সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অনেক দিনের ইচ্ছে, ছোট্ট-খাট্টো একটা বাড়ি তৈরি করব। বেশ বাংলো প্যাটার্নের। চারপাশে ছবির মতো বাগান। রুমালের মাপের সবুজ ঘাসে ঢাকা লন। গ্রীষ্মের বিকেলে পাশাপাশি দুটো বাগান চেয়ারে বুড়ো বুড়ি বসে বসে ফুরফুরে হাওয়া খাব। আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটবে! পশ্চিম আকাশে ক্ষয়া চাঁদ উঠবে। হ্যাঁ গোটা দুয়েক মন্দির ঝাউ বসাব। হাওয়া লেগে যে ঝাউয়ের একটা দুটো পাতা নয়, সারা গাছটাই দুলতে থাকে ওড়িশি নর্তকীর ছন্দে। তারপর যেদিন ছেলের বিয়ে দোব। ভাবা যায় না! হালকা হলুদ রঙের দেওয়ালে স্বপ্নের মায়া গড়াতে থাকবে চুঁইয়ে চুঁইয়ে। আলোর মালা দিয়ে গাছ সাজাব। মনে হবে কলকাতার উপকণ্ঠে বসে নেই, বসে আছি হাওয়াই দ্বীপের মায়ালোকে। অদৃশ্য সুন্দরীরা গাছের ফাঁকে ফাঁকে নেচে চলেছে। বেনারস থেকে সবচেয়ে বড় ওস্তাদ আনাব। সানাইয়ের মিঠে সুর ধূপের ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে পড়বে। অবশেষে একদিন দক্ষিণের জানালা খোলা শোবার ঘরে, ধবধবে সাদা বিছানায়, আমি চললুম গো বলে শুয়ে পড়ব। কোনও ব্যথা নেই, যন্ত্রণা নেই, শ্বাসকষ্ট নেই,সজ্ঞানে স্বর্গে গমন। স্বর্গেই যাব, জীবনে আমি কোনও পাপকর্ম করিনি। আমি মধ্যবিত্ত বাঙালি হলেও আমার স্বভাবটি ভালো। প্রতিবেশীর ভালো দেখলে বুক ফেটে যায় ঠিকই, তবে সেই সাবেক কালের বধূদের মতো, বুক ফাটে তবু মুখ ফোটে না। নিয়মমতো দেবালয়ে যাই। নিজের ভালোর সঙ্গে অন্যের ভালো কামনা করি। সুন্দরী মহিলাদের দিকে আড়ে আড়ে তাকালেও, চোখ ফিরিয়ে নিয়ে গর্জন করতে থাকি—মা—মা।
কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়।
সঞ্চয়ের দিকে ষোলো আনা নজর দিলুম। যেটুকু খরচা না করলেই নয়, সেইটুকু বজায় রাখে বাকি সব ছাঁটাই। রাজনৈতিক নেতাদের মতো একটা স্লোগানই তৈরি করে ফেললুম—ইকনমি, ইকনমি। মাথা গোঁজার ঠাঁই চাই। আগে একটা বাড়ি, তারপর অন্য সব।
বাড়িতে শিশু যখন কেউ নেই তখন দুধেরও কোনও প্রয়োজন নেই। চায়ের জন্যে ছোট এক টিন গুঁড়ো দুধেই এক মাস চলে যাওয়া উচিত। না চললে র চা। গৃহিনী মাসখানেকের মধ্যেই রব তুললেন, পড়ুয়া ছেলেরা দুধের অভাবে রোগা হয়ে যাচ্ছে। বুদ্ধি কমে যাচ্ছে। অঙ্ক কষতে পারছে না। স্মৃতিশক্তি কমে আসছে।
আমি বললুম, ওসব কিছু না। ও ব্যাটা মায়ের দিকে গেছে। তোমার মাথাটাই উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ও-মগজের গোড়ায় জোলো দুধ যতই ঢালো, কিস্যু হবে না। একটা বাছুরকে দুধ খাওয়ালে সে কি আইনস্টাইন হবে! অকাট্য যুক্তি। এ যুক্তি জজেও মানবে। উঠতি বয়সের ছেলেদের শরীরের জন্যে এক মুঠো ভিজে ছোলা, দু-এক কুচি আদাই যথেষ্ট। ছোলাপোষ্য ওয়েলার ঘোড়া দেখেছ! বড়বাজারের পাতাখেকো ষাঁড় দেখেছ!
মাছও বাতিল। আমরা মানুষ, বেড়াল নই। পচা মাছ ছাড়া ভাত উঠবে না, তা তো নয়। নিরামিষের মতো আহার নেই। দেহ পবিত্র, মন পবিত্র থাকে। বই খুলে দেখালুম। মাছ, মাংস, ডিম খেলে আমাদের কোলনে এমন সব জীবাণু জন্মায় যা আমাদের শত্রু। শরীর বিষিয়ে তোলে। নিরামিষ আহারে যেসব জীবাণু জন্মায় তারা আমাদের বন্ধু। তলপেট শত্রুর দখলে চলে যাক, এই কি তোমরা চাও?
গৃহিণী বললেন, কোলন কাকে বলে?
তলপেটের ডানপাশ খাবলে ধরে দেখিয়ে দিলুম, এই সেই বিখ্যাত কোলন যার প্রদাহকে বলে কোলাইটিস। হলে সারে না। ধীরে ধীরে মৃত্যু। শাকপাতা খেয়ে নিজের বাড়িতে দীর্ঘজীবী হবে, না পচা মাছ খেয়ে পটল তুলবে?
মৃতুভয়ের চেয়ে বড় ভয় আর নেই। মাছ বাতিল হল। বেশ বড় দুটো খরচ বাঁচানো গেল। এইবার তেল। খাওয়ার আর মাখার। মেয়েদের চুল সাংঘাতিক তেল খায়। ভালো করে মাখলে, এক এক খেপে দুশো গ্রাম। শরীরে আজকাল আর তেমন তেল কেউ মাখে না। কুস্তির পালোয়ানরা মাখে। আমাদের পালোয়ান হওয়ার শখ নেই। আমরা বাড়িওয়ালা হতে চাই।
গৃহিনীকে শোবার ঘরে ডেকে, ম্যাগাজিন খুলে চিত্রতারকাদের চুল দেখালুম!
রেশমের চামর দুলছে পিঠের ওপর! তোমার ইচ্ছে করে না, অমন চুলের মালিক হতে?
লাজুক লাজুক মুখে বললে, ওরা কত যত্ন নেয়!
তুমিও নাও। তেল মাখা বন্ধ করে মাঝে মাঝে চুলে ব্যাসন ঘষো, তোমার চুলও ওইরকম হয়ে যাবে। তোমার লজ্জা করে না?
মাথার বালিশের খোলটা দেখালুম। খুনের মামলায় কোর্টে যেভাবে অপরাধের চিহ্ন এক, দুই করে দেখানো হয়।
এই দ্যাখো তোমার বালিশ! এই বুড়ো আঙুল টিপসই দেওয়ার মতো চেপে ধরলুম। কেমন? এইবার তুলছি দ্যাখো! এত আঠা, বিছানা ছেড়ে আধ হাত ওপরে উঠে আসছে। উচ্চ সমাজের ফ্যাশানেবল মহিলারা এই জিনিস দেখলে ছি ছি করবেন!
একে বলে শকথেরাপি। এই চিকিৎসায় পাগল ভালো হয়। স্ত্রী তেল মাখা ছাড়লেন। দেখতে, দেখতে ভৈরবীদের মতো চেহারা হল। তা হোক। এ তো ঘরের বউ। বিশ্বসুন্দরী হওয়ার জন্যে তো আর হনুলুলু ছুটবে না।
হার্টের ভয় দেখিয়ে তেল খাওয়াটাও বন্ধ হল। ঝাল, ঝোল, ভাজা খেয়ে বিধবা হতে চাও, না সেদ্ধ খেয়ে সধবা?
নেচার কিওরের বই খুলে দেখিয়ে দিলুম, ভারতবর্ষের জনৈক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কী বলছেন! সাবান চামড়ার পক্ষে ভীষণ ক্ষতিকারক। জল আর হাত, এর চেয়ে উত্তম জিনিস আর কিছু নেই। চামড়া উজ্জ্বল আর মসৃণ থাকবে। সহজে বুড়ো হবো না। আমার কথা নয়। ভারতের এক প্রধানমন্ত্রীর কথা। যিনি নব্বই বছরেও যুবক।
সাবানের খরচও কমে গেল। চল্লিশ পাওয়ারের বেশি আলো কোথাও রাখলুম না। বাঙালির চোখে চালসে ধরবেই, চশমা নিতেই হবে। ষাটের পর ছানি অপারেশন! ইলেকট্রিক বিল যতটা কমে ততই ভালো। মাসে দশ টাকা বাঁচা মানে কুড়িখানা ইট। যা বাঁচবে তাতে বাড়ি তৈরির মাল মশালায় নিয়ে এলে কষ্টকেও আনন্দ মনে হবে। যেমন কাজের মহিলাটিকে ছাড়িয়ে দিলে মাসে ষাট টাকা বাঁচবে। তার মানে এক বস্তা সিমেন্ট। এক বছরে বারো বস্তা। তার মানে একতলার গাঁথনি।
বাথরুমে একদিন মাথা ঘুরে পড়ে গেলুম। ডাক্তারবাবু বললেন, ভয়ংকর লো-প্রেসার মশাই। খাওয়াদাওয়া ঠিক হচ্ছে না। একটু প্রাোটিন খান। সকালে হাফবয়েল। রাতের দিকে হোয়াইট মিট স্ট্যু করে। এক গেলাস দুধ। কাজকর্ম করে খেতে হবে তো। আজ বাথরুমে পড়েছেন, কাল যদি পথে উলটে পড়েন, বাঁচবেন?
এ কান দিয়ে শুনলুম ও কান দিয়ে বের করে দিলুম। যতসব কেতাবি কথা। সারা ভারতের নব্বই ভাগ মানুষই তো তাহলে উলটে পড়বে! উলটে উলটে, কেতরে কেতরেই এদেশ চলবে! এটা কি বিলেত! রিডার্স ডাইজেস্ট পড়লুম, স্রেফ জোরে জোরে নিশ্বাস নিয়ে মানুষ সুস্থ সবল থাকতে পারে। আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের কায়দাটাই জানি না, ল্যাদাড়ুসের মতো বেঁচে আছি। সাঁ করে টান, সিঁ করে ছাড়। আসলে রাতের খাওয়াটা বদহজম হচ্ছে। একাহারী হলে শরীর ঠিক হয়ে যাবে। যে বয়েসের যা। খরচও বাঁচবে। দু'টাকা বাঁচা মানে একটা ভেনটিলেটার।
জগাছার কাছে চার কাঠা পোড়ো জমি ওরই মধ্যে সস্তায় পাওয়া গেল। তিন হাজার টাকা কাঠা। একটু একটেরে। স্টেশান থেকেও যেমন দূর, বাসস্টপ থেকেও তেমন দূর! মাইল দেড়েক হাঁটতেই হবে। তা হোক, হাঁটলে শরীর ভালো থাকে। কত লোক শখ করে হাঁটে। কত বীর হেঁটে বিশ্ব ঘুরে আসছে। বীরভোগ্য বসুন্ধরা।
এদিকে ভিটামিন আর প্রাোটিনের অভাবে কত্তা-গিন্নির গোহাড়গিলের মতো চেহারা হয়ে গেছে। তা যাক। ভুঁড়ো নাদা হয়ে সারা জীবন পরের বাড়িতে বাস করার চেয়ে কঙ্কাল হয়ে নিজের ভিটেয় ঘোরা ঢের ভালো। এই যে রোববার রোববার যখন সস্ত্রীক নিজের জমিতে যাই, মন ভরে ওঠে। মনে হয় টাকে চুল গজিয়ে উঠছে আনন্দে। সত্যিই কি আর গজায়! মনে হয় জায়গাটা আগাছায় ঢেকে আছে। মনুষ্যকৃত্যের গন্ধও পাওয়া যায়। তা যাক। কল্পনায় মানুষ কত কী দেখতে পায়! আমি বাগান দেখি, গোলাপ দেখি, ঝাউ দেখি। আমার বাংলো প্যাটার্নের হলুদ বাড়ি দেখি। আমার স্ত্রী অবশ্য এ সব দেখতে পায় না। মেয়েরা বড়ো বস্তুবাদী।
জগাছা থেকে একদিন ফিরে এসে আমার স্ত্রী দাঁত ছিরকুটে পড়লেন। ডাক্তার বললেন, কী করেছেন মশাই, অ্যাক্যুট অ্যানিমিয়া! ডাক্তারদের যা ধর্ম। তিলকে তাল করেন। কোন বঙ্গললনার অ্যানিমিয়া আর অম্বল নেই! জনৈক কবিরাজ আমাকে অ্যানিমিয়ার টোটকা শিখিয়েছিলেন, নতুন কড়ায় থোড় রেঁধে খাওয়া। এমন কিছু খরচ নয়। এই সময় অ্যালোপ্যাথি করতে গেলে, বাড়ির স্বপ্ন চুরমার হয়ে যাবে। বারো হাজার জমিতে গেছে। বর্ষার আগে লিন্টন অবধি তুলে ফেলে রাখব। তারপর লোন পেলে বাকিটা শেষ করব। দোতলা আমি করব না। একতলা করব, তবে সম্পূর্ণ করব। আধাখ্যাঁচড়া নয়।
বোশেখে ভিতপুজো হয়ে গেল। আমার স্ত্রী কোনওরকমে গেলেন। বাড়ি করার চিন্তাটা আমার কাছে ভিটামিনের মতো হলেও আমার স্ত্রীর শরীরে তার কোনও প্রভাব দেখছি না। সব সময় যেন ধুঁকছে। অসুখ তো মনে। মনটাকে শক্ত করো। বলে বলে আর পারলুম না।
মার খাওয়া কুকুরের মতো ফিরে এল। আসার পথে মন দুর্বল করার কথা। আমার আর বাড়ি দেখা হল না। যাক, তোমরা সুখী হও। আমি ওপর থেকে দেখব। কথা শুনে নিজের চোখেই জল এসে যাওয়ার জোগাড়।
মাসখানেক ছুটি নিলুম। বাড়ি বেশ তরতর করে উঠছে। আমার স্ত্রীর শরীরও তরতর করে ভাঙছে। হাত-পা মুখ ফুলছে। অনেকের বাড়ি সহ্য হয় না। কী জানি বাবা! সত্যি সত্যিই চলে যাবে নাকি! আত্মীয়-স্বজনরা বলতে লাগলেন, কী বাড়ি বাড়ি করছ। আগে স্ত্রীকে বাঁচাও। ছেলে বড় হচ্ছে। সে একদিন স্পষ্টই বলে বসলে, সত্যি মিথ্যে জানি না, আগে ব্রিজ তৈরির সময় প্রত্যেক পিলারের তলায় একজন করে মানুষ বলি দেওয়া হত। বাবার হয়েছে তাই। মায়ের সমাধি তৈরি করছে।
মনে বড় আঘাত পেলুম। বাড়ি কি শুধু আমার জন্যে! ঠিক আছে, তোমরা যখন চাইছ না, তখন কাজ বন্ধ থাক। চিকিৎসাই হোক। জীবন আগে তারপর বাসস্থান। আজকাল চিকিৎসার খরচ তো কম নয়। এই পরীক্ষা, সেই পরীক্ষা, ওষুধ, ইনজেকশন। শেষে বায়ু পরিবর্তন।
এদিকে বর্ষা এসে গেল। ইঁটের গায়ে শ্যাওলা পড়ে এল। আগাছা মাথা তুলেছে। কী আর করা যাবে! রেস্ত ফাঁক। এখনও পাঁচ-ছ ফুট তুললে তবে লিন্টন। তবে ঋণের আবেদন। হাঁটাহাঁটি, ধরাধরি, তবে লোন। শরীরে আর সে শক্তি নেই।
অ্যানিমিয়ার রুগি ক্রমশ সেরে উঠেছে। উঠলে কী হবে, বয়েস তো বেড়েছে। এ বয়েসের শরীর একবার ভাঙলে আর আগের মতো হয় না। পুরোনো বাড়ি যতই রিনভেট করো না, মনের মতো হয় না।
রবিবার একা একা জগাছায় যাই। হাঁটুভর জঙ্গল। গাঁথনির ওপর বসে বসে ভাবি এটাই হবে বসার ঘর, বসার ঘর থেকে বেরিয়ে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা করিডর। দক্ষিণে শোবার ঘর, দুটো। সব ডবল জানালা। ফুল ফুল গ্রিল বসানো। উত্তরে স্টোর, রান্নাঘর, বাথরুম। বেশ খোলামেলা একটা ডাইনিং স্পেস। দুপাশে চওড়া বারান্দা। পশ্চিমে উঠোন। উ:, যা হবে না!
ভাবতে ভাবতে ঘোর লেগে যায়। দিনের আলো নিবে আসে। পায়ের কাছে কাঠবেড়ালি খেলতে আসে, একজোড়া ঘুঘু চরতে আসে, পোকামাকড় লাফায়, সরীসৃপ সরসর করে বেড়ায়। আমার ভয় করে না।
আমি উঁচু গলায় বলি, আমি তোমাদের বাড়িওয়ালা রে ব্যাটা। তিনমাস ভাড়া বাকি পড়েছে। এবার কেস করব।
কিন্তু কোন আদালতে!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন