সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

।। ছন্দপতন ।।
মাধুরী : এই খেয়েছে।
মানস : কী হল, বেড়ালে দুধ খেয়েছে?
মাধুরী : না গো। সর্বনাশ হয়েছে। মা আসছেন।
মানস : কোন মা। এই তো দশভুজা আমাকে দেউলে আর তোমাকে রানি করে সরে পড়লেন।
মাধুরী : তার মানে? তোমাকে দেউলে আর আমাকে রানি?
মানস : চোদ্দোখানা শাড়ি হয়েছে। নগদে আট। ইনস্টলমেন্টে ছয়। এর পরেও যদি এই খেয়েছে বলো কিছু বলার নেই।
মাধুরী : আরে এ খাওয়া সে খাওয়া নয়। মা আসছেন, মা।
মানস : কোন মা? শ্যামা মা? দুধ বন্ধ করে চাঁদা দাও। আমার ট্যাঁক গড়ের মাঠ।
মাধুরী : আরে বাবা, শ্যামা মা নয়। তোমার মা আসছেন। দুর্গাপুরে ঠাকুরপোর ওখানে ভালো লাগছে না। এই দ্যাখো চিঠি।
মানস : আহা মা আসছেন এর চেয়ে আনন্দের আর কী আছে? এক পোয়া দুধ বাড়িয়ে দাও। আর আমি আমসত্ব নিয়ে আসব। মা আমার আমসত্ব খেতে বড় ভালোবাসেন।
মাধুরী : এই তো বললে দুধ বন্ধ করে চাঁদা দিতে।
মানস : এখন বলছি চাঁদা বন্ধ করে দুধ নাও।
মাধুরী : চাঁদা না দিলে কী হয় জানো?
মানস : জানি, গণধোলাই। মায়ের সেবায় শহিদ হতে রাজি আছি, তবু নর্দমার ধারে একটা শহিদ বেদি তো হবে। আর তুমি, জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা মরণে তার বেদিতে দিও ঘেঁটুর মালা।
মাধুরী : ইয়ারকি রাখো। মা কোথায় থাকবেন?
মানস : কেন এইখানে থাকবেন। আমাদের এখানে আসছেন যখন আর কোথায় থাকবেন?
মাধুরী : এই তো দেড়খানা ঘরের ফ্ল্যাট। মাকে রাখবে কোথায়?
মানস : কেন খাটে রাখব?
মাধুরী : তোমার মাথায় কী আছে বলতে পারো? খাটে তো রাখবে, খাটটাকে রাখবে কোথায়?
মানস : কেন ঘরে?
মাধুরী : কোন ঘরে?
মানস : হুঁ এ এক সমস্যা বটে। আচ্ছা মাকে ওই বারান্দায় রাখলে কেমন হয়। একটা ফোলডিং খাট কিনে আনি। খোলা আকাশ, মেলা বাতাস। তারা দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়বেন। ভোরবেলা পাখি এসে ডাকল—ওঠ মা ওঠ। পুব আকাশে জমাকুসুম সূর্য গুড মর্নিং করবে।
মাধুরী : আর কার্তিকের হিমে অচিরেই নিউমোনিয়া। ছেলেদের বুদ্ধিতে সংসার চালাতে হলে খুনের দায়ে নরকেই যেতে হবে।
মানস : বারান্দাটা তেরপল দিয়ে ঘিরে দিলে?
মাধুরী : আমরা মজা করে খাটে নরম বিছানায়, আর বৃদ্ধা মা বাইরের বারান্দায়। মানুষের বিবেক মরে আসছে ঠিকই, তবে এখনও একেবারে মরেছে কি?
মানস : তাহলে এই বাইরের ঘরে।
মাধুরী : কী বুদ্ধি? যতবার তোমার বন্ধুবান্ধবরা আসবে ততবার তিনি উঠে উঠে বাইরে যাবেন। বৃদ্ধা বলে, তাঁর মানসম্মান নেই। গোপনীয়তা নেই। মা তোমার ঝড়ের এঁটো শালপাতা?
মানস : ছি ছি। তা কেন? তা কেন?
মাধুরী : আমার তো সেইরকম মনে হচ্ছে। বিয়ের পর থেকেই দেখছি মা যেন তোমাদের ফুটবল। দু-মাস দুর্গাপুরে ছোটছেলের কাছে তো তিনমাস জামসেদপুরে মেজর কাছে, আর তোমার কাছে আসার নাম করলেই নাকে কান্না, আমার ছোট ফ্ল্যাট! দেড়খানা মাত্র ঘর। ভাগের মা গঙ্গা পেলে হয়। মা আগে না তোমাদের বউ আগে?
মানস : মা আগে।
মাধুরী : পুজোয় মাকে কী দিয়েছ?
মানস : একখানা থান।
মাধুরী : কত দাম?
মানস : পঞ্চান্ন।
মাধুরী : আমার পিওর সিল্কটার দাম কত?
মানস : চারশো।
মাধুরী : লজ্জা করে না। লজ্জা করে না তোমার। মা কতদিন আগে তোমার কাছে একটা পুজোর গরদ চেয়েছিলেন?
মানস : ছোট আমার চেয়ে বেশি রোজগার করে।
মাধুরী : অ, তাহলে তো সবই হয়ে গেল। শোনো, মা আসবেন। এখানে থাকবেন। আমাদের ঘরেই থাকবেন। আমরা থাকব এই বসার ঘরে। তুমি শোবে সোফা কাম বেডে। আর আমি শোব মেঝেতে।
মানস : সোফা কাম বেডে শোয়া যায়?
মাধুরী : খুব যায়। মনটাকে তৈরি করতে পারলেই যায়।
মানস : মায়ের আবার ছুঁচিবাই আছে। ছোঁয়া-ছুঁয়ির বিচার আছে।
মাধুরী : সে আমি বুঝব। তুমি কতক্ষণ বাড়ি থাকো।
মানস : দেখবে খুব অসুবিধে হবে মাধুরী।
মাধুরী : ভুলে যেও না। আমাদেরও একদিন বয়েস হবে।
[ইন্টারলুড মিউজিক]
মানস : (ডাকার গলায়) মাধুরী, মাধুরী।
মাধুরী : (দূর থেকে) বলো, কী হল আবার? জড়িয়ে ফেলেছ? এখন রেখে দাও।
মানস : আরে ধুর। জড়াব কেন? এসো না একবার। কী এমন করছ?
মাধুরী : ঝুল ঝাড়ছি। তোমার দ্বারা তো কোনও কাজের কাজ হবে না। বললুম পাখার ব্লেডগুলো একটু পরিষ্কার করে দাও।
মানস : তুমি একটু বাড়াবাড়ি করে ফেলছ। এসো না একবার।
মাধুরী : বলো। বাড়াবাড়ির কী দেখলে? শোবার ঘরটাকে কী করে রেখেছ। মা শুনেছি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা পছন্দ করেন। পাখার ব্লেডটা পরিষ্কার করে দাও না।
মানস : ফুলস্পিডে চালিয়ে রাখো কিছুক্ষণ। সব ধুলো উড়ে যাবে আপসে।
মাধুরী : দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। থাক তোমাকে কিছু করতে হবে না। তুমি বসে বসে ন্যাজ নেড়ে যাও।
মানস : শোনো। ন্যাজ থাকলে একলাফে চেয়ারে চেয়ার লাগিয়ে উঠে ব্লেড পরিষ্কার করে দিতুম। তোমার একী চেহারা হয়েছে ম্যাডাম। ঠিক যেন মিকিমাউস।
মাধুরী : র্যাটের স্ত্রী তো মাউসই হবে। কাজের নামে অষ্টরম্ভা, বচনের ঝুড়ি। কী বলবে বলো, আমার অনেক কাজ।
মানস : শোনো। আমাদের মশারিটা যদি মাকে দাও, তাহলে আমাদের আরও দুটো মশারি কিনতে হয়। মানে একটা তোমার, একটা আমার। তোমার আমার বিছানা তো আলাদা হয়ে যাচ্ছে?
মাধুরী : হ্যাঁ তা তো যাচ্ছেই। কিনে আনো দুটো মশারি।
মানস : দুটো মশারির দাম জানো? আবার একটা বাড়তি খরচ।
মাধুরী : সংসার মানেই খরচ। রোজগার করছ। খরচ করবে।
মানস : মাধুরী, তোমার মাথা তো আমার চেয়ে অনেক বেশি খোলতাই। একটা কিছু ভেবে বার করো না।
মাধুরী : দুটো বোরখা বানাও। একটা তোমার—একটা আমার। ওই পরে শুয়ে পড়া যাবে।
মানস : পা দুটো যে বেরিয়ে থাকবে।
মাধুরী : পা দুটো কেরোসিন তেলে চুবিয়ে নিলেই হবে। বাবুর সামনে দিয়ে ছুঁচ গলে না, পেছন দিক দিয়ে হাতি বেরিয়ে যায়। দিনে ক'প্যাকেট সিগাারেট ওড়ে? যাও মশারির ব্যবস্থা করো। ম্যালেরিয়ায় যদি মরতে না চাও।
মানস : আচ্ছা আমরা যদি আগাপাশতলা চাদর মুড়ি দিয়ে শুই আর পাখাটা ফুল স্পিডে চালিয়ে রাখি। বিশ্বাস করো আমার ট্যাঁক একেবারে গড়ের মাঠ। আচ্ছা মাধুরী, মশারি ভাড়া পাওয়া যায় না?
মাধুরী : আহা, খুব ছেলের কাছে মা আসছেন! এসব ভ্যানতাড়া শুনলে তিনি কাশীবাসী হতে চাইতেন। শোনো আমার কিছু টাকা জমেছে।
মানস : কার পকেট মেরে?
মাধুরী : মেয়েরা তোমাদের মুরোদ জানে। তাই মাছের তেলেই মাছ ভাজে। এই বিছানায় তোশকের তলায় আছে। যাও এক কৌটো ভলো জর্দা কিনতে ভুলো না। মা জর্দা খান।
[মিউজিক্যাল কাট]
কী হল তুমি এখনও বসে বসে কাগজ পড়ছ। স্টেশনে যাবে না! আজ তো মা আসছেন।
মানস : আরে হ্যাঁ, তাই তো। দাও দাও জামা দাও। আর বেশি সময় নেই। মায়ের জন্যে গঙ্গজল আনিয়ে রেখেছ? এক পো দুধ বেশি নিয়েছ তো?
মাধুরী : আমার কাজ আমি ঠিকই করেছি। তোমার কাজ তুমি করো।
মানস : বাবার ছবিটা, একটু মুছে-টুছে...
মাধুরী : আরে বাবা হ্যাঁ।
পিওন : টেলিগ্রাম।
মানস : মাধু—টেলিগ্রাম। কার টেলিগ্রাম?
মাধুরী : (কাঁদতে কাঁদতে) এই নাও, এই নাও, তোমার মা আর তোমাকে জ্বালাতে আসছেন না। তিনি অন্য ট্রেন ধরে শেষ স্টেশনে চলে গেছেন।
।। বারুদ ।।
মাধুরী : মাঝরাতে কী আরম্ভ করেছ, দেব একদিন আপদ চুকিয়ে।
[টেপ বন্ধ]
মানস : এ কী, এ কী বন্ধ করে দিলে কেন?
মাধুরী : তোমার কোনও কাণ্ডজ্ঞান আছে?
মানস : নিজের ঘরে বসে সারা দিনের পর একটু মৌজ করে গান শুনতেও পারব না? এ তোমার কী শাসন? আমরা গণতন্ত্রে বাস করছি, না স্বৈরতন্ত্রে!
মাধুরী : স্বৈরতান্ত্রিক না হলে তোমাদের মতো অবাধ্যদের বাগে আনা যায় না, বুঝেছ?
মানস : তার মানে? আমার কোনও স্বাধীনতা নেই? জরু কী গোলাম হয়ে আমাকে থাকতে হবে।
মাধুরী : হ্যাঁ, সময় সময় তাই থাকতে হবে। পাশের বাড়িতে যমে-মানুষে টানাটানি চলেছে আর উনি বসে বসে হামদোনো হামদোনো করছেন।
মানস : পাশের বাড়িতে কী হয়েছে? কই আমি তো কিছু জানি না।
মাধুরী : জানবে কী করে? নিজের খবর ছাড়া অন্য কারুর খবর রাখো? প্রসাদবাবুর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
মানস : তুমি এখন আমাকে বলছ? একটু আগে বললে দেখতে যেতুম।
মাধুরী : কারুর বিপদে কখনও পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছ, নিজের ভাইয়ের অসুখে একবার গিয়েছিলে?
মানস : আরে ধুর কার্বঙ্কল আবার একটা অসুখ?
মাধুরী : ছোট ঠাকুরপোর ফ্যাক্টারিতে যখন ধর্মঘট চলছিল, তখন একবারও খবর নিয়েছিলে? সংসার কী করে চলছে?
মানস : আরে ধুর, ধর্মঘট তো এখন সর্দি-কাশির মতো। হলেই হল।
মাধুরী : তোমার তো সবেতেই ধুর। নিজের সিদ্ধান্তটাই সব। যা হয় একটা ভেবে নিলেই হল। যাও, তোমার জায়গায় সরে শোও। আমি আলো নেবাচ্ছি।
মানস : আজ আমি ধারে শোব। তুমি দেওয়ালের দিকে যাও।
মাধুরী : ও সব চালাকি ছাড়ো। রোজ যেদিকে শোও সেদিকে যাও।
মানস : না আজ আমি ধারে শোব। দেওয়ালের দিকে আমার ভীষণ অসুবিধে হয়। পাখার হাওয়া লাগে না। মাঝরাতে প্রয়োজন হলে তোমাকে ডিঙিয়ে নামতে হয়।
মাধুরী : নামো কেন? এক ঘুমে রাত কাবার করে দিতে পারো না?
মানস : আমি জল বেশি খাই।
মাধুরী : কে তোমাকে জল বেশি খেতে বলেছে—আমাকে ভোগাবার জন্যে?
মানস : বা: অদ্ভুত কথা তো। জল খাবার স্বাধীনতাও আমার নেই? তুমি কোন দেশের রানি হে?
মাধুরী : একসময় তো বলতে, তোমার রাজত্বের রানী। কথা বাড়িও না। ভীষণ মাথা ধরেছে। সরে শোও। আমাকে আমার জায়গায় শুতে দাও।
মানস : লাস্ট থ্রি ইয়ার্স আমি কোণে পড়ে আছি। আজ আমি ধারে শোবই শোব, শোবই শোব। এইটুকু স্বার্থত্যাগ, এইটুকু সেলফ-স্যাক্রিফাইস করতে পারছ না! তুমি তো আচ্ছা স্বার্থপর মহিলা।
মাধুরী : হ্যাঁ, তাই তো বলবে। তোমার জন্যে পদবিটা পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছি। ছিলুম চট্টোপাধ্যায় হয়েছি চক্রবর্তী। আমি স্বার্থপর আর তুমি ভারী পরার্থপর? তুমি কার জন্যে কী ত্যাগ করেছ চৈতন্য মহাপ্রভু?
মানস : দ্যাখো, গালাগাল দিও না। আমার ত্যাগের তুলনা হয় না। তোমার জন্যে আমার মায়ের পেটের ভাইদের পর্যন্ত ত্যাগ করেছি।
মাধুরী : ওটা ত্যাগ নয় প্রভু। ওটা আধুনিক জীবনের ভাঙন। ওটাও তো স্বার্থপরতা। প্রথমে ঘর নিয়ে টানাটানি। কে উত্তর নেবে কে দক্ষিণ নেবে, কে পূর্ব কে পশ্চিম। পৈতৃক বাড়িটাই শেষে বিক্রি হয়ে গেল। এমন জায়গায়, এমন একটা বাড়ি। তোমাদের মুরোদে কুলোবে আবার ওই রকম একটা বাড়ি তৈরি করা।
মানস : বেশ হয়েছে। আপদ গেছে। বড় বউদির বোলচাল শুনেছিলে? সারাজীবন উনি দক্ষিণের বাতাসে মানুষ। মুটকি।
মাধুরী : কী বললে?
মানস : মুটকি। দাদার তোয়াজে চেহারা হয়েছে দেখেছ! দুটো বাঘেও শেষ করতে পারবে না।
মাধুরী : এরপর যদি ওরা আমাকে পুঁটকি বলে তোমার কেমন লাগবে। ভদ্রভাষাও ভুলে গেছ। আবার রকবাজদের সমালোচনা করো।
মানস : যেসব বউ স্বামীদের মাথায় উঠে নাচে তাদের প্রতি আমার বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা নেই।
মাধুরী : আসলে ওই দক্ষিণের ঘর। ওটা তোমাকে ছেড়ে দিলেই মুটকিকে মনে হত ড্যান্সিং ফিগার, কী বলো। সরে শোও। মাথা ধরেছে।
মানস : তোমার দেখছি গণ্ডারের গোঁ। মেয়েরা সব সময় বাঁ পাশে থাকবে। সেইজন্যেই মেয়েদের আর এক নাম বামা।
মাধুরী : বেশ, মাথাটা ঘুরিয়ে নাও। তাহলে ধারে শুয়েও আমি তোমার বাঁয়ে থাকব।
মানস : তুমি কেন পলিটিসিয়ান হলে না মাধুরী তাহলে আইন মিনিস্টার হতে।
মাধুরী : যাও লক্ষ্মী ছেলের মতো নিজের জায়গায় গিয়ে শুয়ে পড়ো।
মানস : আজ আমি ধারে শোবই শোব। গত তিন বছর আমি দেওয়ালমুখো।
মাধুরী : তুমি সরবে না।
মানস : নো নো নো—
মাধুরী : দ্যাখো সারাদিন আমাকে গাধার খাটুনি খাটতে হয়।
মানস : আমাকেও হয়।
মাধুরী : থাক। সকালে নেচে নেচে বেরিয়ে গেলে। রাতে ফিরে এসে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে একের পর এক হুকুম। চা-লে আও। চিঁড়ে ভাজা লে-আও। বিছানাটাকে ধামসে ধুমসে কী করেছ দ্যাখো। আবার সিগারেটের ছাই ফেলেছ। ওঠো, চাদর ঝাড়ব।
মানস : তোমাকে আমি জানি ম্যাডাম। যেই উঠব, অমনি শুয়ে পড়বে ধপাস করে।
মাধুরী : তোমার মাথায় কি আজ ভূত চেপেছে?
মানস : ভূত চেপেছে তোমার মাথায়। সত্যিই গাধা হয়ে গেছ।
মাধুরী : তুমি কিন্তু সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছ।
মানস : তাই না কি? তুমি জানো, সারাদিন আমাকে কী খাটুনি খাটতে হয়। খেটে রোজগার করি, বলেই খেতে পাও। ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তোলাটাই দেখলে, আর সকাল বিকেল এই অসহ্য গরমে বাসে কোস্তাকুস্তিটা দেখলে না।
মাধুরী : কথায় কথায় তোমার খাবার খোঁটা। বউ মানে তোমাদের ক্রীতদাস—তাই না? সে যুগ আর নেই যে মেয়েরা পড়ে পড়ে তোমাদের মার খাবে। চাকরি করলে তোমার চেয়ে আমি কিছু কম রোজগার করতুম না। কাল থেকে আমি তোমার অন্ন স্পর্শ করব না। আজ যা পেটে গেছে গলায় আঙুল দিয়ে আমি তুলে দিয়ে আসছি। শোও পুরো খাট জুড়েই তুমি শোও। দাসীবাঁদীর স্থান মেঝেতে। সেইখানেই আমি আঁচল বিছিয়ে শোব।
মানস : ধ্যাততেরিকা। তিল থেকে তাল। ওই জন্যেই বলে যতই করো না কেন, মেয়েদের মন তুমি কোনদিনই পাবে না। পর কখনও আপন হয় না মাধুরী। শোও। তুমিও শোও। আমার ব্যবস্থা আমিই করে নিচ্ছি।
মাধুরী : তোমার আপনজনেরা আপন আছে তো?
মানস : তোমার বিছানা ছেড়ে দিয়েছি। পুরো খাটটাই ছেড়ে দিয়েছি। আর একটাও কথা বাড়াবে না।
মাধুরী : ক্রীতদাসীর স্থান খাটে নয়, মেঝেতে।
মানস : ধ্যাততেরিকা। এ যেন ফাটা রেকর্ড। বাজলে আর থামতে জানে না। আমার রাস্তাই ভালো। ফুটপাতে লেড়ি কুকুরের গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকি।
মাধুরী : (আদেশের গলায়) দাঁড়াও, যাচ্ছ কোথায়?
মানস : যমের বাড়ি।
মাধুরী : তুমি বেরিয়ে দ্যাখো। আমিও জানি কী করতে হয়। আমাকে চেনো না। থানা পুলিশ করিয়ে ছাড়ব।
মানস : যাও যাও। সব করবে।
[কলিং বেল]
মানস : কে আবার এত রাতে। আসারও সময় নেই!
[দরজা খোলার শব্দ]
মানস : আরে আপনি! মাস্টারমশাই?
মাস্টারমশাই : কোন নাটকের মহলা চলছে?
মানস : (আমতা আমতা) না মানে এই একটু ডিবেট মতো হচ্ছিল আর কী। 'শ্রুতি নাটক' বলতে পারেন।
মাস্টারমশাই : হ্যাঁ মাইক ছাড়াই বেশ অমাইক শুনছিলাম বারান্দায় বসে বসে। তা মা জননী ব্যাপারটা কী? অমন অশ্রুমুখ কেন? জ্বালামুখী দিয়ে লাভা বেরিয়েছে বুঝি।
মাধুরী : (ধরা গলায়) না মাস্টারমশাই। জীবনে অনেক কিছু শেখার আছে তো।
মাস্টারমশাই : ঠিক ঠিক। পৃথিবী এক পাঠশালা। একটু বসতে পারি?
মানস : হ্যাঁ হ্যাঁ। নিশ্চয় পারেন।
মাস্টারমশাই : তা কী শিখলে মা?
মাধুরী : শিখলাম যুগ বদলালেও, মেয়েরা ক্রীতদাসী। তাদের দৈনিক বরাদ্দ, ঝাঁটা জুতো লাথি।
মাস্টারমশাই : মানস, ডিফেন্সে তোমার কিছু বলার আছে?
মানস : আজ্ঞে সত্যকে বিকৃত করছে।
মাস্টারমশাই : তোমার কিছু বলার আছে মা?
মাধুরী : সত্য একটাই মাস্টারমশাই, অন্নদাতার ওপর কোনও কথা চলবে না।
মাস্টারমশাই : ঠিক ঠিক, ঠিক বলেছ। র্যাশনে যে চালই দিক, সপ্তাহে সপ্তাহে থলে ভরে আনতে হবে। কোনও কথা চলবে না।
মাধুরী : আজ্ঞে র্যাশন নয়, স্বামী।
মাস্টারমশাই : স্বামী আবার কবে থেকে র্যাশনের দোকান হল! স্বামী তো বচনদাতা। আমার বুড়ি কী করে জানো আজকাল বেশি বকবক করলেই নাতির চুষিকাঠিটা এনে মুখে গুঁজে দেয়। বেশ কাজ হয়, জানো। ফোকলা মুখে বসে বসে পাকলাই আর মনটা ধীরে ধীরে শিশুর মতো হয়ে যায়! নারী জাতিকে তখন মা মা মনে হয়। চণ্ডী কী বলেছেন জানো তো, স্ত্রীরা সমস্তা সবলা, জগৎসু। তা কী দিয়ে শুরু হয়েছিল মা?
মাধুরী : খাটে শোয়া নিয়ে। কে ধারে শোবে, কে শোবে দেওয়ালের দিকে। আমাকে ভোরে আগে উঠতে হয় তাই এতকাল আমি ধারে শুয়ে আসছি। আজ বায়না ধরলেন ধারে শোবেন। সেই থেকে গড়াতে গড়াতে উনি গৃহত্যাগের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন।
মানস : আর উনি হুমকি দিচ্ছিলেন আত্মহত্যার।
মাস্টারমশাই : বা: বা:, একেই বলে মেড ফর ইচ আদার। তোমরা তো দেখছি জ্যামিতিতে খুবই কাঁচা। এর তো খুব সহজ সমাধান রয়েছে। দেখবে?
মানস : এ কী এ কী খাট টানছেন কেন। ভারী। কোথাও খ্যাঁচকা লেগে যাবে।
মাস্টারমশাই : না গো, অত অপলকা শরীর ভগবান দেননি। প্রথম যুগে মাস্টাররা ছাত্র ঠ্যাঙাত, একালে ছাত্ররা মাস্টার ঠ্যাঙায়। শরীরটা ওরাই তৈরি করে দিয়েছে। আর কলকাতার এই লড়াইয়ে, জীবন হয়ে গেছে ফ্রন্টিয়ারের সৈনিকদের মতো। নাও দ্যাখো, এইবার কী হল? কী দেখছ?
[খাট টানার শব্দ]
মানস : আজ্ঞে দুদিকেই পাশ।
মাস্টারমশাই : এই পাশে তুমি ওই পাশে তুমি। মাঝখানে নদী নয়, প্রেম বয়ে যায়। ও হ্যাঁ, কেন এসেছিলুম? একটু বারুদ দেবে বাবা। মনের নয়। দেশলাইয়ের। গোটা চারেক কাঠি দেবে মা জননী। একটু গুড়ুক খাব।
।। ওপরতলা-নিচেরতলা ।।
মানস : নাও, নাও ধরো, ধরো। ব্যাগটার ওজন দেখেছ। তার ওপর তোমার এই ফুলঝাড়ু নিয়ে রাস্তা হাঁটা, বুঝলে মাধুরী, এক ঝকমারি ব্যাপার। তিন-তিনবার ধোলাই খেতে খেতে বেঁচে গেছি! কারুর গায়ে লাগল কী লাগল না, অমনি তেরিয়া 'সন্ধেবেলা ঝাঁটা মারলেন!' কলকাতার মানুষ এমন খেঁকি হয়ে গেছে কেন বলো তো?
মাধুরী : ভিটামিনের অভাব।
মানস : ঠিক বলেছ। কিছু হল কি হল না—ষাঁড়ের মতো গুঁতোতে এল। শোনো মাছ খাওয়া ছেড়ে দাও। চল্লিশ টাকার কমে মাছ নেই। স্রেফ আলুর দম চালাও। তাতেই দম বেড়ে যাবে। সেই একটা গান ছিল না—দাম বাড়ে দাম, দম মারো দম। শুয়ে পড়ি হাম।
মাধুরী : আরে সত্যি সত্যি শুয়ে পড়লে যে, এ কী! তোমার এই ঝোলায় চা কোথায়? বেরোবার সময় অন্তত হাজারবার বলেছি—চা এনো মনে করে। সেই চা-টাই ভুলে এলে! এখন কী হবে?
মানস : চায়ের কথা তুমি একবারও বলোনি, আমার মেমারি অত খারাপ নয়। জানো রবীন্দ্রনাথের 'আফ্রিকা' আমি লাইন বাই লাইন মুখস্থ বলতে পারি এখনও। শুনবে?
মাধুরী : যাও, চা নিয়ে এসো। এখুনি তো চা খেতে চাইবে?
মানস : আর আমি পারছি না, মাধুরী। আমার জান কয়লা হয়ে গেছে। তোমার চা মানে তো গামছা নিঙড়ানো জল। তাই না হয় একটু আনো।
মাধুরী : তোমার এই গা জ্বালানো কথা শুনলে আমার আর কিছু করতে ইচ্ছে হয় না।
মানস : রাগ কোরো না দেবী। রসিকতা বুঝতে শেখো। জীবন বড় শুকিয়ে এসেছে।
এই কটা দিন গেয়ে যেতে দাও শুধু গান প্রাণ ভরে। [একটি গানের কলি]
[কলিং বেল। ঘন ঘন, উত্তেজিত]
মানস : এ নির্ঘাৎ বারোয়ারি পুজোর চাঁদা। রোয়াব দেখেছ?
[দরজা খোলার শব্দ]
তরলা : (উত্তেজিত) কই কোথায়? কোথায় মানসবাবু? ও এই যে। কোচে কাত হয়ে আছেন। উঠে বসুন (ধমক)
মানস : কী ব্যাপার তরলাদি? এত উত্তেজিত?
তরলা : না, আমাকে দিদি বলবেন না। দিদি বলার কোনও অধিকার নেই আপনার। আমার আদ্দেকটা কোথায়?
মানস : আপনার আদ্দেক? আপনার পুরোটাই তো দাঁড়িয়ে আছে, আমার সামনে।
তরলা : আমার আদ্দেক নয়। আমার এই শাড়ির হাফ।
মানস : (ঘাবড়ে গিয়ে) আপনার শাড়ির আদ্দেক? তার আমি কী জানি।
তরলা : জিগ্যেস করুন, জিগ্যেস করুন আপনার এই ডাকাতে বউকে। অফিস থেকে ফিরে এসে শাড়ি পরতে গিয়ে দেখছি, হাফ নেই? কেন নেই?
মানস : (বোকার মতো) কেন নেই? কেনার সময় পুরোটা ছিল তো!
তরলা : (ভেঙচি কেটে) পুরোটা ছিল তো? যেমন দেবা তেমনি দেবী।
মানস : সে আবার কী, তুমি ওঁর অবর্তমানে ওঁর ফ্ল্যাটে ঢুকে শাড়ির আধখানা কেটে নিয়ে এলে? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে!
তরলা : বদমাইশি, বদমাইশি।
মাধুরী : ফ্ল্যাটে যাব কেন? শাড়িটাই নেমে এল আমার মুখের কাছে। অপরের ভিজে শাড়ি আমার মুখে ঝাপটা মারবে তা তো হতে পারে না। অনেকবার অনুরোধ করেছি ওপরের বারান্দা থেকে ওভাবে সপাটে ভিজে শাড়ি ঝোলাবেন না। বলেছি আমাদের বারান্দায় তখন আর বসা যায় না। ঘর অন্ধকার হয়ে যায়। আকাশ দেখা যায় না। ফোঁটা ফোঁটা জল পড়ে। মেঝে ভিজে যায়। ওখানে আমার তুলসী গাছ। শুনেছিলেন? ভেবেছিলেন আমার কথা? রেখেছিলেন অনুরোধ?
তরলা : অভদ্র মেয়ে। আমার ফ্ল্যাটে আমি শাড়ি শুকোতে দেব। সে অধিকার আমার আছে।
মাধুরী : আমাদের এলাকায় এলে, আমারও এত বড় একটা কাঁচি আছে। একটা শাড়িও আস্ত থাকবে না।
তরলা : শুনছেন, শুনছেন? আপনার ডাকিনী বউয়ের কথা! আমি থানায় যাব।
মাধুরী : যে চুলোয় খুশি যান। আমার এক দাওয়াই। ধরো আর কাটো।
তরলা : আমি হাইকোর্ট যাব।
মাধুরী : যান। আমার সুপ্রিম কোর্ট খোলা আছে।
তরলা : শুনছেন, শুনছেন আপনার বউয়ের কথা?
মানস : কী হচ্ছে মাধুরী।
মাধুরী : তুমি চুপ করো। ঠিক হচ্ছে। এতদিনে ঠিক দাওয়াই পড়েছে। শাড়ি আমার আকাশ সীমানা লঙ্ঘন করলেই কুচুক কাঁচি।
তরলা : একটা শাড়ি কতটা ঝুলতে পারে?
মাধুরী : পাককা বারো হাত। আবার তো ঝুলিয়েছেন। যান না, নিজে গিয়ে একবার স্বচক্ষে দেখেই আসুন না অত হম্বিতম্বি না করে।
তরলা : যাবই তো। ভদ্রতার একটা সীমা আছে। যাচ্ছি আমি।
[পড়ে যাওয়ার শব্দ]
উরে বাব্বারে, পড়ে মরেছি রে! জল ফেলে কী করে রেখেছে!
মানস : কী হল তরলাদি?
মাধুরী : জল আপনিই ফেলেছেন। ওই যে ঝুলছে আপনার সিনথেটিক শাড়ি। তারই ফোঁটাফোঁটা জল। আর এই যে ওপর থেকে ছুড়ে ছুড়ে ফলের খোসা ফেলেছেন। নিন উঠুন।
তরলা : (আর্তনাদ) তুলসীর টবে লেগে আমার কোমর ভেঙে গেছে। আমি উঠতে পারছি না। মাগো কী হবে গো!
মাস্টারমশাই : কী হল কী? কীচকবধ পালা?
মানস : না মাস্টারমশাই। ছোটখাটো একটা সমস্যা, এই মাধুরী আমাকে পাগল করে দেবে।
মাস্টারমশাই : রাধে কী মরণ যমুনায় ঝাঁপ দিতে চেয়েছিলেন?
মাধুরী : রাধে নয়, তরলাদি। নিজের কলে নিজেই কাত মাস্টারমশাই, আর্নিকা আছে?
মাস্টারমশাই : আছে মা। দাঁড়াও যাচ্ছি।
মাধুরী : কী হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছ। ধরো না তরলাদিকে, তুলে ঘরে বসাই।
মানস : আমি হাত ধরব?
মাধুরী : হ্যাঁ ধরবে। দিদির হাত ধরলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
তরলা : হ্যাঁ গো কোমরটা ফ্র্যাকচার হয়ে গেল না তো? আমি তো আবার নাচ শেখাই।
মাধুরী : ভয় পাবেন না দিদি, নাচের কোমর সহজে ভাঙে না।
মাস্টারমশাই : এই যে আর্নিকা। কীসের ভয়?
মাধুরী : কোমর ভাঙার।
মাস্টারমশাই : ধুর অত সহজে কোমর ভাঙে? আমার কাছে আর্নিকা মলমও আছে। ব্যথার যম।
মানস : দিদি, আপনি সোফায় ঠান্ডা হয়ে বসুন।
মাস্টারমশাই : কীসের এত গোলমাল?
মানস : আর বলবেন না। মেয়েরা কত কী যে জানে।
মাস্টারমশাই : তা তো জানবেই। বিয়ের বিজ্ঞাপনে পাত্রীরা কী কী জানে তার ওপরেই তো নির্ভর করে তাদের কদর। জানে বলেই তো বিয়ে করেছ বাবাজি!
মাধুরী : এই নিন দিদি, ঢক করে ঢেলে দিন গালে।
তরলা : (রেগে) তাহলে তোমরা কী চাইছ? শাড়ি আমি শুকোতে পারব না?
মাধুরী : আবার উত্তেজনা?
মাস্টারমশাই : আচ্ছা, তোমাদের সমস্যাটা কী?
মানস : তরলাদির শাড়ি ওপর থেকে ঝুলে আমাদের বারান্দা আড়াল করে দেয়। মাধুরী আজ কাঁচি দিয়ে ছেটে দিয়েছে।
মাস্টারমশাই : ও, এ সেই বিমানের আকাশসীমানা লঙ্ঘন, আর সঙ্গে সঙ্গে কামান দাগা।
তরলা : আমি কী তাহলে ভিজে শাড়ি মাথায় পাগড়ি বেঁধে বসে থাকব।
মাস্টারমশাই : না, নিদারুণ সমস্যা। ইউনাইটেড নেশানসে পাঠাতে হবে।
তরলা : আপনার আর কী? সারাজীবন আপনি হেসেই সব সহজ করে নিলেন। আমার একশো টাকা দামের শাড়ির পঞ্চাশ টাকা কেটে নিয়েছে এই গুন্ডা মেয়েটা।
মাস্টারমশাই : শোনো মা, এর খুব সহজ সমাধান আছে। পুরো শাড়িটা লম্বা করে না মেলে দুপাট করে মেলে দিও। আমরা সবাই তাই করি। আর বারন্দায় দড়ি খাটাও। হাত দুয়েক তফাতে সমান্তরালে দুটো দড়ি। তার উপর কাপড় ঢেউ খেলিয়ে দিও, সব সমস্যার সমাধান। নাও, চা খাওয়াও।
মাধুরী : চা!
মাস্টারমশাই : হ্যাঁ, চা। এক কাপ চা হল আমার ফি। বিনা পয়সায় উকিল পাওয়া যায়?
মানস : একটু বসুন মাস্টারমশাই। আমাদের চা ফুরিয়েছে। চট করে কিনে আনি। এই তো পাশেই দোকান।
তরলা : থাক, খুব হয়েছে। এখন আবার দোকানে ছুটতে হবে না। আমার ওপরে চলুন। চায়ের জল চাপিয়ে এসেছি। এতক্ষণে হয়ে গেছে।
মানস : আমরাও যাব।
তরলা : কেন যাবেন না?
মানস : না, এতক্ষণ ঝগড়া হল তো!
মাস্টারমশাই : আরে ধুর, তুমি তো আচ্ছা বোকা? ঝগড়া ভাব ঝগড়া। এই নিয়েই তো মানুষের বসবাস। আসলে কী জানো, ওপরতলা মাঝে মাঝে নীচের তলার কথা বেমালুম ভুলে যায়। এই বহুতল ফ্ল্যাটেই নয়, সমাজেও সেই একই ঘটনা। ওপরতলার মানুষ নীচের তলার মানুষের কথা মনে রাখে না। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হয় মাঝে মাঝে। নাও, বলো ভাব।
মাধুরী : তরলাদি, ছোট বোন হিসেবে এই নতুন শাড়িটা আপনাকে প্রণামী দিলাম।
তরলা : তার মানে? গরু মেরে জুতো দান?
মাস্টারমশাই : আহা, উলটে ফেলেছ মা। বলো জুতো মেরে গরু দান। না মা জিনিসটাকে ওভাবে পেঁচিয়ে নিও না। মনটাকে ফিতের মতো, ট্রাম লাইনের মতো সোজা রাখো।
মানস : তরলাদি আর রাগ পুষে রাখবেন না, আপনি একজন নৃত্যশিল্পী। আমরা মনে মনে আপনাকে শ্রদ্ধা করি।
তরলা : সত্যি বলছ! তাহলে আর 'আপনি' 'আজ্ঞে' নয়। কটা বাজল? সাতটা! আরে টি ভি খোলো, টি ভি। আমার আজ প্রাোগ্রাম আছে।
মাস্টারমশাই : তাই না কী? তাই না কী? খোলো খোলো। মা মাধুরী, আমার চন্ডেকে হেঁকে বলে দাও এই বারান্দা থেকে, চার কাপ চা।
তরলা : সাবধান মাধুরী। তুমি আবার আমার মতো আছাড় খেও না যেন।
[নাচের বোল, ঘুঙুরের শব্দ]
।। জেগে ঘুমোনো ।।
মাধুরী : এই শুনছ, শুনছ! শিগগির ওঠো।
মানস : (ঘুমজড়ানো গলায়) কী হোল? কই, কতোদিন তোমাকে বলেছি, অমন আচমকা ঘুম ভাঙাবে না। মিষ্টি সুরে পাখির মতো করে ডাকবে, ওঠো, জাগো। ভৈরবী সুর।
মাধুরী : কাল তুমি সব শেষে সিগারেট কিনে এনে সামনের দরজা বন্ধ করেছিলে?
মানস : (ঘুম ঘুম গলায়) কী জানি, মনে নেই। এই মাঝরাতে দরজা দরজা করছ কেন? এসো শুয়ে পড়ো। পাখাটা বন্ধ করে দাও।
মাধুরী : কোথায় পাখা?
মানস : ওই তো মাথার ওপর। পাঁই পাঁই ঘুরছে। অত স্পিডে পাখা চালাও কেন গো?
মাধুরী : ক্যানো গো! ওঠো শিগগির। সব চুরি হয়ে গেছে।
মানস : অ্যাঁ! চুরি! অসম্ভব! চুরি কেন হবে? কোথায় চোর? পাকড়ো উসকো। চো-চো (চিঁ চিঁ গলায়)।
মাধুরী : কী হচ্ছে কী। আগাপাশতলা মুড়ি দিয়ে চো চো করছ! কোথায় তোমার চোর?
মানস : এই তো বললে চুরি হয়ে গেছে?
মাধুরী : তুমি উঠবে কী না?
মানস : তুমি ম্যানেজ করে নাও লক্ষ্মীটি। চোরের মুখ আমি দেখতে চাই না। দেখাও পাপ।
মাধুরী : তুমি কী কাল নেশা করে শুয়েছিলে? ওঠো। যথাসর্বস্ব নিয়ে গেছে।
মানস : অ্যাঁ সে কী, তুমি কাল কোথায় ছিলে?
মাধুরী : তোমার পাশে।
মানস : কোথায় সেই রাসকেল? কোথায়?
মাধুরী : বা:, মশারি-ফশারি ছিঁড়ে কী করলে?
মানস : আমি চোরের বারোটা বাজাচ্ছি।
মাধুরী : বারোটা বাজাবে কী করে? নিজেরই তো বারোটা বেজে গেছে। মশারি জড়িয়ে মেঝেতে গড়াচ্ছ। তুমি ধরবে চোর?
মানস : মাধুরী, তুমি শুধু আমাকে বেরোবার রাস্তা করে দাও। তারপর দ্যাখো আমি কী করি।
মাধুরী : কীভাবে জড়িয়েছ। তোমার ক্ষমতা আছে। নাও বেরিয়ে এসো।
মানস : চোর চোর [চিৎকার]
মাধুরী : [ধমক] চুপ চুপ। একদম চুপ।
মানস : চোর পড়লে চিৎকার করতে হয় জানো? তা না হলে চোরেরা পেয়ে বসে।
মাধুরী : তুমি আর একবার চিৎকার করে দ্যাখো। এখন কটা বেজেছে জানো।
মানস : কটা? ঘড়ি দ্যাখো না।
মাধুরী : থাকলে তো দেখব।
মানস : অ্যাঁ! সে কী আমার অমন কী দামি দেওয়াল ঘড়ি! জার্মানির জিনিস!
মাধুরী : আমরা দুজন ছাড়া সবই গেছে। কাল কী খেয়েছিলে?
মানস : তুমি কী খেয়েছিলে?
মাধুরী : তুমি কী খেয়েছিলে?
মানস : না, না এভাবে হবে না। নিজেদের মধ্যে ফাটাফাটি হয়ে যাচ্ছে। বিপদের সময় একটাই নীতি, ইউনাইটেড উই স্ট্যান্ড ডিভাইডেড উই ফল। এসো, হাতে হাত মেলাই। আমাদের এখন কী করা উচিত?
মাধুরী : নিজেদের গালে থাপ্পড় মারা উচিত।
মানস : কে কার গালে মারবে? না চুরি নিয়ে রসিকতা চলে না।
মাধুরী : পাখাটা কীভাবে খুলে নিয়ে গেল? একহাত দূরে তুমি শুয়ে আছ। টের পেলে না? এ তোমার জানা চোর। সবে নতুন পাখাটা কেনা হয়েছে।
মানস : তার মানে? কী বলতে চাইছ তুমি! নিজের বাড়িতে নিজে চুরি করেছি? তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি?
মাধুরী : (কাঁদো কাঁদো গলায়) এঘরের পাখা ওঘরের পাখা সেলাই মেশিন, সব নিয়ে চলে গেল, আর তুমি পড়ে পড়ে ঘুমোলে!
মানস : আমি একা ঘুমালাম? তুমি তো পাশে ছিলে। তুমি কী করছিলে?
মাধুরী : আমি জানতুম। রাতে ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খেলেই মরণঘুম ধরে। সে ঘুম আর সহজে ভাঙে না। (ঝাঁজিয়ে উঠে) কে তোমাকে রাতে ইলিশ আনার পরামর্শ দিয়েছিল? সেই ব্যাটাই চোর।
মানস : সেই ব্যাটাই চোর? তাহলে তিনি তোমারই ভ্রাতা। হাইকোর্ট থেকে ফোনে বললেন, ভূতঘাটে বড় বড় গঙ্গার ইলিশ মাছ শুয়ে আছে। যাওয়ার সময় একটা তুলে নিয়ে যান। আজ আমি মক্কেল মারা শেষ করেই যাচ্ছি। দিদির হাতের রান্না অনেক দিন খাওয়া হয়নি। তাহলে তার নামেই একটা ডায়েরি করে আসি।
মাধুরী : কাঁদো কাঁদো কী হবে এখন?
মানস : কী কী নিয়েছে? বিলকুল সাফ?
মাধুরী : আমার দেখার সাহস নেই। তুমি দ্যাখো।
মানস : ভাগ্যি পরশু দিন গয়নাগুলো লকারে রেখে এসেছিলুম। বাড়িতে যাকে-তাকে আসতে দিলে এই অবস্থাই হয়।
মাধুরী : আমি কাকে আবার আসতে দিলুম। সবাই তো তোমারই বন্ধু। ছুটির দিন আড্ডার লহরা তো তুমিই বসাও।
মানস : আমার কাছে যারা আসে তারা সব বিগম্যান। কেউ ছিঁচকে চোর নয়।
মাধুরী : আমার কাছে কারা আসে?
মানস : কী করে বলব!
মাধুরী : তাহলে দুম করে ও কথা বললে কেন?
মানস : (উত্তেজিত) বেশ করেছি। (ঠান্ডা হয়ে) না না বেশ করিনি। অন্যায় হয়ে গেছে। চুরি হয়ে গেলে মানুষের মাথার ঠিক থাকে না মাধুরী। কী লজ্জার কথা। ছি: ছি: চুরি হয়ে গেল। শেম শেম। ব্যাপারটা চেপে যাও। কাউকে বোলো না।
মাধুরী : থানায় যাবে না?
মানস : না। থানায় যেতে আমার ভীষণ ভয় করে।
মাধুরী : বা:! একটা ডায়েরি করবে না?
মানস : তুমি যাও।
মাধুরী : বা:! মেয়েছেলে থানায় যাবে আর ব্যাটাছেলে মাথায় ঘোমটা টেনে বাড়িতে বসে থাকবে!
মানস : এখন মেয়েদের যুগ পড়েছে—তুমি গেলে হয়তো কিছু হবে। আমি গেলে পাত্তাই দেবে না। তার চেয়ে একবার চলো সস্ত্রীক যাই।
মাধুরী : আহা, এ যেন জামাইষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি যাওয়া।
মানস : আচ্ছা বিপদে পড়া গেল। দাও, জামা দাও। কোন থানায় যাব? থানাই তো জানি না। আমাদের বাড়িটা কোন থানার আন্ডারে?
মাধুরী : মাস্টারমশাইকে জিগ্যেস করো। ভোর হয়ে গেছে। উনি এখুনি বেড়াতে বেরিয়ে যাবেন।
মাস্টারমশাই : আরে, মানসচন্দ্র যে! এতদিনে স্বাস্থ্য-সচেতন হয়েছ। গুড, ভেরি গুড। বউমা বুঝি কাঁচা ঘুম থেকে তুলে দিয়েছে? মুখে হাসি নেই! গোবদা মেরে আছ।
মানস : না মাস্টারমশাই। আমাদের সব চুরি হয়ে গেল।
মাস্টারমশাই : অ্যাঁ সে কী! এই সেদিন বি. সেকসে চুরি হয়ে গেল।
মানস : আমাদের পাখাটাখা সব খুলে নিয়ে গেছে।
মাস্টারমশাই : আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ওরা ঘুম পাড়ানোর ওষুধ ব্যবহার করে।
মানস : তাই ভেবেছিলাম যে থানায় যাব।
মাস্টারমশাই : অবশ্যই যাবে। চলো আমিও তোদের সঙ্গে যাব। এত ঘন ঘন চুরি হবে, পুলিশকে একটু চাপ দেওয়া দরকার। আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কে নেবে? চলো, চলো। লেট আস মার্চ।
অফিসার-ইন-চার্জ : (ফোন করে) হ্যালো হ্যালো? হ্যাঁ লাশ পাওয়া গেছে। আমি কী করব? লাশ নিয়ে আমি কী করব! যার লাশ তাকে দিয়ে দাও। সাত সকালে লাশ লাশ কোরো না। না করবে না। (উত্তেজিত হয়ে) আমি কী করব? লাশ কোলে করে বসে থাকব? যা পারো করো। এবার আমি সন্ন্যাসী হয়ে যাব। ওই পাঁঠাটাকে মারতে মারতে নিয়ে এসো। হ্যাঁ নিয়ে এসো—পলিটিকস। পলিটকসের লাশ ফেলে দাও।
[রিসিভার ফেলার আওয়াজ]
মাস্টারমশাই : আসতে পারি?
ও. সি. : এসেই তো পড়েছেন। বলুন কী হয়েছে?
মাস্টারমশাই : বসতে পারি?
ও. সি. : বসুন। বেশি সময় দিতে পারব না। যা বলার তাড়াতাড়ি বলুন।
মাস্টারমশাই : চুরি হয়ে গেছে।
ও. সি. : বেশ হয়েছে, ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোলে চুরি হবেই। কিছু করার নেই। ছেলেটা কোথায়?
মাস্টারমশাই : কার ছেলে?
ও. সি. : আরে মশাই কাজের ছেলে। কোনও খোঁজখবর না নিয়ে যাদের আপনারা রাখেন।
মাস্টারমশাই : কাজের লোক তো ছিল না। স্বামী-স্ত্রী ছোট্ট সংসার।
ও. সি. : তাহলে কে চুরি করল? দেখেছেন কে চুরি করেছে?
মাস্টারমশাই : দেখলে তো ধরেই ফেলতুম।
ও. সি. : ধরে ফেলতেন? ও:, খুব সাহস। আমরাই ধরতে পারি না। ধরবেন আপনারা? তাহলে আমাদের কাজ তো অনেক কমে যেত। সে কো অপারেশন আছে আপনাদের? ভয়ে চেঁচাতেও পারেন না। চোঁ চোঁ করেন। অধিকাংশ চুরি চোখের সামনেই হয়। বলুন হয় কি না? (ধমকের সুরে) সত্যি কথা বলবেন।
মানস : আজ্ঞে তা হয়।
ও. সি. : থ্যাংক ইউ। এই সত্যি কথা বলার জন্যে আপনাদের চা খাওয়াব। অ্যায়, কে আছ? রমেন, তিন কাপ চা আনো।
মানস : চোরকে আমি দেখেছি স্যার।
ও. সি. : পুলিশ লাইনে চুল পাকিয়ে ফেললুম। আমি সব জানি মশাই। কী রকম দেখতে?
মানস : বিশাল লম্বা। প্যাঁকাটির মতো চেহারা।
মাস্টারমশাই : তুমি দেখলে যখন, তখন কিছু বললে না কেন?
মানস : প্রথমে চেঁচাবার চেষ্টা করলুম। গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরল না। হাত বাড়াবার চেষ্টা করলুম, নড়ল না। মাধুরীকে খোঁচা মারার ইচ্ছে ছিল। হাতই নড়ল না তো কী করব? পা দুটো মনে হল আড়াই মণ ভারী।
ও. সি. : ওই হয়। অথচ যাকে দেখেছেন তাকে থাপ্পড় মারলে ঘুরে পড়ে যেত। ওর নাম বিশু।
মানস : আপনি চেনেন স্যার?
ও. সি. : খুব চিনি! মালের লিস্ট দিন।
মানস : দুটো পাখা।
ও. সি. : পাখা! পাখা খুলে নিয়ে গেল? হায় ভগবান। কী পাল্লায় ফেললে এই সাত সকালে। খাটসুদ্ধু তুলে নিয়ে যায়নি, পূর্বপুরুষের ভাগ্য। নিন চা খান। আর কী নিয়েছে?
মানস : সেলাই কল। তিনটে ঘড়ি।
ও. সি. : তিনটে ঘড়ি। একটা কবজি, ঘড়ি তিনটে। উ:, অর্থের কী অপচয়!
মানস : আজ্ঞে, অপচয় নয়। একটা ছাত্র-জীবনের, একটা বিয়ের। আর একটা দেওয়াল।
ও. সি. : শ্বশুরমশাইয়ের ঘাড় ভেঙে একটা নিতেই হবে, কী বলেন? সেলাইকলটাও তাই?
মানস : ওটা আমার বউয়ের পেছন পেছন এসেছিল।
ও. সি. : আর কী এসেছিল?
মানস : একটা হারমোনিয়াম।
ও. সি. আছে না গেছে?
মানস : আছে।
ও. সি. : আর কী নিয়েছে?
মানস : খান চল্লিশ শাড়ি।
ও. সি. : শাড়ির ব্যাবসা করেন বুঝি?
মানস : না স্যার। এই তিন চার বছরে জমে গেছে।
ও. সি. : স্ত্রীকে খুব তেল দেন বুঝি?
মাস্টারমশাই : আমি এক প্রবীণ শিক্ষক। অনুগ্রহ করে পুলিশি ভাষা একটু সংযত করলে বাধিত হব।
ও. সি. : আপনার মুখটা তখন থেকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কোন স্কুল?
মাস্টারমশাই : রাজবল্লভ এইচ. এস.। প্রধান শিক্ষক হয়ে রিটায়ার করেছি গতবছর।
ও. সি. : আরে, মাস্টারমশাই আপনি? আমাকে চিনতে পারলেন না? আমি সত্য। পায়ের ধুলো দিন। (চেয়ারের শব্দ)
মাস্টারমশাই : এসো বাবা। এসো। তুমি অনেক রোগা ছিলে।
ও.সি. : চোর বদমাশ ঠেঙিয়ে মোটা হয়ে গেছি। এ ভদ্রলোক আপনার কে হন মাস্টারমশাই?
মাস্টারমশাই : আমার প্রতিবেশী। বড়ো ভালো ছেলে। স্বামী-স্ত্রী যেন দুটি শিল্প। পারো তো উদ্ধার করে দাও।
ও. সি. : সে আমি করব। তবে পুরোটা পারব কী না জানি না। যতটা পারা যায়। আপনার স্নেহভাজন যখন, তখন আপনার মতো একটু সাহসী করে তুলুন না।
মাস্টারমশাই : আমাদের যুগ চলে গেছে সত্য। তখন মানুষ এত একা হয়ে যায়নি। বিপদে পাশে এসে দাঁড়াত। এখন যে যার সে তার। অপরাধীরা তোমাদের চেয়ে সশস্ত্র।
ও. সি. : তা ঠিক। চাঁদা করে একজন নাইট গার্ড রাখুন না, আমি একজন ভালো সাহসী লোক দিতে পারি।
মাস্টারমশাই : কেউ চাঁদা দেবে না বাবা। সে চেষ্টা হয়েছে। তুমি বিপদে পড়েছ? আমি তো কখনও পড়িনি। মিটিং-এ একজন কী বললে জানো—ঘরে ঘরে পালা করে সব রাত জাগো। প্রথম রাতে যদি স্বামী জাগে তো শেষ রাতে স্ত্রী। কী বলবে তুমি।
ও. সি. : আমরা দিন দিন সব গাধা হয়ে যাচ্ছি। [চিৎকার] রমেন। এখুনি ফোর্স নিয়ে বেরিয়ে যাও। যেখান থেকে পারো, বিশুকে তুলে আনো।
মাস্টারমশাই : আমরা তাহলে—
ও. সি. : হ্যাঁ আসুন। আমি দেখছি। কী করা যায়।
[রাস্তার শব্দ]
মানস : মাস্টারমশাই, আমার একটা অনুরোধ...
মাস্টারমশাই : বলো।
মানস : মাধুরীকে বলবেন না প্লিজ, যে আমি জেগে ঘুমোচ্ছিলুন।
মাস্টারমশাই : দূর পাগল। তা না হলে সমাজের এই ছিরি হয়।
[ফায়ার ব্রিগেডের ঘণ্টা]
সরে এসো, সরে এসো। সাত সকালেই আগুন লাগিয়ে বসে আছে।
।। মুশকিল আসান ।।
মানস : কোন মহাপ্রভুর আবার আগমন হল। দরজাটা ভেঙে ফেলে দেবে দেখছি।
কলিং বেলটাও চোখে পড়ছে না? (চেঁচিয়ে) মাধুরী দ্যাখো তো।
মাধুরী : তুমি খুলে দাও না। আমি একটা কাজ করছি।
মানস : আমি যে দাড়ি কামাচ্ছি।
মাধুরী : একটা কাজও যদি তোমাকে দিতে হয়। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ—সব মাধুরী।
মানস : তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে ম্যাডাম?
মাধুরী : থাকো। তোমাকে আমার চেনা আছে। কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলেই পাজি—দেখছি।
দরজা খোলার শব্দ
মাধুরী : কীরে মানসী? তুই? এত সকালে?
মানস : কে গো?
মাধুরী : মানসী।
মানস : ও আমার সুইট শ্যালিকা। কী ভাগ্য! মেঘ না চাইতেই জল।
মাধুরী : কোথাও যাবি নাকি? সুটকেস মুটকেস নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিস?
মানসী : আগে ভেতরে ঢুকতে দাও। তারপর সব বলছি।
মাধুরী : তোর এমন এলোমেলো চেহারা কেন? কী হয়েছে বলবি তো?
মানস : আহা, ওকে আগে একটু সুস্থ হতে দাও। তারপর যত পারো প্রশ্ন কোরো।
মানসী : এক গেলাস জল দেবে?
মাধুরী : জল চা, সব দিচ্ছি। তুই একটা কিছু গোলমাল পাকিয়েছিস।
মানসী : হ্যাঁ, পাকিয়েছি। আমি বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছি।
মাধুরী : অ্যাঁ, সে কী রে?
মানসী : ভয় নেই তোমাদের। দু'একদিনের বেশি জ্বালাব না।
মাধুরী : তার মানে?
মানসী : তারপর নিজের ব্যবস্থা নিজেই আমি করে নেব।
মাধুরী : তোর কথাবার্তা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই, দ্যাখো তুমি যদি কিছু বের করতে পারো।
মানস : তুমি জল, চা, বিস্কুট যা যা হাতের কাছে পাও নিয়ে এসো। আমার মনে হচ্ছে ও পরীক্ষায় ফেল করেছে।
মাধুরী : তুমি আবার এক পাগল। ওর আবার পরীক্ষা কী? সে পাট তো চুকে গেছে।
মানস : আরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাই পরীক্ষা! জীবনের আর কোনও পরীক্ষা নেই। কী হয়েছে মা তোমার?
মাধুরী : তোমার মাথাটা সত্যিই একেবারে গেছে, মানসীকে মা বলছ।
মানস : আরে বাবা, সব মেয়েই তো একদিন মা হবে।
মানসী : তোমাদের বক বক আমার অসহ্য লাগছে। তোমরা দয়া করে চুপ করো।
মানস : অ্যায় চুপ। সায়লেনস, সায়লেনস।
মানসী : (উত্তেজিত) জামাইবাবু, আপনাদের কোনও অসুবিধে করলুম না তো?
মানস : অসুবিধে! তুমি তো আসোই না। আসতেই চাও না। আমাদের ত্যাগ করেছ।
মানসী : আমি এখন কী করি? কোথায় যাই?
মানস : কী হয়েছে? দয়া করে বলবে।
মানসী : আমার যা খুশি আমি তাই করব।
মানস : করো না। কী করতে চাও বলো। নাচবে? গাইবে?
মানসী : আমি আত্মহত্যা করব।
মানস : যা:, আত্মহত্যা করার মধ্যে কোনও নতুনত্ব নেই। নতুন কিছু করো। আত্মহত্যার বদলে হত্যা করো।
মানসী : বেশ, তাই করব।
মানস : কাকে করবে?
মানসী : আমাদের বস্তা পচা সমস্ত প্রাচীন রীতিনীতি বিশ্বাস অবিশ্বাসকে গলা টিপে হত্যা করব।
মাধুরী : এই নে, খেয়ে নে।
মানসী : জল আর চা ছাড়া আর কিছু খাব না।
মাধুরী : এরকম অগ্নিশর্মা হয়ে আছিস কেন বল তো? মেয়েছেলের অত তেরিয়া মেজাজ ভালো নয়।
মানস : আহা! কে কাকে উপদেশ দিচ্ছে। চালুনি বসেছে ছুঁচের বিচার করতে।
মাধুরী : আমাদের বোনে বোনে কথা হচ্ছে, তুমি নাক গলাবার কে?
মানস : বা: বা:, এই তো আসল চেহারা বেরিয়ে পড়ছে। এই না বললে, শোনো তো কী বলছে।
মাধুরী : আমি তোমাকে শুনতে বলেছি। খোঁচা মারতে বলিনি।
মানসী : প্লিজ, তোমরা একটু চুপ করবে। তোমাদের ক্যাচোর-ম্যাচোর আমার অসহ্য লাগছে।
মাধুরী : (ধমকের সুরে) আ মলো—কী হয়েছে বলবি তো। সাতসকালে ব্যাগ ঘাড়ে নাচতে নাচতে চলে এলেন গোবদামুখী। মা কেমন আছেন?
মানসী : জানি না।
মাধুরী : বাবা দিল্লি থেকে ফিরেছেন?
মানসী : জানি না।
মাধুরী : দ্যাখ, আমার সঙ্গে অমন চড়চড়ে কথা বলবি না।
মানসী : ধ্যাততেরিকা, তোমাদের কাছে আসাটাই আমার ভুল হয়েছে। আমি চলে যাচ্ছি।
মানস : উহুঁ উহুঁ। রাগ করে চলে যেও না মালিনী! কলকাতা বড়ো সহজ জায়গা নয়, সুন্দরী। মাধুরী, আর ঘণ্টখানেক পরেই আমাকে বেরোতে হবে। সে কথা কি ভুলে গেলে? উ:, দুধপোড়া গন্ধ বেরোচ্ছে।
মাধুরী : যা:, সব দুধটাই বোধহয় পুড়ে গেল।
মানস : যাও যাও, ছোট ছোট (পায়ের শব্দ) যাক, মানসী এইবার বলো তো, কী হয়েছে?
মানসী : জামাইবাবু, আমি বড় হয়েছি কি না?
মানস : অবশ্যই হয়েছ।
মানসী : নিশ্চয়ই অশিক্ষিত নই?
মানস : অবশ্যই নও।
মানসী : নিজের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা নিশ্চয় হয়েছে?
মানস : হয়েছে।
মানসী : তাহলে?
মানস : তাহলে কী?
মানসী : তাহলে আমাকে হাটে হাজির করার অধিকার ওদের কে দিয়েছে?
মানস : দাঁড়াও দাঁড়াও। একটু পরিষ্কার করেনি। হাটে হাজির মানে?
মানসী : মাসে অন্তত দুবার সেজে-গুজে চটক দিয়ে গোটাকতক বুড়োবুড়ির সামনে হাতজোড় করে বসতে হবে! যেন আমার এক্সরে হচ্ছে। আর যত সব বোকা বোকা প্রশ্ন। কেন কী জন্যে?
মানস : বা, বিয়ের বয়েস হয়েছে। তোমার বিয়ে দিতে হবে না?
মানসী : আমার যাকে ইচ্ছে হবে আমি তো তাকেই বিয়ে করব। তা নয় যার ইচ্ছে হবে, সে আমাকে বিয়ে করবে। আমি আলু না ফুলকপি। আমার কোনও স্বাধীনতা নেই?
মানস : অবশ্যই আছে। তবে কি জানো, অনেকদিন ধরে এই প্রথাটাই চলে আসছে তো! বাপ-মা দেখে-শুনে ছেলেমেয়ের বিয়ে দেন। যেমন তোমার দিদির সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল তাতে খারাপ তো কিছু হয়নি। বেশ সুখেই আছি। কখনও ঝগড়া হচ্ছে। কখনও ভাব হচ্ছে। প্রেমযমুনা উথলে উঠছে। আমি তো এখন তোমার দিদির ফুল কট্রোলে; ট্যাঁ ফোঁ করার উপায় নেই।
মানসী : আমি আমার বিয়ে নিজেই ঠিক করে ফেলেছি।
মানস : ও, ডার্লিং তুমি প্রেমে পড়ে বসে আছ? তা সে কথাটা বাড়িতে ভেঙে বললেই হয়।
মানসী : বলেছি। বলা মাত্রই মা বললে—জুতো।
মানস : জুতো মানে?
মানসী : জুতো মানে, জুতো-পেটা।
মানস : কাকে?
মানসী : দুজনকেই।
মানস : বাবা কী বলছেন?
মানসী : এসব ব্যাপারে মাথা ঘামাবার সময় নেই তাঁর। সারাদিন মক্কেল নিয়েই ব্যস্ত। অমুক ধারা তমুক ধারা।
মানস : তা তুমি হঠাৎ গৃহত্যাগ করলে কেন?
মানসী : কাল রাতে মা আমার গায়ে হাত তুলেছে। এর বদলা আমি নেব।
মানস : কীভাবে? কেমন করে?
মানসী : না, বিয়ে করে।
মানস : ছেলেটি কেমন?
মানসী : অসাধারণ।
মানস : কী করে?
মানসী : করবে।
মানস : কী করবে?
মানসী : একজন উচ্চ শিক্ষিত ছেলের যা যা করা উচিত তাই করবে। বিদেশেও চলে যেতে পারে।
মানস : যে কিছুই করে না, সে এই মুহূর্তে তোমাকে বিয়ে করবে কোন সাহসে?
মানসী : এখন করবে কেন? পরে করবে।
মানস : তার মানে? তার মানে, তোমাকে ট্যাঁকে নিয়ে ঘুরবে এখন। তারপর ট্যাঁক খুলে যদি পড়ে যাও, তখন তোমাকে কে কুড়িয়ে নেবে?
মানসী : সমরকে আপনি অপমান করছেন।
মানস : অপমান! অপমান করব কেন?
মানসী : ওই যে ট্যাঁকে বললেন।
মানস : ঠিকই বলেছি মানসী। সব প্রেমই কি পাকে। কত মেয়ে ঝুলে পড়ে যায় জান?
মানসী : সমর সে রকম ছেলেই নয়। আপনি তার কিছুই জানেন না, ঝপ করে একটা মন্তব্য করে দিলেন।
মানস : প্রেম শব্দটা পাঁচ হাতে পড়ে বড় ঠুনকো হয়ে গেছে মানসী। এই আছে এই নেই।
মানসী : ও, আপনি ওদের দলে?
মানস : আমি কোনও দলে নেই। যেমন দেখছি চারপাশে, সেই দেখা থেকেই বলছি। মোহ কেটে যেতে বেশি দেরি হয় না। রোমান্সের যুগ চলে গেছে মানসী। একালের সব কিছুই বড়ো অগভীর। আমি ছেলেটির সঙ্গে নিজে একবার কথা বলতে চাই। তারপর তোমার মায়ের সঙ্গে কথা বলব। দাও ঠিকানা দাও।
মানসী : আপনাকে যেতে হবে না। আমিই তাকে নিয়ে আসব।
মাধুরী : এই, তুই বাড়িতে বলে এসেছিলি?
মানসী : না।
মাধুরী : শিক্ষিতা মেয়ের কাণ্ডজ্ঞান দেখেছ? চারপাশে কি কাণ্ডই না হচ্ছে। উনি কাউকে না বলে দুম করে চলে এলেন। তুমি অফিস থেকে একটা ফোন করে দিও তো। মা বাপ ভেসে গেল, ওনার সমর হলেন জপের মালা। আজকালকার মেয়েদের ক্ষুরে ক্ষুরে নমস্কার।
[যন্ত্রসঙ্গীত—ঘড়ির ঘণ্টা—সাতটা]
মাধুরী : সেই তিনটের সময় বেরিয়েছে, সাতটা বাজল, তুমি বলো, ভালো লাগে এই দুশ্চিন্তা?
মানস : আর কলকাতার রাস্তার যা অবস্থা। আধঘণ্টার পথ যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগে এখন। কতক্ষণ আর হাঁ করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকবে কার্তিকের হিমে? ভেতরে চলে এসো।
মাধুরী : ফোনে মা কী বললেন?
মানস : বললেন, জানোই তো আমার হাই প্রেসার। আস্তে একটা চড় ভুলে গালে মেরেছি। আমি ওর মা তো, না অন্য কেউ। এতদিনের আদর-যত্ন-সোহাগ, কোলেপিঠে সব ভুল হয়ে গেল। মনে রইল ঠুস করে একটা চড়? বাহারে জগৎ!
মাধুরী : ঠিক বলেছেন? মেয়েরা কখনও আপন হয় না। পরের সম্পত্তি আগলানো।
[ডিং ডং]
মানস : ওই এলেন।
মাধুরী : কীরে এত দেরি হল!
মানসী : কী করব? জ্যামে আটকে বসে আছি।
মানস : আরে এসো, এসো, সমর এসো। বলো কী খাবে?
সমর : স্রেফ এক কাপ চা।
মানস : সে কী? আমাদের বাড়িতে প্রথম এলে—
সমর : মানসদা, আমরা দুজনেই খুব খেয়েছি। কী করব বলুন, খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিল।
মানস : তা বেশ করেছ। তুমি সমস্যাটা শুনেছ? মানসী তোমার জন্য গৃহত্যাগ করেছে। তুমি কি মানসীকে বিয়ে করবে?
সমর : করব।
মানস : কবে এবং কীভাবে? [ডিং ডং]
মানস : মাধুরী, দ্যাখো, কে এলেন। মনে হয় মাস্টারমশাই।
মাধুরী : আসুন মাস্টারমশাই। চা চলবে?
মাস্টারমশাই : অবশ্যই চলবে। তোমার কাছে তো চাতক হয়েই আসি মা। আমাদের বাবাজি কোথায়?
মানস : আসুন মাস্টারমশাই, ছোটখাটো একটা সমস্যা নিয়ে বসে আছি।
মাস্টারমশাই : আরে সমস্যা আর সমাধান, এই তো জীবনের গণিত।
মানস : আজ্ঞে হ্যাঁ। আর এই হল সমর। আমার ভায়রাভাই হওয়ার মতো একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
মাস্টারমশাই : বা:, এ ফাইন হ্যান্ডসাম ইয়াংম্যান। লেখাপড়া?
সমর : আজ্ঞে সি. এ. পাশ করে একটা কোথাও ঢোকার চেষ্টা করছি।
মাস্টারমশাই : বা:, ভালো লাইন। চাকরির অভাব হবে না। কে কে আছেন তোমার?
সমর : বাবা-মা। আমি এক ছেলে।
মাস্টারমশাই : বাড়ি ভাড়া, না নিজেদের?
সমর : নিজেদের।
মাস্টারমশাই : বা:, সোনায় সোহাগা। তাহলে আর দেরি কেন, শুভস্য শীঘ্রং।
মানস : আমার শ্বশুরমশাই বড়ো সাবেকপন্থী। নিজেরা ঠিক করে বিয়ে দেবেন।
মাস্টারমশাই : আরে মিঞা-বিবি রাজি তো কেয়া করে কাজী।
সমর : মাস্টারমশাই, আমারও সেই এক সমস্যা। আমার বাবা ভীষণ রাশভারী, তাঁর অমতে—
মাস্টারমশাই : না:, তোমরা অঙ্কে ভীষণ কাঁচা। দুটো প্লাসে যেমন প্লাস হয়, দুটো মাইনাসেও তেমনি প্লাস হয়। কেবল কায়দা করে পাশাপাশি এনে ফেলা। সে দায়িত্বটা তোমরা এই বুড়োর ওপর ছেড়ে দাও। কই মা, তোমার চা কোথায়? বেটার হাফের জন্যে আজ ডবল হাফ চাই!
।। প্রথম পাপ ।।
মানস : টেরিফিক। ঘরের চেহারাই পালটে গেল।
মাধুরী : কত পড়ল?
মানস : মাত্র তিনশো।
মাধুরী : তিনশো টাকায় কার্পেট। তুমি আমাকে বোকা গাধা ভেবেছ? তিনশো টাকায় এত বড় একটা কার্পেট হয়? কত চাপলে?
মানস : সত্যি বলছি। তিনশো। সেলে কিনেছি।
মাধুরী : হঠাৎ আবু হোসেনের মতো একটা কার্পেট আনলে? পয়সা কামড়াচ্ছিল?
মানস : কামড়াবে কেন? জীবনটা কি শুধুই আলু-পটল-ঢেঁড়শ! সৌন্দর্যের পূজারী হও মাধুরী। দ্যাখো তো ঘরের মেঝেতে কেমন ফুটেছে।
মাধুরী : হ্যাঁ এইবার ভেন্টিলেটার থেকে কোকিল ডেকে উঠবে। এই তিনশোর সঙ্গে আর কয়েকশো জুড়লে একটা নতুন তোশক, একটা ভালো লেপ, গোটা দুই বেডকভার হয়ে যেত। এই মাসের মাঝখানে তুমি তিনশো টাকা পেলে কোথা থেকে?
মানস : ছিল।
মাধুরী : কোথায় ছিল।
মানস : সে এক জায়গায় ছিল।
মাধুরী : তার মানে? তুমি আমার টাকায় হাত দিয়েছ না কি?
মানস : তোমার টাকা মানে? আমার টাকাই তো তোমার টাকা হয়। তোমার টাকা মানে আমার টাকা। টাকা ছাড়া কিছু নিজস্ব নয়। যেমন আমার টাক আমারই টাক, তোমার টাক নয়।
মাধুরী : ওসব রঙ্গ রসিকতা ছাড়ো। তুমি আমার টাকা ঝেড়েছ কি না বলো।
মানস : বলাবলির কী আছে? মিলিয়ে দেখে নাও।
মাধুরী : দেখব কী করে। তুমি যে বসে আছে। এখুনি আমার টাকা লুকিয়ে রাখার জায়গাটা দেখে ফেলবে।
মানস : আমি চোখে আঙুল চাপা দিচ্ছি।
মাধুরী : তোমাকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। আঙুলের ফাঁক দিয়ে দেখে নেবে। মনে নেই একবার তুমি আমার সব ঝেড়ে দিয়েছিলে।
মানস : সত্যি বলছি। দেখব না। চোখ টিপে বসে থাকব।
মাধুরী : পুরুষ জাতিকে আমি একেবারে বিশ্বাস করি না। দাঁড়াও, তোমার চোখে আগে আমি রুমাল বাঁধি।
মানস : টাকা কি তুমি এঘরেই রাখো?
মাধুরী : আজ্ঞে হ্যাঁ। চোরের ঘরে রাখলে ধনসম্পদ নিরাপদ থাকে।
মানস : কোথায় থাকতে পারে?
মাধুরী : খুব সহজ, অথচ খুব কঠিন জায়গা। শার্লক হোমস ছাড়া খুঁজে পাবে না। তোমার রুমালটা কোথায়, পকেটে?
মানস : আঁহাঁ আঁহাঁ। কার্পেটে পা দিও না।
মাধুরী : সে আবার কী? ঘরজোড়া কার্পেট। হাঁটব কোথা দিয়ে?
মানস : কেন? দেওয়ালের পাশ দিয়ে, পাশ দিয়ে। সাবধানে ফালি জায়গাটুকু দিয়ে।
মাধুরী : তোমার মাথাফাতা খারাপ হয়ে গেছে। কার্পেটের ওপর দিয়েই তো লোকে হাঁটে।
মানস : সে বড়লোক। বড়লোকে কার্পেটের ওপর দিয়ে হাঁটে। আর গরিব হাঁটে চারপাশের ফালি জায়গা দিয়ে।
মাধুরী : অমন কার্পেট দরকার নেই। তুমি রোল করে রেখে দাও। খুব হয়েছে। দেওয়ালের পাশ দিয়ে অমন টাল খেতে খেতে আমি যাওয়া-আসা করতে পারব না। এ যেন কার্নিশ ধরে চোরের মতো হাঁটা।
মানস : ভালো, দামি জিনিসের কদর বুঝতে শেখো মাধুরী। সারাজীবন শুধু ন্যাতা, ঝ্যাঁটা আর হাতাখুন্তি নিয়ে কাটালে চলে না। জাতে ওঠো, জাতে।
মাধুরী : তুমি ওঠো। আমি তোমার কোমর ধরে ঝুলে পড়ব। পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য।
মানস : একী, চললে কোথায়?
মাধুরী : যাই, চায়ের জল বসাই। তোমার সঙ্গে বকবক করলে রাতে ডান হাতের ব্যবস্থা কে করবে?
মানস : তোমরা টাকা মেলাবে না, টাকা?
মাধুরী : যে ক'টা টাকা আছে, তাতে তোমার কার্পেটটা কিনলে কীভাবে?
মানস : যেভাবে সবাই কেনে! সোজা দোকানে গেলুম, দাম ফেললুম, ট্যাক্সিতে চাপালুম, চলে এলুম।
মাধুরী : কালই তুমি আমাকে বললে, সংসার চলেছে তৈলহীন গরুর গাড়ির চাকার মতো কাঁচোর কোঁচোর করে। মাস যেন আর শেষ হতে চাইছে না। হঠাৎ তোমার পকেটে টাকা এসে গেল? আর তুমি কিনলে, অদ্ভুত এক জিনিস! কার্পেট! কী জানি বাবা, আমার কেমন যেন রহস্য রহস্য লাগছে?
মানস : কী রহস্য, তোমার ধারণা, আমি চুরি করে এনেছি?
মাধুরী : তুমি জানো।
মানস : সামান্য ব্যাপার নিয়ে মেয়েরা কী মাথাই যে ঘামাতে পারে! যাই, হাত-পা ধুয়ে আসি। আজ আমার রাত ওমর খৈয়ামের রাত। চুস্ত পাজামা আর পাঞ্জাবি পরে কানে আতর গুঁজে শের আফগানের মতো এই কার্পেটে বসব। ভর পেয়ালা সাকী। সুর আছে ভেসে যাও সুরের স্রোতে। মুরা আছে, ভুলে যাও সব কিছু। রূপসীর প্রেমে পাগল হয়ে যাও। সাধুতা থাক অন্যদের জন্য!
(শিস দিতে দিতে মানস বাথরুমের দিকে)
মানস : সামান্য একটু শীত পড়েছে। এইবার লেপটেপ রোদে দাও।
মাধুরী : হুঁ।
মানস : কী হল? শুতে না শুতেই ঘুমিয়ে পড়লে?
মাধুরী : হুঁ।
মানস : তোমার কী হয়েছে বলো তো? সেই সন্ধে থেকে হুঁ হাঁ চলেছে? তোমার টাকা আমি নিইনি—
মাধুরী : তুমি ঘুষ নিয়েছ, ঘুষ।
মানস : ঘুষ?
মাধুরী : হ্যাঁ ঘুষ। এই কার্পেটের দাম বারোশো টাকা। তিনশো টাকা নয়।
মানস : কী আবোল-তাবোল বকছ? তুমি একেবারে সবজান্তা, হরিদাস।
মাধুরী : দ্যাখো, মিথ্যে দিয়ে সত্য চাপা যায় না। কোনও না কোনও ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে পড়বেই। তুমি কি জানো, কার্পেটটার নীচে দামের একটা টিকিট লাগানো আছে। তুমি লক্ষ করোনি।
মানস : হতেই পারে না। মিথ্যে কথা।
মাধুরী : দেখতে চাও? আলো জ্বালব?
মানস : লেখা থাকলে ওটা নতুনের দাম। সেলের দাম তিনশো।
মাধুরী : নশো টাকা ছাড়? এ কি ব্যাবসা, না দান-খয়রাত?
মানস : আজকাল ক'টা লোক কার্পেট কিনতে পারে মাধুরী?
মাধুরী : তা ঠিক, ঘুষের পয়সা ছাড়া কার্পেট কেনা যায় না। রোজ মাছ খাওয়া যায় না। রোজ ট্যাক্সি চাপা যায় না।
মানস : মাঝরাতে প্রলাপ না বকে ঘুমিয়ে পড়ো রানি।
মাধুরী : প্রলাপ! তুমি কি আমাকে ঘুম পাড়াতে পারবে? তুমি কি তোমার বিবেককে ঘুম পাড়াতে পারবে?
মানস : বেশি জ্ঞান দিও না।
মাধুরী : তুমি অনেকদিন থেকেই উশখুশ করছিলে। কোটা, লাইসেন্স সব তোমার হাতে। শেষে লোভ আর সামলাতে পারলে না। শয়তানের কাছে বিকিয়ে দিলে নিজেকে।
মানস : দ্যাখো, বাড়াবাড়ি করবে না। বউয়ের মতো থাকবে।
মাধুরী : তার মানে?
মানস : মানে খুব সহজ। আমার ব্যাপারে নাক গলাবে না। আমি কী করছি—না করছি—তোমার দ্যাখার দরকার নেই।
মাধুরী : এই তো নিজ মূর্তি ধরেছ। স্বরূপ বেরিয়ে পড়েছে। তোমার জীবনে আমার ভূমিকা তাহলে কী? দেবদাসী? জানো, তুমি আমার নজরে আজ কত ছোট হয়ে গেলে। একটা অসৎ ব্যবসায়ী এইবার তোমাকে নাকে নড়ি দিয়ে পোষা জানোয়ারের মতো ঘোরাবে। ওঠ তো ওঠ, বোস তো বোস।
মানস : (ধমকের সুরে) মাধুরী।
মাধুরী : আজ তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ, কাল ওরা তোমাকে ধমকাবে।
মানস : সারাদিনের পর তুমি আমাকে একটু ঘুমোতে দেবে?
মাধুরী : আজ তুমি আমার জন্যে ঘুমোতে পারছ না, কাল তুমি ওদের জন্যে ঘুমোতে পারবে না। তোমার লোভ দিনে দিনে বাড়বে। আর ততই তুমি বিকিয়ে যাবে।
মানস : দ্যাখো বেশি প্যান-প্যান কোরো না। আজকাল সবাই ঘুষ নেয়। ওসব মধ্যযুগীয় আদর্শ একালে অচল।
মাধুরী : ও হল লোভীর যুক্তি।
মানস : ধ্যাততেরিকা। আমি ওঘরে গিয়ে শুই।
মাধুরী : শুতে পারো, তবে ঘুমোতে পারবে না। মশার কামড়ে উঠে আসতে হবে। আর আমি নেমে যাব না। তোমার পাশেই থাকব। কারণ শেষ পর্যন্ত আমি ছাড়া তোমার পাশে কেউ থাকবে না।
মানস : তোমার পায়ে পড়ি। দয়া করে চুপ করো মাধুরী।
মাধুরী : (হাই তুলে) হ্যাঁ, এবার আমি চুপ করেছি। এখন তুমি নিজের কণ্ঠস্বর শোনো।
[এফেক্ট]
মানস : না:, ঘুম আসছে না। জল খাই। বেডসুইচটা গেল কোথায়? ও এই তো বালিশের খোলের মধ্যে ঢুকে গেছে। কীভাবে মশারি গুঁজেছে। বাপস। ঘুষ? ঘুষ নিয়েছি ঘুষ। কে ঘুষ নেয় না। ধম্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির! এমন সুন্দর একটা কার্পেট নিজের রোজগারের পয়সার কোনও দিন কিনতে পারতাম? না কেনা উচিত? এই ঘুষে সমাজের কী ক্ষতি হচ্ছে? ঘুষ তো আর ঘুষি নয় যে সবাই দাঁত ছিরকুটে পড়বে। রসময়বাবুর ফাইলটাকে একটু স্নেহ করতে হবে। তাতে তো দেশেরই ভালো হবে। ব্যবসা বাড়বে। শিল্প বাড়বে। না শুয়ে পড়া যাক।
[এফেক্ট]
মানস মানস।
মানস : কে কে!
কণ্ঠস্বর : আমি তোমার বিবেক। তুমি কোন বংশের ছেলে মনে আছে? (একো) তোমার পিতা ছিলেন আদর্শ শিক্ষক। সারাজীবন অসত্য তার বিলাসিতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছেন। উপোস করেছেন তবু কারুর কাছে হাত পাতেননি। তুমি তার ছেলে হয়ে—আজ তুমি বড় রেস্তোরাঁয় পরের পয়সার সামান্য মদ্যপানও করেছ। এইভাবে একটু একটু করে তুমি নামতেই থাকবে। নীচে, আরও নীচে।
[হা হা হাসি]
মানস : কে কে? মাধুরী মাধুরী।
মাধুরী : [ঘুমজড়ানো কণ্ঠে] কী হল?
মানস : ঘরে কে ঢুকেছে—
মাধুরী : কে আবার ঢুকবে। আমি নিজে দরজা বন্ধ করেছি। আলো জ্বালো। কই কেউ নেই। তুমি আর আমি ছাড়া কেউ নেই।
মানস : [উত্তেজিত হয়ে] আছে আছে। ওই যে কার্পেট। আমার জীবনের প্রথম পাপ। এই রাতেই আমি ওর সৎকার করব। তুমি শুধু একবার হরিবোল...।
[রাস্তা থেকে চাপা গম্ভীর গলার শব্দ ভেসে এল। বলো হরি হরিবোল]
মাধুরী : কী হল, তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরেছ কেন?
মানস : ভয় করছে মাধুরী, ভীষণ ভয়?
মাধুরী : অনেকদিন ভুগে প্রকাশবাবু মারা গেলেন। সারাজীবন অনেক অন্যায় করেছেন। এই শেষ রাতের শীতল অন্ধকারে চলেছেন।
মানস : কোথায়?
মাধুরী : কেউ জানে না কোথায়।
মানস : আমার এত ভয় করছে কেন?
মাধুরী : তুমি একা অনেক দূরে গেছ—তাই এত ভয় করছে। ফিরে এসো। এই দু:খ-কষ্টের সংসারে আবার তুমি ফিরে এসো। দুর্নীতি হল মৃত্যু, ন্যায় আর নীতি হল জীবন।
।। ব বে বা ।।
[টেলিফোনের রিং]
মানস : হ্যালো।
গলা : কি রে, চিনতে পারছিস?
মানস : চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কে, সোমেন?
গলা : তোর মাথা। সোমেন তো এখন মন্ট্রিলে।
মানস : তুই তাহলে যোগেন।
গলা : তোর মুণ্ডু।
মানস : কে তুই?
গলা : আমি সৌরভ।
মানস : সৌরভ! তুই কোথা থেকে এলি এত বছর পরে!
সৌরভ : ফ্রম জার্মানি, মাই লাভ।
মানস : কি, একেবারে চলে এলি?
সৌরভ : অফিসে আছিস?
মানস : আপটু ফাইভ।
সৌরভ : আসছি আমি, পালিয়ে যাসনি।
(ফোন রাখার শব্দ)
বেয়ারা : বড়সায়েব ডাকছেন স্যার—
মানস : বলো আসছি।
বেয়ারা : স্যার গোটা পাঁচেক টাকা ধার দেবেন! মাইনে পেয়ে শোধ করে দেব।
মানস : সে আর করো কই! ধার সব সময় একমুখো রাস্তায় চলে। যা যায় তা আর আসে না।
বেয়ারা : কী করব স্যার। এই তো সামান্য মাইনে—তার ওপর মেয়েটা চিররুগণ।
মানস : এত ছেলেপুলে কেন? নিজে কষ্ট করছ করো আর পাঁচটাকে কষ্ট দিচ্ছ কেন?
বেয়ারা : এই একই উপদেশ শুনে শুনে আমার কান পচে গেল। আমাদের মাইনে কেন বাড়ে না সে কথাটা তো একবারও বলেন না।
মানস : মাইনে বাড়াবার মালিক কি আমরা? ওপরওয়ালাকে বলো।
বেয়ারা মিনিস্টার, মিনিস্টার থেকে বোঁ করে ঘুরে আবার আমরা। সেই জনগণ। আরশোলার ওড়া, পিঠ থেকে উড়ে চক্কর মেরে আবার পিঠেই এসে বসে পড়ল।
মানস : আন্দোলন করো।
বেয়ারা : আন্দোলনে ওপরতলায় দু-দশ টাকা বাড়ে, পিয়োনদের কিছু হয় না। তাদের জন্যে শুধু উপদেশ—ব্রহ্মচারী হয়ে বড়বাবুদের সেবা করে যাও। আর 'জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ', 'চলছে না চলবে না' করে যাও।
মানস : তোমার খুব পাকা কথা হয়েছে তো।
বেয়ারা : বাতেলার যুগই তো পড়েছে স্যার। সবাই জ্ঞান দিচ্ছে, পয়সা দিচ্ছে না কেউ। দশ টাকা মাইনে বাড়ল কি বাড়ল না—অমনি সবাই ধিতিং ধিতিং নৃত্য শুরু করে দিলে। বাজারদর আগের মতো ঠেলে উঠল। দশটা টাকা দেবেন স্যার?
মানস : পাঁচ থেকে দশ হয়ে গেল?
বেয়ারা : পাঁচ টাকায় আজকাল কী হয় স্যার? এক কেজি চালের দাম চার টাকা। ডালের কেজি আট টাকা। আলু দু টাকা চার আনা।
মানস : তুমি যে দেখি বাজারদর বলতে শুরু করলে। আকাশবাণীতে চলে যাও। আমার কাছে টাকা নেই।
বেয়ারা : [উদ্ধত ভঙ্গিতে] বড়সাহেব ডাকছেন।
মানস : কানে গেছে। না চেল্লালেও চলবে।
[অফিস-পরিবেশের শব্দ]
মানস : যে দিনই একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে কাটব ভাবি, সেই দিনই যত ঝামেলা। নাও, এই ফাইলের গন্ধমাদন ঘেঁটে এখন স্টেটমেন্ট তৈরি কর। এখুনি সৌরভ আসবে, হয়ে গেল। খেল খতম পয়সা হজম। বড়কত্তা যে মাল ঘাড়ে চাপালেন, আটটার আগে আর মাথা তোলা যাবে না।
[এফেক্ট—গান গাইতে গাইতে কেউ এগিয়ে আসছে]
সমীর : কী হল মানসদা? কী জপ করছেন? জপাৎ সিদ্ধি। হামনে কিসকো! ফাইলগুলো কি ডিসপোজাল থেকে কিনে আনলেন?
মানস : তোমার আর কী বলো সমীর। খেলোয়াড়দের চাকরি। আজ দিল্লি কাল বোম্বে—দয়া করে অফিসকে দর্শন দাও। আমাদের ভাগ্য! এই মড়া ঘেঁটে একটা স্টেটমেন্ট তৈরি করতে হবে। ভাবতে পারো আমার মনের অবস্থাটা কী?
সমীর : মানসদা, সত্যিই আপনি অশিক্ষিত!
মানস : তার মানে? অশিক্ষিত মানে?
সমীর : ব্যাকরণে বড়ো কাঁচা। টেনস পড়েননি ভালো করে। ব বে বা মনে আছে? কী কাল?
মানস : ভবিষ্যৎ কাল!
সমীর : এই তো জানেন দেখছি। প্রয়োগটাই জানেন না। কেতাবি হয়ে থাকলে চলবে? ব্যাবহারিক হতে শিখুন। স্টেটমেন্ট হবে।
মানস : হবে?
সমীর : বে।
মানস : বে?
সমীর : ব বে বা। ব-এর মেলা। বাড়ছে বয়েস। বাড়ছে বেকারি। মরছে বোকা। বাড়ছে হকার। যান যান হাত ধুয়ে আসুন। ওসব ঠেলে সরিয়ে রাখুন। অসুখ করবে দাদা।
মানস : স্টেটমেন্ট?
সমীর : হবে। সব হবে।
মানস : কবে হবে?
সমীর : যখন হবে তখন হবে।
[সৌরভ ঢুকছে]
সৌরভ : হ্যাললো ফ্রেন্ড!
মানস : সৌরভ না?
সৌরভ : কোনও সন্দেহ নেই।
মানস : বোস, বোস।
সৌরভ : বসে কাজ নেই। চল বাইরে যাই! কোথাও গিয়ে বসা যাক দু-দণ্ড। কতদিন পরে দেখা হল!
মানস : আমার স্টেটমেন্ট!
সমীর : এরই মধ্যে ভুলে গেলেন মানসদা। ব বে বা।
সৌরভ : ইয়েস ইয়েস, ব বে বা।
[হালকা বাজনা]
সৌরভ : জায়গাটা খুব খারাপ নয়। কী বলিস?
মানস : এই সব জায়গায় জীবনে আসার কথা ভাবিনি। খুব কস্টলি। এক কাপ চায়ের দাম একশো টাকা।
সৌরভ : তোর মাথা। এসব জায়গায় কেউ চা খেতে আসে না মানিক।
মানস : কী খেতে আসে?
সৌরভ : ওয়েটার, দুটো বড় হুইস্কি!
মানস : এই, হুইস-কি, ফুইস-কি আমি খাই না।
সৌরভ : চুপ। খাসনি, আজ খাবি। চিরকাল গেঁয়ো হয়ে থাকবি না কী? মর্ডান হতে শেখ মানস। ওয়েটার, দুটো বড়। ফুড পরে বলছি...
মানস : আমার ভয় করছে সৌরভ।
সৌরভ : তা তো করবেই। তুই যে মেয়েছেলেরও অধম। ওই দ্যাখ কোণের টেবিলে মেয়েরা কীরকম খাচ্ছে দেখেছিস?
মানস : তুই আমায় ছেড়ে দে ভাই।
সৌরভ : ফার্স করিসনি। সবাই তোকে দেখছে।
মানস : মুখে গন্ধ বেরবে। বউ ধরে ফেলবে।
সৌরভ : সে দায়িত্ব আমার পান খাইয়ে দেব। চুপ। ভায়লা গান গাইছে।
[ইংরিজি গান]
সৌরভ : ওয়েটার, চিকেন রেশমি কাবাব। [ইংরিজি গান]
সৌরভ : চিয়ারস।
[ইংরিজি গান]
সৌরভ : ওয়েটার, দুটো বড়। দু-প্লেট চিকেন তন্দুরি।
[গান—হাসির শব্দ]
মানস : [জড়ানো গলায়] সৌরভ? কী সুন্দর। স্বর্গ স্বর্গ।
সৌরভ : স্বর্গই তো? ইট, ড্রিংক অ্যান্ড বি মেরি।
মানস : কিন্তু ভগোয়ান!
সৌরভ : ভগোয়ান! তিনি ভাই গরিবের হুইসকি। [সুর করে] যার কেহ নাই তুমি আছ তার। ওয়েটার।
মানস : [নেশার গলায়] ওয়েটার। সৌরভ, আমাদের অফিসের ওই পিয়োন। ওই যে রে মধু মধু। ওর মেয়ে—মধু মধু। ওই মেয়েটার অ্যানিমিয়া।
সৌরভ : ব্র্যান্ডি আর চিকেন ব্রথ খেতে বল।
মানস : আমার কাছে দশ টাকা ধার চেয়েছিল। (খিল খিল করে হেসে) আমার কাছে টাকা ছিল। আমি দিইনি ভাই।
সৌরভ : বেশ করেছিস। অ্যানিমিয়ায় টাকা দিয়ে কী হবে? ও তো রক্ত দিতে হবে। ব্লাড ব্লাড। ওয়েটার।
[ইংরিজি গান]
[ট্যাক্সির হর্ন। যানবাহনের শব্দ]
[ব্রেক কষার শব্দ]
সৌরভ : মানস, এই মানস!
মানস : চাই না। চাই না আমি রাজা হতে।
সৌরভ : তোর বাড়ি এসে গেছে। নাম—নামতে পারবি?
মানস : ও সিওর।
সৌরভ : গুড নাইট।
মানস : না-ই-ই-ট।
[গাড়ি চলে যাওয়ার শব্দ]
মানস : (সিঁড়ির ধাপ গুনছে) এক, দুই, তিন। তিন, দুই এক। এক এক, দুই দুই। বেলটাতো এখানেই ছিল বাবা? গেলে কোথায় সুন্দরী, মাধুরী, মাধুরী। আমি যে হারিয়ে গেছি।
[দরজা খোলার শব্দ]
মাধুরী : এ কী? তুমি নেশা করেছ?
মানস : সুরাপান করিনে আমি, সুধা খাই জয় মা কালী বলে।
মাধুরী : তাই না কি? কে করলে তোমার এ সর্বনাশ। দাঁড়াও, তুমি ভেতরে এসো। তারপর তোমার দাওয়াই পড়ছে। এসো। [জোর গলায়]
মানস : হাত ধরে তুমি নিয়ে চলো সখা।
মাধুরী : হাত ধরে নয়, ঠ্যাং ধরে। [ধমকের সুরে] এসো ভেতরে।
মানস : আমি শুয়ে পড়ি বাবা। মা বকবে। মাধু মাধু, নিয়ে যাও। নিয়ে যাও।
মাধুরী : ছি ছি। কী লজ্জা!
মানস : লজ্জার কী আছে? লজ্জা। দিয়ে দাও। মধুর মেয়েকে বোতল বোতল রক্ত দিয়ে দাও। আমার অনেক রক্ত আছে।
মাধুরী : চুপ করে শোও। তা না হলে গায়ে জল ঢেলে দোব।
[বেল]
মরেছে—এই দু:সময়ে কে আবার এল।
[দরজা খোলার শব্দ]
মাস্টারমশাই আপনি?
মাস্টারমশাই : কী হয়েছে? মানসের শরীর খারাপ?
মাধুরী : [কাঁদো কাঁদো] নেশা করে এসেছে মাস্টারমশাই। দেখুন একবার। দিন দিন কী উন্নতি হচ্ছে।
মাস্টারমশাই : দাঁড়াও, দাঁড়াও, উতলা হয়ো না। ওর নেশা কাটুক। তারপর ওকে একটু লজ্জা দিতে হবে। সে ব্যবস্থা আমি করছি। তুমি রাতটা কোনওরকমে কাটাও মা। শুধু ভোরের দিকে একটু সজাগ থেকো। আমি আসব।
মাধুরী : এ আমার কী সর্বনাশ হল মাস্টারমশাই?
মাস্টারমশাই : তুমি হাল ছেড়ে দিও না মা। যুগ তো এইরকমই পড়েছে। সুপথের চেয়ে কুপথের দিকেই একালের মানুষের যাওয়ার প্রবণতা। ও কারুর পাল্লায় পড়ে গেছে! আচ্ছা। আমি আসি। দাওয়াই প্রস্তুত করি।
(পাখির ডাক ভোরের শব্দ—দরজায় টুকটুক শব্দ)
মাধুরী : মাস্টারমশাই এলেন?
(দরজা খুলতেই)
মাস্টারমশাই : আমি একা নই। ওই দ্যাখো, পুরো বেড়াবার দলটাই নিয়ে এসেছি। আর এই দ্যাখো।
মাধুরী : বোতল?
মাস্টারমশাই : হ্যাঁ, বোতল। কীসের আরক বলো তো? নিমপাতার। বাবু উঠেছেন?
মাধুরী : মাঝে মাঝে পাশ ফিরছে।
মাস্টারমশাই : বা:, ঠিক সময় এসেছি। চোখ খুলেই দেখবে এক ঘর লোক উদগ্রীব হয়ে চেয়ে আছে। চলো চলো। ভেতরে চলো।
(চেয়ারের শব্দ)
মানস : (জড়ান গলায়) ভোর কি হল? হরিণঘাটার দুধের গাড়ি কি এল? এ কী, আমি কোথায়? আপনারা আমাকে ঘিরে আছেন কেন?
মাস্টারমশাই : আর একটু খাবে বাবা? এই যে বোতল। বউমা পলকাটা বেশ ভালো একটা গেলাস দাও তো।
মানস : মাস্টারমশাই। এ কী?
মাস্টারমশাই : তরল পদার্থ বাবা। প্রথম প্রথম তুমি খাবে। তারপর এই তোমাকে খাবে।
মানস : আমি উঠব মাস্টারমশাই।
মাস্টারমশাই : তুমি ওঠো তাইতো আমরা চাই, কিন্তু তুমি যে পড়ে গেলে। তোমার পতনই যে আমরা দেখতে এলুম। অধ:পতন। কেমন করে পড়লে?
মানস : একজনের পাল্লায় পড়ে।
মাস্টারমশাই : তাই তো হয় বাবা। একজন ধরায়, আর একজন ধরে। তুমি সংসারী মানুষ। চাকরি করো। কত টাকাই বা তোমার রোজগার! তুমি যদি বোতল ধরো নিজেও মরবে, সংসারকেও মারবে।
মানস : আর আমি করব না মাস্টারমশাই।
মাস্টারমশাই : সে মনের জোর তোমার আছে?
মানস : আছে মাস্টারমশাই।
মাস্টারমশাই : তাহলে ওঠো। উঠে পড়ো। গেট আপ। শুধু শরীরটাকে ওঠালে চলবে না। মনে ওঠো। আত্মশক্তিতে ওঠো। সৎ, সুন্দর নাগরিক হয়ে ওঠো। বলো। (সুরে))উত্তিষ্ঠিত জাগ্রত প্রাপ্য বরান্নিবোধত।
।। বিয়ের আংটি ।।
পার্থ : মানসবাবু আছেন? মানসবাবু?
মানস : কে? আরে আপনি? কী ব্যাপার পার্থবাবু?
পার্থ : ভেতরে আসতে পারি?
মানস : অবশ্যই পারেন। আসুন আসুন।
পার্থ : বা: বেশ সাজিয়েছেন। ছিমছাম সুন্দর। অ, ফ্রিজ কিনে ফেলেছেন দেখছি। কবে কিনলেন? নগদে না ইনস্টলমেন্টে?
মানস : নগদে।
পার্থ : হ্যাঁ। নগদে কেনাই ভালো। বা: ডিভানটা বেড়ে লাগিয়েছেন। অকশনে কিনলেন? না করালেন?
মানস : করালুম।
পার্থ : পারেনও আপনি! এই বাজারে সংসার চালাতেই ধার হয়ে যায়। পয়সা বাঁচিয়ে ফ্রিজ কেনা, ফার্নিচার কেনা! বেশ পরিকল্পিত সংসার আপনার? এই যে, বউদি যে!
মাধুরী : কী ব্যাপার! এই সকালে, আজ আপনার অফিস নেই?
পার্থ : হ্যাঁ, আছে বইকি! যখন হোক গেলেই হল। আমাদের এই একটা সুবিধে। আসা-যাওয়ার স্বাধীনতা। যখন খুশি যাও, যখন খুশি চলে এসো।
মাধুরী : তা ভালো। এর নাম স্বাধীনতা।
পার্থ : আর এই স্বাধীনতার জন্যেই তো আমরা লড়েছিলুম। নিন বউদি, এক কাপ চা খাওয়ান। বেশ কড়া করে। চা, দুধ, চিনি সমান সমান। কী, অসুবিধে করলুম না তো?
মাধুরী : না, অসুবিধের কী আছে।
পার্থ : আমার মিসেস স্কুলটিচার তো? সাতসকালে উঠে, কোনওরকমে এক কাপ চা খাইয়ে কেটে পড়ে। সেই যে কেটে গেল এগারোটার আগে আর দেখা নেই।
মাধুরী : বসুন আপনি।
পার্থ : বুঝলেন মানসবাবু, স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে দুজনে চাকরি করলে সংসার একেবারে ভেসে যায়। ফ্লোটিং। নৌকোর মতো টলমল। ভাবতে পারেন, ভোরের প্রথম কাক, ফার্স্ট কাক, কা কা করছে, আর আমরা চা খাচ্ছি কোঁত কোঁত করে। আমার তখন সেই দধিমঙ্গলের কথা মনে পড়ে যায়।
মানস : দধিমঙ্গল মানে?
পার্থ : ভুলে গেলেন? সেই বিয়ের দিন ভোররাতে দই চিঁড়ে খাওয়া। ফান্টাসটিক, অমন ছটফট করছেন কেন?
মানস : আমি কী আর করছি। ঘড়ি আমায় করাচ্ছে। বেরোতে হবে যে। সকাল বেলা সময় এত কম।
পার্থ : তা ঠিক। আয় যত বাড়ে, সময় তত কমে। ব্যাবসাদাররা বলে টাইম ইজ মানি। তা আপনি ব্যাবসাদার নন, ঠিকাদার নন, অথচ ঘড়ি দেখছেন আর ছটফট করছেন। কোনও মানে হয়।
মানস : পার্থবাবু, আপনি কোনও কাজের কথা বলতে এসেছেন, না গল্প করে সময় কাটাতে এসেছেন?
পার্থ : মানসবাবু, আমি খুব বিপদে পড়ে গেছি। শুনেছি আপনি খুব ভালো মানুষ। খুব সুনাম আপনার চারিদিকে।
মানস : অবাক করলেন মশাই। বাঙালি বাঙালির সুনাম করে? আমি কারুর সুনাম করি না। আমার সুনাম কে করবে? ওসব বলে লাভ নেই। আপনার বিপদের কথা শোনা যাক।
পার্থ : এটা প্রাইভেট।
মানস : এখানে আর তো কেউ নেই। নির্ভয়ে বলে যান।
পার্থ : আপনার স্ত্রী।
মানস : মাধুরীর কাছ থেকে আমি কিছু গোপন করি না। অতএব আপনি আমাকে যা বলবেন তা আমাদের দুজনকেই বলা হবে।
পার্থ : না, আপনার সত্যিই কোনও তুলনা হয় না। স্ত্রীর সঙ্গে এমন দোস্তি কজনের থাকে? লাখে এক।
মানস : এবার কিন্তু সত্যিই আমি বিরক্ত হচ্ছি।
পার্থ : নো ওয়ান্ডার। আমি হলে আমিও বিরক্ত হতুম। ইচ্ছে করেই আমি একটু সময় নিচ্ছি। আচ্ছা, এই জিনিসটা একটু দেখুন তো।
মানস : কী এটা! আংটি! সোনার আংটি! আংটি দেখে আমি কী করব?
পার্থ : পাথরটা দেখুন।
মাধুরী : এই নিন চা। তোমার হাতে ওটা কী!
পার্থ : আংটি।
মাধুরী : আংটি কোথায় পেলে? কার আংটি?
মানস : পার্থবাবুর।
মাধুরী : কী হবে?
পার্থ : বউদি, বড়ো বিপদে পড়ে গেছি। বসুন বলছি।
মাধুরী : আমার সময় নেই। অফিসের ভাত রাঁধতে হবে।
পার্থ : জাস্ট এ মিনিট। আপনার মিনিট পাঁচেক সময় এই অভাজনকে দিন। বড়ো বিপদে পড়ে ছুটে এসেছি। বউদি, এই আংটিটার দাম অন্তত হাজার তিনেক টাকা। এইটা রেখে আমাকে অন্তত হাজার খানেক টাকা ধার দিন। আমি একটু একটু করে শোধ করে দেব।
মানস : এ আবার কী প্রস্তাব! হাজার টাকা আমি পাব কোথায়?
মাধুরী : তা ছাড়া আমরা তো বন্ধকি কারবার করি না। যারা করে তাদের কাছে যান।
পার্থ : অসম্ভব সুদ বউদি। এ আংটি আর জীবনে ছাড়াতে পারব না।
মাধুরী : তো আর কী হবে। আমরা মধ্যবিত্ত ছাপোষা মানুষ। দিন আনি দিন খাই। হাজার টাকা ধার দেওয়ার ক্ষমতা থাকলে এমনিই দেওয়া যেত।
পার্থ : ও কথা বলবেন না বউদি। আপনাদের পরিবারে লক্ষ্মী বিরাজ করছে।
মানস : এবার আমি উঠব।
পার্থ : তাহলে আমাকে কি ধরে নিতে হবে যে প্রতিবেশীর বিপদে বাঙালী পাশে এসে দাঁড়াবে না? চিরকাল যা করে এসেছে তাই করবে? নিজেরাই সুখে থাকি, অন্যরা ভেসে যাক!
মানস : আপনি যে মশাই ধমকাতে শুরু করলেন। ব্যাপারটা কী? চোখ রাঙিয়ে টাকা আদায় করবেন?
মাধুরী : তুমি আর সাতসকালে মাথা গরম কোরো না।
পার্থ : ছেলেবেলায় বৃথাই পড়লেন—সকলের তরে সকলে আমরা নিজের তরে কেহ তো নই! [চায়ের অ্যাকশন] চায়ে বড় বেশি মিষ্টি দিয়েছেন; আমি আবার চায়ে চিরকালই একটু কম মিষ্টি খাই।
মাধুরী : যাও, তুমি দাড়িটাড়ি কামিয়ে নাও।
পার্থ : হাজার না পারেন পাঁচশো দিন।
মাধুরী : একটা পয়সাও নেই। আপনারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে রোজগার করছেন, তাও ধার?
পার্থ : যারা সৎ সংসারী তাদের ধার দেনা হবেই। যা বাজার পড়েছে কালোবাজারি না হলে, চারপাশ থেকে পাওনাদার ছেঁকে ধরবেই।
মানস : তার মানে আমরা অসৎ সংসারী।
পার্থ : তা মশাই এই ফ্যান, ফোন, ফ্রিজ, ডিভান, দেওয়ালে প্ল্যাস্টিক পেন্ট—হচ্ছে কী করে? যাক, পাঁচশো না পারেন তিনশো দিন।
মানস : এবার ঘাড়ধাক্কা দেব। বাড়ি বয়ে সাত-সকালে অপমান করতে আসেন। উন্মাদ কোথাকার!
মাধুরী : জুয়া আর রেস খেললে এই অবস্থাই হয় পার্থবাবু।
পার্থ : কে বলেছে?
মাধুরী : আপনার স্ত্রী বলেছেন।
পার্থ : মিথ্যাবাদী। জানেন আপনি, রোজগারের একটা পয়সাও সংসারে ঠেকায় না।
মাধুরী : কেন ঠেকাবে? আপনি রেস খেলবেন নেশা করবেন। আর আপনার স্ত্রীর সংসার চালাবেন? ইয়ারকি!
মানস : কত মজা, শখের প্রাণ গড়ের মাঠ।
পার্থ : আমার অন্যায় হয়ে গেছে।
মানস : অন্যায় মানে? আপনার তো মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
পার্থ : ধরেছেন ঠিক। আমি অপ্রকৃতিস্থ। আপনারা জানেন আমার স্ত্রী ডিভোর্স চেয়ে মামলা ঠুকে দিয়েছে—
মাধুরী : বেশ করেছেন। বেশ করেছেন তিনি। আপনাদের মতো অপদার্থদের হাতে মেয়েরা পড়ে পড়ে মার খাবে না। যুগ পালটাচ্ছে। সংসার পেতে দুজনে দু-রাস্তায় চলবেন তা তো হয় না।
মানস : সংসার মানে যুগলবন্দি। সেতার-সরোদ, সানাই-বেহালা, বাঁশি-সন্তুর।
মাধুরী : তোমাকে আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। ঘড়ি দেখছ? কটা বাজল? এরপর তো ঘোড়ার মতো ছুটবে। খেতে বসার সময় আর থাকবে না।
পার্থ : মরে যাব; মানসবাবু শ দুয়েক টাকা অন্তত দিন। এটা আমার বিয়ের আংটি। আজ কিছু টাকার যোগাড় করতে না পারলে মার খেয়ে মরব!
মানস : আচ্ছা মুশকিল। টাকা পাব কোথায়?
মাধুরী : থাকলেও দোব না। আপনি দয়া করে আসুন।
পার্থ : ঠিক আছে। আমি চলেই যাচ্ছি। ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে।
মাধুরী : তার মানে?
পার্থ : আজ খুব সুখে আছেন। কাল কী হবে কেউ জানে না।
মানস : শাপ দিচ্ছেন? আপনার শাপে কিছু হবে না। সে শক্তি নেই আপনার।
মাধুরী : কী হল? দরজা তো ওদিকে! জানালার দিকে চললেন কোথায়?
পার্থ : রাস্তাটা একবার দেখেনি।
মানস : উ:, পৃথিবীতে কতরকমের ঝামেলা যে আছে।
পার্থ : ওই যে দাঁড়িয়ে আছে, ওরে বাবা।
মানস : কে দাঁড়িয়ে আছে?
পার্থ : চারটে ছেলে। বেরোলেই ঠ্যাঙাবে।
মানস : কেন?
পার্থ : চাকরি করে দোব বলে একজনের কাছ থেকে পাঁচশো টাকা নিয়েছিলুম।
মাধুরী : বা:, চিটিংবাজিও শুরু করেছেন।
পার্থ : কী করব বউদি। আমাকেও তো বাঁচতে হবে।
মাধুরী : যান, আপনি রাস্তায় গিয়ে বাঁচুন। এখানে এঘরে আর এক মিনিটও নয়।
মানস : যান না, আংটিটা ওদের হাতেই তুলে দিন।
পার্থ : আমার বিয়ের আংটি। তিন হাজার টাকা দাম।
মাধুরী : বুঝলেন পার্থবাবু, আপনাকে ঘোড়ায় ধরেছে। ঘোড়ার চেয়ে ওরা অনেক ভালো। দু-চার ঘা দিয়ে ছেড়ে দেবে।
পার্থ : আংটিটা আমি রেখে যাই।
মাধুরী : আরে শুনুন শুনুন।
পার্থ : [দূর থেকে] ওটা অন্তত নিরাপদে থাক বউদি। বেঁচে থাকলে পরে এসে নিয়ে যাব।
মানস : কী মুশকিল।
মাধুরী : কী বিপদ।
মানস : আংটির পাথরটা কী করুণ চোখে তাকিয়ে আছে দ্যাখো।
মাধুরী : ভদ্রলোকের জীবনের সেই আংটির কথা তুমি এবার ভেবে দ্যাখো। ফুল, মালা, লোকজন, বেনারসী, গরদ।
মানস : মানুষ কেন এমন হয়ে যায় মাধুরী?
মাধুরী : কেন এমন হয় বলো তো? সব ভেসে যায়।
মানস : ভাগ্য।
মাধুরী : না ভাগ্য নয়। কর্ম। যেমন বীজ বুনবে তেমন ফসল ফলবে।
[হই হই]
মানস : যাই। [লোকটাকে বাঁচাই। দেখি না ফেরানো যায় কি না।]
মাধুরী : নিজে না ফিরলে, কেউ কি ফেরাতে পারে?
।। তিল থেকে তাল ।।
মানস : উ:, কী শীত পড়েছে রে ভাই। লেপের তলা থেকে বেরোতে ইচ্ছে করছে না। রোদ উঠেছে? রোদ। মিষ্টি রোদ। কমলালেবু রোদ। উঠেছে মানিক? না আমারই মতো লেপের তলায় পড়ে আছে, এক কাপ গরম চায়ের অপেক্ষায়। সুয্যি ঠাকুর! উরে বাবারে ! কী ঠান্ডা রে! কড়াইশুঁটি খাব। ফুলকো লুচি খাব, বেগুন ভাজা দিয়ে। পরোটা খাব নলের গুড় দিয়ে। গলদা চিংড়ি খাব। আধ হাত সাইজের পারসে খাব। নোলায় জল আসছে রে! ব্যাগে কটা টাকা ডন মারছে রে। ঈশ্বর, একটা লটারি মিলিয়ে দাও প্রভু! একটু লবাবি করি।
মাধুরী : এখনও শুয়ে শুয়ে দ্যায়লা করছ কী গো?
মানস : পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল। গরম খেজুর রস খাব—ফ্যানা ফ্যানা।
মাধুরী : এই যে এনেছি। ধোঁয়া ছাড়ছে।
মানস : দাও দাও। অরে পিকো। ক্রিম ক্রেকার বিস্কুট দাও পুরু করে মাখন মাখিয়ে। তুলতুলে ডিম সেদ্ধ দাও, টাটকা গুঁড়নো মরিচ ছড়িয়ে।
মাধুরী : চা-টা ধরো। এটা বাস্তব। বাকিটা চোখ বুজিয়ে কল্পনা করে নাও। মনেই মথুরা।
মানস : আজ তোমার জমানো দু-এক পাত্তি ছাড়ো না! বড়ো মেজাজ এসে গেছে। হাফ ডজন গলদা আনি। ঠাস ফুলকপি গোটা দুই। একমুঠো কড়াইশুঁটি। আজ একেবারে ফেটে যাক।
মাধুরী : ছি: খোকা। অত লোভ ভালো নয়। আয় বুঝিয়া ব্যয়। জ্ঞানীর উপদেশ।
মানস : আর এক জ্ঞানী বলিয়াছেন ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ।
মাধুরী : দয়া করিয়া উঠিয়া পড়ো। ইহার পর আর গোদুগ্ধ পাইবে না। ডিপো বন্ধ হইয়া যাইবে।
মানস : যায়ে তো যায়ে কাঁহা।
মাধুরী : গেট আপ ডার্লিং। গো টু দি মার্কেট, কানা বেগুনের কোফতা হবে। চুনো মাছের ঝাল। অভাবে ডিম ঝালদে। আর বোগড়া চালের ভাত।
মানস : অভাবে ডিম ঝালদে! আর বোগড়া চালের ভাত। কোথা থেকে কই-পাতুরি? মাছের ডিমের বড়া? সাধ আছে সাধ্য নেই মা। বিছানাতেই গড়া।
মাধুরী : এবার লেপ তুলে গায়ে ঠান্ডা হাতের ছেঁকা।
মানস : মুরগী খাব, মটন খাব।
মাধুরী : পালং শাকের ঘণ্টো।
মানস : খেয়ে খেয়ে পচে গেছে। আর লাগে না ভালো।
[ঘড়ির শব্দ]
মাধুরী : শুনলে, কটা বাজল?
মানস : আজ আর সময়ের দাসত্ব নয়। আজ রবিবার। মাস পয়লা।
মাধুরী : মাস পয়লা কী গো? মাসের শেষ। কী কী বাড়ন্ত শুনবে? চিনি নেই।
মানস : বহুত আচ্ছা। মনে করো ডায়াবিটিস হয়েছে।
মাধুরী : আহা সাত-সকালেই কী অলক্ষুণে কথা। তেল বাড়ন্ত।
মানস : মনে করো জনডিস হয়েছে।
মাধুরী : তার চেয়ে মনে করো না কাল রাতে আমরা দুজনেই সহমরণে গেছি।
মানস : মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে। মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। কত দেশ আছে দেখার। কত খাদ্য আছে খাবার। কত বই আছে পড়ার। কত জিনিস আছে শেখার। একবার যখন জন্মেছি—প্রাণভরে বেঁচে যাই! তুমি আর আমি শুধু। আমার চটিটা গেল কোথায়? ঢুকেছে খাটের তলায়। নিশ্চয়ই তোমার কাজ। মেরেছ শুট। প্রণাম করো ভাই, প্রণাম করো। আমি গুরুজন।
মাধুরী : কেবলই গর্জন। তর্জন-গর্জন হম্বি-তম্বি। হায় গুরুজন! হায় গুরুজন! না বাবা সকাল থেকেই এত হাসি ভালো নয়। পরে কাঁদতে হবে।
[দৃশ্যান্তর]
মানস : মারো লাফ।
অশোক : কী বলছেন মশাই? কোথায় লাফ মারবেন?
মানস : গরম জলে। উত্তপ্ত কটাহে। ভেতরের অবস্থা কী দেখে এলেন। লো-প্রেসারের কিছু আছে?
অশোক : কুমড়ো। বড় বড় কুমড়ো আছে। কত খাবেন খান। অবলা পাম্পকিন। কচু আছে। গ্রেট কচু। কোনওরকমে গলার কাছে ছেড়ে দিন, হড়কে নেমে যাবে নীচে। গিন্নির হাতে ছেড়ে দিন, দেখিয়ে দেবে প্রচুর কালোয়াতি। পাটশাকের স্যালাড।
মানস : মাছের দিকে গিয়েছিলেন।
অশোক : নাইনটিন সেভেন্টিতে লাস্ট একবার গিয়েছিলুম। তারপর দীক্ষা নিয়ে নিলুম। পুরো ভেজিটেরিয়ান। বুড়ো আঙুলের ঢাকনা দিয়ে ভাত খাই। আর সৎ চিন্তা করি। হিংসা বড়ো খারাপ জিনিস।
মানস : আমি তাহলে ভেতরে যাই।
অশোক : আসুন আসুন, জয়ী হয়ে ফিরে আসুন।
[বাজারের ভেতর]
বিক্রেতা : এই যে দাদা। আসুন। আসুন।
মানস : বাবা। গলা এইরকম হয়ে গেল কী করে?
বিক্রেতা : সে অনেক কথা।
মানস : শুনি না কী কথা?
বিক্রেতা : এক কারখানায় কাজ করতুম। পঞ্চাশ টাকা হপ্তা। তাও আবার নো ওয়ার্ক-নো পে। তাই সবাই মিলে দিলুম একদিন ঝান্ডা উড়িয়ে। চলবে না চলবে না। লাগাতার চিল্লে গেলুম তিন বছর। চেল্লাই আর জল খাই। জল খাই আর চেল্লাই। সে এখনও খোলেনি। সাত পাকে বাঁধা হয়ে ঘোমটা মেরে পড়ে আছে ফুলশয্যায়। যদিও কেউ কেউ তখনও উলু দিচ্ছে। আমার আর দুটোই ম্যানেজের জিনিস মাস্টার! বিয়ে করে ফেললুম।
মানস : বিয়ে করে ফেললে কী গো। তোমার তো খুব সাহস।
বিক্রেতা : আরে বাবু। সাহস না থাকলে কেউ বিয়ে করতে পারে? ধর্মঘট আর ধর্মপত্নী এক জিনিস। দুটোতেই হাঁড়ি শিকেয় উঠে যায়। দুটোই ম্যানেজের জিনিস মাস্টার।
মানস : আমি মাস্টার?
বিক্রেতা : বা:, এই বাজারে বুক ফুলিয়ে যারা বাজার করে তারা সবাই মাস্টার।
মানস : দর-দস্তুর কী যাচ্ছে আজ? একটু নরম হয়েছে?
বিক্রেতা : কী নেবেন নিন না। এমন সুন্দর বিধুমুখী ফুলকপি। নববধূ যেন এইমাত্র ঘোমটা খুলেছে। মুক্তকেশী বেগুন। নটবর পালং। চিচিং ফাঁক সিম। পদতলে পড়ে তোলা লাউ। (গান)—এমন মানব জমিন রইল পতিত/আবাদ করলে ফলত সোনা/মনরে কৃষি কাজ জানো না।
মানস : বা:, বেশ স্ফূর্তিতে আছ দেখছি।
বিক্রেতা : কেন থাকব না প্রভু। এক সময় ক্রেতা ছিলুম। এখন বিক্রেতা। (গান) দে মা আমায় তবিলদারি। পমেটম টম টম টোম্যাটো। সিক্স রুপিজ এ কিলো। কী, এক কেজি হয়ে যাক।
মানস : আগে পুরোটা একবার ঘুরে আসি, আমার বাবা বলতেন সারা বাজারটা একবার ঘুরে আসবে। তারপর মাথা মুড়োবে।
বিক্রেতা : সে যুগ ভুলে যান। একই সুরে বাঁধা আছি সহস্র প্রাণ।
মানস : একই সুরে বাঁধা আছে সহস্র পরান!
বিক্রেতা : এই যে নিয়ে যান লাস্যময়ী পালং। বিধুমুখী ফুলকপি, খোঁপাময়ী বাঁধা। (বাজারের হই চই)
জনৈক : দাদা? কোথায় আট টাকা কে. জি. চারা বিক্রি হচ্ছে দাদা? শুনেছেন? কোন লাইনে?
মানস : মার্টিন লাইনে। বলাগড়ের কাছে।
জনৈক : আমার বউ বললে যে?
মানস : শ্বশুরবাড়িতে।
জনৈক : বিশ্বাস করুন। এই দেখুন দুটো টাকা আর এই প্লাস্টিকের ঠোঙাটা ধরিয়ে দিলে।
মানস : তিনি স্বপ্ন দেখেছেন, আর তা না হলে ব্যাক গিয়ারে চৌষট্টি সালে চলে গেছেন। খুবই প্রবীণা?
জনৈক : ধ্যাৎ মশাই, আমার আঠাশ হলে বউয়ের কত হবে—চব্বিশ।
মানস : তাহলে খুঁজে দেখুন।
[বাজারের হট্টগোল]
মানস : কাটা আজ কত করে যাচ্ছে ভাই?
বিক্রেতা : কতটা মাছ?
মানস : আগে দামটা শুনি।
বিক্রেতা : দাম শুনে কাম নাই।
মানস : দাম না শুনলে হিসেব হবে কী করে?
বিক্রেতা : দাম করনের সময় নাই। ধরেন, চল্লিশ যাইতেসে।
মানস : তিন টাকায় তাহলে কত হবে?
বিক্রেতা : দাঁড়ান। একটু জল ছিটাইয়া দি। ওঁ শান্তি, দ্যান তিনটাকা প্রণামী।
মানস : ইডিয়েট।
বিক্রেতা : হ: ঠিক চিনছেন। রতনে রতন চেনে। ভাল্লুক চেনে শাঁকালু। হইছে।
আরে, বিলাসবাবু যে, আয়েন, গাদাটা রাখছি।
মানস : সর্বাঙ্গে শান্তির জলের মতো মাছের জল ছিটিয়ে দিলে! আর আমি কিছুই করতে পারলাম না! আমি এক শিক্ষিত সরীসৃপ। বন্ধুগণ, অন্যায়ের প্রতিবাদ করুন বলে হাঁকডাক করলে কেউ আসবে? কেউ আসবে না? এই হলুম আমরা। আজ আর বাজারই করব না। মাংসের দোকানের সামনে লাইন দ্যাখো। যেন মড়ক লেগেছে।
[গাড়ির প্যাঁক প্যাঁক]
মাধুরী : কী গো। গেলে এত বড় একটা ব্যাগ নিয়ে। ফিরে এলে চোপসানো বেলুন হয়ে? কী, হল কী তোমার?
মানস : বুঝলে মাধুরী, পয়সার গরমে পৃথিবী তেতে আছে। পা রাখা যাচ্ছে না। হাত দেওয়া যাচ্ছে না। ছ্যাঁকা লেগে ফোস্কা হয়ে যাচ্ছে। দশ-বিশ টাকায় আর বাজার হবে না। একটা করে বড় পাত্তি নিয়ে যেতে হবে। দর-দস্তুর চলবে না। আমাদের এই চলাকে কী বলে জানো? ক্রাচে ভর দিয়ে চলা। এ যেন সার্কাস বালিকার তারের খেলা। একটু এপাশ ওপাশ হলেই দুম করে নীচে।
মাধুরী : সাত সকালেই কেন মাথা গরম করছ। এ তো তোমার রোজের অভিজ্ঞতা।
মানস : এভাবে বাঁচা যায় না। মধ্যবিত্তরা আর বাঁচবে না। এতকাল চিঁড়ে-চ্যাপটা হয়েছিল। এইবার সব খাবি খেয়ে মরবে। মাধুরী, তুমি কোনওরকমে বিধবা হয়ে যাও।
মাধুরী : চুপ। এ আবার কী অলক্ষুণে কথা। মাথাটা একেবারে গেছে।
মানস : তুমি বললে আজ একাদশী। একটু মাছ এনো। গায়ে ওঁ শান্তি বলে মাছের জল ছিটিয়ে দিয়েছে—জান? কী অপমান বোঝ?
মাধরী : যত ঝামেলা কী তোমার বরাতেই। কী করেছিলে? খুব বোলচাল মেরেছিলে বুঝি? তুমি তো আবার একটু রগচটা আছ। সেদিন খুচরো নিয়ে কী হল? তোমার হাত থেকে পাউরুটি কেড়ে নিল। কার কাছে গিয়েছিলে?
মানস : ওই যে গো, মদন মস্তান। দিনের বেলা মাছের কারবার আর রাতের বেলা ধেনো।
মাধুরী : তুমি কিছু না বলে চলে এলে?
মানস : কী করব? আমি যে একা।
মাধুরী : তোমাদের দ্বারা কিছু হবে না বুঝলে? এইবার আমাদেরই কোমর বেঁধে বেরতে হবে। তোমাদের দৌড় বোঝা গেছে। দাঁড়াও, আমি ঝ্যাঁটা নিয়ে বেরোচ্ছি। কে তোমার মদন মস্তান। আমি বাপের নাম ভুলিয়ে দিয়ে আসছি।
মানস : খবরদার মাধুরী। ও কাজ কোরো না। দিনকাল ভীষণ খারাপ।
মাধুরী : নিকুচি করেছে তোমার খারাপ দিনকালের। দিন দিন তোমরা কেঁচো হয়ে যাচ্ছ। ফোঁস করতেও ভুলে গেছ। কথামৃত পড়ো।
মানস : পড়ব বলে কিনে তো এনেছি।
মাধুরী : ওই কেনাই সার হবে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেছিলেন ফোঁস করবি।
মানস : এখন যাব? ফোঁস করে আসব?
মাধুরী : থাক খুব হয়েছে। তোমাদের যত ফোঁস ফোঁস এই বাড়িতে। আজ বাজারে অপমানিত হয়েছ। কাল বাড়ি বয়ে এসে অপমান করে যাবে। আলসের বটগাছ চারাতেই শেষ করতে হয়। কে তোমার মদন। আমি একাই বারোট বাজিয়ে আসছি।
মানস : [উদ্বিগ্ন চিৎকার] মাধুরী। মাধুরী।
।। প্রশ্ন ।।
মানস : গেট রেডি। এই বাসটা ছাড়া চলবে না, বুঝলে। মালকোচা বেঁধে তৈরি হও।
[বাস থামার শব্দ]
নাও নাও। উঠে পড়ো। উঠে পড়ো।
মাধুরী : কোথায় উঠব?
মানস : সামনে পেছনে যে দিকে খুশি। ছুঁচ হয়ে ঢোক, ঢুকে যাও। তারপর ফাল হয়ে—
[বাস ছেড়ে দেওয়ার শব্দ]
যা:, পাঁয়তারা কষতে কষতে চলেই গেল। তুমি একটা জেনুইন ল্যাদাডুস।
মাধুরী : এভাবে আমি পারব না। এ আমার কম্ম নয়।
মানস : এই মহানগরীতে তোমার বাস ছাড়া চলে না। কোনও দিন কোনও সময়ে তুমি বাস খালি পাবে? সারাজন্ম তোমাকে এইভাবে এখানে দু-ঠ্যাঙে খাড়া থাকতে হবে। ওহ নাও। এইবার একটা মিনি আসছে। প্রস্তুত হও।
[আবার থামার শব্দ]
নাও চার্জ। নিজেকে একটা ষাঁড় ভাবো। মনে করো একটা লাল কাপড় দেখেছ। মারো ঢুঁ—
যা:! চলে গেল। কী করছ কী তুমি?
মাধুরী : আমি কি ময়দার বস্তা, ঠেসেঠুসে ঢুকিয়ে দেবে? আমি একটা সুস্থ মানুষ। স্পর্শকাতর মানুষ। আমার একটা শরীর আছে। মান-সম্মান আছে।
মানস : ওই মান-সম্মান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকো এখানে। আর মাত্র আধঘণ্টা সময় আছে—থিয়েটারের টিকিট দুটো পকেটেই নষ্ট হোক।
মাধুরী : তা আমি কী করব? আমাকে ধমকাচ্ছ কেন? দোষ আমার? আমি ইচ্ছে করে দাঁড়িয়ে আছি!
মানস : তুমি ঝাঁপিয়ে পড়ছ না কেন? আঁচড়ে কামড়ে উঠতে পারছ না কেন?
মাধুরী : আশ্চর্য! কাকে কামড়াবে? আমি বেড়াল না মানুষ?
মানস : যাকে সামনে পাবে তাকেই আঁচড়ে কামড়ে ঢুকে যাবে। আমরা রোজ কীভাবে অফিস করি?
মাধুরী : তোমরা পারো। আমি পারি না। আমার একটা ভদ্রতাবোধ আছে। আমি কারুর গলাগালি খেতে চাই না। এমনকী তোমারও না।
মানস : বাস-ট্রামের গালাগালি কেউ গায়ে মাখে না। দেখলে তো তোমার সামনেই এক মহিলা কেমন উঠে গেলেন। আর তুমি সেই থেকে কেবল 'পারব না' 'পারব না' করছ। পাঁচজনে পারে যাহা তুমিও পারিবে তাহা!
মাধুরী : আমি পারিব না। আমার ক্ষমতা নাই—আমাকে মাফ করো।
মানস : প্রতিযোগিতার দুনিয়া। কেউ তোমাকে বিনা রণে সুচাগ্র মেদিনী দেবে না। লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে হবে। সংগ্রাম চলছে, চলবে। এ লড়াই বাঁচার লড়াই। একটা ট্যাক্সি আসছে ট্যাক্সি-ই-ই ট্যাক্সি। [সুর করে] যা: চলে গেল। ট্যাকসি ধরার একটা কায়দা আছে। মাধুরী তুমি জানো? ট্যাক্সি কীভাবে ডাকতে হয় জানো?
মাধুরী : সে আবার কী? ট্যাক্সি ডাকার আলাদা কোনও কায়দা আছে না কি? বেড়াল না হাঁস? মিউমিউ, চুক-চুক, চুই-চুই করে ডাকতে হবে। ট্যাক্সি বলে জোরে গলা ছেড়ে হাঁক পাড়ো। ঈশ্বর নাকি? যে ভজনা করতে হবে।
মানস : কলকাতার সব কায়দা আছে। ছোট ছেলেকে হিসি করাবার সময় যেরকম হিস হিস করতে হয় সেইরকম করলে তবে ট্যাক্সি আসে।
মাধুরী : ওই তো আসছে। হিস করো।
মানস : ওই শব্দটা মেয়েদের ঠোঁটে ভালো আসে। সহজাত।
মাধুরী : মা হই। তখন একবার দেখা যাবে। এখন তুমি করো।
মানস : হিস। হিস হিস। যা: চলে গেল।
মাধুরী : যাবেই তো। মাথামোটা।
মানস : তার মানে। আমার মাথা মোটা। আর তোমার মাথা সরু?
মাধুরী : অমন ফিস ফিস করে হিস হিস করলে হয়! জোরে করো।
মানস : একটু দাঁড়াও তাহলে। পোর্টেবল লাউড স্পিকার একটা কিনে আনি।
মাধুরী : শোনো। ন'মাসে ছ'মাসে যারা ট্যাক্সি চাপে তাদের ওরা চেনে। পাত্তা দেয় না। তুমি বরং একটা টানা রিকশা করো।
মানস : পাগল হয়েছ। আমার আত্মহত্যা করার ইচ্ছে নেই। অনেক সাধ আল্হাদ বাকি।
মাধুরী : তাহলে বাড়ি ফিরে চলো। খুব হয়েছে।
মানস : তোমার মতো একটা পোঁটলা নিয়ে রাস্তায় বেরলে এই অবস্থাই হয়।
মাধুরী : বিয়ে করার আগে সেটা বোঝা উচিত ছিল। এখন আর পস্তালে কী হবে। বউ তো আর জামা নয় যে ইচ্ছে হলেই পালটে ফেলবে।
বৃদ্ধা : কী হল রে বেটি। তখন থেকে দুটিতে মিলে কী করছিস? ঠুস-ঠাস।
মানস : দেখুন না দিদিমা। তখন থেকে যে কোনও বাস, মিনিবাস এলে দূরে পালাচ্ছে। কষ্ট না করলে কেষ্ট মেলে?
বৃদ্ধা : আমার বেটি তো লড়ুয়ে কার্তিক নয়। কোথায় যাবি তোরা?
মাধুরী : আর যাওয়া। থিয়েটার দেখতে যাব বলে বেরিয়েছিলুম সে বোধ হয় এতক্ষণে আদ্দেক হয়ে গেল।
বৃদ্ধা : দাঁড়া। চুপ করে দাঁড়া। আমার একটা গাড়ি আসবে।
মানস : আপনার গাড়ি।
বৃদ্ধা : হ্যাঁ বাবা, ঈশ্বর আমাকে একটা চারচাকা দিয়েছেন। এতক্ষণে এসে পড়ার কথা।
মাধুরী : আপনি এই ভাবে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?
বৃদ্ধা : কাউকে বোলো না বাবা। ওই গলির তস্য গলির ভেতর আমার এক বোন থাকে। তাকে দেখাশোনা করার কেউ নেই। বুড়ি একা পড়ে আছে নোনাধরা এক ভাঙা বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজনরা বিষয়ের চাকে মধু নেই দেখে ভেগে গেছে। আমি সুযোগ পেলেই লুকিয়ে-চুরিয়ে আসি। এসে একটা ওষুধ পথ্যের ব্যবস্থা করে দিয়ে যাই। আর কদিন, বুড়ি এ শীত কাটাতে পারবে কি না কে জানে? অয় যে তোমার রাধানাথ এসে গেছে।
[গাড়ি থামার শব্দ]
নাও, উঠে পড়ো। গোপাল আমার উঠে পড়ো। আয় বেটি আয়।
মানস : আপনি আগে উঠুন।
বৃদ্ধা : আ মোলো। ভদ্রতা হচ্ছে। যা বলছি শোন। তোরা আমার অতিথি, নারায়ণ।
[দরজা বন্ধ ও স্টার্ট নেওয়ার শব্দ]
মাধুরী : দিদিমা। আপনার বাড়ি কোথায়?
বৃদ্ধা : দুটিতে মিলে আসবি নাকি একদিন! ভোগ খেয়ে যাবি।
মাধুরী : ওর কিন্তু সাংঘাতিক পেট। খিচুড়ি দেখলে জ্ঞান থাকে না।
মানস : মাধুরী, কেন মিথ্যে বলছ? হ্যাঁ খেতুম। যখন যৌবন ছিল। এখন তো পাখির আহার হয়েছে।
বৃদ্ধা : সে কীরে ছোঁড়া। তোর যৌবন চলে গেছে—আমার তাহলে কী চলছে? তা হ্যাঁরে, তোর খাওয়া কেন কমল? এই তো খাওয়ার বয়েস। ভালো ডাক্তার-টাক্তার দেখা না বাবা।
মাধুরী : কে বলেছে খাওয়া কমেছে?
বৃদ্ধা : তুই থাম। তোর কথা কে শুনছে?
মানস : শরীরের কলকবজা সব ঠিক আছে। মা মারা যাওয়ার পর থেকে খাওয়ার বারোটা বেজে গেছে। ওর হাতের রান্না মুখে দেওয়া যায় না।
মাধুরী : কী? একেই বলে বেইমান। আমি রাঁধতে পারি না, তোমার বন্ধুরা খেয়ে গিয়ে কী বলে?
মানস : ওদের জন্যে তুমি ভালো রাঁধো। তোমার রোজের রান্না ক্যাডাভ্যারাস।
মাধুরী : ক্যাডাভ্যারাস। অকৃতজ্ঞ। আমি কীভাবে পুড়তে পুড়তে তোমাকে ভাত ধরাই।
বৃদ্ধা : শোন, তোদের ওই শম্ভু-নিশম্ভুর লড়াই থামা বাপু। কী লগ্নে বিয়ে হয়েছিল? কবে আসবি বল?
মাধুরী : যদি বলি আজ?
মানস : তোমার থিয়েটার।
মাধুরী : ও অফিস-থিয়েটার কে দেখবে।
মানস : না গো এরা ভালো করে।
মাধুরী : আমার মুড নষ্ট হয়ে গেছে।
বৃদ্ধা : তাহলে আজই চল।
মানস : আজ গেলে আপনি বলবেন হ্যাংলা।
বৃদ্ধা : বাঁদর ছেলে।
মাধুরী : ঠিক বলেছেন। ঠিক চিনেছেন। কত 'আমিই' যে জানে।
বৃদ্ধা : 'আমি' মানে?
মাধুরী : রামের বাহন, আর বলি কী করে? স্বামী-দেবতা। তবে সন্দেহ হয়।
বৃদ্ধা : কী সন্দেহ?
মাধুরী : পেছনে রোল করা নেই তো?
বৃদ্ধা : কী রোল করা?
মাধুরী : বুঝতে পারছেন না?
মানস : সাহস দেখেছেন? ল্যাজের কথা বলছে।
বৃদ্ধা : কী বদমাশ মেয়ে দেখেছ? কী, তাহলে যাবি তো?
মাধুরী : হ্যাঁ যাব। আপনার প্রেমে পড়ে গেছি।
বৃদ্ধা : রক্ষে কর মা। তোর মতো মা দজ্জাল মেয়ের প্রেমে পড়তে চাই না।
মাধরী : আমি দজ্জাল? তাহলে যাব না।
বৃদ্ধা : আচ্ছা, আচ্ছা। লক্ষ্মী মেয়ে। সোনা মেয়ে। হ্যাঁরে পাগলি, তোর মাথার চুল যে এখনও ভিজে। চান করার পর শুকোসনি?
মাধুরী : এই যে ইনি। সকাল থেকে আড্ডা মেরে মেরে একটায় ঢুকলেন চান করতে।
বৃদ্ধা : তুই এত বেলায় মাথায় জল দিলি কেন?
মাধুরী : কী করব! মাথায় কাকে অ্যা করে দিয়েছে।
বৃদ্ধা : অ্যা করে দিয়েছে? শুভ লক্ষণ। তুই রানি হবি।
মাধুরী : হ্যাঁ রাজাখানা যা জুটেছে তাতে রানি না হয়ে উপায় কী?
বৃদ্ধা : আমরা এসে গেছি।
মাধুরী : বাবা! কী বড় বাড়ি! আমার ভয় করছে।
বৃদ্ধা : ন্যাকামি করিস না। আজকাল মেয়েদের ভয়ডর আছে?
[চাকার পাথর মাড়ানোর শব্দ]
নে নাম।
[সংগীত]
মানস : মাধুরী, কীগো ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? কী ঘুম বাবা তোমার!
মাধুরী : ঘুমোইনি। স্বপ্ন দেখছিলাম। স্বপ্ন।
মানস : তা ঠিক। বিকেলটা স্বপ্নের মতো কেটে গেল।
মাধুরী : কী বিশাল বাড়ি বাগান। সবাই কেমন হাসি-খুশি। বড়লোক অথচ কোনও অহঙ্কার নেই।
মানস : বনেদি বড়লোক যে!
মাধুরী : সে জন্যে নয়। ধর্ম আর শিক্ষার গুণে।
মানস : পর কত সহজে আপন হয়ে গেছেন। আপনার চেয়ে আপন।
মাধুরী : আচ্ছা, তোমার মা কেন পারলেন না, আমাকে মেয়ের মতো কাছে টেনে নিতে।
মানস : মাধুরী, পুরোনো কাসুন্দি আর ঘেঁটো না, প্লিজ। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো।
মাধুরী : হ্যাঁ ঘুমিয়েই পড়ি। আজ খুব শীত পড়েছে। প্রশ্ন প্রশ্নই থাক।
[হাই তোলার শব্দ] ঘড়ি বাজছে।
।। প্ল্যাটফর্ম ।।
মানস : সাত সকালেই কোথায় ঝগড়া হচ্ছে বলো তো?
মাধুরী : ওপরে। তরলাদির প্রেসার বেড়েছে।
মানস : যাও না। গিয়ে থামিয়ে দিয়ে এসো না।
মাধুরী : প্রেসার নামবার ক্ষমতা আমার নেই। তবে মহিলাকে নামিয়ে আনতে পারি।
মানস : ঝগড়া যে নীচের দিকেই নেমে আসছে গো। (তরলার গলা) স্বার্থপরের দুনিয়া বেইমানের দুনিয়া। ওই জন্যেই বলে আপনার চেয়ে পর ভালো। পরের চেয়ে বন ভালো। সারাজীবন শুধু করে যাও। ভস্মে ঘি ঢেলে যাও।
মানস : খাঁটি কথা। সেন্ট পারসেন্ট খাঁটি। একেবারে আগমার্কা ঘি। (তরলার মা) কী করিস রে তুই? কী করিস রে? সারাদিন ধিতিং ধিতিং নাচ। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি।
মাধুরী : বুড়ির কথা শুনেছ?
মানস : ওই জন্যে তোমাকে আগেই আমার বলা আছে, মাধুরী আর যাই করো দয়া করে বুড়ি হয়ো না।
মাধুরী : একটা রিভলবার এনে রাখো। চল্লিশ পেরলেই দুম।
তরলা : তোমরা এখন বুঝবে না। বুঝবে সেদিন, যেদিন আমি থাকব না। মাস গেলে হাজারটি কড়কড়ে টাকা হাতে আর গুনে নিতে হচ্ছে না।
তরলার মা : যা যা টাকার গরম দেখাসনি।
তরলা : গরম তুমি দেখাচ্ছ। তোমার ছেলে ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে বসে থাকবে আর তোমার মেয়ে নেচে নেচে তার প্যাকেট প্যাকেট সিগারেট খরচ জোগাবে। বাহা রে বিচার! সব একচোখা দৈত্য।
মাধুরী : শুনলে? একেবারে খাঁটি কথা। কাঠের ঘানির খাঁটি সরষের তেলের মতো। ছেলেরা সব একচোখা দৈত্য। সেলফিস জায়েন্ট।
মানস : উনি তো শুধু ছেলেদের বললেন না, মেয়েদেরও বলেছেন।
তরলার মা : ছেলের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করিস না। বসে আছে, বসে আছে, যখন রোজগার করবে তখন বুঝিয়ে দেবে ঠ্যালা। একটা একটা করে তোর ওই বিষদাঁত উপড়ে দেবে।
তরলা : ঠ্যালা আমার নয়, ঠ্যালা বোঝাবে তোমাকে। ওই ধুমসি মেয়েটাকে বউ করে আনবে। সে এসে নোড়া দিয়ে তোমার থোঁতা মুখ আরও ভোঁতা করে দেবে।
তরলার মা : [চিৎকার করে] তরলা!
মানস : কোন মেয়েটা মাধুরী? ধুমসি কোন মেয়েটা?
মাধুরী : তোমার অত কৌতূহল কীসের? তুমি আদার বেপারী। তোমার জাহাজের খবরে দরকার কী?
মানস : ফর সেফটি। নিরাপত্তার কারণে। আমাদের সিলিং মানে ওদের ফ্লোর। কতটা একস্ট্রা লোড পড়বে জানা দরকার। সে রকম বুঝলে স্পেশাল ব্যবস্থা নিতে হবে।
তরলা : চিৎকার কোরো না। তোমার ওই কোকিলকণ্ঠ সকালের ভৈরবী সুরে আর ছেড়ো না। দিল্লির সংগীত একাডেমিতে ধরে নিয়ে যাবে।
তরলার মা: তোর জন্যেই চেঁচাতে হচ্ছে। সাত সকালেই আগুন। একটু কোমর দুলিয়ে মাথা একেবারে কিনে নিয়েছেন।
তরলা : মুখ সামলে।
তরলার মা : তুই মুখ সামলে। কার ভয়ে মুখ সামলাব? আমি কারুর খাই না পরি! সাত সকালে মুখের সামনে চা ধরতে হবে। পারব না যা। গতর থাকে, নিজে করে খা।
তরলা : তোমাদের লজ্জা করে না। নিজেরা সব ঢুকুর ঢুকুর খেলে। আমি কি ফালতু! আমি যেন উড়ে এসেছি?
তরলার মা : বেলা সাতটা অবধি বিছানায় পড়ে থাকলে ওই হবে।
তরলা : কাল আমার ফাংশন ছিল।
তরলার মা : [ভেঙিয়ে] ফ্যাংশন ছিল। ফ্যাংশান। আমি যেন বুঝি না। ঘাসে মুখ দিয়ে চলি। যেখানে যাচ্ছিস, যে চুলোয় যাচ্ছিস, সেখানে যা। আর ঢং দেখাতে ফিরিসনি!
[দরজা বন্ধের শব্দ]
মানস : যাও যাও মহিলাকে ধরে আনো। রেগে মেগে আত্মহত্যা করে না বসে। মেয়েরা আজকাল কথায় কথায় সুইসাইড করছে।
মাধুরী : আত্মহত্যা নয়। ঘরে ঘরে মেয়েদের আজকাল পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। প্রথমে ঝলসানো হয় তারপর কেরোসিন তেল ঢালা হয়।
মানস : সে তো বউদের। বর পোড়ানো একটা ফ্যাশান হয়েছে।
[বেল]
মাধুরী : চুপ। উনি নিজেই এসেছেন।
[দরজা খোলার শব্দ]
তরলা : সাত সকালেই বিরক্ত করতে এলুম ভাই।
মাধুরী : আসুন আসুন।
তরলা : বিরক্ত হচ্ছেন না তো?
মাধুরী : বিরক্ত হব কেন? বরং আনন্দ হচ্ছে।
তরলা : আনন্দ হচ্ছে? আজকাল মানুষের মানুষ দেখলে আনন্দ হয়? মুখে হাসে ভেতের ভেতরে জ্বলে যায়।
মানস : সবাই কি আর সমান? বাইরে সব একই রকম দেখতে ভেতরে উনিশ-বিশ আছে।
মাধুরী : বসুন চা করে আনি।
তরলা : চা! চা তো আপনাদের হয়ে গেছে।
মানস : তা হোক না। আপনার অনারে আবার হবে। মাধুরী, চালিয়ে দাও আর এক রাউন্ড।
তরলা : আমার আবার অনার!
মানস : কী বলছেন আপনি? আপনার এত খ্যাতি। এত সুনাম। আপনি আমাদের গর্ব।
তরলা : ও সব কিছু নয় মানসবাবু। জগৎ সংসারে শুধু টাকা আর স্বার্থ। শুধু দিয়ে যান। একদল ঠ্যাঙের ওপর ঠ্যাং তুলে বসে থাকবে, আর একদল খিদমত খেটে যাবে।
মানস : আপনার চোখে জল?
তরলা : না, ও কিছু না। কাল রাতে চোখে ঠান্ডা লেগে গেছে।
মানস : শিল্পীরা একটু বেশি স্পর্শকাতর হন। দেখুন, পরিবার থাকলেই পারিবারিক অশান্তি থাকবে। বিরোধ থাকবে। যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জার মাথা ব্যথা, সর্দির হাঁচি কাশি, শিশুর কান্না। ও কিছু না। বড় করে দিলেই বড়। ছোট করে নিলে ছোট। ভুলে যান। ভুলে যান, উপেক্ষা করুন।
তরলা : বলা সহজ মানসবাবু করা খুব শক্ত। মানুষ খুব ছোট ছোট কিছু জিনিস চায়। একটু স্নেহ, একটু ভালোবাসা। সারাদিন দু-চারটে মিষ্টি কথা।
মানস : ছোটখাটো জিনিসই তো পাওয়া শক্ত তরলাদি। ছুঁচ হারালে পাওয়া যায় না, হাতি হারালে পাওয়া যায়। কে আবার এল? [ডিং ডং বেল]
তরলা : আমি যাই [ডিং ডং]।
মানস : যাবেন মানে? কোথায় যাবেন? বসুন, চা আসছে।
[দরজা খোলার শব্দ]
পলাশ : [তরলার ভাই] আসতে পারি?
মানস : আসুন।
পলাশ : কী রে দিদি। তুই রাগ করে এখানে বসে আছিস? আমার সঙ্গে কথা বলবি না? আমি কী করেছি?
মানস : বস না ভাই।
পলাশ : দিদি রেগে আছে। আমার ওপর রাগ করিসনি দিদি। দ্যাখ, আমি বাথরুমে ছিলুম। জানিস তো শরীরের জন্য মা একটুতেই রেগে যায়। বাতের জন্যে নড়তে পারছে না। রোজ আমিই তো তোকে চা করে দি। ফোটানো চা পাছে খেতে হয়, তাই রাখিনি। একটুতে এত খেপে যাস। তুই কাঁদছিস কেন?
তরলা : [ধরা গলায়] ছাড়, আমার হাত ছাড়।
পলাশ : তুই আমাকে ছাড়লেও আমি তোকে ছাড়তে পারি না।
মাধুরী : বা:, কী সুন্দর দৃশ্য!
মানস : তুমি আর এক কাপ চা বেশি এনেছ?
মাধুরী : অবশ্যই। নিন চা খান। তরলাদি, চা। এ কী! কোথায় যাচ্ছেন? ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?
পলাশ : কোথায় যাচ্ছিস তুই? এই দিদি?
তরলা : ছাড়—আমার হাত ছাড়।
পলাশ : একবার আমি যে হাত ধরি, সে হাত আর ছাড়ি না।
মাধুরী : তরলাদি, পলাশের চোখ ছল ছল করছে। আপনি ওরকম করবেন না।
[ডিং ডং বেল]
মানস : মাধুরী দরজাটা খোলো তো।
মাধুরী : এ কী আপনি এই শরীরে নেমে এলেন কেন?
তরলার মা : কী করব মা? যত বয়েস বাড়ছে ততই আমার মেজাজ চড়ছে। আর মেজাজেরই বা দোষ কী?
মাধুরী : আসুন, আসুন ভিতরে আসুন। দেখবেন। সাবধান।
মানস : মাধুরী ওঁর হাতটা ধরো।
পলাশ : মা, তুমি আবার সিঁড়ি ভেঙে নীচে এলে কেন?
তরলার মা : মা বলেই এলুম। তরলা!
তরলা : বলো।
মা : আমার দিকে তাকিয়ে দ্যাখ। ষাটটা বছর এই জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। কী পেয়েছি আমি? কে কী দিয়েছে আমাকে? ঈশ্বরের কাছ থেকে চোখের জল, অ্যানিমিয়া আর বাত ছাড়া আরকি কী পেয়েছি?
পলাশ : কেন মা? আমাদের মত এমন সোনার চাঁদ ছেলেমেয়ে পেয়েছ?
মা : তুই চুপ কর। তরলা!
তরলা : বলো।
মা : চল, ওপরে চল।
তরলা : আমি বেশ আছি।
মা : তুই বেশ থাকতে পারিস। আমি বেশ নেই। জীবনে অনেক কেঁদেছি, তাই চোখে আর জল নেই। এখন এই বুকটা ফেটে যায়। ছেলেমেয়েরা বড় হলে ছেলেবেলার কথা ভুলে যায়। এই বুক দিয়ে যাদের আগলেছি তারাই বুকে শেল মারে। কথার একটু উনিশ-বিশ হলেই তখন মা হয়ে যায় মেয়েমানুষ। পান থেকে চুন খসার উপায় নেই।
পলাশ : মা, ফাটিয়ে দিয়েছ। কী ডায়লগ!
মাধুরী : চায় গরম। চায় গ্রম।
পলাশ : এ কী বউদি? এটা কোন স্টেশন?
মাধুরী : পৃথিবী ভাই! এই প্ল্যাটফর্মে ট্রেনের অপেক্ষায়। সেভেন আপ, ইলেভেন আপ। যার যখন আসে উঠে চলে যায়। পড়ে থাকে কয়েক বছরের অপেক্ষা।
পলাশ : ব্রাভো, ব্রাভো। মাতাজি, চায়ে গ্রম।
মা : মুখ পোড়া!
।। জলের মাছ জলে ।।
[ঘড়ি বাজছে মধ্যরাতে]
মাধুরী : উঁ উঁ উঁ হু, উঁ উঁ উঁ।
মানস : এই মাধুরী, মাধুরী, মাধুরী!
মাধুরী : উঁ।
মানস : কী হল তোমার? আপাদমস্তক মুড়ি দিয়ে অমন শব্দ করছ কেন? তোমায় ভূতে ধরলে নাকি?
মাধুরী : ভীষণ শীত কঁরছে।
মানস : শীতকালে শীত করবে না? আচ্ছা মুশকিলের কথা। তা বলে অমন নাকি সুরে কথা বলতে হবে?
মাধুরী : আঁমার দাঁতে দাঁতে ঠোঁকাঠুকি হঁয়ে যাঁচ্ছে। দাঁতকঁপাটি লেগে যাঁচ্ছে।
মানস : কই দেখি, তোমার গা দেখি। সর্বনাশ, গা যে একেবারে পুড়ে যাচ্ছে। তোমার তো জ্বর হয়েছে? মরেছে, ম্যালেরিয়া নয় তো।
মাধুরী : কী জানি। তুমি আঁমাকে চেঁপে ধঁরো।
মানস : তুমি দুপুরবেলা রোদে বসে তেঁতুল খেয়েছিলে নাকি?
মাধুরী : নাঁ।
মানস : আমড়ার অম্বল?
মাধুরী : এঁটা তো শীতকাল।
মানস : তাও তো ঠিক। আমড়া তো গরমকালে হয়। আচ্ছা মশা কামড়েছিল?
মাধুরী : মঁশা তোঁ সঁব সঁময় কাঁমড়াচ্ছে।
মানস : এই মাঝরাতে কী এখন করি। না আছে ওষুধ। ডাক্তারবাবুরাও সব ফ্ল্যাট। কী করব মাধুরী?
মাধুরী : এঁখন কিঁচ্ছু কঁরার নেই।
মানস : তুমি কোনও ক্রমে চন্দ্র বিন্দুটা ফেলে দিতে পারো? সব কথার মাথার ওপর একটা করে চন্দ্রবিন্দু। মেয়েদের কপালে টিপের মতো। ওই ভাবে কথা বললে আমার ভয় করে। তুমি মাধুরী তো। না লেপের তলায় অন্য কেউ এসে ঢুকেছে?
মাধুরী : তোঁমার আঁর কী বঁলো। আঁমি মঁরছি আঁমার জ্বালায়।
মানস : কপাল টিঁপে দোব?
মাধুরী : নাঁ।
মানস : গান শুনবে?
মাধুরী : নাঁ।
মানস : কবিতা আবৃত্তি করব?
মাধুরী : নাঁ।
মানস : গরম জল খাবে একটু?
মাধুরী : নাঁ।
মানস : তাহলে কী করব?
মাধুরী : কিঁচ্ছু নাঁ। শুঁয়ে পড়ো।
মানস : আর তুমি জ্বরে কোঁ কোঁ করো। ম্যালেরিয়ার জ্বর তো দুপুরে আসে। মাঝরাতে এল কেন? এ তাহলে অন্য কিছু। আরও সাংঘাতিক কোনও আক্রমণ। হ্যাঁ গো তুমি বাঁচবে তো? আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না তো?
মাধুরী : অঁত ভাঁবছ কেঁন?
মানস : সাধে ভাবছি। মাধুরী তুমি ছাড়া আমার জগৎ অন্ধকার। কে আর আছে আমার বলো তো?
মাধুরী : ওঁরে বাঁবারে কী শীত কঁরছে রেঁ।
মানস : আমার গরম কোটটা পরবে?
মাধুরী : পাঁগল।
মানস : পায়ে হটব্যাগ চাপাবে?
মাধুরী : গ্যাঁস নেই।
মানস : বিপদের সময় কেউ কি পাশে থাকে? কেউ না। গ্যাসও ফ্যাঁস হয়ে যায়। হা ঈশ্বর!
[আবহশব্দ : পাখির ডাক]
মানস : কী বুঝছেন ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু : এর আর বোঝাবুঝি কী? এই সবই তো আজকাল হচ্ছে। ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু আর ফ্লু, চারটে একসঙ্গে চেপে ধরে চিৎপাত করে দিচ্ছে।
মানস : কী হবে তাহলে?
ডাক্তারবাবু : কী আর হবে! চারটে বুলেট একসঙ্গে ছাড়ব। এ বেলা এক গন্ডা ক্যাপসুল, ও বেলা এক গন্ডা ক্যাপসুল। তিন দিনে রুগি উঠে বসবে। দাঁড়ালেই মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
মানস : মাথা ঘুরে?
ডাক্তারবাবু : ইয়েস, মাথা একেবারে লাট্টুর মতো ঘুরবে। ভয় নেই। তারও দাওয়াই আছে। পুষ্টিকর খাবার। মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ছানা, দই, ফল-পাকড়। দেখি একটা কাগজ দিন। প্রেসক্রিপশন লিখে দি।
মানস : আজকের পথ্য?
ডাক্তারবাবু : মাগুর মাছের সুরুয়া।
মানস : সে আবার কী?
ডাক্তারবাবু : সুরুয়া মানে স্ট্যু।
মাধুরী : স্ট্যু আমি সহ্য করতে পারি না।
ডাক্তারবাবু : সহ্য করতে হবে মা। যে অসুখের যে দাওয়াই।
মানস : স্ট্যু কী করে রাঁধে ডাক্তারবাবু?
ডাক্তারবাবু : যে কোনও একটা রান্নার বই দেখে নিন। ভেরি ইজি। অ্যাজ সিম্পল অ্যাজ এ-বি-সি। চলি, আসি। সাবধানে থেকো মা। অত্যাচার কোরো না।
মানস : নমস্কার ডাক্তারবাবু।
ডাক্তারবাবু : নমস্কার, নমস্কার।
মানস : মাধুরী রান্নার বই আছে?
মাধুরী : বই দেখে রান্না হয়! এসব স্ট্যু ফু ছাড়ো। দাঁড়াও না আমি উঠছি এখুনি। জ্বর এখন কমে আছে।
মানস : ওসব বাহানা ছাড়ো। আজ আমি সব করব।
মাধুরী : পারবে?
মানস : কী ভাবো তুমি? ছেলেরা সব পারে। কেবল করে না তাই।
[আবহসংগীত / পথের কোলাহল]
প্রথম কণ্ঠ : আরে মশাই গেল গেল। সব গেল।
মানস : কী হল?
প্রথম কণ্ঠ : আপনার ব্যাগ থেকে মাগুর মাছ বেরিয়ে রাস্তায় পড়ে কিলবিল করছে। ওই দেখুন।
মানস : অ্যাঁ, সে কী?
প্রথম কণ্ঠ : ধরুন ধরুন। নর্দমায় চলে যাবে।
দ্বিতীয় কণ্ঠ : ধরবেন না দাদা, ধরবেন না, কাঁটা মেরে দেবে।
প্রথম কণ্ঠ : মাগুরে মারে না, মারে সিঙ্গি।
দ্বিতীয় কণ্ঠ : কে বলেছে গুরু? একবার ধরে দ্যাখো না।
তৃতীয় কণ্ঠ : মাগুর মাছ। আহা বেড়ে সাইজ। কালিয়া যা খুলবে না। পেঁয়াজ দিয়ে মাংসের মতো কষে নিয়ে।
প্রথম কণ্ঠ : আরে মশাই, কপাত করে ধরে নিয়ে ঝোলায় পুরে ফেলুন।
মানস : ভয় করছে।
প্রথম কণ্ঠ : ও, খেতে ভয় করে না, ধরতে ভয় করে।
বৃদ্ধা : কী হল রে ছেলে? এখানে এত গণ্ডগোল কীসের!
মানস : আমার ব্যাগ থেকে মাছ বেরিয়ে পড়েছে ঠাকুমা।
বৃদ্ধা : তবু ভালো, বেড়াল বেরোয়নি। আর দেখি ভয়েই সব মরল। ধর, ব্যাগটা ধর রে ছেলে। এই এক। এই নে দুই। ব্যাগের মুখটা চেপে ধর, আবার না রেরিয়ে পড়ে। ঢ্যাঁড়শ কোথাকার?
[পথের কোলাহল]
দ্বিতীয় কণ্ঠ : কোথা থেকে এক বুড়ি এসে সব ভণ্ডুল করে দিলে। ভদ্রলোকের ক্ষমতায় কুলাতো না। আমাদের ভোগে যেত।
প্রথম কণ্ঠ : এই পরোপকারীদের জন্যে দেশটার বারোটা বেজে গেল।
[কোলাহল]
মানস : [আপনমনে] একটা কাজও কী সহজে হওয়ার উপায় আছে। ব্যাগ বেয়ে মাছ পালাচ্ছে। হাত ফসকে ভাগ্য পালাচ্ছে। ঘোর কলি। ঘোর কলি।
[প্রেসার কুকারের তীব্র শব্দ হল। ঘটি বাটি পড়ে যাওয়ার শব্দ]
মাধুরী : কী হল? কী দক্ষযজ্ঞ করছ? কী হল, রান্নাঘর থেকে পালিয়ে এলে কেন?
মানস : উরে শাবাশ! কী শব্দ! যেন দৈত্যের নিশ্বাস!
মাধুরী : প্রেসার কুকারের ওইরকম শব্দ হয়।
[আবার শব্দ]
মানস : শুনছ?
মাধুরী : যাও নামিয়ে নাও। সিটি মারছে।
মানস : কী করে নামাব? যদি ফেটে যায়?
মাধরী : ফাটবে কেন?
মানস : তুমি আমার জন্যে একটু প্রার্থনা করো না মাধুরী। যেন বেঁচে ফিরে আসি।
মাধুরী : যাও। জয়ী হও।
[আবার ফ্যাঁস]
মানস : তাহলে যাই কেমন? জয় বাবা বিশ্বনাথ! জয় বাবা ভোলানাথ! দেখো বাবা বোমেশ্বর! ফেটো না। ওয়ান, টু, থ্রি।
[ঘড়ির টিক টিক]
নেমেছে। বাবা নেমেছে। বাবা ল্যান্ড করেছে মাটিতে। তালি বাজাও। আচ্ছা এইবার এক রাউন্ড চা। তারপর মাছ। কিন্তু মাছ কাটার কী হবে? যাই অ্যাডভাইস নিয়ে আসি। মাধুরী, মাধুরী।
মাধুরী : বলো। কী হল আবার?
মানস : মাছ কাটার কী হবে বলতো?
মাধুরী : কেটে ফ্যালো। ছেলেরা তো সব পারে। অসাধু ব্যাবসাদার গলা কাটছে। মস্তানে পেট কাটছে। কাটাকুটি তো জলভাত।
মানস : আমি কোনওরকমে আলু, বেগুন, কপি, মুলো, কেটেছি। জ্যান্ত দাঁড়াওলা, শুঁড়ওলা মাছ কাটব কী করে? একটা কাজ করব? হাসপাতালের সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে নিয়ে যাব। ওঁরা তো অনেক কাটা ছেঁড়া করেন।
মাধুরী : খুব হয়েছে। মাছ দুটোকে চৌবাচ্চায় ছেড়ে দাও।
মানস : তুমি তো এখন কোঁ কোঁ করছ না। এই একটা ব্যাপারে একটু সাহায্য করো না।
মাধুরী : মাপ করো রাজা। জ্যান্ত মাছ আমি কাটতে পারি না। আমার চোখে জল এসে যায়। ওরা যেন আমার দিকে তাকিয়ে মা মা বলে ডাকতে থাকে। ওই জন্যেই তোমাকে আমি আনতে বারণ করেছিলুম।
মানস : তোমার শরীরের জন্যেই তো আনলুম।
মাধুরী : বেশ করেছ। এবারে ওদের চৌবাচ্চায় ছেড়ে দাও। ওদের আশীর্বাদে আমার শরীর ভালো হয়ে যাবে। তোমারও ভালো হবে।
মানস : বলছ? যাই তাহলে।
মাধুরী : একটু চা দেবে। জ্বরের মুখে কিছু ভালো লাগছে না।
মানস : চাপিয়েছি।
[জলতরঙ্গ]
মানস : যাও মাছ। জলে যাও। (জলের শব্দ) বা:, কী খেলছে। তোমরাও বাঁচো। আমরাও বাঁচি। উ:, কী ফূর্তি! জীবন যখন দিতে পারি না, জীবন নোব কোন আক্কেলে। মাধুরী, মাধুরী! দেখবে এসো। তোমার মাছেরা কেমন খেলা করছে।
[জলতরঙ্গ/সন্তুরের বাজনা]
।। লাইট হাউস ।।
মহিলা : দিদিমণি! দিদিমণি আছেন!
মাধুরী : কে?
মহিলা : আমি দিদিমণি।
শিশুকণ্ঠ : মা, আমরা বলো, আমরা। দুজন হলে আমরা বলতে হয়।
মহিলা : চুপ কর।
মাধুরী : কারা আবার এল, এই ভরদুপুরে। সবে একটু শুয়েছি লেপ মুড়ি দিয়ে। বেশ ঘুমটা আসছিল।
কে গো [দরজা খোলার শব্দ]
মহিলা : এই যে দিদিমণি। আমাদের আপনি চিনবেন না।
মাধুরী : কী চাই, সাহায্য? মাসের শেষ। আমার হাতে এখন কিছু নেই।
মহিলা : সাহায্য চাইতে আসিনি দিদি।
মাধুরী : তবে?
মহিলা : ভেতরে চলুন বলছি।
মাধুরী : যা বলার এইখানে বলো।
মহিলা : সন্দেহ হচ্ছে দিদি? হতেই পারে। দিনকাল তো ভালো নয়। আমি চোর ছ্যাঁচোর নই দিদি। আমাকে সরলবাবু পাঠালেন।
মাধুরী : কে সরলবাবু?
মহিলা : ওই যে রেশনের দোকান। দাদাবাবু বলেছিলেন কাজের জন্যে একটা বাচ্চা ছেলেটেলে পেলে ভালো হয়। তাই আমরা এসেছি দিদি। এই আমার ছেলে শঙ্কর।
মাধুরী : কীরে কীরে, প্রণাম করছিস। এইটুকু ছেলে তোকে এসব কে শেখালে রে? আজকাল তো প্রণামের পাঠ উঠেই গেছে। বেঁচে থাক বাবা। বা:, তোমার ছেলেটি তো বেশ গা। গোপাল ঠাকুরটির মতো দেখতে। এ কী কাঁদছ কেন? কী, হল কী তোমার?
শঙ্কর : মায়ের দু:খ হয়েছে গো মাসিমা। আমার মায়ের তো কেউ নেই।
মাধুরী : ভেতরে এসো, ভেতরে এসো।
[ফোঁস ফোঁস]
তোমার চেহারার কী অবস্থা। চুলে তেল নেই, চিরুনি পড়েনি কতকাল। মুখ শুকিয়ে আমসি। কতদিন খাওনি তুমি?
মহিলা : খেয়েছি। কিছু মনে করবেন না। চোখের জল চাপতে পারিনি।
মাধুরী : এসো। উহুঁ মেঝেতে নয়। মেঝেতে নয়। চেয়ারে বসো।
মহিলা : না দিদি। আমার মেঝেই ভালো। এমন সুন্দর মেঝে।
মাধুরী : তোমার কে কে আছে শঙ্করের মা?
মহিলা : আমার কেউ নেই দিদি। আমি আছি, আর আছে আমার এই পেটের শত্রু।
শঙ্কর : হি: হি:।
মাধুরী : হাসছিস যে বড়?
শঙ্কর : আমায় শত্রু বলছে। আমি কেন শত্রু হব! আমি তো ছেলে। আমার নাম শঙ্কর।
মাধুরী : তোমার কেউ নেই কেন?
মহিলা : শঙ্করের বাবা হঠাৎ মারা গেলেন। আমার দেবর নিজের নামে বিষয়-সম্পত্তি করে নিয়ে একদিন ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। গ্রামের মাতব্বররা বললে বেশ করেছে।
মাধুরী : কোন গ্রাম?
মহিলা : জয়নগর মজিলপুর।
মাধুরী : বাপের বাড়ির কেউ নেই?
মহিলা : ভাই একটা আছে। অমানুষ। চাল চুলোর ঠিক নেই।
মাধুরী : তা তুমি এখানে চলে এলে কী করে? এই বিশাল সাংঘাতিক শহরে। জানি না বাবা—আমার তো বাড়ির ভেতরে থেকেই ভয় করে। যা দিনকাল পড়েছে।
শঙ্কর : আমার একদম ভয় করে না মাসি। ভূতের ভয় না, কিচ্ছু না। মা সন্ধেবেলা রাঁধতে চলে যায়, মাতালবাবুদের বাড়ি। আমি তখন চুপ করে একা একা শিবের মন্দিরে বসে থাকি। ভানু বলে, বেলগাছ থেকে ব্রহ্মদত্যি নেমে এসে দেবে তোর ঘাড় মটকে। জানো মাসি, কিচ্ছু হয় না।
মাধুরী : তোর নাম যে শঙ্কর। তাই কিছু হয় না। তা হ্যাঁগা, মাতালবাবু কে?
মহিলা : ওই যে লোহার ব্যাবসা করে। মাতাল হয়ে মাঝরাতে বাড়ি ফিরে বউকে ধরে পেটায়।
মাধুরী : কে জানে বাবা! সে আবার কে। কতরকমই যে আছে এই চিড়িয়াখানায়। তা তুমি অমন বাড়িতে রাঁধতে যাও কেন? অমন গোলমালের বাড়িতে?
মহিলা : যেতুম ওই লোহাবাবুর বউয়ের দু:খে। ফুলের মতো বউটা। মেরে মেরে কালসিটে ফেলে দিয়েছে। ভালো করে খায় না, দায় না। আমি তবু ধরে করে জোর করে দুবেলা দু'মুঠো খাওয়াই।
মাধুরী : অমন স্বামী-দেবতার মুখে দুই থাপ্পড় কষিয়ে চলে যেতে পারছে না? অমন অ-সুখের সংসারের চেয়ে সুখের অ-সংসার ঢের ভালো।
মহিলা : মেয়েরা তা পারে কই দিদি। মেয়েরা হল পায়রার জাত। একটু খুপরি চাই। সেই খুপরিতে সারাজীবন ঘুরবে ফিরবে। বকবকম করবে। জানি না দিদি, কী হয়েছে। বড়লোকের ব্যাপার। দুদিন হল বউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। খুব থানা পুলিশ হচ্ছে। বউয়ের বড় ভাই পুলিশ এনেছিল, বাড়ি তল্লাস হল। আমাকে ডেকে অনেক কথা জিজ্ঞাসা করলে। আমি কী জানি যে বলব। রাতের বেলায় কোথায় কী হল, সব জানা যায়? আমি তো রাত ন'টায় চলে আসি। আসল রাত তো তার পরে শুরু হয়।
মাধুরী : দ্যাখো, কী করে বসে আছে। পয়সায় পাপের দরজা খুলে যায়। মেরেটেরেই ফেলেছে হয় তো। আজকাল তো বউ মারার যুগ পড়েছে। আগে সব বাঘ মারত বড় বড় শিকারি। বাঘ আর নেই, আছে বউ।
মহিলা : কাজটা আমি ছেড়ে দিয়েছি দিদি, ওই পাপের বাড়িতে আর যাব না। এই ছেলেটাকে একটু স্থান দিন দিদি। আমার জন্যে আমি একটুও ভাবি না। কতদিন একবেলা খেয়ে কাটিয়েছি। এখন না হয় একদিন অন্তর খাব।
মাধুরী : এর মতো একটা বাচ্চা থাকলে আমার কাজকর্মের খুব সুবিধেই হবে। তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তবে কী জানো, আমরা তো তেমন বড়লোক নই।। কী দিতে হবে, না হবে?
মহিলা : আপনি যা দেবেন দিদি। ছেলেটা ভদ্র পরিবেশে মানুষ হোক। আমার কাছে থাকলে নষ্ট হয়ে যাবে। আমার চালচুলোর ঠিক নেই।
মাধুরী : এতটুকু ছেলে, মা ছেড়ে থাকতে পারবে তো? হ্যাঁরে শঙ্কর, পারবি তো?
শঙ্কর : তোমাকে আমার খুব পচন্দ হয়েছে গো মাসি। হ্যাঁ—তোমাকে কী সুন্দর দেখতে। কেমন মিষ্টি কথা। তুমি মারবে না তো?
মাধুরী : দূর পাগল। মারব কেন। শঙ্করকে কেউ মারে? শঙ্কর হলো মহাদেব। তুই তাহলে থাক। মাসিতে আর বোনপোতে শুরু করে দেওয়া যাক। হ্যাঁ গো শঙ্করের মা, তোমার নাম বললে না?
মহিলা : ছেলের নামেই আমার নাম। সবাই শঙ্করের মা বলেই ডাকে। বাপ মায়ের দেওয়া নাম ভুল হয়ে গেছে। সে নাম ছিল—লেখা।
মাধুরী : বা:, সুন্দর নাম লেখা। লেখা তুমি কিছু খাবে? দাঁড়াও চা করি। চারটে প্রায় বাজল।
মহিলা : আমায় বলুন কোথায় কী আছে। আমি করে আনছি দিদি।
মাধুরী : তুমি শান্তিতে দু-দণ্ড বোসো তো। মনে করো তুমি আমার বাড়িতে বেড়াতে এসেছ। সব সময় অমন কাজ কাজ করো কেন? শঙ্কর আয়, তুই আয় আমার সঙ্গে।
শঙ্কর : চলো মাসি।
মানস : [গান] জাগো দুর্গা, জাগো দশ প্রহরণ ধরিণী। দনুজদলনী। হুঁ হুঁ হুঁ হু—ভুলে গেছি মা। [বেল] জাগো দুর্গা। মাধুরীদা, বাড়ি আছেন ভাই? আমি মানস। ম্যায় আয়া হুঁ। [বেল]
মাধুরী : [দরজা খুলে] কী ব্যাপার খোকা! আজ যে এত স্ফূর্তি।
মানস : বুঝলে মাধু আজ এক জ্যোতিষীকে হাত দেখালুম বুঝলে। আরে এ কে গো? ফুটফুটে সোনামুখো ছেলে। আরে আরে। প্রণাম করলি—তুই কে বাপু?
শঙ্কর : মাসি বলে দাও তো। আমি কে?
মাধুরী : এর নাম শঙ্কর। তুমি কাউকে একটা বাচ্চা ছেলের কথা বলেছিলে?
মানস : ইয়েস বলেছিলুম।
মাধুরী : এই সেই ছেলে। ওর মা এসে দিয়ে গেছে।
মানস : আরে ব্বাস। ফটাফট। কী নাম বললে? শঙ্কর। শঙ্কর এক গ্লাস পানি পিলাও। না পানি থাক। এই শীতে কফিই ভালো।
শঙ্কর : কফি মেসোমশাই?
মানস : হ্যাঁরে বাপু। সে তুই পারবি না। তোর মাসিকেই করতে হবে। কী মজা মাধুরী। তুমি এককথায় কেমন মাসি হয়ে গেলে। আর আমি তোমার মেসোমশাই।
মাধুরী : আমার কী গো? বলো শঙ্করের।
মানস : ওই হল রে বাপু। কথায় কথায় অমন ভুল ধরো কেন? যাও, যাও ডবল ডোজে একটা কফি ঠুকে দাও।
[বাজনার শব্দ]
মানস : কটা বাজল বলো তো?
মাধুরী : একটু আগে ঘড়ি দেখেছিলুম। এগারোটা বেজে গেছে।
মানস : এবার তাহলে শুয়ে পড়া যাক। শঙ্কর কোথায় শুয়েছে?
মাধুরী : পাশের ঘরে।
মানস : একা শুতে ভয় করবে না ওর?
মাধুরী : তোমার মতো ওর ভূতের ভয় নেই। সাহসী ছেলে।
মানস : সুন্দর ছেলে। যেমন কথাবার্তা, তেমনি চটপটে। ওকে বাজার করার ট্রেনিংটা দিয়ে বাজার করাটা ওর হাতে ছেড়ে দেব। সকালে আমি আর পারি না। তাড়াহুড়ো।
মাধুরী : সেটি হচ্ছে না চাঁদু।
মানস : তার মানে?
মাধুরী : মানে খুব সোজা। ওকে আমি মানুষ করব। ওকে স্কুলে ভরতি করব। ওকে আমি পড়াব। গান শেখাব। অদ্ভুত সুন্দর ওর গানের গলা। বিকেলে আমাকে একটা গান শোনাল। শুনে শুনে শেখা। এখনও আমার কানে লেগে আছে।
মানস : যা বাব্বা। তাহলে কাজের কী হবে?
মাধুরী : রাখো তোমার ঘোড়ার ডিমের কাজ। এই এক চিলতে সংসারে ক-ছটাকই বা কাজ আছে। শঙ্করের মতো একটা ছেলে মানুষ হলে দেশের কত উপকার হবে। ওর মা ভীষণ ভালোমানুষ। মায়ের মুখে হাসি ফুটবে। একদিন শঙ্কর বড় চাকরি করবে, কী বড় গাইয়ে হবে। নিজের বাড়ি গাড়ি নাম খ্যাতি।
মানস : তাতে আমাদের কী হবে কাঁচকলা?
মাধুরী : সেই জন্ম থেকে কেবল আমার আমার করছ। তাতে তোমার একটা ভুঁড়ি ছাড়া কী হয়েছে শুনি? এইবার বাকি জীবনটা একটু তোমার তোমার করে দ্যাখো না।
মানস : তোমার কথাবার্তা ভীষণ গোলমেলে ঠেকছে। আগে তো নিজের কথা ভাববে। তারপর সময় থাকলে পরের কথা। তাও কী রকম ভাবনা? এই যে কেমন আছেন? বাড়ির সব ভালো তো? হ্যাঁ ভালো। আপনি কেমন? খুব ভালো। ব্যাস, মিটে গেল ঝামেলা। এর বেশি এগোতে গেলেই ঝামেলা আছে মাধুরী। এক হাজার এক সমস্যা ঘরে ঘরে ডিম পাড়ছে। একবার যদি তোমাকে জড়িয়ে ধরে, একেবারে পেড়ে ফেলবে। বেঁচে থাকার কায়দা হল ধরি মাছ না-ছুঁই পানি।
মাধুরী : তুমি কায়দা করো। আমি কাজ করি।
মানস : তোমার মাথায় এই সব বুদ্ধি কে ঢোকাচ্ছে? এ তো মধ্যবিত্ত বাঙালি মাথা নয়। এ তে দেখছি বিলিতি মাথা। কোনও বাজে বইটই পড়ছ না কি।
মাধুরী : বাজে বই মানে?
মানস : যেসব বই পড়লে বিপ্লবী হয়, দেশোদ্ধারে যায়, শহিদ হতে চায়। ঘর ছেড়ে সন্ন্যাসী হতে ছোটে। যেসব বই পড়লে মানুষের মনে হয় স্বার্থপরের সংসার—এক বন্ধকূপ। সেইসব বই যা মানুষের মগজ কুরে কুরে খায়। আমরা তো পড়ব অন্য জিনিস, প্রেমের গল্প। একটি ছেলে একটি মেয়ে। এক ফালি চাঁদ, একটি পাখি দুটি হাঁস। পড়ব ভ্রমণকাহিনি। পড়ব ক্রাইম-থ্রিলার। আততায়ী রিভলবার হাতে পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছে। পাঠকের দম বন্ধ হয়ে আসছে। পড়ব সিনেমা-ম্যাগাজিন, ফ্যাশান ম্যাগাজিন। ভুরুর চুল তোলা শিখব। গালে আপেল পালিশ কী করে মারতে হয়। রক্তে শর্করার পরিমাণ কী করে কম রাখা যায়। বাত যেন না আসে। প্রেসার যেন না বাড়ে। এই তো আমাদের পাঠ্য। এই আমাদের করণীয়। হ্যাঁ, আর একটা বড় কাজ, বসের পায়ে তেল মাখানো।
মাধুরী : তাহলে আমাকে উঠতে হচ্ছে।
মানস : এই রাতে আবার উঠছ কোথায়?
মাধুরী : না না বিছানা ছেড়ে উঠছি না। মনের বিছানায় উঠে বসার কথা বলছি। মেয়েরাই মানুষকে জড়িয়ে ধরে সংসারের পাঁকে ঠেসে মারে। ডানা কেটে দিয়ে মেনিমুখে সংসারী করে দেয়। শেষে টাক ছানি বাত বায়ু ছেলের কেরিয়ার মেয়ের বিয়ে ইনসিওরেন্স প্রভিডেন্ট ফান্ড। কারার এই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল ভেঙে ফেল—।
মানস : উত্তেজক কিছু খেয়েছেন না কি মাধুরী? বেশ মেজাজে কথা বলছ। এক ঘুমেই তো সব মিইয়ে যাবে।
মাধুরী : দেখা যাক। কোথাও না কোথাও কাউকে না কাউকে শুরু তো করতেই হবে। সেদিন স্বামী বিবেকানন্দের একটা লেখায় পড়লুম—সকলকে সুখী না করলে নিজে সুখী হওয়া যায় না। আমার সুখ তোমার সুখ আলাদা আলাদাভাবে আসবে না। এলে একই সঙ্গে দুজনকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
মানস : ব্রেভো ব্রেভো! ঠিক হ্যায়, হাত মেলাও। আমরা দুজনে মিলে পথহারা নাবিকদের জন্যে একটা লাইট-হাউস তৈরি করি। কী আওয়াজ হচ্ছে? এত রাতে কে ঘর ঝাঁট দিচ্ছে?
মাধুরী : তাই তো। পাশের ঘরে। শঙ্কর। দাঁড়াও দেখে আসি।
মানস : যা:, মশারি-ফশারি জড়িয়ে কী যে করলে।
মাধুরী : শঙ্কর। কী করছিস এত রাতে?
শহকর : হেঁ: হেঁ:।
মানস : কীরে গাধা। রাত বারোটায় ফুলঝাড়ু?
শঙ্কর : জানো মাসি, মা বলেছে, শঙ্কর বসে বসে খাবি না। সব রকম কাজ শিখবি। তা মাসি ঝাঁট দেওয়াটা আমি তেমন পারি না তো। কোথাকার ধুলো, কোথায় চলে যায়, তাই ঘুম আসছিল না বলে শিখে নিচ্ছি। এই দ্যাখো এ এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে ধরে এদিক।
মানস : আর তোকে ধরে এই বিছানায়। ধপাস।
মাধুরী : আর এই তোর মাথায় এক গাঁট্টা।
মানস : আর এই আলোর সুইচ অফ।
[স্কুলের ঘণ্টা। শিশুদের কলকণ্ঠ]
।। পাঞ্জাবি আর বোতাম ।।
মাধুরী : (দূর থেকে) কী হল? কী হল গো? কী ফেললে? এ কী? কোথা থেকে পড়লে তুমি?
মানস : চিৎপটাং হয়ে গেছি মাধুরী। পপাত ধরণিতলে।
মাধুরী : লেগেছে? খুব লেগেছে তো?
মানস : তা একটু লেগেছে বইকি। আরও লাগত। তবে পড়ার সময় শরীরটাকে একেবারে আলগা করে দিয়েছিলুম।
মাধুরী : কোথা থেকে পড়লে?
মানস : চেয়ারের ওপর টুল। তার ওপর থেকে ডাইভ।
মাধুরী : অলিম্পিকে যাওয়ার আগে ডাইভিং প্র্যাকটিস করছিলে বুঝি?
মানস : না ম্যাডাম। তোমার উপকার করতে গিয়েছিলুম।
মাধুরী : তারপর নিজেকে কি পাখি ভাবলে। যাগগে, উঠতে পারবে? না ধরে তুলতে হবে?
মানস : পারব মনে হচ্ছে।
শঙ্কর : মাসি, তুমি একটু পরীক্ষা করে দ্যাখো না, কোথায় লাগল দ্যাখো না।
মানস : শঙ্কর, আমি উবুড় হয়ে শুচ্ছি, তুই আমার কোমরটা দুরমুস করে দে তো।
শঙ্কর : সে আবার কী গো?
মাধুরী : ঠান্ডা মেঝে থেকে ওঠো তো। শুয়ে শুয়ে আর মশকরা করতে হবে না। আর কোনওদিন যদি চেয়ারে টুল লাগিয়ে পাখা পরিষ্কার করতে ওঠো তো আমি ওই পাখা বিদেয় করে দোব। বয়েস বাড়ছে না কমছে?
মানস : উঁচু থেকে নীচের দিকে তাকানোর যে কী আনন্দ মাধুরী, উঁচুতে না উঠলে তুমি বুঝবে না। ফ্যান্টাসটিক। মেঝেটা কত নীচে। ছাদটা কত কাছে। সে এক আনন্দ! এ কী আনন্দ [সুর করে], উরে বাবারে কোমর গেছে রে।
শঙ্কর : মেসো, তুমি উঠে দাঁড়িয়ে একটু নেচে নাও। নিতাই-গৌর-রাধেশ্যাম বলে।
মাস্টারমশাই : মানস আছ মানস?
মাধুরী : আসুন মাস্টারমশাই আসুন।
মাস্টারমশাই : এ কী, যোগাসন করছ নাকি? একেবারে খালি মেঝেতে। একটা কম্বল-টম্বল বিছিয়ে নিতে হয়।
মাধুরী : আসন? জীবনে ব্যায়াম আসনের পাট নেই মাস্টারমশাই। সেসব থাকলে এই বয়সে অমন ভুঁড়ি হয়? উনি আছাড় খেয়েছেন। দেখছেন না একপাশে টুল একপাশে চেয়ার।
মাস্টারমশাই : কী সর্বনাশ! আস্ত আছ তো?
মানস : এক সময় ফুটবল খেলতুম তো।
মাস্টারমশাই : অয়ানস আপন এ টাইম।
মাধুরী : অয়ানস আপন এ টাইম আই মেট এ লেম্যান।
মাস্টারমশাই : ক্লোজ টু মাই ফার্ম।
[হাসি] [যন্ত্রসংগীত]
মাস্টারমশাই : মা মাধুরী, তুমি আমায় তলব করেছ কেন?
মাধুরী : তলব নয়। আমার অনুরোধ। প্রথম কারণ আজ সন্ধেবেলা এখানে কড়াইশুঁটির কচুরি খাবার নিমন্ত্রণ।
মাস্টারমশাই : সে কী! তুমি একলা হাতে পেরে উঠবে?
মাধুরী : আর একলা নই। আমার একজন অ্যাসিসটেন্ট এসে গেছে। এই যে সেই খুদে সহকারী শঙ্কর।
মাস্টারমশাই : বা:, ভারী সুন্দর ছেলে।
মাধুরী : দ্বিতীয় কারণ, আমি ভেবেছি, এই শঙ্করটাকে আমি লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করব। আমরা প্রতিটি পরিবার যদি এইরকম এক একটি ছেলেকে মানুষ করে দি, তাহলে তাদের ছেলেরাও মানুষ হবে। আবার তাদের তাদের ছেলেরাও মানুষ হবে।
মানস : তাদের তাদের তাদের তাদের ছেলেরা—উ:, তুমি থামো মাধুরী। এ সেই শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প তিমিকে যারা গিলে খায়, তিমিংগিল। তিমিংগিলকে যে খায় সেই প্রাণীটি হল তিমিংগিল-গিল। এই রকম তিমিংগিল-গিল-গিল-গিল-গিল।
মাস্টারমশাই : স্টপ, স্টপ।
মানস : মাস্টারমশাই এ ননস্টপ ব্যাপার। ফুলস্টপ দেওয়ার নেই।
মাধুরী : সব সময় এই লোকটির ইয়ারকি।
মাস্টারমশাই : তুমি ঠিক বলেছ মা। আমরা তো সবাই নিজের স্বার্থ ভাবতে ভাবতেই চিতায় গিয়ে চড়ি। আমাদের স্বভাবটাই ওইরকম হয়ে গেছে। যত সভ্য আর শিক্ষিত হচ্ছি ততই নীচ আর সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছি। সেই রসিকতা আছে না? কর্তা আমাদের খুব বড় দাতা। ভীষণ দান-ধ্যান। কাকে দান করেন? না স্ত্রীকে। কর্তা খুব ভাবেন। ভেবে ভেবে সারা রাত ঘুমোতে পারেন না। কী ভাবেন? ফিকসড ডিপজিট, পেনশান, গ্রাচুইটি, ছেলের এডুকেশন, মেয়ের বিয়ে। কর্তা খুব কর্মযোগী। কী রকম? প্রাকৃতিক কর্ম ছাড়া আর বিশেষ কিছুই করেন না। কর্তা খুব অতিথিপরায়ণ। কী রকম? শ্বশুরবাড়ির লোকজন এলে মাছ মাংস আর মিষ্টির বান ডেকে যায়।
মানস : চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে মাস্টারমশাই।
মাস্টারমশাই : এরই মধ্যে মা জননী চা এনে ফেলেছে, ম্যাজিক নাকি?
মানস : আপনি লক্ষ করেননি শঙ্কর এনেছে—আমাদের শঙ্করানন্দ।
মাস্টারমশাই : শঙ্কর, কোথায় গেলি রে। কী করছিস ওখানে? আমার জুতো নিয়ে কী করছিস?
শঙ্কর : এত ধুলো। কেউ ঝাড়ে না?
মাস্টারমশাই : আজকাল কে আর কী করে বল। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। মাথার সব চেয়ে কাছাকাছি হল পেট। সেই পেটের চিন্তায় আরও দূরের পায়ের কথা আর মনেই থাকে না।
শঙ্কর : আমি ঝেড়ে দিয়েছি। পরে কালি করে দোব।
মাস্টারমশাই : লক্ষ্মী, বাবা আমার। এদিকে আয় দেখি, তোর বুদ্ধি কেমন? বল তো, কোনও জিনিসের দাম ছ'টাকা কিলো হলে একশো গ্রামের দাম কত হবে?
শঙ্কর : ষাট পয়সা।
মাস্টারমশাই : ভেরি গুড। আচ্ছ বল তো, বারোটার দাম ছ'টাকা হলে দুটোর দাম কত হবে।
শঙ্কর : এক টাকা।
মানস : হয়নি। দুটোর দাম একটাকা হয় কী করে? আমি কালই কমলালেবু কিনেছি এক টাকায় একটা।
মাধুরী : নাও, বোঝ ঠ্যালা? ধান ভাঙতে শিবের গীত। এর মধ্যে কোথা থেকে কমলালেবু এসে গেল।
মানস : আসবেই তো। বললে ছ'টাকা ডজন। দুটো নিলুম। দু-টাকার নোট দিলুম। কিছুই ফেরত দিলে না। হাত পাতুলম, সে শুধু মিষ্টি হাসলে। বুঝলুম খেল খতম, পয়সা হজম।
মাধুরী : তুমি ঠকে মরেছ। গলাটি তোমার কচাং করে দিয়েছে। অঙ্কে মাস্টার তো।
মাস্টারমশাই : আহা ভুল করছ মা, যারা বড় বড় অঙ্ক নিয়ে ব্যস্ত থাকে, ছোট হিসেব তাদের মাথায় ঢোকে না। আইনস্টানের ছোটখাটো ব্যাপারে ভুল হয়ে যেত।
মাধুরী : যাক। আমিও কোনও মন্তব্য করতে চাই না। তবে জেনে রাখুন মাস্টারমশাই, অঙ্কে ওই মহাপুরুষ একশোর মধ্যে গোল্লা পাবে।
মাস্টারমশাই : না, শোনো না, ছেলেটির 'আই কিউ' বেশ ভালোই। যদি ক্ষরে না যায়, ওর হবে।
মানস : ক্ষরে যাওয়া মানে?
মাস্টারমশাই : মানে যারা খুব চালাক-চতুর হয় তাদের ভেতরে একটা ফাঁকিবাজি এসে যায়। শেষে অতিচালাকের গলায় দড়ি। শোন শঙ্কর। তুই রোজ দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর আমার কাছে চলে আসবি। আমি আজ সময় মতো তোর জন্যে কিছু বইপত্তর বের করে রাখব। কেমন? আমি এখন উঠি। আবার তো সন্ধে বেলা আসছি! তখন জমিয়ে গল্প হবে।
মাধুরী : সকাল সকাল আসবেন।
মাস্টারমশাই : সে আর বলতে। তোমাদের রাতের পরিবেশটি ভারী সুন্দর। যেন হরপার্বতীর সংসার। আসি এখন। শঙ্কর আসি রে। [মিউজিক]
মানস : মাস্টারমশাইয়ের কী হয়েছে বলো তো! কেমন যেন অন্যমনস্ক। মুখ বিষণ্ণ।
মাধুরী : আমারও যেন সেই রকমই মনে হল। কী মনে হয় জানো? ওই ছেলে, ছেলের বউ বৃদ্ধের জীবনটাকে শেষ করে দিলে।
মানস : যা:, ওঁর ছেলে খুব ভালো ছেলে। বউ চাকরি করে।
মাধুরী : তুমি কিস্যু জান না। তরলাদি বলছিলেন ছেলে এখন শ্বশুরবাড়ির দিকে একটু বেশি করে ঝুঁকছে।
মানস : মেয়েরা সব বেড়ালের মতো। সকলের হেঁসেলের খবর মুখে মুখে। কারুর মুখের কথা বিশ্বাস কোরো না।
মাধুরী : বেশ তুমি এখন ওঠো। দয়া করে বাজারে যাও। দু-তিন কিলো ভালো দানাওয়ালা কড়াইশুঁটি আনবে।
মানস : তুমি আজ আমায় দেউলে করবে।
মাধুরী : কিছু করতে চাইলেই দেউলে। আবার না করলেও রাগ। তোমার তো কেবল থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়।
[যন্ত্রসংগীত]
মাধুরী : শঙ্কর ক'টা বাজল রে?
শঙ্কর : তিনটে।
মাধুরী : তোর আর কত দেরি?
শঙ্কর : এই তো আর এই কটা ছাড়াতে বাকি।
মাধুরী : তিনি কী করছেন?
শঙ্কর : কে গো মাসি? মেসোমশাই?
মাধুরী : হ্যাঁরে।
শঙ্কর : ভোঁস ভোঁস।
মাধুরী : চায়ের পাটটা সেরে ফেলি আগে। কী বল? এরপর আর সময় পাওয়া যাবে না।
শঙ্কর : এত আগে চা খাবে? এই তো ভাত খাওয়া হল?
মাধুরী : ধ্যুত, শীতের বেলা চায়ের আবার সময় কী রে? অমৃত, যখন খুশি খেলেই হল। তুই বাবুকে টেনে তোল। অবেলায় পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছে। এরপর উঠেই বলবে শরীর খারাপ। খ্যাত-খ্যাত করছে।
শঙ্কর : মেসো, মেসো। ও মেসো
মানস : চুপ। আমি স্বপ্ন দেখছি।
শঙ্কর : জেগে জেগে কেউ স্বপ্ন দেখে!
মানস : আমি দেখি। আমি কি তোর মাসি? ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোলে তবেই তিনি স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্ন আমার হাত ধরা। বুঝলি?
শঙ্কর : চা হচ্ছে।
মানস : লাইন রাখ।
শঙ্কর : সে আবার কী রে বাবা?
মানস : রেশনের লাইন, কেরোসিনের লাইন। রান্নাঘরের সামনে একটা ইট পেতে রেখে আয়। আমার লাইন।
শঙ্কর : আমি মাসিকে ডেকে আনছি। লেপমুড়ি দিয়ে জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা বেরোবে।
মানস : আমার ওই সর্বনাশটা আর করিসনে বাপ। কড়াইশুঁটি নিয়ে আছে তাই থাক।
[যন্ত্রসংগীত]
মাধুরী : কী হল বলো তো? সাতটা বেজে গেল, মাস্টারমশাই এখনও এলেন না।
মানস : মনে হয় পুজোপাট শেষ করে আসবেন।
মাধুরী : কখন সন্ধে হয়ে গেছে। শীতের রাত। তুমি একবার দ্যাখো না।
মানস : দাও চাদরটা দাও। শীত শীত করছে। শঙ্কর চ'।
মাধুরী : যাবে পাশের ফ্ল্যাটে-এ চ' ও চ'।
মানস : আহা ওকে চিনিয়ে দি'। চিনে রাখুক। চিনে আসুক।
মাধুরী : কী মুশকিল, আমি ভাজতে পারছি না।
[যন্ত্রসংগীত]
শঙ্কর : মেসো সাবধানে নামো। সিঁড়িতে আলো নেই। আবার যেন পড়ে যেও না। সিঁড়িতে আলো নেই কেন গো?
মানস : বুঝলি শঙ্কর, ভাগের মা গঙ্গা পায় না। কে আলো লাগাবে? বাঙালির ব্যাপার শঙ্কর। মুখে বড় বড় বাত। সমালোচনা। কাজের বেলায় অষ্টরম্ভা।
শঙ্কর : তুমি তো বাঙালি।
মানস : অফ কোর্স। তবে তফাতটা কোথায় জানিস? আমি যে বাঙালি—সে কথাটা আমার সবসময় খেয়াল থাকে। সহজে ভুলি না। দেখলি না, পড়ে যাব জেনেও পাখা সাফ করার জন্যে চেয়ারে টুল লাগিয়ে টঙে উঠেছিলুম।
শঙ্কর : কিন্তু অবেলায় লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়েছিলে কেন?
মানস : আরে ধুর। সব সময় জেগে থাকতে ভালো লাগে? পৃথিবীটা দিন দিন কীরকম শেয়ালের মতো ধূর্ত হয়ে যাচ্ছে, বাঘের মতো হিংস্র হয়ে যাচ্ছে, সাপের মতো বিষধর হয়ে উঠছে। তুই বল, এই পৃথিবীতে বেশিক্ষণ জেগে থাকা ভালো? পাগল হয়ে যাবি।
শঙ্কর : মেসো, বাইরে কী ঠান্ডা বাতাস দিচ্ছে?
মানস : তোর শীত করছে, তুই এই চাদরটা নে। কাল তোর জন্যে মোটা একটা সোয়েটার কিনে আনব।
শঙ্কর : মেসো আমার শীত করছে না গো। মা বলে গরিব লোকের আবার শীত কী? শীত গ্রীষ্ম বড় লোকের।
মানস : শোন, তুই এখন আমাদের ছেলে। তুই আগের কথা সব ভুলে যা। এই নে চাদর।
শঙ্কর : মেসো আমার খুব গরম হচ্ছে। কেন বলো তো? গরম জামা আর লাগবে না।
মানস : হি হি। কী মজা! তোর কাছে আর একটা আছে! পরীক্ষা করি।
শঙ্কর : না গো। মেসো, তোমার এত ভালোবাসো কেন?
মানস : আমরা ভালোবাসতে জানি বলে। হি হি। কী রকম উত্তর। বল? একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছি।
মাস্টারমশাই : কী ফাটালে মানসকুমার?
মানস : আরে মাস্টারমশাই। এত দেরি? আমরা আপনাকে খুঁজতে যাচ্ছিলুম।
মাস্টারমশাই : বাবা পাঞ্জাবির ঘরে কোনও দিন বোতাম ঢোকাবার চেষ্টা করে দেখেছ? একঘণ্টা কসরতের পর দুটো লাগিয়েছি। দুটোর আশা ছেড়েই দিয়েছি। মানুষের যেমন আজকাল শুভবুদ্ধি ঢোকে না, পাঞ্জাবিতে আজকাল তেমনি বোতাম ঢোকে না। চলো চলো—মা আমার বসে আছে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন