেবা। মালিক, রসিক দার্শনিক। প্রশ্ন করেছিলুম, এটা একটা নাম হল! বললে ভেবে দেখবেন। নামে কোনও ভুল নেই। যাই হোক, রোজ সকালে আমি যখন পড়াতে যাই, তখন দেখি, দুটো ছাগল দোকানের বাইরে বাঁধা। মৌজসে বটপাতা চিবোচ্ছে। আর একটা ঝুলছে। যখন ফিরে আসি, তখন কোনও দিন দেখি একটা বাইরে বাঁধা, আর একটা নেই, ঝুলছে। কোনও দিন দেখি, দুটোই নেই। কিছু বটপাতা পড়ে আছে।
সেদিন সকালে অবাক কাণ্ড! কী মনে হল, একটা ছাগলকে প্রশ্ন করলুম, 'কী ভাই, কেমন আছ?' এমনি একটু মজা করার জন্যে যেতে যেতে ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন। আজকাল কোনও মানুষকেই কোনও কথা বলা যায় না। সব মানুষেরই মনে তেমন সুখ নেই। কথা বললেই কথা কাটাকাটি, বাক্যবাণ ছোঁড়াছুঁড়ি, হাতাহাতি হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। সব মানুষই বড়, ছোট লঙ্কা, পরিমাপ মতো ঝালে ভরা। ডগায় থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। আবার কথা না বলেও তো থাকা যায় না। সব মানুষেরই ভেতরে ভেতরে কথা চলেছে। গুম মেরে গোমড়া হয়ে কতক্ষণ থাকা যায়। তাই গাছের সঙ্গে, পাতার সঙ্গে, ফুলের সঙ্গে, আকাশের সঙ্গে কথা কই। এরা সব শ্রোতা তাই কথা কাটাকাটির ভয় নেই। কথায় ফোড়ন হেলুনি, খণ্ডযুদ্ধ! অবাক হলাম এই কারণে, ছাগলটা পরিস্কার মানুষের ভাষায় উত্তর দিল। আধবোজা চোখে বললে, 'দেখতে পাচ্ছ না কেমন আছি। সেই ভোর থেকে এক নাগাড়ে কচি কচি বটপাতা খেয়েই যাচ্ছি, খেয়েই যাচ্ছি। বুঝলে লোকটা বেশ দিলদার। কৃপণ নয়। বেশ খাওয়ায়-দাওয়ায়। এই দ্যাখো না, একটু আগে আমরা দুজনে পাতা খাচ্ছিলুম, দ্যাখো লোকটা কত উদার, আমার ভাগীদারটাকে ভেতর টেনে নিয়ে গিয়ে এক কোপে সাবাড় করে দিয়ে ওই দ্যাখো ঝুলিয়ে দিয়েছে। সেই থেকে দুজনের খাবার আমি একাই খাচ্ছি। কী ভালোবাসা মাইরি।'
আমি বললুম, 'সাধে তোমাকে ছাগল বলে, বলে তোমার এই পাঁঠার বুদ্ধির জন্যে।'
সব ছাগলকেই কেমন যেন বুড়ো বুড়ো দেখতে। বটপাতা চিবোতে চিবোতে বললে, 'অ, তুমি হলে বুদ্ধিমান মানুষ, আর আমি বোকা পাঁঠা। আমি যা বললুম তাতে আমার বোকামিটা কোথায় দেখলে?'
'একটু পরে তো তোমারও গর্দান যাবে, আগে আর পরে।'
'সে তো তোমারও যাবে, কাল, পরশু অথবা দশ কি বারো বছর পরে, তবে যাবে একদিন যাবেই যাবে। আমাকে বটপাতা খাওয়াচ্ছে ওই লোকটা, ওই লোকটাই আমাকে মারবে আজ অথবা কাল, আবার ওই লোকটা, যে ছাগল বেচে খাচ্ছে তার দিনও ঝপাত করে শেষ হবে একদিন। আমি বটপাতা, শালপাতা খাই, তুমি টোস্ট, ডিম, মুর্গমসল্লম খাও, তা খাও না, কিন্তু ঘড়ি ভাই ঠিক চলছে। তোমাতেও চলছে, আমাতেও চলছে। আমার হয়তো একটু পরেই থামবে, তোমারটা হয়তো আরও কিছুদিন পরে।'
'বেশ তোমার এ কথাটা আমি মানলুম, কিন্তু কোন আক্কেলে তুমি তোমার ঘাতকের প্রশংসা করছ?'
'এই লাও, তুমি দেখি রামপাঁঠা। তুমি তোমার ভগবানের প্রশংসা করো না, পুজো করো না! তবে! ভগবান কে! যে মানুষের কাছে মৃত্যুকে পাঠায়। তোমার পাশে কেউ একজন মারা গেলে তুমি কী ভাবো—করুণাময়! আমি এখনও আছি, খোদা মেহেরবান। আমাকে দেখে আমার পাশেরটাকে নিয়ে গেল। তাই আমিও বলছি, বাবা, মাংসওয়ালা তুমি কৃপাময়!'
আমি বললুম, 'তোমার গলায় দড়ি, তুমি দাঁড়িয়ে আছ বধ্যভূমিতে। আমি স্বাধীন, ঘুরছি-ফিরছি, খাচ্ছি-দাচ্ছি, তাহলে বুঝলে তফাতটা! তোমার আর আমার পার্থক্য!' ছাগল বিজ্ঞের মতো হেসে বললে, 'তুমি একটা গাধা! মৃত্যু যেখানে সেইটাই তো বধ্যভূমি হে। পৃথিবীটাই তো বধ্যভূমি মানিক। স্বাধীনতা! লোহারই বাঁধনে বেঁধেছে সংসার, দাসখত লিখে নিয়েছে হায়! এ তো তোমাদেরই গান।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন