সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কোনওকালেই বেঁচে থাকাটা এখনকার কালের মতো এমন লাঠালাঠির ব্যাপার ছিল না। সব সময়েই যেন যুদ্ধ করে বেঁচে থাকা। জীবন যুদ্ধ!
সেকালে মানুষ সকালে উঠে কী করতেন? এক গেলাস চিরতার জল খেয়ে ভোরবেলা মুক্ত বাতাসে বেড়াতে যেতেন। বেড়াতে যাওয়ার প্রয়োজন হত। তখনকার মানুষের শরীরে মন বলে একটা বস্তু ছিল। পাখির ডাকে, ভোরের বাতাসে, সে মনে পুলক লাগত। আকাশ, পৃথিবী, জল, ফল, ফুল দেখার অবকাশ ছিল। প্রাণ ছিল, এখন তো সব প্রাণহীন প্রাণ। ঘড়ির মতো টিকটিক করছে। চলে কিন্তু ভাবে না।
তখনকার মানুষের ভোগ ছিল, এখন দুর্ভোগ : রাতে গাওয়া ঘিয়ে ভাজা ফুলকো লুচি। বেগুন ভাজা, মুচমুচে আলুভাজা। মাছের কালিয়া অথবা ডিমের কারি। একবাটি ক্ষীর। তখন চিংড়ির মালাইকারি খুব হত বাড়িতে বাড়িতে, পাড়া ম ম করত মাংস রান্নার ফ্লেভারে। ভোরে না বেড়ালে হজম হবে কী করে! দীর্ঘদিন বাঁচতে হবে। কত ভোগ এখনও বাকি। তিন তীর্থ শেষ হয়েছে, সাত তীর্থ বাকি। বাতে ধরলেই বিপদ। বাবু তাই ভোরে চিরতার জল খেয়ে নেচে নেচে বেড়াচ্ছেন। ফেরার পথে পছন্দসই একটি রুই কি ইলিশ হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ফিরছেন। গৃহিণী দেউড়িতে দাঁড়িয়ে কর্তাকে অভিবাদন জানাচ্ছেন।
ওমা, কী সুন্দর মাছ এনেছ গো? আহা রূপোর বরণ কান্তি।
পুবে সূর্য উঠছে লাল হয়ে, এদিকে এয়োস্ত্রীর সিঁথিতে টকটকে সিঁদুর। পুত্রবধূদের উল্লাস, কলরব। পরিপূর্ণ সংসারের সুখ উথলে পড়ছে।
গিন্নি ভাবছেন, বাবা বলেছিলেন, দেখেশুনে তোকে ভালো হাতেই দিয়ে গেলুম মা। এখন তোর বরাত।
তখন মানুষ ক্রমশই বড় হত। এখন উলটোটাই হয়। ছোট হতে হতে জীবন ক্রমশই উঞ্ছবৃত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তখন নীতিবাক্য ছিল, ওহে সংসারী মানুষ, আয় বুঝে ব্যয় করো। কাট ইওর কোট অ্যাকর্ডিং টু ইওর ক্লথ। সেই বাক্যে আজ কর্ণপাত করলে, কোট আর কাটা হবে না, বড়োজোর লাল একটা ল্যাভোট হতে পারে।
মাঝে মাঝে ভাবি, যাদের ভালো, তাদের সব ভালো। ইউরোপ, আমেরিকা ধনীদের দেশ। ইচ্ছে করলেই মেয়েরা সেখানে বারো হাত, চোদ্দো হাত শাড়ি পরে ফরফরিয়ে ঘুরতে পারে। কিন্তু পারে না। তিন ছটাক কাপড়ের বিকিনি পরে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। ওই পোশাকে যৌবনটিও কেমন খোলতাই হয়। মনে মনে বসন্তের জোয়ার বইতে থাকে। এদেশের পুরুষমানুষের মতো ওদেশের পুরুষকে অমন ছোঁক ছোঁক করে মরতে হয় না। সায়েবদের চোখের দৃষ্টি ওই জন্যে একেবারে সোজা। বীরের মতো, সাধুদের মতো চাহনি। আমাদের দৃষ্টি ওই জন্যই তেড়ছা, ছিঁচড়ে চোরের মতো। মেয়েরা অমন দৃষ্টি একেবারে পছন্দ করে না, প্রায়ই বলতে শুনি, দ্যাখ ভাই দ্যাখ, লোকটা কী রকম শকুনির মতো তাকাচ্ছে দ্যাখ।
মানুষ যা চায় তা না পেলে ছোঁচা হয়ে যায়। বেড়ালের মতো চুরি করে হাঁড়ি খেতে ছোটে। সারা মুখে চুনকালি মেখে ফিরে আসে। সব ব্যাপারটাই আমাদের হাঁড়িখেকো বেড়ালের মতো। শখ আছে সঙ্গতি নেই। ধনপতি সদাগর আকাশে উড়ছেন তো আমাদেরও উড়তে হবে। লাট খেয়ে পড়লেন হাজার টাকা মাইনের ছাপোষা কেরানি। পাওনাদার এসে প্যান্ট খুলে নিয়ে গেল।
রোজ দশ টাকার বাজার করতে যার দাঁত ছরকুটে যায় তিনি পাশের বাড়ির কালোয়ারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিস্তিতে কিনে ফেললেন ফ্রিজ। এইবার সেই ফ্রিজ ভরতে কাবলীওয়ালার কাছে হাত পাতো। ফ্রিজের সঙ্গে ফ্রিজের মালিকও ফ্রিজ হয়ে গেলেন। ডিম খাচ্ছেন, মাছ খাচ্ছেন, আইসক্রিম খাচ্ছেন, লেমন স্কোয়াশ খাচ্ছেন, আর চোখ ক্রমশই কপালে উঠছে। টেঁসে না গেলে দেউলে হতে হবে।
অতীতের মানুষ বাজেট রেখে চলতেন। কাল দশ টাকার মাছ খেয়েছি এখন তিনদিন নিরামিষ। এ নিয়ে সংসারে কোনও বিদ্রোহ হত না। এ যুগের গৃহিনি বলবেন, সে কী কথা! আমাদের লকুবাবু মাছ না হলে একগাল ভাতও মুখে তুলবেন না। ছেলের এমন লবাবি মুখ হয়েছে না। আমরা ছেলেদের নবাব বানিয়েছি, আদরের আতিশয্যে, অতিমানব ধারার অতি আগ্রহে নিজেদের স্বভাবের বিরোধী করে তুলেছি। সংসারের স্বাভাবিক দু:খ-সুখের বাইরে রেখে এমন একটা মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছি, তারা আর পরিবারের একজন নয়, একজন মহামান্য অতিথির মতো।
কারুর কিছু জুটুক না জুটুক, ছেলের সকালে চাই ডিমসেদ্ধ, একপো দুধ, রুটি, মাখন, কলা, মাছ চাই, মাংস চাই তার ওপর বিজ্ঞাপনে দেখা স্ট্যামিনা বাড়াবার টনিক চাই।
সে যুগের ছেলেমেয়ে কীভাবে মানুষ হত! বিদ্যাসাগর কি হাফবয়েলে খেয়ে অ্যাংলো স্কুলে পড়তে যেতেন? তিনি তো ছাত্রজীবন থেকেই ভাতে ভাত রেঁধে খেতেন, পিতাকে খাওয়াতেন। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে যা হয়েছিলেন তার ধারে কাছে আজও কেউ যেতে পারলেন না। রবীন্দ্রনাথের প্রশস্তি পড়লে তিনি কী ছিলেন এই আত্মবিস্মৃত জানতে পারবে।
বিবেকানন্দ কি বিকেলে কাজুবাদাম খেতেন? ঠ্যাং তুলে বসে থাকতেন মহামান্য অতিথির মতো? পিতামাতা চারপাশে হুমড়ি খেয়ে পড়তেন কি? আহা, বাছা আমার বলে আমায় তুলে নৃত্য করতেন? নেতাজির শৈশব কীরকম ছিল? অগহর্ণ না পেলে থালা ছুঁড়ে বলতেন, ড্যাম ইট!
যাঁদের নাম ভাঙিয়ে বাঙালি এখনও চালাচ্ছে, তাঁরা কেউ ধনকুবের ছিলেন না। নিজেদের ব্যারন কিংবা লর্ড ভাবতেন না। বড় হওয়ার বীজ ভিটামিনে নেই, আছে চরিত্রে। আমাদের সবকিছুই এখন ক্যারিকেচারের মতো।
নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়ে চলেছি। সংসার করছি, সংসারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো ব্যক্তিত্ব নেই। আগেকার দিনের কর্তারা একবার না বললে, কারুর বাবার ক্ষমতা ছিল না, হ্যাঁ করার। সামান্য একটু গলা খাঁকারিতে সমস্ত বাড়িটাকে স্তব্ধ করে দিতে পারতেন। কী হচ্ছে কী, বললেই সব বাঁদরামি ঠান্ডা। এখন সংসার চালাবার ধারাটাই আমরা বদলে ফেলেছি। যিনি ভালোমানুষ তিনি সাত চড়েও রা কাড়বেন না। ন্যায়ে তাল দিচ্ছেন অন্যায়েরও তাল দিয়ে চলেছেন। সবাই মাথায় চড়ে নাচছেন। সংসারে তিনি প্রয়োজনের মানুষ। গরু যদ্দিন দুধ দেবে তদ্দিনই তার খাতির। দুধ ফুরোলেই খোঁয়াড়ে দিয়ে আসবে। খোঁয়াড়ে হয়তো দেবে না, তবে বাড়ির পরিবেশটাকে এমন করে তুলবে মনে হবে খোঁয়াড়।
সংসারে আর এক ধরনের গৃহী পাওয়া যাবে যাঁদের সমাজবিরোধী বললেও অন্যায় হবে না। সংসার করেছেন কিন্তু দায়িত্ব পালনে কাতর, স্ত্রী-পুত্র পরিবারের খবর রাখেন না। এঁরা ঠিক উদাসী নন, জোর করে ধরে সন্ন্যাসীকে গৃহী করা হয়েছে, তা নয়। এঁরা সূক্ষ্ম বিচারে এক ধরনের অপরাধী। চরিত্রে বাঁধন নেই। রেস খেলছেন, মদ্যপান করছেন, অন্যান্য ব্যাপারেও বেশ সড়গড়। সংসারে অহরহ চুলো জ্বেলে রেখেছেন।
আসল কথা, মানুষ আর নেই। কিছু প্রাণী আছে, যারা লক্ষভ্রষ্ট, আয়েসি। নাচালে নেচে ওঠে। কী করলে ভালো হতে পারে, সেই জ্ঞানটাই হারিয়ে গেছে। কোনও বাড়িতেই আর শান্তি নেই। খেয়োখেয়ি, চুলোচুলি। সবাই স্বাধীন। প্রাণ যা চায় তাই করব। মানামানি আবার কী!
যাঁরা শান্তিপ্রিয় মানুষ, তাঁরা পথ বের করে ফেলেছন। মুখ বুজে একপাশে পড়ে থাকি। যার যা প্রাণ চায় করে যাও। যদ্দিন পারব আবদার রাখার চেষ্টা করব।
এ যুগে সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছেন এই মনোবৃত্তির মানুষ, স্রোত বইছে উলটোদিকে, সরে থাকার উপায় নেই, ভেসে চলো। এঁদের প্রায়ই চোখে পড়বে, বাসে ওঠার দাঙ্গায় এঁরা নেই, একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন উদাস মুখে। ভাবছেন, এ তো মানুষের আচরণ নয়, ক্ষিপ্ত পশুর। শাসকরা তো মানুষ চান না, পশুই চান। পশুর ছবি তিনটি, আহার, নিদ্রা, মৈথুন। র্যাশনে পচা চাল, খুপরিতে নিদ্রা আর মৈথুন। কোন কালে মহিলা এত সহজপ্রাপ্য ছিল! ফ্রি-সেক্সের নামে চতুর্দিকে পর্ণোগ্রাফির স্রোত বইছে। ছায়াছবি মানেই যৌনতা, খুন, জখম, রাহাজানি, বলাৎকার। এর বাইরে আর কিছু নেই।
মানুষকে প্রাথমিক স্তরে রাখতে পারলে রাজত্ব চালানো সহজ হয়ে যায়। 'মেটো' তো মানুষকে ফেলে রাখো। পোকার মতো কিলবিল করুক, এক জায়গায় অনেক মানুষ, মানে নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি। অন্য ব্যাপারে মাথা ঘামাবার অবকাশ কোথায়। প্রতি মুহূর্তের বাঁচার সংগ্রামেই ক্লান্ত। ভাবনা-চিন্তার অবকাশ নেই। বিচার-বুদ্ধি লুপ্ত, আকৃতি মানুষের চরিত্র পশুর, এই ধরনের জীবকে সহজে কিনে ফেলা যায়, খেপিয়ে তোলা যায়, যেমন খুশি ব্যবহার করা যায়।
গণতন্ত্রের প্রহসনে এরা একনম্বর উপাদান।
নিষ্ঠুর আত্মকেন্দ্রিক, অনুদার, নীচ। সামান্য কিছু পেলেই এরা হাত তুলে জয়ধ্বনি দেবে, কখনও এক হতে পারবে না। এদের সব দাবিই হবে ব্যক্তিগত। আমাদের বলে তেড়ে আসতে পারবে না। কয়েকটাকে কিছু দিলেই, তারা নেতা হয়ে বাকিগুলোকে নাচাতে পারবে। মানুষটাকে মারতে পারলেই সমস্যা সহজ। কুকুর কখনও দাবি করবে না, আমার জন্যে স্বর্গ তৈরি করে দাও। তার দাবি একটুকরো হাড়। মানুষের দেবশক্তি জেগে উঠলে ভয়ের কথা, সে আর তখন ভয় পাবে না। অথচ ভয়ই হল একমাত্র অস্ত্র।
অল্প কয়েকজনের জন্যে দানবীয় ব্যবস্থা রেখে বাকি সকলকে ঠেলে দাও নরকে। যমদূত তৈরি রাখো, সময় মতো ড্যাভোস মারো। পেশাদার গুণ্ডাদের কুচকাওয়াজ চলুক। কোনও কিছুই সহজপ্রাপ্য রেখো না। তেল নেই, চাল নেই, শিক্ষা নেই, বিদ্যুৎ নেই, পরিবহন নেই, জল নেই, স্বাস্থ্য নেই, বাসস্থান নেই। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতে থাকতে বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে যাবে। ছেলেধরারা কলশির মধ্যে বাচ্চাকে রেখে বিকলাঙ্গ তৈরি করে। রাজনীতির কারখানায় বিকলাঙ্গ তৈরি হচ্ছে। ন্যালা খ্যাবলা মানুষের দল স্বভাবে শয়তান। কোন কালে বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা এমন ভয়ঙ্কর ছিল! প্রতি মুহূর্তে জীবনমরণ সমস্যা। সংস্কৃতির বড়াই। অন্য দেশের মানুষ গ্রহান্তরে চলে গেছে। আমাদের মুখে বড় বড় কথা। ব্রেশট, ডিস্কো, কামু, কাফকা, ১৯৮২ সাল। শতাব্দী শেষ হতে চলেছে, কম্পিউটার কোটি মাইল দূরের উপগ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, আর এদিকে উন্মত্ত জনতা মানুষ থেঁতো করছে। চোখ খুবলে তুলে নিচ্ছে, পেট্রল ঢেলে জ্যান্ত মানুষ পোড়াচ্ছে; শিশু, নারী কারুকেই নিষ্কৃতি নেই। এরই নাম শাসন। এরই নাম নেতৃত্ব। এরই নাম রাজনীতি। এরই নাম প্রগতি।
কে বলেছিলেন, মানুষ অমৃতের পুত্র! মানুষ চিরকালই গরলপুত্র। বিশেষত আমরা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন