সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এ কোনও দলাদলি, রাগারাগির কথা নয়। বলা যেতে পারে সত্যদর্শন। যা দেখা যাচ্ছে, যেমন দেখা যাচ্ছে। সেটা কী? পুরুষরা সব ঘোড়া আর স্ত্রীরা সব জকি। এই ঘোড়ারা বয়েস অনুসারে, যুবক, প্রৌঢ়, বৃদ্ধ, জরদগব ইত্যাদি। আর সেই অনুসারেই 'ম্যাচিং জকি'। ঘোড়ারও বয়েস বাড়ে, পিঠে চেপে থাকা জকিরও বাড়তে থাকে।
সব যুবতীকেই একটি ঘোড়া কিনে দেওয়ার রীতি এই সংসারে প্রচলিত। সেকালে আস্তাবলে যেতেন অভিভাবক, পিতা, মাতা, ভ্রাতা প্রভৃতি মুরুব্বিরা। ঘোড়া পছন্দ করতেন। দরদাম চলত, পেডিগ্রি দেখা হত, অ্যারেবিয়ান না অস্ট্রেলিয়ান! না একেবারেই দিশি টাট্টু। একালে এদেশে বিদেশী রীতি এসে গেছে। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। সেটি হল প্রেমের যুগ।
কী রকম প্রেম? মদের জগতে একটা পানীয় আছে—নাম তার ড্রাই জিন। ধোলাইয়ের জগতে একটা ধরন আছে—ড্রাই ওয়াশ। সেইরকম ড্রাই প্রেম। অনেকটা নাট-বল্টুর মতো। অনেকটা ভূতের মতো—নেই কিন্তু আছে।
এই প্রেমের যুগে—টপাটপ সব ঘোড়ার পিঠে চেপে বসছে। ঘোড়ারা চিরকালই মূর্খ টাইপের। পিঠে চেঙ্গিজ খানই চাপুন কি শ্রীচৈতন্যই, দৌড়তে শুরু করল। প্রথমজন নিয়ে যাবেন যুদ্ধে, দ্বিতীয়জন মহামানব, প্রেমিক, নিয়ে যাবেন সংকীর্তনে। ফলে একালের ঘোড়াও বছরখানেক প্রেমের লাগামে বাঁধা পড়ে, পার্ক, পার্কস্ট্রিটে ঘোরাঘুরির পর টোপর মাথায় দিয়ে ভাড়া করা বিয়েবাড়ির ছাতে উঠবে। ক্যাটারারদের কেরদানি। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আত্মীয় স্বজনের গুলতানি। বাইরে আলো দিয়ে লেখা—বুম্বা ওয়েডস টুম্পা। বিপরীতটাই লেখা উচিত ছিল—টুম্পা ওয়েডস বুম্বা।
বাঙালিদের মধ্যে আজকাল এই চলটা খুব হয়েছে—ভালো নাম একটা থাকলেও বিদঘুটে ডাক নামে ডাকাটা 'স্মার্টনেস'। হাই সার্কলে এইটাই এখন রেওয়াজ। কলকাতার এক বিদেশি নৈশ ক্লাবে হৃষ্টপুষ্ট জনৈক বিজনেস ম্যাগনেট এক খতম যৌবনা কসমেটিক সুন্দরীকে জিগ্যেস করছেন—হাই মোচা ব্যারেল আসেনি এখনও। মোচার পোশাকি নাম মৃদুলা। আর তার স্বামীর নাম মহাদেব। নারকেলডাঙ্গার সামান্য অবস্থা থেকে বিত্তে আরোহণ। এখন বসবাস কলকাতার পশ এলাকায়। ক্লোজ সারকেলে এই নামেই সম্মান। যিনি জিগ্যেস করলেন স্কুলে বন্ধুমহলে পাঁচু নামেই পরিচিত ছিলেন। এলেমের জোরে বিরাট হয়েছেন। এখনকার বন্ধুমহলে তাঁর নাম প্রপেলার।
কাজি নজরুলের নাতির ছেলের বয়সী একজন পাবলিক ফাংশনে গান গাইতে বসে রেলা নিচ্ছেন—'কাজিদা বললে গানের এই জায়গাটা একটু লেফট সাইডে মুচড়ে দাও। পঞ্চম বললে, গোলাপে একটা গুঁতো মারো, শচিন কত্তা বললে, চাঁদ শব্দের চাঁটা নাক দিয়ে বাইরে করো।'
একেই বলে ঘোড়া-কালচার। জকিরা পেটের দুপাশে গোড়ালির গুঁতো মেরে ছোটাচ্ছে। কোথায় প্রেম! জীবনের স্বাদ এখন চিরতার জলের মতো। ছেলেমেয়েদের অবস্থা শোচনীয়। একটা নম্বর কম পেলেই আত্মহত্যা। লেখাপড়ার কোনও দাম নেই। কিন্তু অনেক দাম দিয়েই কিনতে হবে।
তাহলে এটা কোন যুগ? সত্য-ত্রেতা-দ্বাপর-কলি। এই যুগের নাম—দিশাহারা। ছুটছে ঘোড়া চোখে ঠুলি বাঁধা। যাচ্ছে কোথায়? নো হোয়্যার। বিজ্ঞানীদের মহাচিন্তা—শকুনিরা গেল কোথায়? বিলুপ্তির পথে! কী আশ্চর্য! শকুনিরা মানুষ হবে না। তাই তো এই ভালচার-কালচার!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন