সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

রামপ্রসাদ লিখলেন, এই সংসার ধোঁকার টাটী। ও ভাই আনন্দবাজারে লুটি। এই অসীম রসবোধের জোরে বাঙালি এখনও টিঁকে আছে। জীবনটাকে জোরালোভাবে নিলে, জাতটা মারামারি করে মরে যেত। রসিক বাঙালির পাকে পাকে রস। অনেকটা জিলিপির মতো। খাদ্যে রস, কাব্যে রস, কথায় রস, দেহে রস, একাদশী অমাবস্যায় মালুম হয় অনেকের। বন্যা, প্লাবন, খরা, দুর্ভিক্ষ, মহামারি, শোষণ, শাসন, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, দেশ বিভাগ, ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি, মুদ্রাস্ফীতি, অর্থাভাব, কর্মাভাব, কোনও কিছুতেই বাঙালিকে কাবু করা গেল না। বাঙালির চোখ সেই ধরনের কাচ।
বাঙালি এক সময় ভোজনবিলাসী ছিল। মহিলাদের হাতে রান্নার অনেক প্যাঁচ ছিল। কুটে বেটে, সাঁতলে, সেঁকে সারাটা জীবন অক্লেশে কাটিয়ে দিতে পারতেন। বিচিত্র সব পদ। কোনও জাত ভাবতে পারে, নারকেলের জল বের করে, তার ছোট ফুঁটোর মধ্য দিয়ে একটি একটি করে খোলা ছাড়ানো চিংড়ি মাছ ঢুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে এমন একটি বস্তু বানানো যায়, যার গন্ধেই জিভে জল আসে! আর খেতে বসলে, বর্তমান কালের একটা কার্ডের বরাদ্দ চালের চাহিদাতেই আটকে রাখা যাবে না। সামান্য কচুর ডাঁটা, রন্ধন নিপুণার হাতে এমন চেহারা নিতে পারে, ছোলা, বড়ি আর নারকেল কোরা সহযোগে আহারে বসে আপসে গলা ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে 'যুগ যুগ জিও'। রসিক কবি আবেগে লিখে ফেলেন, সন্দেশ, গজা, সীতাচুর, মতিচুর, রসকরা সরপুরিয়া। মিষ্টান্নে বিশাল তালিকার সামান্য কয়েকটি পদ। আরও আছে। এই বাঙালির মাথাতেই আসে, গরুকে সের দুই গোলাপজাম খাইয়ে দুধে গোলাপ-গন্ধ আনার চেষ্টা।
এখন বাঙালি চাপে পড়ে, চেয়ারের পায়া-চাপা আরশোলার মতো একটু কেতরে পড়েছে। মন-টন সামান্য ছোট হয়ে এসেছে। এক সময় বাঙালির মেজাজ কী ছিল। রাত বারোটার সময় অতিথি এলে, গৃহকর্ত্রী ময়ান দিয়ে ময়দা মাখতে বসে যেতেন। রাত আড়াইটার সময় অতিথির সামনে পরিবেশিত হত ফুলকো লুচি, বিবিধ তরকারি সহযোগে।
এক দরাজ মানুষের বাড়ির একটি ভোজনের স্মৃতি এখনও মনে আছে। নিমন্ত্রিতরা কেঁদে ফেলেছিলেন। আমি আর পারছি না। রগচটা এক ভদ্রলোক পরিবেশনকারীকে তেড়ে মারতে উঠলেন, তবে রে শালা। সে রকম আয়োজন ইদানীংকালে হয়তো চোখে পড়বে না। না পড়লেও স্মৃতিতে আছে। প্রশস্ত বাগান ঘেরা বাড়ি, আলোর মিছরিদানা ঝুলছে। বসন্তের বাতাসে সানাই বিরহের সুর ছড়াচ্ছে। ইলশে গুঁড়ির মতো আতর সর্বাঙ্গ সৌরভে ভরে দিচ্ছে। গেলাসে গেলাসে কাগজি বাদামের শরবত। গোলাপের পাপড়ি তুলে চুমুক দিতে হয়। দুই পালোয়ানে নাকি আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে নাগাড়ে বেটে বেটে, একেবারে 'মাইক্রোফাইন' করে ছেড়ে দিয়েছে। মূল আহারের আগে প্লেটে প্লেটে ভূমিকা, যেন পরিচিত পর্ব। মিনিয়েচারে পরিবেশিত। অতর্কিত আক্রমণ নয়, বলে কয়ে হামলা। লুচির ময়দা মাখা হয়েছে নেয়াপাতি ডাবের জলে। যে লুচি চিবোতে হয়, সে লুচি জাতে নৈকষ্য কুলীন নয়। চিবোবার কষ্টটুকু যেন নিতে না হয়। জিভে পড়বে আর গব্য ঘৃতের স্বাদ নিয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে, সূর্যোদয়ে শেষ রাতের অন্ধকারের মতো। মোট ষাট-সত্তর রকমের পদ। শেষের দিকে ভোজনবিলাসীরা যখন চোখ ছানা-বড়া করে আসনে উলটে পড়ার দাখিল, তখন গৃহস্বামীর নির্দেশে লেবুতে জারানো ঝিরিঝিরি আদাকুচি ঘুরে যাচ্ছে। জিভের জড়ভাব কাটিয়ে আবার লেগে পড়ুন কোমর বেঁধে। খেতে খেতে মানুষ প্রায় ক্ষিপ্ত।
সে যুগ আর নেই। রস এখন মরে এসেছে। ক্যাটারারের দিন পড়েছে। যারা সাবেক প্রথা চালু রেখেছেন, তাঁরাও ব্লিৎসক্রিগের কায়দায় পরিবেশন করান 'মাছ, মাছ' বলে পরিবেশনকারী পঙক্তির মাঝখানের সুঁড়িপথ দিয়ে টেলিগ্রাফ হকারের মতো ছুটতে থাকেন, জোর খবর! ঠোঁট-কাটা কেউ কেউ লাফিয়ে ওঠেন। ধর তো ব্যাটাকে। এমন অভিজ্ঞতাও হয়েছে, কে একজন গোটা-তিরিশ কমলাভোগ সাঁটিয়ে, 'আরও দাও, আরও দাও' করছেন আর ভীত পরিবেশনকারী গৃহস্বামীকে বলছেন, ওই তে-এঁটেটা দেখছি ফেল মারিয়ে দেবে। গলবস্ত্রে একবার গিয়ে বলুন, বাছা আর নয়!
তখন ছিল প্রাচুর্যের রস, এখন হয়েছে দুধমারা রস। এখনকার কালে দু:খটাই বেশ সরস হয়ে উঠেছে। মানুষ কাঁদতে কাঁদতে হাসে। বাজারে দেখা হলে একজন আর একজনকে হেসে হেসেই বলেন, কী বাজার পড়ল মশাই, পটল তেরো টাকা কেজি। এইটুকু একটা মাছ কেটে বলে, কাটাপোনা লগনসার বাজারে তিরিশ টাকা কেজি। মাইরি আর বাঁচা যাবে না। মৃত্যু আসন্ন জেনেও এত হাসি একমাত্র বাঙালিই হাসতে পারে।
সবেতেই একটা কী মজার ভাব। লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে গাড্ডায় পড়ে, বাঙালিই হেসে হেসে বলতে পারে, পড়ে গেছি দাদা। প্যাঁকাটির মতো পা ভেঙে তিন টুকরো। তিনদিন আগে এক ব্যাটা কেলে কুকুরের পেটে উঠে পড়েছিলুম, সে বর্ণনাও কত হাস্যোদ্রেককারী। নাও এখন তলপেটে গোটা চোদ্দ পাস্তুর। সেই ফোঁড়ার বিবরণও বলার মতো। যন্ত্রণাতেও রস। এই ভিড়ের শহরে নিজের স্ত্রী ভেবে অন্যের স্ত্রীর হাত ধরে বেশ দু-এক কদম হামেশাই ঘটতে পারে। বিশেষত সিনেমা হল থেকে বেরোবার মুখে। অনেক সময় দুই অচেনা পরিবার এইভাবে বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারেন। সেই বন্ধুত্বের বার্ষিকীও পালিত হতে পারে ঘটা করে।
বাসে দুই বাঙালির ঝগড়া নিত্য ঘটনা। একজন যেখানেই পা রাখছেন, আর একজন বলছেন, আমার পা মাড়াচ্ছেন। শেষে প্রথম জন বিরক্ত হয়ে একটি মাত্র প্রশ্ন করলেন, আপনার ক'টা পা মশাই? তার মানে? আমি চতুষ্পদ? লেগে গেল ধুমধাড়াক্কা। সহযাত্রীরা বললেন, চুপ, চোপ, দুটো হুলোকেই নামিয়ে দিন। কিন্তু এর মেয়াদ বেশিক্ষণ নয়। বিবাদীদের দুজনই নামলেন। পাশাপাশি চলতে লাগলেন একই দিকে। যেতে যেতে দেশলাই আর সিগারেটের আদান প্রদানও বিচিত্র নয়। বাঙালি তেমন বিদ্বেষ পোষণ করতে পারে না। পারলে একই ক্যান্ডিডেটের ভোটে পর পর দুবার জিতে আসার উপায় থাকত না। ব্যবসায়ীরা ব্যাবসা করতে পারতেন না, তাঁরা একঘরে হয়ে থাকতেন। তেলে যে তেল থাকবে না, এ জেনেও বাঙালি তেলেভাজা খাবে, আর হেসে হেসে বলবে শেয়ালকাঁটা খেলুম গো, এবার হুককা হুয়া ডাক না ছাড়তে হয়। ঘিয়ে ঘি নেই জেনেও বাঙালি গরম ভাতে ঘি আর আলুভাতের স্বপ্ন দেখবে। আত্মহত্যার জন্য তেইশটা স্লিপিং পিল খেয়ে পরের দিন সকালে হাসতে হাসতে উঠে এসে বলবে, ভেজাল ছিল মাধু, তোমার সিঁদুরের জোর আছে, মিস ফায়ার হল। কড়া করে এক কাপ চা দাও, সেই প্রথম দিনের মতো, আর চলো ম্যাটিনিতে 'নিকা' মেরে আসি। পুনর্জন্ম হল তো!
সব পরিবারেই অল্প বিস্তর চুলোচুলি লেগে আছে। সেই চুলোচুলির আবার টি ব্রেক হয়। একপক্ষ আর একপক্ষকে বলেন, নাও খুব হয়েছে। ঝগড়া এখন ধামা চাপা থাক, এক কাপ চা করো। রাতে বিছানায় এসে ঝগড়ার তিক্ততা ভুলে স্ত্রী স্বামীকে বলবেন, ঘাড় মুখ গুজড়ে শোওয়ার ছিরি দ্যাখো! মাথা সোজা করো, ঘাড়ে ব্যথা হবে। বঙ্গললনার ভেতর এই যে একটা মা বসে আছে, যার ফলে সব কিছুই সহনীয় হয়ে ওঠে। বেদান্ত যেন আমাদের হাতের মুঠোয়। মৃত্যু, বিচ্ছেদ, বঞ্চনা, কোনও কিছুই আমাদের গায়ে লাগে না। তা না হলে অন্দরমহল থেকে এমন কায়দার কথা বন্ধু পরিবৃত গৃহস্বামীর কাছে আসে কী করে? ক্ষুদিরামবাবু পাথুরেঘাটায় এসেছেন, তিনি জুড়নপুরে চলে যাবেন আপনি একবার দেখা করে আসুন। হেঁয়ালি ভাঙলে যার অর্থ দাঁড়ায়, অভাবের সংসারে পাথরের থালায় ক্ষুদ ভাত পরিবেশন করা হয়েছে, জুড়িয়ে যাওয়ার আগে খেয়ে আসুন। দু:খ নিয়ে রসিকতা বাঙালিরই সাজে। মৃতদেহ নিয়ে শ্মশানে ছোটার কায়দা আর প্রতিমা বিসর্জনের হল্লা আর একই রকম মনে হয়। চার কাঁধে চেপে খাট চলেছে, বলো হরি হরিবোল। ছোটার তালে তালে মৃতদেহের মাথা ডাইনে বামে দুলছে, যেন বেশ উপভোগ করছেন এই দুরন্ত শেষ যাত্রা, শোনা না গেলেও সেই ঈশ্বরীভূত মানুষটি যেন তালে তালে বলছেন, আসছে বছর আবার হবে। শ্মশান ফটোগ্রাফার ছবি তোলার সময়, আচ্ছাদনের তলা থেকে মৃত ব্যক্তিকেও অভ্যাসমতো বলে ফেলেন, একটু হাসুন। হাসি ছাড়া বাঙালির মুখ যে বেমানান।
ভগবানের কাছে আমরা একটা মেমোরান্ডাম পাঠাতে পারি এই বলে : আমাদের সব নিয়েছ, দেশ নিয়েছ, শান্তি নিয়েছ, শৃঙ্খলা নিয়েছ, বাসস্থান নিয়েছ, আলোর দিশারী মহাপুরুষদের নিয়েছ, অন্ধকারে ডুবিয়ে মারছ, রাজনীতির হ্যান্ডবল যেখানে সেখানে ফাটছে, পিলে চমকে দিচ্ছে, সব অচল করে দিচ্ছে, তুমি প্রভু দুটি জিনিস নিও না, এক আমাদের হাসি, দু:খ মিশ্রিত করুণ মুখব্যাদন, দুই মেয়েদের সোয়েটার বোনা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন