সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

যদি কোনওদিন মুখ্যমন্ত্রী হই তাহলে প্রথমেই আমাকে যা করতে হবে, তা হল শপথ গ্রহণ। রাজ্যপালের পাশে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার ইংরেজিতে কাটা কাটা উচ্চারণে শপথ বাক্য পাঠ করব। এখন যেমন সবেতেই দাঁত বের করে হাসি, সেই হাসিটাকে একেবারে কন্ট্রোল করব। পশ্চিমবাংলার অদ্বিতীয়, সফল, দীর্ঘস্থায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে আমি এই ব্যাপারে অবশ্যই অনুসরণ করব। হাসলে পার্সোনালিটি লিক করে যায়।
এর আগে গোটা একটা দিন আমাকে ধুতি পরা প্র্যাকটিস করতে হবে। কাছা কোঁচার ব্যালেন্স, কোমরে কষি বাঁধা। কায়দা করে কোঁচা ধরা। কোঁচা আর কাছা অনেকটা জনসমর্থনের মতো। কষে বাঁধতে না পারলে ফস করে খুলে পড়ে যায়। তখন পথের মাঝে দাঁড়িয়ে বলতে হয়—যা: বাবা, খুলে গেল।
আমি জানি, পশ্চিমবাংলার মানুষ প্যান্ট পরা ন্যালাখাপা মুখ্যমন্ত্রী পছন্দ করেন না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী, পরতে পারেন। মানুষ অ্যাকসেপ্ট করবে। মুখ্যমন্ত্রীর স্বতন্ত্র একটা ফাঁট থাকা চাই। শপথ নেওয়ার পর রাজভবন থেকে সোজা রাইটার্সে। খেয়াল রাখব আমার সামনে পিছনে চব্বিশখানা গাড়ির কনভয় ঠিক আছে কি না! সাইরেন তারস্বরে ওঁয়া-ওঁয়া করছে কি না! একালের মুখ্যমন্ত্রী আর অ্যাম্বুলেন্সে মুহূর্ষু রোগী একই কায়দায় চলাফেরা করেন। বোঝার উপায় নেই কে যাচ্ছে!
দপ্তর বন্টনের সময় খেয়াল অবশ্যই রাখব, যাতে 'ইয়েস ম্যান' ছাড়া কেউ না ক্যাবিনেটে ঢুকতে পারে। যেমন পূর্বতন প্রতাপশালী এক মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, আমার মন্ত্রীরা সব কচ্ছপ। সকালবেলা অ্যাসেমব্লিতে আসা মাত্র চিৎ করে দি, আর বিকেলবেলা বাড়ি যাওয়ার সময় উপুড় করে দি। এ-দপ্তরে ও-দপ্তরে ফ্যাঁস ফোঁস বেমক্কা মাথা তুললে মুখ্যমন্ত্রীদের খুব অসুবিধে হয়। সেই যে কথায় আছে, দুষ্ট গরুর চেয়ে শূন্য গোয়াল ভালো।
আগে থেকেই খোলাখুলি কথা বলে নেব, দ্যাখো বাপু, এই তোমার দেশ, এই এত তার জনসংখ্যা, শিল্প আর শিল্পপতিদের এই সংখ্যা। রোজগারের টাকার পরিমাণ এই, কেন্দ্রের সাহায্যের পরিমাণ এই, আমরা কেউই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে আসিনি, ভেরেণ্ডাও ভাজতে আসিনি। পাবলিক লাইফের তেমন দায়িত্ব নেই। আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে। ধরে নাও পাঁচ বছর মেয়াদ। নির্বাচন যন্ত্রকে কষে বাঁধতে পারলে হয়তো আর পাঁচ বছর। কিন্তু ভাই, আগেকার নির্বাচন কমিশনার শেষনের মতো কোনও মানুষ যদি বাড়া ভাতে ছাই দিতে থাকেন, তাহলে মেয়াদ কবে কোনদিন ফুস হয়ে যায় বলা মুশকিল। অতএব এসো মিলেমিশে সবাই মিলে ব্যুফে সিস্টেম খাই। আমার ভাগটা একটু বেশি হবে ভাই, ভেরি ন্যাচারাল, কারণ আমি মুখ্য। তবে একটা কথা মনে রেখো, গণেশের পুজো দিয়ো কিঞ্চিৎ না কোরো বঞ্চিত।
সহ্যশক্তি অবশ্যই বাড়াতে হবে। দেহকষ্ট নয় মনকষ্ট। বহু ধরনের সমালোচনা হবে। রাস্তা কেন কোদালেন, কেন চারপাশে আবর্জনা, কেন এত নারী নির্যাতন, কেন এত খুন, কেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পোলিও-র টিকে নিতে গিয়ে শিশুমৃত্যু, কেন হাসপাতাল শূকরের খোঁয়াড়, কেন জলে আর্সেনিক, কেন কলকারখানা বন্ধ, কেন এত বেকার। কেন উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র ফাঁস হল। পাঁচটা বছর, দশটা বছর, পনেরোটা বছর অনবরতই পাখি সব করবে রব। জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেবে। সেতারিদের সেতার বাজাতে বাজাতে আঙুলে কড়া পড়ে, আমার মনে কড়া পড়াতে হবে। মনবেহালায় গণসঙ্গীত বাজাতে বাজাতেই সেই কড়া পড়বে। কিছুটা ঔদ্ধত্য, কিছুটা উদাসীনতা, জনসমস্যার প্রতি এই হবে আমার অ্যাপ্রাোচ। আমি শ্রীচৈতন্য নই, বুদ্ধও নই, একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আমি। চিল যখন ছোঁ মেরে মাছ নিয়ে আকাশে উড়ে যায়, তখন ঝাঁক ঝাঁক কাক পেছনে কা-কা করে তাড়া করে। তিষ্ঠতে দেয় না। মাছটা ফেলে দিলেই শান্তি। কিন্তু আমি চিলরূপী মুখ্যমন্ত্রী ক্ষমতার মাছ সহজে ছাড়ছি না, কত কা-কা করবি কর।
প্রথমে আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করব। কাটা কাটা, চোখা চোখা কথা বলব। বিশাল একটা বাড়ি হবে, সুরম্য। লিফট, সিকিউরিটি, হট লাইন, ফ্যাকস, টেলি কমিউনিকেসান, বুলেট প্রুফ গাড়ি। আধুনিক মুখ্যমন্ত্রীর এই সব চাই। তিনি খালি পায়ে ঊর্ধ্ববাহু হয়ে হরিনাম সংকীর্তনে বেরোননি—প্রেম দাতা নিতাই বলে, গৌর হরি হরি বোল, গোটা ক্যাবিনেট পেছন পেছন নৃত্য করতে করতে আসছে—ফ্রম স্টেডিয়াম টু রাইটার্স। এ দৃশ্য এই ফ্যাকসের যুগে, টেররিজমের যুগে ভাবা যায়! ঈশ্বরের ভজনা দুভাবে করা যায়, মিত্র ভাবে আর শত্রু ভাবে। মহিষাসুর শত্রুভাবে ভজনা করেছিলেন। গণ ঈশ্বরকে শত্রুভাবে ভজনাই রাজনীতির বিধান। জনসভায় বন্ধুগণ, বলে হেদিয়ে পড়বে; কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে থান ইট পড়তেই পারে। তখন কিন্তু নিত্যানন্দ হলে চলবে না, মেরেছিস কলসির কানা তা বলে কী...প্রেম নয়, ফায়ার, গুলি মেরে শুইয়ে দাও, তারপর তদন্ত কমিশান। ওই এক মহা চৌবাচ্চা, সব অভিযোগ চুবিয়ে রাখো। খলবল করে ওইখানেই খেলুক! সংবাদপত্র একদিন লিখবে, দু'দিন লিখবে, তিন দিনের দিন অন্য ইস্যু। সবসময় মনে রাখতে হবে সময়, সময়ে সবই সেরে যায়, সরে যায়।
সংবাদপত্র আমি পড়ব না। প্রেস কনফারেনসে দুটো কথা বলব—তাই না কী? এমন হয়েছে বুঝি! বা, আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখছি তিন-চার কথায় ফিনিশ! আমাকে মনে রাখতে হবে, কাগজের কাজ হল লেখা, আর আমার কাজ হল, সবরকম পলিউশানে ইমইয়ুন হয়ে থাকা। পাওয়ার হল সেই ইমিউনিটির টিকা। সবসময় আমাকে মনে রাখতে হবে সেই একটি কথা—Democracy is the art of running the circus from the monkey cage.
শাসনের শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হল ফিউডাল সিসটেম। মোগলাই ব্যবস্থাই শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা। সাতশো বছর চালিয়ে গিয়েছিল। দেশটাকে পাড়ায় ভাগ করব অর্থাৎ এলাকায়। এলাকার ইজারা থাকবে দাদাদের হাতে। তারাই হবে জমিদার। এলাকার মানুষের ইজারাদার। দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। সর্বত্র থমথম করবে ভয় আর ত্রাস। তবলা বেসুরে বাজলে যেমন করে ছড় টেনে, হাতুড়ি ঠুকে সুরে আনতে হয়, ঠিক সেই কায়দায়। পুলিশ তো সিসটেমে এসে গেছেই। বলে দেব, লজ্জা, ঘৃণা, ভয়, তিন থাকতে নয়। বেআইনের মধ্যে আইন শব্দটা আছে, আত্মগ্লানির কারণ নেই, আপনাদের ব্রত হবে, শিষ্টের দমন, দুষ্টের পালন।
মেশিনারিটাকে এইভাবে ফিট করে নিজের দিকে নজর ফেরাব। মড়াখেকো চেহারা পাবলিক নেবে না। মাঠভরতি মৃতপ্রায় মানুষ, কৃষক, শ্রমিক বেকার আর মঞ্চে মাইক্রোফোনের সামনে একটি গোলাপ। বন্ধুগণ! সবসময় তাদের সামনে অদৃশ্য সব শত্রুর ছবি আঁকব, প্রধান শত্রু কেন্দ্র, দ্বিতীয় শত্রু বিরোধীদল, তৃতীয় শত্রু মালিকানা, চতুর্থ শত্রু বুদ্ধিজীবীদের দল, পঞ্চম সংবাদপত্র। আসল শত্রু কে, বুঝতেই দেব না। কুরে কুরে খাব। সব সময় মনে রাখতে হবে—অল্প সময়, অনেক বাধা, তার মধ্যেই মাল গুছতে হবে। পরিবার, পরিজন, পেয়ারের আত্মীয়স্বজন, ক্যাবিনেট বান্ধব, বশম্বদ ওপরওয়ালা। বিশাল এক পঙ্গপাল। খেত-খামারের ওপর মুখ থুবড়ে কিছুকাল পড়ে থেকে উড়ে যাবে—শ্মশান। চার্চিলের কথা—Democracy is the worst system devised by the wit of man। জন জন যাতে মাথা তুলে ট্যাঁফোঁ করতে না পারে সেই ব্যবস্থা সুষ্ঠভাবে করতে হবে আমাকে। স্কুল, কলেজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দফারফা, চাকরি থাকবে না, থাকবে কুঁচো ব্যাবসা, ফুকো কারবার। দেশটাকে ডেলি প্যাসেঞ্জার আর ভেণ্ডারে ভরে দেব। দিকে দিকে চোলাই। অন্ধকারে সবাই স্বাপদ।
জনসাধারণ থেকে ক্রমশ ক্রমশ বুলেটপ্রুফ, জেড ক্যাটিগোরি সিকিউিরিটিতে সরে আসাটাই হল চরম সাফল্য। মাংকি কেজে বসে সার্কাস পরিচালনা। আছে দু:খ আছে মৃত্যু, থাকবেও চিরকাল। ভারত কোন দু:খে আমেরিকা হবে!
আমার চারপাশটা আমেরিকা হোক। আমার এলাকাটা। দুটো বা তিনটে 'হ'-এ আছেই হেঞ্চমেন। চার বেহারার পালকি।
শেষ ইচ্ছে—সুইজারল্যান্ডে থাকব, রিমোর্ট কন্ট্রোলে দেশ শাসন করব। আর ভোট! সে তো সাপ্লায়াররা ঠিক সময় ধরে এনে দেবে। ভোট মানে মাথা। ভোট দে দো, মাথা বাঁচা লো। ইংরিজিতে বলব, Democracy means not...I am as good as you are but you are as good as I am. আমাকে গদিতে রাখো—তোমরা যেমন আছ তেমনি থাকবে। ঊনিশ-বিশ হবে না। আমাকে ফেলেছ, কি মরেছ।
তবে আমার এমন দুর্ভাগ্য হবে না। মুখ্যমন্ত্রী হতে যাব কোন দু:খে, আমি কি এতই মূর্খ। ভোটারই থাকব। মজা দেখতে দেখতে মরে যাব। ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলতে বলতে শ্মশানে। দেড় কেজি ছাই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন