সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

খুব বৃদ্ধ একটা গরুর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে। সংসার আমাদের দুজনকেই বরখাস্ত করে দিয়েছে। গরুর অপরাধ, সে আর দুধ দিতে পারে না। আমার অপরাধ, কর্ম থেকে অবসর গ্রহণের ফলে, মাসের পয়লা তারিখে আমি আর নোটের কেতা সংসারের হাতে তুলে দিতে পারি না। মানুষের দুগ্ধ তো টাকা! আমাদের নদীর ধারে বাঁধানো একটা বটতলা আছে। জীবনের হাতে ঝাড় খাওয়া জীবের পাদপীঠ ওই প্রাচীন বটতলা ঝড়তিপড়তি মালেদের পীঠস্থান, সংসারের স্বরূপদর্শনের পীঠস্থান।
কঙ্কালসার রসিক এক গরু আর আমি এক উদাস বৃদ্ধ। গরু বললে, 'কী গো, ব্রেকফাস্ট জুটেছে? আমি তো একজনের বাগানের পাঁচিলের বাইরে ঝুলে থাকা একটা গাছের ডাল ঘাড় উঁচু করে টেনে ছিঁড়ে খেয়ে এলুম। আমার আবার স্পন্ডিলাইটিস আছে। এখন আর ঘাড় ঘোড়াতে পারছি না!'
আমি বললুম, 'এক কাপ চা আর একটা বিস্কুট জুটেছে। জানোই তো, আমার পরিবারের সকলে এই সময়টায় খুব ব্যস্ত থাকে। কেউ দৌড়োচ্ছে স্কুলে বাচ্চা পৌঁছোতে। কেউ যাচ্ছে বাজারে। কেউ করছে যোগাসন। কেউ বিছানায় পড়ে আছে। চেষ্টা করছে ওঠার। বিছানা ছাড়ছে না, প্রেমিকার মতো দুহাত জড়িয়ে ধরে আছে—আরও কিছুক্ষণ না হয় রহিতে কাছে। তাই ভাই আমি নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। একে কী বলে জানো, ফিট করা। জুতোয় পা ফিট করা, চশমায় চোখ ফিট করা। জিনিসটা ভালো করে বোঝার চেষ্টা করো, পায়ে জুতো ফিট, চোখে চশমা ফিট নয়, উলটোটা। ওইতেই শান্তি।'
'তোমার ছেলেমেয়ে আছে?'
'অবশ্যই আছে। তাদের সব মানুষ করেছি, লেখাপড়া শিখিয়েছি, সংসারী করেছি, বাকি রাখিনি কিছু। তারা সব সুপ্রতিষ্ঠিত।' গরু তার লেজটা সামান্য নাড়িয়ে, হাসি হাসি মুখে প্রশ্ন করল, 'তোমার দেনাপাওনা সব বুঝে নিতে পেরেছ?'
'দ্যাখো ভাই গরু, সংসারটা তো শেয়ার মার্কেট নয়, সংসার হল দু:খ শেয়ার করার জায়গা। প্রত্যাশা কিছু রাখতে নেই, তাহলে দু:খটাই বাড়ে! তাই যা পেয়েছি, যা পাচ্ছি, তাই বেশ।'
গরু বললে, 'বেশ, বেশ, একেই বলে গরুর জীবনদর্শন! পেটের জ্বালায় যতদিন দুধ আছে দিয়ে যাও। শুকিয়ে গেলেই বেরিয়ে এসো গোয়াল থেকে ঈশ্বরের পৃথিবীতে। চরে খাও, মরে যাও।'
'কথাটা বেশ বললে তুমি। আমার দু:খের জায়গায় গুঁতো মারলে! কত সংগ্রাম করেছি ভাই। যখন ছাত্র, তখন তেড়েফুঁড়ে এই পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা, তারপর ইন্টারভিউ, এই চাকরি, সেই চাকরি, তারপর কোথা থেকে একটা মেয়ে এসে প্রেমের বঁড়শি টোপ গিলিয়ে দিলে। বুঝিনি তখন, কত ধানে কত চাল! একেবারে মোহিত অবস্থা! তারপর বঁড়শি গাঁথা সেই রুইমাছ অদৃশ্য কড়াইতে সোহাগের তেলে ভাজাভাজা। তারপর যেই রোজগার গেল, সামান্য খাতির যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও গেল। কথায় কথায় দাঁত খিঁচুনি। স্ত্রী বলতে লাগল, ভাম বুড়ো ভাম, শিক্ষিত ছেলে টাইটাল দিলে ইংরিজিতে, ওল্ড ফুল! শিক্ষিতা, সদাকুসিঞ্চতা ভ্রূ, সুন্দরী পুত্রবধূ উপাধি দিল, ব্যাক ডেটেড। বাড়ির কাজের মেয়েটিকে কিছু বললে, বলে, দাঁড়াও বউদিকে জিগ্যেস করে আসি! বুঝিয়ে দেয়, তুমি ঔরঙ্গজেবের কারাগার রুদ্ধ বৃদ্ধ সাজাহান, বসে বসে দূর থেকে তোমার প্রেমের তাজমহল দ্যাখো।' গরু একটু হেসে বললে, 'দ্যাখো ভাই, তোমরা আমাদের গরু বল, কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের মতো গরু আর দ্বিতীয় নেই। আমরা পেটে করে দুধ নিয়ে আসি, তোমাদের সে মুরোদও নেই। রোজগারের কসরতেই জীবন যায়। দুধ তোমাদের কিনে খেতে হয়। আমাদের খাদ্য সর্বত্র ছড়ানো, তোমাদের খাদ্য টাকা, ফ্যালো কড়ি মাখো তেল, শেম শেম, বেদবেদান্ত ইন্টেলেকচুয়াল গেম।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন