সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

শচিন অর শচিনের মেয়ে একসঙ্গে খেতে বসেছে। ছুটির দিন বাপ আর মেয়ে একসঙ্গে পাশাপাশি খেতে বসে। শচিন চল্লিশ পেরিয়ে সামনের কার্তিকে একচল্লিশে পড়বে। শচিনের মেয়ে শুভার বারো চলছে। মেয়েটির বেশ কথা ফুটেছে। সব সময় কথার খই ফুটছে মুখে। আজকাল মায়ের কাজকর্মের সমালোচনা করারও সাহস হয়েছে। মাঝে মধ্যে চড়-চাপড়ও খায় এর জন্যে। তবু বলতে ছাড়ে না। শচিন অবশ্য মেয়েকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। করলে কী হবে, শুভার মার আবার রেগে গেলে জ্ঞান থাকে না।
শুভা ডালের বাটিটা দেখিয়ে বাবাকে বলল, 'চেহারাটা দেখেছ?'
শচিন আগেই দেখেছে। একবাটি কালচে জল। মনে মনে সে যা ভাবছিল, মেয়ের মুখে সেই ভাবনাটারই কথা হল।
শচিন বললে, 'মালটা কী বল তো?' শচিন এইভাবেই কথা বলে।
'মালটা হল মার হাতের বিখ্যাত মুগের ডাল।'
'কী দিয়ে এরকম চেহারা করে বল তো?'
'জিগ্যেস করো না।'
শচিন একটু থমকে গেল। অলকাকে ডেকে ডাল সম্পর্কে কিছু জিগ্যেস করা মানেই ব্যাপারটাকে অনেক দূর গড়াতে দেওয়া। কেঁচো খুঁড়তে বড় বড় সাপ বেরোনো। খেতে বসে অশান্তি শচিন ভালোবাসে না। মাসখানেক আগে অম্বলের অসুখে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। শ' পাঁচেক টাকা ওষুধে পথ্যে বিধু ডাক্তারকে ধরে দেওয়ার পরও অম্বল যখন কিছুতেই সারল না, জল খেলেও অম্বল, তখন সুনীলবাবু শচিনকে ধরে নিয়ে গেলেন এক মনস্তত্ববিদের কাছে। সুনীলবাবু শচিনের সহকর্মী। সে ভদ্রলোকের অম্বলও কিছুতেই সারছিল না। মনস্তাত্বিক ডক্টর এইচ এস ঘোষ তিনটে সিটিংয়েই সুনীলবাবুর সব অম্বলরস মধুরস করে দিয়েছেন।
সেই ডক্টর ঘোষ শচিনকে বারবার বলেছেন, 'অম্বল, পেটের অসুখ, বুক ধড়ফড় প্রভৃতি সমস্ত অসুখের নাইনটি নাইন পয়েন্ট নাইন নাইন পার্সেন্টই সাইকো-সোমাটিক ডিজিজ। মন চাইছে অসুস্থ হতে তাই দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মনটাকে কনন্ট্রোলে রাখুন। রোজ সকালে পট্টবস্ত্র পরে গীতা পাঠ করবেন, স্পেশ্যালি দ্বিতীয় অধ্যায়। মনের দাঁড়ে সব সময় একটি খুশি খুশি পাখিকে বসিয়ে রাখবেন, মনের আকাশ যে সব সময় গানে গানে ভরে রেখে দেবে। আর বাড়িতে একটা ফতোয়া জারি করে দেবেন, খাবার সময় স্রেফ ফুর্তি, কোনওরকমে চেঁচামেচি, হইহই, ঝগড়াঝাঁটি অশান্তি কিচ্ছু চলবে না। প্রশান্ত মনে, তন্ময় হয়ে খাদ্যবস্তুকে আক্রমণ করবেন। খাবার সময় যাদের আপনি অপছন্দ করেন তাদের ধারে-কাছে ঘেঁষতে দেবেন না, তাদের কথা চিন্তাতে পর্যন্ত আনবেন না। পারলে, খাবার সময় রেকর্ড প্লেয়ারে কি টেপরেকর্ডারে হালকা কোনও গান চালিয়ে দেবেন। মিউজিক। খাবার ঘরের দেওয়ালটা উজ্জ্বল রঙে রাঙিয়ে দেবেন। জানালায় ঝুলিয়ে দেবেন বাহারি পর্দা। ফুল রাখবেন, কিছু ফুল। আসল ফুল খরচে সমলাতে না পারলে প্লাস্টিকের ফুল। দূরে কোথাও বেশ ভালো একটা ধূপ জ্বেলে রাখবেন। হাওয়ায় গন্ধ ভেসে আসবে ফুরফুর করে। খেতে বসবেন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন জামা-কাপড় পরে। কেলে লুঙি কিংবা খেঁটে গামছা পরে খেতে বসা চলবে না। যুযুৎসু অথবা ক্যারাটে শেখার পোশাক দেখেছেন? লুজ ঢলঢলে ধবধবে সাদা। পরিবেশন যিনি করবেন, যদি স্ত্রী হন বলবেন ঝলমলে উজ্জ্বল শাড়ি পরে, গায়ে সেন্ট মেখে পরিবেশন করতে। যদি কাজের লোক রেখে থাকেন এবং সে যদি পরিবেশন করে, তা হলে কৃপণতা না করে তার কাপড়-জামার পেছনে নিজের অম্বলের স্বার্থে বাড়তি কিছু খরচ করবেন। কথায় বলে পেটপুজো। সেই পুজোর আয়োজনে কোনও ত্রুটি থাকলে চলবে না। ''আহার করো মনে করো আহুতি দি শ্যামা মাকে।''
শচিন মেয়েকে বললে, 'চেপে যা। যা পাবি চোখ কান বুজিয়ে খেয়ে যাবি! খুঁতখুঁতে স্বভাব ভালো নয়, বুঝলি? পেট ভরানো নিয়ে কথা।'
'তুমি কখন কী যে বলো বাবা? এই সেদিন বললে ডাক্তার ঘোষ বলছেন, খাবারের রং গন্ধ এমন হবে, দেখলেই যেন ভেতরটা খাব খাব করে ওঠে। তুমি বললে, মাসকাবার হলে ভালো ভালো সব প্লেট ডিশ কিনে আনবে। ঝকঝকে চকচকে খাবার টেবিল তৈরি করাবে, চারখানা চেয়ার।'
'তোর জন্যেই তো কেনা গেল না।'
'আমার জন্যে?'
শচিন ঠোঁটে আঙুল রেখে স-স করে মেয়েকে সাবধান করে দিল। পাশের রান্নাঘর থেকে অলকা আসছে। দু'বাটি ডাল দিয়ে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল, এইবার বাকি মালেরা একে একে আসছে। শচিনের মনে হল, প্রথম স্যামপেলটি যা ছেড়েছে তাইতেই আমরা কাত। তোমার বাকি কেরামতি যা যা বেরোবে, বোঝাই গেছে। হায় অলকা, যৌবনে মনযোগ দিয়ে রান্নাটা যদি একটু শিখতে! একেবারে গোয়ানিজ কুক হতে হবে এ কথা কেউ বলছে না; কিন্তু নিতান্তই মুখে দেওয়ার মতো একটা কিছু দাঁড় করাবার ক্ষমতা যদি তোমার থাকত! আমি নিজেই যে তোমার চেয়ে ভালো রাঁধার ক্ষমতা রাখি। শচিন ভাবনাটাকে মাঝারি রকমের একটা গলাখাঁকারি দিয়ে মন থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করল। ডাক্তার ঘোষ বলেছেন 'বি চিয়ারফুল। বি চিয়ারফুল।'
'হুঁউউ গীত গাতা চল উঁউঁউঁ গীত গাতা চল', শচিন নখের টুসকি দিয়ে ডালের বাটির গায়ে একটু মিউজিকের মতো কিছু করা যায় কি না চেষ্টা করল। কোথায় সুর! বেসুরো ডাল থেকে কি আর কাফি ঠুমরি বেরোয়! কেলে মতো একটু ডালের জল মেঝেতে ছলকে পড়ল।
অলকা ভাতের থালাটা দক্ষিণী-নাচের মুদ্রার কায়দায় মেঝেতে রাখতে রাখতে বললে, 'পাঁচ টাকা কিলো, ফুর্তিটা ডালের বাটির ওপর না দেখিয়ে নিজের মনেই চেপে রাখার চেষ্টা করো। পাশেই কলাগাছ বড় হচ্ছে। বিয়ের খরচটা তোমার ঘোষ ডাক্তার যোগাবে না। তার ব্যবস্থা তোমাকেই করতে হবে।'
শুভা জিগ্যেস করল, 'বাটিতে এটা কী মা?'
অলকা মেয়ের দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল, 'খেয়ে দেখ। হাতে পাঁজি মঙ্গলবার।'
'এটা খাবার জিনিস কি না সেটা তো আগে জানা দরকার।'
'চুউপ।'
অলকার 'চুপ' যেন বোমার মতো ফাটল। শচিন চমকে উঠেছিল। শুভারও চোখ পিটপিট করে উঠেছে।
'বাপের আশকারায় একেবারে মাথায় উঠে বসেছে। যা দোব মুখ বুজে খেতে পারো খাও, না পারো উঠে যাও। আমার কাছে অত খাতিরখুতির নেই।'
মায়ের চিৎকার আর আসন থেকে স্প্রিঙের মতো মেয়ের লাফিয়ে ওঠাটা এমনভাবে মিলে গেল, শচিনের মনে হল, অলকার পায়ের চাপে স্প্রিং লাগানো একটা বাক্সের ডালা খুলে গেল। শুভা শচিনের পেছন দিক দিয়ে গুমগুম করে পা ঠুকে ঠুকে খাবার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মা, মেয়ের দুজনেই সমান রাগপ্রধান।
শচিন ডাকল, 'শুভা, শুভা রাগ করিনসি মা, যাসনি, আয়।'
অলকা বললে, 'মা বলে আদর দিয়ে মাথাটা আর খেও না দয়া করে। পেটের জ্বালা ধরলে ঠিক এসে খাবে। পেটের জ্বালা বড়ো জ্বালা। তুমি খেয়ে-দেয়ে আস্তে আস্তে সরে পড়ো। আজ বিকেলে কল্যাণী আসবে না। তোমাদের খাওয়া হলে সৃষ্টি বাসন নিয়ে বসতে হবে আমাকে।'
'তোমার কোনও কাণ্ডজ্ঞান নেই। খেতে বসিয়ে শত্রুর সঙ্গেও দুর্ব্যবহার করতে নেই। মেজাজটা সব সময় এমন চড়াপর্দায় বেঁধে রেখেছ, সাপের মেজাজও হার মানে! কথায় কথায় ফোঁস!'
'হ্যাঁ কথায় কথায় ফোঁস! আমার মেজাজ ওই রকমই জানোই তো! আমি সব সময় তুমি মশাই, তোমার ন্যাজ মশাই করে চলতে পারব না। আমার হল ধর তক্তা মার পেরেক। সংসার আমাকে কী দিয়েছে, কী দিয়েছে শুনি। সংসারে বলির পাঁঠা হয়ে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।'
'পাঁঠা নয় বলো পাঁঠী। রেগে যাও ক্ষতি নেই, গ্রামারে ভুল কোরো না।'
শচিন আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গেল, শরীরটা দু'ভাঁজ হয়েছে, শেষ ঠেলায় এইবার নিজেকে সোজা করলেই হয়, অলকা এক ধমক লাগাল, 'উঠছ কোথায়, উঠছ কোথায়, শুনি!'
'যাই মেয়েটাকে ধরে আনি! ও না খেলে আমি খাই কী করে?'
'আহা মেয়ে সোহাগী রে! তোমার ভাবনা তুমি ভাবো। মেয়ের ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না। আমার মেয়ে আমি বুঝব। অয়েল ইওর ওন মেশিন।'
ডক্টর ঘোষ বলেছেন, খাওয়ার এক ঘণ্টা আগে ও পরে নিজেকে কোনও রকমে উত্তেজনার মধ্যে জড়িয়ে ফেলবেন না। কাম, অ্যবসলিউট কাম, ভরা নদীর মতো শান্ত তরঙ্গহীন। উত্তেজনা মানেই ভেগাস নার্ভের ছটফটানি, সঙ্গে সঙ্গে অ্যাসিড।
অ্যাসিড পেটের মধ্যে ছাড়া থাকতে থাকতে উদরের মিউকাস মেমব্রেন খেয়ে ফেলবে। দেখতে দেখতে জবরদস্ত আলসার, তারপর ফ্যাঁস করে একদিন পেটটা ফুটো করে দেবে। বাঁচতে যদি চান, জেনে রাখুন দারা পুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার?
ঠিক আছে বাবা, বাপ ঠাকুরদার আমলে বলত কর্তার ইচ্ছায় কর্ম, এ যুগে গিন্নির ইচ্ছায় কর্ম। শচিন আবার ফোলডিং টেবিল ল্যাম্পের মতো ভেঙে পড়ল। মাথাটা থালার ওপর হেঁট। পাশে মেয়ের আসনটা খালি। তার বয়সের মাপের ছোট্ট থালায় এক মুঠো ভাত, কয়েক টুকরো আলু ভাজা। গুলি গুলি কয়েকটা বড়ি ভাজা একপাশে গড়াগড়ি পড়ে আছে। শুভা রেগে আসন থেকে উঠে যাওয়ার সময় আসনটা একটু গুটিয়ে গেছে। শচিন আড় চোখে একবার তাকিয়ে দেখল। ছোট্ট একটা মাছি থালার ওপর ভনভন করছে। এর নাম খাওয়া। সুখের আহার। ইংরেজের জেলখানায় স্বদেশিরা অনশন করত। পুলিশ হাতে ব্যাটন নিয়ে সামনে এসে বসত, গলায় বাঁশ পুরে জোর করে খাওয়াত। এ যেন ছেলে পুলিশের বদলে মেয়ে পুলিশ। হাতে ব্যাটনের বদলে হাতা। সংসার কারাগারে স্ত্রীর হাতে স্বামী-নির্যাতন! এভাবে কি খাওয়া যায়? গলায় গাদা যায়! মেয়েটার মুখের ভাত পড়ে রইল, সে বাপ হয়ে কেমন করে খায়? তবু অশান্তির চেয়ে শান্তি ভালো। ডক্টর ঘোষ বলেছেন...।
খাবার আসনে শচিনকে দাবড়ানির আঠা দিয়ে আটকে রেখে অলকা রান্নাঘরে গেছে পরের কেরামতিগুলো আনতে। যেমন ভাতের ছিরি, তেমনি ডালের ছিরি। ভাজা! ভাজায় আর কী কেরামতি থাকতে পারে! কম তেলে আধপোড়া। আহা! কোথায় গেল মায়ের হাতের আলু ভাজা! কোথাও এতটুকু বেশি কি কম ভাজা নেই। হালকা বাদামি রং! মুখে দিলেই মুচমুচ শব্দ! তেলের কালচে খাঁকরি লেগে নেই। অলকার ভাজা আলু যেন ভূতের খোকা। কাজল চটকানো খোকার মুখ। কৃপণরা কি আলু ভাজতে পারে! ভাজাভুজিতে দিল চাই।
অলকা আবার এসেছে। উনুন থেকে সাঁড়াশি দিয়ে সরাসরি তুলে এনেছে কেলে একটা কড়া। তেল তখনও পিটপিট করে ফুটছে। এই দৃশ্যটা শচিনের কাছে ভীষণ ভীতিপ্রদ। তেলসুদ্ধ গরম কড়া সাঁড়াশির ঠোঁট আলগা হয়ে কোনদিন যদি ধপাস করে সামনে পড়ে শচিনের নির্ঘাত মৃত্যু। গরম তেল ছিটকে চোখেমুখে, সর্বশরীরে। চোখ দুটো তো যাবেই, সেই সঙ্গে মুখের চেহারা হবে চল্লিশ স্ক্রিনে ছাপা ব্লকের মতো কালো কালো বিন্দু বিন্দু। বিয়ে করে বিল্বমঙ্গল। শচিন বহুবার স্ত্রীকে সাবধান করেছে, ওহে ভালোমানুষের মেয়ে, তোমার এই বিপজ্জনক প্রথাটি দয়া করে ছাড়ো। কে কার কথা শোনে। চোরা না শোনে ধর্মের বাণী। কথাই যদি শুনবে তা হলে স্ত্রী হবে কেন? প্রতিবারই অলকার এই উত্তর 'কড়া আমার হাতে। ভবিষ্যৎও আমার হাতে। ভাগ্যকে যেভাবে নিয়তি ধরে থাকে, আমার হাতের সাঁড়াশিও সেই ভাবে কড়ার কানা ধরে আছে। কারুর বাপের সাধ্য নেই এখন কী হয় বলে!' ঠিক তো? ভয়ে মরলেই শেকসপিয়ার, কাওয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস, আর একটু এগোলেই রবীন্দ্রনাথ, মরতে মরতে মরণটারে। শচিন অবশ্য ভেবেই রেখেছে, সত্যিই যদি তেমন কিছু হয়, নিয়তির ঠোঁট আলগা হয়ে কড়া যদি দড়াম করে মুখের সামনে পড়ে এবং চোখ দুটো যায়, তাহলে ওই মোড়ের মাথায় চেটাই পেতে সিঙ্গল রিডের হারমোনিয়াম নিয়ে সামনে একটা কানা উঁচু থালা রেখে সারাদিন গান গাইবে, ভালোবাসার আগুন জ্বেলে কেন চলে যাও। অলকা পাশে বসে এক হাতে মাথায় ধরে থাকবে রং-চটা ছাতা আর এক হাতে মাঝে মাঝে হাতপাখা নেড়ে বাতাস করবে। এইরকম একটি হতভাগ্য দম্পতিকে সে রোজই পথে দেখে। মাথায় ছাতা ধরবে! হাতপাখা নেড়ে বাতাস করবে! কে, অলকা! এমন দিন কি হবে মা তারা।
অলকা বাঁ হাতে ধরা সেই ভয়ংকর তপ্তকটাহের ফুটন্ত শব্দায়মান তেল থেকে খুন্তি নিয়ে একটি ভাজা মাছের দাগা তুলে শচিনের ভাতের ওপর ধপাস করে ফেলে দিয়ে বললে, 'সঙের মতো বসে না থেকে দয়া করে খেয়ে উঠে যাও না। সংসারের পাট তো আমাকে চুকোতে হবে, না সারাদিন বসে থাকলেই চলবে!'
শুভার পাতেও অনুরূপভাবে একটি মাছের খণ্ড পড়ল। শচিন না বলে পারল না, 'ওর পাতে শুধু শুধু দিচ্ছ কেন, ও তো খাবে না।'
'খাবে না মানে, ওর বাবা খাবে।'
শচিন ভাবলে ওর বাবা তো খাচ্ছেই, আর কীভাবে খাবে। পেঁকো ভাতের ওপর কেলে ডাল ঢেলেছে, ডাল আবার গলেনি। বাটির তলায় আঙুল চালিয়ে গোটা গোটা কিছু মুগের দানা তুলে এনে পিণ্ডের ওপর যেভাবে তিল ছিটোয় সেইভাবেই ছড়িয়ে দিয়েছে, সতিল পিণ্ডোদকং সকাতলা মৎস্যং। এক টুকরো লেবু হলে মন্দ হত না। অলকাকে বলার সাহস নেই। শুভা থাকলে বলা যেত, সে তো এখন গোঁসাঘরে।
শোওয়ার ঘরের রেডিয়োটা হঠাৎ বেজে উঠল। আহা নজরুলের সেই গানটা, 'জনম জনম গেল আশাপথ চাহি।' শুভা খাওয়া ছেড়ে উঠে গিয়ে মনের দু:খে রেডিও খুলেছে। ডক্টর ঘোষ বলেছেন, খাবার সময় একটু গান, একটু কনসার্ট।
হঠাৎ কনসার্ট থেমে গেল। অন্য কনসার্ট কানে আসছে। 'শিগগির চল, শিগগির চল, এক থেকে তিন গুনব, তার মধ্যে সুড়সুড় করে উঠে আসবি। এক, দুই, তিন! উঠলি! কি হল উঠলি! ভালো কথায় উঠবি, না যাব? কী রে?
'আমি খাব না, যাও।'
'বাপের পয়সা সস্তা দেখেছ, না? লাগে টাকা দেবে গৌরী সেন। ওঠ শুভা ওঠ, শুভা ওঠ বলছি। আমার মেজাজ কিন্তু আস্তে আস্তে চড়ছে। এবার বলতে গেলে আর মুখে নয় হাতে বলব।'
শচিন মুখটাকে বিকৃতি করল, মেজাজ চড়ছে! আর কোথায় চড়বে বাবা। তিনি তো সব সময় সপ্তমেই চড়ে আছেন। না, ডক্টর ঘোষ বলেছেন মনটাকে পারিপার্শ্বিক ব্যাপার থেকে তুলে রাখবেন। নিজেকে অনেকটা নিরোর মতো করতে হবে। রোম পুড়ছে পুড়ুক, আপনি ছাদের আলসেতে বসে ব্যয়ালা বাজাচ্ছেন। তা না হলেই পারিপাকে বিপাক এবং অম্বল।
শয়নকক্ষের মা মেয়ের খণ্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। মায়েরই তো মেয়ে। দুজনেই একরোখা বুলডগ। বুলডগ কামড়ালে তার চোয়াল আটকে যায়। মাংস মা খাবলে সে কামড় খোলে না। এদেরও তাই। এর গোঁ ওকে, ওর গোঁ একে কামড়ে ধরে আছে। মেয়ে খাবে না, মাও ঘাড় ধরে খাওয়াবেই। দরকার হলে ল্যাং মেরে চিত করে ফেলে বাঁশ গেদে খাওয়াবে। অনশন ভঙ্গের দৈহিক ব্যবস্থা। ওরে আমার বুলু ডগুয়ারে। শচিনের শান্ত স্বভাবের ছিটে ফোঁটাও যদি শুভার চরিত্রে লাগত! কী করে লাগবে। মেয়েদের শরীরে মায়ের রক্তই যে বেশি, তা না হলে মেয়ের বদলে ছেলে হত।
ঘাড় ধরে বেড়ালছানাকে যেভাবে তুলে আনে অলকা সেইভাবে শুভাকে ধরে এনে ধপাস করে আসনে বসিয়ে দিল।
'আর যেন একটা কথাও আমাকে না বলতে হয় শুভা। সেই সকাল থেকে রান্নাঘরে। এর মধ্যে ছ'বার চা হয়েছে। খিদেয় পেট জ্বলে যাচ্ছে আমার। তোমাদের আর কী, খাবেদাবে ঘরে গিয়ে ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়বে। আমি একটা মানুষ, ধোপার গাধা নই!' দাঁতে দাঁত চেপে গাধা শব্দটা অলকা এমনভাবে উচ্চারণ করল! অ্যা: মহিলার সমস্ত স্নায়ু ড্যামেজ হয়ে গেছে। কামড়ে না দেয়! দাঁতাল, মাতাল আর পাগল! বিশ্বাস নেই! খুব সাবধান।
শুভা হাত গুটিয়ে মুখ গোজ করে বেঁকে বসে আছে। খুবই স্বাভাবিক। শচিনদের ছেলেবেলায় মাঝে-মধ্যে এইরকম ঘটনা অবশ্যই ঘটত। সেই সময়কার ভিক্টোরিয়ান 'গোল্ডেন টাইমে' মায়েরা এই রকম পুলিশি প্রথায় ছিলেন না। বলতেন, চ বাবা, ওঠ মা; রাগ করিসনি। রাগী ছেলে কি মেয়ে বলত, না যাব না, না খাব না। মা মাথায় পিঠে হাত বোলাতে বোলাতে বলতেন, চল বাবা, চল না। যাবি না তো! ঠিক আছে কাল সকালে আমাকে আর দেখতে পাবি না। কোথায় যাবে তুমি? দেখতেই পাবি, যমে নিয়ে যাবে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে। ব্যাস, হাউ হাউ কান্না। না মা যেও না তুমি।
মায়ের ফরসা সাদা কপালে লাল টকটকে সিঁদুরের টিপ ঘামে আঁচলের ঘষায় একটু ছড়িয়ে গেছে। হাতে মিছরি দানা চুড়ি। লাল পলা, সাদা শাঁখা পাশাপাশি। মাকে জড়িয়ে ধরে সে কী কান্না। মা অমনি বলতেন, দূর পাগল, তোদের ফেলে যাব কোথায়! কার কাছে ভরসা করে রেখে যাব! কত কাজ বাকি! অসম্ভব তেতো নিমঝোলও তখন চুমুক দিয়ে খেতে আপত্তি নেই।
আর এখন? অ্যাঁ, কী যুগ পড়ল রে বাবা! মিলিটারি ক্যাম্পে মহিলা মেজর জেনারেলের সঙ্গে সংসার। সবসময় কুচকাওয়াজ চলেছে! শচিন মনে মনে বললে, 'এবার থেকে তুমি ইউনিফর্ম পরে হাতে ব্যাটন নিয়ে খাবার তদারকি কোরো। সেইটাই মানাবে ভালো।'
শচিন বললে, 'শুভা খেয়ে নে মা! কেন অশান্তি করছিস। দুপুর থেকেই মেঘ জমে জমে সন্ধের কালবোশেখি!'
'তুমি খাচ্ছ খাও। আমি খাব না। ওকে আমি দেখে নোব!'
'কাকে দেখে নিবি?'
'তোমার বউকে।'
'হোয়াট! কী বললি?'
শচিনের 'হোয়াট' অলকার 'চুপ'-এর চেয়ে জোরে বেরল। রাগটাকে এতক্ষণ অনেক কষ্টে চেপে চেপে রেখেছিল। এইবার বোমা ফাটল।
অলকা পাশের ঘর থেকে ছুটে এল। হাতে একটা হাতা।
শচিন চিৎকার করে বললে 'গেট আউট। তোমাকে খেতে হবে না। বড্ড বাড় বেড়েছে শুভা। মেয়েছেলে বলে তোমাকে আমি ছেড়ে দোব না রাসকেল। কানটাকে টানতে টানতে ছাগলের কানের মতো লম্বা করে ছেড়ে দোব স্কাউনড্রেল।'
মায়ের বকুনি শুভার তেমন গায়ে লাগে না। খেয়ে খেয়ে অভ্যস্ত। বাপের ধমকধামকে ঠোঁট ফুলে যায়। অনেকদিন পরে শচিন খেপেছে। শুভার চোখে অভিমানের জল। শচিন সেসব তেমন গ্রাহ্য করল না।
হাত উঁচিয়ে দরজার গোড়া থেকে অলকা বললে, 'শুধু শুধু মেয়েটাকে বকছ কেন। হঠাৎ আবার কী হল। এই তো দেখে গেলুম মেয়ের সোহাগে উলটে পড়েছ।'
'তোমার ট্রেনিং-এ এই বয়সেই ইনি গোল্লায় গেছেন। যেমন মা তার তেমনি মেয়ে!'
'যা বলবে মুখ সামলে বলবে। মেয়েকে হচ্ছে হোক, মাকে ধরে টানাটানি করবে না।'
'ওই তো, ওই তো তোমার বচনের ছিরি! সাইকোলজিস্টরা কী বলেন জানো, ছোটরা সব সময় বড়দের চালচলন নকল করে, বিশেষত মায়েদের। শুধু জন্ম দিলেই মা হওয়া যায় না। মায়ের মতো মা হতে হয়। ত্যাগ, তিতিক্ষা, লজ্জা, মাত্রাবোধ, তাল, লয় সব শিখতে হয়।'
'জন্ম দিলেই বাপ হওয়া যায় না। রাখো তোমার সাইকোলজিস্ট। অতি আদর, আশকারা, রিরংসা এসব সযংত করে বাপের মতো বাপ হতে হয়।'
'রিরংসা জিনিসটা কী?'
'ডিকশেনারি দেখে নিও। শুভা, থালাটা নিয়ে তুই এ ঘরে উঠে আয়। আর কাঁদতে হবে না। আয় আমার পাশে বসে খাবি আয়। আর একটু মাছ, ঝোল দোব। আয় উঠে আয়।'
'ওকে উঠতে হবে কেন? আমিই উঠে যাচ্ছি। আনওয়ান্টেড এলিমেন্ট আমি।'
শচিন তেড়েফুঁড়ে উঠে পড়ল। চালতার অম্বলটা একটু চেখে দেখার লোভ ছিল। না খেয়েছে ভালোই হয়েছে। অ্যাসিডে অ্যাসিড বাড়ে।
*
সোমবারটা এমনিই ভারী বিশ্রী। ব্ল্যাক মানডে। সকালে গা ম্যাজম্যাজ করে। বেরোতেও গড়িমসি হয়ে যায়। ট্রাম, বাস কেমন ঢিমে-তালে চলে। সংখ্যাতেও কম মনে হয়। ক্যাটকেটে রোদ, ভিড়, ঠেলাঠেলি। তার ওপর কাল থেকেই অলকার সঙ্গে বাক্যালাপ বন্ধ। কথাবার্তা সব তৃতীয় পুরুষে, দেওয়াল কিংবা আলমারিকে উদ্দেশ্য করে হচ্ছে—'খেতে দিলে হয়, আন্ডারওয়্যারটা আবার কোনচুলোয় ফেলেছে, মানিব্যাগটার পাখা গজালো না কি!' চুড়ির রিনিঝিনি মেশানো অলকার সরোষ উত্তর, 'বল, যে-চুলোয় থাকে সেই চুলোতেই আছে, একটু চোখ চেয়ে দেখতে।'
'রুমালটা আবার দয়া করে কে হাওয়া করে দিলে?'
'কেউ হাওয়া করেনি নিজের প্যান্টের পকেটটা ভালো করে দেখলেই পাওয়া যায়।'
'যা: বাবা একপাটি জুতো আবার কোথায় গেল?'
'কোথাও যায়নি, র্যাকের পাশে পড়ে গেছে। যেমন রাখার ছিরি!'
'ও, পড়ে গেলে তুলে রাখতে নেই? হাতে পক্ষাঘাত?'
'হ্যাঁ, পক্ষাঘাত। যেমন দেখাবে তেমনি দেখতে হবে। আর্শির মুখ দেখা।'
শচিন ঝুলতে ঝুলতে অফিসের টেবিলে এসে বসছে। ঘেমে নেয়ে, আধকপালে হয়ে, আধমরা অবস্থা।
ঢকঢক করে এক গেলাস জল খেল। কাজ দেখলেই রাগ ধরছে। পেটটাও ভুটভাট করছে। ঢেঁড়সের ঢেঁকুর উঠছে। অন্যদিন ড্রয়ারে একটা দুটো অ্যান্টাসিড থাকে, আজ তাও নেই। ভোগাবে। ঢেউ ঢেউ করে আর গোটাকতক ঢেঁকুর তুলল। মাথাটা বেশ জম্পেশ ধরেছে। ধরবেই। মাথার আর দোষ কী! কথায় বলে মুড়ি আর ভুঁড়ি। অম্বল হলেই মাথা ধরবে। শচিন নাকের ওপর কপালের কাছটা দু আঙুলে টিপে চুপ করে বসে রইল। রাসকেল পেট, রাসকেল ডাক্তার। কোনও অসুখই সারাবার ক্ষমতা নেই, কেবল ফি গুনে দিয়ে যাও।
সুনীলবাবু পান চিবোতে চিবোতে বললেন, 'হল কী? এত করে বললুম খাবার পর একটা করে পান খাবেন, চুনে ক্যালসিয়াম, ভালো অ্যান্টাসিড, পানের রসে ক্লোরোফিল...।
'ধ্যার মশাই ক্লোরোফিল, ক্যালসিয়াম। ভেতরটা চুনকাম করে দিলেও কিছু হবে না। সংসারটাই অম্বলে অম্বলে অ্যাসিড হয়ে গেছে।'
'চলুন আজ ডক্টর ঘোষের কাছে। আমিও যাব, একটা কেস আছে। আপনার চেয়েও জটিল। সেও ওই স্ত্রীর সঙ্গে অবনিবনা।'
'হ্যাঁ যাব। আজই শেষ। হয় এসপার না হয় ওসপার।'
'আরে মশাই, অত সহজে হাল ছাড়েন কেন? কথায় বলে যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ আশ। নিন একটা পান খান। আজ আর চা খাবেন না। স্রেফ জল চালিয়ে যান। হাইড্রোপ্যাথি ইজ দি বেস্ট প্যাথি। এই সুরেন, শচিনবাবুর গেলাসটা ভরে দাও।'
টিফিনে সুনীলবাবু শচিনকে দেখিয়ে দেখিয়ে খাস্তা কচুরি খেলেন। হজম করায় মন! মনই লিভারকে নাচায়।
সুনীলবাবু বললেন, 'দেখেছেন কাণ্ড, জল পর্যন্ত যার পেটে তলাতনা সে আজ প্লেন কচুরি নয়, একেবারে খাস্তা কচুরি খাচ্ছে।'
শচিন ফাইল দেখতে দেখতে বললে, 'আমার বউটাকে বোবা আর কালা করে দিতে পারলে আমিও হেসে হেসে খাস্তা কেন কবিরাজি কাটলেট খেতুম।'
ডক্টর ঘোষের চেম্বার ফাঁকাই ছিল। থাকেও তাই। কার দায় পড়েছে পয়সা খরচ করে ছত্রিশ গণ্ডা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে সাধ করে আসতে। একটাই সুবিধে, বেশ আরাম করে বসার জন্যে পুরু পুরু গদি আঁটা ভালো ভালো চেয়ার আছে যা অন্য ডাক্তারখানায় থাকে না।
ডক্টর ঘোষ সব শুনলেন। শুনেটুনে বললেন, 'পর্বত মহম্মদের কাছে না এলে মহম্মদকেই পর্বতের কাছে যেতে হবে। দাম্পত্য জীবনের কয়েকটা বেসিক ডিসিপ্লিন আছে। সেই ডিসিপ্লিন মেনে চলার ওপর শান্তি নির্ভর করছে। এই তো হালফিল একটা কেস ভালো করে দিলুম।'
শচিন বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। কেসটা শোনার কোনও উৎসাহই নেই তার। পয়সা খরচ করে যত বাজে গালগল্প শুনতে আসা। সুনীলবাবুর খুব উৎসাহ, প্রশ্ন করলেন, 'কী কেস?'
'জানালা খোলা। মাথার দিকের জানালা খোলা নিয়ে চোদ্দো বছরের ঝামেলা, বদহজম, নার্ভাস ব্রেকডাউন। স্ত্রী জানালা খুলে শোবেন, স্বামী বন্ধ করবেন। ইনি খোলেন তো উনি বন্ধ করেন। সারারাত ওই চলে। খোলা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে ছিটকিনি ধরে দুজনের সারারাত হাত কাড়াকাড়ি। ঘুমের বারোটা। প্রতিবেশীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। প্রথম প্রথম মজা, বিরক্তি, প্রতিবাদ। ভদ্রলোক কোথায় পড়েছেন মাথায় সরাসরি হাওয়া লাগলে সাইনাস হয়। সিটিংয়ের পর সিটিং, কিছুই করতে পারি না। দুপক্ষই সমান। গোঁ জেতে কি সাইকোলজি জেতে! শেষে...।'
'শেষে কী হল?' সুনীলবাবু যেন রহস্য গল্প শুনছেন।
'শেষে সাইকোলজির বাইরে যেতে হল।'
'কী রকম?'
'শঠে শাঠ্যাং সমাচরেৎ। ভদ্রলোককে বললুম, একদিন আপনি সারারাত জানালাটা খোলা রাখতে দিন। প্রয়োজন হলে নিজে মাংকিক্যাপ পরে অলীক সাইনাস থেকে বাঁচুন। একটা দিন। ভদ্রলোক রাজি হলেন। ব্যাস হয়ে গেল?'
'কী হয়ে গেল?'
'চোদ্দো বছরের ঝামেলা মিটে গেল। এখন স্ত্রী সবার আগে জানালা বন্ধ করে দেন।'
'কেন?'
'সেদিন রাত দুটো নাগাদ অ্যাপ্রন পরে নিজেই গেলুম। রাস্তার ধারে একতলার ঘর। রকে উঠলুম। জানালা দিয়ে আমার লম্বা হাতটা বাড়িয়ে ভদ্রমহিলার চুল ধরে এক হ্যাঁচকা টান মেরেই দে দৌড়।'
সুনীলবাবু হি হি করে হাসলেন। শচিনের হাসি পেল না। শচিনের তো জানালা-কেস নয়। আরও ঘোরালো জোরালো ব্যাপার।
সুনীলবাবুই শচিনের মুখপাত্র। তিনি জিগ্যেস করলেন, 'এঁর ব্যাপারটা তাহলে কী হবে? এইভাবেই চলবে?'
'এঁর ব্যাপারটার একমাত্র সমাধান প্রেম। প্রেম করতে হবে, প্রেম দিতে হবে।'
'এই বয়েসে প্রেম? মেয়ে পাবে কোথায়? এখন মার্কেটে যেসব ছেলে ঘুরছে তাদের হাত থেকে মেয়ে বার করা শক্ত হবে না?'
'প্রেম মানেই কি পরকীয়া! নিজের স্ত্রীর সঙ্গেই প্রেম।'
শচিন এইবার লাফিয়ে উঠল, 'ওই বউয়ের সঙ্গে প্রেম? কারুর বাপের ক্ষমতায় কুলোবে না। সবসময় বাঘিনীর মতো গর্জন করছে।'
'বাঘিনীকেও পোষ মানাবার কায়দা আছে। সার্কাসের রিংমাস্টার দেখেছেন তো! বউকে একটু তোয়াজ করবেন। রোজ গীতগোবিন্দ পড়বেন। মোলায়েম করে বলবেন, দেহি পদপল্লবমুদারম। আদর করে কখনও পিঠে, কখনও মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন, সুড়সুড়ি দিয়ে দেবেন। গালে দু-চারটে ঠেলা মারবেন। ট্যাবলেট নয়, নিয়ম করে রোজ একটা দুটো চুমু খাবেন।'
'চুমু?'
'হ্যাঁ হ্যাঁ চুমু, চুম্বন। ওর চেয়ে ভালো অ্যান্টাসিড আর কিছু নেই। না জানা থাকলে গোটাকতক ইংরেজি সিনেমা দেখে শিখে নেবেন। আমাদের দেশের দোষই হল, মেয়েদের শরীরের নীচের দিকেই আমাদের নজর। কিন্তু ঊর্ধ্বাংশটাই হল আসল। শুরু হবে ওপর থেকে। ডিভাইন লাভ, ডিভাইন লাইট ওপর থেকে ধীরে ধীরে নীচে নেমে আসে। প্রেম কি মশাই ধর তক্তা মার পেরেক! সব কিছুর একটা মেথড আছে, অ্যাপ্রাোচ আছে। স্ত্রীর সঙ্গে প্রেমই হল বেস্ট প্রেম, সিকিওর্ড প্রেম, খোঁটায় বেঁধে প্রেম। প্রেমের অবজেকট সহজে মেলাতে পারবে না। ইঁদুর-কলে পড়ে গেছে। প্রথম প্রথম অসুবিধে হলে পরস্ত্রী ভেবে নেবেন। নিজেকে মনে করবেন কৃষ্ণ, চলেছেন রাধার কাছে অভিসারে।'
'ইমপসিবল।'
'ওই তো দোষ। অহংটাকে খাটো করা যায় না? আত্মসমর্পণ, সারেন্ডার। বিল্বমঙ্গল যদি পেরে থাকে, হোয়াই নট ইউ! সিকির সিকি প্রেমই হল আমার প্রেসক্রিপসান। মাঝে মাঝে এদিক ওদিক তাকিয়ে বইয়ের মুখে একটু মিষ্টি গুঁজে দেবেন। ভালো শাড়ি পরিয়ে পার্কে পাশাপাশি বসে কোলের ওপর হাত নিয়ে খেলা করবেন। আঙুলের আংটি ঘোরাবেন। চীনেবাদাম ঝালমুড়ি কিনে দেবেন। ফুচকা খাওয়াবেন। আড়ালে ঝোপঝাপ দেখে পাশাপাশি বসে মাথাটা কাঁধে হেলিয়ে দেবেন। ইডেনে গেলেই এ দৃশ্য দেখতে পাবেন। প্রথম প্রথম কপি করবেন। কপি করতে করতেই অরিজিন্যালিটি এসে যাবে। দিন কতক এইভাবে তোয়াজ করে দেখুন শান্তি ফিরে আসবে। মুখের ওই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত বুড়োটে ভাব কেটে যাবে। যান, বি চিয়ারফুল! মনে রাখুন অম্বল আর বদহজমের দাওয়াই অ্যান্টাসিড নয়, প্রেম।'
দুজন চেম্বার ছেড়ে রাস্তায় নেমে এলেন।
সুনীলবাবু বললেন, 'তাহলে একটা গীতগোবিন্দ আর বিল্বমঙ্গল কিনে ফেলুন। নতুন জীবন আজই শুরু করুন। একটা কামসূত্রও সঙ্গে কিনে ফেলতে পারেন। ডাক্তারে, ওষুধে তো বহু পয়সা দিলেন আরও কিছু না হয় এদিক যাবে। দেখতে দোষ কী? আচ্ছা আমি চলি কাল দেখা হবে। গুডবাই।'
শচিন গুটি গুটি হাঁটা ধরল। আবার বাড়ি। আবার সেই দেওয়ালকে উদ্দেশ্য করে ঠারেঠোরে ছিটে গুলির মতো কথা ছুঁড়ে মারা। মেয়ের সঙ্গেও কথা বন্ধ। এভাবে আর কতদিন চলবে প্রভু! শচিন সেই অদৃশ্য প্রভুর কাছে পরামর্শ চাইল। কোথায় প্রভু! ঊর্ধ্বশ্বাসে মানুষ ছুটছে। ভ্যাঁক ভ্যাঁক করে গাড়ি দৌড়োচ্ছে। দু:খী শচিনের দিকে কারুর নজর নেই। অসার সংসার, নাহি পারাপার। আচ্ছা দেখাই যাক না ডক্টর ঘোষের নতুন দাওয়াই কাজে লাগিয়ে। অহং-এর ভাগটাকে একটু নীচু করে স্ত্রীর উদাসীনতার অগাধ জলে স্পর্শ করিয়ে স্নেহের কণা কিছু তুলে আনা যায় কি না। আমার বউ। আহা, আমার প্রেমের বউ! আহা, আমার ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। বউকে স্নেহ করার জন্যে শচিন নিজেকেই তোয়াজ করতে লাগল। স্নেহকে, প্রেমকে এখন দৃশ্যমান করতে হবে। তেমন রেস্ত থাকলে একটা হীরের আঙটি কেনা যেত। তেমন রেস্ত থাকলে একটা শাড়ি। পকেট তো গড়ের মাঠ। মধ্যমাসে কেরানির পকেটের আর কত জোর থাকবে। অলকা একসময় কড়াইয়ের চপ খেতে ভালোবাসত। বিয়ের পর প্রথম প্রথম নতুন বউকে সে কত খাওয়াত। কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি পরে হু হা করে ঝালঝাল চপ খাবার সেই দৃশ্য হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে উঠল। নাকের ডগায় শিশিরের দানার মতো ঘাম। আয় পুরোনো দিন ফিরে আয়।
কড়াইয়ের চপ নিয়ে শচিন বাড়ি ঢুকছে। ঢুকতে ঢুকতেই শোওয়ার ঘর দেখতে পাচ্ছে। জানালা খোলা। ফন ফন করে পাখা ঘুরছে। পায়ের ওপর পা জড়িয়ে অলকা শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে। ওরে আমার মহারানি রে? বাস ঠেঙিয়ে ধস্তাধস্তি করে সারা দিনের পর একটা লোক বাড়ি ফিরছে, কোথায় জানালার সামনে বিরহিনীর মতো দাঁড়িয়ে থাকবে, হাসিমুখে এগিয়ে আসবে, বলবে, আহা তুমি এলে, বাছারে! তা না, উনি শুয়ে শুয়ে মৌজ করে উপন্যাস পড়ছেন। ফায়ার। না না, আজ আর ফায়ার নয়, দাঁতে দাঁত চেপে সিজফায়ার।
শচিন একটু কাশল। অলকা বই থেকে চোখ না সরিয়ে শুয়ে শুয়েই বললে, 'শুভা দরজাটা খুলে দে।' ও! শুভা দরজা খুলবে, আপনার হাতে কি পক্ষাঘাত। এ যেন শচিন আসেনি, এসেছে কাজের লোক। না, নো রাগারাগি। শচিন ঢুকে পড়ল, 'একবার দয়া করে উঠে এসে এটা ধরো না।'
দয়া করে শব্দটা না বললেই হত। সোজাসুজি বলা যেত, ওগো একবার উঠে এসো তো। যাক মুখ ফসকে যা বেরিয়ে গেছে তা বেরিয়েই গেছে।
'শুভা, কী ধরতে বলছে ধরত!'
ও, তবু নিজের ওঠা হয় না।
'কী এমন ব্যস্ত, নিজে উঠতে পারছে না!' অতিকষ্টে শচিন পরের শব্দ ক'টা ধরে রাখল—গতরে কি শুঁয়োপোকা ধরেছে!
ধপাস করে বইটা পাশে ফেলে বেজার বেজার মুখে অলকা উঠে এল, 'কী হল কী?'
শচিন হাসির রেখা টেনে পরম উৎসাহে বললে, 'গরম গরম, একেবারে গরম গরম কড়াইয়ের চপ।'
'কী হবে?'
'কী হবে মানে?'
'তুমি খাবে? তোমার তো অম্বলের ব্যামো!'
'আমি কেন? তুমি খাবে।'
'আদিখ্যেতা!'
'তার মানে?'
'রোজই তো শুধু হাতে ঢোকো, হঠাৎ আজ পিরিত উথলে উঠল কেন?'
'ও পিরিত? কোনওদিন কিছু আনি না, না?'
'মনে তো পড়ে না। তোমার চপ তুমি খাও।'
এই সময় শচিনের উচিত ছিল বউকে একটু সোহাগ করা, তার বদলে সে ঠোঙাটা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিলে লাফিয়ে উঠল, 'রাবিশ! নৃশংস রাবিশ!'
'হ্যাঁ রাবিশ।'
'অফ কোর্স রাবিশ, হৃদয়হীন রাবিশ।'
'জানোই তো। জেনে শুনে ঘাঁটাতে আস কেন? কেঁচো খুঁড়তে গেলেই সাপ বেরোবে।'
'বেরোক। তাই বেরোক।' শচিন চপের ঠোঙায় মারল লাথি। ঠোঙা ছিঁড়ে সব চপ ছত্রকার।
'পয়সা তোমার অনেক, মারো, মারো লাথি, কার কী?'
'সংসারের মুখে লাথি।'
'নতুন কি, সে তো দুবেলাই চলছে।'
'দুবেলাই চলছে?'
'হ্যাঁ চলছে। বেরোতে লাথি আসতে লাথি।'
'যেমন দেখাবে তেমনি দেখবে।'
'কী তোমাকে দেখানো হয়েছে।'
'আদর করে চপ নিয়ে এলুম, দিলে ফেলে।'
'আমি ফেলে দিলুম, না তুমি ফেলে দিলে?'
'ওই হল।'
'বিষাক্ত তেলেভাজা আজকাল কেউ খায় না। পারতে শ্যামাদির স্বামীর মতো ইলিশ নিয়ে, সিনেমার টিকিট, কি থিয়েটারের টিকিট, কি কাশ্মীরে বেড়াতে যাওয়ার টিকিট নিয়ে বাড়ি ঢুকতে। বুঝতুম মুরোদ! আজ চোদ্দো বছরে একবার চিড়িয়াখানা দেখাতে পারলে না। মেয়েটাকে প্রত্যেক বছর আশা দিয়ে দিয়ে রাখা। এ বছর হল না মা, আসছে বছর। সেই আসছে বছর। সেই আসছে, সেই আসছে বছর চোদ্দো বছরেও এল না। এই তো মুরোদ।'
কড়াইয়ের চপের লড়াই গড়াতে গড়াতে অনেক দূরে গড়িয়ে গেল। শচিন পা থেকে জুতো দুপাটি খুলে র্যাকের দিকে ছুঁড়ে দিল। দাঁত মুখ খিঁচিয়ে হিড়হিড় করে টেনে-টুনে পা থেকে নাইলনের মোজা খুলল। গা থেকে জামাটা খুলে চেয়ারে ছুঁড়ে মারল। বুক পকেট থেকে এক গাদা টুকরো-টুকরো কাগজ খানকতক ময়লা ময়লা নোট ছড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। থাক পড়ে। শ্যামাদির স্বামীর মতো মুরোদ দেখাতে পারলে অলকা সব তুলে গুছিয়ে-গাছিয়ে রাখত।
অনেক রাতে বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে শুয়ে শচিন নিজেকে শ্যামাদির স্বামীর সঙ্গে মেলাতে বসল। প্রতিবেশী। দু'বেলাই শচিনের সঙ্গে দেখা হয়। লুঙ্গিটাকে উঁচু করে পরে সকালে ঘোঁত ঘোঁত করে বাজারে ছোটেন। শচিন মাঝেসাঝে বাজারে যায়। রোজ সকালে বাজার যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ব্যাপার। ন'টা নাগাদ আদ্দির পাঞ্জাবি পরে ঘাড়ে একগাদা পাউডার মেখে মুরগি-হাটায় ব্যাবসা করতে যাওয়া। হবে না, শচিনের দ্বারা হবে না। ও সাজে সাজা যাবে না মা! মোড়ের মাথায় পানবিড়ির দোকানে দাঁড়িয়ে শ্যামাদির স্বামী বেরোবার সময় এতখানি একটা হাঁ করে দু'খিলি পান একসঙ্গে মুখে পোরেন। তারপর রিকশায় ওঠার আগে কোনও দিকে না তাকিয়ে পচাৎ করে এক ধাবড়া পিক ফেলেন। হবে না, শচিনের দ্বারা ও কাজ হবে না। ছুটির দিন মেয়ের ঘাড়ে সংসার ফেলে দিয়ে বউ বগলে শ্যামাদির স্বামীর যে কোনও সিনেমা বা থিয়েটারে যাওয়া চাই। যে কোনও সিনেমা বা থিয়েটার শচিনের পক্ষে সহ্য করা শক্ত। হিন্দি ছবির ননসেন্স, বাঙলা থিয়েটারের ক্যাবারে কোনও সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের সহ্য শক্তির ওপর অত্যাচার। শালিদের বাড়িতে এনে ছত্রিশবার বাজারে ছোটা, হই হই করে হাসি মশকরা, টাকার শ্রাদ্ধ, শচিনের সে ক্ষমতাও নেই, রুচিও নেই। বোকা বোকা কথা বলে ব্যা ব্যা করে হেসে মেয়েদের মনোরঞ্জন করার ক্ষমতা শচিনের নেই। শান্ত মানুষ, শান্তিতে থাকতে চায়। বউ পেয়েছে তাইতেই খুশি, শালাশালি নিয়ে ঢলাঢলির ইচ্ছেও নেই, প্রয়োজনও নেই। এক মেয়েছেলেতেই কাহিল-কাহিল অবস্থা, আর মেয়েছেলেতে কাজ নেই। শ্যামাদির স্বামী ভালো শাড়ি দেখলেই বউয়ের জন্যে কিনে আনেন, কথায় কথায় গহনা গড়িয়ে দেন, দিতেই পারেন। ব্যাবসার পয়সা। টাটা আরও দেন, বিড়লা গোয়েঙ্কা দিতে পারেন। শচিনকে দিতে হলে চুরি করতে হবে।
অলকার দিকে পেছন ফিরে শচিন চিত থেকে কাত হল। গায়ে হাত দিলেই খ্যাঁক করে উঠবে। শ্যামাদির স্বামী না হতে পারলে অলকার সোহাগ শচিনের বরাতে জুটবে না। যা হয়ে গেছে বিয়ের প্রথম চার বছরেই খতম। বাকি দশটা বছর ভিয়েতনামের যুদ্ধ। চলছে তো চলছেই। কবে যে শেষ হবে! সেই সাহেব শিকারির কথা মনে পড়ছে। দূর থেকে বাঘের গায়ে পিন ছুঁড়ে মারেন। বাঘ ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর বাঘের মতো হিংস্র জন্তুকে বেড়ালের মতো ন্যাজ ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসেন। ওইরকম একটা অস্ত্র যদি শচিনের থাকত! রোজ বাড়ি ঢোকার আগে জানালার বাইরে থেকে অলকাকে টিপ করে মারত! ব্যাস বাঘিনী ঘুমে ন্যাতা। সংসার শান্ত। ডক্টর ঘোষ! ডক্টর ঘোষ কী করবেন! প্রেম! প্রেম নয়, শচিনকে হতে হবে শ্যামাদির স্বামীর মতো।
অনেক ভেবে শচিনের মনে হল, একটা কাজ সে করতে পারে—চিড়িয়াখানা। অগতির গতি চিড়িয়াখানা। বাঘিনীকে বাঘ দেখাও, আইসক্রিম খাওয়াও, ট্যাক্সি চাপাও। সেই রেশে যদি কিছুদিন শান্তি পাওয়া যায়। আর দেরি নয় তাহলে। কালই। শুভস্য শীঘ্র। কাল অফিস না গিয়ে চিড়িয়াখানা। অনেক ছুটি পাওনা। ছুটি তো সে নেয়ই না। ছুটি নিয়ে বাড়িতে থাকলেই তো অশান্তি।
একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে শচিন শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঝনঝন করে বাসন পড়ার শব্দে শচিনের ঘুম ভেঙে গেল। বেশ বেলা হয়েছে। অলকা মেয়েকে বলছে, 'থাক, ডাকতে হবে না, আক্কেলটা দেখাই যাক না। কখন ওঠে, কখন বাজার হয়, কখন খাওয়া হয়, কখন আপিস যাওয়া হয়। আমার কী? আমি ভাত নামিয়ে বসে থাকি।'
শুভা বলছে, 'না মা, বাবাকে ডেকে দি। তা না হলে এমন তাড়াহুড়ো করবে সকলেরই মেজাজ খারাপ হয়ে যাবে।'
'কোনও দরকার নেই। আমি বাথরুমে ঢুকছি, তুই একটু একটু পরে ভাতের হাঁড়িতে কেবল এক ঘটি জল ঢেলে দিস।' শচিন বিছানা থেকে লাফিয়ে নামল। মরেছে, অলকা বাথরুমে ঢুকলে পাক্কা এক ঘণ্টা। তার আগেই মুখটা ধুতে হবে। শচিন ঘর থেকেই চিৎকার করে বলল, 'শুভা আমি উঠছি।'
'উঠেছ বাবা!'
'হ্যাঁ মা উঠেছি।' শচিন বাইরে এল। আহা কী সুন্দর প্রভাত।' চট করে মুখটা ধুয়ে আসি! অলকা, অলকা তুমি চা চাপাও।'
উ:, কতদিন পরে বউকে নাম ধরে ডাকা হল। দাঁতে বুরুশ ঘষতে ঘষতে শচিন ভাবল, অলকা নামটা ভারী সুন্দর। অলকানন্দা। চেহারাতেও একসময় বিউটি ছিল। মনটা যদি একটু বিউলিফুল হত! কাদের বাড়ির রেডিও থেকে অতুলপ্রসাদের গান ভেসে আসছে, প্রভাতে যারে নন্দে পাখি।
হাত মুছতে মুছতে শচিন বেরিয়ে এল, 'কই চা হয়েছে অলকা?' কোনও দিকে না তাকিয়ে শচিন বসার ঘরের দিকে এগোল। কেমন যেন লজ্জা লজ্জা করছে। অলকা, অলকা, একটু যেন তোয়াজের গলা। চায়ে চিনি গুলতে গুলতে মা মেয়েকে ফিসফিস করে বললে, 'কী ব্যাপার!' মেয়ে ঠোঁট উলটে বোঝাতে চাইল, তোমাদের ব্যাপার তোমরাই জানো, আমি তো সবে এসেছি। জ্ঞান হয়েছে মাত্র কয়েক বছর।
শুভা চা নিয়ে এল। শচিন কাগজ দেখছিল।
'তোর মাকে ডাক তো।'
অলকা নববধূর মতো পায়ে পায়ে বসার ঘরে এল। শাড়ির সামনেটা ভিজে। হাত মুছেছে। রাতের বাসি চুল, শরীর উশকোখুশকো। অনেকদিন পরে শচিন অলকাকে ভালো করে দেখছে। আগের মতন সুন্দর মুখটা সংসারের আঁচে যেন পোড়াপোড়া হয়ে গেছে।
'শোনো আজ আর বেরোব না।'
অলকা উদাস গলায় বললে, 'বেরিও না।'
'কেন বেরোব না বলো তো?'
'কী জানি?'
'আজ আমরা চিড়িয়াখানায় যাব। ডিম নিয়ে আসছি। ভাতে ভাত, ডিম সেদ্ধ, মাখন।'
'হঠাৎ চিড়িয়াখানায়।'
'অনেক ছুটি পাওনা, মাঝে মাঝে একটু আউটিং ভালো।'
'তোমার ডাক্তারবাবুর প্রেসক্রিপশান বুঝি।'
'আরে না না। জীবনটা বড় একঘেয়ে হয়ে গেছে। সংসার, অফিস, অফিস, সংসার।'
'তোমার মেয়েকে নিয়ে যাও।'
'আর তুমি!'
'আমার রোজ যা তাই। হাঁড়ি ঠেলা কাজ, সেই হাঁড়িই ঠেলে যাই সারাজীবন।'
'এদিকে সরে এসো।'
'বলো না।'
শচিন চেয়ার ছেড়ে উঠে এল। অলকার চেয়ে বেশ কিছুটা লম্বা। এদিক ওদিক তাকাল। ধারে কাছে শুভা নেই।
শচিন অলকার গলাটা জড়িয়ে ধরে চুক করে গালে একটা চুমু খেল।
অলকা চমকে উঠেছে। 'সাত সকালে এ কী অসভ্যতা।'
শচিনের নিজেকে মনে হল ইংরেজি ছবির হিরো। ডক্টর ঘোষ বলেছেন অ্যান্টাসিড নয়, চুমু। বেশ লাগল। অনেকদিন পরে যদিও ভয়ে ভয়ে আলগোছে।
'যাও, রেডি হয়ে নাও। তোমার চুল বড় তেলচিটে হয়েছে। একটু শ্যাম্পু করো।' অলকা চলে গেল।
শচিন শুনতে পাচ্ছে মা মেয়েকে বলছে, 'কী রে মা, ভাতের তলা ধরে যায়নি তো মা!'
ওষুধ ধরেছে। মা বেরিয়েছে মুখ দিয়ে। জয় গুরু। জয় গুরু। ডক্টর ঘোষ কী বলবেন? তার নিজের লেখাপড়াও কম না কি। নিজেই একটা মেন্টাল হসপিটাল খুলতে পারে। এই তো সেদিন এরিক ফ্রমের 'দি আর্ট অফ লাভিং'-এ পড়ছিল, লাভ ইজ অ্যান অ্যাকটিভ পাওয়ার ইন ম্যান, এ পাওয়ার হুইচ ব্রেকস থ্রু দি ওয়ালস...।
সেই বলে না, সোনার মোহর মাটি চাপা থাকলে পেতলের মতো ম্যাড়মেড়ে হয়ে যায়। একটু ঘষলেই আবার চকচকে। অলকার রূপটা আজ অ্যায়সা খোলতাই হয়েছে! কোথায় গেলেন শ্যামাদির স্বামী। আসুন একবার দেখে যান!
শুভা মায়ের হাত ধরে, শচিনের কাঁধে জলের বোতল। বাসের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করবে। না, পেলে ট্যাক্সি। আজ আর কৃপণতা নয়। অলকা বললে, 'কিছু লজেনস কিনে নিলে হত।'
'ঠিক বলেছ।'
রাস্তার ওপরেই স্টেশনারি দোকান। শচিন বোধহয় একটু অন্যমনস্ক ছিল। লক্ষই করেনি বেগে একটা গাড়ি আসছে। রাস্তা পার হওয়ার জন্যে একেবারে গাড়ির মুখোমুখি। অলকা একটান মেরে শচিনকে সরিয়ে আনল। গাড়িটা থামেনি। একটা গালাগাল ছুঁড়ে দিয়ে বিদ্যুৎ বেগে চলে গেল। অলকার হ্যাঁচকা টানে শচিন প্রায় তার বুকের ওপর এসে পড়েছে। একটুর জন্যে শচিন বেঁচে গেল। অলকা হাঁপাচ্ছে। দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে স্থির দৃষ্টিতে। অলকা কাঁদোকাঁদো গলায় বললে,
'রাস্তা পার হওয়ার সময় দেখবে তো। এখুনি একটা কাণ্ড হয়ে যেত।' অলকা কেঁপে উঠল। শুভা এসে শচিনের হাত ধরেছে, যেন হাত ধরে থাকলেই বাবা চিরকাল থাকবে।
অলকা বললে, 'চলো ফিরে যাই। বাধা পড়ে গেছে। তোমার শরীর কাঁপছে।'
'ধুর ফিরব কেন? ফাঁড়া কেটে গেল।'
'তাহলে চিড়িয়াখানায় গিয়ে কাজ নেই। চলো কালীঘাটে যাই। অনেকদিন ধরে মা টানছেন।'
কালীঘাট। শচিন একটু ঘাবড়ে গেল। ভিড় ঠেলাঠেলি, পাণ্ডা। মায়ের কথা উঠলে, না বলা যায় না। হিন্দুর ছেলে।
'বেশ তাই চলো! বাসের চেষ্টা করে লাভ নেই। ট্যাক্সি ধরি।'
'অনেক নিয়ে নেবে।'
'তা নিক, রোজগার তো খরচের জন্যেই।'
দু-দিকের দু-জানালার ধারে মা আর মেয়ে মাঝখানে শচিন। বেশ লাগছে। সত্যিই বেশ লাগছে। হু হু করে গাড়ি ছুটছে। শুভার নানা প্রশ্ন। এটা কী ওটা কী? অলকা বললে, 'একদিন আমাকে নিউ মার্কেটটা দেখাবে?'
'আজই দেখিয়ে দোব ফেরার পথে।'
'একটা জিনিস কিনে দেবে?'
'কী?'
অলকা শচিনের কানে ফিসফিস করে সাধের জিনিসের নাম বললে, অন্য পাশ থেকে শুভা বললে, 'কী বাবা?' অলকা শচিনের ঊরুতে চিমটি কেটে সাবধান করে দিলে।
শচিন বললে, 'তোর জন্য কাচের চুড়ি।'
শুভা খুব খুশি, 'তাহলে মাকেও কিছু কিনে দিও। তোমার জন্যেও কিছু কিনো।'
শচিন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল অখুশি মুখ গুলো কেমন খুশি খুশি হয়ে উঠেছে।
তেমন ভিড় নেই মন্দিরে। বেশ ফাঁকা ফাঁকা। পুজোর নৈবেদ্য নিয়ে তিনজনে পাশাপাশি দাঁড়িড়েছে মায়ের দিকে মুখ করে। পূজা নিচ্ছেন, প্রসাদ দিচ্ছেন। তাঁর কী মনে হল, অলকার কপালে গোল একটা সিঁদুরের টিপ পরিয়ে দিলেন। মুখে ঘামতেল কপালে লাল টিপ। শচিনের মনে হল কুসুমডিঙার দিন হোমের আগুনে অলকার মুখটা এইরকম দেখতে হয়েছিল। তখন শচিনের সঙ্গে বাঁধা ছিল গাঁটছড়া। অতীত যেন ফিরে এসেছে বর্তমানে। কান পাতলে কি সানাইয়ের সুর শোনা যাবে?
অলকার চোখে জল। শচিনের মনে হল পাথরে জল ঝরছে।
'তুমি কাঁদছ কেন?'
'আমার ভীষণ বাঁচতে ইচ্ছে করছে, আমি মরতে বড় ভয় পাই।'
'মরার কথা আসছে কেন?'
'আসছে। তোমাকে আমি বলিনি আমার ভীষণ একটা অসুখ করেছে।'
'কী অসুখ।'
'টিউমার।'
'টিউমার? কোথায় টিউমার?'
'এই যে মাথার মাঝখানে।'
অলকা মাথাটা নীচু করল। কপালের সামনে থেকে চুল দু'ভাগ করে সিঁথি চলে গেছে মাথার মাঝখানে পর্যন্ত। ঘাড়ের কাছে খোঁপা টলমল করছে। শচিন মাথার মাঝখানে হাত দিয়ে দেখল গোল মতো একটা কী উঁচু হয়ে উঠেছে। গুলির মতো হাতে চাপ দিলে পিছলে এপাশ ওপাশ করছে।
'তুমি বলোনি তো?'
'কী বলব, বলে কী হবে? তোমাকে না বলে একদিন ডাক্তারবাবুকে দেখিয়েছিলাম। বললেন, জায়গাটা খারাপ। ভালো করে দেখতে হবে।'
অন্য দর্শনার্থীদের ঠেলা খেয়ে তিনজনকে সরে আসতে হল। একপাশের চাতালে বসে শচিন জিগ্যেস করলে, 'কী হয়?'
'যন্ত্রণা হয়। মাঝে মাঝে মাথাটা মনে হয় চুরমার হয়ে যাচ্ছে। চোখেও যেন কম দেখছি আজকাল। কান দুটোও কেমন হয়ে যাচ্ছে। আমি বেশি দিন বাঁচব না গো। তোমাকে অনেকদিন জ্বালিয়েছি, এইবার তোমার ছুটি। আবার যদি বিয়ে করো, একটু দেখে শুনে কোরো, শুভাটাকে যেন যত্ন করে।'
মায়ের কোলে মুখ গুঁজে শুভা ফ্যাঁস-ফ্যাঁস করে উঠল। শচিন চুপ। ভেতরটা বড় নাড়া খেয়েছে।
রাত নিঝুম। শচিন মেটিরিয়া মেডিকা খুলে বসেছে। টিউমার, টিউমার। কত পাতায়। হোমিওপ্যাথিতে টিউমার সারে। বইয়ের ভেতর থেকে একটা কাগজ বেরোল। অনেকদিন আগে খবরের কাগজে দেবে বলে রাগ করে একটা বিজ্ঞাপন লিখেছিল।
স্বামী চাই
মধ্যবয়সী বিবাহিতা মহিলার জন্য পার্টটাইম স্বামী চাই।
দুপুরে বিকেলে প্রেম করতে হবে, তোয়াজ করতে হবে, বেড়াতে নিয়ে যেতে হবে। সব খরচ আসল স্বামীর। এমনকি অবাঞ্ছিত পিতৃত্বের দায়িত্ব। লিখুন বক্স নং...
শচিন কাগজটা টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে জানালা দিয়ে উড়িয়ে দিল। অন্ধকারে সাদা সাদা কাগজের টুকরো হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে উড়ছে। আলো পড়ে কোনওটা চিকচিক করছে। যেন অজস্র বাদুলে পোকা।
দেওয়ালের ব্র্যাকেটে মা কালীর সিঁদুর মাখা ছবি। মায়ের পায়ের তলায় কালীঘাট থেকে আনা প্রসাদী জবা ফুল জিভের মতো লকলক করছে। সবাই ঘুমোচ্ছে। শচিন একা জেগে। কেমন যেন ভয় ভয় করছে। তোমার সংহারের রূপ আমি আর দেখতে চাই না।
অনেক অনেক দিন আগে শচিন একটা গল্প পড়েছিল 'স্রোতের ফুল'। সেই গল্পের সঙ্গে একটা ছবিও ছিল। নির্জন নদীর ঘাটে একটি বালিকা একের পর এক জলে ফুল ভাসিয়ে চলেছে। গল্পটা তার এখনও মনে আছে। অনেকে বলেন, ঈশ্বর এক মহান শিশু, বসে আছেন বিরাট সিন্ধুর তীরে আপন মনে। একটি একটি করে জীবনের ফুল ভাসিয়ে চলেছেন। ভাসতে ভাসতে সুদূরে চলেছে, কখনও একটি, কখনও পাশাপাশি দুটি তিনটি। এইভাবে চলতে চলতে স্রোতের টানে আবার একা। মিলন, বিচ্ছেদ, সঙ্গ, নি:সঙ্গ সবই স্রোতের খেলা। অলকার জন্যে অসম্ভব করুণায় শচিনের মনটা কানায় কানায় ভরে গেল। একটা জীবন এসেছিল আর একটা জীবনের সঙ্গে মিলতে। একটু স্নেহ ভালোবাসা, একটু নির্ভরতা, এ আর এমন কী ধনদৌলত যা দেওয়া যায় না। কী তুচ্ছ ভাত, ডাল, তরকারির স্বাদ বিস্বাদ নিয়ে কলহ! কীসেরই বা অহঙ্কার!
বই বন্ধ করে শচিন বিছানায় গেল। অলকার ব্রহ্মতালুর ফুলো জায়গায় একটা আঙুল রাখল। অলকা খুব ঘুমোচ্ছে। বাইরে তো বেরোয় না, ঘোরাঘুরিতে খুবই ক্লান্ত। অলকা ঘুমোলেও টিউমারটা ঠিকই জেগে আছে। দেওয়াল ঘড়ির টিকটিকের সঙ্গে সমান তালে দপ দপ করে চলেছে। আমি বাড়ছি, আমি বাড়ছি। কী বলতে চায়? তোয়াজে সারতেও পারি আবার মরতেও পারি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন