একদা 'একদিন'

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পরপর দাঁড়িয়ে আছে ষোলোটা সাদা অ্যামবাসাডর। সবক'টাই ঝকঝকে নতুন, যেন এইমাত্র কারখানা থেকে বেরিয়ে এল। হাতে গরম। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। সব বড়কর্তা। এসি আর ডিসি-র নীচে কেউ নেই। ঝাঁক ঝাঁক ব্ল্যাক ক্যাট। প্রত্যেকের হাতে অটোমেটিক। একটু এদিক সেদিক হলেই পাঁজরা ঝাঁজরা বানিয়ে ছেড়ে দেবে। গোটা শরীরটাই ফুটো। আগে দুটো ফুটো দিয়ে শ্বাস নিতে, এখন গোটাটাই নাক। শয়ে শয়ে ফুটো। রাস্তার দুটো মাথাই বন্ধ। কিছুক্ষণের জন্যে যান চলাচল করবে না। মুখ্যমন্ত্রী সচিবালয় থেকে বাড়ি ফিরছেন। জেড ক্যাটাগরির নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিছু করার নেই। চারপাশে ছারপোকার মতো টেররিস্ট। মানুষ মারার সর্বাধুনিক ব্যবস্থা নিয়ে ঘুরছে। হরেকরকমের সব দাবি। সকলেই এক একটা স্বতন্ত্র স্বাধীন রাজ্য চাইছে। কেউ কারও তাঁবে থাকবে না। সকলেরই কোমরে ভেলিগুড়ের মতো বিস্ফোরক। নাম তার আরডিএক্স। পেছনে বোতাম ফিট করা, তলপেটে এক জোড়া ব্যাটারি, দু-গাছা লিকলিকে তার। কী কেমন আছেন স্যার? ভালো আছি, তুমি কেমন আছ বলার সময়ও মিলবে না। ব্লাম। দুজনেই স্বর্গে। কদম গাছের ডালে এক জোড়া আত্মা। সর্বাঙ্গে কদম ফুলের মতো রোমাঞ্চ! উই আর অন দি সেম ডাল ব্রাদার। দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা।

মেটাল ডিটেকটার দিয়ে পথ ঘাট দেখা হচ্ছে। প্রতিটি গাড়ির ভেতর ও তলা। পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধান। দুনিয়াকে বিশ্বাস নেই। কোথাকার কাজিয়া কোথায় চলে আসে কেউ জানে না। অমন সোনার চাঁদ ছেলেটাকে কেমন গলায় মালা দিয়ে, প্রণাম করার ভান করে ফর্দাফাই করে দিলে! এক সেকেন্ড আগে বোঝা গিয়েছিল! কেন, এই যে হালফিল গেলেন পাঞ্জাবের সিএম। সেও তো এই গাড়ি কেস! কোথায় বাড়ি যাবেন, চলে গেলেন স্বর্গে!

পিক করে একটা শব্দ হল। সাবধান! টাইম বোমার টিকি। হলেও হতে পারে। না, সামান্য জিনিস! একটা সেফটি পিন। বাস ধরার কোস্তাকুস্তিতে কারও বক্ষচ্যুত হয়েছে। কোথা থেকে একটা নেড়ি কুকুর ব্যুহ ভেদ করে ঢুকে পড়েছে। সিকিউরিটির প্রতি সামান্যতম শ্রদ্ধার ভাব নেই এই সারমেয়কুলের। কিছুদিন আগে শেয়াল নিয়ে কী কেলেঙ্কারি! অভূতপূর্ব। এই এক কুকুর। ভোটার লিস্টে যাদের নাম আছে, তাদেরই সমীহ করা হয় না আজকাল, এ ব্যাটা তো লিস্ট বহির্ভূত প্রাণী; তবে হ্যাঁ, লেজে গোবরে করে দিতে ওস্তাদ। এদিকে তাড়ালে ওদিকে যায়, ওদিকে তাড়ালে এদিকে। ডগ স্কোয়াড রেডি ছিল। ক্যাঁক করে ধরে সোজা পলিথিন ব্যাগে চালান।

এই নিরুত্তেজক রুটিন ব্যাপারটায় যথেষ্ট উত্তেজনা আনার জন্য আমেরিকান কায়দায় কোড নেম দেওয়া যেতে পারে, যেমন অপারেশন ব্লু-ফকস! রিসিভারে বিপবিপ সিগন্যাল, হ্যালো হ্যালো মাইকেল, ফ্রম দি কার্নিস, দি ডল ইজ রেডি ফর ডেলিভারি। প্যাকিং ইজ কমপ্লিট। মানে, তিনি অবতরণ করছেন। একা তো নয়। হিউম্যান ওয়াল দিয়ে ঘেরা। গাছের ডালে বসে টেলিস্কোপিক রাইফেল দিয়ে তাক করলেও সুবিধে হবে না। ফুটো হবে একটা কমাণ্ডার। বিধবা পাবেন তিন লাখ টাকা কমপেনসেশন।

এক ডজন মাথা বেরিয়ে এল। এর মধ্যে তিনটি মাথার মালিক সি এম। পরপর ষোলোটা গাড়ির দরজা খুলছে। বসবেন র‌্যান্ডাম চয়েসে। তিনে বসবেন, কি পাঁচে, না সাতে, তৎক্ষণাৎ ঠিক হবে। এটাও সিকিউরিটি গেম। আগে ভাগে ঠিক করে রাখলে রক্ষীদের কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে। রক্ষক ভক্ষক হতে কতক্ষণ! এ যুগে সবই সম্ভব।

সিএম ঝাঁকের মৌমাছির মতো এগোচ্ছেন। চারপাশে সিকিউরিটির লোক। আধুনিক অস্ত্রধারী ব্ল্যাক ক্যাটের দল। এক নম্বর গাড়ি, না দু-নম্বর, মনের সায় নেই। তিন নম্বর বাতিল। ঝপঝপ দরজা বন্ধ হচ্ছে। সিএম এগোচ্ছেন। সবাই তটস্থ। জোড়া জোড়া চোখ ভূতল, উচ্চতল, উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম নৈঋত, ঈশান, নজর রাখতেই ব্যস্ত। মৃত্যু গোলক যে-কোনওদিক থেকেই ছুটে আসতে পারে।

সিএম আজ গুড মুডে। রাজ্যের কোথাও কোনও সমস্যা নেই। মেশিন স্মুথ চলছে। কেন্দ্র গেঁজে গেছে। হাওলা, গাওলায় রথী-মহারথীরা ফ্ল্যাট। গুড টাইম। স্মুথ সেলিং। ভরা পালে সুবাতাস। শিস দিতে ইচ্ছে করছে। নস্টালজিয়া আসছে।

সিএম অন্যমনস্ক ষোলোতম গাড়িটিও অতিক্রম করে, বেড়া ফেড়া টপকে সোজা সামনে হেঁটে চলেছেন। প্রচণ্ড গুলতানিতে প্রহরীরা লক্ষই করল না। ধাস করে বন্ধ হল শেষ গাড়ির দরজা। ইলেকট্রনিক সিগন্যাল এল বিপ! পুরো ব্যাপারটার কন্ট্রোলে ছিল কম্পিউটার। ওকে সিগন্যাল। কনভয়ের যাত্রা শুরু হল। পাইলট কারে ওঁয়া ওঁয়া শব্দ। মাথার ওপর পাক মারছে লাল আলো। কোনও তফাত নেই, মরণাপন্ন রোগী অ্যাম্বুলেনসের সঙ্গে। ড্রিপ চলছে, পাখার বাতাস। সাইরেনে নবজাতকের কান্না। ছুটেছে হাসপাতালের দিকে। আন্ত্রিক অথবা হার্ট, অথবা ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া। মরে না যায়। সিএম বাড়ি ফিরছেন। ষোলো রথের কনভয়। সেই একই কান্নার সুর সাইরেনে—ওঁয়া ওঁয়া। মৃত্যু যেন হাত না বাড়ায়। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হলে সিকিউরিটি আরও টাইট করা হবে। এয়ার কন্ডিশনড, অক্সিজেন ফিলড লোহার সিন্দুক, ভিভিআইপি-দের জন্যে। চারপাশে চারটে স্পিকার। ভেতরে অডিয়ো সিস্টেম। সভায় এসে আসন গ্রহণ করলেন সিন্দুক। ফুলের মালা চাপানো হল। শুরু হল সিন্দুকের ভাষণ। বন্ধুগণ, আপনারাও ভালোবাসেন, আমিও ভালোবাসি প্রেমের আলিঙ্গনে বাঁধা পড়তে। শুধু টেকনিক্যাল কারণে, এই টেকনোলজির যুগে লখিন্দরের লোহার বাসরে ঢুকে আছি। মহাপ্রভুরা মধ্যযুগ আর নেই। মাধাইরা তখন ইনোসেন্ট কলসির কানা ছুড়ত। কপালে রুমাল চেপে বলা যেত, মেরেছিস কলসির কানা, তা বলে কী প্রেম দেব না। বন্ধুগণ প্রেম আজও আছে প্রেমের তালশাঁস; কিন্তু অ্যাডভানসড মাধাইদের দাপটে এই লোহার বাসরঘর। একালে মারলে খোলনলচে সব সেপারেট হয়ে যাবে।

ষোলোখানা গাড়ি সঙ্গে যাবতীয় লটবহর বিশেষ রাস্তা ধরে দুরন্ত পৌঁছে গেল সিএম নিবাসে। সিকিউরিটির কর্মীরা একে একে দরজা খুলে ঠাস ঠাস স্যালুট ঠুকতে লাগলেন। কোনটায় খোদ মালিক আছেন কে জানে! ষোলোটা গাড়ির দরজা খোলা হল, আবোলতাবোল সবাই নেমে এলেন। সিএম নেই। সিএম মিসিং।

মাথায় হাত। এ আবার কী! নতুন ধরনের টেররিজম! ভেতর থেকে আঁকসি দিয়ে তুলে নিয়ে গেল। জেল থেকে কয়েদি পালালে পাগলঘণ্টি বাজানো হয়, এ ক্ষেত্রে কী করা উচিত!

আবার সাইরেন বাজানো হবে! জানাজানি হলে কেলেঙ্কারি।

ওয়্যারলেস সক্রিয় হল। সারা ভারতে ছড়িয়ে গেল সিক্রেট খবর, সিএম ইজ মিস্টিরিয়াসলি মিসিং। রেড অ্যালার্ট জারি করে দেওয়া হল। এসি, ডিসিকে বললেন, আসনু সপরিবারে রেজিগনেশন চিঠিটা লিখে ফেলা যাক। কর্তব্যকর্মে এমন অবহেলা অভাবনীয়। রাজা ছাড়াই রথ চলে এল! ঢোলসহরত করে!

সবাই মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন পথের দুপাশে। কেলো টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। এদিকে কী হল! সিএম গুনগুন করে সুর ভাঁজতে ভাঁজতে সোজা বেড়া টপকে চলে এলেন। হাঁটতে হাঁটতে সোজা চার্চের কাছে। নিজের চোখেই দেখলেন, তাঁর কনভয় সাট সাট করে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাঁর পাশ দিয়ে যেতে যেতে কে একজন বলে গেল, 'কী দেখছেন?' রাজা যাচ্ছেন।

সি এম বললেন, কত খরচ জানেন?

—সে আর আমি জানি না! হাতি পোষার খরচ।

একজন পোড় খাওয়া মধ্যবয়সি মহিলা রেলিং-এ লটারির টিকিট ঝুলিয়ে বিক্রি করছেন। সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই করুণ কণ্ঠে বললেন, একটা রয়াল ভুটান নিন না। কালকে ড্র। পঞ্চাশ লাখ। সি এম বুক পকেটে হাত দিলেন। সোনার কলম। টাকা কোথায়! কেরানি নাকি, যে টাকা নিয়ে বেরোবেন! কপর্দকশূন্য অবস্থা। সিএম-এর থেকে নি:স্ব মানুষ কে আছে দেশে!

তাড়াতাড়ি সরে গেলেন। ঝালমুড়ি বিক্রি হচ্ছে। বহুকাল খাওয়া হয়নি। জিভে জল এল। পকেটে পয়সা থাকলে সাহস করা যেত। জীবনের প্রথম দিকে পার্টি অফিসে খবরের কাগজে মুড়ি ঢেলে তরিবাদি করে মেখে সবাই মিলে খাওয়া হত। সঙ্গে দিশি পেঁয়াজ, কাঁচা লঙ্কার হুহা। কোথায় গেল সেই দিন! সোনার খাঁচায় বন্দি পাখি।

পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক ফচকে আধুনিক মন্তব্য করে গেল, জামাইবাবু জামাইষষ্ঠী সেই জষ্টি মাসে।

সচেতন হলেন। মলিন এই শহরের পক্ষে পাটভাঙা মিহি ধুতি পাঞ্জাবি বড়ই বেমানান। একালের মানুষ কি বেপরোয়া দু:সাহসী! যাকে তাকে যাতা বলে দেয়। এইভাবে বেশিক্ষণ ঘেরাঘুরি করা যাবে না।

ধাবমান বাস, মিনিবাসের দিকে তাকালেন। চলন্ত, ঝুলন্ত সার্কাস। তামাটে বর্ণের শক্তপোক্ত মানুষের গুঁতোগুঁতি। ওর পাদানিতে স্থান করে নেওয়া দু:সাহস নেই। মানুষ এইভাবে দিনের পর দিন যাতায়াত করে! পপুলেশন কী হারে বেড়েছে! কোথায় গেল ফ্যামিলি প্ল্যানিং।

একটা খালি ট্যাক্সি। হাত দেখালেন। চালক মুখ ভেঙচে চলে গেল। আর একজন বলে উঠলেন ওদিকে যাব না। যা শুনেছেন, তাই ঠিক। নম্বরগুলো নিলে হত। সি এমকে রিফিউজ করার ঠেলাটা একবার বুঝত।

সামনেই বিশাল একটা ঘড়ির দোকান। নানারকমের অজস্র ঘড়ি। হাজার, বারোশো, সাতশো, তিনশো। সবই সময়ের ট্যাবলেট। মানুষও তো ঘড়ি! দার্শনিকতা ভালো লাগে না। মেয়েলিপনা যেন। যে ইজম নিয়ে আছেন, তাতে জীবন নিয়ে প্যানপ্যানানি নেই, ঈশ্বর নেই। দু-ধরনের মানুষের লাগাতার সংগ্রাম—হ্যাভস আর হ্যাভ নটস-এর লাগাতার কোস্তাকুস্তি মারো আর মরো। তবু সময় তো রয়েছে। উলটো রেল। ভবিষ্যতের মেলট্রেন বর্তমান স্টেশনে হল্ট করে অতীতের ইয়ার্ডের দিকে ছুটছে। মানুষ হল বর্তমান-স্টেশনের স্টেশন মাস্টার। হাতে গ্রিন সিগন্যাল। কোথায় গেল শৈশব, যৌবন! খেলার মাঠ, নদীর ধার, ছাত্রজীবনের বন্ধুবান্ধব, আড্ডা। পরীক্ষা। ফিফটিন মিনিটস মোর। হ্যাপি বয় আইসক্রিম, আলুকাবলি, নটি বয় শু।

পাশে এক প্রবীণ মানুষ এসে দাঁড়ালেন। আড়ে আড়ে তাকাচ্ছেন। হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, কেমন যেন চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কোথায় যেন দেখেছি দেখেছি মনে হচ্ছে!

—টেলিভিশানে।

—টিভিস্টার? নাটক-টাটক করেন?

—কেউ কেউ সেইরকমই বলে। তা নয়, আপনি দেখেছেন নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপনে। কী দু:খের কথা মশাই, আমি হারিয়ে গেছি। লস্ট ফর এভার। আমাকে কেউ খুঁজে পাচ্ছে না, আমিও কারোকে খুঁজে পাচ্ছি না।

ভদ্রলোক সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে একটি মন্তব্যই করলেন—পাগল! সত্যিই গরম পড়েছে।

আবার একটা ট্যাক্সি। এবার দাঁড়াল। চালকের চোহারাটি বেশ ভোলেভালে।

—কোথায় যাবেন?

—যেখানে যাব, সেইখানেই যাবেন তো?

—জাহান্নাম ছাড়া। বেশি পঁয়তাড়া না করে উঠে বসুন, মামু এক্ষুণি নম্বর নিয়ে নেবে। সি এম উঠতে উঠতে বললেন, মামুরা তাহলে কাজ করছে?

—ঘোড়ার ডিম করছে। এদিকে লরি নেই, তাই আমাদের ধরে টানাটানি। রোজগার তো চাই। যা দিনকাল! পটলের কিলো তিরিশ, আলু ছয়। চাল বারো, ষোলো, চল্লিশ। মাছ আশি, নব্বই। চিংড়ি তো সাহেবদের জন্যে, সাড়ে তিনশো, চারশো। ওই হাওলা আর গাওলারাই বাঁচবে। আমাদের দিন শেষ।

—আমাদের সরকার কেমন চলছে।

—নিজের তো সংসার আছে। বুঝতে পারছেন না! রোজ সকালে বাজার তো যান! আস্ত আস্ত নোট উড়ে যাচ্ছে, ছোট্ট একটা থলে ভরছে না।

—এবারের নির্বাচনে কী হবে!

—কেন ওই সব ফালতু কোশ্চেন করছেন। সাধারণ মানুষের কাছে নির্বাচন কোনও ফ্যাকটার? যে যাবে লঙ্কায় সেই হবে রাবণ। আমার ছেলেটা এম. এ. বি. টি. করে বসে আছে তিন বছর। মাস্টারির চান্স পাচ্ছে না। বলছে, পোস্টার লেখ, আমাদের লোক হও তবে হবে। আমাদের লোক, তোমাদের লোক কী! সব লোকই তো লোক। লে হালুয়া।

—ছেলেটাকে তাহলে মানুষ করেছেন?

—অনেক কষ্টে। ড্রাইভারি লাইনে সবাই মদ খেয়ে উড়িয়ে দেয়, আমি জল ছাড়া কিছুই খাই না। আমি পরিবার বাড়াইনি। সংযম করেছি। একটাই মাত্র ছেলে। এখন মনে হচ্ছে মানুষ করে ভুল করেছি। অমানুষের জগতে মানুষকে তো না খেয়ে মরতে হবে। রাজনীতিতে পাঠালে করে খেত। এতদিনে মন্ত্রী না হোক, প্রাোমোটার কি কন্ট্রাক্টর হত।

গাড়ি থেমে গেল। সামনে বিশাল জ্যাম।

—কী হল ভাই।

—কী আবার হল। বসে বসে ঘামুন, আর ডিজেলের গন্ধ শুঁকুন। এই শহরের একটাই তো ব্যামো। মিছিল। চলছে না, চলবে না। এর নাম লড়াই। লড়াই লড়াই লড়াই। মিছিলের মাথাটা গাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছে। সি এম মুখ বাড়িয়ে নেতার মতো একজনকে জিগ্যেস করলেন, কত বড়?

অশ্লীল গালাগালি ও উত্তর, ট্যাক্সিতে বসে রিপোর্টারি হচ্ছে চাঁদু। মালাইকারি বানিয়ে দেব। গাড়ির চালক বললেন, ঠিক হয়েছে। পার্টির লোককে কিছু জিগ্যেস করতে আছে। আপনার জন্যে আমার গাড়িটা ভাঙচুর হয়ে যাবে।

সিএম পেছনে বসে দেখছেন, স্টিয়ারিং-এ শক্ত সমর্থ একজন প্রকৃত মেহনতী মানুষ। চওড়া পিঠ। শক্ত ঘাড়। আবার গুন গুন করে গান গাইছে। এ মণিহার আমার নাহি সাজে। বহুকাল পরে একটা রিয়েল মানুষ দেখছেন। গায়ে ঘামের গন্ধ, মুখটা তেলতেলে, কদম ছাঁট চুল। সর্বদা যারা তাঁকে ঘিরে থাকে, সেই ধান্দাবাজ, পানমশলা খাওয়া থলথলে, গদগদে লোকগুলোর একজন নয়। এদের জন্যেই তো কিছু করার কথা ছিল। সে আর হল কই! দেশ থেকে মানুষই অদৃশ্য হয়ে গেল। কাতারে কাতারে এরা কারা! সব কিছুই রং ট্র্যাকে চলে গেছে মিস্টার সি এম। আর তো ফেরা যাবে না।

অনেকক্ষণ পর গাড়ি আবার চলল। জটিল যান জটলা। উদভ্রান্ত মানুষ। রংচটা নোনাধরা বিখ্যাত সেই হাসপাতাল। ডাবপটি, ফলপটি, চৈত্রের সেল, ফুটপাথ জুড়ে কালোয়ারদের লোহার কালোয়াতি।

সি এম ফিরলেন। দূর থেকে দেখছেন, তাঁর আলয়ের সামনে বিশাল জটলা।

ব্যারিকেড কর্ডন। কে একজন বলছে, সি এম পালিয়েছে।

উত্তর এল, আপনাদের কত অত্যাচার আর সইবেন!

ট্যাক্সির চালক বললেন, আর তো যাওয়া যাবে না স্যার। এ তো রেড লাইট এরিয়া।

সিএম চমকালেন, ইংরেজিটা ঠিক হল না। ইওর ম্যাজেস্টি লুকস ব্লাডির মতো হয়ে গেল। যাক গে, সংশোধন করার আর সময় নেই। সবাই হেরে রেরে করে ছুটে আসছে।

ডিসি উঁকি মেরেই আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন, স্যার এসে গেছেন, স্যার এসে গেছেন।

সিএম কান দিলেন না। ড্রাইভারকে জিগ্যেস করলেন, আপনার নাম?

—আজ্ঞে গোপাল সাধু। কোনও অপরাধ করিনি তো! গরিব মানুষ স্যার!

—অপরাধ! আপনার ছেলের চাকরির ব্যবস্থা আমি করব।

—না, স্যার। দেশের আর দশটা মানুষ থেকে তাকে আলাদা করে দেবেন না।

এইভাবে বাঁচতে বাঁচতে সে বাঁচাটা শিখে যাবে। আপনারা যেমন আছেন সেইরকমই থাকুন, আমরা যেমন আছি সেইরকমই থাকি।

আর বেশি কথা হল না। সিস্টেম সি এমকে সোনার শিকলে বেঁধে সুরম্য বৈঠকখানায় এনে শরীর ডুবে যাওয়া সোফার বসিয়ে দিল।

এসি আর ডিসি আর ডিজি আর আর সবাই সামনে অধোবদন,

—স্যার আমরা এন মাস রেজিগনেশন দিচ্ছি। প্লিজ অ্যাকসেপ্ট ইট। সি এম হাহা করে হেসে উঠলেন। এমন হাসি জীবনে হাসেননি। তলপেট থেকে উঠছে এমন হাসি হাসতে হাসতে বললেন, আপনাদের সব ডবল তিন ডবল প্রাোমেশন হবে। আপনাদের কৃপায় আজ আমি রিয়েল কিছু মানুষ দেখলুম মশাই। জলজ্যান্ত মানুষ। আমার অতীতটাকে কয়েক ঘণ্টার জন্যে ফিরে পেয়েছিলুম। রিয়েল লাইফ। আমরা কোথা থেকে কোথায় চলে এসেছি, কী থেকে কী হয়েছি। ভাবছি, আমিই রেজিগনেশান দেব।

ঘরশুদ্ধ সবাই হায় হায় করে উঠলেন স্যার, অমন কাজটি স্বার্থপরের মতো করবেন না। এত অপোগণ্ড তাহলে যাবে কোথায়!

সবাই সোজা হয়ে মিলিটারি কায়দায় ঠাস ঠাস স্যালুট বাজাতে লাগলেন। পার্টির কিছু লোক ঢেঁকুর তোলার কায়দায় বলতে লাগলেন। যুগ যুগ জিয়ো, যুগ যুগ জিয়ো।

সি এম মনে মনে যোগ করলেন, জিওল মাছের মতো।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%