তাসের ঘর

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। মাঝে মাঝে দমকা হাওয়া আসছে উত্তর থেকে। ভীষণ ঠান্ডা। অন্যদিন এই সময়টায় শশাঙ্কবাবু সাধারণত বেড়াতে যান। গলি পেরিয়ে বড় রাস্তা। বড় রাস্তা পেরিয়ে আবার গলি। গলির মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে সন্ধের মুখেই ফিরে আসেন বাড়ির দরজায়। বৃদ্ধ মানুষ। সকাল-বিকেল না বেড়ালে ভালো হজম হয় না। এই বয়সে লোভটাও বাড়ে। মাঝে মধ্যে লুকিয়ে-চুরিয়ে এটা সেটা খেয়ে ফেলেন। তার পর পেট যখন হাঁসফাঁস করে তখন প্রতিজ্ঞা করেন, না আর কখনও অখাদ্য-কুখাদ্য খাব না। আজ সেইরকম একটা দিন। সকালে মেঘলা দেখে দুটো চপ খেয়েছিলেন। দুপুরে খেয়েছেন খিচুড়ি আর সেঁকা পাঁপড়। একটু আগে খেয়েছেন চা আর নিমকি। এখন বেশ অস্বস্তি হচ্ছে। অন্যদিন এক মাইল বেড়ালে আজ তিন মাইল বেড়ানো উচিত।

ঘরের একটা জানালা খুলে শশাঙ্কবাবু আকাশের দিকে তাকালেন। আরও কালো হয়ে এসেছে আকাশ। চারপাশ যেন মাকড়সার জালে ঢাকা পড়ে গেছে। ছাতা নিয়ে বেরনো যেত যদি দমকা হাওয়া না থাকত। জানালাটা আবার বন্ধ করে দিয়ে ঘরের মধ্যেই পায়চারি শুরু করলেন। সন্ধের আগেই ঘরে অন্ধকার নেমেছে। আলোটা জ্বালালেও হয়, না জ্বালালেও হয়। সারা দুপুর অনেক পড়েছেন। ঝাপসা আলোয় পায়চারি ভালো। ঘরে ঘুরে ঘুরেই তিন মাইল বেড়িয়ে নিতে হবে।

একটা ফ্ল্যাটের একেবারে ওপরের তলায় শশাঙ্কবাবু থাকেন। স্ত্রী মারা গেছেন। একটি ছেলে, একটি মেয়ে। দুজনেই উচ্চ শিক্ষিত। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। থাকে জামসেদপুরে। ছেলের বিয়ে হয়নি। ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বড় চাকরিতে ঢুকেছে। ছেলের বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বেশি দেরি করতে চান না। বৃদ্ধ বয়সে একা থাকতেও ভালো লাগে না। সারাদিন নি:সঙ্গ। বই, কাগজ, ছবি, আকাশ, ফুলগাছের টব, বারান্দা, রাস্তা, আশপাশের বাড়ি—এই তো তার জগৎ! এর বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। কাঁহাতক ভালো লাগে। ঠিকে একজন কাজের লোক আছে। ফুড়ুক করে আসে, ফুড়ুক করে পালিয়ে যায়। মাঝে মধ্যে একটা ছোঁচা বেড়াল আসে সঙ্গ দিতে। তিনি তাকে দুধ রুটি মাছ খাইয়ে তোয়াজ করেন। যদি পোষ মেনে যায়। একটা কিছু নিয়ে থাকতে হবে তো।

শশাঙ্কবাবু এতক্ষণ গোল হয়ে ঘুরছিলেন। হঠাৎ তাঁর একটু মজা করার ইচ্ছে হল! ঘুরে ঘুরে ইংরিজি অক্ষর লিখতে শুরু করলেন—এ বি সি ওয়াই এম ডবলু। রাত আটটা কি নটার সময় সুধী আসবে। ছেলের নাম সুধী। তার আগে অবশ্য রান্নাবান্না করার মহিলাটি এসে যাবে। মুখে পান। খোঁপাটা মাথার পিছন দিকে উঁচু করে তুলে বাঁধা। মহিলাটির চালচলন কেমন কেমন হলেও রাঁধে ভালো। কামাই করে না।

হঠাৎ কলিং বেলটা বেজে উঠল। এমন সময় কারুর তো আসার কথা নয়। আজকাল পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে দরজার কড়া নড়লে, কি বেল বাজলে ভয় করে। একা থাকেন। শরীরে তেমন শক্তিও নেই। অস্ত্রও রাখেন না। ইদানীং ফ্ল্যাট বাড়িতেই তো নানারকম খুনখারাপি হচ্ছে। দরজার ম্যাজিক আইও নেই যে আগন্তুককে দেখে নেবেন।

শশাঙ্কবাবু গম্ভীর গলায় জিগ্যেস করলেন—কে?

সঙ্গে সঙ্গে ওপাশ থেকে জবাব এল—আমি।

—কে সন্ধ্যা?

—না আমি।

—তবে কি রমা?

রমা হল নীচের ফ্ল্যাটের পরেশবাবুর মেয়ে। মাঝে মাঝে বেড়াতে আসে। মেয়েটি দেখতে শুনতে ভালো, তবে ছেলের বউ করা চলে কি না ভাবতে হবে।

—না আমি।

শশাঙ্কবাবু খুব সমস্যায় পড়ে গেলেন। মহিলা কণ্ঠ, অথচ সন্ধ্যা নয়, রমা নয়। তাহলে কে? কোনও পুরুষ মহিলার গলা নকল করছে বলে মনে হয় না। ওপাশে নির্ভেজাল কোনও মহিলাই দাঁড়িয়ে আছেন। একমাত্র মহিলারাই কে জিগ্যেস করলে আমি আমি করেন। তা ছাড়া শাড়ির খসখস শুনতে পাচ্ছেন।

—দয়া করে নামটা বলবেন? শশাঙ্কবাবু সরাসরি নাম জিগ্যেস করলেন।

—দরজাটা খুলুন। নাম বললে চিনতে পারবেন না।

—না না, আজকাল দিনকাল ভালো নয়। পরিচয় না দিলে দরজা খুলব না।

—আ গেল যা। পুরুষ মানুষ হয়ে মেয়েছেলের মতো ভয়ে মরছে দ্যাখো!

শশাঙ্কবাবু অবাক হয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কথা শুনে বুঝতে পেরেছেন, চোর ডাকাত নয়, আদি অকৃত্রিম গেরস্থ মহিলা। সাহস করে দরজাটা খুলে দিলেন। দরজার সামনে মোটাসোটা মাঝবয়সী এক মহিলা। পাকা পেয়ারার মতো রং। হাতে ঝুলছে পেটমোটা চটের লেডিজ ব্যাগ। মহিলা সংক্ষিপ্ত একটি নমস্কার ঠুকেই বললেন,

—বিপদে পড়ে এসেছি। চিনতে পারছেন কি না জানি না। পেছনের ফ্ল্যাটের দোতলায় থাকি। দু-একবার চোখাচোখি হয়েছে। একদিন বাসে ওঠার সময় আমাকে ধাক্কা মেরে নিজেই টাল খেয়ে পড়ে যাচ্ছিলেন। ধরেছিলুম বলে মাথাটা পিছনের চাকায় যায়নি। মনে পড়ছে?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। ভেতরে আসুন। কী বিপদ বলুন?

মহিলা ভেতরে এসে দরজার ছিটকিনি লাগাতে লাগাতে জিগ্যেস করলন,

—এখন কারুর আসার সম্ভাবনা আছে?

—আজ্ঞে না।

—বেশ—খুব ভালো কথা। আপনার শোওয়ার ঘরে একবার চলুন তো।

শশাঙ্কবাবু মহিলার অসংকোচ ব্যবহারে প্রথম থেকেই হকচকিয়ে গিয়েছিলেন, এইবার একেবারে অভিভূত হয়ে বললেন,

—না না, শোওয়ার ঘরে কেন। বসার ঘরে বসাই তো ভালো।

—বসতে আমি আসিনি। এসেছি কাজে। এ কাজটা শোওয়ার ঘরে না গেলে হবে না।

কথা বলতে বলতেই মহিলা শোওয়ার ঘরের দিকে এগোতে লাগলেন। শশাঙ্কবাবু খুব অবাক হলেন। কোনটা শোওয়ার ঘর মহিলার জানা। হাত ধরে টেনে আনতেও পারছেন না। পায়ে পায়ে এগোতে লাগলেন। শোওয়ার ঘরেই সংসারের যথাসর্বস্ব। দুপাশে দুটো খাট। একটা নিজের অন্যটা ছেলের। দুজনে একই ঘরে শোন। শশাঙ্কবাবু একা শুতে পারেন না। ঘুম আসে না, ভয় ভয় করে। দরজার পাাশে আলোর সুইচ। জ্বালাতে যাচ্ছিলেন। মহিলা হাঁ হাঁ করে উঠলেন—

—খবরদার না। আলো জ্বালালেই সব মাটি হয়ে যাবে।

শশাঙ্কবাবু হাত সরিয়ে নিয়ে জিগ্যেস করলেন,

—কী করতে চাইছেন আপনি? আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।

মহিলা শশাঙ্কবাবুর বালিশ থেকে তোয়ালেটা তুলে নিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বললেন,

—ওয়াচ। ওয়াচ করতে চাইছি।

—তার মানে? কাকে ওয়াচ করবেন?

—ওই যে, ও বাড়ির বুড়োটাকে। আমার স্বামী।

শশাঙ্কবাবুকে আর কোনও প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে উত্তর দিকের জানালার খড়খড়িটা ফাঁক করে দেখতে দেখতে বললেন,

—হুঁ, আলো জ্বালা হয়নি। তুমি যাও ডালে ডালে আমি যাই পাতায় পাতায়। কতক্ষণ তুমি আলো না জ্বেলে থাকবে। এই আমি বসলুম খাটের কিনারায়।

শশাঙ্কবাবু অবাক হয়ে দেখলেন, মহিলা তার খাটের পাশে বেশ জাঁকিয়ে বসেছেন। একটা পা তুলে দিয়েছেন মাথার বালিশে। কিছু বলতেও পারছেন না চক্ষুলজ্জায়। অথচ প্রায় অপরিচিতা এক মহিলা একেবারে বিছানায় গিয়ে বসবেন এটাও বরদাস্ত করা যায় না।

ছেলের খাটে বসে ব্যাপারটাকে একটু পরিষ্কার করার জন্যে জিগ্যেস করলেন,

—ব্যাপারটা কী?

—ব্যাপার? বুড়োকে ঘোড়া-রোগে ধরেছে।

—বুড়ো কাকে বলছেন, আমাকে?

—ছি:, আপনাকে কোন সাহসে বলব? বলছি আমার কত্তাকে। সেই কচিখোকা দেবতাটিকে।

—তার মানে?

—তাহলে একটু ভেঙেই বলি। তার আগে জিগ্যেস করি, চায়ের ব্যবস্থা-ট্যবস্থা আছে?

—ব্যবস্থা আছে, করার লোক নেই।

—একটু চা না খেলে যে মরে যাচ্ছি। আমি করলে আপত্তি আছে?

—আপত্তি নেই, তবে সেটা কি ভালো দেখাবে।

—ও: বাবা, আজকাল আবার ভালো-মন্দর অত বিচার আছে নাকি! চলুন কোথায় কী আছে দেখেনি।

চা তৈরি হল। শশাঙ্কবাবু বিস্কুট বের করলেন। বসার ঘরেই চা-পর্ব শুরু হল। মহিলা চা খেতে খেতে নিজেকেই নিজে তারিফ করলেন,

—চা-টা বেশ করেছি, কী বলেন?

—হ্যাঁ বেশ হয়েছে।

—তাও তো মন মেজাজ খিঁচড়ে আছে।

চা খেতে খেতে মহিলা যা বললেন, স্বামী ঠিকেদারি করেন। পয়সাকড়ি আছে। মহিলা বড় একটি হাসপাতালের নার্স। ছেলেপুলে হয়নি। বছরখানেক হল ভদ্রলোক দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়াকে বাড়িতে এনে রেখেছেন। মেয়েটি কলেজে পড়ে। সেই মেয়েটিকে কেন্দ্র করেই যত অশান্তি। খালি কাপটা টেবিলে রেখে মহিলা বললেন,

—চারদিকে ছি ছি পড়ে গেছে। কান পাতা যাচ্ছে না। নীচের ফ্ল্যাটের নন্দা অনেক কিছু দেখেছে। সেদিন আমার খোঁজে দুপুরবেলা ওপরে উঠেছিল। ওপরে উঠে দেখে, আরে ছি ছি, বুড়োর মুখে আগুন।

শশাঙ্কবাবুর অন্যের পারিবারিক কথা শুনতে ভালো লাগছিল না। এসব নোংরা ব্যাপারে তাঁর জড়িয়ে পড়তে একদম ইচ্ছে করছিল না। মহিলাকে কোনওরকমে বিদায় করতে পারলে তিনি বেঁচে যান। এ কী উটকো ঝামেলা! শশাঙ্কবাবু চাইলেই তো আর হবে না, মহিলা নিজের মনে বলছেন,

—অ্যাঁ, যে বয়েসে লোক বনে যেত, সেই বয়েসে তুই ভর দুপুরে একটা ছুকড়িকে কোলে বসিয়ে মুখে রসগোল্লা গুঁজে দিচ্ছিস। তাহলে আমার যখন নাইট ডিউটি থাকে তখন তুই কী করিস? কী শয়তান, কী শয়তান!

মহিলা সোফা ছেড়ে উঠে পড়লেন। শশাঙ্কবাবু হাঁ করে দেখছেন তাঁর গতিবিধি। আবার শোওয়ার ঘরের দিকে চলেছেন। উত্তরের জানালা দিয়ে তাকালে একটা বারান্দার কিছু অংশ, একটা ঘরের পুরোটাই চোখে পড়ে। খাট ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার আলনা। বারান্দার রেলিং-এ লাল টকটকে একাটা সায়ার তলার দিক হাওয়ায় অসভ্যের মতো ফুলে ফুলে উড়ছে। খড়খড়ি জানালার পাখি ঈষৎ ফাঁক করে মহিলা নিজের শোওয়ার ঘরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বললেন,

—মহারাণির চুল বাঁধা হচ্ছে। আহা যেন অভিসারে যাবেন! মরণ আর কি? বুড়োটা গেল কোথায়, দেখছি না তো।

শশাঙ্কবাবুর খুব ইচ্ছে করছিল ঘটনার নায়িকাকে একবার চোখের দেখা দেখেন। মনের ইচ্ছে মনেই চেপে রাখলেন। মহিলা দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

—শয়তানি আমার মাথা খাবার জন্যে এসেছেন। মানুষের উবগার করতে নেই।

—আপনার স্বামীকে বারণ করুন না। বোঝাতে পারছেন না!

—বোঝানো? ঝ্যাঁটাপেটা পর্যন্ত হয়ে গেছে। পুরুষ হল পতঙ্গ। আগুন দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমার দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন তো, আর ওটাকেও একবার এখানে এসে দেখে যান। তারপর বলুন তো, আমার কোন জিনিসটা কমতি আছে! আসুন, আসুন।

শশাঙ্কবাবু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন। চোখে ক্যাটারাক্ট ফর্ম করছে। ভালো দেখতে পেলেন না। তবু তাঁর মনে হল, এই মহিলার তুলনায় ওই মেয়েটির সব কিছুই কম—বয়েসে কম, মেদ কম। বেশির মধ্যে চুল, শরীরের খাঁজ। সরে এলেন শশাঙ্কবাবু। এইবার তাঁকে বিচারকের রায় দিতে হবে

—না আপনার চে' সব কিছুই ওনার কম কম। কেবল চুলটাই যা বড়।

আরে মশাই, ওই বয়েসে আমার চুলও পাছা ছাড়িয়ে নামত। এখনই না হয় টিকটিকির ন্যাজ হয়ে গেছে। সব পুরুষেরই এক রা, সব শেয়ালের মতো। চুল আর বুক দেখেই গলে গেল।

শশাঙ্কবাবু নিজেকে খুব অপরাধী মনে করলেন। সত্যিই তো, মেয়েদের ওই দুই বস্তুর প্রতি যৌবনে তিনিও ভীষণ আকর্ষণ বোধ করতেন। মনটা কেমন হু হু করে উঠত। সেই আকর্ষণের ছিটেফোঁটা বুড়ো শরীরে এখনও পড়ে আছে। হিংসে হলে কী হবে, মেয়েটির চুলের ঢল সত্যিই চোখে পড়ার মতো। মাথাটা একপাশে কাত করে চুলে চিরুনি চালাচ্ছে, সন্ধেবেলা আলো ঝলমলে ঘরে দীর্ঘকায় স্লিম এক মহিলা, সংসারে এর চে' সুখের দৃশ্য আর কী আছে। অথচ এই মহিলাটি রাগে জ্বলে যাচ্ছেন।

চটের হাতব্যাগ থেকে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে মহিলা চ্যাপ্টা একটি কৌটো বের করে মুখে কিছু পুরলেন। পাশের ঘরের আলোর আভা এ ঘরে এলেও শশাঙ্কবাবু স্পষ্ট কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। শব্দ শুনে মনে হল পান চিবোচ্ছেন।

—পান খাবেন? মিষ্টি মশলা দিয়ে সাজা।

—সন্ধেবেলা পান আর খাবো না। আগে খুব খেতুম। এখন সকালে খাবার পর সুপুরি ছাড়া এক খিলি খাই।

—আমি খুব খাই। ঘুম থেকে উঠে শুরু করি যতক্ষণ না শুতে যাচ্ছি। কিছু একটা নিয়ে থাকতে হবে তো। ছেলে নেই পুলে নেই। সংসারটাও পরের হাতে চলে যেতে বসেছে। ফ্রাসট্রেশন, ফ্রাসট্রেশন।

মহিলা চৌকির ওপর বেশ ভালো করে নড়েচড়ে বসতে বসতে খুব ঘরোয়া গলায় জিগ্যেস করলেন,

—ওই খাটে কে শোয়?

—আমার ছেলে।

আমি যেটায় বসে আছি?

—ওটা আমার।

—একই ঘরে বাপ ছেলে। ছেলের বিয়ে দিতে হবে তো?

—হ্যাঁ, মেয়ে দেখছি।

—তখন তো ঘর আলাদা করতে হবে।

—বসার ঘরের একপাশে সরে যাব। অসুবিধের কিছু নেই।

—ছেলের বউ একটু দেখে শুনে করবেন। আজকালকার মেয়েদের ছিরি দেখছেন তো। নিজের বউটিকে তো খেয়ে বসে আছেন। যে বয়েসে নিজের বউকে সব চে' বেশি দরকার হয় সেই বয়সেই তো ঘর খালি। এখন লাগছে কেমন একলা একলা?

—একটু ফাঁকা ফাঁকা লাগে। সকলকেই তো যেতে হবে। আগে আর পরে।

শশাঙ্কবাবু শব্দ করে হাসলেন। হেসে অন্যের চোখে ধরা পড়ে যাওয়া নি:সঙ্গতাটা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। মহিলা শুনলেন কি শুনলেন না বোঝা গেল না। জানালার পাখি খুলে চোখ রেখেছেন। পুরো মনযোগটাই ওখানে। চাপা একটা গর্জন শোনা গেল।

—আ-হা-হা, পটের বিবি। মরা মানুষেরও লজ্জা থাকে, উনি শুধু সায়া পরে ঘরময় উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছেন। জানালা খোলা। আলো জ্বলছে। সায়ার রং দেখো—লাল, নীল, হলদে, সবুজ। যে জিনিস চাপা থাকবে তার আবার অত রঙের বাহার কী জন্যে? আমাদের আমলে সব সাদা ছিল। এখন আবার লুঙ্গি উঠেছে। বুড়োটা নিশ্চয় ঘরের মধ্যেই কোথাও ঘাপটি মেরে বসে বসে ঊর্বশীর নৃত্য দেখছে। বাড়ি নয় তো বেশ্যালয়।

জানালার পাখি ফেলে দিয়ে মহিলা সোজা হয়ে শশাঙ্কবাবুকে প্রশ্ন করলেন,

—আজকাল মেয়েগুলোর কী হয়েছে বলতে পারেন? পুরুষদের না হয় ফুলে ফুলে মধু খেয়ে উড়ে বেড়ানোই চিরকালের স্বভাব। ছুঁড়িগুলোর এই মতিচ্ছন্ন ধরেছে কেন?

শশাঙ্কবাবু কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। প্রশ্নের কী জবাব দেবেন ভেবে পেলেন না। এক সময় বললেন,

—কালের হাওয়া।

শশাঙ্কবাবু নিজেকে সামলে নিয়ে সাবধানে, হিসেব করে করে বললেন,

—এক এক বয়সের মেয়েকে এক এক রকম দেখতে। কম বয়েসে এক রূপ, বেশি বয়েসে আর একরকম রূপ। দুটো রূপই ভালো।

মহিলা খাটের ওপর বেশ করে নড়েচড়ে বসলেন। সাবেক আমলের অমন শক্ত খাটও শব্দ করে উঠল। মুখে আর একটু মশলা ফেলতে ফেলতে বললেন,

—রূপসী অ-রূপসীর কথা হচ্ছে না, আমার কথা হল তোয়াজ। ক'টা স্বামী মশাই স্ত্রীকে তোয়াজে রাখতে পারে? সারাজীবন বাবুরা ধামসে যাবেন, বুড়ো বয়েসে চাইবেন স্ত্রীর যৌবন, পাছা ভরতি চুল, সরু কোমর, টান টান তেল তেল চামড়া, হাত ভরতি...।

শশাঙ্কবাবু আতঙ্কে কেশে উঠলেন। এঁর মুখে তো কোনও কথাই আটকায় না।

—কাশি হয়েছে দেখছি। আর হবে না! বর্ষায় চারদিক ঢ্যাপ-ঢ্যাপে হয়ে আছে। রক্তের জোরও তো কমছে। বুকে বসেছে?

—না, শুকনো কাশি।

—একটু মালিশটালিশ, কেই বা করবে! এই বয়েসের বিধবাদের বড় কষ্ট। ওই মড়া কিন্তু বুঝল না, বউ কী জিনিস? এই তো সেবার, অস্থানে বিষফোঁড়া হল। সারারাত ঘুমোতে পারে না। কে সেবা করল? ফুর্তির মেয়ে জুটবে অনেক। কথায় বলে ভাত ছড়ালে কাগের অভাব হয় না। কিন্তু সেবার মেয়ে ওই একটাই—বউ। কিল মারো, চড় মারো, ঝ্যাঁটা মারো, শেষ পর্যন্ত বউ-ই ভরসা। বয়েস তো হল, অনেকের অনেক কেতাই তো দেখলুম, ঘাড়ে পাউডার, চুনট করা ধুতি, বার্নিস করা জুতো, শালির সঙ্গে রপটারপটি, ভাদ্দর বউয়ের সঙ্গে গা ঘসাঘষি, বন্ধুর বউয়ের সঙ্গে নুকোচুরির পিরিত, মাসকাবারি মেয়েমানুষ, শেষ কালে বুড়ো এসে মরল বউয়ের কোলে—ওগো তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই গো! ঘেন্না ধরে গেল জীবনে।

মহিলা জানালার পাখি ফাঁক করে আর একবার দেখলেন। শশাঙ্কবাবু ভেবেছিলেন কোনওরকম মন্তব্য হবে। না, হল না। অনেকক্ষণ বসে থেকে নিজেকে এইবার একটু ক্লান্ত মনে হচ্ছে। তা হলেও সন্ধেটা বেশ কাটল। মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। একটা হাই উঠল। দু হাত মাথার ওপর তুলে আড়মোড়া ভাঙলেন। ঘরে আলো না জ্বললেও, বারান্দা থেকে আলোর একটা আভা ঘরে এসেছে। একটা আবছা স্বপ্ন-স্বপ্ন পরিবেশ। চওড়া পাড় তাঁতের শাড়ি, হালকা রঙের ব্লাউজ। শরীরটা সামান্য ভেঙেচুরে খুব পরিচিত একটা ভঙ্গি তৈরি হচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেও তো এইভাবে শরীর ভাঙত। বয়েস যখন কম ছিল শশাঙ্কবাবু ঠিক এই রকম মুহূর্তে লোভ সামলাতে না পেরে স্ত্রীর কোমর জড়িয়ে ধরে খাটে উলটে ফেলে দিতেন। না, না অতীত অতীতই, প্রাচীন ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে মনকে দুর্বল করে তোলা ঠিক নয়।

বিছানা থেকে চটের হ্যান্ডব্যাগটা তুলে নিয়ে মহিলা বললেন,

—যাই। গিয়ে সংসারের চুলোই আগুন ধরাই। মেয়েদের এই জ্বালা, যখন আদর জোটে তখন ফুটকলাই নিয়ে ফোটে। যখন আদর টুটে তখন মুগুর দিয়ে ঠোকে।

শশাঙ্কবাবু পেছন পেছন দরজা পর্যন্ত এলেন। বেঁটে মহিলা, দরজার ছিটকানিতে হাত পাবেন না। ঘাড়ের কাছে সরু সোনার হার চিকচিক করছে আলো পড়ে। গোল-গোল হাতে সাদা শাঁখা। শশাঙ্কবাবু গড়ন-পেটন মানেন। তন্ত্রে এই ধরনের চেহারার যে উল্লেখ আছে তা যদি ঠিক হয়, তাহলে এই মহিলা লক্ষ্মীমন্ত। ছিটকিনি খুলতে খুলতে প্রশ্ন করলেন,

—আপনাকে বিয়ে করার পরই কত্তার ভাগ্য ফিরেছে, তাই না?

দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে মহিলা বললেন,

—ঠিক ধরেছেন তো! জ্যোতিষ-টোতিষ করেন নাকি?

—তেমনভাবে করি না, তবে বেকার মানুষ, একটা কিছু নিয়ে থাকতে হবে তো।

—তাহলে এবার যেদিন আসব কোষ্ঠীটা আনব।

মহিলা বেরোচ্ছেন শশাঙ্কবাবুর কাজের মহিলাটিও ঢুকছে। অবাক হয়ে একবার তাকিয়ে দেখল। এ আবার কে! মেয়েটির আজ টান করে চুলবাঁধা। ফেত্তা দিয়ে শাড়ি পড়েছে। অন্যদিনের চেয়ে আজ যে সাজের ঘটা একটু বেশি। বেশ গুছিয়ে নিজের মতো করে কাজ করে, তাই বেচাল সহ্য করে নিতে হয়। মাঝে মাঝে গুন গুন করে গানও গায়। একটু ফিচলেও আছে। এই তো সেদিন, শশাঙ্কবাবুরই সামনেই ব্লাউজের মধ্যে দিয়ে হাতার পিছন ঢুকিয়ে পিঠ চুলকোচ্ছিল। কোনও সংকোচ নেই। উলটে জিগ্যেস করল, 'ঘামাচির পাউডার আছে আপনার কাছে?' পাশ দিয়ে চলে গেলে কেমন একটা যৌনতার আঁচ গায়ে লাগে। রক্ত ঠান্ডা হয়ে এসেছে, তাও মাঝে মাঝে চমকে উঠতে হয়।

দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে শশাঙ্কবাবু নিজের ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বললেন,

—মানু, একটু চা করবে নাকি?

—রান্নাঘরের পাশের কলে অনেকখানি কাপড় তুলে পায়ের গোড়ালি ধুচ্ছিল। ভালো দেখতে পান না তবু ক্ষণিকের জন্যে শশাঙ্কবাবুর নজর চলে গেল শ্যামলা দুটি পায়ের গোছে। সায়ার ঝোলা অংশ, শাড়ির পাড়, নির্জন বারান্দা, ঝিমঝিম বৃষ্টির শব্দ, ভিজে গাছের পাতা দোলানো বাতাস, প্রতিবেশীর রেডিও থেকে ভেসে আসা সঙ্গীত।

না:, জীবন একটা মধুর অনুভূতি। ফুরিয়ে গিয়েও ফুরোতে চায় না। হঠাৎ মনে পড়ল, যুও, যুবতী, ভাজা। তিন বাদলের মজা।

—মানু আর পা ঘসো না, এবার ক্ষয়ে যাবে।

—রাস্তার যা অবস্থা ঘেন্না করে, ম্যাগো।

—জানো তো দাদাবাবু আজ ফিরবে না, কলকাতার বাইরে গেছে।

—জানি, সকালে বলে গেছে আমাকে। তার থেকে ওই গামছাটা দিন তো। ওটা নয়, ওটা নয়, ওই পাশের লালটা।

—আরে বাবা লাল-নীল বোঝার মতো কি আর চোখ আছে আমার। এই নাও ধরো।

—বাদাম দিয়ে চিঁড়ে ভাজব, খাবেন?

শশাঙ্কবাবু না বলতে পারলেন না। মানুর খাবার ইচ্ছে হয়েছে। না বললে নৃশংসতা হবে।

—হ্যাঁ হ্যাঁ কেন খাব না? ভাজো ভাজো, বর্ষায় জমবে ভালো।

মানুকে শোনাতে ইচ্ছে করল, যুও, যবুবতী, ভাজা। তিন বাদলের মজা। এসব কথা হঠাৎ বলা যায় না। নিজেকে সংযত করে রাখলেন। তাড়াতাড়ি ঢুকে পড়লেন নিজের ঘরে। মন বড়ো মাতাল হয়েছে। বিবাহিত জীবনের কত অভ্যাস স্ত্রী বিয়োগের পর জোর করে ভুলতে হয়েছে। বাবা! অভ্যাস-দোষ না ছাড়ে চোরে। শূন্য ভিটায় মাটি খোঁড়ে।

বিছানায় কাত মেরে শুয়ে পড়লেন শশাঙ্কবাবু। বেডকভারটা একটু কুঁচকে মুচকে গেছে। বালিশের ঢাকাটা একটু ভিজে ভিজে। চুলের আর তেলের গন্ধ। নাকের কাছে কি একটা সুড়সুড় করছে। হাত বাড়িয়ে আলোটা জ্বাললেন। গোটাকতক লম্বা চুল আটকে আছে তোয়ালের রোঁয়ায়? বেডকভাররের যে জায়গাটায় মহিলা বসেছিলেন সেই জায়গাটাও সামান্য ভিজেছে। শাড়িটা বোধ হয় বৃষ্টিতে ভিজেছিল। আলোটা নিবিয়ে দিলেন। স্ত্রী সুধাও মাথায় গন্ধতেল মাখত। সারা ঘরে এইরকম একটা গন্ধ ভেসে বেড়াত। অনেকদিনের স্মৃতি আবার ভেসে এল। মহিলাশূন্য নীরস সংসারে কিছুক্ষণের জন্যে যেন রসের ধারা বয়ে গেল। শশাঙ্কবাবু চাদরের ভিজে জায়গাটায় বারকয়েক হাত বুলোলেন। বালিশের ঢাকায় মুখ জুবড়ে নিজের স্ত্রীকে মনে করবার চেষ্টা করলেন। যৌবন, সংসার, ভালোবাসা, ঝগড়া, ভাব। শরীরটা মাঝে মাঝেই একটু সঙ্গ চাইত। সুধা সাবধান করত, একটু বুঝে সুঝে খরচ করো, তাহলে দেরিতে ফতুর হবে। নিজেই কেটে পড়লে, পড়ে রইল শশাঙ্ক। কার কখন তেল ফুরোয়, কে বলতে পারবে বাবা।

একটু বোধ হয় তন্দ্রামতো এসেছিল। মানু ঘরে এসে বলছে,

—এ কী, চিঁড়ে খাননি কাকাবাবু! আমি যে চা নিয়ে এসেছি। শশাঙ্কবাবু ধীরে ধীরে উঠে বসলেন।

—আলোটা জ্বাল তো মানু।

ঘরের ওপর আলো লাফিয়ে পড়ল। শশাঙ্কবাবু যেন স্বপ্ন দেখছেন। চোখে ঘুম রয়েছে। সংসারটাকে বেশ ভরাট ভরাট লাগছে। সব যেন ফিরে এসেছে। এ কে? মানু, না সুধা? মানু বললে,

—অবাক হয়ে কী দেখছেন? শরীর খারাপ?

—না, শরীর খারাপ নয়। বিকেলে বেরোতে পারিনি তো, সন্ধের দিকে গা-টা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে।

—সব কটা জানালা বন্ধ করে রেখেছেন, গরম লাগছে না?

চায়ের কাপটা খাটের পাশের ছোট টেবিলে রাখার জন্যে মানু নীচু হল। পরিপাটি করে বাঁধা খোঁপার দিকে শশাঙ্কবাবুর নজর চলে গেল। কুচকুচে কালো চুল। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতে মুছতে মানু বললে,

—যা বর্ষা নেমেছে, কী করে বাড়ি ফিরে যাব ভাবছি?

—বাড়ি ফিরতেই হবে?

—না ফিরলে আর একজন তো হেদিয়ে মরে যাবে।

—না, তেমন হলে এখানেও তো শোওয়ার ব্যবস্থা আছে।

—দেখি।

মানু চলে গেল। একবার শশাঙ্কবাবুর খুব জ্বর হয়েছিল, মানু একদিন সারারাত জেগে সেবা করেছিল। সন্ধে থেকেই মনটা বড়ো দুর্বল হয়ে পড়েছে। যে বাঘ একবার মানুষের রক্তের স্বাদ পায় সে নরখাদক হয়ে যায়। শশাঙ্ক কি সেই বাঘ? ভাজা মুচমুচে চিঁড়েও এখন পাগলে পাগলে খেতে হয়। দাঁতগুলো বাঁধিয়ে ফেললে কেমন হয়! মুখের চেহারাটা আবার যুবকদের মতো হয়ে যাবে! চুলে একটু কলপ। আরও যুবক। মন-পাখি কি বুড়িয়ে গেছে? ভেতরটা আজ বড়ো শিরশির করছে। মানু যখন পেছন ফিরে চলে যাচ্ছিল তখন কেমন মনে হল! না মনটাকে বাঁধতে হবে।

নারী সংসৃতিমূলিকা, অর্গল সুরপূরকের।

চিত্রতমপি নহি দেখহিঁ বুদ্ধিমন্ত ঘনের।

এই সংসারের নারীই হল সংসারের মূল ও মোক্ষপথের বাধা। ছবির মেয়েছেলেও চিত্তচাঞ্চল্যের কারণ হয়। জ্ঞানী ব্যক্তি তাই ছবির মেয়েছেলের দিকেও ফিরে তাকান না।

শশাঙ্কবাবু আলোটা নিবিয়ে দিলেন। বিদ্রোহী শরীরটাকে বিছানায় চেপে রাখার ইচ্ছে। হঠাৎ মনে হল, জানলার পাখিটা ফাঁক করে একবার দেখি। সেই সায়া ফুলে ফুলে উড়ছে। সেই মহিলা ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে খুব হাত নেড়ে অদৃশ্য কাউকে শাসন করছেন। বেশ ব্যক্তিত্ব আছে। সেই মেয়েটি কোথায়! অনেকটা মানুর মতোই দেখতে। মানুর চেহারার বাঁধনটা এখনও ঠিক আছে। একটু যত্নে থাকলে কত লাগদাঁই হত!

দুপুরের দিকে মহিলা এলেন। এখনও বেশ চুল আছে। কপালটা তাই ছোট। বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটছে। নাকের ডগাতেও পুঁতির মতো ঘামের দানা। নাকের ডগা ঘামলে প্রেমিক হয়। দরজাটা ভেজাতে ভেজাতে মহিলা বললেন,

—যত বর্ষা হচ্ছে তত গরম বাড়ছে।

ঘাড় বেঁকিয়ে শাড়ির পেছন দিকটা দেখতে দেখতে বললেন,

—চটি পরে বর্ষায় হাঁটা যায় না। কাদা ছিটকেছে?

শশাঙ্কবাবু দেখলেন। সাদা শাড়ি ভারী শরীরে মোলায়েম হয়ে জড়িয়ে আছে। এখানে-ওখানে সামান্য কাদার ছিটে।

—একটা দুটো ছিটে লেগেছে। একেবারে স্প্রে পেন্টিং হয়ে যায়নি।

—কাদার দাগ ওঠে না বুঝলেন, মনের দাগের মতো।

—ছেলে কোথায়?

—ছেলে বেরিয়েছে।

—আজ আমার অফ ডে। বুড়ো জানে না। প্রথম প্রথম বলত আজ আর বেরিও না সুধা, নাইবা গেলে আজ।

—আপনার নামও সুধা?

—কেন?

—আমার স্ত্রীর নামও সুধা ছিল।

—ও। এখন কী বলে জানেন, তুমি বেরোবে না। না না, কামাই করা ঠিক হবে না। দেশের মানুষ সাফার করবে। ওরে আমার দেশ হিতৈষীর বাচ্চারে। চলুন, ঘরে চলুন।

মহিলার এই আদেশের ভঙ্গিটা বেশ ভালো লাগে। তেমন তেমন মেয়ের ক্রীতদাস হয়েও তৃপ্তি পাওয়া যায়। মনে পড়ছে, দিগ্বিজয়ী যো শূর হোয়, বহুগুণসাগর তাঁহি। ভ্রূ-কটাক্ষ নো করত হোয়, তাকো পদতলমাহি। দিগ্বিজয়ী, মহাবলশালী পুরুষ। মেয়েছেলের কটাক্ষপাতে পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ল। মহিষাসুরের বুকে দুর্গার শ্রীচরণ।

—এই নিন। ভুলিনি। কাশিটাকে তো কমাতে হবে। দু আঙুলে নিয়ে শোবার আগে বুকে লাগাবেন। মালিশ নয় শুধু ওপর ওপর লাগিয়ে দেবেন। আর এই নিন খাবার ওষুধ। শোবার আগে এক চামচে, চেটে চেটে। ভালো মানুষের জন্যে করতে ইচ্ছে করে। মিচকে শয়তানটার জন্যে অনেক করেছি, দাম দিলে না।

—আপনি শুধু শুধু কষ্ট পাচ্ছেন। হয়তো শুধু শুধু সন্দেহ করছেন। ভদ্রলোক হয়তো মেয়ের মতোই ভালোবাসেন।

—কীই?

মহিলা খাটের ওপর ধপাস করে বসে, একটি পা বিছানায় রাখলেন।

—মেয়ের মতো? না, মেয়েমানুষের মতো? শুনুন তবে, ছেলেপুলে হচ্ছে না দেখে দুজনেই ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করালাম। ডাক্তার বললেন, গোলমাল আপনার নয়, আপনার স্বামীর। বুঝলেন ব্যাপারটা। ও তো এখন বেপরোয়া। ঢোঁড়া সাপের বিষ নেই, ছোবলালেও মরবে না! এইবার দেখুন।

উত্তেজিত মহিলা ব্যাগ থেকে একটা ভিউফাইন্ডার বের করলেন,—নিন, চোখে লাগিয়ে দেখুন।

চোখ লাগিয়েই শশাঙ্কবাবু চমকে উঠলেন। উরে বাপ! এ কী! সাপ দেখছেন যেন? জিনিসটা তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিয়ে লজ্জায় চোখ নাবিয়ে নিলেন।

—এইসব জিনিস বাড়িতে আনছে কীসের জন্যে? বলতে পারেন কীসের জন্যে? সন্দেহ! সাধে সন্দেহ আসে? মেয়েছেলে হতে পারি, মুখ্য হতে পারি, তা বলে তো গাধা নই। প্রথম বয়েসে এসবের মানে বোঝা যায়, শেষ বয়সে মরার কালে এত চুলবুলুনি কিসের? সব ওই ছুঁড়ির জন্যে। বুড়ো মড়ার যৌবন ফিরে এসেছে। আমার দিকে আর ফিরে তাকায় না। ভালো কথা বললেও খিঁচিয়ে ওঠে। ওই ছুঁড়ি কিছু বললেই হেসে একেবারে গড়িয়ে পড়ে।

শশাঙ্কবাবু প্রসঙ্গটা ঘোরাতে চাইলেন।

—আজ একেবারে শরতের আকাশ।

—ওসব আকাশ-টাকাশ কবিরা দেখবে। আপনি কি কবি? একটা পান খাবেন নাকি জর্দা দিয়ে?

চৌকো মতো একটা পানের ডিবে খুলে পর পর দুটো খিলি মুখে পুরলেন। ফরসা গাল দুটো ঠেলে উঠল। শশাঙ্কবাবু না বলতে পারলেন না। না বললেই মহিলা সন্দেহ করবেন, দাঁত নেই, ফোকলা দিগম্বর।

—দিন একটা খাই, অনেকদিন ছেড়েছুড়ে দিয়েছি। সুধাও গেছে, পানের পাটও উঠে গেছে।

—আর এক সুধা এসে আবার চালু করে দিচ্ছে। নিন। হাত পাতুন, একটু জর্দা দিই।

—না না জর্দা থাক। মাথা-টাথা ঘুরে পড়ে যাব।

—আহা, কচি খোকা। ঘুরে যায় যাবে, জল থাবড়ে দোব। জর্দার জন্যেই তো পান।

পান, পানের পিক, জর্দা সব ভেদ করে কথা আসছে জড়িয়ে জড়িয়ে। মহিলা উঠে দাঁড়ালেন, পিক ফেলবেন। শশাঙ্কবাবু বুঝতে পেরে বললেন,

—আসুন কোথায় ফেলবেন দেখিয়ে দিই। নর্দমার কাছে এসে ডান হাতে কাপড়ের সামনের দিকটা পুরুষ্টু দুই ঊরুর মধ্যে ঠেসে ধরে, মুখটা ছুঁচা মতো করে পোয়াটাক পিক ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। চারপাশে চোখ ঘুরিয়ে বললেন,

—বাড়িটা নতুন, তবে জায়গা বড়ো কম। আর কী হবে, এরপর আর দাঁড়াবার জায়গাও মিলবে না।

ঘরে ঢুকে নিজেই রেগুলেটার ঘুরিয়ে পাখার চলন বাড়িয়ে দিলেন। খাটের ওপর বসতে বসতে বললেন,

—বেশ শান্তির জায়গা। এক ছুতোর মিস্ত্রির হাতে পড়ে জীবনটা বরবাদ হয়ে গেল।

—কে ছুতোর মিস্ত্রি?

—ওই হল, কনট্র্যাকটারও যা, মিস্ত্রিও তাই। আপনার বউটি এত কম বয়সে খসে গেল কী করে? এমন সুখের সংসার সহ্য হল না বুঝি।

লিভার। লিভারটা নষ্ট করে ফেললে। খালি পেটে কাপ কাপ চা, ঘুরতে ফিরতে মুঠো মুঠো চানাচুর। মেয়েদের স্বভাব জানেন তো একগুঁয়ে, অবুঝ, ভালো কথা কানে ঢোকে না।

—খবরদার বউ নেই বলে যা খুশি তার নামে বলে যাবেন, সেটি হতে দেব না। কিপটেমি করেছিলেন। ভালো করে চিকিৎসা করাননি। বিছানায় শুধু শুলেই হয় না, মাঝে মাঝে রোদেও দিতে হয়।

—চিকিৎসা করাইনি মানে? অ্যালো, হোমিও, কোবরেজি, টোটকা কোনটা বাদ গেছে! নিজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন দিয়ে ফটিক ঠাকুরের দৈব ওষুধও এনেছি। থাকবে না, যে যাবে তাকে আটকে রাখবে কে?

শশাঙ্কবাবুর গলাটা ধরে এল। চোখ ছলছল করছে। কোঁচার খুঁটে চোখ মুছলেন।

—সে কী চোখে জল এসে গেল। ভীষণ দুর্বল মানুষ তো! ওই পাষণ্ডটাকে দেখে শিখুন। এক চোখে কান্না আর এক চোখে হাসি।

—বয়েস হচ্ছে তো? পুরোনো কথা মনে পড়লেই চোখে জল এসে যায়। দু:খের দিনে আমার সঙ্গে কষ্ট করে গেল, সুখের দিনে রইল না। সুধাকে আজকাল বড্ড মনে পড়ে যায়। ভেবেছিলুম ছেলের বিয়ে দিয়ে বুড়োবুড়ি কাশীতে গিয়ে থাকব। তা আর হল না। একলাই যেতে হবে। কত সব ছোট ছোট সাধ আহ্লাদ ছিল, যখন মেটাবার মতো অবস্থা এল, সব ফাঁকা। ছেলের রোজগার, ভালো জামাই, কিছুই সহ্য হল না। হাসতে হাসতে চলে গেল। যাওয়ার সময় বলে গেল, আসছ তো?

টেবিলে মাথা রেখে সুধার শোকে শশাঙ্ক ছেলেমানুষের মতো ফুঁপিয়ে উঠলেন। মহিলার চোখেও জল এসে গেছে। তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে শশাঙ্কর মাথার পেছন দিকের কাঁচাপাকা চুলে হাত রাখলেন। চোখ থেকে এক ফোঁটা জল শশাঙ্কের ঘাড়ে পড়ল। আর এক সুধা শান্ত করার জন্যে কিছু বলতে গেলেন, সঙ্গে সঙ্গে বিষম। পানের কুচি, জর্দার টুকরো শ্বাসনালিতে। দমকা কাশি। মাথার পেছনে রাখা হাত লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছে।

শশাঙ্ক মাথা তুললেন, মহিলার হাত মাথা থেকে খসে, কাঁধ ছুঁয়ে বুকের ওপর দিয়ে নেমে গেল। জোর বিষম। মুখ চোখ লাল হয়ে গেছে। একে ফরসা মানুষ। শশাঙ্ক হাত ধরে খাটে বসিয়ে দিলেন। স্ত্রী সুধার বিষম লাগলে মাথার তালুতে চাঁটা মারতেন। ভালো দাওয়াই। এই সুধার মাথায় কি থাপ্পড় মারা যাবে? যা থাকে বরাতে। শশাঙ্ক ব্রহ্মতালুতে থাবড়া মারতে লাগলেন, দু'চারবার ফুঁও লাগালেন। সিথিঁর কাছে সিঁদুরের রেখা বয়েসে চওড়া হয়েছে, চুলের গোড়ায় সাদার ছোঁয়া লেগেছে। মানুষের মাথা দেখলেই বোঝা যায় কটা ঝড় বয়ে গেছে জীবনের উপর দিয়ে। ভীষণ মায়া হল শশাঙ্কর। জীবনে জীবনে ঠোকাঠুকি কবে যে শেষ হবে!

—দাঁড়ান এক গেলাস জল নিয়ে আসি।

শুধু জল নয়, একটা তোয়ালেও ভিজিয়ে আনলেন।

—নিন, মুখটা বেশ করে মুছে ফেলুন। লাল টকটকে হয়ে উঠেছে। উঁহু ওভাবে নয়, জলটা ধীরে ধীরে খান, তা না হলে আবার বিষম লেগে যাবে।

বুকের ওপর থেকে কাপড় খসে পড়েছে। শশাঙ্কর মনে হচ্ছিল ভিজে তোয়ালে দিয়ে নিজে হাতে মুছিয়ে দেন।

—একটু না হয় ফ্ল্যাট হয়ে শুয়ে পড়ুন। না না, সংকোচের কোনও কারণ নেই। আমি পাশের বসার ঘরে চলে যাচ্ছি।

—কেন, আপনিও ছেলের খাটে শুয়ে পড়ুন। এই বয়েসে খাবার পর একটু বিশ্রাম করতে হয়।

—আপনার অসুবিধে হবে।

—অবাক করলেন মশাই। আপনার বাড়িতে আমি তো একটা উৎপাত। আমার জন্যে কষ্ট করে সারা দুপুর ঠায় বসে থাকবেন?

—না বসে থাকব কেন। ও ঘরে গিয়ে কাত হয়ে থাকব।

—কেন, এ ঘরে থাকলে কি চরিত্র নষ্ট হয়ে যাবে?

—এ: ছি ছি, এই বয়েসে চরিত্র বলে কিছু থাকে নাকি। সবই তো ঘুমিয়ে পড়েছে।

—তাহলে জানালার পাখিটা ফাঁক করে একবার দেখুন তো।

মহিলা আবার কেশে উঠলেন। বিষমের রেশ এখনও লেগে আছে।

—দেখছি দেখছি, আপনি পাশ ফিরে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন। আর এক গেলাস জল?

—না আর জল লাগবে না।

শশাঙ্ক পাখি ফাঁক করে ও বাড়ির দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলেন। বারন্দার রেলিং-এ দুহাতের কনুইয়ে ভর রেখে কত্তা দাঁড়িয়ে। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, ছাপা লুঙ্গি। মাথার সামনে ওলটানো ফুলকো চুল। কপালের দুপাশ টাকে খেয়ে গেছে। হাতের আর কাঁধের গুলি দেখলেই মনে হয় শরীরে এখনও বেশ শক্তি। এক ঘুষিতে শশাঙ্ক কাত। পাশেই সেই মেয়েটি। নীল শাড়ি, সাদা ব্লাউজ। এলোচুল মাথার দুপাশ দিয়ে সামনে ঝুলছে। চুড়িপরা একটা হাত কত্তার পিঠে। শশাঙ্ক ভয়ে ভয়ে পাখিটা বন্ধ করে দিলেন। এই দিকেই যেন চেয়ে আছেন। যদি দেখে ফেলেন।

—কী দেখলেন?

শশাঙ্ক তোতলাতে তোতলাতে বললেন,—বারান্দাতেই দুজনে দাঁড়িয়ে। বাপ-মেয়েও বলা যায় স্বামী-স্ত্রীও বলা যায়, বয়েসের ডিফারেন্সটা না ধরলে।

—বাপ-মেয়ে! কই দেখি।

শুয়ে শুয়েই শরীরটাকে ঘুরিয়ে জানালার পাখিতে চোখ রাখলেন।

—বা:, বা:, বা ভাই। বেড়ে হচ্ছে! প্রকৃতি দেখে শরীরে প্রেম আনা হচ্ছে। যাচিলে জামাই রুটি না খায়। রাত্রি হইলে জামাই ঢেকশেল চাটিতে যায়। মুখে আগুন তোমার। এইবার আমি যদি এই মানুষটাকে জড়িয়ে ধরি। কেমন হয়!

শশাঙ্ক তাড়াতাড়ি সরে গেলেন ছেলের খাটের দিকে।

—এত প্রেম ছিল কোথায়? নিজের বউয়ের বেলায় সব শুকিয়ে যায়, অন্যের বেলায় উথলে ওঠে। অন্য মেয়েছেলে দেখলেই আপনারা এত চুলবুল করেন কেন বলতে পারেন?

শশাঙ্ক শুয়ে শুয়ে বললেন,—সবাই কি আর করে? এক এক জনের এক এক স্বভাব। কেউ কেউ নিজেকে ঠিক রাখতে পারে না। পাগল হয়ে যায়।

—পাগলামি আমি ঘুচিয়ে দিচ্ছি। হুট করে বাড়িতে ঢুকে দুজনের পিরিত চটকে দোব সে উপায় রাখেনি। দরজায় কড়া নাড়লেই কত্তা অমনি লুঙ্গি সামলে জপে বসে যাবেন। ছুঁড়ি গিয়ে ঢুকবেন বাথরুমে। আমি এই জানালাটা খুলে এখান থেকেই চিৎকার করব, এই যে দাদু কেমন হচ্ছে, তোমাদের যম সব দেখছে।

—এই না।

শশাঙ্ক ধড়মড় করে উঠে জানলার ছিটকিনির দিকে মহিলার বাড়ানো হাত চেপে ধরলেন। দুজনে চোখাচোখি হল।

—আমাকে বিপদে ফেলবেন না। এই সব নোংরা ব্যাপারে একবার জড়িয়ে গেলে, লোক হাসাহাসি হবে।

শশাঙ্ক হাত ধরে টেনে মহিলাকে চিত করে বিছানায় শুইয়ে দিলেন।

—উত্তেজনায় কোনও কাজ করা ঠিক নয়। যা করতে হবে ভেবেচিন্তে ধীরে ধীরে। চোখ বুজে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকুন। ভগবানই রাস্তা বাতলে দেবেন।

শশাঙ্ক ছেলের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লেন। অনেকদিন পরে মেয়েছেলের গায়ে হাত দিলেন। বেশ লাগল। পুরোনো একটা অনুভূতি ফিরে এল। স্ত্রীকে বেশ লাগত। পরস্ত্রীকে যেন আরও ভালো লাগল। না, না, এ ভালো লাগা ঠিক নয়। খুব অন্যায়। শশাঙ্ক সামালকে।

শশাঙ্ক বোধহয় একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলেন। ভাতঘুম। ঘড়িতে চারটে বাজছে। চোখ মেলে তাকালেন। বাইরে মেঘ ভাঙা রোদ। একখণ্ড নীল আকাশে শরতের টুকরো মেঘ। উঠে বসলেন। সেই সুধা থাকলে এখন চায়ের জল বসত। এই সুধা খুব ঘুমোচ্ছে। শরীরটা শিথিল হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, মুখটা প্রশান্ত। কোনও রাগ বিরক্তি অশান্তির চিহ্ন নেই। ঘুমে সব মোলায়েম। অল্প বয়েসে বেশ ধারাল মুখই ছিল। বয়েসে তীক্ষ্ণতা একটু কমেছে। তা হলেও বেশ ভালোই দেখাচ্ছে। ঠোঁট দুটো অল্প ফাঁক হয়ে আছে। লিপস্টিকের মত পানের লাল দাগ। ধবধবে একটা পা আর একটা পায়ের ওপর আড় হয়ে আছে। একটা হাত খাটের বাইরে ঝুলছে। চিকন চিকন দুগাছা সোনার চুড়ি চিকচিক করছে। চারদিকে ছড়িয়ে আছে ভাঁজে ভাঁজে শাড়ি। গলার কাছে একটা শিরা দপদপ করছে। বুকের ভার শ্বাসপ্রশ্বাসে ধীরে ধীরে উঠছে নামছে।

হেই মাঝি। জোয়ার আসছে।

বিলেতে মেমসাহেবরা মুখ চুম্বন করে। যৌবনে একটা বই হাতে এসেছিল, আর্ট অফ কিস।

এই বুড়ো বি কেয়ারফুল। মক্ষীবয়টি সাহদ পরো পংখা গয়ে লপটাই। মক্ষী ঝটপটায়। শিরধুনে, লালচ বুরি বালাই। লোভই এই সংসারে পতনের একমাত্র কারণ। দেখ শশাঙ্ক মৌমাছির হাল। মধুতে বসলেই পাখা দুটো আটকে যায়। মৃত্যু। যা করবে ভেবেচিন্তে করবে।

শশাঙ্ক রান্নাঘরে ঢুকে চায়ের জল চাপালেন। অন্যদিন এক কাপ, আজ দুকাপ। শূন্য বাড়িটা বেশ ভরাট লাগছে আজ। দুকাপ চা হাতে নিয়ে শশাঙ্ক আবার শোওয়ার ঘরে এলেন। মহিলা তখনও অকাতরে ঘুমোচ্ছেন। শান্তি আর ঘুম হাত মিলিয়ে চলে।

—এই যে শুনছেন, উঠুন, চা এসেছে। এই যে। সুধা সুধা। কতদিন এই নাম ধরে ডেকেছেন। উঠতে বসতে, ঘুরতে ফিরতে। কী অদ্ভুত যোগাযোগ!

—সুধা, সুধা, চা।

সুধা চোখ মেলে তাকাল।

—উঠুন উঠুন, চা এসেছে।

—অ্যাঁ, সকাল হয়ে গেছে?

—না, সকাল নয় বিকেল। খুব ঘুমিয়েছেন। কেমন লাগছে আপনার?

চায়ের কাপটা সুধার হাতে দিলেন। কাপড়চোপড় সব এলোমেলো, আলুথালু চেহারা। এই অবস্থায় কেউ যদি দেখে ফেলে কী যে ভাববে!

—আপনি একবারও দেখেছেন?

—কী দেখেছি?

—হা ভগবান! ও বাড়ির সেই চরিত্রহীন বুড়োটা?

—না তো?

—একটা কাজের ভার দিলুম। ব্যাটাছেলেদের মতো অকর্মা পৃথিবীতে খুব কমই দেখেছি।

শশাঙ্কের সেই কথামৃতের গল্পটা মনে পড়ল। এক জাদুকর খেলা দেখাচ্ছে, লাগ ভেলকি লাগ ভেলকি। হঠাৎ জিভ আটকে সমাধি হয়ে গেল। সবাই ভাবলে যে ভাগ্যবানের মোক্ষলাভ হল। ওমা যেই জ্ঞান ফিরে এল, সঙ্গে সঙ্গে আবার সে বলতে লাগল, লাগ ভেলকি। মহিলারও সেই এক অবস্থা।, চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে, মহিলা পাখি ফাঁক করে দেখতে লাগলেন।

—এই যে দেখে যান, দেখে যান, আপনাদের কাণ্ড দেখে যান।

অনিচ্ছা সত্বেও শশাঙ্ক এগিয়ে গেলেন। মাথাটা নীচু করছেন মহিলাও মাথা তুলছেন। কপালে আর মাথায় ঠোকাঠুকি হয়ে গেল।

—লাগল তো?

—শশাঙ্ক বললেন, না না, এত সামান্য লাগাকে লাগা বলে না।

চশমাটা নাকের ডগায় হেলে গেছে। চুলের তেলে কাচ ঝাপসা। শশাঙ্ক অস্পষ্ট হলেও এই বাড়ির শোওয়ার ঘরে পুরুষজাতির কাণ্ড দেখে সত্যিই অবাক হলেন। কত্তা মেঝেতে থেবড়ে বসে আছেন, মেয়েটি পেছন দিক হতে গলা জড়িয়ে আছে। কত্তা পিঠে ফেলে দোল দোল করছেন। ছেলেবেলায় মার পিঠে চেপে শশাঙ্ক এইভাবে দোল খেতেন। মা বলতেন দোল দোল দোল, খোকা দোলে, দোল দোল দোল দোল।

—মনে হয় ব্যায়াম করছেন। এই বয়েসে শির-ফির টেনে থাকে। বারবেলের বদলে ওই মেয়েটিকেই ওজন হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফিজিওথেরাপি। অনেকে মোটা বই মাথার ওপর তুলে কাঁধের একসারসাইজ করেন।

—হ্যাঁ হ্যাঁ ব্যায়ামই হচ্ছে। ফিজিওথেরাপি নয়, সেই থেরাপি হচ্ছে! আমার ইচ্ছে করছে এখুনি গিয়ে চুলের মুঠি ধরে শয়তানটিকে রাস্তায় বের করে দি। হাতের তেমন জোর থাকলে এখান থেকে ঢিল ছুঁড়তুম। কিছু তো একটা করতে হয়। বলুন না মশাই কী করা যায়? একটা বুদ্ধি দিতে পারছেন না?

—আমেরিকা হলে ডিভোর্স করার পরামর্শ দিতুম। অ্যাডালটারির চার্জ এনে ঠুকে দাও মামলা।

—সাক্ষী দেবেন?

—আমি নির্বিবাদী মানুষ। আমাকে কেন জড়াচ্ছেন?

—সে কী, আপনার কোনও সামাজিক দায়িত্ব নেই। চোখের সামনে অনাচার। একটা মেয়েছেলে সংসার তছনছ করে দিচ্ছে। কেউ কোনও কথা বলবে না? আগেকার দিন হলে গ্রামের মোড়ল মাথা কামিয়ে ঘোল ঢেলে ছেড়ে দিত। কাজির আমল হলে গর্ত করে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে দিয়ে ডালকুকুর দিয়ে খাওয়াত।

—আপনি স্বাবলম্বী মহিলা, আপনার অত কীসের? কেন পড়ে পড়ে মার খাবেন?

—বা: খুব বললেন যা হোক। আমি ডিভোর্স করলে আপনি আমাকে বিয়ে করবেন?

—আমি? শশাঙ্ক হাসলেন, আমার বিয়ের বয়েস আছে আর?

—বিলেতে বুড়োবুড়ির বিয়ে হয় না?

—তা হয়, তবে এটা তো বিলেত নয়।

—তা হলে ডিভোর্সও হয় না, হয় ঝ্যাঁটা-পেটা। ঝেঁটিয়ে আমি আপদ বিদেয় করব। এক গেলাস জল খাওয়াবেন?

শশাঙ্ক জল এনে দিলেন। ব্যাগ থেকে ট্যাবলেট বের করে খেলেন।

—প্রেসারটা আবার বেড়েছে। আজ আপনি আমার যা করলেন, জীবনে ভুলব না। আপনারও কেউ নেই। মিলেছে ভালো। মেয়েরাও একটু আদর চায়, যত্ন চায়। শুধুই সংসারের হাঁড়ি ঠেলবে আর বিয়োবে তা হয় না। এই নিন কিছু ওষুধ রাখুন, এইটা অম্বলের, এটা মাথাধরার, এটা আমাশার। আরও আরও এনে দোব। যাই, নরকে ফিরে যাই। সতীন নিয়ে সোনার সংসার। এই বাড়িটা কী শান্তির। সেই চটের হাতব্যাগটা তুলে নিয়ে মহিলা ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোলেন। যাওয়ার ইচ্ছে নেই তবু তো যেতেই হবে।

কিছু কেনাকাটার ছিল। বিস্কুট ফুরিয়েছে, টুথপেস্ট গেল গেল হয়েছে, সাবানের ভেতর দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। দাড়ি কামাবার ব্লেড। চিঠি লেখার প্যাড। স্টেশনারি দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে আছেন। মালপত্তর ওজন হচ্ছে। নজর চলে গেল একটা প্যাকেটের ওপর, হেয়ার ডাই ব্ল্যাক। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। এক শিশি কিনে দেখলেন হয়। সুধা মাঝে মাঝে বলত, কী বুড়োটে হয়ে যাচ্ছ, চুলে একটু কলপ লাগাও না। চুল কালো করে দেখতে ইচ্ছে হয়, দাদু থেকে দাদা হওয়া যায় কি না!

পাগল। পাগল। বুড়ো শালিখের ঘাড়ে রোঁ।

একশো গ্রাম লজেনসও কিনলেন। একটা মুখে ফেলে পার্কে বার কতক পাক মেরে বাড়িমুখো হলেন। পার্কে আজকাল বুড়োদের বেড়ানো চলে না। ছেলেমেয়েরা বড়ো সাহসী হয়ে উঠেছে। তাকালে আবার সিটি মারে। বইয়ে পড়েছেন লন্ডনের হাইড পার্কে সকালবেলা ঝুড়ি ঝুড়ি সেই সব পড়ে থাকে। না:, পৃথিবীটা চিরকালই যুবক যুবতীদের। তারা যা করবে সেইটাকেই মুখ বুজে মেনে নিতে হবে। ওই যে রাধাচূড়া গাছের তলায় যে জোড়াটি বসে আছে তাদের যদি বলেন, অ্যায় কী হচ্ছে, সব কটা জোড়া তেড়ে এসে আপনার জিওগ্রাফি পালটে দেবে।

বাড়ি ফিরে এসে কাপড়ের আলমারিটা খুললেন। সবে সন্ধে নেমেছে। দিনশেষের তরল অন্ধকারে জনপদের বাতি সারি সারি ভাসছে। এখনও কিছু কিছু বাড়িতে শাঁখ বাজে। শশাঙ্ক তাঁর স্ত্রীর একটি শাড়ি বের করলেন। ডুরে শাড়ি। রংটি বেশ গাঢ়। শাড়িটাকে পাশ পালিশের ওপর ছড়িয়ে দিলেন। সুধা যেন শুয়ে আছে। একটা সায়া বেশ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন। অর্গাণ্ডির একটা ব্লাউজ হাতে ধরে স্পর্শ নিলেন। পুরোনো জিনিসগুলোকে জোড়াতালি লাগিয়ে হারানো অতীতকে বর্তমানে টেনে আনার চেষ্টা। যে শরীরের এই সব আচ্ছাদন সেই শরীরটা নষ্ট হয়ে গেছে। কালে এগুলো কীটদষ্ট হয়ে হারিয়ে যাবে। তাঁকেও যেতে হবে।

বিছানার দিকে তাকিয়ে ডাকলেন,

—সুধা, ওঠো, সন্ধেবেলা শুয়ে থাকতে নেই, ওঠো, উঠে বসো।

নিজের পাগলামিতে নিজেই হেসে উঠলেন। দুধের সাধ কি ঘোলে মেটে? সব পাট করে তুলে রাখলেন। ইডিয়েট, ইডিয়েট। একটা টিনের কৌটোর মধ্যে কাঁচা সিদ্ধির পাতা ছিল। দু চিমটে মুখে ফেলে চিবোলেন। তেতো, তেতো। আজ একটু নেশা চাই, নেশা। স্বপ্ন চাই। সেই স্বপ্ন। সুধার হাত ধরে নৌকো থেকে পাড়ে নামাচ্ছেন। সাবধান, দেখো পোড়ো না যেন।

অনেকদিন তোমাকে চিঠি লেখা হয়নি।

মাঝে-মধ্যে সুধাকে চিঠি লেখেন শশাঙ্ক। পৃথিবীতে কোনও পোস্টম্যান সে চিঠি বিলি করতে পারবে না। লিখে তাই ছিঁড়ে ফেলেন। ছোট ছোট সাংসারিক কথা। মান-অভিমান।

সুধা, বহুদিন হয়ে গেল, জানি তা তুমি আগের ঠিকানাতেই আছে, না অন্য কারুর মেয়ে হয়ে নেমে এসেছ। ভেবেছিলুম অন্তত একদিনও তুমি আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়াবে। রাত তখন গভীর নিস্তব্ধ, আমার জ্বর হল, মানু এসে কপালে হাতে বুলিয়ে দিল, তুমি কিন্তু এলে না। ওখানে হয়তো আমার চেয়ে প্রিয় কোনও সঙ্গী পেয়ে গেছ। যেসব দায়িত্ব তুমি দিয়ে গেছ সবই আমি একে একে গুছিয়ে এনেছি, কেবল সুধীর বিয়েটাই বাকি। ওই কাজটা শেষ হলেই, কয়েকটি তীর্থ ঘুরে বাড়ি। তীরে আমার নৌকো বাঁধা। জোয়ার এলেই ভেসে যাব। আর ক'টা দিন। রাত প্রায় কাটিয়েই এনেছি, আর প্রহরখানেক মাত্র বাকি, একটুর জন্যে তাল আর ছাড়ছি না। বড়ো ক্লান্ত তবু মুজরো শেষ করেই যাব। ততদিন তুমি আমার অপেক্ষায় থাকবে? আর এক সুধা এসে কদিন খুব হামলা করছে। তোমার বিছানা দখলের তালে আছে কি না কে জানে? মন না মতিভ্রম।

দরজার কড়া নড়ে উঠল।

কে এল? সুধী। আজ বেশ একটু সকাল। কোনদিন কখন আসে।

—যাক আজ বেশ সকাল সকাল এসেছিস।

—হুঁ।

—শরীর ভালো তো?

—হুঁ।

শশাঙ্ক একটু ঘাবড়ে গেলেন। সব প্রশ্নেরই সংক্ষিপ্ত জবাব। সুধীর তো এমন কাটাকাটা স্বভাব নয়!

—কী খাবি এখন? একটু চা বসাই?

—কোনও প্রয়োজন নেই।

ছেলেটা আজ মনের ওপর বড়ো ধাক্কা মারছে তো! কী হল! অসহায়, বুড়ো মানুষ। বড়ো ভয় করছে।

—আজ তোর কী হয়েছে সুধী?

—কিছু না।

—কিছু একটা হয়েছে, তা না হলে এমন কাটাকাটা উত্তর কেন?

পোর্টফোলিও ব্যাগটা বিছানার ওপর ঝপাং করে ফেলে দিয়ে সুধী রিস্টওয়াচ খুলতে খুলতে বলল,—তুমি আমাদের ফ্যামিলির মুখে চুনকালি মাখিয়েছ।

ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল কপালের ওপর ঝুলে পড়েছে। চোখের ওপর চশমা। চশমার কাচে আলোর ছটা। চোখ দেখা যাচ্ছে না।

—আমি?

—হ্যাঁ, তুমি। তুমি এই বয়েসে বাড়িতে একটা মেয়েমানুষ ঢুকিয়ে সারাদিন যা তা করো।

—সে কী? কে বললে?

—যাদের মধ্যে বাস করছ তারাই বললে। সমাজের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিছু করা যায় না বাবা।

—ভুল শুনেছিস। এসব অপপ্রচার।

—তুমি অস্বীকার করতে পারো, এ বাড়িতে কোনও মহিলা আসে না?

—হ্যাঁ আসে, কিন্তু কেন আসে তুই জানিস? আসল রহস্য জানিস?

—আমি জানতে চাই না। শুধু এইটুকু জানি, আমার দুর্ভাগ্য তোমার ছেলে হিসেবে আমাকে পরিচয় দিতে হয়।

—এত বড় কথা।

—হ্যাঁ এত বড়ো কথা। বৃদ্ধ বয়েসে পদস্খলন। তোমার ওপর আমার সামান্যতম শ্রদ্ধাও আর নেই।

—তুই আমার কাছে ঘটনাটা শুনবি না?

—না, যা শোনার আমি প্রতিবেশীর কাছ থেকেই শুনেছি। চরিত্রহীন এক মহিলা, প্রথম স্বামীকে ছেড়ে দু-নম্বর একজনের সঙ্গে ঘর বেঁধে তিন নম্বরের কাছে নাচতে আসেন। ছি ছি!

সকালে শশাঙ্ককে কিঞ্চিৎ উদভ্রান্তের মতো মনে হল। শুকনো মুখ। রাতজাগা লাল চোখ। বিছানা সারারাত শূন্য পড়ে রইল, বসার ঘরেই রাত কাটালেন। সুধীর সামনে দাঁড়াবার ইচ্ছে নেই। দুজনেই দুজনের কাছে ঘৃণিত। সুধী শোওয়ার আগে ভেবেছিল বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বিছানায় এনে শোওয়াবে। রোজ যেমন গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে সেইভাবেই এক সময় ঘুমিয়ে পড়বে। কিন্তু নিজের মনকে রাজি করাতে পারল না কিছুতেই। ফেরার পথে রাজেনবাবু তাকে যা তা বললেন।

—তোমার বাবার আবার বিয়ে দাও হে। তোমার বিয়ে না হয় পরেই হবে।

কথাটা শূলের মতো বিঁধে আছে। চরিত্রহীন পিতার পুত্র—এই পরিচয়ে সে পরিচিত হতে চায় না। সে নিজেকে বোঝাল, বেশ করেছি বলেছি। অন্যায়ের প্রতিবাদ অবশ্যই করা উচিত। হলেনই বা বাবা। যদি কষ্ট পেয়ে থাকেন, নিজের স্বভাবের জন্যেই পেলেন। যেখানে খুশি যেভাবে খুশি রাত কাটান। বাড়িতে মেয়েছেলে এনে ফুর্তির সময় তোমার মনে ছিল না বিপত্নীক বৃদ্ধ। সমাজের হাজারটা চোখ।

দুপুরের দিকে নির্জন ঘরে দাঁড়িয়ে শশাঙ্ক উন্মাদের মতো বার কতক হাসলেন।

—তোমার সংসার আজ ভেঙে গেল সুধা। চারিদিকে সাজানো সব তাসের ঘর। জীব শিব সম সুখ মগন সপনে কিছু কর তৃতি। জাগত দীন মলিন সোই বিকল বিষাদ বিভূতি। স্বপ্নের ভোগৈশর্য স্বপ্নেই মিলিয়ে গেল। আমি এখন সজাগ, মায়ামুক্ত। সুখের স্বপ্ন আমার কাছে ঘোর বিষাদ। তোমার স্মৃতি রইল, তোমার ছেলে রইল। আলমারি-ভরতি তোমার জামা-কাপড়, গয়না রইল। তোমার ছেলের বউ এসে পরবে। তোমারও দেখা হল না, আমারও দেখা হল না। রাত যায়, স্বপ্ন যায়, আবার রাত আসে, নতুন স্বপ্নও আসে। আমি শুধু আমাদের বিয়ের আংটিটা তোমার কাছে চেয়ে নিলাম। সকলেই আমাকে ত্যাগ করেছে। জগতের কাছে ঘৃণ্য হয়েছি। তুমি যেন ঘৃণা কোরো না।

সাদা টেনিস শার্ট পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো, হাতে কিটব্যাগ। একমাথা উস্কোখুশকো কাঁচাপাকা চুল। চোখে পুরু কাচের চশমা। শশাঙ্ক সিঁড়ি দিয়ে নামছেন। শেষবারের মতো তালাবন্ধ দরজার দিকে তাকালেন। মায়া কাছা ধরে টানছে। না, আর না। জয় শিবশম্ভু, উখার দে মকান লাগা দে তম্বু।

নীচের ফ্ল্যাটের মেয়েটির কাছে চাবি রাখলেন। বলা যায় না—এই চাবিই হয়তো আঁচলে বেঁধে তুমি একদিন ওপরে উঠবে। মা! আমার এই কলমটা তোমার খুব ভালো লাগত।

—এই কলমটা তোমাকে দিয়ে গেলুম। তুমি বলেছিলে বেশ লেখে।

—আপনি কোথায় চললেন, এই দুপুরবেলা?

—মনটা বড় উতলা হয়েছে মা, যাই মেয়ের বাড়ি থেকে ঘুরে আসি কয়েকদিন। তোমরা সব সাবধানে থেকো।

—কলমটা দিয়ে দিলেন?

—আর কী হবে মা। চিঠিও লিখি না, চোখেও দেখি না। তোমার কাছে আমার একটা স্মৃতি থাক, কে বলতে পারে, আজ আছি কাল হয়তো থাকব না।

শশাঙ্ক রাস্তায় নেমে এলেন। মোড়ের মাথায় সেই বুড়ো রিকশাওয়ালা। পাদানিতে বসে বসে গাছের ছায়ায় ঝিমোচ্ছে। শশাঙ্ক তার সামনে এসে দাঁড়ালেন।

—তুমি গত শীতে আমার কাছে একটা সোয়েটার চেয়েছিলে?

—হাঁ বাবু।

—এই নাও।

—শীতের তো এখনও অনেক দেরি আছে।

—দূর বোকা! দেরি আছে তো কী হয়েছে। একদিন তো আসবেই, তার জন্যে প্রস্তুত হতে হবে না।

পাড়ার সকলেই শশাঙ্ককে চলে যেতে দেখেছেন। ছেঁড়া ছেঁড়া টুকরো টুকরো সেই সব কথা থেকে কিছুতেই পরিষ্কার হল না, তিনি কোথায় গেছেন। সেই হোমিওপ্যাথ ডাক্তার বললেন,—আমাকে ওয়েলসের ডায়েরিয়া অ্যান্ড ডিসেন্ট্রি বইটা দিয়ে বললেন, রাখো, তোমার কাজে লাগবে। এক পুরিয়া অর্শের ওষুধ খেলেন। জিগ্যেস করলুম, এমন সময় কোথায় চললেন কাকাবাবু? হাসতে হাসতে গান গেয়ে উঠলেন, জুড়াইতে চাই কোথায় জুড়াই, কোথা হতে আসি ভেসে যাই!

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%