সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

জামাইষষ্ঠীর জামাইয়ের যে যাই বলুন, কেমন যেন বোকাসোকা চেহারা হয়। কেন হয় বলা শক্ত। দেখলেই চেনা যায়। মহাশয় শ্বশুরালয়ে চলেছেন? মুখে তেমন হাসি নেই। চোখের দৃষ্টি ফ্যালফেলে, উদাস। স্ত্রী চলেছেন আগে আগে।
সেজেগুজে। প্রখর রোদে মেকআপ গলে গলে পড়ছে। যেহেতু তিনি বাপের বাড়ি চলেছেন, সেই হেতু চলনে বেশ একটা বাড়তি আবেগ। অনেকটা 'চলরে নওজোয়ান'-এর ভঙ্গি। যিনি মা হয়েছেন, তিনি শাবকটিকে তুলে দিয়েছেন স্বামীর কোলে তোয়ালে জড়িয়ে। নিজের হাতে রেখেছেন প্লাস্টিকের বালতি ব্যাগ। তার মধ্যে পাট-পাট তোয়ালে। একটি বাড়তি শাড়ি। মাঝারি মাপের সন্দেশের বাক্স। উঁকি মারছে ফিডিং বোতল। একটি রবার ক্লথের রোলও সময় সময় দেখা যেতে পারে।
ষষ্ঠী আর আগের মতো জমে না। জীবন বড় এলোমেলো হয়ে গেছে। মানুষও আজকাল আত্মসচেতন। অনেক জামাই শ্বশুরালয়ের ত্রিসীমানা এড়িয়ে চলতে পারলে বেঁচে যান। শ্বশুরবাড়িতে পার্সোন্যালিটি ধাক্কা খায়। সমীহ করে চলার যুগ চলে গেছে। অথচ স্ত্রীর পিত্রালয়ের গুরুজনদের সামনে ভিজে বেড়ালটি হয়ে থাকতে হয়। নিজের পিতাকে 'বাবা' বলে পায়ে হাত দিয়ে প্রণামের অভ্যাস খসে গেলেও, স্ত্রীর পিতাকে পিতৃসম্বোধনে যথোচিত সম্মান দেখাতেই হবে। কারণ নিজের টিকিটি স্ত্রীর হাতে গচ্ছিত। পান থেকে চুন খসলেই বয়কট করে দেবেন। এ যুগে আবার বেয়াইয়ে বেয়াইয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঠান্ডা লড়াই চলে। হয় দেনাপাওনা নিয়ে, নয় পুত্রবধূর ঔদ্ধত্যের অভিযোগে। দুই পরিবার জল ঘোলা করে দম্পতিকে অশান্তির আবর্তে চুবিয়ে রাখেন। সম্পর্কের খেলা চলে শ্বশুর-জামাইয়ে। ছেলের পিতামাতার সেই এক অভিযোগ, পরের বাড়ির মেয়ে এসে ছেলেটাকে গ্রাস করে নিল। শ্বশুরবাড়ির কথায় ওঠে আর বসে। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি তেমন সুখের নয়। তবু ষষ্ঠী আসে। স্ত্রী স্বামী-ট্যাঁকে নেচে নেচে ষষ্ঠীর টানে পিত্রালয়ে ছোটেন। সেখানে তাঁর অন্যরূপ। যেন বাঁধা গরু ছাড়া পেয়েছে। স্বামীর সংসারে যে মুখ তোলা হাঁড়ি, পিতার সংসারে সে মুখে হাসি আর কলকাকলির ঝরনাধারার তফাতটা চোখে পড়ে। মন ধাক্কা খায়। আগের কালে বিবাহ ছিল জম্পেশ ওয়েলডিং। জোড়ের দাগ ধরা যেত না। এখন গ্রাইন্ডার চালিয়েও জোড় মেলানো যায় না। বেকায়দায় হাত পড়লে খোঁচা খেতে হয়। দু:খের হলেও কথাটা সত্যি : আজকাল অধিকাংশ ছেলেই স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ থেকে আগলে রাখতে চান মগজ ধোলাইয়ের ভয়ে। কে কখন কী ফুসমন্তর ঝেড়ে দেবে, পারিবারিক শান্তি চোট খাবে। বেসুরে বাতাস বইবে।
সুখের ষষ্ঠী, হুল্লোড়ের ষষ্ঠী শহর জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে। এখন যেন মনে হয়, স্বামী বেচারার গলায় দড়ি বেঁধে স্ত্রী চলেছেন টানতে টানতে। আমার মাতামহের কাছে সে যুগের ষষ্ঠীর গল্প শুনেছি। এখন মেলাতে গেলে আর মেলে না। মাতামহের জীবনের ঘটনা। একবার ষষ্ঠীতে প্রচণ্ড ঝড়জল। কলকাতা ভেসে যাচ্ছে। মাতামহ ফিনফিনে পাঞ্জাবি পরে, পঞ্চান্ন ইঞ্চি ধুতির কোঁচা ঝুলিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলে পমেটম লাগিয়ে বুরুশ মারছেন। মাতামহের পিতৃদেব জিগ্যেস করলেন, এই বৃষ্টিতে যাবে কী করে উত্তরপাড়ায়।' মাতামহ বললেন, 'সাঁতরে।' পিতৃদেব স্ত্রীকে বললেন, 'ব্যাটা আমার বিল্বমঙ্গল'। মাতামহের চোখের সামনে তখন ভাসছে, শহর নয়, বড় বড় তপসে মাছ, মসৃণত্বক ল্যাংড়া আম, শুড়ওয়ালা গলদা চিংড়ি। ভোজনবিলাসী ছিলেন। মনে এক মুখে এক ছিল না। লজ্জা-টজ্জার তেমন বালাই ছিল না।
জীবনের অস্বাভাবিক চাপে এখন সপরিবারে কোথাও যেতে হলে দুর্ভাবনায় মুখ শুকিয়ে যায়। যানবাহনের শোচনীয় অবস্থা। পয়সা ফেললেও ট্যাক্সি মিলবে না। গুঁতোগুঁতি করে অফিসে যাওয়া যায়, শ্বশুরবাড়ি তো আর কোর্ট-কাছারি নয়। স্টপেজে স্টপেজে, প্ল্যাটফর্মে প্ল্যাটফর্মে তীর্থের কাকের মতো জোড়া জোড়া স্বামী-স্ত্রী ধৈর্যের পরীক্ষা দিচ্ছেন। কোন সুদূর শ্বশুরবাড়িতে অন্ন ঘৃত-পক্ক হচ্ছে। তপসে বাঙালির জীবন থেকে অদৃশ্য। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় স্মৃতি সন্ধান করতে হয়। চিংড়ি সহসা চোখে পড়ে না। শাঁখা সিঁদুরের প্রতীক মৎস্য দুমূর্ল্য। কার্বাইডের পাকা আম জ্যৈষ্ঠের গরমে আর সে রস ছাড়ে না, যার আকর্ষণে জামাই আসার আগেই ডুমোডুমো নীল মাছি উড়ে আসত।
কারুর কারুর জীবনে ষষ্ঠী বড় করুণ অভিজ্ঞতা। আমার এক বন্ধুর পঞ্চ শ্যালক। শ্বশুর মহাশয় গত হয়েছেন। শ্যালকরা সকলেই বিবাহিত। শশ্রুমাতা ফ্যামিলি পেনশানে কায়ক্লেশে জীবিত। জামাই বেচারা এখন ভাগের মা। শ্যালকরা স্বার্থপর। তাঁরা বলেন, জামাই হল মায়ের, ষষ্ঠীর আপ্যায়ন করতে হলে তিনিই করুন। আমাদের দায় পড়েছে! বৃদ্ধা তাঁর পেনশানের পয়সায় ষষ্ঠীর আয়োজন করেন। সে বড় করুণ দৃশ্য। শ্যালকরা বউ বগলে সাত-সকালেই বাড়ি খালি করে সরে পড়েন। সেই শূন্য বাড়িতে জামাই বেচারা রাতের বেলায় খানকতক ফুলকো লুচি নিয়ে বিরসবদনে বসেন। পরিবেশন আর রন্ধনের দায়িত্ব স্ত্রীকেই নিতে হয়। বৃদ্ধা সারাক্ষণ আঁচলে অশ্রুমোচন করেন। ছেলেদের কীর্তিকাহিনি বর্ণনা করেন। দেওয়ালে প্রলম্বিত শ্বশুর মহাশয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে বলেন, 'আহা, আজ ওই মানুষটা বেঁচে থাকলে কী আনন্দের দিনই না হত। তিনি খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসতেন।' এদিকে লুচি জুড়িয়ে আসে। এক-একটি পদ আসতে থাকে, আর আমার বন্ধু মনে মনে হিসেব করতে থাকেন, বৃদ্ধার সামান্য পেনশানের কত টাকা ধ্বংস হয়। বাজারটাই বা কে করেছে! এর নাম চোখের জলের জামাইষষ্ঠী।
ষষ্ঠী রজনি অনেক জামাইয়ের ক্ষেত্রে আবার উপদেশ রজনি হয়ে দাঁড়ায়। সে আর এক জ্বালা। লাল লুঙ্গি আর কাঁধকাটা গেঞ্জি পরে বড় শ্যালক ডিভানে আড় কাত। পাশে নস্যির ডিবে আর নস্যির রঙে ছোপানো একটি রুমাল। নস্যিতে ফোঁ টান মেরে বললেন, 'তা, তোমার সেই ব্যাংকিং পরীক্ষার কী হল? ওটা এবার চাড় করে দিয়ে দাও। অফিসারস গ্রেডে উঠতে হবে তো! সামনে চায়ের কাপ ধরে দিতে দিতে স্ত্রীর মাতাঠাকুরানী বললেন, 'শুনেছি তোমার খুব খরচের হাত। বেশ মোটা টাকার একটা ইনশিওরেনস করে ফ্যালো। মেয়ের বিয়ে দিতে হবে তো! এখন আর না জমালে হবে কী করে? শ্বশুরমশাই সিগারেট পাকাতে পাকাতে বললেন, তোমাদের কালে লাখের কমে মেয়ে পার হবে না বাবাজি।'
বড় শ্যালক খেই ধরলেন, 'একটা নিজস্ব বাড়ির চেষ্টা করো এখন থেকে। লটারিতে অন্তত একটা সরকারি ফ্ল্যাটই না হয় দ্যাখো।'
শাশুড়ি বললেন, 'মেয়েটাকে একটা ভালো স্কুলে এখন থেকেই দেওয়ার চেষ্টা করো।'
শ্বশুর মশাই বললেন, 'মানু (মেয়ের নাম) কে একজন স্পেশ্যালিস্ট দেখাও।
আফটার ইস্যু কেমন যেন অ্যানিমিক হয়ে যাচ্ছে। জানবে, স্টিচ ইন টাইম সেভস নাইন।'
অনেক শ্বশুরমশাই আবার নিজেকে একটু জাহির করতে ভালোবাসেন। 'চিংড়িটা খেয়ে দ্যাখো। একেবারে এক নম্বর মাল। গোটা আষ্টেক ছিল। চল্লিশের কমে নামল না। আমার আবার একটু উঁচু নজর।'
আমে হাত দিতে গিয়ে হাত টেনে নিতে হল। 'সেরা ল্যাংড়া। গাছপাকা, দাম একটু বেশি নিলে। তা নিক। খাওয়াতে হলে সেরা জিনিসই খাওয়াতে হয়।'
সন্দেশটি মুখে পোরা মাত্রই বললে, 'স্রেফ জিভে আর তালুতে পাগলে পাগলে খাও। তারকের নরম পাক। ঘরে কাটানো ছানা। এ জিনিস অর্ডিনারি দোকানে পাবে না।'
এইবার সেই দিন আসছে। নিজের ষষ্ঠী নিজেকেই না করতে হয়। অনেক শশ্রুমাতা আবার চাকুরে। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে প্রেশার কুকারে জামাই বাবাজীর ফলার পাকাতে বসবেন ক্লান্ত শরীরে। রাত সাড়ে দশ। তখনও প্রেশার কুকার সিটি মারে না। শোনা গেল তাঁর রাগত কণ্ঠস্বর, মুখপোড়াকে আজ আবার কী রোগে ধরল!
এর চেয়ে চিনে রেঁস্তোরাই ভালো। স্ত্রীর তো ষষ্ঠীর উপবাস। নিজেকেই নিজে খাওয়াও। চাউমিনের জট ছাড়াতে ছাড়াতে ভাবো, সামনে বসে আছেন শাশুড়িমাতা, হাতে তালপাখা নিয়ে। তা ছাড়া, কাউন্টারে যিনি বসেছেন, আনেকটা 'তাঁর' মতোই দেখতে। একটু স্থূলকায়া।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন