সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমাদের দেশে কবে
সেই ছেলে হবে।
নিজেকে না বিকিয়ে
বিয়ে করে আসবে।।
বুঝলেন, আমাদের কোনও দাবি দাওয়া নেই। আমি মশাই কশাই নই যে, মেয়ের বাপের ছাল ছাড়াব একটু একটু করে নুন দিয়ে। আপনার মেয়ে যেমন সাজিয়ে দেবেন, ঠিক সেইভাবেই মা আমার ঘরে এসে উঠবে। অনেকে ফ্রিজ দেয়, কালার টিভি দেয়, টেপ ডেক কি স্টিরিও টু ইন ওয়ান দেয়, আয়না ফিট করা স্টিলের আলমারি দেয়, মোপেড বা স্কুটার দেয়। বিশ বাইশ ভরি সোনা দেয়। বোম্বাই খাট দেয়। ফোমের গদি দেয়। এক সিন্দুক বাসন দেয়, শ'খানেক প্রণামির শাড়ি দেয়। যার যেমন দিল। সমুদ্রের মতো হৃদয় যাদের, তারা দেয়। যাদের মুরগি হৃদয়, তারাই কেবল কোঁকোর কোঁকোর ডাক ছাড়ে। ইংরেজিতে একটা কথা আছে মশাই, হোয়ার দেয়ার ইজ উইল, দেয়ার ইজ এ ওয়ে। ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। আমার কোনও দাবি নেই। তবে আপনারও তো একটা প্রেস্টিজ আছে। যার মন বড়, তার মেয়ের মন বড় হবে। যার নিজের মন ছোট, তার মেয়ের মনও ছোট হবে। মেয়ে আসবে মাথা উঁচু করে। পিতৃ পরিচয়ে দুম দুম করে ঘুরবে। সবাই বলবে, দেখতে হবে তো কেমন বাপের মেয়ে। একেবারে ছপপর ফুঁড়ে দিয়েছে। আমাদের কোনও দাবি নেই। আমার নিজের বিয়ের সময় একটা সাইকেল চেয়েছিলুম। শ্বশুরমশাই জামাইয়ের আবদার শুনে হাঁ হাঁ করে হেসে উঠলেন, 'সাইকেল? তুমি ওই বি. টি. রোড দিয়ে সাইকেল চেপে লগবগ লগবগ করতে করতে যাবে! আমার মেয়েকে বাবাজীবন, জেনেশুনে বিধবা হওয়ার রাস্তা পরিষ্কার করে দিতে পারব না। কোনও বাপ তা পারে না।'
তখন আমার মাথায় ধাঁ করে বুদ্ধি খেলে গেল, 'বেশ, সাইকেলের বদলে তা হলে সাইকেল রিকশা দিন। আমি একটা লোক রাখব। রোজ আমাকে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে দেবে। সস্ত্রীক সিনেমায় যাব। আপনার নাতি এলে স্কুলে যাবে। এদিকে ডেইলি চার-পাঁচ টাকা রোজগারও হবে। বেবি ফুডের পয়সা উঠে যাবে।'
শ্বশুরমশাই বললেন, 'তথাস্তু।'
সেই সাইকেল রিকশার পেছনে স্ত্রীর গর্ভধারিণীর নামটি লিখে দিলুম, নিস্তারিণী। সহধর্মিণীর মুখটি উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সেই 'নিস্তারিণী' চেপে আমরা জোড়ে সিনেমায় যেতুম, বাজার করতুম। এখন আমার ষোলোটি রিকশা। চারটি সন্তান। ডেইলি আশি নব্বই টাকা একস্ট্রা রোজগার। একে বলে, রথ দেখা কলা বেচা। মিথ্যে বলব না, আপনার মেয়েকে আমাদের পছন্দ হয়েছে। নাকটা একটু চাপা, তা হোক। বাপের বাড়িতে একটু আয়েসে থাকে, শ্বশুরবাড়ির চাপে গাল দুটো একটু ভাঙলেই নাকটা খাড়া হয়ে উঠবে। চোখ দুটো আর একটু টানা টানা হলে মন্দ হত না। কিন্তু মেয়ে তো আর অর্ডার দিয়ে করানো যায় না। ঈশ্বরের হাত। পয়সা ঢাললে ট্যারারও ভালো বিয়ে হয়। একটা মোটর গাড়ি কি তিনতলা একটা বাড়ি মেয়ের সঙ্গে ধরে দিন। ভালো ভালো পাত্তর হাঁউমাউ করে ছুটে আসবে। বিয়ের বাজারে মেয়ে তো মশাই বাই-প্রাোডাক্ট, আসল তো সোনা, ঘর সাজানো ফার্নিচার, গাড়ি, বাড়ি, ফ্রিজ, টিভি। আমরা আবার অতটা ঠোঁটকাটা নই। চোখের চামড়া আছে।
পরনে চেক চেক লুঙ্গি, গায়ে চিকনের কাজ করা চপল চরিত্রের পাঞ্জাবি। ঠোঁটে নাচছে খঞ্জন পাখির ন্যাজের মতো 'বার্ডসাই'। চোখ দুটো ধূর্ত শৃগালের মতো। সারা সংসার থেকে একটা আঁশটে গন্ধ বেরোচ্ছে। প্রাচুর্য আছে, কিন্তু বড় এলোমেলো, অগোছালো। এমন ঘরে মেয়ে এসে উঠবে। এমন একজন দুঁদে মানুষকে 'বাবা' বলে ডাকতে হবে। এক পরিবেশ, এক সংস্কৃতি থেকে উৎপাটিত হয়ে এসে নতুন মাটিতে শিকড় চালাতে হবে। বিবাহেই নাকি নারী-জীবনের সার্থকতা। মেয়েরা এইটাই নাকি চায়। বাপ হয়ে যা ভাবা যায় না, মেয়েরা নাকি একটা বয়সে তারই জন্যে উৎকণ্ঠিত।
জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ তিনটি নাকি বিধাতার হাতে। কে কোথায় জন্মাবে, তার ওপর নিজের কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। মৃত্যু কোথায় কখন বাঘের মতো ঝপাং করে ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে টুটি চেপে ধরবে, জীবনের অজানা। বিবাহও তাই। কে যে কার সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে এসে গাঁটছড়া বেঁধে বসবে, ভবিতব্যই জনেন। তারপর নাকের জলে, চোখের জলে হবে, না হাসির ফোয়ারা ছুটবে, সে হল হাতে-নাতের ব্যাপার। অভিজ্ঞ মানুষ বলেন, ইয়ে হ্যায় দিল্লিকা লাডড়ু, যো খায়া ও পস্তায়া, যো নেহি খায়া ওভি পস্তায়া। স্বামী-স্ত্রী এমন দুই ধাতু, গলে মিশে ভরনের কাঁসাও হতে পারে, আবার আলাদা তামা, পিতল হয়ে পাশাপাশি সারা জীবন একই সংসারে থেকে বক্সিং লড়ে যেতে পারে। কেউ ছাড়াতেও আসবে না, মাথাও ঘামাবে না। বড় প্রাইভেট অ্যাফেয়ার। সংস্কৃতে বলাই আছে : অজাযুদ্ধে ঋষিশ্রাদ্ধে/প্রভাতে মেঘডম্বরে/দাম্পত্যেব কলহে চৈব/বহবারম্ভে লঘুক্রিয়া। উলটোটা হল : মেঘযুদ্ধে নৃপশ্রাদ্ধে/প্রভাতে মেঘডম্বরে/সাপত্ন কলহে চৈব। লঘবারম্ভে বহুক্রিয়া।
যাঁরা ম্যাচ মেকার্স, তাঁদের আর কী! একজন সর্বস্ব বেচে মেয়ে পার করে ফতুয়া পরে ঘুরবেন। ছেলের বাপ প্রথমে মহানন্দে গোঁফে তা দেবেন। ছেলের বউ এনেছেন। ঘর একেবারে ভরে গেছে। দান সামগ্রীতে পা ফেলা যাচ্ছে না। পৃথিবীতে অনেক রকমের ইতিহাস লেখা হয়েছে। শ্বশুরমশাইদের ইতিহাস লেখা হলে জানা যেত, শুধু মেয়ে বা ছেলের ভাগ্য নয়, শ্বশুরমশাইদেরও ভাগ্য বলে একটা জিনিস আছে। শশ্রুমাতাদেরও আনন্দের কোনও কারণ নেই। পরের মেয়ে বাগে পেয়েছি, এইবার কাদায় ফেলে ঠাসব, শিলে ফেলে দাঁত ভাঙব, ডালকুত্তা দিয়ে ছেঁড়াব। সে গুড়ে বালি। পালটাচ্ছে। তেমন মেয়ে হলে বছর না ঘুরতেই সংসারে ফাটল ধরিয়ে দেবে। হাড়ে দুব্বো গজিয়ে ছেড়ে দেবে। পুত্রটিকে এমন কবজা করে নেবে, তখন তিনি আর বাপ-মাকে চিনতেই পারবেন না। হ্যাঁগা-র পেছন পেছন মিনমিন করে ঘুরবেন। অবশেষে একদিন বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে আলাদা আস্তানায় গিয়ে উঠবে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস।
এ যুগ তো আর সে যুগ নয় যে, মরদ জুতি কো সাথ বাতচিত করেগা। সেই গল্পটি মনে পড়ছে। দুই ভাইয়ের একইসঙ্গে বিয়ে হল। বিয়ের পর বড় আর ছোট দুজনে দু'জায়গায় চলে গেল। অনেকদিন পরে ছোট এল দাদা কেমন আছে দেখতে। দাদাকে দেখেই তার চক্ষুস্থির। এ কী চেহারা! মাথা জোড়া টাক, তোবড়ানো গাল। এ কী রে দাদা? তোর এ হাল কে করলে?
তোর বউদি।
কেন তুমি শাদির পয়লা রাতেই বেড়াল কাটোনি বুঝি?
সেটা কী?
তাহলে শোনো। বিয়ের রাতে বউয়ের বেড়ালটা বড় ঝামেলা করছিল। মিউ মিউ। আমি একবার বললুম, চুপ! শুনল না। তখন তাকে সাবধান করলুম, আমি তিনবার বলব, তারপর অন্য ব্যবস্থা। তিনবারেও যেই শুনল না অমনি তরোয়ালের এক কোপ। বউকে বললুম, আমি তিনবারের বেশি কোনও কথা বলি না। কী কাজ যে হল রে ভাই সেই থেকে! আমার আর কোনও সমস্যাই নেই।
অত্যাচারিতা স্ত্রী যেমন আছে, অত্যাচারী স্ত্রীরও তেমনি অভাব নেই। প্রায়ই শোনা যায়, আগুন জ্বালিয়ে দিলে ভাই! বাড়িতে আর ঢুকতে ইচ্ছে করে না। লেডি ম্যাকবেথ স্বামীকে দিয়ে খুন করালেন, এমনই ছিল তাঁর উচ্চাশা। টলস্টয়ের মতো মানুষ স্ত্রীর ঘ্যানঘ্যানানি আর প্যানপ্যানানির চোটে আত্মহত্যাই করলেন বলা চলে। স্ত্রীয়াশ্চরিত্র দেবা ন জানন্তি কুত: মনুষ্যা। পণপ্রথা সামাজিক অভিশাপ। যারা বউ মারছে, তারা কেউই স্বাভাবিক মানুষ নয়, তারা ক্রিমিন্যাল। যেসব স্ত্রী সব জ্বালাচ্ছে, তাঁরাও সকলেই সাইকোলজিক্যাল পেশেন্ট। এই সব লোভী, নির্বোধ মানব-মানবী আমাদের সমাজের আলসার।
যাঁরা সুস্থ, স্বাভাবিক, তাঁরাও কিছু কিছু প্রথার শিকার। যেমন মেয়ের বাপ মনে করেন, কিছু দিতেই হবে, সকলেই দেয়। না দিলে প্রেস্টিজ থাকে না। ছেলের বাপ মনে করেন, সব ছেলেই তো পায়, আমার ছেলে পাবে না কেন। তা ছাড়া মেয়ে যেহেতু ছেলের ঘরে আসে, সেই হেতু ছেলের বাপের এক ধরনের অহংকার থাকে। অনেকে বলেন, ছেলের বিয়েতে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ কেন? দীর্ঘদিনের বিভিন্ন প্রথায় হরেক রকম গলদ ঢুকে আছে। সংস্কারের প্রয়োজন। চিৎকার বা মিছিলের আন্দোলন অর্থহীন। আইনেও কিছু হবে না। ঘুষ নেওয়া বা দেওয়া সমান অপরাধ। আইনও আছে। তবু ঘুষ বন্ধ হয়নি। কোনও কোনও দেশে ব্যাভিচারীকে ইট মেরে মেরে ফেলার প্রথা আছে। তাতে কী হল? ব্যাভিচার বন্ধ হয়েছে? দেহব্যাবসা বন্ধ করার জন্য আইন আছ, তবু পতিতালয় জমজমাট। মানসিক সংস্কারের জন্যে মানুষকে ধার্মিক হতে হবে। ঘণ্টা নাড়া ধার্মিক নয়। আমরা মোটা মোটা বই পড়তে শিখি, নিজেকে পড়তে শিখি না। ধর্ম হল নিজের সংস্কার। এই যুগেও আমি বহু সুখের সংসার দেখেছি। রোজ সকালের বাজারে আমার সঙ্গে এক দম্পতির দেখা হয়। দশাসই কর্তা, ছোটখাটো গিন্নি। যেন এক জোড়া কপোত-কপোতী। কত্তা জিগ্যেস করেন, হ্যাঁগো আজ ঝিঙে কিনব?
ঝিঙে? ঝিঙে কী হবে?
কেন, পোস্ত দিয়ে।
না, কাল হয়েছে।
তবে থাক। ঢ্যাঁড়শ কিনি, কচি ঢ্যাঁড়স।
ফ্রয়েডকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনার দাম্পত্য সুখের কারণ কী? ফ্রয়েড বলেছিলেন, খুব সোজা। আমার স্ত্রীকে আমি প্রকৃতই অর্ধাঙ্গিনী মনে করি, অ্যান্ড শি ইজ মাই বেটার হাফ। আমার ইচ্ছেটাকে কখনওই তার ঘাড়ে জোর করে চাপাই না।
'মা, তোমার জন্যে দাসী এনেছি' এই সনাতন উক্তি জিভে নেই হয়তো, কিন্তু মনে আছে। যাক, ওসব গোলমেলে ব্যাপারে না যাওয়াই ভালো। কেঁচো খুড়তে সাপ বেরোবে। মিষ্টান্ন ইতরে জনা। তুমি টোপর মাথায় পিঁড়িতে বোসো। আমরা একদিন ভুরিভোজ করে তিনদিন উলটে পড়ে থাকি। তারপর তোমার ম্যাও তুমি সামলাও। বেশি ম্যাও ম্যাও কোরো না। কথায় আছে, প্রথম মাস স্বামী বলে—স্ত্রী শোনে। দ্বিতীয় মাসে স্ত্রী বলে—স্বামী শোনে। তৃতীয় মাস থেকে দুজনেই বলাবলি করে, প্রতিবেশীরা কানে হাত চাপা দিয়ে শোনে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন