সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘ডাক্তারবাবু! বড় কষ্টে আছি। আপনি যে কাঠের ঠ্যাংটা ফিট করে ছিলেন তার যন্ত্রণায় এখন মরোমরো।' ডাক্তারবাবু অবাক হয়ে বললেন, 'তাজ্জব কী বাত! কাঠের পা তো কঠেরই পা। কাঠের কি প্রাণ আছে, যে যন্ত্রণা দেবে! কী আবোল-তাবোল বকছেন!'
ভদ্রলোক করুণ মুখে বললেন, 'আজ্ঞে, নিজস্ব প্রাণ নেই, প্রাণ পায় আমার স্ত্রীর হাতে। রেগে গেলেই ওইটা খুলে দমাদ্দম পেটাতে থাকে আমাকে।'
'তাহলে ওটা বরং খুলে উনুনে ঢুকিয়ে দিন, আপনার ওই দেড় ঠ্যাংই ভালো!'
আমাদের এই কৃত্রিম সভ্যতা কাঠের ঠ্যাং-এর মতোই। সুখ-এর চেয়ে যন্ত্রণাই দেয় বেশি। স্বাভাবিক জীবন থেকে সরে গেছে, ফলে আর্তনাদ বেড়েছে। ঘরে ঘরে প্রাণহীন আবর্জনা। নড়বার, চড়বার জায়গা নেই।
একজন অসুস্থ বললেন, 'মানুষের ডাক্তার আমার কিছু করতে পারবে না, ডেকে আন এক পশুচিকিৎসককে।' ভায়রা ভাই জিগ্যেস করলে, 'কেন ভাই এমন বলো?'
'একটু ভাবলেই বুঝতে পারবে। আমি ঘোড়ার মতো পরিশ্রম করি, কুকুরের মতো জীবনযাপন করি আর এক নির্বোধ গরুর সঙ্গে ঘুমোই। আমার চিকিৎসা ভেটিনারি ডাক্তার ছাড়া কে করবে!'
মানুষ অবশ্যই পশু; কিন্তু তার কিছু বাড়তি জিনিস ছিল। চেতনা, ভালো মন্দ বোধ, শ্রেষ্ঠত্বের প্রচ্ছন্ন একটা অহংকার। সেই মানুষকে যখন পারিপার্শ্বিকের চাপে বোধহীন দাসের জীবনযাপন করতে হয়, তখন সে মনোবিকলনের শিকার হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে এসে একজন বললেন, 'ডাক্তারবাবু, আমি স্কিজোফ্রেনিক হয়ে গেছি।'
'কী করে বুঝলেন?'
'কী করে একজনের রোজগারে চারজন বেঁচে আছি? আমি, আমার স্ত্রী, ভাই, বোন!'
উন্মাদ ছাড়া, কে বাঁচতে পারে এই আর্থসামাজিক পরিস্থিতিতে। একজন এসে বলছেন, 'সব সময় নিজেকে মনে হয় মুরগির বাচ্চা।'
'কত দিন হল, এই চিকেন ফিলিংস?'
'বেশ কিছু দিন।'
'কী করছিলেন এতদিন, আসেননি কেন?'
'স্ত্রীর বাধা।'
'কীসের বাধা?'
'ওয়াইফ, বললে, অপেক্ষা করে দ্যাখো না, বাচ্চাটা বড় হলে ডিম পাড়তেও তো পারে!'
ডাক্তারবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, পাড়বে তবে অন্ড নয় ব্রহ্মাণ্ড। এখন নিয়মিত ঘুমের ওষুধ চালিয়ে যান মাস তিনেক। যত জটিল হচ্ছে জীবন, মানুষের মন যত বিষণ্ণ হচ্ছে, রোগও তত বাড়াছে। সুস্থ মানুষ কোথায়! রাগি মানুষ, তিরিক্ষি মানুষ, দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ, সুবিধেবাদী, সবাই মানুষ; কিন্তু প্রত্যেকেরই আগে কুৎসিত মানুষের বিশেষণ।
ডাক্তারবাবু বেরিয়ে এলেন রোগীর ঘর থেকে—'একটা স্ক্রু-ড্রাইভার আছে!' দেওয়া হল।
আবার বেরিয়ে এলেন, 'প্লাস আছে!'
পরিবার পরিজন ভীত, 'কেস কী খুব সাংঘাতিক ডাক্তারবাবু!'
ডাক্তার বললেন, 'ধুর মশাই, নিজের ব্যাগটাই খুলতে পারছি না! রোগী এখনও দেখাই হয়নি!' আধুনিকতার ব্যাধি সারবে কী, চিকিৎসার ব্যাগই খোলা যাচ্ছে না!
ডাক্তারবাবু বলছেন, 'আপনার কাশিটা বেশ সরল হয়েছে। তার মানে, আমার ওষুধ ধরেছে।'
রোগী বেজার মুখে বললেন, 'আজ্ঞে না, ওষুধে ঘোড়ার ডিম হয়েছে। আমার লাগাতার অভ্যাসে সরল হয়েছে ডাক্তারবাবু!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন