সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আচ্ছা বলুন তো, কাউন্টার আছে টিকিট নেই, সেটা কোন কাউন্টার? সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টার। কোনও সময়েই টিকিট পাওয়া যাবে না। সবসময় হাউসফুল। টিকিটের জন্যে আছে চলমান কাউন্টার। হাঁকছে দোকা দশ, দোকা দশ। ঘুলঘুলি থেকে টিকিট বেরোবে না। টিকিট বেরোবে ব্লাউজের বুক থেকে। রোমান্টিক বই, রোমান্টিক টিকিট। দামটা গরম হলেও টিকিটটা নরম। এই স্টার টিভি, কেবল টিভি, ভিসিআর-এর যুগে ভ্যাপসা গরম, সিনেমা হলে কারা ছবি দেখতে যান? যাঁদের প্রেম বেশি। প্রেমের ফুচকা-ফুচকিরাই ওই কষ্ট সহ্য করতে পারেন। সাধারণ মানুষের দু:সাধ্য। অন্ধকার ঘরে পাশাপাশি হাতে হাত রেখে, কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে দুদণ্ড বসা। কানের কাছে ঠোঁট নিয়ে গিয়ে প্রেমের ফিসফিসানি। পরদায় প্রেম, আসনে প্রেম। পেছনে সিটের স্প্রিং খোঁচা মারছে। পায়ের ওপর দিয়ে ধেঁড়ে ইঁদুর, ছুঁচো পাশ করছে। কুছ পরোয়া নেহি। সুরঞ্জনা পাশে আছে। যখন সিনেমা হলে ঠান্ডা মেশিন চলত, পুরু গদিঅলা আসন ছিল, পায়ের নীচে নরম কার্পেট, তখন দুপুরের শোয়ে অনেকে ঘুমোতে যেতেন। অমন বিখ্যাত বই চার্লির 'লাইমলাইট' দেখতে গেছি, কানের পাশে নাসিকাগর্জন। হৃষ্টপুষ্ট ভদ্রলোক হেলে পড়েছেন গভীর ঘুমে। মাথাটা আমার কাঁধে। ঠেলা মেরে বললুম, এত ভালো বই, ঘুমোচ্ছেন কেন?'
ভদ্রলোক বললেন, 'সিনেমা আমি দেখি না।'
'তা হলে এসেছেন কেন?'
'ঘণ্টা দুই ঠান্ডা ঘরে ঘুমোতে।'
'আমার কাঁধটা আপনার বালিশ?'
'সরিয়ে রাখুন।'
সারাটাক্ষণ সিঁটিয়ে বসে রইলুম। চার্লি বেহালা বাজাচ্ছেন, ভদ্রলোক নাক ডাকাচ্ছেন। সামনের আসনে একটি ছেলে আর মেয়ে। দুটো মুণ্ডু জোড়া লাগছে আবার খুলে যাচ্ছে। নাও, 'লাইমলাইট' দ্যাখো! সামনে জ্যান্ত সিনেমা। জীবনধর্মী নাটক। প্রেমিক প্রেমিকা। দুজনেই দুজনেতে মজে আছে। ভুলেই গেছে পেছনে আমরা আছি। প্রেমে আর ধর্মে সেই একই বাণী, লোক না পোক। অথবা, লজ্জা ঘৃণা ভয় তিন থাকতে নয়। কলকাতার অধিকাংশ সিনেমাহলেই মাথা প্রবলেম। যেমন, গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে আকাশ দেখতে হয়, সেইরকম মাথার ফাঁকে ফাঁকে পরদা। দুটো মুণ্ডুর খাঁজ দিয়ে চোখ চালানো। ধড় আমার, মুণ্ডু পাবলিকের। স্বাধীনভাবে মুণ্ডচালনার উপায় নেই। প্রথমেই শুনতে হবে—দাদা, মাথাটা সরান। তাতে না হলে, 'কেটে পকেটে পুরুন।' এতেও না হলে, মৃদু চাঁটি। সিনেমা হল হল সমঝোতার জায়গা। মাথায় মাথায় সমঝোতা। সামনে পেছনে হেলাহেলি অলিখিত এক শর্ত। তোমারটা যদি ডান দিকে হেলে থাকে, সারাটাক্ষণ সেইভাবেই থাকবে। সামনের প্লেসিং-এর ওপর পেছন, তার পেছনের প্লেসিং নির্ভর করবে। গাছের মাথার মতো নিজের মাথার হেলাহেলি, দোলাদুলির স্বাধীনতা পেছনের পাবলিক বরদাস্ত করবে না। স্টিফ হয়ে বসে থাকতে হবে।
আমার সামনে একবার এক দশাসই পাঞ্জাবি ভদ্রলোক পড়েছিলেন, মাথায় বিশাল পাগড়ি। সে যেন ট্রাকের পেছনে মারুতি। ওভারটেক করার উপায় নেই। সেকালের লম্পটরা যেভাবে গাছের গুঁড়ির আড়াল থেকে পুকুর ঘাটে মেয়েদের স্নান দেখত, আমিও সেই কায়দায় পাগড়ির আড়াল থেকে 'মাকেনাজ গোল্ড' দেখলুম। দেখতে দেখতে মনকে বোঝালুম, ব্রাউনিং-এর ফিলজফি, এ তো পাগড়ি পাঞ্জাবি, যদি রাবণ এসে সামনে বসতেন! দশটা মাথার জন্যে দশটা টিকিট কেটে। তা হলে তুমি কীভাবে দেখতে!
বাইরে প্রখর রোদ, ভেতরে অসীম অন্ধকার। শো শুরু হয়ে যাওয়ার পর হলে ঢুকে দেখেছেন কোনওদিন! খেলাটা কেমন জমে। টিকিট চেকার টর্চলাইট মেরে চলে গেলেন। নি:সীম অন্ধকারে আমি এক ভূত। সিটে যে আলোর মার্কা পড়ল সেটা একেবারে দেওয়াল ঘেঁষে। অর্থাৎ দশ-বারোজনকে টপকে যেতে হবে। হাতড়াচ্ছি। কোনও হদিস পাচ্ছি না ফাঁকটা কোথায়! প্রথমেই ভাঙল আস্ত একটা খোঁপা। অন্ধকারে আন্দাজ করতে গিয়ে প্রথমেই হাত পড়ল লাগদাঁই এক খোঁপায়। কুণ্ডলিকার বহুতল ইমারতের মতো সেটি নি:শব্দে আমার হাতের ওপর ধসে পড়ল। কপালে বিশেষণ জুটল, জানোয়ার। কিন্তু আমাকে তো ঢুকতে হবে হাঁটুর জটলা পেরিয়ে। আবার আমার হাত অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হল। এবারে কার নরম কোল মসৃণ বস্ত্রাবরণে ঢাকা। একটা সিৎকার। আমি গাঢ় গলায় বললুম, সরি। ততক্ষণে আমি পিস্টনের মতো ঢুকতে শুরু করেছি। নিতম্ব-প্রবলেম। অর্থাৎ আমার ধামার মতো পশ্চাদ্দেশ উপবিষ্টদের নাসিকাদেশ অতিক্রম করে চলেছে। দু-চারটে চড়চাপড়ও পড়ছে তাতে। ব্যাপারটা অতিশয় অশালীন। কোনও উপায় নেই। দু-সার আসনের মাঝে ফাঁক অতি সামান্য। এন্তার পা মাড়িয়ে চলেছি। এই কি গো শেষ দান, বলে কেউ বিরহ প্রকাশ করছে না। তেড়ে গালাগাল। পরদায় ধর্ষণের দৃশ্য। আমার জন্যে যাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না, তাঁরা চিৎকার করছেন, গাধা, পায়ের কাছে নিলডাউন হয়ে যান। আলো জ্বললে উঠে বসবেন। ব্যাটা রাতকানা। এরপরে যে কাণ্ডটা করলুম, সে আরও সাংঘাতিক। নিজের আসনে পৌঁছে গেছি ভেবে এক ষোড়শীর কোলে বসে পড়লুম। তিনি আমাকে বিষাক্ত মার্জারের মতো আঁচড়ে দিলেন। তৎক্ষণাৎ নিজেকে উত্তোলিত করে স্বস্থানে বসালুম। সিনেমা দেখব কী, ভয়েই মরি। এরপর প্রহার না শুরু হয়ে যায়। ছবিটা এত জমাটি কেউ আর কিছু বললেন না। বরং পার্শ্ববর্তিনীর সঙ্গে ছোটমতো একটা প্রেম হয়ে গেল। অবোধ শিশুর মতো কোলে বসে পড়েছিলুম। তিনি মাতৃস্নেহে ক্ষমা তো করলেনই উলটে তিনঘণ্টার মধ্যেই ঘনীভূত প্রেম। নারীচরিত্র বোঝা ভার।
ব্যাটল অফ ওয়াটারলুর মতো এই সিনেমা হলেই আমার সঙ্গে হয়েছিল ব্যাটল অফ হাতল। হাতলের লড়াই। ঘোরতর সংগ্রাম। ব্যাপারটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। সেই অন্ধকারে খোঁপা ভাঙার পর প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, আলো থাকতে থাকতে হলে ঢুকব। অন্ধকারে কদাচ নয়। তা আগে আগেই হলে ঢুকে বেশ জমিয়ে বসেছি, দু'হাতলে দুটো হাত রেখে জমিদারের মতো। জ্বল জ্বল করছে আলো। ধীরে ধীরে আসন ভরতি হচ্ছে। একসময় আলো ম্লান হয়ে এল, বাজনা থেমে গেল। পরদা উঠতে উঠতেই ঘন অন্ধকার। শুরু হল বিজ্ঞাপন। বইও শুরু হল। আমার বাঁ পাশের আসন তখনও খালি। সরু গলিতে একটা ট্রাক ঢোকার মতো আলো-অন্ধকারে বিশাল এক শরীর এগিয়ে এল। বেদিতে তিন টন একটা ব্রোঞ্জের মূর্তির মতো নিজেকেই নিজে প্রতিষ্ঠা করলেন আমার বাঁ পাশের খালি আসনে। লোভনীয়, মানে ব্র্যাঘ্র লোভনীয় শরীর। একটা বাঘের ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনারের পরেও অবশিষ্ট কিছু থেকে যাবে। তিনি বসেই অবাঞ্ছিত এক আবর্জনার মতো আমার বাঁ-হাতটাকে হাতলচ্যুত করে নিজের থলথলে ডানহাতটা সেখানে স্থাপন করলেন। ঘাম চটচটে লোমওয়ালা একটা থাবা। প্রথমে আমি কিছু মনে করিনি। ইংরেজি সিনেমা চলছে। জেমস বন্ড। সুন্দরী নায়িকা হোটেলের বাথরুমে। একটু পরেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য উন্মোচিত হবে। হঠাৎ মনে হল হাতলটা কার? তোমার, তোমার একার সম্পত্তি! কমন হাতল। হাফ তোমার, হাফ আমার। দুজনেই একই দামের টিকিট কেটেছি। সমান অধিকার। অসভ্যের মতো ঠেলে ফেলে দিলে কেন? এটা কী তোমার জমিদারি! আমার অধিকারবোধ জেগে উঠল। সিনেমার বাথরুম থেকে আমার মন বেরিয়ে এল। আড়চোখে তাকালুম। স্থূল একটা মুখ গদগদে হয়ে রমণীর রমনীয় স্নান দেখছে মগ্ন হয়ে। সেই তন্ময়তার মুহূর্তে খচ করে ঠেলা মেরে হাতটা ফেলে দিয়ে হাতলের দখল নিলুম। বেশিক্ষণ সে দখল বজায় রইল না। পরমুহূর্তেই আমার হাত হাতল-চ্যুত হল। তক্কে তক্কে রইলুম। সিন কনোরি নায়িকাকে নিয়ে লেপের তলায় ঢুকেছেন, একটা কাণ্ড ফুলেফুলে উঠছে, সেই সময় আমি মেরে দিলুম এক ট্যানজেন্ট। থাবাটা হাতল থেকে হড়কে গেল। এইবার বাঁ-হাতটাকে ডান হাত দিয়ে চেপে ধরে রইলুম। বিশাল ভদ্রলোকের বিশাল হাত আমার হাতটাকে ফেলে দেওয়ার জন্যে আঁকুপাঁকু করতে লাগল। অসীম সংগ্রাম। পাঞ্জার লড়াইয়ের মতো বাহুমূলের লড়াই। বলপ্রয়োগ। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে দুই যোদ্ধার ফোঁস ফোঁস শ্বাস। শুম্ভ-নিশুম্ভের হাতলের লড়াই। একবার আমারটা পড়ে, একবার আমার প্রতিদ্বন্দ্বীর। তোলা ফেলা, ফেলা তোলা। একবার আমি ফেলি, একবার তিনি ফেলেন। একবার দুবার ফাউলও করে ফেললুম। ভদ্রলোকের বগলে কাতুকুতু। এত মাংস, কোনও সেনসেশন নেই। কোনও অনুভূতিই নেই। দুজনে সিনেমা দেখা ভুলে হাতলে হাত রাখার সংগ্রামে বিভোর হয়ে রইলুম। বিনা রণে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী। ধপাস করে আলো জ্বলে উঠল। দুজনে দুজনের দিকে তাকিয়ে আছি। ভদ্রলোক বুকপকেট থেকে একটা কার্ড বের করে আমার হাতে দিলেন। রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। ভয়েই মরি। কপালে জেল লেখা আছে। ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'গুড ফাইটার। সমানে লড়ে গেছ। গোঁ আছে। চাকরিবাকরি করো?' বললুম, 'না। চাকরি জোটেনি বলেই তো সিনেমা দেখছি।'
'কার্ডে ঠিকানা আছে দেখা কোরো।'
পরিচয় পাওয়ার পর ভদ্রলোককে আমি সমীহ করতে শুরু করেছি। গদগদ গলায় বললুম, 'আজ্ঞে হ্যাঁ, করব।' দেখা করেও ছিলুম। তিনি আমাকে অনেক সাহায্যও করেছিলেন।
জীবনের প্রথম চাকরিটা তাঁর কৃপাতেই হয়েছিল। বহুবার বহু ব্যাপারে তাঁর বাড়িতে গেছি, ভালোমন্দ খেয়ে চলে এসেছি।
বাংলা সিনেমার মৃত্যু দৃশ্য নিয়ে আমার একবার রিসার্চ করার বাসনা জেগেছিল। সব সিনেমাতেই নায়ক অমর। নায়ককে বিরহের গান গাইবার জন্যে নায়িকারা কখনও-সখনও মারা যেতে পারেন। তবে নায়ক নায়িকার জুটি যদি বক্স অফিস হয়, তা হলেই দুজনেই অমর। মরবেন নায়ক নায়িকার বাবা, মা। আর সে মৃত্যু প্রায় একইরকম। বালিশ থেকে মাথাটা ঠেলে উঠবে ইঞ্চি তিনেক, তারপর 'ঝাং'। মাথাটা পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাদ্যযন্ত্রের ঝঙ্কার, বেহালার করুণ প্রলাপ। যেন যমদূতেরা যন্ত্রপাতি নিয়ে সব রেডি হয়েছিলেন। কুঁই কুঁই করে বাজাতে শুরু করলেন। মৃত্যু কত দু:খের কারণ হওয়া উচিত। আমার ভীষণ হাসি পেত। আর এই হাসির জন্যে উত্তর কলকাতার এক সিনেমা হল থেকে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।
শেষ অভিজ্ঞতা, বিবাহ বিচ্ছেদের মুখ থেকে ফিরে আসা। শো শেষ হল। চৌরঙ্গির সিনেমা হল। গলগল করে বেরিয়ে আসছি পচা কুমড়োর ভূতির মতো। আমার পাশে আমার স্ত্রী। হঠাৎ কখন তিনি সরে গেছেন। পাশে আর এক মহিলা। পায়ে পায়ে, কাঁধে কাঁধে সব বেরিয়ে আসছি। আমি ভাবছি, আমার পাশে আমার সতী-সাবিত্রী। হাতটা হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে পাকড়াও করে ধরে, সিনেমার আলোচনা করতে করতে একটা ঘোরের মধ্যে পার্ক স্ট্রিট অবদি যাওয়ার পর হঠাৎ খেয়াল হল, আমার স্ত্রীর তো খোঁপা ছিল, এ তো দেখছি বব। তার ঠোঁট সাদা, এ তো রাঙা! এ সুন্দরী কে? আর কোনও কথা নয়। বাঁ-পাশে মিউজিয়ামের গলি। হাত ছেড়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়। নিউ মার্কেটের কাছে এসে দেখি আমার লিগ্যাল ওয়াইফ এত জিনিস থাকতে ঝাড়ু দর করছেন। ফুলঝাড়ু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন