সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কিছু উদাসীন মানুষ যেমন আছেন, কিছু অতি আগ্রহী মানুষও আছেন। এঁরা হলেন 'কী হল দাদা'র দল। চারিদিকে যা কিছু ঘটছে, এঁদের নাক বাড়িয়ে জানা চাই। 'কী হল, কী হল' বলে এঁদের ভেতরটা সব সময় লাফাচ্ছে। কিছুতেই সুস্থির হয়ে থাকতে দিচ্ছে না। এদিকে তাকাচ্ছেন, ওদিকে তাকাচ্ছেন। রাস্তার ছোটখাটো কোনও জটলা দেখলেই একটা কাঁধ উঁচু করে, ডিঙি মেরে মেরে, ঘাড়টাকে পারলে সারসের মতো লম্বা করে দেখে নিতে চান কীসের জটলা, কাকে ঘিরে জটলা, না পারলে প্রশ্নে প্রশ্নে উত্যক্ত করে তোলেন, 'কী হল দাদা, কী হল দাদা?'
আমি নিজেও একটি 'কী হল দাদা'। বহুবার অপ্রস্তুত হয়েছি, অপমানিত হয়েছি, তবু স্বভাব না যায় ম'লে। অল্প বয়সেই সংশোধন করে নেওয়ার মতো কানমলা একাধিকবার খেয়েছি, তবু শিক্ষা হয়নি। বাসে মাখো-মাখো হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। সবাই আছেন। কিছুক্ষণের এই যন্ত্রণা সকলেই চোখ বুজিয়ে পার করে দিতে চাইছেন। আমার চোখ কিন্তু খোলা। দাঁড়িয়ে থাকলে চলমান রাস্তার যতটুকু দেখা যায়, ততটুকু এক ফালি রিবনের মতো উলটোদিকে হুহু করে ছুটে চলেছে। পা দেখছি, ভাঙা ফুটপাত দেখছি, নর্দমা দেখছি, দোকানের সিঁড়ির ধাপ দেখছি, গরুর নীচের আধখানা দেখছি। হঠাৎ দেখলাম, তিন-চার জোড়া পা দ্রুত ছুটছে, একটা অন্য ধরনের হল্লা। সঙ্গে সঙ্গে 'কী হল দাদা'। আমার পেছন দিকটা ডেঁয়ো পিঁপড়ের মতো উঁচু হয়ে আমার পেছনে দাঁড়ানো লোকটিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিল, আমার উপর অংশ সামনে ভেঙে সিটে-বসা দুটি প্রাণীর মাথার ওপর একটা চাঁদোয়া তৈরি করে আমার কৌতূহলী মুখটাকে জানালার ফাঁকে পরিপূর্ণ চন্দ্রের মতো শোভনীয় করে ধরে রাখল। সামনে দোমড়ানো আমার এমতো একটি শরীর বাসের দোলায় চিড়িয়াখানায় একহাতে গাছের ডাল ধরে ঝুলে থাকা শিম্পাঞ্জির মতো ডাইনে বামে দুলতে লাগল। আমার বুকের ঘষায় বসে-থাকা চরিত্র দুটির মাথার চুল এলোমেলো হতে লাগল। আমার কোমরের সংঘর্ষে পেছনে দাঁড়ানো মানুষেরা অনবরত সামনের দিকে উথলে উঠতে থাকলেন। 'কী হল দাদা? দৌড়চ্ছে কেন?'
শিক্ষিত মানুষরা সাধারণত মেয়েলি প্রশ্নের জবাব দেওয়াটা অসম্মানজনক বলে মনে করে থাকেন। তিন জোড়া পা হঠাৎ কেন দৌড়চ্ছে, আমাকেই তা দেখে জেনে নিতে হবে। এই অবস্থায় আমাকেই অনেকের প্রশ্ন—'কী হল দাদা?'
মশারির চালের মতো আমার ঝুলে পড়ার কারণটা কী? যাঁদের মাথার ওপর 'কী হল' বলে ঝুলে পড়েছিলুম, তাঁরা দুহাত ঠেকিয়ে ঠেলেঠুলে সোজা করার চেষ্টা করলেন। আমি সোজা হয়ে এদিকে ওদিকে তাকিয়ে একটু হাসি হাসি মুখ করে সহযাত্রীদের কী হয়েছে জানিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করে বললুম—'কিছু হয়নি। ট্রাম ধরার জন্যে দৌড়চ্ছে।'
শিক্ষিত মানুষ আবার অনেক কথা বিশ্বাস করেন না। কারুর মুখেই কোনও ভাবান্তর হল না। তবু কী হল যেমন জানা দরকার, কী হয়েছে তেমনি জানানোও দরকার।
সাত সকালেই পাশের বাড়িতে ধুম ঝগড়া বেঁধেছে। পুরুষ কণ্ঠ ও নারী কণ্ঠের কোরাস উচ্চগ্রামে। আমার মাথা ঘামাবার মতো কোনও ব্যাপারই নয়। স্বচ্ছন্দে চা খেয়ে বাজার চলে যেতে পারি। কিন্তু আমি হলুম গিয়ে 'কী হল দাদা'। উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতেই হচ্ছে—'হলটা কী'? পাঁচিলের এপাশ থেকে প্রতিবেশীর উঠোনের দিকে আমার মুন্ডুটাকে জ্যাক দিয়ে ধড় থেকে তুলে ধরলুম। বা:, বেশ সুন্দর দৃশ্য। বড় ভাই পরান্নভোজী ছোট ভাইকে জুতো দিয়ে দলাই মালাই করে রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা করছেন। ছোট ভাইয়ের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মধ্যস্থার জন্যে বড় ভাই সম্পর্কে একগাদা অভিযোগ আমার দিকে ছুড়ে দিল। অভিযোগের ভাষা খুব শালীন নয়। আমি যেন পাঁচিলের এপাশে জজ সাহেব। সকালে গার্ডনিং করছিলুম। মামলাটা আমার হাতে এসে গেল।
পারিবারিক কেচ্ছার ম্যানহোল খুলে গেছে। বড়র হাতের জুতো শুন্যেই তোলা রইল। সাময়িক বিরতি। ছোট ভাই সম্পর্কে তাঁরই নানা অভিযোগ। বড় যদি স্বার্থপর শয়তান হন, ছোট চোর এবং লম্পট। সঙ্গে সঙ্গে আমার মুণ্ডু গুটিয়ে এল। 'কী হল দাদা'-রা কখনও সমস্যার গভীরে যেতে চান না, বা সমাধানে এগিয়ে যান না। সালিশির দায়িত্ব তাঁদের নয়। কী হল? মোটামুটি জানা হয়ে গেলেই তাঁরা উদাসীন মুখে সরে পড়েন, যেন কিছুই হয়নি। পরের ঘটনা লোকমুখে জেনে নেন—তারপর কী হল? তারপর কী হবে?
'কী হল দাদা'দের পেছনেও 'কী হল দাদা'রা থাকে। রাস্তার দিকের ঘর। ছেলেকে পড়াতে বসেছি। আজকালকার ছেলেদের পড়াতে বসানো মানেই লো প্রেশারকে হাই করানো। তারপরই স্কেল দিয়ে পেটানো। পেটাপেটির একটা পর্যায়ে ছেলের গর্ভধারিণীর আবির্ভাব। বিদ্যাসাগর মশাইয়ের কালে মাসিরা আশকারা দিয়ে ছেলেদের বারোটা বাজাতেন। এখনকার কালে মায়েরা। 'স্পেয়ার দি রড স্পয়েল দি চাইন্ড'—আজকের কথা নাকি? চিরকালের সত্য। ছেলের মার সঙ্গে হাতাহাতি। তিনি স্কেলটি কেড়ে নিতে চান। আহা বাছা আমার, গোমূর্খ হয়ে চিরকাল বাপের হোটেলে থাক। বাপ যখন, বাপ-বাপ করে ভরণপোষণ করতে বাধ্য। ছেলে পড়ে রইল মাঝ মাঠে ফুটবলের মতো। গোলের কাছে স্বামী-স্ত্রীতে স্কেল নিয়ে ড্রিবলিং। একটু চেঁচামেচি—খবরদার, খবরদার। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তার দিকের জানালায় একটি মুখ—'কী হল দাদা?'
এই 'কী হল দাদা'দের জন্যে কোনও কিছুই চেপে রাখার, লুকিয়ে রাখার উপায় নেই। সব সময় আমরা পাদপ্রদীপের সামনে। সবাই জেনে গেছেন, যে স্ত্রীর সঙ্গে সাতসকালে স্কেল যুদ্ধ হয়, সেই স্ত্রী সন্ধেবেলা আদর করে মুখে রসগোল্লা দেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন