সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীর এই চিড়িয়াখানায় আমিও তো এক প্রাণী। কেমন প্রাণী! সংজ্ঞা মেলালে, মানুষই বলতে হবে। দুটো হাত দুটো পা। বাঁদর, ওরাংওটাং, শিম্পাঞ্জি ছাড়া মনুষ্যেতর অন্য কোনও প্রাণীর হাত নেই। চারটেই পা। চতুষ্পদ। মানুষ দ্বিপদ। সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে, আবার ইচ্ছে করলে দু-হাত, দু-পায়ে হামাও দিতে পারে। শৈশবে দশ, এগারো মাস হামাই দেয়। তারপর ধরে ধরে দাঁড়ায়, তারপর টলে টলে টালমাটাল হাঁটা, ধুপধাপ পড়ে যাওয়া। অবশেষে দৌড়। সেই যে দৌড় শুরু হল, চলল চিতায় শয়ন পর্যন্ত।
তবে চল্লিশের পর নানা উপসর্গ দেখা দিতে পারে। হনুমানের বাত হয় না, সেরিব্রাল অ্যাটাকে, বাম অথবা দক্ষিণ অঙ্গ পড়ে যায় না, যা যে কোনও মানুষের হতে পারে এবং হয়ও। ঘোড়ার বাত হয়, তখন বলা হয় বেতো ঘোড়া।
মানুষ কেন শিম্পাঞ্জি নয়! ওটা বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন। বাঁদর থেকে মানুষ হতে কত বছর লেগেছিল। প্রকৃতির পাঠশালায় কী ধরনের লেখাপড়া করতে হয়েছিল! কোন বিউটি পারলারে গিয়ে বাঁদরকে লেজ ছেঁটে লোম কামিয়ে, প্লাস্টিক সার্জারি আর ফেস প্যাক নিয়ে সুন্দর হতে হয়েছিল! এ সব বিবর্তন বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন।
আমাকে বলা হল, 'তুমি মানুষ'। আমি মনে করতে শিখলুম আমি একটা মানুষ।
আমাকে বলা হল, তোমার একটা ফুটবলের মতো গোল মাথা আছে তার মধ্যে বুদ্ধি আছে, কৌশল আছে, ভাষা আছে, শিল্প আছে, বিচার আছে, কাজে লাগাও। মানুষ হও।
মানুষ আবার মানুষ হবে কী করে?
আছে। মনুষ্যত্ব তোমাকে অনুশীলন করতে হবে। শিখতে হবে। শিক্ষা। ভাষা শিখবে, শিখবে বর্ণমালা। তারপরে জ্ঞান, বিজ্ঞান, সহবত। তারপর চর্চা করবে, সঙ্গীত, শিল্প। তারপর অভ্যাস, ভালোবাসার অভ্যাস, সেবার অভ্যাস, ত্যাগের অভ্যাস। সকলের সঙ্গে শান্তিতে বেঁচে থাকার অভ্যাস। একটা কুকুর আর একটা কুকুরকে দেখলে গড়রর গড়রর করে দাঁত বের করে কামড়াতে যায়। তুমি ওরকম করবে না। কোনও মানুষকে অপছন্দ হলে, আক্রমণের অন্য অনেক সুসভ্য রাস্তা আছে। কুকুরের মতোই কামড়াবে, তবে সুসভ্য উপায়ে, সুন্দর ভাবে, শিল্পসম্মত ভাবে। নানারকম অদৃশ্য বাঁশ অদৃশ্য বাঁশঝাড় আছে, সেই বাঁশ প্রয়োগ করবে। আদালত আছে মামলা করবে। সেই মানুষটি যদি তোমার ভাড়াটে হয় জলের লাইন আলোর লাইন কেটে দেবে। যদি তুমি তার ভাড়াটে হও ভাড়া বন্ধ করে দেবে। দরজা, জানলা, দেওয়াল-টেওয়াল সব ভেঙে দেবে। পাড়ার ক্লাবকে ব্যবহার করবে। ক্লাব খুব সাহায্যকারী সংগঠন। পরোপকার ও পরের অপকার (সন্ধি করার চেষ্টা করি। পর + অপকার পরাপকার) অর্থাৎ পরোপকার ও পরাপকার, উভয় প্রকার 'কার' এই ক্লাব করতে পারে, তার জন্যে চাঁদা দিতে হবে। সবসময় স্মরণে রাখবে, তুমি মানুষ, তোমার অন্তরে কুকুর, শেয়াল, হায়না, বাঘ, সাপ থাকতে পারে, কারণ বিবর্তনের ধারায় তুমি শেষমেশ মানুষ হয়েছ। শাস্ত্র বলছেন চুরাশি লক্ষ যোনি অতিক্রম করার পর তোমার এই মানব জন্ম। ফলে যাবতীয় জন্তু জানোয়ারের পূর্বস্মৃতি তোমাতে বর্তমান। ক্ষণে ক্ষণে তোমার স্বভাবে তার প্রতিফলন। মানুষকে কী করতে হবে, চেপেচুপে রাখতে হবে। জন্তুরা সব দেহ-খাঁচায় থাক, তুমি নিজেকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখো—জেন্টলম্যান। সব মানুষই বোকা, তুমি যে হেতু মানুষ তুমিও বোকা। এই বোকারা কী দেখে—পৃথিবীময় প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, দয়া, মায়া, সহযোগিতা, বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, নির্ভরতা, নিরাপত্তা, সামাজিক বন্ধন, পারিবারিক বন্ধন। এই বোকাদের শাস্ত্র বলবে, সত্য ও সুন্দরের পৃথিবীর চারটে স্তম্ভ—দয়া, মায়া, প্রেম, স্বাধীনতা। এই বোকাদের পৃথিবীর বাণী হল, সবে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন