সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

একবার একটা জায়গায় গিয়েছিলুম বেড়াতে। তীর্থস্থান। দূরে একটা আকাশ-ছোঁয়া পাহাড়। ইশারায় কাছে ডাকে। আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল প্রাচীন এক বাংলোয়। বাংলোটার নাম জর্জেস কোয়ার্টার। জর্জ নামে এক জার্মান সাহেব এই শতাব্দীর প্রথম দিকে এই পাহাড়ি শহরে এসে বসবাস শুরু করেন। পেশায় ছিলেন ডাক্তার। বিহারের এই অনুন্নত অঞ্চলের জনজীবনের সঙ্গে তিনি মিশে গিয়েছিলেন। সর্বস্ব ত্যাগ করে সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিয়েছিলেন। দরিদ্র মানুষদের মধ্যেই তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর ঈশ্বরকে। একটা সাইকেল চেপে পল্লীতে-পল্লীতে নিরন্ন দু:স্থ মানুষদের চিকিৎসা করে বেড়াতেন। নিজের ইওরোপীয় জীবনের যাবতীয় বিলাস, ব্যসন কেটে ছেঁটে ভারতীয় সন্ন্যাসীদের মতো করে ফেলেছিলেন। জীবনের শেষ প্রান্তে বাংলো ও তৎসংলগ্ন উদ্যান একটি আশ্রমকে দান করে দিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন জর্জসাহেব।
সেই জর্জ কুঠিতে আমার থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ভূতুড়ে একটি বাড়ি। পাঁচিল ঘেরা নিরালা সামান্য একটি আবাসস্থল। ভেঙেচুরে গেলেও পড়েনি, কারণ সেকালের গাঁথনি। চল্লিশ ইঞ্চি দেওয়াল। চুন, সুরকির গাঁথনি। উদ্যান আগাছায় ভরে গেলেও কিছু কিছু ফুল গাছ ফুল ফুটিয়ে বসে আছে। সুন্দর একটি উঠান পাঁচিলের অন্তরালে বুক পেতে রেখেছে। অনুচ্চ একটি দাওয়া তারপরেই মাঝারি মাপের একটি ঘর। নোনাধরা দেওয়াল। অনবরতই বালি ঝরছে চুরচুর শব্দে। বাংলোয় আসার পায়ে চলা পথটি বড় বড় ঘাস আর আগাছায় কখনও প্রকাশিত, কখনও অপ্রকাশিত এক লুকোচুরি। সাপ আছে। দিনে তেমন ভয় নেই। রাতে সাবধানতার প্রয়োজন।
রাতটা যে এত ভয়ঙ্কর হবে, দিনের বেলায় বুঝিনি। আশ্রম, মন্দির অনেক দূরে। লোকালয় আরও দূরে। গাছপালা আর পোড়ো বাংলোর নির্বাসনে আমি একা। সেই সময়টায় চলছিল চাঁদের আলোর রাত। কয়েক দিন আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশের সব ধুলো ধুয়ে গিয়ে নীল নির্মল। চাঁদ প্রায় পূর্ণিমার প্রান্তে। গাছের মাথায়, আকাশ প্রান্তরে আলোর প্লাবন। ঘুম আর আসে না। একে জায়গা নতুন, তার ওপর দু:সহ সেই নির্জনতা। আমার থাকার ব্যবস্থা যাঁরা করেছিলেন, তাঁরা এই নির্জনতার ওপরেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। মনে করেছিলেন, নিরালা অবস্থানে আমি আমার হারিয়ে যাওয়া আমিটাকে খুঁজে পাব।
কোথাও কেউ নেই। বসে আছি একা। চাঁদের আলো চরাচরে বেড়িয়ে ফিরছে। নির্জনতা ভালো, কিন্তু এতটা কি ভালো! হায়! একেই বলে, উলটা বুঝলি রাম! আশেপাশে চোর-ডাকাত অবশ্যই নেই, তবে অশরীরী উপস্থিতির অনুভূতিতে মন পালাই পালাই করছে। বিজ্ঞান ভূত না মানলেও, আমি মানি। দু-একবার দর্শন লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। সেই দর্শনের আতঙ্ক বিজ্ঞানের জ্ঞান দিয়ে সেই মুহূর্তে দূর করতে পারিনি।
দ্বিতীয় কোনও উপায় না দেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলুম রকে। যা হওয়ার তা বাইরেই হোক। বাইরেটাকে বাইরে রাখলে ভেতরটা ভয়ে কুঁকড়ে মরে! সামনেই উঁকি ঝুঁকি! একটু ঘাস, একটি কচি বট, পাথর কুঁচি, তুলো ঘাস। প্রাচীর ঘেরা সেই প্রশস্ত উঠানে লুটিয়ে আছে অকৃপণ চাঁদের আলো। চন্দ্রালোকের নির্জন একটি হ্রদ যেন। আমি বসে আছি একা সেই হ্রদের কিনারায়। মধ্যরাতের সুষুপ্ত পৃথিবী। মাথার ওপর তারার জলসা। শিকারি কালপুরুষের মৃগয়া। হঠাৎ একটা অনুভূতি এল। মনে হল, ওই অবলুণ্ঠিত চাঁদের আলো, আমার মা, বহুকাল আগে যে-মা আমাকে ছেড়ে চলে গেছেন, স্নেহহীন, প্রেমহীন এই পৃথিবীতে আমাকে একা ফেলে রেখে। স্নেহের আঁচল বিছিয়ে এই নির্জনে তিনি আমাকে ডাকছেন যেন, 'খোকা, আয় আয় তোর যত তাপ উত্তাপ সব জুড়িয়ে দি, বড্ড পুড়ে গেছিস!'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন