বেদনা

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কতরকমের বেদনা আছে এই পৃথিবীতে? দাঁতের বেদনা, গাঁটে গাঁটে বাতের বেদনা, মাঝে মাঝে মাথার বেদনা, দিনভোর খাওয়া হয়েছিল বন্ধুর দেওয়া ভোজে, পরের দিন পেটের বেদনা। তার মানে দেহের খোলে যেই এসে ঢুকলুম, অমনি হরেক দৈহিক বেদনার খপ্পরে এসে পড়লুম। কারোর সাধ্যি নেই বাঁচায়। বাড়ি থাকলে যেমন ট্যাকস দিতে হয়, দেহেরও সেইরকম ট্যাকস। আবার আয় বাড়লে যেমন ইনকাম ট্যাক্স সেইরকম বয়স বাড়াটাও তো দেহের উপার্জন, সেই উপার্জনের জন্যে ইনকাম ট্যাক্স হল, বাড়তি বেদনা। ধরল স্পন্ডিলোসিস, ঘাড়ে কি কোমরে, ঘাড়ে হলে বিলিতি কুকুরের মতো সুদৃশ্য একটা কলার পরে ঘুরে বেড়াও। কেউ পাশ থেকে, পেছন থেকে ডাকলে গোটা শরীরকে কাঠের পুতুলের মতো ঘুরিয়ে দ্যাখো। রাতে বালিশ ছাড়া বিছানায় শুয়ে যন্ত্রনায় কাতরাও। পেটে আলসার হওয়াও বিচিত্র নয়। বয়েস বাড়া মানে দুশ্চিন্তা বাড়া। আর দুশ্চিন্তার আর এক নাম অ্যাসিড ও আলসার। তারই বা কতরকম, পেপটিক, ডিওডিনাল। ডাক্তারবাবু প্রশ্ন করবেন, খাওয়ার পর বাড়ে? না পেট খালি হলে বাড়ে? বয়স বাড়া মানে দেহ খাঁচা পুরোনো হওয়া। হাড়ে জমে গেল ক্যালসিয়াম। হাঁটু ভাঙে না, কোমরের খিলে জং ধরে গেল। দেহ ক্রমশই ঝুঁকতে লাগল সামনের দিকে। অবশেষে ধনুক। যদি রক্তে মাইগ্রেন আসে তাহলে তো হয়েই গেল। সারা জীবন মাথার যন্ত্রণা হয়ে দাঁড়াবে সহধর্মিণী। আর্থাইট্রিস আর মাইগ্রেনের কোনও ওষুধ নেই। ওষুধ নেই ক্যানসারের। কোনও ওষুধ নেই স্পন্ডিলোসিসের। আমাদের পাশে পাশে সব ঘুরছে। কাকে যে কখন ক্যাঁক ধরবে বলা মুশকিল। এইসব সম্ভাবনার মধ্যেই মানুষ হাসছে, খেলছে, প্রেম করছে, করছে ঝগড়া-কাজিয়া। তেড়ে যাচ্ছে বাঁশ নিয়ে। বোলচাল মারছে বড় বড়। বুক চিতিয়ে বলতে গেল 'জানিস আমি কে?' কথা আর শেষ হল না হয়তো, হৃদয়ের বাঁধা চলন থমকে গেল কয়েক সেকেন্ডের জন্যে, কি লাফিয়ে উঠল টাট্টু ঘোড়ার মতো। চোখের সামনে আঁধার যবনিকা। অসহ্য ব্যথা। 'আমি কে' চোখ খুলল হাসপাতালের ইন্টেসিভ কেয়ারে; কি চোখ আর খুললই না, ফিরে গেল প্যাভেলিয়ানে। আম্পায়ার হাত তুলে দিলেন আউট।

দেহের বেদনার শেষ নেই। ফিরিস্তি বাড়ালেই বেড়ে যাবে। আজ গেলে কাল সকাল কী গ্লানি নিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠব আমি জানি না, দন্তশূল, পিত্তশূল না অম্লশূল। দেহপিঞ্জরে বসে আছে মন। তার তো বেদনার অন্ত নেই। তার প্রথম বেদনা, সে এক বন্দি পাখি। একটা দেহে, একটা নামে, একটা পরিবারে, একটা সমাজে, একটা সময়, একটা ব্যবস্থায়, একটা অবস্থায় আটকে পড়ছে মৃত্যু ছাড়া তার মুক্তি নেই। সব মনেরই এই এক বেদনা। কেউ বোঝে, কেউ বোঝে না। মানুষ নানাভাবে ভোলার চেষ্টা করে এই বেদনা। নানাভাবে মেতে থাকে।

এরপর যা হতে চেয়েছিলুম তা হতে না পারার বেদনা। যা ধরতে চেয়েছিলুম তা ধরতে না পারার বেদনা। আমাকে যারা জীবনযুদ্ধে মেরে বেরিয়ে গেল তাদের উত্থানে অক্ষম আমির বেদনা। ভালোবেসেছিলুম একটি মেয়েকে। তিন তিনটে বছর দুরন্ত প্রেমের অভিনয় করে সে বিয়ে করেছে অন্য আর একজনকে। বেদনার রাগিনীতে সারা জীবনের মতো বাঁধা হয়ে গেছে আমার জীবনবীণা। অনেক আশা নিয়ে ঘর বাঁধলুম আর একজনের সঙ্গে। সে দেখি আমার সুরে সুর মেলাতে রাজি নয়। আমি উত্তরে গেলে সে যায় দক্ষিণে। একটা কথা বললে সে ছিটেগুলির মতো দশটি কথা ছোঁড়ে আমার দিকে। বউয়ের জন্য জনক জননী ছেড়েছিলুম। ঘোর কাটার পর পরম সত্যের খোঁচা, সংসারে আপনার জন্য দুজন পিতা ও মাতা; কিন্তু সেতু ভেঙে ফেলেছি আমি। একূল, ওকূল দু-কূলই আমার গেছে। এ এক চির বেদনা।

বন্ধুর বিশ্বাসঘাতকতা, সেও এক বেদনা। অবাধ্য পুত্র, স্বাধীনতাকামী কন্যা মহাবেদনা। স্বজন হারানোর বেদনা, কর্মের স্বীকৃতি না পাওয়ার বেদনা। প্রতিবেশীর ভালোবাসা না পাওয়ার বেদনা অকারণে অপমানিত হওয়ার বেদনা। বেদনাময় পৃথিবীতে কেন আসা! যেখানে সবই শুধু যায় শুধুই ক্ষয়। কৈশোর চলে গেল। যৌবন উঠে গেল প্রৌঢ়ত্বের রথে। এক মাথা চুল ছিল, সামনে পড়েছে টাক। চুল যাওয়ার বেদনা। টানটান ত্বকে বয়সের কুঞ্চন, সেও এক বেদনা। চোখের জ্যোতি গেল সেও এক বেদনা। রিক্ত, সিক্ত পরাজিত মানবের নি:সীম বেদনা নিয়ে একদিন চির বিদায়। এই বেদনা নিয়ে যাই বলেই ফিরে এসে ভূমিষ্ঠ শিশুটি পয়লা চোটে কেঁদে ওঠে—ওমা।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%