বিশ্বাস

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পৃথিবীতে বিশ্বাসের মৃত্যু হয়েছে। বিশ্বাস করেছ কি মরেছ। একান্ত পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যেও বিশ্বাস নেই। ভাই ভাইকে বিশ্বাস করে না। পিতা পুত্রদের বিশ্বাস করে না। স্বামী স্ত্রীকে বিশ্বাস করেন না, স্ত্রী স্বামীকে। যানবাহনে সহযাত্রীকে বিশ্বাস নেই। নির্জন পথে এক পথচারী আর এক পথচারীকে বিশ্বাস করতে পারে না। একটু বেশি রাতে কোনও ট্যাকসিতে কোনও মহিলা একা আরোহী হতে কখনই সাহসী হবেন না। আবার গভীর রাতে কোনও ট্যাকসি চালক পেছনে তিনজন আরোহী নিতে বাধ্য হলেও, প্রতি মুহূর্তে তাঁর আতঙ্ক, গলায় ফাঁস বা পিঠে ছুরি পড়লেই হল।

দুই বন্ধু এক বান্ধবীকে নিয়ে হোটেলে উঠেছে। ছুটি, বেড়ানো, আনন্দ। তারা চলে গেল দ্যাখা গেল ঘরের খাটের তলায় বস্তাবন্দি একজনের মৃতদেহ। প্রেমের ত্রিভুজের সহজ সরলীকরণ। একটি ভুজ ছিন্ন বেওয়ারিশ লাশ। অপরাধী হয়তো ধরা পড়বে না। জীবন স্রোতে মিশে যাবে। কোথাও পাতবে প্রেমের সংসার। যে ছুরিতে প্রতিদ্বন্দ্বীর শ্বাসনালি কেটেছিল সেই ছুরিতেই মুরগির গলা কেটে কারি বানিয়ে খাবে। সেই মুহূর্তে কোনও প্রেতাত্মা তাদের খাওয়ার টেবিলে এসে বসবে না।

সমুদ্রসৈকতে ঘর ভাড়া নিয়েছিল এক তরুণ দম্পতি। মালিক দেখলেন, আহা! প্রেমের ছবি। হাসি হাসি মুখ। পরস্পর গাত্র সংলগ্ন। সন্দেহ হয়নি এতটুকু। তিন দিন পরে দ্যাখা গেল, ছেলেটি মেয়েটিকে খাটের মশারি টাঙাবার দণ্ডটির সঙ্গে বেশ করে বেঁধেছে। সম্পূর্ণ নগ্ন। গলায় নলিটি কেটে দিয়ে সরে পড়েছে। মেয়েটির চিৎকার করার ক্ষমতা ছিল না। কোনওরকমে নিজেকে মুক্ত করে বাইরে ছুটে বেরোতেও পারবে না। কারণ নগ্ন। রক্তক্ষরণে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই মৃত্যু। কত স্বপ্নের জাল বুনেছিল প্রেমিক। সমুদ্রসৈকতে তারা ভরা আকাশের তলায় হাতে হাত রেখে ঢেউ ভাঙা দেখেছিল। যাকে বিশ্বাস করে ঘর ছেড়েছিল, সে পৃথিবী ছাড়া করে দেবে, এ কি সে স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল।

কটা টাকার জন্যে বাপকে মেরে ছেলে আর তার স্যাঙাত বাপেরই গাড়িতে করে লাশ পাচার করতে যাচ্ছিল। 'হাইওয়ে পেট্রল' হঠাৎ কী সন্দেহে তাড়া করে ধরে ফেলল। পাওয়া গেল লাশ, টাকা, ব্যাবসার দরকারি কাগজপত্র, শেয়ার।

তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে বলো তো। পৃথিবীতে এসেছি, হয়তো আবার আসতে হবে। কিন্তু জায়গাটাতো বিশেষ সুবিধের নয়। কুমীর, হাঙরে ভরা। মাথার ওপর শকুনের চক্কর। পিতা, মাতাও তো ঘাতক হতে পারে। কত নবজাতকই তো ডাস্টবিনে পরিত্যক্ত হয়। কত শিশুকেই তো বিদেশে পাচার করে দেওয়া হয়। নিজের কন্যাকে বিক্রি করা হয় দেহ ব্যাবসার দালালদের কাছে। বিদেশে চাকরির লোভ দেখিয়ে যুবতীদের পাচার করা হয়, বিদেশে নিগৃহিতা হওয়ার জন্যে।

এসব চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত। এ ছাড়া যা আছে ঘরে ঘরে স্বাভাবিক নির্যাতন। রাগি মা শাসনের নামে তার শিশু সন্তানটিকে বেধড়ক পিটিয়ে রক্তাক্ত করছে। স্ত্রী স্বামীকে গেলাস ছুড়ে মারছে, অথবা স্বামী স্ত্রীকে পেটাচ্ছে। স্ত্রী যেহেতু অসহায়, দিনের পর দিন নীরবে নির্যাতন সহ্য করছে এবং পর্যায়ক্রমে ওই পুরুষটির সন্তানও ধারণ করছে। কেয়া বাত।

করুণ, বীভৎস, শান্ত, সুন্দর, মধুর, বাৎসল্য, রুদ্র, কঠোর সবরকম রসে সৃষ্টি ভরে আছে। সেই কারণেই পৃথিবীতে এত মজা। সব পাশাপাশি। এঘরে স্বামীর শিয়রে জেগে আছে স্ত্রী। আরোগ্য কামনায় সেবা আর অবিরল প্রার্থনা। ওঘরে আর এক স্ত্রী বিশ্বাসী স্বামীকে দুধের সঙ্গে আর্সেনিক মিশিয়ে সোহাগ করে খাওয়াচ্ছে, এর হাতের ছুরিতে প্রাণ মরে, সার্জেনের হাতের ছুরিতে প্রাণ বাঁচে।

একজন বললেন ব্যাপারটা বুঝলেন না। পৃথিবীতে যিনি তিল সৃষ্টি করেছেন, তিনি তালও করেছেন আবার বিরাট পর্বত তাঁরই সৃষ্টি। ছুঁচোর পাশে হাতি। একই টিনের চালে বেড়াল আর পায়রা। একই অরণ্যে বাঘ আর হরিণ। তাহলে কী হবে? কী পাওয়া গেল? একটি মাত্র শব্দ, স্বভাব। শিক্ষা, দীক্ষা, বক্তৃতা, শাসন, প্রহার, শাস্তি, কিছুই কিছু নয়। চোর চুরি করবে, সাধু সেবা করবেন, খুনি খুন করবে, বিশ্বস্ত প্রাণ দেবে, কোনও সন্তান পিতামাতার সেবা করবে, কোনও সন্তান স্ত্রীর কথায় ওঠবোস করবে।

যে যে-ঘরের মানুষ, সে সেই ঘরেই থাকবে। ঘর চিনতে ভুল হলেই বিপদ। আর সেই ভুল অহরহই হবে তা না হলে নাটক জমবে কী করে। পৃথিবীর নাটমঞ্চে অনাদিকালের পালা চলেছে, সেই পালায় ঐতিহাসিক খুঁজছেন ইতিহাস, দার্শনিক খুঁজছেন দর্শন, রাজনীতিক খুঁজছেন তত্ব, লেখক খুঁজছেন গল্প।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%