সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শীতকাল। ভোর পাঁচটা মানে ভদ্রলোকের মাঝরাত। ছাত্রজীবন চলে গেছে, ঘুমও গেছে। সে জীবনে বই খুললেই চোখ জুড়ে আসত কালনিদ্রায়। মাথায় ওপর পরীক্ষার খাঁড়া ঝুলছে। সামনে খোলা অর্থনীতির বই। মাথা লটকে আছে চেয়ারের পেছনে। ঠোঁট ফাঁক। ফুড়ুত-ফুড়ুত নি:শ্বাস পড়ছে। কিল, চড়, ঘুসি, কানমলা, নস্যি, অন্ধকার ভবিষ্যতের ছবি, কোনও কিছুতেই ঘুম আর বাগ মানে না। সংসার ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। চিত হলেই বুকের দুপাশে পা ঝুলিয়ে গেড়ে বসে দুশ্চিন্তা! রাতের এখন তিন পর্ব। প্রথম পর্বে সমভূমিতে পাশাপাশি শুয়ে শ্বশুর মশাইয়ের দেওয়া জ্যান্ত উপহারের সঙ্গে এটা ওটা সেটা নিয়ে ঠুসঠাস, ফোঁসফোঁস। অন্তে পৃষ্ঠে পৃষ্ঠদেশ ঠেকিয়ে দেওয়ালমুখো হয়ে ক্ষতস্থান লেহন। তদন্তে উশখুশ, উশখুশ করে সন্ধিস্থাপন। চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর। উই আর অন দি সেম বোট ফাদার, উই আর অন দি সেম খাট মাদার বলে ভাবাশ্রু বিসর্জন। দেখতে দেখতে পার্শ্ববর্তিনীর নাসিকা গর্জন। তখন কারবালার সেই শূন্য প্রান্তরে রাত-জাগা ঘুঘু হয়ে বিচরণ। মহাশূন্য হেঁকে বলে, মনে করো, মনে করো, শেষেরঅ সেদিনঅ কী ভয়ঙ্করঅ। অত:পর আয় ঘুম, ঘুম আয়। সাধ্য-সাধনা। ঘুম এল দু:স্বপ্নের ভেজাল নিয়ে। শেষ পর্বে পরাজিত কুস্তিগির বেহুঁশ!
আর তখনই নড়ে উঠবে কড়া। এলেন। তিনি এলেন। ভি আই পি নাম্বার ওয়ান।
মাথার ওপর ধামা খোঁপা। পুরু ঠোঁটে বিগত রাত্রির তাম্বুল রাগ। কণ্ঠে সাত সাগরের গরল। চোখ ঘুরে কুঁচ ভাঁটা যিনি ইন্দিবর নাটা। পিলে কাঁপিয়ে কড়া নাড়বে তিনবার। তারপর দৈববাণী, আমি তাহলে চললুম। শুয়ে শুয়ে মিঞাও শুনছেন, বিবিও শুনছেন। দুজনেই পড়ে আছেন মটকা মেরে। যার গরজ বেশি তিনিই তড়াক করে লাফিয়ে উঠবেন। আমি তা হলে চললুম শুনে মিঞাই ঠেলে ওঠেন, না, যেও না, রজনী এখনও বাকি, আমি রাত-জাগা পাখি। একবার লাইন কেটে গেলে তুমি সাত বাড়ি সেরে আসতে আসতে, এ সংসারে আগুন জ্বলে যাবে। আমি গেলে সংসার অচল হবে না। ইনসিওরেনস, প্রভিডেন্ড ফান্ড, ফিক্সড ডিপোজিট, ফ্যামিলি পেনসানে ভালোই চলবে। তুমি গেলে দিনমণি, এ পরান যাবে। খাবার ঘরে জগাই মাধাইয়ের সংসার গড়াগড়ি যাচ্ছে। বাসনের পাঁজা। গেলাস লাট খাচ্ছে। বেসিনে কাপ-ডিস গণকবরের মৃতদেহের মতো ঘাড়ে ঘাড়ে চেপে আছে। ভুক্তাবশেষ নিয়ে ধেড়েরা সারারাত দাবা খেলেছে। দুধের বাটিতে জল ঢেলেছিল, তার ওপর ওষুধের ফেলে দেওয়া ফয়েল ভাসছে। হেলে হেলে দুলে দুলে। ভিটামিন, অম্লনাশক, মাথাধরা, অনিদ্রা। বাবুদের হেঁশেল নয় তো আস্তাকুড়। এ জিনিস ওই প্রাত:স্মরণীয়ার ভরসাতেই সৃষ্টি করা যায়। সকালে সাফ করার নাম শুনলেই স্বেদ, কম্প, পুলক জাগে। বিষাদযোগ তৈরি হয়। হাত ঠেকাতেই ঘেন্না হয়, মেগে:! কলকাতায় ট্রাফিকজটের মতো। ভয়ে পুলিশ ভাগে। সৃষ্টির সামনে পা ছড়িয়ে বসে স্রষ্টারা হাপুস নয়নে কাঁদে। ওগো! কী হবে গো, তারার মা আসছে না। তারার মা না এলেই চোখে অন্ধকার। কনডিশান রিফ্লেক্স বলে একটা ব্যাপার আছে, যেমন খাবার দেখলেই নোলায় জল আসা। হাত তুললেই চমকে ওঠা। ভোরে কড়া নাড়বে ভেবে জেগে উঠে চোখ পিটপিট করা। এই এল এই এল করে রাত ফরসা হয়ে গেল। সামনের বাড়ির পুবের পাঁচিলে হলুদ রং ধরল। তারস্বরে কাক ডেকে উঠল। রাতে যেসব কল বন্ধ করা হয় তার মুখ দিয়ে দামাল ছেলের মতো জল নামল লাফিয়ে লাফিয়ে। তবু মনে হতে লাগল বাড়ি সার্জিক্যাল থিয়েটারের মতো শান্ত। তারার মা ঠুকে ঠুকে বাসনে টোল ধরাচ্ছে না। কড়কড়ে ছাই ঘষে ঘষে দুধের ডেকচির বারোটা বাজাচ্ছে না। স্টিলের গেলাসে ফুটবলের শট হাঁকড়াচ্ছে না। বাবুদের পিণ্ডি চটকাচ্ছে না। বেলা দেখে মনে হচ্ছে আজ লাইন কেটে গেছে। আসতেও পারে নাও পারে!
বিপদ দেখলে খরগোশ কী করে? মাথাটা গর্তের ভেতরে ঢুকিয়ে পেছনের দিকটা উঁচু করে রাখে। ভাবে খুব লুকোনো হল। শত্রু পেছন দিকে থেকে এসে পশ্চাদ্দেশটি ধরে গর্ত থেকে টেনে বের করে আনে। বালিশে মুখ গুঁজে পেছনে উলটে শুয়েছিলুম। প্রথম চোট কেটে যাক, তারপর সংসারের চাতালে নেমে তাল ঠুকব। সে আর হল না। পেছনে একটি মোলায়েম খোঁচা।
'দরজা খুলে দাওনি?'
'কাকে খুলব?'
'কেন রোজ যাকে খোলো!'
'তিনি না হলেও খুলে বসে থাকব! এসো হে, এসো হে, প্রাণসখা!'
'ঠিকই এসেছিল, তুমি মটকা মেরে পড়েছিলে, বদমাইশি করে। তোমাকে আমি চিনি না! হাড়ে হাড়ে চিনি। বাঁশ দেওয়ার সুযোগ পেলে তোমাকে আর পায় কে!'
'বাজে কথা বোলো না। রোজ কে দরজা খোলে? মটকা মেরে যদি কেউ পড়ে থাকে, সে হলে তুমি! দরজা খুলে দিয়ে যেই বিছানায় ঢুকি, অমনি তুমি কুঁই কুঁই করে হেসে বলো, আবার নতুন করে শুচ্ছ কেন, এখুনি তো বাজার যেতে হবে। কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে।'
'যার যা ডিউটি।'
'আমি মারা গেলে? তখনও কি ভূত হয়ে এসে তোমার তারার মাকে দরজা খুলে দিতে হবে?'
'সাতসকালে একদম বাজে কথা বলবে না। ভোরে ঘুম থেকে উঠলে তোমারই ভালো। স্বাস্থ্য ভালো থাকবে, মন মেজাজ খুশি খুশি হবে। তাড়াহুড়ো হবে না, আয়েস করে অফিস যেতে পারবে।'
'থাক। আমার ভালো আর তোমাকে দেখতে হবে না। যে ভালো করেছ কালী, আর ভালোতে কাজ নাই। এখন ভালোয় ভালোয় বিদায় দে মা, আলোয় আলোয় চলে যাই।'
'আহা! মামার বাড়ি! আলোয় আলোয় আমাদের হাতে হারিকেন ধরিয়ে চলে যাই! ভাবিতে উচিত ছিল প্রতিজ্ঞা যখন! নাও উঠে পড়ো।'
'উঠে কী করতে হবে! বাসন মাজতে হবে! ঘর ধুতে হবে?'
'আজ্ঞে না। জীবনে তো কুটোটি নেড়ে উপকার করোনি। রেখাদির মতো বরাত করে কি আর জন্মেছি যে সাতসকালে স্বামী এসে চায়ের কাপ সামনে ধরবে। বউকে সাজিয়ে রাখবে শোকেসে। আমার হামানদিস্তের বরাত। সারা জীবন থেতো হওয়ার জন্যেই জন্মেছি। এখন দয়া করে উঠে পায়ে চটিটা গলিয়ে ওই সামনের বাড়িতে গিয়ে একবার খবর নিয়ে এসো, মুখপোড়া ওখানে আগে গিয়ে মরেছে কি না!'
যথা আজ্ঞা। মাঠ পেরোলেই বলাইদের বাড়ি। যতই করি না কেন রেখাদির স্বামী হতে হচ্ছে না। একবার শুকসারি দম্পতিকে যদি চর্মচক্ষে দেখতে পেতুম, স্পষ্ট জিগ্যেস করতুম, আপনারা মশাই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়ে আমার বারোটা এভাবে বাজাচ্ছেন কেন?
বলাইদের বাড়ির সদর হাট খোলা। ভেতর উঠোন স্পষ্ট চোখে পড়ছে। পা তুলে সাইকেল দাঁড়িয়ে আছে। বলাইয়ের মা গামছা পরে তারে থান মেলছেন। দৃশ্যটা বড় অপূর্ব। উঁকিঝুঁকি মারাটা ঠিক হচ্ছে কি? হচ্ছে না। প্রাণের দায়ে এই প্রাত:দর্শন। পাশের জানালা এক চিলতে ফাঁক করে আমার এই অপরাধের ওপর যে কেউ চোখে রাখতে পারেন, ধারণাই ছিল না। 'পিপিং টম' হওয়ারও একটা আর্ট আছে। জানালা ফুঁড়ে কাংস্যকণ্ঠ বেরোল, 'কী চাই?'
বাপস, বলাইয়ের সেই বিখ্যাত বউ। চেহারা দেখলে মনে হয় সার্কাসে ট্রাপিজের খেলা দেখাত। ঢোঁক গিলে বলুলম, 'আপনাদের বাড়িতে তারার মা কাজে এসেছে?'
'কেন, ফুসলে নিয়ে যাবেন?'
আরে রাম কহো ভাই। ওই পাথর প্রতিমাকে ফুসলে নিয়ে গিয়ে রাখব কোথায়? মুখে বললুম, 'আজ্ঞে না, আমাদের বাড়িতে আসেনি তো! ভাবলুম এখানে যদি এসে থাকে!'
'আসেনি। আমি তো ওকে আপনাদের বাড়িতেই পাঠালুম উঁকি মেরে চুপি চুপি দেখে আসার জন্যে। আপনাদের আদরেই তো বাঁদর হয়ে বসে আছে। কী মুখ হয়েছে আজকাল।'
আমাদের বাড়ির দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল স্যান্ডো গেঞ্জি পরা বোকা বোকা চেহারার এক দৈত্য মিটার ঘরের পাশে ঘাপটি মেরে লম্পট জমিদার পুত্রের মতো উঁকিঝুঁকি মারছে। আরে ওই তো বলাই! চোখাচোখি হয়ে গেল। বলাই ফিরে এসে বলল—
'আসেনি দাদা?'
'না রে ভাই। কি বিপদেই যে পড়া গেছে!'
বলাই জানালার দিকে তাকিয়ে বললে, 'শুনলে, আসেনি। আমার কথা তোমার বিশ্বাসই হয় না।'
জানালা বললে, 'এলে আমি ওর বাপের নাম ভুলিয়ে দিতুম।'
'তোমরা লোকের সঙ্গে বড়ো খারাপ ব্যবহার করো, তাই কেউ টেঁকে না।'
ওই তো যিনি ভালো ব্যবহারের বড়াই করেন তাঁরও তো একই অবস্থা। মেয়ের বিয়েতে চুড়ি দিয়েছিলেন। মান রেখেছে!'
'আমি তারার মেয়ের বিয়েতে চুড়ি দিয়েছিলুম? কে বললে আপনাকে? আপনি পায় না খেতে শঙ্করাকে ডাকে।'
'তারার মা বলেছে। আমাদের বললে, আপনি চুড়ি দিচ্ছেন, জামাইয়ের আংটিটা আমাদের দিতে হবে।' আমি ধারধোর করে একশো টাকা দিয়েছিলুম।'
মহিলা গলা দিয়ে যে শব্দ বের করলেন, তাকে বলে আর্তনাদ। 'কী সর্বনেশে মেয়েমানুষ গো! ওই বলে ওই বোকা লোকটার কাছ থেকে পাঁচ আনা সোনার একটা আংটি ভোগা দিয়ে নিয়ে গেল! কী পাল্লায় পড়েছি! আমার কী হবে গো!'
বলাই বললে, 'সাতসকালে আর চেঁচিয়ো না তো! খুব হয়েছে।'
'না চেঁচাবে না! তোমার মতো বোকা আর পৃথিবীতে দুটো আছে! মেয়েছেলে দেখলেই বাবুর ন্যাজ একেবারে পটাস পটাস নড়ে উঠল। এমনি হাত দিয়ে পয়সা গলে না। আমার ভাইয়ের বিয়েতে একটা শাড়ি ঠেকিয়ে সরে পড়ল।'
'কাজের লোককে একটু তোয়াজে রাখতে হয় গবেট। তোমার ভাই এসে বাসন মাজবে?'
উপরে দমাস করে জানালার পাল্লা বন্ধ হয়ে গেল। বলাই বললে, 'আচ্ছা জ্বালায় পড়া গেছে তো মশাই?'
গোলমাল শুনে পাশের বাড়ির প্রবীণ ভদ্রলোক বেরিয়ে এসেছেন, 'কী হল কী আপানাদের? সাতসকালেই মড়াকান্না। বলাই বউমাকে ধরে পেটালে না কি?'
'পেটাব কেন? ঝি আসেনি।'
'তাইতেই মাথায় বাজ ভেঙে পড়ল! একদিন নিজেরাই না হয় করে নিলে?'
বাড়ি ফিরতেই গরম হাওয়র স্পর্শ। 'কী করছিলে কী এতক্ষণ?'
'কী আর করব? ওদের বাড়িতেও আসেনি।'
'মরে গেছে। কাল চিংড়ি মাছ খেয়েছিল, তোয়াজ করে খাইয়েছিলুম, কলেরা হয়ে মরেছে! ওই তো আমতলার বস্তি, যাও না একবার খবর নিয়ে এসো।'
'ওখানে আমি যেতে পারব না, তোমার সব ছাঁটাই করা দশাসই মেয়েছেলেরা আমাকে চাঁদা করে ঠেঙাবে।'
'তুমি কিছুই পারবে না। আমিই যাই। আমার তো আর বসে থাকার বরাত নয়। সৃষ্টি পড়ে আছে। আসবে কি আসবে না।'
'অত হাঙ্গামা না করে, এসো না, দু'হাতে ঝটাপট সেরেনি।'
'কালকে ঘি-ভাত খাওয়া হয়েছিল, সব বাসনে তেল বেড়বেড় করছে। গেলাসে পার্সে মাছের আঁশটে গন্ধ। ও তোমার আর আমার কম্ম নয়।'
'একটু চা হলে হত না!'
'একদিন নিজের গতর নাড়িয়ে চা-টা করো না। যেখানে থাক, আমি ওর ঘাড়টা ধরে টেনে আনি।'
গেল তো গেলই। ফেরার আর নাম নেই। না পারছি বাজার যেতে, না পারছি দুধ আনতে। সব স্ট্যান্ড স্টিল। অবশেষে তিনি ফিরলেন।
'কী রিপোর্ট।'
মোড়ায় ধপাস করে বসে পড়ে বললে, 'আগে এক গেলাস জল।'
জল কোথায় ঢালবে? মাথায় না গলায়! জল খাওয়া হল। আ:।'
'বলো, কী রিপোর্ট!'
'তিনি কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন। জ্বর হয়েছে, সুখের জ্বর। কপালে হাত দিয়ে দেখতে গেলুম। বড় বড় নখ নিয়ে এমন খামচে দিলে। দেখি একটু ওষুধ দাও তো। জলাতঙ্ক না হয়। এ টি এস নিতে হবে।'
'না না, এ টি এস নিতে হবে কেন! তুমিও যেমন।' প্রাণীজগতে দুজন মহিলার মুখোমুখি দেখা হলেই একটু আঁচড়া-আঁচড়ি কামড়া-কামড়ি হবেই। দুটো বেড়াল। ফেস টু ফেস, ঠুসঠাস, ফোঁসফোঁস।
ওষুধ লাগাতে লাগাতে বললে, 'দিয়েছি আজ বারেটা বাজিয়ে।'
'কীভাবে বাজালে?'
'এত বড় পাজি মেয়েমানুষ, ছোট মেয়েটাকে কাজে বের করে দিয়েছে! আমাকে বললে, না তো, পাঠাইনি তো! কালী বাড়ির পাশে গুঁইদের ওখানে গিয়ে দেখি রক ধুচ্ছে। ফের ফিরে গেলুম। কী গো, তুমি যে বললে মেয়েকে কোথাও পাঠাওনি! এই তো দেখে এলুম কাজ করছে। তখন বলে কি না ওটা আমার বেশি টাকার বাড়ি। আমি বলে এসেছি তুমি আর তোমার মেয়ে যদি এমুখো হও, ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দোব। তুমি এখুনি একটা লোক দ্যাখো।'
'সাধনা করলে ঈশ্বর পাওয়া যায়, কাজের লোক পাওয়া অত সহজ নয়। এ তুমি কী করলে? ওদের ইউনিয়ন আছে। কেউ আর এ বাড়িতে আসতে চাইবে না।'
'ঝাঁটা মারি ইউনিয়নের মুখে। তুমি অন্য জায়গা থেকে লোক আনাও। থাকা, খাওয়া, পরা। কাগজে বিজ্ঞাপন দাও। ভাগলপুর, বিলাসপুর, কানপুর, যেখান থেকে পারো। চেষ্টা করলে কী না হয়!'
'তা ঠিক। পিসির গোঁফ গজিয়ে পিসে হয়, মাসি মেসো হয়।'
এদিকে লণ্ডভণ্ড কাণ্ড অবস্থা। মেজাজ সব ফাইভ ফর্টি ভোলট। বাসন কমাবার জন্য সব পাতে পাতে চলেছে। ভাত, ডাল, ঝাল, ঝোল, সুক্তো, চাটনি সব মিলেমিশে একাকার। যা উদরে মিশত, তা পাতেই মিশে মিক্সচার হয়ে গলকম্বল গলে ইঞ্জিনে পড়তে লাগল।
এভাবে তো চলে না। একটা কিছু করতেই হয়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি, মুখে পান ঠুসে, গাল গুলি করে, নেচে নেচে সব কাজে চলেছেন বাড়ি বাড়ি। কয়েকজনকে মনে ধরলেও মার খাবার ভয়ে সাহস করে বলতে পারি না, হ্যাঁগা আমাদের বাড়িতে কাজ করবে? দাদাঠাকুরের মতো গান গেয়ে গেয়ে ঘুরতে হবে নাকি—বাসন মেজে দাও, মেজে দিলে শাড়ি দোব, বাটা ভরা পান দেব, পুজো এলে ধনেখালি দোব, মেয়ে হলে নোলক দোব, জামাই হলে জুতো দোব, মাংস হলে ভাগ দোব, পেটে এলে দুধ দোব!
হাতের কাছে যাকেই পাই দু-চার কথা হওয়ার পর জিগ্যেস করি, জানাশোনা কেউ আছে? দিন না ভাই, একটা লোক জোগাড় করে। ছেলে হোক, মেয়ে হোক। বড়ো আদরে থাকবে। রিকশায় উঠে রিকশাওয়ালাকে বলি। ট্যাক্সিতে উঠে ড্রাইভারকে বলি। ডাক্তারখানায় বসে সহরোগীকে বলি। চোখ দেখাতে গিয়ে অন্ধকার ঘরে ডাক্তারবাবু নাকের কাছে ঝুঁকে পড়ে যখন আলো ফেলছেন তখনও আমি ফিসফিস করে বলে ফেলি, কাজের লোক আছে? পরিচিতের বাড়ি গিয়ে সব ছেড়ে প্রশংসা করে উঠি, আহা মেয়েটি বেশ। কোত্থেকে পেলেন! গৃহস্বামীর ভুরু কুঁচকে ওঠে। ভাবেন চরিত্রে ছিড় ধরেছে।
একটা সময় এল, যখন কারুর সঙ্গে দেখা হলেই আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত তুলে বলেন, কাজের লোক ছাড়া অন্য কিছু বলার থাকে বলুন। অনেকে আবার দেখামাত্রই দৌড়তে শুরু করলেন, ওই রে আসছে রে। এদিকে গৃহের গঞ্জনা দিনে দিনেই বাড়ছে। পরিস্থিতি চরমে উঠল, যেদিন পাশের বাড়ির ব্যোমকেশবাবু সোনারপুর থেকে একটি ডাগর-ডগুর ফুলটাইমার নিয়ে বাড়ি ঢুকলেন। সে কী উল্লাস। উলুধ্বনি, সহর্ষ আর্তনাদ। পেছনে পেছনে প্রবেশ করল ফুলশয্যার তত্বের মতো নতুন বিছানা, মশারি, বালিশ, জারুল কাঠের খাট। রেকর্ড প্লেয়ার বেজে উঠল, আও না পেয়ার করো, লাচ করে, ডিসকো দিওয়ানে, আহা: আহা:। ব্যোমকেশবাবু যেন বুড়ো বয়সে বিয়ে করে বাড়ি ঢুকলেন।
ছাদে দাঁড়িয়ে এইসব দেখতে দেখতে গৃহকর্ত্রীর বিদ্যুৎ-পরিবাহী নালিকায় হাই ভোলটেজের সঞ্চার হল। তিনি বজ্রের মতো, অগ্নির মতো, কামানের গোলার মতো ফেটে পড়লেন। 'অপদার্থ, ওই দ্যাখো, করিতকর্মা, পুরুষ কাকে বলে। চোখে চালসে, রক্তে শর্করা, তবু তিনি যা করলেন!' কী করলেন? যেন বিলেত থেকে আই. সি. এস. হয়ে এলেন।
জগৎ-সংসার সম্পর্কে যাঁদের অসম্ভব জ্ঞান, যাঁরা এ হাটে কিনে ও হাটে বেচেন, তাঁদেরই একজন বললেন, ওভাবে হবে না বন্ধু। লোক ভাঙাতে হবে, এজেন্ট ফিট কর। ওই পুষ্পিতালতাকে রোজ লোভ দেখাতে হবে। আরও নরম মোটা গদি, নেটের মশারি, ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, সন্ধেবেলায় টিভি, রবিবার সিনেমা। আরও, আরও দোব।
'সে তো ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি!'
'সেই যুগই তো পড়েছে ভাই। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। মলের চেয়ে চুটকি ভারী। বেকারে দেশ ছেয়ে গেলেও কাজের লোক তুমি সহজে পাবে না। সবচেয়ে সহজ হল আর একটি বিবাহ করা। পাত্রী তুমি সহজেই পাবে। বিনাপণে করতে চাইলে, পুলিশ ডেকে তোমাকে ফিলমস্টারের মতো সামলাতে হবে। বড়র জন্যে মেজ আন, মেজর জন্য সেজ। বামুনের গরু ভাই। খাবে কম দুধ দেবে বেশি।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন