সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলুম। জেতার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না। ফলাফল যখন বেরল, শুধু আমি নয়, আমার হয়ে যারা খাটাখাটি করেছিল তারাও অবাক। তাদের অবশ্য বিশেষ কিছুই করতে হয়নি। দেওয়ালে হাজারখানেক পোস্টার সেঁটেছিল, আর দিনসাতেক একটা সাইকেল-রিকশা ভাড়া করে, ভাঙা মাইক নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরেছিল, জিতেন চক্রবর্তীকে ভোট দিন। মাইকটার আবার নিজস্ব কিছু বক্তব্য ছিল। সব সময়েই একটা সি সি আওয়াজ করত, মাঝে মাঝে আবার ধমক-ধামকও দিত। কাকে ভোট দিতে বলেছে, তিনি কোন দলের, সে দল জনসাধারণের জন্য কী করেছে বা করতে চায়, কিছুই বোঝা যেত না। আর সেই কারণেই আমাকে দুর্বোধ্য কবিতা ভেবে সকলে ভোট দিয়ে এলেন। সবাই ভাবলেন, জেনে ঠকার চেয়ে না জেনে ঠকা অনেক ভালো। তা ছাড়া জনপ্রতিনিধি হল মেয়ে মানুষের মতো। মানুষ সবসময় নতুন নতুন জিনিস চায়। ঘরেরটিকে ছেড়ে পরের পেছনে দৌড়োয়।
যাক আমি এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, এম. এল. এ.। আমার সার্পোটাররা দুশো চকোলেট বোমা এনে দড়াদ্দম ফাটাতে শুরু করে দিল। পাড়ার দুই হার্টের রুগি, আর ক্যানসারের রুগি আছেন। এখন-তখন অবস্থা। সাপোর্টারদের ডেকে বললুম, এ তোমরা কী করছ ভাই, পাঁচজনের অসুবিধা করে এ তোমাদের কী আনন্দ।
হেড সার্পোটার বললে, আপনি চুপ করে থাকুন জিতুদা। একটাও কথা বলবেন না। মনে করুন, আপনার মৃত্যু হয়েছে। আপনি এখন আমাদের সম্পত্তি। লোকের সুবিধে করার জন্যে কেউ এম. এল. এ. কি মন্ত্রী হয়! ছিলেন স্কুল মাস্টার কিছুই জানেন না। অনেক কিছু জানার আর শেখার আছে। বসুন চুপ করে। ইটখোলার মালিক নগেনের লরিটা এসে গেলেই, আপনার গলায় ফুলের মালা ঝুলিয়ে, কপালে চন্দন লেপে আমরা বিজয় মিছিল বের করব। আজ রাতেই গোটা দুয়েককে মায়ের ভোগে পাঠাব।
মায়ের ভোগে মানে?
আপনার মতো সেকেলে লোক নিয়ে আমাদের মহাজ্বালা। কিছুই জানেন না, এম. এল. এ হয়ে বসলেন। মায়ের ভোগ মানে, কেটে কুচিকুচি করে জলে ভাসিয়ে দেওয়া।
আমরা মার্ডার বলি না। বলি লাশ ফেলে দেওয়া।
সে কী? লাশ? লাশ ফেলে দেবে কেন?
লাশ ফেলায় আমরা ভীষণ পেছিয়ে আছি। নির্বাচনের আগে একটাকে চেষ্টা করা হয়েছিল, সে ব্যাটার অখণ্ড পরমায়ু। বেঁচে উঠে, আমাদের রেকর্ড নষ্ট করে দিলে। অফসাইডের গোলের মতো, হয়েও হল না। জেনে রাখুন জিতুদা, লাশের হিসাবেই পার্টির পোজিশন আর স্ট্রেংথ। রাজনীতিতে দাদা বোষ্টুমের স্থান নেই। কাপালিক হতে হবে, নাগাসন্ন্যাসী হতে হবে। নৃমুণ্ডমালিনী হতে হবে।
বেশ বুঝলাম, আমি আমার হাতের বাইরে চলে গেছি। যেভাবে নাচাবে সেইভাবে নাচতে হবে।
এ পাড়ার সবচেয়ে কুখ্যাত চোর বিধুশেখর দেখা করতে এলেন। হাতে ফুলের তোড়া, মিষ্টির বাক্স। মাল খেয়ে চোখের কোল দুটো ব্যাঙের মতো হয়ে গেছে। লোকটাকে দেখেই আমার হাড় পিত্তি জ্বলে উঠল। বিধু আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছেন। অমায়িক হেসে বললেন,
দাদা, লাইনে নতুন এসেছ, তাই একটু কষ্ট হচ্ছে। বেশ্যার প্রথম রাতের মতো। কাপড় খুলতে লজ্জা করে। জোর করে খুলে দিতে হয়। তারপর বলতেও হয় না! নিজেই খুলে দেয়।
লোকটার কথা শুনে মাথায় আগুন জ্বলে গেল। ব্যাটা বলে কী? আঙুল তুলে বললুম, গেট আউট।
লোকটা নড়ল না। বসেই রইল, ফোলা ফোলা মুখে ভাগাড়ের হাসি। আমাদের লম্ভঝম্ভ শেষ হতেই বললে, প্রথম রাতে ওরাও ওই রকমই করে। করলেও কী নিস্তার পায় রে দাদা। মাসি আছে না। ভেটারেন মাসিরা জানে কী করে কাপড় খোলাতে হয়। কী করে পরপুরুষের সঙ্গে শোয়াতে হয়। প্রথম রাতের খদ্দেরদের একটু বেশি চার্জ দিতে হয়। বাধ্যা একটা বাড়তি আনন্দ দাদা। আমি তাই তৈরি হয়ে এসেছি। মিষ্টির বাক্সের তলায় একটা খাম আছে। ওটা তোমার নয়, তোমার গৃহিনীর। শুনলুম গয়না-টয়না বেচেছিলে। দেখেছ, সব খবর রাখি। আমরা হলুম এই জামানার নাক, মুখ, চোখ, কান। পারো তো, একে একে উদ্ধার করে দিও।
খুব রেগে গিয়ে বলুলম, দেশের সেবা করবার জন্যে আমি, আমার পরিবার, সবাই বিবস্ত্র হতে রাজি আছি। জানেন আমার পিতামহ স্বদেশি করতেন।
বিধু ভিলেনের মতো হেসে বললেন, বালক! খোকা! খোকাবাবু, তোমার দেশ কোথায়, যে সেবা করবে?
কেন? যাঁরা আমায় ভোট দিয়েছেন, তাঁরাই আমার দেশ, তাঁদেরই আমি সেবা করব। জীবন দিয়ে।
আহা, আমার মানিক রে! বিদ্যাসাগরের প্রথমভাগের ভাষায় কথা বলছে রে। আজকাল আর একা দেশ সেবা করা যায় না চাঁদু। সেই স্বদেশিযুগ আর নেই। সেবা করে পার্টি। পার্টির দেশ অনেক ছোট। সাপোর্টাররাই হল দেশ। তোমার চামচারাই হল দেশ। তোমার স্ত্রী পুত্রই হল দেশ। তুমি নিজে হলে একটি দেশ। বেড়ালের ভাগ্যে শিকে একবার ছিঁড়েছে। এইবার বুদ্ধিমানের মতো চামচে কালচার করো, নিজের একটা কিংডাম তৈরি করো। খোকামি করে আখের নষ্ট কোরো না। জেনে রাখো তুমি হলে আমাদের শিখণ্ডী।
বিধুশেখর চলে গেলেন।
সত্যি কথা বলতে কি, আমার আনন্দ-টানন্দ সব চলে গেল। বাইরে নগেনের ইট খোলার লরি থামার শব্দ হল। তাসা বাজছে চড়াক চড়াক বোলে। মালা এসেছে। আবীর এসেছে। এক হোটেলওয়ালা পেটি পেটি কোল্ড ড্রিংকস পাঠিয়েছে। ব্যাটা একটা বার লাইসেন্স চায়। একটু পরে ওরা আমাকে নিয়ে বিজয় মিছিলে বেরোবে। তবু আমি নিরানন্দ। মনে হচ্ছে সত্যিই আমি এক সেই, বসে আছি সেজেগুজে একা ঘরে। মাসি গেছে প্রথম রাতের খদ্দের ধরতে দরজায় শিকল তুলে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন