সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অরিন্দমের হঠাৎ মনে হল শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে। মাথাটা ভার ভার। রগের পাশের শিরা দুটো টিপটিপ করছে। অফিসে তেমন কোন কাজ ছিল না। অরিন্দম ভাবলে তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম করবে। চা-টা খাবে। একটু গল্প-গুজব করবে, রেডিয়ো শুনবে। বই পড়বে। বউয়ের সঙ্গে গল্প-টল্প করবে। অর্থাৎ বিকেল আর সন্ধেটা একটু মজায় কাটবে। শীতের সময়টায় অফিসের বড় কর্তারা সাধারণত টুর কিংবা নানা ধরনের পার্টি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সুতরাং তিনটে নাগাদ অরিন্দম তার দপ্তর বন্ধ করে উঠে পড়ল।
অফিসপাড়ার বিশাল বিশাল বাড়ির আড়ালে বিদায়ী সূর্য তখন মুখ লুকিয়েছে। রাস্তায় ছায়া নামলেও বড় বড় গাছের মাথায় তখন সূর্য মাখামাখি হয়ে আছে। বেশ ভালো লাগছিল অরিন্দমের। পশ্চিম থেকে একটা হিমেল হাওয়ায় রাতে যে আরও শীত পড়বে তারই জানান দিচ্ছিল। অরিন্দম চাদরটাকে ভালো করে গলায় জড়িয়ে নিল। বলা যায় না ঠান্ডা লেগে জ্বর-টর হয়ে গেলেই মুশকিল।
বাসে বা ট্রামে তেমন ভিড় নেই। মিনিবাস একের পর এক লাইনে দাঁড়াচ্ছে, গন্তব্যস্থল হেঁকে যাত্রী জড়ো করছে। অরিন্দম একটু আরামে এবং তাড়াতাড়ি যাওয়ার জন্য এক টাকা তিরিশ পয়সার একটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলল। মিনি বাসে উঠে একেবারে শেষের দিকে একটা কোণের আসনে বসে পড়ল। অরিন্দম একটু শৌখিন মানুষ। সাজে পোশাকে ছিমছাম পরিপাটি। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারেও বেশ ভোজলবিলাসী।
বাড়ির কাছাকাছি বাস থেকে নেমে তার মনে হল একটু মাংস কিনে নিলে মন্দ হয় না। সকালের খাওয়াটা তেমন জুতসই হয়নি। রাতের দিকে হিটারে প্রেসার কুকার চাপিয়ে সে নিজেই খাসা একটা স্টু বানাবে। গাজর থাকবে, লম্বা লম্বা আলু, বিনস, বাঁধাকপি আর নামাবার সময় ছোট এলাচ। আজকের রাতটা আহারে, বিশ্রামে, গল্পে-গানে একেবারে আরব্য রজনীর মতো হয়ে উঠবে।
অরিন্দমের মাংস কেনার একটা আলাদা ধরন আছে। বিশেষ কোনও একটি অংশ থেকে সে একেবারে বেশ খানিকটা তুলে নেয়। তারপর নিজের সুবিধেমতো সহজ করে নিজস্ব ঢংয়ে রাঁধে। যে কোনও দোকানে অরিন্দমের বেশ খাতির। দরদস্তুরের বালাই নেই। সেরা জিনিস চাই। পরিমাণে বেশি চাই।
ব্যাগ ছিল না। রুমালেই মাংসের টুকরোটা বেঁধে নিয়ে, এক পাউন্ড রুটি বগলদাবা করে অরিন্দম একটা সাইকেল রিকশায় উঠে বসল। শরীরটা আর তেমন খারাপ লাগছে না। মাথায় নানা পরিকল্পনার ভিড়। প্রথমত অপর্ণাকে চমকে দেবে, দ্বিতীয়ত জমিয়ে রাঁধবে, তারপর সকাল সকাল বিছানায় আরাম করে শুয়ে শুয়ে হেডলি চেজ পড়বে!
রিকশার ভাড়া মিটিয়ে বাড়ি ঢুকে অরিন্দম অবাক হয়ে গল। সদর দরজায় বিশাল একটা তালা ঝুলছে, কেউ কোথাও নেই। দোর তালা সব বন্ধ। সামনের ফ্লাওয়ার বেডে নি:সঙ্গ কয়েকটা কসমস উত্তুরে শীতের হাওয়ায় কাঁপছে।
অপর্ণা কোথায় গেল, কোথায় যেতে পারে? না বলে বিনা অনুমতিতে তো সে কোথাও যায় না। আশেপাশে কোনও বাড়িতে গেছে হয়তো সময় কাটছিল না বলে। নাকি কোনও কেনাকাটায়...। কিন্তু কেনার কী থাকতে পারে? বাড়িতে সব কিছুই তো মজুত। অরিন্দম তো কৃপণ নয়। সব কিছুই বেশি বেশি কিনে রাখে। আশ্চর্য ঘটনা। অবশ্য কোনদিনই এতো তাড়াতাড়ি ফেরে না! তাহলে রোজই কি অপর্ণা এইভাবে তালা ঝুলিয়ে দুপুরের অবসরের সদ্ব্যবহার করে? সিনেমায় যায়? না কি আইবুড়ো বেলার তাঁর বন্ধু-বান্ধবের বাড়ি...
'তুমি ভীষণ সুড়সুড়ি দাও', অপর্ণার শরীরটা এঁকে বেঁকে গেল। বিছানার চাদরে ভাঁজ পড়ল।
কেন, সুড়সুড়ি তোমার ভালো লাগে না, তোমার কত্তা বুঝি সুড়সুড়ি দিতে জানে না! পার্থ লোমশ বুকে অপর্ণার মুখটা চেপে ধরে তার শরীরের এখানে ওখানে যেখানে সেখানে খুশিমতো হাত বোলাচ্ছিল। মধ্য কলকাতার নির্জন একটা ফ্ল্যাটবাড়ির চারদিকে ভারী পর্দা ঝোলানো। বন্ধ দরজা, প্রায় অন্ধকার একটা ঘরে তখন পরকীয়া প্রেমের লীলা চলছে।
নায়ক পার্থ একটা বিলিতি ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ। অপর্ণার এক সময়কার সহপাঠী, প্রেমিক। ছাত্র জীবনে বহুদিন তারা পাশাপাশি ইডেনে, আউটরামে, বোটানিকসে কাটিয়েছে। অপর্ণা আদর খেতে খেতে অনেকটা বেড়ালের মতো ঘড়ঘড়ে গলায় বলল, কী করছ, কামড়াচ্ছ কেন? দাগ বসে যাচ্ছে না! আমার ভদ্রলোকটি দেখলে কী হবে বলো তো!
—কী আবার হবে? তুমি বলে দিও অ্যালার্জি হয়েছে।
—ঠিক বলেছ। লোকটা একটা বুদ্ধু টাইপের। ঠিক বিশ্বাস করে নিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ওষুধ কিনে আনবে।
—বিয়ের আগে কখনও মেয়েছেলে দেখেনি বোধহয়। বলতে বলতে পার্থ হো হো করে হাসল।
অপর্ণা একটু ভেবে বলল, 'যদি আমার মাতৃত্ব দেখা দেয়!'
পার্থ নিশ্চিন্ত মনে বলল, 'তাতে কী? তোমার কর্তার ঘাড়ে দোষ চাপবে। যাকে বলে উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে।'
'এবার আমি যাই পার্থ। ওঁর আসার সময় হয়েছে। গুড হাউস ওয়াইফের কর্তব্য এবার করতে হবে।'
পার্থর ঘরের টাইমিং ঘড়িতে ঢং ঢং করে ছটা বাজল।
অপর্ণা গেট খুলে দেখল, একটা কালো কুকুর বড় একখণ্ড মাংসের টুকরো আয়েস করে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। কিছুদূরে পড়ে আছে ছিন্নভিন্ন রক্তমাখা একটা রুমাল। ইস, কার মাংস, কীসের মাংস? কুকুরটা ভীষণ আনসিভিলাইজড হয়ে গেছে তো। অপর্ণা জোরে ধমক দিল, রেকস, কী হচ্ছে কী? খেতে পাস না? কোথা থেকে মরা জন্তুর মাংস এনেছিস?
অপর্ণা একটা গাছের ডাল ভেঙে রেকসকে শাসন করতে গেল। কুকুর কিন্তু শুনল না, রাগে একটা চাপা গর্জন করে তার অবাধ্যতা প্রকাশ করল। অপর্ণা গাছের ডাল দিয়ে রক্তমাখা ছেঁড়া রুমালটা কায়দা করে পাঁচিল টপকে পাশের মাঠে ফেলে দিল। একবারও দেখল না রুমালটার কোণে তারই হাতের কাজকরা সুতো দিয়ে লেখা আছে একটি ছোট্ট 'এ'।
গভীর রাত। অরিন্দম আর অপর্ণা পাশাপাশি শুয়ে আছে। অপর্ণা ভাবছে রেকসটাকে কাল থেকে শাস্তি দিতে হবে। দুদিন খাওয়া বন্ধ করতে হবে। রাস্তা থেকে মাংসের টুকরো মুখে করে এনে খেয়েছে। চাবুক-টাবুক মারতে হবে। আর অরিন্দম ভাবছে কিছুতেই আজ আর অপর্ণাকে স্পর্শ করবে না। অপর্ণার গোড়ালি ফেটেছে। ল্যানোলিন ক্রিম এনেছিল, নিজে হাতে মাখিয়ে দেবে বলে। তার পর ধীরে ধীরে ওপর দিকে উঠবে। না, সেসব কিছুই সে আজ করবে না।
আর একটা ফ্ল্যাটে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে পার্থ। মুখে তার মৃদু হাসি। মেয়েরা কী বোকা, কী মুর্খ। আমি ডন জুয়ান, বিয়ের কী প্রয়োজন, মাংস তো সব দোকানেই ঝোলে, সব রকমের মাংস। আগলি রাং, পিছলি রাং, শিনা, গর্দান।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন