সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এক একজন থাকে ওইরকম। সবেতেই তাদের গোলমাল। যা কিছু করতে যাবে একটা কেলেঙ্কারি। কিছু করার নেই। বরাত। বরাত মানতেই হবে। আমি ভেবেছিলুম, বিয়ে-টিয়ে করব না। একা মানুষ, একমেবাদ্বিতীয়ম। প্রায় ব্রহ্মের মতো। যা সামান্য লেখাপড়া শিখেছি, তাই ভাঙিয়ে মোটামুটি একটা চাকরি জুটেছে। একা মজাসে থাকব। যা মাইনে পাই, ভালো-মন্দ খেয়ে, বই পড়ে, গান শুনে সিনেমা দেখে ভালোই চলে যাবে। ওসব কথায় কান দোব না, ব্যাচেলার লিভস লাইক এ প্রিনস ডাই লাইক এ ডগ। আরে মরতে তো হবেই, সে কুকুর-বেড়ালের মতো মরি, কি বউয়ের কোলে মাথা রেখে ছেলেদের কীর্তন শুনতে শুনতেই মরি। পরমগতি মৃত্যু। তার চেয়ে যদ্দিন বাঁচি সুখে বাঁচি।
ওই বরাত। বরাতে নেই কো ঘি ঠকঠকালে হবে কী? ফাঁদে পড়ে গেলুম। ইচ্ছে করেই পড়লুম, বোকার মতো। প্রেম, প্রেম একটা ভাব বয়েসকালে সব মানুষের ভেতরেই থাকে। গোঁফ বেরলো তো প্রেমের হুলও বেরলো। পাত্তা না দিলেই হয়। নড়ে নড়ে একসময় পক্ষাঘাত হয়ে যায়। বাতের ব্যাথার মতো, সইতে সইতে সয়ে যায়। আমার তো তা হওয়ার নয়। তাহলে বলি কীভাবে গর্তে পড়লুম।
পুজোর ফুল কিনতে গেছি। দেখি কি একটি মেয়ে মালা কিনছে। তা কিনছে কিনুক। আমার কী? আমি পাশটিতে দাঁড়ালুম। দরাদরি চলছে। জায়গাটা ঘিঞ্জি মতো। ফলওলা, ফুলওলা, সাইকেল রিকশা, বাস, এক গাদা লোক, সব একসঙ্গে গুঁতোগুঁতি। একটি মেয়ের পাশে দাঁড়ালে দেখতে ইচ্ছে করবেই, তাতে মহাভারত এমন কিছু অশুদ্ধ হবে না। মনে হল, মেয়েটি বেশ সুন্দরী। ছিপছিপে লম্বা। ফরসা। বড় বড় তারার মতো চোখ। ঘাড়ের কাছে সকালের এলো খোঁপা। নীল ফিনফিনে শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিজেকে কবিতার মতো মনে হতে লাগল। মেয়েটি একবার মাত্র আমার দিকে তাকাল। মনে মনে ভাবলুম লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট শুনেই এলুম। হবে না কি! ওই এক তাকানোতেই মোহিত হয়ে যেতে পারে নাকি। আমার কিন্তু হয়েছে। আমি প্রেমে পড়ে গেছি। একেবারে ভরাডুবি। আমি তখন স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করেছি। আমার মন মেয়েটির খোঁপার কাছে প্রজাপতির মতো উড়ছে। মির্জা গালিবের মতো অবস্থা আমার। আমার ভাগ্য বা দুর্ভাগ্যদেবী যাই বলি না কেন আবিভূর্তা হলেন গরুর রূপ ধরে। সুডৌল নিতম্ব দিয়ে আমাদের একটু ঠেলা মারলেন। আমি সামলাতে পারলেও মেয়েটি সামনে হুমড়ি খেয়ে ফুলের ওপর পড়ে যাচ্ছিল। আমি চট করে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেললুম।'
মেয়েটি হেসে ফেলল। ফুল, আর মালা নিয়ে চলে যাওয়ার সময় ফুলওলাকে বলে গেল, 'আমি কিন্তু কাল ঠিক আটটায় সময় আসব, তিনটে একেবারে টাটকা মালা রেডি করে রাখবেন।' মেয়েটি চলে যাওয়ার পর ফুলওলা আমার দিকে তাকাবার একটু অবসর পেল। তিরিক্ষি মেজাজে বললে, 'কত'? কিছু ছেঁড়া ফুলের পাপড়ি, দুব্বো ঘাস, পাতামাতা দিয়ে একটা মোড়ক তৈরি করে দিলে। ফুল না বলে আবর্জনা বলাই ভালো। অথচ মেয়েটিকে কেমন বেছে বেছে সাজিয়ে গুছিয়ে দেওয়া হল। তা দিক। মেয়েটি আমার মন ছুঁয়ে গেছে। হাতে দিয়ে গেছে স্পর্শ। সারাটা দিন মনে মনে ভাবলুম, বোম্বে ছবিতে এইভাবে কোনও মেয়েকে সাহায্য করলেই প্রেম হয়। আমার কেন হবে না! হতেও তো পারে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চিন্তা বাড়তে লাগল। মেয়েটি আমাকে একেবারে উস্তমখুস্তম করে মারল। যেই একটু ঘুম আসে অমনি মেয়েটি স্বপ্ন হয়ে এসে দাঁড়ায়, খোঁপায় আবার ফুলের মালা। দাঁড়াবার সে আবার কী ভঙ্গি। যেন এক সম্রাজ্ঞী। যে ইঁদুর যেচে কলে পড়বে তার আর কে কী করবে। আমার ফুলের দরকার ছিল না, তবু গিয়ে হাজির হলুম। ইংরেজিতে একটা কথা আছে কিউরিসিটি কিলস এ ক্যাট। আমার মাস্টারমশাই প্রায়ই বলতেন। কৌতূহলই বেড়ালের মৃত্যুর কারণ। মেয়েটি আটটার সময় আসে কি না! আমি আবার একটু সাজুগুজু করে ফেললুম। নিজেই হাসলুম। ফুল কিনতে যাচ্ছি না বিয়ে বাড়ি যাচ্ছি! আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হল, বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। এত সেজেগুজে কেউ সাতসকালে বাজারে যায় না। আবার সব খুলে ফেললুম। এ তো সিনেমার প্রেম নয়, বাস্তবের প্রেম। ফুলওলার দোকানের সামনে কেউ নেই। প্রেমের ফুল। সে যদি আসে তবেই খরচ করব। অকারণে খরচ করব না। আমি টোকো ন্যাসপাতির ঝুড়ির ওপর ঝুঁকে পড়লুম। আর আড়ে আড়ে দেখছি, সে এল কি না। হঠাৎ সে এল হুড়তে পুড়তে। দমকা বাতাসে চুল উড়ছে ফুরফুর করে। কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি। সাদা ব্লাউজ। গলায় একটা চিকচিকে হার। হৃৎপিণ্ড আমার ছলাৎ করে উঠল। বয়েস বেশি হলে ওই এক লাফানিতেই মৃত্যু হত। আমি নেশার ঘোরে এগিয়ে গেলুম। মেয়েটি হাতব্যাগ থেকে টাকা বের করতে করতে আড়চোখে একবার তাকিয়ে মধু মেশানো গলায় বললে, 'ভালো আছেন?'
টাকা বের করতে গিয়ে কী একটা পড়ে গেল। ভগবান আছেন গো। আবার আমি সেবার সুযোগ পেয়ে গেলুম। ছোট্ট একটা লেডিজ রুমাল পড়ে গেছে। তাড়াতাড়ি তুলে হাতে নিলুম। মেয়েটি অদ্ভুত একটা চোখের ভঙ্গি করে, গানের কলির মতো বললে, 'ধন্যবাদ।'
সাবধান করে দিলুম, 'ওতে আর মুখ মুছবেন না।'
'না, না, সে আর বলতে।'
মেয়েটি এদিক ওদিক তাকিয়ে বললে, 'সেই অসভ্যটা কোথায়!'
'কোনটা? কোনটা?'
'সেই দামড়া গরুটা কোথায় গেল?'
'সেটা আজ অন্য এলাকায় চরতে গেছে।'
মেয়েটি চলে যাওয়ার সময় বলে গেল, 'আমি কাল ঠিক সাড়ে আটটার সময় আসব। চারটে জবার মালা একেবারে রেডি করে রাখবেন।'
আমার দিকে তাকিয়ে বললে, 'আসছি।'
বেশ কিছু চোখে চোখে রগড়ারগড়ি হয়ে গেল। আমি বললুম, 'আসুন।'
সারারাত বেশ ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করলুম। মেয়েটি বেশ জোরে জোরে পরের দিনের আসার সময় কেন বলে? নিশ্চয়ই আমাকে শোনাবার জন্যে। আসবে, মালা নেবে চলে যাবে। অত বলার কি আছে? প্রেম। এরই নাম প্রেম। মেয়েটি আমার জীবনে এল ধন্য হয়ে যাব। যেন ছবি! আনন্দে আমার ভেতরটা প্রজাপতি হয়ে গেল। অদৃশ্য কোকিল ডেকে উঠল। নাম জানি না। কাল্পনিক একটা নামে বারকতক ডাকলুম। কল্পনার তেমন জোর নেই। নামটা বিশেষ সুবিধের হল না। সুধা, সুধা বললুম কয়েকবার। বলতে, বলতে পালকের মতো ঘুমিয়ে পড়লুম আমি।
পরের দিন ঈশ্বর আরও সহায় হলেন। মেয়েটির সবুজ শাড়ির তলার দিকটা ফুলের ঝুড়ির খোঁচায় আটকে গেল। ফুলসমেত ঝুড়িটা উলটে পড়ে যাচ্ছিল। কোনওরকমে সেটাকে সামলালুম। তারপর নীচু হয়ে শাড়িটাকে ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগলুম। সাহসটাকে এক হ্যাঁচকায় বেশ বাড়িয়েছি। কী সুন্দর পা! ওই কারণেই কবিতার লাইনকে বলে চরণ।
মেয়েটি রাজরানীর মতো দাঁড়িয়ে রইল। শাড়িটাকে কায়দা করে ছাড়ালুম।
'ছিঁড়েছে?'
'ছোট্ট একটা ফুটো হয়েছে।'
'আমার শাড়ি পরা উচিত নয়। এই নিয়ে সাতটা হল। এটা আমার মায়ের শাড়ি। পরার সময়েই বলেছিল, 'হ্যাঁ যাও, পারো তো ছিঁড়ে নিয়ে এসো। কী হবে?'
'রিপু করা যায়। ইনভিজিবল রিপু। একেবারে বোঝাই যাবে না।'
'কোথায়, কোথায়?'
'আমাদের দোকানে।'
মেয়েটি দাঁড়িয়ে পড়ল। 'যান ফুলটা নিয়ে আসুন। আমি দাঁড়াচ্ছি।'
আমার সঙ্গে সঙ্গে বলতে ইচ্ছে করল, তুমি করুণাময়ী। কাল রাতে নাম রেখেছিলুম সুধা। তুমি করুণাময়ী। বেশ কিছুটা পথ দুজনে নীরবে পাশাপাশি হাঁটলুম। মেয়েটি কী একটা গান গুনগুন করছে। বাজার এলাকার ভিড়ভাট্টা পেরিয়ে এসেছি। মেয়েটি হঠাৎ জিগ্যেস করল,
'আপনার বাড়ি কি এই দিকে?'
'তা হলে সুর সুর করে এদিকে চলেছেন কোথায়?'
বেশ বিব্রত বোধ করলুম। পায়ের তলা থেকে হঠাৎ যেন জমি সরে গেল। কোনও উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। শেষে যা থাকে বরাতে। বললুম, 'আমার ভীষণ ভালো লেগে গেছে।'
'কাকে?'
'আপনাকে?' তারপর চোখ-কান বুজিয়ে বোমা ফাটানোর মতো যোগ করলুম, 'আই লাভ ইউ।' ভেবেছিলুম মারবে এক চড়। মারল না। বললে, 'কী সর্বনাশ! কী হবে এখন?'
'আমি জানি না। আমার হয়ে গেছে।'
দুষ্টু দুষ্টু হেসে মেয়েটি বললে, 'আমারও একটু একটু হয়েছে। মা জানতে পারলে আমাকে পেটাবে।'
মনটা একটু খারাপ হল। মা পেটাবে কেন? আমি কি লোফার না কি! আমার কোনও যোগ্যতা নেই না কি! দোব একবার ফিরিস্তি! আমি কি ফক্কা প্রেমিক, না লক্কা প্রেমিক।
'আপনার মাকে গিয়ে প্রণাম করে আসি!'
'সেটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আগে পেটাপেটি হোক। জানাজানি হোক। দাদার নৃত্য হোক। আপনার ওপর একটু ধুমধাম হোক। জিনিসটা আগে বেশ একটু জমে উঠুক।'
'দাদা কি খুব কড়া ধাতের মানুষ?'
'ও বাব্বা! দাদা আর মা, দুজনেই সমান। এ বলে আমায় দেখ ও বলে আমায় দেখ। আমার বাবা নেই তো! সি ই এস সি-র ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। অ্যাকসিডেন্টে মারা গেলেন দু'বছর আগে। মেরেই ফেলল বোধহয়।' মেয়েটি মেঘ ভাসা শরতের নীল আকাশের দিকে উদাস তাকিয়ে রইল। পুজো যে এসে গেল। আজ সকালে শিশির পড়েছিল। মা দুর্গার চিঠির মতো ছোট ছোট অক্ষরে।
'মেরে ফেলল কেন বলছেন?'
'বাবা কারেন্ট অফ করে একটা মেশিনে কাজ করছিলেন। হঠাৎ কে একজন স্যুইচ অন করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে আমার অমন সুন্দর বাবা পুড়ে কাঠ হয়ে গেলেন। কত তদন্ত-টদন্ত হল। দোষীকে খুঁজে পাওয়া গেল না। সবাই বললে, সুন্দর একটা চক্রান্ত। অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিলে। দাদাকে একটা চাকরি দিলে। সে আর কী হবে! আমার বাবাকে তো আমি আর কোনও দিন পাব না। বাবার সেই ডাক—সুরঞ্জনা প্লিজ। বাবা আমার প্রেমিক ছিলেন।'
সুরঞ্জনা এইবার খুব দ্রুত হাঁটতে লাগল। কেউ যেন খুব পরিচিত গলায় ডাকছেন—'সুরঞ্জনা প্লিজ।'
অধ্যবসায় থাকলে কী না হয়। আদা-জল খেয়ে লাগতে পারলে সিদ্ধি হবেই। আমার পেছনে যাঁরা আসছেন প্রেমের পথ ধরে, আমি তাঁদের এই কথাটাই বলতে চাই। অনেকটা আমার জীবনই আমার বাণী গোছের একটা ব্যাপার। সুরঞ্জনার জন্যে পাগল হয়ে গেলুম। সুরঞ্জনার দাদা মেরে আমার খোলনলচে আলাদা করে দিক। সুরঞ্জনার মা আমার গায়ে গরম জল ঢেলে দিন। আলু সেদ্ধর মতো সেদ্ধ হয়ে যাই। মরে ভূত হয়ে যাই। সেও ভি আচ্ছা। হৃদয়ে আমার হুল ফুটিয়ে দিয়েছে। সুরঞ্জনা খুব ভলো নাচে। মহাজাতি সদনে ফাংশান। আমার সঙ্গে তখন তুমির সম্পর্ক। বললে, 'তুমি মহাজাতি সদনে চলে এসো। গ্রিনরুমে দেখা হবে। তারপর অনুষ্ঠান শেষ হলে দুজনে একটা ট্যাক্সি করে একটু ঘুরে-ঘুরে ফিরে আসব। বেশ মজা হবে।
মহাজাতি সদনে গিয়ে সাজঘরে খোঁজ করতেই আধ-সাজা অবস্থায় বেরিয়ে এল। পোশাক পরা হয়ে গেছে। চুল আর মুখের মেকআপটাই বাকি ছিল। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছিল! নাচে বলেই ফিগারটা অত ভালো। ঠিক এমন সাজে তো আগে দেখিনি। হাঁ হয়ে গেলুম।
কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বললুম, 'কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে।'
সুন্দর বললে কোন মেয়ের না ভালো লাগে! সুরঞ্জনার মুখে একটা খুশির আমেজ ফুটল। হাত দিয়ে আমাকে দূরে ঠেলে দিতে দিতে বললে, 'কাছে এসো না। দিদি খুব কড়া। দেখে ফেললে তোমাকে যা তা বলবেন। তুমি সিটে গিয়ে বসো প্রাোগ্রাম শেষ হলে তোমাকে ডেকে নেব।'
অনুষ্ঠান শুরু হল। সুরঞ্জনা নাচল বটে। সেরা নাচ। সে কী হাততালি। আমার মনে হল পায়ের ধুলো নেওয়া উচিত। তার পরেই মনে হল, এই মেয়ের স্বামী হওয়ার কোনও যোগ্যতাই আমার নেই। মানে মানে পালিয়ে যাওয়াই ভালো। অনুষ্ঠান শেষ হল। সুরঞ্জনা বেরিয়ে এল, 'চলো-চলো' আর এক মিনিট দাঁড়ালেই দলে পড়ে যাব।'
সুরঞ্জনার হাতে একটা ব্যাগ। ব্যাগটা আমি আমার কাঁধে ঝুলিয়ে নিলুম। জানি, ব্যাগে কী আছে! সুরঞ্জনার নাচের পোশাক। ঘুঙুর। মেকআপের জিনিস। মিষ্টি ব্যাগ। ব্যাগটাও যেন সুরঞ্জনা। আমার পাশে পাশে সুরঞ্জনা হাঁটছে। তার পা থেকে নাচের নেশা তখনও যায়নি। শরীরে তখনও তরঙ্গ খেলছে। একবার গায়ে গা ঠেকল। শরীর তখনও গরম হয়ে আছে। নাচের সময় সুরঞ্জনা যখন ঘুরছিল, আমি তখন তার পা দেখছি। পা দেখে পাগল হয়ে গেছি। সুরঞ্জনা যদি আমার হয়, আমি তাকে কতটা যত্নে রাখব, সে আমিই জানি। রোজ পদসেবা করব। দেবীর মতো ভক্তি করব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলুম। পেছনের আসনে প্রথম কয়েক কিলোমিটার আমাদের মধ্যে একটা ব্যবধান ছিল। হঠাৎ সুরঞ্জনা সরে এল একেবারে আমার পাশে। একটা হাত রাখল আমার কাঁধে। ডান হাতটা ঝুলে পড়ল আমার বুকের কাছে। চাঁপার কলির মতো আঙুল। গোল কবজিতে সুন্দর সোনালি একটা ঘড়ি। পিঠে নেমেছে চুলের ঢল, রাতের কবিতার মতো। সুরঞ্জনা বললে, 'ভীষণ ক্লান্ত, জানো তো! স্টেজে কী ভীষণ গরম তোমার কোনও ধারণা নেই।'
সুরঞ্জনা মাথাটা আমার বাঁ কাঁধের ওপর ফেলে বললে, 'ঘুমিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে।'
'যা নাচ নাচলে তুমি! আমি হাঁ হয়ে গেছি।'
'নাচ বোলো না। বলো নৃত্য।'
ট্যাক্সি চলেছে ফাঁকা পথ ধরে হু হু করে। খুব ইচ্ছে করছে বাঁ হাত দিয়ে সুরঞ্জনার সরু কোমরটা জড়িয়ে ধরে আরও কাছে টেনেনি। পেছনের আসনে খেলা করছে তরল অন্ধকার। মাঝে মাঝে আলো এসে আমাদের শরীরের ওপর দিয়ে খেলে চলে যাচ্ছে। ক্লান্ত ট্রাম ঘরে ফিরছে। পার্কসার্কাসে গজলের আসর বসেছে। স্কার্টপরা এক মহিলা চেনে বাঁধা সাদা কুকুর নিয়ে ফুটপাথে বেড়াচ্ছেন। রাত একেবারে রোমন্টিক হয়ে উঠেছে। সুরঞ্জনা এক লাইন গুন গুন করে উঠল, 'নিশিরাত বাঁকা চাঁদ আকাশে।' লাখনৌ রেস্তোরাঁয় রুমালি রুটি তৈরি হচ্ছে। কাঠ কয়লার আগুনে কাবাব চুনচুন হচ্ছে। লহমায় দৃশ্যটা দেখে সুরঞ্জনা বললে, 'যা খিদে পেয়েছে না!'
'গাড়ি ঘোরাতে বলব?'
'না বাবা। যারা বসে আছে তাদের মাঝে বসার সাহস আমার নেই।'
কী খাবে বল? বাঙালি রেস্তোরাঁয় যাবে?'
'রাত কত হল খেয়াল আছে? দাদা লাঠি হাতে বাড়ির বাইরে পায়চারি করছে। আমি দেখতে পাচ্ছি।' গাড়ি আরও কিছুটা এগোল। সুরঞ্জনা বললে, 'আজ সারা রাত তুমি আমার কাছে থাকলে কত ভালো হত। পিয়ালশাখার ফাঁকে একখানি চাঁদ বাঁকা ওই, তুমি আর আমি শুধু বাসর জেগে রই। অনুষ্ঠানের রাতে আমার নিজেকে মনে হয় আনারকলি।'
'আজ আমার ভীষণ অবাক লাগছে সুরঞ্জনা, তুমি কেন আমাকে ভালোবাসলে? তোমার মতো এত বড় একজন শিল্পী!' শিল্পী-টিল্পী জানি না। তোমাকে ভালোবাসি একটা কারণে, তোমাকে ঠিক আমার বাবার মতো দেখতে।'
'তা হলে?'
'তা হলে মানে?'
'ওই একটা মাত্র কারণ হলে চটকে যেতে বেশি সময় লাগবে না। কেন জানো? ওই যে ছেলেটা তোমার সঙ্গে নাচছিল, সে আমার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য। আমি আত্মহত্যা করতে পারব না সুরঞ্জনা। আমি ভয়ঙ্কর ভীরু।'
'তোমার একটাই দোষ, পরেরটা অনেক আগেই ভেবে ফ্যালো। যারা সঙ্গে নাচে তাদের বিয়ে করতে নেই। এক শিল্পী আর এক শিল্পীকে সহ্য করতে পারে না। ঠোকাঠুকি লেগে যায়। তা ছাড়া ও অনিতা বলে একটা মেয়েকে ভালোবাসে। দয়া করে তুমি একটু কম ভাবো।' সুরঞ্জনা আমার কাঁধে মাথা রেখে সারাটা পথ এল। বেশ কিছুটা দূরে নির্জন মতো একটা জায়গায় আমরা গাড়ি ছেড়ে দিলাম। সুরঞ্জনা তার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। আমি সারা গায়ে তার স্পর্শ মেখে বাড়ি ফিরে এলুম। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলুম, তবলাটা শিখলে কেমন হয়। আমার বোলে সুরঞ্জনার পা নাচবে।
নাটক যে সেই রাতেই জমে উঠবে ভাবতেও পারিনি। একেই বলে, বিধির বিধান। একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। সদরের কড়া বাজল। এই রাতে কে আবার এল। আমি দিদির কাছে থাকি। দিদি অধ্যাপিকা। তিন বছর হল জামাইবাবু কিডনি ফেল করে মারা গেছেন। নি:সন্তান দিদির একজন অভিভাবক দরকার। আমি সেই হিসেবেই আছি। আমারও কলকাতায় একটা থাকায় জায়গার প্রয়োজন ছিল। তা ছাড়া ছেলেবেলা থেকেই দিদি আমাকে ভালোবাসে।
দিদি নিজের বিছানা থেকে বললে, 'এত রাতে কে এল রে! এই সময় তো পুলিশ ছাড়া কেউ আসবে না। তুই নকশাল-টকশাল করছিস না তো?'
'আমার সে সাহস নেই দিদি।'
দরজার কাছে গিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বললুম, 'কে?'
মেয়ের গলা, 'দরজা খোলো। আমি।'
দরজা খুললুম। সামনেই সুরঞ্জনা। হাতে একটা বড় ব্যাগ; যেন ট্রেন ধরতে যাচ্ছে। আমাকে ঠেলে ভেতরে চলে এল।
দিদি জিগ্যেস করলে, 'কে রে শুভো?'
'সুরঞ্জনা।'
সুরঞ্জনা ততক্ষণে ঘরে চলে গেছে। ব্যাগটা একপাশে নামিয়ে রেখে সোজা বিছানার কাছে গিয়ে দিদিকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে ফেঁদে ফেলল। সুরঞ্জনাকে পাশে বসিয়ে দিদি বললে,
'কী হয়েছে? কাঁদছ কেন?'
'আমি চলে এসেছি। আমাকে ওরা তাড়িয়ে দিয়েছে।'
'তাড়িয়ে দিয়েছে? সে আবার কী। তাড়িয়ে দিল কেন? এত রাতে কেউ তাড়িয়ে দেয়!'
'আজ আমার নাচের প্রাোগ্রাম ছিল। ফিরতে একটু দেরি হয়েছে। আমাদের দলের একজন আগে এসে লাগিয়ে দিয়েছে। ঢোকামাত্রই দাদা আমার গালে সপাটে এক চড় মেরে, হিন্দিতে বললে, নিকালো হিঁয়াসে। মা বললে চুলের মুঠি ধরে ঢিল লঙ্গরের মতো ঘোরা। দাদা বললে, প্রেম হচ্ছে প্রেম। প্রেমের কর্মকার।'
'তুমি শুভোর সঙ্গে ঘুরছিলে?'
'আমি ঘুরিনি। আমরা এক সঙ্গে বাড়িই ফিরছিলুম, একটু ঘুরপথে।'
'সেটা তো তাহলে একটু অন্যায়ই হয়েছে।'
'কেন অন্যায় হয়েছে কেন?'
'তোমার যে এখনও বিয়ে হয়নি মা।'
'যার সঙ্গে আমার বিয়ে হবে তার সঙ্গেই তো ঘুরেছি। অন্য কারোর সঙ্গে নয়। আমার এক মুঠো চুল ছিঁড়ে দিয়েছে দিদি, ওই শয়তানটা।'
'দাদাকে শয়তান বলতে নেই ছি:।'
'আপনি জানেন না, সেই ছেলেবেলা থেকেই ও আমার শত্রু। নিজে ওর থেকে বয়েসে বড় এক মহিলার সঙ্গে ঘোরে। তার একবার বিয়ে হয়েছিল। ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। বিয়ে করার জন্য ফোঁস ফোঁস করছে। সে যদি এসে ঢোকে হয়ে গেল। সে যা জিনিস! আমি চলে এসেছি। একেবারেই চলে এসেছি। আর জীবনে যাব না। কিছুতেই যাব না। একেবারে সব পাট চুকিয়ে এসেছি। দু'জনেই বললে, যা, যা বেরো বেরো। কেমন তিল থেকে তাল করলে! আমি জানি, ওদের একটা খুব বদ মতলব আছে। সেই মতলবটা আমি ধরে ফেলেছি।'
'কী মতলব বোন?'
'সে আমি এখন বলতে পারব না। ব্যাপারটা খুবই খারাপ। আমি সোজা চলে এসেছি, আমার নিজের বাড়িতে। আমি আর ফিরব না।'
'ওরা যদি থানা-পুলিশ করে?'
'আমিও কেস করব দাদার নামে। মেয়েদের গায়ে হাত তোলা একবারে বার করে দেব।'
সেই রাতেই আমাদের সভা বসে গেল। সুরঞ্জনা আধশোয়া হয়ে রইল দিদির বিছানায়। খুবই চিন্তার ব্যাপার। সুরঞ্জনা তো আর এমনি থাকতে পারবে না। বিয়ে করে বউ করে ঘরে রাখতে হবে।
দিদি বললে, 'যত তাড়াতাড়ি পারিস রেজিস্ট্রিটা করিয়ে নে। পাড়া দিনকতক সরগরম থাকবে। তা আর কী হবে! এমন একটা মুখরোচক ব্যাপার!'
'সবার আগে বোলপুরে বাবা আর মাকেও তো জানাতে হবে।'
'সে তো হবেই। তাঁদের অনুমতি ছাড়া তো কিছুই হবে না।'
সুরঞ্জনা তড়াং করে লাফিয়ে উঠল, 'তার মানে, তাঁরা যদি অনুমতি না দেন, তাহলে যাব কোথায়? আমাদের বিয়ে তো একরকম হয়েই গেছে। এতে অনুমতি নেওয়ার কী আছে! আমরা তাঁদের নিমন্ত্রণ করব। সব ঠিক হয়ে যাওয়ার পর অনুমতি চাওয়া মানে অপমান করা। তাঁরা তো বলতেই পারেন, এ আবার কী আদিখ্যেতা!'
সবই ঠিক; কিন্তু ব্যাপারটাকে এমন ভাবে সাজাতে হবে—সাপও মরবে না লাঠিও ভাঙবে না; যাঁদের ছেলে তাঁরা জানবেন না? তুমি আমার কাছে থাকবে। শুভো বীরভূমে যাবে। বীরভূম থেকে বিয়ে করতে আসবে।' সুরঞ্জনা বললে, 'তবেই হয়েছে। সে বিয়ে আর হবে না। আমি তা হলে অন্যপথ দেখি। মানে মানে সরে পড়াই ভালো। ওঁরা না বললে, কী হবে? বিয়ে হবে?'
আমি বললুম, 'অবশ্যই হবে। তখন বিনা অনুমতিতেই হবে।'
'এটুকু আর খুঁত থাকে কেন? দেখাই যাক কী হয়। দিদি ঠিক ম্যানেজ করে দেবে।'
'তোমরা করবে প্রেম আর আমি করব ম্যানেজ। দেখাই যাক কী হয়। বাবা খুব উদার মানুষ। আয় আমরা এখন শুয়ে পড়ি।'
সুরঞ্জনা বললে, 'আমি চান করব। আমার খিদে পেয়েছে।'
'হ্যাঁ, তার একটা ব্যবস্থা হতে পারে।'
দিদির ভাঁড়ার কখনও শূন্য থাকে না। সুরঞ্জনার মাঝরাতের ভোজ নেহাৎ মন্দ হল না। খাওয়ার পরেই তার মনের ফূর্তি ফিরে এল। প্রায় নাচের ছন্দেই চলে গেল আমার ঘরে। দরজা ভেজিয়ে গুন গুন করে গান গাইতে শাড়ি পালটান হল। আমি যখন শুতে এলুম সারা ঘরে মেয়েলি গন্ধ ভাসছে। বিছানায় লুটিয়ে আছে সিল্কের শাড়ি। সোফার ওপর ব্লাউজ, ব্রা! কোণের দিকে ব্যাগটা খোলা। টেবিলের ওপর চিরুনি। মুখে ক্লিনসিং ক্রিম মেখেছে ছিপিটা খোলা। বেশ বোঝাই যায় বউ ঢুকেছিল ঘরে। সব এক এক করে গুছিয়ে রাখলুম। চুল বাঁধার ফিতে আর চিরুনিটা একটা বাক্সে ফেলে রাখলুম। শুয়ে আছি। সুরঞ্জনা দিদির পাশে শুয়ে শুয়ে গজর গজর করছে। মাঝে মাঝে হাসছে, খিলখিল করে।
মেয়েরা কত সহজে সব কিছু ভুলে যেতে পারে।
সকালবেলাই সুরঞ্জনার যমদূতের মতো দাদা এসে হাজির। বোনের হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মেরে বললে, 'বাড়ি চল। মা ডাকছে।'
'সুরঞ্জনা বললে, 'হাত ছাড়ো। এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।'
'হ্যাঁ ভদ্রলোক তো বটেই। একটা মেয়েকে ফুসলে এনে ভদ্রলোক!'
দিদি বললে, 'একটু ভদ্র ভাষা কি আশা করা যায় না! আপনার বোনকে তো কাল রাতে মেরে বের করে দিয়েছিলেন, তখন মনে ছিল না!'
'আমাদের মেয়ে আমরা যা খুশি তাই করতে পারি। শাসনের অধিকার আমাদের আছে।'
সুরঞ্জনা বললে, 'এখানে গলাবাজি কোরো না। নিজের খোঁয়াড়ে গিয়ে যত পারো চেল্লাও।'
'তুই যাবি কি না?'
'না, না, না।'
'তাহলে আমাকে পুলিশের সাহায্যই নিতে হচ্ছে।'
'পুলিশ কিছুই করতে পারবে না আমি সাবালিকা।'
'তাহলে আমি আমার দলের ছেলেদের নিয়ে আসি।'
'আমরা তাহলে থানায় যাই।'
দিদি বললে, 'আপনাদের আর কিছুই করার নেই। এরা বিয়ে করবেই।'
'ঠিক আছে বিয়ে আমি করাচ্ছি। পরপারে গিয়ে বিয়ে হবে। পার্টির ছেলেদের খবর দিচ্ছি।' দিদি হেসে বললে, 'এর মধ্যেও পার্টি।'
'যা খুশি তাই করার অধিকার আপনাদের নেই।'
'দেখাই যাক।'
ভদ্রলোক চলে গেলেন মার্চ করতে করতে। সুরঞ্জনা হাসতে হাসতে বললে, 'আ:, এইটাই চেয়েছিলুম। বেশ জমে গেছে।'
দিদি বললে, 'আশ্চর্য মেয়ে তুই হাসছিস কী বলে?'
'হাসব না! যেমন মোষের মতো চেহারা, তেমনি ব্যবহার। ওর খাটালে থাকাই উচিত।'
'ও বাধা দিচ্ছে কেন? শুভো তো পাত্র হিসেবে খারাপ নয়।'
'স্রেফ দাদাগিরি ফলাচ্ছে। বাবা নেই তো, অভিভাবক হয়েছেন আর কি! দাঙ্গা হাঙ্গামা একটা করবেই।'
'সে কীরে?'
'করুক না। যা পারে করে নিক। মায়ের পেয়ারের ছেলে।'
সুরঞ্জনা আমাকে জিগ্যেস করলে, 'তোমার ভয় করছে?'
'মোটেই না। ধরে মারবে তো! মারুক না।'
দিদি বললে, 'চল আমরা বীরভূমে যাই। সকালের ট্রেনেই। লোক হাসাহাসি করার চেয়ে ভালো।'
'ভয়ে পালাবে দিদি!'
'একে পালানো বলে না। বলে স্ট্র্যাটিজি।'
অনেক দিন পরে বীরভূমে এলুম। মা-বাবার কথা প্রায় ভুলেই ছিলুম। একজন ছেলের পক্ষে এটা খুবই অন্যায়। কেমন যেন লজ্জা, লজ্জা করছিল। তার ওপর সঙ্গে আবার সুন্দরী এক মেয়ে। গ্রামে এসেছে সুরঞ্জনা। তার কী আনন্দ! শরৎ পরিপূর্ণ ফুটেছে। পুকুরের জলে। কাশফুলে আকাশের মেঘে। আমার মন কিন্তু মরে আসছে যতই এগোচ্ছি বাড়ির দিকে। দিদি নির্বাক। সুরঞ্জনা একের পর এক গান ধরছে আর ছাড়ছে।
বাড়ির সামনে এসে সুরঞ্জনা লাফিয়ে উঠল। 'আরেব্বাস! এ তো জমিদার বাড়ি।'
সত্যিই বাড়িটা আমাদের বিশাল। ঠাকুর্দার আমলের। কথায় আছে, এক পুরুষে করে যায় পরের পুরুষে ওড়ায়। আমার বাবা নামকরা ডাক্তার। তিনি ধরে রাখতে পেরেছেন। এখনও দোল-দুর্গোৎসব হয় ঘটা করে। চণ্ডীমণ্ডপ ডান হাতে রেখে আমরা বিশাল দেউড়ি পেরিয়ে দালানে উঠলুম।
মলয়দা মাদুর পেতে বসে আছেন। চার-পাঁচটা বাচ্চা ছেলেমেয়ে ঘিরে আছে। মলয়দার অবৈতনিক বিদ্যালয়। মলয়দার চুল আরও কিছুটা পেকেছে। চেহারা সে আগের মতোই আছে। টসকায়নি।
মলয়দা আমাদের দেখে লাফিয়ে উঠল, কী ব্যাপার তোমরা?'
দিদি বললে, 'হ্যাঁ আমরা। আপনি অমন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন কেন?'
'কর্তা মশাই যে আজ সকালে তোমাদের ওখানেই গেলেন।'
'সে কী? হঠাৎ ডাক্তারি ফেলে চেম্বার ফেলে, সাত সকালে? মা কোথায়?'
'মা তো আজ তিনদিন হল বিছানায়। কেঁপে কেঁপে জ্বর আসছে। ছাড়ছে আবার আসছে। যাও না ভেতরে যাও।'
'এখন বাবার কী হবে? গিয়ে তো দেখবেন তালা ঝুলছে। কেলেংকারি হয়ে গেল। কেন গেলেন?'
'ওই যে খুব একটা সুখবর আছে। শুভোর বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে।'
'কার সঙ্গে? শুভো জানে না বিয়ের ঠিক হয়ে গেল! কার সঙ্গে!'
'নৃপেনবাবুর ছোট মেয়ের সঙ্গে। ওই যে নৃপেন উকিল। খুব নামকরা।'
'যা:। সব গোলমাল হয়ে গেল।'
'ও সব ঠিক হয়ে যাবে। কর্তামশাইয়ের কলকাতায় আরও থাকার জায়গা আছে। কাল সকালেই ফিরে আসবেন; কিছু দরকারি কেনাকাটাও আছে। তোমরা ভেতরে চলো আমি আসছি। এই মেয়েটিকে তো চিনতে পারলুম না।'
'এর নাম সুরঞ্জনা। শুভোর বউ।'
'অ্যাঁ। শুভোর বউ। কবে বিয়ে হল? আমরা জানতেও পারলুম না!'
'কাল গভীর রাতে বিয়ে হয়ে গেছে।'
'সে কী। কর্তাবাবু, কর্তা মায়ের অমতে?'
'কেন, বউ খারাপ হয়েছে? আমার মতে হয়েছে।'
'ওরে বাপরে! এ মেয়ে তো রূপসি। সিনেমার নায়িকার মতো। কোথায় লাগে নৃপেনবাবুর মেয়ে। সে তো ঘোড়ার মতো দৌড়য়। জিমন্যাস্টিক করে। ডিস্ট্রিক চ্যাম্পিয়ন। এ বউ বেশ ভালো হয়েছে। যাও যাও ভিতরে যাও, আমি এদের ছুটি দিয়ে আসছি।'
ভেতরের উঠোন পেরোতে পেরোতে সুরঞ্জনা বললে, 'আমার সামনে এখন একটাই পথ আত্মহত্যা। ডান পাশের দিঘিটা ভারী সুন্দর। ওখানেই ভেসে উঠবে আমার দেহ। উ:, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বিয়ে করবে, তাও কত বাধা!'
দিদি বললে, 'তুই ভাবছিস কেন? আমরা মাকে হাতে করে ফেলব, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মা প্রেম বোঝে। সেই যুগে মায়ের সঙ্গে বাবার ভালোবাসা হয়েছিল। সেই নিয়ে আমরা এখন কত হাসাহাসি করি। ঠাকুর্দা বাবাকে বের করে দিয়েছিলেন। তিনিই আবার মায়ের কোলে মাথা রেখে নব্বই বছর বয়সে হাসতে হাসতে চলে গেলেন। যাওয়ার সময় মাকে সার্টিফিকেট দিয়ে গেলেন, আমার চিনতে ভুল হয়েছিল, দেবীকে ভেবেছিলুম মানবী।'
আমাদের সেই বিশাল শোওয়ার ঘর। পাথরের টুকরো বসানো মেঝে। বিশাল বাঘ থাবা পালঙ্কে পিঠে বালিশের থাকে ঠেসান দিয়ে মা বসে আছে। পায়ের ওপর পাতলা একটা চাদর। জ্বরে একটু রোগা দেখালেও মা আমার সুন্দরী। সুরঞ্জনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।
দিদি ভনিতা না করেই বললে, 'এর নাম সুরঞ্জনা। শুভোর আর আমার পছন্দ।'
সুরঞ্জনা কাঁপতে কাঁপতে এগিয়ে গিয়ে মায়ের পায়ে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করল। মা হাতের ভঙ্গি করলেন। কোনও কথা নেই। সুরঞ্জনাকে দেখছেন। আমার আর দিদির নি:শ্বাস বন্ধ। সুরঞ্জনা ভয়ে জড়সড়ো। মুখ নীচু। নাকছাবির পাথরটা ঝিলিক মারছে।
মা বললেন, 'হুঁ! তাহলে এই ব্যাপার।'
সুরঞ্জনা হঠাৎ মায়ের কোলে মাথা গুঁজে ফোঁস ফোঁস করে ফুলতে লাগল। তারই মাঝে কোনওরকমে বলল, 'শুভোকে আমি ভীষণ ভালোবাসি। আমার কেউ নেই। তাহলে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।'
মায়ের দুটো হাত সুরঞ্জনার চওড়া পিঠে পড়ি পড়ি করছে। হাত দুটো পিঠে পড়লেই, জানি মঞ্জুর হয়ে গেল। আর ভাবনা নেই। হাত দুটো ধীরে নেমে এল। একটা হাত পিঠে। একটা মাথায়। ওই মাথার হাতটাতেই কাজ হবে।
সুরঞ্জনা, 'মা' বলে অদ্ভুত একটা ডাক ছাড়ল। মন্দিরে মায়ের মূর্তির সামনে ভক্ত যেভাবে ভাবাবেগে ডাকে। দু'হাত দিয়ে মায়ের কোমরটা জড়িয়ে ধরল। কী পাজি মেয়ে। মাকে বোধহয় সুড়সুড়ি দিয়েছে! মা বলছেন, 'ওরে ছাড় ছাড় সুড়সুড়ি লাগছে!'
সুরঞ্জনা বললে, 'না, তোমাকে আমি ছাড়ব না। আগে আমাকে মেয়ে করবে কি না বলো?'
'একটা শর্ত। আজ বিকেলে আমার জ্বর যদি না আসে।'
সুরঞ্জনা কোল থেকে মাথা তুলে বলল, 'আমি বলছি, জ্বর আজ আসবে না।'
দিদি বললে, 'মেয়ে খুব গুণের। লেখাপড়া তো জানেই, আবার বড় নাচিয়ে।'
'নাচিয়ে তো বটেই, তা না হলে শুভোর মতো ছেলেকে নাচাতে পারে।'
যে সন্ন্যাসী হব বলেছিল, সে সংসারী হয়ে ফিরে এল।'
'নৃপেনবাবুর গেছো মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধটা তুমি করেছিলে।'
'কর্তা। আমার মত নেই।'
'যাক বাবা, ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল।'
'এখনও ছাড়েনি। কর্তা না ফেরা পর্যন্ত ছাড়বে না। কর্তা এককথার মানুষ। টনটনে মানসম্মান জ্ঞান।'
'তুমি আমাদের দিকে আছ তো!'
ফিরলে ছ'টা নাগাদ ফিরবেন। আমরা দমবন্ধ করে বসে আছি। অপরাধ তো করেই ফেলেছি। সুরঞ্জনাকে তো বের করেই এনেছি। যথেষ্ট নোংরা কাজ। সন্ধের প্রথম শাঁখটা বাজল। এই আসেন, আসেন। এলেন। গাড়ি থামল। দিদিই এগিয়ে গেল প্রথমে। বাবা দিদিকে ভীষণ ভালোবাসেন। মলয়দা জিনিসপত্র নামাতে শুরু করেছেন।
দিদিকে দেখে বাবা বললেন, 'আশ্চর্য মেয়ে! এত বড় একটা তালা ঝুলিয়ে চলে—'
বাবাকে জড়িয়ে ধরে দিদি বললে, 'কতদিন দেখিনি তোমায়!'
আমি প্রণাম করলুম। বাবা বললেন, 'এই তো দামড়া তোমাকেই আমি ধরতে গিয়েছিলুম। যাক নিজেই এসে ফাঁদে ধরা দিলে।'
সুরঞ্জনা প্রণাম করতেই বললেন, 'বা: মেয়েটি কে? যেন পার্বতী।'
দিদি বললে, 'সত্যিই পার্বতী। বড় ড্যানসার। কেমন মেয়েটা?'
'খুব ভালো। আমার পুত্রবধূ করতে ইচ্ছে করছে।'
'তাই না কি? তুমি তো নৃপেনবাবুর মেয়েকে ঠিক করে এসেছ?'
'তখন তো একে দেখিনি।'
'তাহলে নাও। এই তোমার পুত্রবধূ। সব ছেড়ে চলে এসেছে।'
'সেটা তো খুব অন্যায়। গৃহত্যাগ করা তো ঠিক নয়।'
'বেচারার আর কোনও উপায় ছিল না।'
সেদিন সন্ধেবেলা মায়ের সত্যিই জ্বর এল না। সুরঞ্জনা বললে, 'প্রার্থনার জোরে কী না হয়।'
রাতে নাচের আসর বসল হলঘরে। মলয়দা সব কটা ঝাড় জ্বেলে দিলেন। হেমন্তের শীত শীত বাতাস। অনেকদিন পরে জলসাঘরে আসর পড়ল। মা একটা পাতলা চাদর গায়ে দিদির পাশে বসে আছেন। কয়েকজন গণমান্য এসেছেন। এসেছেন নৃপেনবাবু। বাদ্যযন্ত্রীরাও এসেছেন। মলয়দা নিয়ে এসেছেন। সুরঞ্জনার নাচ শুরু হল। প্রাণমন দিয়ে নাচছে উর্বশীর মতো। যেমন পায়ের কাজ, তেমনি হাতের মুদ্রা। তেমনি চোখের ভঙ্গি। বাবা মাঝে মাঝে বলে উঠছেন, 'গুণী, গুণী।'
নাচের আসর দশটায় শেষ হল। বড় দালানে সবাই খেতে বসেছেন। খাঁটি ঘিয়ে লুচি ভাজা হচ্ছে। গন্ধে বাড়ি ভরে গেছে। হেমন্তের শিশিরের ওড়না গায়ে শীত আসছে। আকাশ ভরা তারা। ঘুঙুরের বোল তখনও বাতাসে ভাসছে। ফুলকো লুচিতে আঙুল ফোটাতেই ফস করে খানিকটা বাতাস বেরিয়ে গেল।
বাবা নৃপেনবাবুকে জিগ্যেস করলেন, 'মেয়েটি কেমন নাচল?'
নৃপেনবাবু উচ্ছ্বসিত, 'অপূর্ব একেবারে অপ্সরা।'
'মেয়েটিকে যদি পুত্রবধূ করি তোমার আপত্তি আছে?'
ক্ষণকাল নীরব থাকলেন নৃপেনবাবু। মুখের উজ্জ্বলতা ম্লান হল। উদাস ঠোঁটে ঠেকে রইল লুচির সাদা টুকরো। অবশেষে বললেন, 'কিছুমাত্র না?'
আমার বিয়ে না করাই উচিত ছিল। পারিনি। সুরঞ্জনা আমায় ছাড়েনি। অবসরে, নির্জনে আমার চোখে ভাসে নৃপেনবাবুর সেই মুখ। আর দেখতে পাই শ্যামলা একটি মেয়েকে, সবাইকে ছাড়িয়ে সে প্রাণপণে ছুটছে একটা ফিতেয় বুক ঠেকাতে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন