সুন্দরী লেন

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘এত রাত হল?'

'রোজই তোমাকে এক কৈফিয়ত দিতে আমার ভালো লাগে না। আমি পারব না দিতে।'

শেষ কথাটা যতটা সম্ভব কর্কশ গলায় বললে শিখা। পাশের বাড়ির ঘড়িতে রাত বারোটা বাজছে। সারা পাড়া নিস্তব্ধ। অন্ধকারে এর ওর রকে শুয়ে থাকা গোটা কয়েক ধামসা কুকুর মাঝে মাঝে গুমরে উঠছে। অন্ধকারের শূন্যতায় সময় সময় ওরা প্রেতের উপস্থিতি টের পায়।

উত্তর কলকাতার বুকের ওপর পড়ে আছে এক চিলতে লাজুক গলি। মোটেই সুন্দর নয়। তবু কোথায় এক জায়গায় রসিকতা করে নাম লিখে রাখা হয়েছে সুন্দরী লেন। বাবু কলকাতার রমরমার দিনে এই গলি যেখানে বাঁক নিয়ে বিডন স্ট্রিটে পড়ছে, সেই বাঁকের মুখে বিশাল এক বাড়ি ছিল। সেই বাড়িতে বসবাস করতেন সুন্দরীদাসী নামে এক বদান্য মহিলা। দান, ধ্যান, পূজাপাঠ, হরিনাম সংকীর্তন, মন্দির প্রতিষ্ঠা, দরিদ্রসেবা ইত্যাদি পুণ্যকর্মের অক্ষয় দ্যুতি রেখে শতাব্দীর প্রথম দিকেই বিদায় নিয়ে চলে গেছেন। প্রথম জীবনে সেকালে কোনও এক উদার বাবুর রক্ষিতা ছিলেন। তিনিই তাঁর প্রাণের মানুষটিকে এই ইমারত উপহার দিয়েছিলেন। তখন এই অঞ্চলে এত বাড়িঘর ছিল না। গোটা তিন বাগান বাড়ি ছিল। সেসব এখন আর নেই। মাঠময়দান পরে খুপরি খুপরি বাড়ি হয়েছে। গায়ে গায়ে। আলো ঢোকে না। বাতাস ঢোকে না। সেই বিশাল ইমারতের লাগোয়া রাধামাধবের মন্দিরটি আজও আছে। টিংটিং করে আরতি হয়। সেবিকা মধ্যবয়সী একজন মহিলা। মহিলার অতীত নেই। বর্তমানে রাধামাধবের পদাশ্রিতা। এই মন্দিরের এক পাশেই সেবিকার বসবাসের ব্যবস্থা।

শিখা প্রথমে ডান পা তুলে ডান পায়ের উঁচু হিল জুতো উঁচু র‌্যাকে রাখল। একটা চেয়ারে বসে রুদ্র শিখাকে লক্ষ করছে। বাঁ পায়ের ওপর ভর রেখে বাঁ হাতে ঘরের দরজার ফ্রেম ধরে শরীরের টাল সামলাচ্ছে। ডান পা'টা উঁচুতে উঠে গেছে। ধবধবে সাদা পা বেরিয়ে পড়েছে। সুন্দর সুগঠিত পা, যে পা বাজনার তালে তালে রাতের পর রাত মঞ্চে নাচে। পায়ের ওপর যে দেহকাণ্ডটি সেটি নানা ছন্দে দোলে, দোমড়ায় মোচড়ায়। ডান পা নামিয়ে শিখা বাঁ পা তুলল জুতো রাখার জন্যে। মেঝেতে শক্ত কাঠের গোড়ালির খটখট শব্দ হল! আজ চার পাঁচ বছর হল এই দেহ আর এই মনের সঙ্গে রুদ্র ভীষণ পরিচিত। তবু শিখার এইভাবে জুতো রাখার ভঙ্গিতে রুদ্র কাবু হয়ে গেল। বুকের আঁচল খসে গেছে একপাশে। একটা দিক তোলা থাকায় পাতলা ব্লাউজের আবরণ ভেদ করে একপাশের বুক বিদ্রোহী হতে চাইছে। ভরাট কাঁধে টান টান হয়ে আছে ভেতরের জামার ফিতে। রুদ্র জানে শরীরটাকে শিখা খুব যত্নে রাখে। শরীরটাই তার নেশা। রোজ সকালে ঘণ্টা দুই ব্যায়াম করে। আসন, ফ্রি হ্যান্ড, দোমড়ানো, মোচড়ানো। মাঝে মাঝে কোমর আর নিতম্বের মাপ নেয়, ওজন নেয়। মুখের জন্যে আবার বিশেষ পরিচর্যার ব্যবস্থা। গরম জল, ঠান্ডা জল, গোলাপ জল, নানারকমের প্রলেপ। হরেকরকম দেশি-বিদেশি বইয়ের দামি দামি উপদেশ।

শিখা ঘরে এসে টেবিলের সামনে আয়নার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতে দেখতে কান থেকে পাথরের দুল খুলছে একে একে। মুখটা একবার ডান দিকে ফিরল, একবার বাঁ দিকে। রুদ্র একই মুখ দুটো দেখছে। একবার আসল মুখ আর আয়নায় তার প্রতিফলন। একটা সোজা দিক আর একটা উলটো দিক। ধারালো সুন্দর মুখ। টানা টানা চোখ। সবসময় একটু রাগি রাগি। যখন হাসে তখনও যেন উদাস ভাব। ভেতরে এমন একটা কঠিন প্রাণী আছে যে ভাঙে না, গলে না, টলে না। সমর্পণ জানে না। নিবেদন জানে না। শিখার দেহের ওপর সব কিছু খেলা করে এক সময় ক্লান্ত হয়ে তারা নিজেরাই সরে পড়ে। উদাসীনতা যেন শিখার হাত ধরা। রুদ্র লক্ষ করেছে, একমাত্র শিখা যখন নিজেকে নিয়ে, নিজের শরীরকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তখন তার মুখে কোমল ছায়া ঘন হয়ে আসে। দৃষ্টিতে প্রেম আসে। হাতের আঙুল দেখছে। পায়ের গোড়ালিতে পাথর ঘষছে। বুকের খাঁজে তোয়ালে চেপে ধরছে। চুল উঁচু করে ঘাড় মুছছে। চোখে সরু করে কাজল টানছে। আড়াল থেকে দেখেছে রুদ্র, তখন তাকে প্রেমিক বলেই মনে হয়। চোখের মণিতে হাসির ঝিলিক।

শিখা ঘরে এসেছে। গুনগুন করে গান গাইছে। ঘরের বাতাসে ভাসছে দামি বিলিতি সুবাস। শিখাকে দেখে রুদ্রর মনে হচ্ছে মাইকেল এঞ্জেলোর তৈরি প্লাস্টার অফ প্যারিসের একটি ভাস্কর্য নীল সিল্কের শাড়ি পরে এই মধ্যরাতে উত্তর কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠেছে। রুদ্রর হিংসে হচ্ছে। ঘৃণা হচ্ছে। আবার ভীষণ ভাবে কাছে পেতেও ইচ্ছে করছে। বিয়ের আগে আর বিয়ের পরে যেভাবে পেয়েছিল কয়েক বছর। এখন আর উপায় নেই। দিন বদলে গেছে। প্রতিযোগিতা বেড়ে গেছে। অনেক বড় উমেদার জুটে গেছে এখন। আম কাটলে বা কাঁঠাল ছাড়ালে যেভাবে নীল নীল ডুমো ডুমো মাছি ছেঁকে ধরে, শিখার এখন সেই অবস্থা।

রুদ্র জিগ্যেস করলে, 'আজ কে ছিল সঙ্গে?'

শিখার সংক্ষিপ্ত উত্তর, 'কেউ একজন ছিল নিশ্চয়।'

'ভালোভাবে কথার উত্তর দিতে পারো না?'

'না পারি না।'

'দিনকে দিন খুব বেড়ে যাচ্ছ তুমি?'

'দিন দিন সব কিছুই বাড়ে। গাছ বাড়ে। বয়েস বাড়ে। লোক বাড়ে।'

'আজ খেয়েচ?'

'খেয়েচি।'

'কতটা?'

'ঠিক ততটা যতটায় গা গরম হয়।'

রুদ্র চিৎকার করে উঠল, 'শিখা।'

শিখা ঠান্ডা গলায় বললে, 'ওঘরে যাও। আমি কাপড় ছাড়ব।'

'কেন, আমার সামনে লজ্জা করছে?'

'লজ্জা নয়। তোমাকে আনন্দ দেওয়ার সামান্যতম ইচ্ছা আমার নেই। তুমি পাশের ঘরে যাও।'

'যে হাজারখানেক দর্শকের সামনে উলঙ্গ হতে পারে সে আমার সামনেও পারবে।'

'মুখ সামলে কথা বলবে।'

'এতদিন হাত আর পা সামলে রেখেছিলুম, এবার সেটাও চলবে।'

'চালিয়ে দেখতে পারো।'

রুদ্র ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললে, 'চরিত্রহীন।'

'শিখা সঙ্গে সঙ্গে বললে, 'নপুংসক।'

*

একটা বড় ঘর, একটা বসার ঘর ছোট মতো, রান্নাঘর আর সে সঙ্গেই চৌকো মতো একটা জায়গা যেটাকে ইংরেজিতে ডাইনিং স্পেস বলে বাড়িওলা গৌরব বাড়াবার চেষ্টা করেছেন। বসার ঘরে তিনটে কোচ একটা সেন্টার টেবিল। টেবিলের তলায় দু'হাত বাই তিন হাত মাপের এক চিলতে কার্পেট। সংসারে শান্তি না থাক ঘর সাজাবার কেতায় যেন ত্রুটি না থাকে। আধুনিক জীবনের এই হল ধরন।

রুদ্র একটা কোচে বসে পা দুটো জোড়া করে সামনের সেন্টার টেবিলের ওপর টানটান করে ছড়িয়ে দিল। কী একটা ম্যাগাজিন ছিল নীচে মুখ থুবড়ে পড়ল। রুদ্র গ্রাহ্যই করল না। দু'কান দিয়ে উত্তাপ বেরোচ্ছে তার। শিখার আজকাল সুযোগ পেলেই পুরুষত্বের খোঁটা দেয়। ব্যঙ্গ করে পৌরুষ নিয়ে। এ এক নতুন কায়দা। অপদস্থ করার নতুন পদ্ধতি। মনস্তাত্বিক নিপীড়ন। এই একটা জায়গায় রুদ্র হেরে যায়। শিখার সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। প্রেমিক রুদ্র ডাকাত হতে পারে না। তার ভেতরে একটা মেয়েলি ভাব আছে। নরম, কোমল। কথা বলে ধীরে। মানুষের সঙ্গে অভদ্র আচরণ করতে পারে না। শিখা এক সময় তাকে ভালোবেসেছিল এই সব গুণের জন্যেই। বলত তোমার মুখটা কী মিষ্টি। চোখ দুটো কী সুন্দর। কোনও পাপ নেই। সেইসব দিন কোথায় চলে গেল। কত তাড়াতাড়ি সব বদলে গেল। দিনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনটাও কোথায় চলে যায়।

রুদ্র শুনতে পাচ্ছে শিখা বাথরুমে ঢুকেছে। জল পড়ার শব্দ হচ্ছে। তখন থেকেই কী একটা গান গাইছে গুনগুন করে। আজ ভীষণ ফুর্তিতে আছে। পয়সাওলা প্রাোডিউসার ধরেছে। মঞ্চ থেকে বাংলা ফিল্ম। বাংলা থেকে হিন্দি। স্বপ্ন দেখছে শিখা। টাকা থাকলে অনেককে স্বপ্ন দেখানো যায়। রুদ্রর পয়সা থাকলে রুদ্র দেখাতে পারত। তবে শিখাকে নয়, অন্য কাউকে। স্বামী-স্ত্রী, মা মেয়ে, বাপ ছেলে, পৃথিবীতে এই ধরনের কিছু সম্পর্ক আছে যার চেয়ে তিক্ত সম্পর্ক আর নেই। খুব কাছের অথচ গরলে ভরা!

শিখা বাথরুম থেকে বেরিয়েছে। ওপাশ থেকে বহুরকমের খুটখাট শব্দ ভেসে আসছে। শিখা ভুলেও একবার এ-ঘরে আসছে না। শোওয়ার ঘরের দরজা বন্ধের শব্দ হল। রুদ্র উঠে দাঁড়াল। অসহ্য। অসহনীয় ব্যাপার। ভেবেছে কী?

ঠেলতেই দরজা খুলে গেল। পায়ের পাতায় আর গোড়ালিতে ক্রিম ঘষছে শিখা। সংক্ষিপ্ত বেশবাস। অন্য সময় হলে, দু'বছর আগে হলেও রুদ্র কী করত বলা শক্ত। তবে ঘরের আলো হয়তো নিবে যেত। একটা হুটোপুটির শব্দ। মাঝে মাঝে খিল খিল হাসি। আদরের তিরস্কার—আ:, কী হচ্ছে।

শিখার এইসব ভাবভঙ্গি আর ছলাকলা তার আর ভালো লাগে না। যখন প্রেম ছিল, ভালোবাসা ছিল তখন শিখার সব কিছু ভালো লাগত। তার তাকানো, কথায় কথায় মাইরি বলা। আচমকা পিঠে চড় মারার অভ্যাস। রুদ্র হয়তো চিঠি লিখছে আচমকা এসে হাত নাড়িয়ে দিয়ে খিল খিল হাসি। পিঠের ওপর ঝুলে পড়ে কুট করে কান কামড়ে দেওয়া।

রুদ্র বললে, 'কী হল? খাওয়াদাওয়া হবে না?'

গুনগুন গানের ফাঁকে শিখা খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললে, 'আমার খাওয়া হয়ে গেছে।'

'অ, তোমার হলেই হয়ে গেল, আমার কী হবে?'

'খেয়ে নাও। মনুর মা তো সব চাপা দিয়েই রেখে গেছে।'

'সব তো ঠান্ডা জল।'

'গ্যাস আছে। জ্বেলে গরম করে নাও। তোমার তো পক্ষাঘাত হয়নি।'

'কীভাবে কথা বলছ শিখা?'

'তোমার সঙ্গে এর চেয়ে ভালোভাবে কথা বলা যায় না।'

'আমি এতই ঘৃণ্য।'

'অনেকটা কেঁচোর মতো।'

'তুমি কী চাইছ শিখা?'

'তোমার ভাষায় একটু বেশিরকম উড়তে চাইছি। হয়েছে? উত্তর পেয়েছ! যাও এখন নিজের জায়গায় যাও। আমাকে আর বিরক্ত করো না। আমার ঘুম পেয়েছে।'

শিখা মাথার ওপর দু'হাত তুলে শরীর মুচড়ে হাই তুলল। ইচ্ছে করে এমন একটা ভঙ্গি করল যাতে রুদ্রর শরীরে আগুন জ্বলে ওঠে।

শিখা আজকাল এইরকম করে। রুদ্র যাতে দগ্ধে দগ্ধে মরে। ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে যায়। অপমানে কুঁকড়ে থাকে। সেই দিনগুলোর কথা শিখার মন থেকে মুছে যাওয়া শক্ত। নিজের উন্নতির জন্যে, তরতর প্রাোমোশানের জন্যে রুদ্র শিখাকে বহুবার টোপ হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। অফিসের বড়কর্তাকে বাড়িতে ডেকে এনে কাজের অছিলায় নিজে সরে পড়ত। খুব সোজা হিসেব। কত নোংরামিই না শিখাকে সহ্য করতে হয়েছে। তখন বড় অসহায় ছিল। আজ আর সেদিন নেই। আজ সে ওই নীচ, নোংরা লোকটাকে লাথি মারতে পারে। নোংরা ব্যাধিতে ভুগছে। দেহের খিদে দিন দিন বাড়ছে। মেটাবার ক্ষমতা নেই। শয়তান। শয়তান এখন সতীপনার উপদেশ দিতে আসে। চাকরিবাকরি সব খুইয়ে বসে আছে। চারশো বিশ করে দু-একশো রোজগার করে। মাঝে মাঝে অপমানিত হয়, ঝাড় খায়। রুদ্রই তাকে খেলতে শিখিয়েছে। খেলাতে শিখিয়েছে। বহু পুরুষকেই সে খেলায়, রুদ্র তাদের মধ্যে একজন। আয়নার দিকে ঘুরে বসে শিখা বুকে পাউডার ছড়াতে লাগল। রুদ্র কুকুরের মতো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখুক। চেনে বাঁধা কুকুর। লোকটা এত বড় পাজি শিখাকে বিয়ের পর মা-বাবাকে ভুলে গেল। ছেড়ে চলে এল। মা যখন মৃত্যুশয্যায় রুদ্র তখন শিখাকে নিয়ে গোপালপুরে ফুর্তি করছে। বৃদ্ধা যখন মারা যাচ্ছেন রুদ্র তখন প্রচণ্ড মদ্যপান করে শিখার নগ্ন বুকে মুখ ঘষছে। বৃদ্ধ পিতা এখনও জীবিত। রুদ্র ভুলেও সে পথ মাড়ায় না।

রুদ্র শিখাকে আয়নায় দেখতে দেখতে বললে, 'আজও তুমি খেয়েছ?'

'কেন আজ ড্রাই ডে না কি?'

রুদ্র প্রচণ্ড ধমক দিল, 'শিখা।'

শিখা সুর করে বললে, 'বাবা বিষ নেই তার কুলোপানা চক্কর।'

'তুমি তোমার মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।'

'এক সময় তুমিই তো আমার মাত্রা ঠিক করে দিয়েছিলে গুরু। দুটো বড়, অ্যান্ড ইউ লুক ভেরি সেকসি। সেইটাই সামান্য একটু বেড়েছে। কখনও তিন, কখনও চার অ্যান্ড আই লুক মোর সেকসি। এ বিট মোর সেকসি। আমার গাল গোলাপি হয়। আমার দেহ জ্বলতে থাকে ফসফরাসের মতো। ওরা তাই বলে গো। একটু আগে শক্তি আমার ঘাড়ে মুখ ঘষতে ঘষতে তাই বলছিল। বলছিল আমেরিকায় জন্মালে আমি মেরিলিন মনরো হতে পারতুম।'

রুদ্র গর্জন করে উঠল, 'কে শক্তি?'

'ওমা! শক্তিকে চেনো না। সাতটা হিট ছবির প্রডিউসার। শক্তি আমাকে নায়িকা করবে।'

'আমি তাকে খুন করব।'

'খুন করবে? আহা বাছারে! জেলে যাওয়ার শখ হয়েছে গোপালের।'

শিখাকে মারবার জন্যে রুদ্র তেড়ে গিয়েছিল। মাঝপথেই থেমে যেতে হল। হার্টের অবস্থা খুব খারাপ। চোখে অন্ধকার দেখছে। বিন বিন করে ঘাম বেরোচ্ছে। জিভ আর গলা শুকিয়ে কাঠ। চেয়ারের পেছন ধরে সামলে নিল। সেই অবস্থাতেই শুনতে পেল শিখা বলছে, 'আমার মতো রোজ রাতে তোমার পার্টির পয়সায় একটু স্কচ খাও না গো, সঙ্গে চিকেন তন্দুর। তুমি তো লাইসেন্স পাইয়ে দিতে পার। কতরকমের লাইসেন্স। সিমেন্টের, লোহার, মদের দোকানের, গাড়ির, মেয়েছেলে নাচাবার, তোমার অভাব কীসের!'

রুদ্র ঘর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে একটু করে দরজার দিকে এগোচ্ছে। চোখের সামনে সবই ঝাপসা। তারই মধ্যে দেখছে শিখা শরীরের সব কিছু খুলে ফেলেছে। কানে আসছে চটুল কণ্ঠ—'কাম, কাম মাই ডারলিং, কাম, আই অ্যাম রেডি।'

রুদ্রর মাঝে মাঝে মনে হয়, একদিন গলা টিপে শেষ করে দেয়। যখন জেগে থাকে সম্ভব হবে না। বাইরে থেকে শরীর স্বাস্থ্য দেখলে মনে হবে না রুদ্র অসুস্থ। ভেতরটা ফোঁপরা হয়ে গেছে। গেছে নিজের দোষে। মদ, সিগারেট, অনিয়ম, উচ্ছৃঙ্খলতা। স্নায়ু বলে আর কিছু নেই। একটু উত্তেজিত হলেই কাঁপতে থাকে থরথর করে। ইসিজি করিয়েছিল, হার্টের অবস্থা শোচনীয়। রক্তে চিনি এসেছে। শিখা যখন ঘুম আর অ্যালকোহলে বেহুঁশ থাকে সেই সময় খুব সহজেই করা যায়; কিন্তু নিদ্রিত শিখা এমনই লোভনীয়, এমনই আকর্ষণীয়, তাকালেই থমকে দাঁড়াতে হয়। মনে হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাগানে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাস্করের হাতে খোদাই করা, স্নানরতা ভেনাস, ক্লান্ত হয়ে পাথরের বেদি থেকে নেমে এসে বিছানায় শুয়ে পড়েছে।

ও ঘরের আলো নিবে গেল। জোর শব্দে দরজা বন্ধ হল। ঘরের নয়, যেন মনের দরজা বন্ধ হল। সেই শিখা আর এই শিখা! রুদ্র ভাবে, কীভাবে দিন বদলায়! চরিত্র বদলায়। শিখাকে তো সে পাপের জগৎ থেকেই তুলে এনেছিল ভালোবাসা দিয়ে। গাঁটছড়া বেঁধে নিয়ে এসেছিল প্রথমে গনগন হালদার লেনের বাড়িতে। কে না জানে উন্নতির জন্যে ক্ষমতাশালী মানুষকে কিছু না কিছু দিতে হয়। খোদ ঈশ্বর ওই আকাশে তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর বহর নিয়ে ব্রহ্মাণ্ড শাসন করছেন। মন্দিরে মন্দিরে তাঁর চৌকি। পেলা দাও, মানত করো, মাথা ঠোকো, উপোস করো, তবে যদি তিনি সন্তুষ্ট হন। ক্ষমতাশালী মানুষ হল নিজের নিজের এলাকার ঈশ্বর। সেই ঈশ্বরকে তুষ্ট করার জন্যে পুজো তো দিতেই হবে। যে পুজোর যে নৈবেদ্য। কোথাও মদ। কোথাও অর্থ। কোথাও একটু নারীসঙ্গ। কাজ বাগাবার জন্যে যাকে যা দেওয়ার তা দিতে হয়।

কেন? তুমি জানো না! ওই যে অত বড় চিত্রাভিনেত্রী, প্রতি ছবিতে যিনি এখন পনেরো লাখ টাকা ফি নেন, সেই অভিনেত্রী প্রথম কয়েক বছর কার রক্ষিতা ছিলেন? তুমি জানো না! তুমি পড়োনি ফিলম ম্যাগাজিনে। এখন তিনি বিরাট মহিলা। দেশেবিদেশে নাম। প্লেনে চেপে লন্ডন। রয়াল অ্যালবার্ট হলে এ দেশের প্রতিনিধি হয়ে ভারতীয় কনসার্টের উদ্বোধন করছেন। এখন তাঁর কী ভীষণ দাপট। কে আর বলতে সাহস পায়, আপনি তো একসময় ইয়ে ছিলেন।

রুদ্র উত্তেজনায় উঠে পড়ল চেয়ার ছেড়ে। ঘরে পায়চারি করছে।

প্রথম যখন সরকারি চাকরিতে বহাল হতে গেলুম, বললে ডাক্তারি পরীক্ষা দিতে হবে। কী রকম পরীক্ষা। সরকারি সার্জেন একবারে প্রায় উলঙ্গই করে ছাড়লে। নিয়ম। প্রথা। প্যান্ট নামাও বলায়, আমি প্রতিবাদ করেছিলুম শিখা। প্যান্ট নামাব মানে? বুড়ো ডাক্তার গম্ভীর মুখে বললেন, হয় যা বলছি তাই করুন নয় তো সরে পড়ুন। এই চাকরিতে ঢোকার আগে প্যান্ট খুলতেই হবে মশাই। আপনার পিতাও খুলেছিলেন! আপনার পুত্রকেও খুলতে হবে।

ওই যে সরল সরকার। সামান্য মেট্রিক পাশ করে আজ কত বড় চাকরি করছে। গাড়ি এসে তুলে নিয়ে যায়। কী সুন্দর বাড়ি করেছে। চমরি গাইয়ের মতো বউ। কী করে হয়েছে তুমি জানো না শিখা! পাড়ার সবাই জানে। সরল সরকারের বউই সরল সরকারের লক্ষ্মী। সবাই জানে সে কাহিনি। তুমিও জানো। সরলের বউ একদিন সরলের অফিসে গিয়েছিল স্বামীর খোঁজে। খবর পাঠিয়ে বসে আছে ভিজিটার্স রুমে। এমন সময় কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর নির্মল সেনগুপ্ত রিসেপশানিস্টকে বোর্ডে না পেয়ে ফায়ার করার জন্যে তেড়ে বেরিয়ে এলেন নিজের বাতানুকুল অনুপম প্রকোষ্ঠ ছেড়ে। রিসেপশানে ঢুকে সরলের বউকে একা বসে থাকতে দেখে প্রশ্ন করলেন, 'হোয়্যার ইজ শি?' সরলের বউ সঠিক কোনও উত্তর দিতে না পারলেও সাহস করে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললে, 'অ্যাজ শি ইজ ক্যারিং, শি হ্যাজ গন টু ভমিট।'

সেনগুপ্তর চোখ কান দুটোই জুড়িয়ে গেল। সরলের বউয়ের তখন ভীষণ চটক।

সেনগুপ্ত নরম গলায় বললে, 'হু আর ইউ?'

'সরলস ওয়াইফ।'

ব্যাস জিনিসটা সেই দিনই জমে গেল। রিসেপশান থেকে সোজা বড় কত্তার চেম্বারে। সেখান থেকে বার, রেস্তোরাঁ, ঘুরতে ঘুরতে সোজা হোটেলে। হোটেলে নানারকম দুরূহ ইন্টারভিউ-এর পর 'সরলস ওয়াইফ' সায়েবের পিএ। একটু বেশি খাওয়াদাওয়ার ফলে শরীরটা ইদানীং আরব রমণীদের মতো হয়েছে। তা হোক। প্রথমে সেনগুপ্ত কব্জা করেছিল এখন মহিলা সেনগুপ্তকে কব্জা করেছে। আহা, এই তো দুনিয়ার নিয়ম। গিভ অ্যান্ড টেক। প্রথমে মানুষ মদ ধরে তারপর মদে মানুষ ধরে। সরলের বউও চালাক, সরলও উদার। যেভাবেই হোক আমাদের বাঁচতে হবে। এ বাজারে পয়সা ছাড়া বাঁচা যায় না। তুমিও জানো, আমিও জানি। সেই তো নিজের স্বার্থে তোমাকে শরীর ভাঙাতে হল। আমাদের দুজনের স্বার্থে যখন একটা আধবুড়োকে খেলাতে বললুম তখন এমন সতীপনা করলে পুরো পরিকল্পনাটা তো কেঁচে গেলই, আমারও বারোটা বেজে গেল।

রুদ্র এত কথা একসঙ্গে কখনও ভাবতে পারে না। ইদানীং পারছে। শিখা তার সম্পত্তি। সেই সম্পত্তি ওই এক ইম্প্রেসারিও দিনের পর দিন চোখের সামনে একটু একটু করে ভোগ করবে আর রুদ্র সব শেষে ছিবড়েটি কোলে নিয়ে, হরি দিন তো গেল করবে, তা হয় না। তা হতে পারে না। শিখাকে একদিন বলেছিল, বেরিয়ে যাও। শিখা সঙ্গে সঙ্গে বলেছিল, বেরোতে হয়, তুমি বেরোও। এ ফ্ল্যাট আমার। আমি ভাড়া দি।

এক বিছানায় বহুকাল শোয় না দুজনে। সেইদিন শেষ উঠে চলে এসেছিল রুদ্র, যেদিন শিখা পা দিয়ে ঠেলে তার পা সরিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, তুমি কাছে এলে আমার গা ঘিন ঘিন করে। মনে হয় গায়ের ওপর একটা গিরগিটি চলে বেড়াচ্ছে।

রুদ্র বলেছিল, তুমি আমার বউ, আমি তোমার স্বামী, তুমি আমাকে লাথি মারছ, লাথি মেরে সরিয়ে দিতে চাইছ?

শিখা সেদিন একটু বেশি ঘোরে ছিল। বলেছিল আমার লাথির দাম জানো। কলকাতায় এমন লোক আছে যে আমার এক একটা লাথির জন্যে হাজার হাজার টাকা দেবে। বেশি স্বামীগিরি ফলাতে এসো না। নীচে নেমে শোও। তোমার ওই আদর-টাদর অসহ্য লাগে। তোমাদের মতো ঘেয়ো পুরুষদের জন্যে তো পাড়া আছে। পাঁচ টাকা, পাঁচশো টাকা সবরকমই পাবে।

রুদ্র সেই থেকে বিছানা আলাদা করে নিয়েছে।

রুদ্র হঠাৎ হেসে ফেলল। সামান্য একটা মেয়েছেলের জন্যে সে কী না করেছে। মাকে মেরেছে। বাপকে ছেড়েছে। ভাইকে তাড়িয়েছে। অসৎ উপার্জনে উপহার কিনেছে। আর দিনের পর দিন দিওয়ানা হয়ে ঘুরেছে। ঘুরছে। না। না আর নয়। রুদ্র উঠে পড়ল। খিদে পেয়েছে, খেতে হবে এখন।

শিখা সংসার-টংসার দেখা অনেক কাল ছেড়ে দিয়েছে। রান্নাঘরের চেহারা দেখলে কান্না পায়। এলোমেলো। অগোছালো। সব ওলটপালট। ইঁদুর ছুটছে। টিকটিকি ঘুরছে থালার ওপর। বিশ্রী একটা আঁশটে গন্ধ ভেপসে আছে বদ্ধ ঘরে। কে বলেছিলেন—সুন্দর শরীরে সুন্দর মন বাস করে। ভুল। সম্পূর্ণ ভুল কথা।

রুদ্র জানলা খুলে দিল। নীচেই সুন্দরী লেন, অন্ধকারে পাক খেতে খেতে চলে গেছে আরও অন্ধকারে মাতাল পথিকের মতো। দূরে শ্যামসুন্দরের মন্দির। মিটিমিটি আলো জ্বলছে এখনও। রুদ্র পথের দিকে, প্রায় ভেঙে পড়া মন্দিরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। মায়ের কথা মনে পড়ছে। শৈশব থেকে যৌবন, কত উৎপাত সহ্য করে গেছেন মহিলা। বাবাকে দেখতে পাচ্ছে চোখের সামনে। পুরোনো রংচটা একটা ছাতা বগলে, বাড়ি বাড়ি টিউশানি করে ফিরছেন বৃদ্ধ। সেই বয়সে, যে বয়েসে মানুষ ছেলের রোজগারে সামান্য শাকান্ন খেয়ে, শান্তিতে ভগবৎ চিন্তায় জীবন কাটাবার স্বপ্ন দেখে। ভাইটা ট্রেনে কাটা পড়ে মরেছে।

সমস্ত কিছুর জন্যে দায়ী ওই উচ্ছৃঙ্খল মেয়েটা। আর দায়ী তার কাম। তার লোভ। তার ভোগবাসনা। রুদ্র ফিরে তাকাল ঘরের দিকে। সে একটা লেংটি ইঁদুর। ধরা পড়েছে শিখার ইঁদুর কলে। এই কল থেকে বেরোতে হবে মনের জোরে। শিখাকে সে মারতে পারবে না। শিখাকে সে ছাড়তেও পারবে না। এরই নাম কি ভালোবাসা।

রুদ্র স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ! সামনে একটা ফালি টেবিল। এলোমেলো বাসনপত্তর। টেবিলের তলায় একটা কেরোসিনের টিন। আজ কী বার! কত সাল! রুদ্র খেয়াল করার চেষ্টা করল। বছর কী রকম ঘন, পোড়া মোবিলের মতো একটু একটু করে গড়াচ্ছে! আর কি কিছু হবে। ফিরে আসবে জীবনে সুখের দিন। অমলিন শৈশব। স্বপ্ন দেখার কৈশোর। প্রেমের যৌবন।

কে এক নিশাচর বিশ্রীরকম কাশতে কাশতে চলে গেল। দূর থেকে তার ভীষণ কাশির শব্দ ভেসে আসছে এখনও। একটু পরেই আবার সব চুপচাপ। মাঝে মাঝে সরু তারের মতো ফিনফিনে বাতাস ঢুকছে খোলা জানলা দিয়ে। একটা সসপ্যানের ওপর ইঁদুর উঠেছিল। প্যানটা নেচে উঠল। অদৃশ্য কোণ থেকে একটা টিকটিকি টিকটিক করে উঠল।

সুন্দরী লেন এখন একেবারেই অচৈতন্য। গভীর, গভীর নিদ্রায়। এমন কি আজ কুকুরগুলোও ডাকতে ভয় পাচ্ছে। রাধামাধব মন্দিরের টিমটিমে আলোটাও নিবে গেছে। সেবিকা সামনের রকে একটুকরো তেরপলের ওপর শুয়ে আছেন। আজকাল আর সহজে ঘুম আসতে চায় না। এপাশ, ওপাশ করতে করতে একটু যাও-বা এল, দেখতে দেখতে ভোর। উঠে পড়ার তাগিদ।

সেবিকা শুয়ে আছেন আকাশের দিকে চোখ রেখে। সতেরো নম্বর বাড়ির জানালা খোলা। এত রাতেও আলো জ্বলছে। শিল্পীর বাড়ি। শিল্পীদের রাত নেই। মেয়েটা কোনও কোনও দিন শেষ রাতেও ফেরে। ঘুম আসে না সেবিকার। রাধামাধব! তুমি কত কি-ই না দেখালে প্রভু। এ পাড়ায় এখনও এমন মানুষ আছে যে মাঝে মাঝেই রাত নিশুতি হলে তার কাছে আসে কুপ্রস্তাব নিয়ে। সেবিকা মনে মনে হাসেন, আর তার রাধামাধবকে বলেন—বাঁশিটি আড়ে নিয়ে বাঁকা হয়ে আছ প্রভু। পৃথিবীর কিছুই তুমি দেখছ না। একেবারে এলে দিয়েছে। কোথায় মন্দিরে আসবে তোমার খোঁজে, না ছুটে এসেছে দেহের খোঁজে। মানুষের মুখে আগুন।

সতেরো নম্বর বাড়ির খোলা জানালায় আলোটা হঠাৎ খুব জোর করে উঠল। বাবা এত রাতে উনুনে আগুন পড়ল। এরপর রান্নাবান্না তারপর খাওয়া! ভোর হতে যাবে যে রে। অভিনয় করিস বলে সবই কি অভিনয়! তেলচিটে কালো ধোঁয়া বেরুচ্ছে গল গল করে। বিশ্রী পোড় গন্ধ। সেবিকা তেরপল ছেড়ে উঠে বসলেন, হায় ঈশ্বর। এ তো উনুনে আগুন নয়। আগুন লেগে গেছে সারা ঘরে। সাপের জিভের মতো লকলকিয়ে উঠছে। সারা ঘরে জড়াজড়ি করছে। সর্পমৈথুনের মতো। আগুনের আভায় অন্ধকার গলি কাঁপছে।

সকালেই পুলিশ এল। ওয়্যারলেস লাগানো একটা জিপ। একটা কালো ঢাকা ভ্যান। অনেক লোকলস্কর। গলিটা একেবারে ভরে গেল। অফিসার-ইন-চার্জ মন্দিরের সেবিকাকে প্রশ্ন করলেন, 'কী হয়েছিল বলুন।'

'আমি দেখলুম।'

'কি দেখলেন?'

'জীবনে যা দেখিনি। তখন অনেক রাত। কত রাত তা বলতে পারব না। ওই যে সতেরো নম্বর বাড়ি। ওই যে জানালা খোলা। এ পাড়ার সবাই ওই বাড়িটাকে বলে নাচমহল। অনেক রাত পর্যন্ত আলো জ্বলছিল। আমার তো ঘুম আসে না ভাই। এই এইখানটায় এক টুকরো তেরপল বিছিয়ে শুয়ে শুয়ে দেখছি—আলো জ্বলছে। কে একজন দাঁড়িয়ে রইল জানলায় অনেকক্ষণ ধরে। দেখছি শুয়ে শুয়ে। তন্দ্রামতো এসেছে। হঠাৎ মনে হল চোখের সামনে একটা আলো কাঁপছে। এত আলো। তাকিয়ে দেখি আগুন। ওই ঘরটা যেন জ্বলে উঠেছে। লকলকে শিখা হিলহিল করে নাচছে সারা ঘরে।'

'তারপর?'

'তা আমি ভাবলুম আগুন লেগে গেছে। আগুন আগুন আগুন বলে চিৎকার করলুম। কে শুনবে। গভীর রাতে মেয়েছেলের গলা। হঠাৎ আকাশ বাতাস কাঁপানো আর একটা চিৎকারে আমি ভাই অবশ হয়ে গেলুম। তারপর মেয়েছেলের রাত-চেরা গলা—বাঁচাও। তারপর দেখি কী, সম্পূর্ণ উলঙ্গ একটি মেয়ে তীরবেগে ছুটে আসছে এই দিকে। তার পেছনে ছুটে আসছে দুটো জ্বলন্ত হাত সামনে বাড়িয়ে জ্বলন্ত এক মানুষ। আমি এমন দৃশ্য জীবনে দেখিনি। মেয়েটা ছুটছে আর চিৎকার করছে—বাঁচাও বাঁচাও। জ্বলন্ত মানুষ প্রায় ধরে ফেলে আর কী। আমি বলছি, জয় রাধামাধব, বাঁচাও, জয় রাধামাধব বাঁচাও। তেরপলটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিলুম মানুষটার দিকে। পড়ে গেল। পড়ল আর উঠল না। তেরপলের তলায় ধুঁইয়ে ধুঁইয়ে পুড়ে একেবারে অঙ্গার হয়ে গেল।'

'কোথায় সেই মেয়ে?'

'আমার পুজোর কাপড়টা ওকে পরিয়ে দিয়েছি। সেই থেকে বসে গুম মেরে। মেয়েটা পাথর হয়ে গেছে।'

এই সুন্দরী লেনের অনেক ইতিহাস।

সেই সুন্দরীদাসীর জুড়ি গাড়ির ঘোড়া একবার ক্ষেপে গিয়ে হরেন সাঁতরার মেয়েকে চাপা দিয়ে মেরে ফেলেছিল। সেই মৃত্যু সুন্দরীর জীবনের মোড় ফিরিয়ে দিয়েছিল। ইতিহাসের সেই শুরু। রুদ্রের পুড়ে মরায় পাড়া আবার জেগে উঠল কিছু দিন। এ খুন, না আত্মহত্যা। থানা, পুলিশ খুব হল। শেষে ঢেউ পড়ল। ঘটনা হারিয়ে গেল, ঘটনার স্রোতে।

শুধু রাধামাধবের মন্দিরটি বেশ ঝকঝকে নতুন হয়েছে। পেছনের দিকে একটা থাকার ঘর হয়েছে। কেউ বলে শিখা পুলিসের ভয়ে সেবিকা কিঙ্করী হয়েছে। তা না হলে স্বামী খুনের অপরাধে জেল হত। প্রবীণা সেবিকা বলে, 'শিখা যে যা বলে বলতে দে। প্রথম প্রথম অনেকেই আমাকে বলত। আমার সম্পর্কে রটিয়েছিল, ও তো একটা বেশ্যা।'

মানুষের মুখ আর নদীর স্রোত, আপনি বন্ধ না হলে বন্ধ করা যায় না। শিখাই শুধু জানে শিখার কথা। চোখ বুজোলেই সে দেখতে পায়, তার মাথার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে এক জ্বলন্ত পুরুষ। এক একবার, বাতাসের সুরে ডাকছে—শিখা, আর মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে আগুন আর নীল ধোঁয়া। অনেকেই প্রশ্ন করেছিল—তোমার স্বামী আগুনে পুড়ছে। তুমি দেখছ। নেবাবার চেষ্টা না করে তুমি ছুটে পালালে কেন? এর নাম ভালোবাসা! শিখা কোনও উত্তর দিতে পারে না। অদ্ভুত একটা অস্বস্তি বোধ করে—রুদ্র জ্বলতে জ্বলতে তাকে আলিঙ্গনে বাঁধতে চাইছে। ভালোবাসার আলিঙ্গন নয়, মৃত্যুর আলিঙ্গনে। শিখা ছুটছে। রাত্রিবাস ছিঁড়ে পড়ে গেছে শরীর থেকে। শিখা বলতে পারে না, স্বামী কে? সবাই তো কামনার জ্বলন্ত আগুন। নারীর বিধিলিপি সেই আগুনে তিলে তিলে মরা।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%