সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

অনেকদিন পরে বাবার সঙ্গে দেখা হল। লঞ্চ ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন ভিড় এড়িয়ে একপাশে। একমাথা সাদা চুল গঙ্গার বাতাসে উড়ছে। পরনে একটি সাদা ধুতি, সাদা পাঞ্জাবি। চোখে সেই ব্যক্তিত্ববর্ধনশালী কালো ফ্রেমের চশমা। ধপধপে ফরসা রং। দাঁড়িয়ে আছেন একটি ঋজু চন্দন গাছের মতন। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম, ভয়ে ভয়ে জিগ্যেস করলাম, 'কেমন আছেন আপনি?'
বাবা আমার দিকে তাকিয়ে শূন্য হাসি হেসে বললেন, 'পৃথিবীর আর পাঁচটা লোক যেমন আছে আমিও সেইরকমই আছি। তোমরা কেমন আছো? দেখে মনে হচ্ছে খুব একটা ভালো নেই।'
আমি অপরাধীর মতো মুখ করে বললাম, 'আপনি সবই তো জানেন।'
বাবা বললেন, 'পলাশ! মানুষের জীবনে নারী একটা মস্ত বড় ফ্যাক্টর। জানো তো সব সংসারই নারীকে দিয়ে শুরু হয়। তারপর সেই সংসার সুখের হবে কি দু:খের হবে সবই নির্ভর করছে পুরুষ যাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করল তার ওপর। এই ব্যাপারে তোমার লাকটা খুব খারাপ। অথচ তুমি জানো তোমার জন্যে আমি আর তোমার মা খুব ভালো একটি মেয়ে দেখে রেখেছিলাম। আই অ্যাম সরি টু সে, তোমার সেই সময়ে মতিভ্রম হয়েছিল। তোমাদের একালের প্রেম অনেকটা লটারির মতো। লাগলে লেগে গেল না লাগলে ফক্কা। যাক যা হয়ে গেছে তার পোস্ট মর্টেম করে কোনও লাভ নেই। এ কীরকম জানো, তুমি টিকিট কেটে প্লেনে উঠেছ যতক্ষণ না সেই বিমান ডেস্টিনেশানে পৌঁছোচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমাকে আরোহী হয়ে বসেই থাকতে হবে। আই অ্যাম সরি ফর ইউ।'
আমি একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম, 'আপনি যদি আমাকে ছেড়ে চলে না আসতেন তাহলে হয়তো আমার জীবনের চেহারাটা অন্যরকম হত।'
বাবা একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন, 'আমি ছেড়ে এলাম না তোমরা আমাকে তাড়িয়ে দিলে! যতদিন তোমার মা বেঁচে ছিলেন ততদিন কোনওরকমে জোড়াতালি দিয়ে চলেছিল। তুমি কি সেই রাতটা ভুলে গেলে, যে রাতে তোমার স্ত্রী মারমুখী হয়ে বললে—তোমার বাবার আবার বিয়ে দাও। পলাশ, ইঙ্গিতটা খুব নোংরা। সেদিন তুমি কোনও প্রতিবাদ করোনি। জড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলে। আমার ছেলে হয়ে তোমার এই ব্যক্তিত্বহীনতায় মনে হয়েছিল আমার মৃত্যু হয়েছে। কারণ তুমি আমারই সন্তান। যাক এইসব কথার কোনও অর্থ হয় না। তুমি তোমার পথ বেছে নিয়েছ আমি আমার পথ।'
লঞ্চ ঘাটে ভিড়ছে। যাত্রীরা সব নামছে। আমাদের দুপাশ দিয়ে স্রোতের মতো মানুষ যাচ্ছে। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমার জলযান এসে গেছে। আবার হয়তো কোনওদিন দেখা হবে। একটা কথা বলে রাখি, আমার তাঁবুতে তোমার জায়গা আছে। আমার একটাই দু:খ আমার স্ত্রী মারা গেছে তাই আমি বিপত্নীক, তোমার স্ত্রী বেঁচে আছে কিন্তু তুমিও বিপত্নীক! দু:খ কোরো না সবই বরাত।'
বাবা ধীরে ধীরে লঞ্চে গিয়ে উঠলেন। সেই একই ব্যক্তিত্ব সেই একইরকম দৃঢ় চলন সেই একই মনোভাব—যতদিন বাঁচব মাথা উঁচু করে থাকব। করুণার ভিখারি হব না। ধীরে ধীরে লঞ্চ জেটি ছেড়ে মাঝ গঙ্গার দিকে চলে গেল। আমাকে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আমার লঞ্চের অপেক্ষায়। সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে আমি একা। সমস্ত কিছু আমার চোখে ধূসর। আমার জীবনটা যেন একটা খাঁজে আটকে গেছে। এমন সময় পিঠে একটা হাত এসে পড়ল। একটা কণ্ঠস্বর, 'কীরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখছিস নাকি!'
চমকে ফিরে তাকালাম, দেখি মনোজ। আমার অনেক দিনের বন্ধু। আগে দুজনে একই অফিসে পাশাপাশি কাজ করতাম। হঠাৎ আমাকে অন্য জায়গায় বদলি করে দেওয়ায় দেখা সাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আজ আবার হঠাৎ দেখা। মনোজ শুধু আমার বন্ধু নয় আমার অভিভাবকও। তার জগৎ-জ্ঞান আমার চেয়েও অনেক বেশি। অনেক লড়াই করে সে নিজেকে দাঁড় করিয়েছে। সে জানে এই প্রবল জীবনস্রোতে একটুও না টলে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকার কৌশল।
মনোজ বললে, 'কিরে তুই কাঁদছিস নাকি, তোর চোখের কোণে জল!'
আমি বললাম, 'কই না তো।'
মনোজ বললে, 'লুকোচ্ছিস। জানি আমি মানুষের মুখ দেখে মনের কথা পড়তে পারি।'
আমি বললাম, 'তুই ঠিকই বলেছিস। আমি এখন এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি যে জায়গাটাকে ইংরেজিতে বলে, 'ওয়ে ওফ নো রিটার্ন।'
মনোজ বললে, 'ফুঁ মারতে জানিস, গায়ে পিঁপড়ে উঠলে মানুষ যেভাবে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেয়?'
'জিনিসটা যদি পিঁপড়ের চেয়েও ভারী হয়, অনেক ভারী?'
'তাহলে ঘুমিয়ে পড়।'
'ঘুম যদি না আসে?'
'তাহলে বেরিয়ে পড়। বিশাল ভারতবর্ষ কোটি কোটি মানুষ, কোটি কোটি রকমের জীবন। ঘুরে ঘুরে দ্যাখ। দেখতে পাবি আনন্দ আর দু:খ কেমন মিলেমিশে টানা আর পোড়েনে কেমন সুন্দর জামদানি বুনছে। চল কোথাও গিয়ে দুজনে বসি। অনেক ভাঁজ পড়েছে। জল ছিটিয়ে ইস্তিরি করে দিই।'
'আমার লঞ্চ যে এক্ষুনি এসে যাবে।'
'পরেও আসবে, তারপরেও আসবে। আসতেই থাকবে।'
আমরা দুজনে হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ধারে একটা জায়গায় এলাম যেখানে চা আছে, ঝালমুড়ি, আছে নিশ্চিন্তে বসার জায়গাও আছে। সূর্য অস্ত গেছে, আকাশ গোলাপি লাল। আর একটু পরেই অন্ধকারে সব তলিয়ে যাবে। বিভিন্ন ধরনের মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। তাদেরই মধ্যে একজন ফুলের কথা বলছে। কত রকমের জবা আছে, কত রকমের গোলাপ! তিনি যাঁকে বলছেন তাঁর নানা প্রশ্ন। মনে হল দুজনেই ফুলের ভক্ত। আর একজন খুব জোরে জোরে কোনও একটা বিষয় বোঝাতে চাইছেন এমন একজনকে যিনি কিছুতেই বুঝবেন না।
মনোজ দু-ঠোঙা ঝালমুড়ি কিনে নিয়ে এল। জিগ্যেস করলাম, 'তোর পেটে আলসার একবার অপারেশন হয়ে গেছে ঝালমুড়ি খাচ্ছিস কোন আক্কেলে?'
মনোজের সেই একই পোশাক পাজামা আর পাঞ্জাবি। একমাথা কোঁকড়া কোঁকড়া চুল। খাড়া একটা নাক। মুখে সব সময় একটা হাসি। মনোজ বললে, 'মনের আলসার ভালো হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পেটের আলসার সেরে গেছে। আমি এখন হয় পাগল না হয় ছাগল। যা খাই সব হজম হয়ে যায়।'
মনোজ যখন দাদা আর বউদির সঙ্গে থাকত তখন তার জীবনে নানা অশান্তি ছিল। অশান্তির কারণ তার দাদা। মানুষটা রোজ রাতে বেহেড মাতাল হয়ে বাড়িতে ফিরত আর বউদিকে বেধড়ক পেটাত। মনোজ বাধা দিতে গেলেই মনোজকেও দু-চার ঘা লাগিয়ে দিত। আর এমন নোংরা নোংরা কথা বলত যে, মনোজের বউদি কাঁদতে কাঁদতে বলত, আমাকে মেরে ফেলছে ফেলুক তোমাকে কিছু বললে আমি সহ্য করতে পারি না। মনোজ তখন বলত আমাকে, জানিস, লোকে বলে ঘুমের রাত। আমি বলি চোখের জলের রাত। প্রশ্ন করতাম, তুই পড়ে আছিস কেন? মনোজ বলত, একটা মেয়ের ভালোবাসার টানে। খাঁচার পাখি দেখেছিস? খাঁচার গায়ে আকাশ লেগে থাকে, উড়তে গেলেও খাঁচার তারে আটকে যায়। তারপর সে খাঁচার আকাশটাকে নিজের আকাশ করে নেয়। সে তখন বুঝতে শেখে বাসা তার ছোট কিন্তু সেখানে ভালোবাসা আছে। রোজ সকালে একটি মেয়ে এসে শিস দিয়ে গান শোনায়। ভিজে ছোলা দিয়ে যায়, তার কপালে একটা টিপ গোল, তার মুখ ভরা হাসি। সংসারের কত কথা তার কানে আসে। কখনও আত্মীয়স্বজনে বাড়ি ভরে যায় কখনও খালি। রাতের বেলা সেই মেয়েটি এসে তার খাঁচা কালো কাপড়ে ঢেকে দেয়। দুপুর বেলায় কলতলায় নিয়ে গিয়ে চান করায়। এইসব ছোট ছোট প্রাণের বন্ধনে সে বিরাট আকাশকে ভুলে যায়। ভয় পায় অজানা জগৎকে। খাঁচার দরজা খুলে দিলেও সে আর উড়তে চায় না। বুঝলে ভাই এরই নাম 'প্রেমের বন্ধন'।
সেই মনোজ কিন্তু একদিন বেরিয়ে এল। বেরোতে বাধ্য হল। সে যদি আর কিছুদিন ওই বাড়িতে থাকত, সে তার দাদাকে মেরে ফেলত।
তারপর মনোজ কলকাতার উপকণ্ঠে একটা ঘর ভাড়া নিল। একটা ঘর, খোলা একটা বারান্দা। সামনে একটা উঠোন, উত্তরে একটা কলঘর। একটা ইকমিক কুকার আর তার সেতার।
মনোজ ঝালমুড়ি খেতে খেতে বললে, 'দ্যাখ পৃথিবীতে যত বউ আছে তাদের মধ্যে আমার বউ শ্রেষ্ঠ। তার একটা মাথা আছে আর লম্বা একটা শরীর, সেই শরীরে বসানো আছে কিছু তার। তার নাম সেতার। আমি যে সুরে বাজাই সে-ই সুরে বাজে। ফলে কখনও কোনও বিবাদ নেই। আমি বাজাই সে বাজে। তোর সমস্যাটা কি জানিস? তুই ভীষণ আবেগপ্রবণ তার ফলে কখন কোথায় পা ফেলছিস সেইটাই তোর খেয়াল থাকে না।'
'দ্যাখ, গর্তে সকলেরই পা পড়ে তোরও পা পড়েছিল। একমাস অচল হয়ে গিয়েছিলি।'
'অন্ধকারে এক আধবার পা পড়তেই পারে কিন্তু চাঁদের আলোয় দুজনে জড়াজড়ি করে খানায় পড়ে গেলে বলতে হবে মাতাল। মাতালের নেশা ছুটে গেলে সে বুঝতে পারে কোথায় গিয়ে পড়েছে। মনের নেশা থাকে একরাত প্রেমের নেশা কিন্তু অত সহজে কাটে না।'
'তুই কি আমাকে জ্ঞান দিচ্ছিস?'
'এখন তুই জ্ঞান, অজ্ঞানের বাইরে। আমি কিছু কিছু শুনেছি, এখন একটু ঝেড়ে কাশ দিকিনি।'
আমরা উঠে গিয়ে দু'ভাঁড় চা নিয়ে এলাম। ঝালের মুখে চা সে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। মনোজ সাবধানে ভাঁড়টাকে পাশে নামিয়ে রাখল। ঠোঙা ঝেড়ে বাকি মুড়ি গালে ফেলে চিবোতে চিবোতে বললে, 'আমি তোকে ভালোবাসি। তোকে অসহায় দেখলে বড় কষ্ট হয়।'
আমি বললাম, 'এই প্রথম আমি একজনের মুখে শুনলাম যে, আমার জন্যে, তার কষ্ট হয়। আমার আত্মীয়স্বজনদের খুব আনন্দ হয়। তার কারণ আমি ছিলাম আমার বাবার গৌরব। সেই গর্বের জিনিসটি এখন পরিত্যক্ত। ডাবের খোলার মতো ধুলোয় গড়াগড়ি। এর চেয়ে আনন্দের আর কী থাকতে পারে!'
মনোজ চায়ে চুমুক দিয়ে বললে, 'তোর বাবা এখন কোথায়?'
বাবা এখন একটি বৃদ্ধ নিবাসে তাঁর স্থান খুঁজে নিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে তেমন কোনও যোগাযোগ নেই।'
'তোর খারাপ লাগে না?'
'লাগলেও কিছু করার নেই। তুই দড়ির পাক দেখেছিস? খোলার চেষ্টা করলেও পাক খোলে না। টেলিফোনের তারের মতো, ওই অবস্থাতেই থেকে যায়।'
'তোর বিয়েতে তো আমরা সবাই খেতে গিয়েছিলাম তখন তো বোঝা যায়নি কিছু! বেশ ধারালো চেহারার সুন্দরী একটি মেয়ে। আমরা তখন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেছিলাম, পলাশের বেশ পছন্দ আছে। তারপরে কী এমন ঘটল রে!'
'এখন এমন একটা পরিস্থিতি চলছে যে-কোনও দিন আমি খুন হয়েও যেতে পারি।'
'যা:, এ তো খবরের কাগজ পড়া আর টিভি দেখার ফল। দুর্বল মস্তিষ্কের কিছু লোক আজকাল এরকম ভাবে। হয় তাকে কিডন্যাপ করবে, না হয় তাকে খুন করবে। তোকে খুন করে কার কী লাভ হবে বল!'
'শোন, এক একটা উপন্যাস থাকে না, পড়তে পড়তে সব খোলে, এও ঠিক সেই রকম। ধীরে ধীরে দীপা, আমার বউয়ের নাম জানিস নিশ্চয়ই, ধীরে ধীরে দীপার ভেতরটা বেরিয়ে এল। একটা অস্থির চরিত্র। কোনও কিছুই তার ভালো লাগে না। সব সময়ে সে একটা উত্তেজনা খোঁজে। তার ছেলে বন্ধুর সংখ্যাও অনেক। এদের মধ্যে দুজন খুব বদ ধরনের। পয়সা আছে, গাড়ি আছে, মদ আছে, এমন সব যোগাযোগ আছে যার সাহায্যে যে-কোনও পাপ কাজ করে পার পেয়ে যেতে পারে। দীপা এখন এই দুজনের খপ্পরে। আমার অনেক সময় বাড়ি ফিরতে ভয় করে।'
'বাড়িতে আর কেউ থাকে না।'
'অধিকাংশ সময়েই দীপার বাড়ির লোকজনেরা জাঁকিয়ে বসে থাকে। আমি গেলে এমন ভাবে তাকায় যেন উটকো কেউ একটা এসেছে। যতক্ষণ থামি ততক্ষণ কানে আসে বড় বড় চালের কথা। আর দীপার মা হলেন সবজান্তা এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা। একটি অসহ্য ভদ্রমহিলা। স্বামীটিকে দড়ি দিয়ে খাটের পায়ার সঙ্গে বেঁধে রেখেছেন, এক বৃদ্ধ অ্যালসেশিয়ানের মতো। অ্যালসেশিয়ান তবু সময়ে খাবারদাবার পায়, এঁর বরাতে তাও জোটে কিনা সন্দেহ! ভদ্রমহিলা অনেক গুণের অধিকারী। এক সময়ে তিনি ভালো নাচতেন, এক সময়ে তিনি ভালো গাইতেন, এক সময়ে তিনি সিনেমায় অভিনয় করার চান্স পেয়েছিলেন। এখন তিনি তাঁর মেয়েটিকে নাচান। আর ওই দুটো আপদ তাঁর হাতের দোনলা বন্দুক।'
'তুই বেরিয়ে আসছিস না কেন? আমি তো বেরিয়ে এসেছিলাম।'
'তোর বউদি, আর এ তো আমার বউ। যতই অপদার্থ হই বউয়ের ওপর স্বেচ্ছায় আমার অধিকার কেমন করে ছাড়ি। তা ছাড়া আমার টাকার জোর নেই।'
'টাকা থাকলে কী করতিস?'
'টাকা থাকলে ডিভোর্স করতাম। কোর্ট থেকে খোরপোষের যে ব্যবস্থা করে দিত তাই না হয় দিতাম।'
'আমার কি মনে হচ্ছে জানিস? তোর মধ্যে একটা গোলমাল আছে। শ্যাম রাখি না কুল রাখি করতে গিয়ে শ্যামও গেল কুলও গেল।'
'তুই কী বলতে চাইছিস?'
'খুব সহজ কথা। তোর বাবাকেও সন্তুষ্ট করতে পারলি না তোর বউকেও সন্তুষ্ট করতে পারলি না। তোর বউ এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে।'
'কীসের প্রতিশোধ?'
'মেয়েরা যাকে চায় তাকে পুরোপুরি চায়। তুমি তাকে তোমার সবটা দিতে পারোনি তাই সে এখন প্রতিশোধ নিচ্ছে। মেয়েরা ঈর্ষাপরায়ণ হয় জানিস তো! তারা হল মা কালীর জাত। এক হাতে খড়গ অন্য হাতে বরাভয়। তুমি এখন খড়গটাই দেখছ।'
'তুই মেয়েদের কী জানিস তুই তো বিয়ে করিসনি।'
'আমার একটা সেতার আছে রে, সেই সেতারের সব রাগরাগিণীই খেলা করে। আমার অনেক ছাত্রী আছে তাদের দেখে আমি শিখেছি, মেয়েদের চরিত্র কেমন হতে পারে। পোষ মানালে সেতার যেমন তোমার আঙুলে কথা বলবে, সেইরকম পোষ মানাতে পারলে মেয়েরা তোমার জন্যে জান দিয়ে দেবে। আমার বউদি তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। সেরিব্রাল অ্যাটাকে আমার দাদা এখন পঙ্গু। বউদি এখন সংসার সামলায়। প্রয়োজনে দাদাকে দু-পাত্তর ঢেলেও দেয়। দেখলে মনে হবে কোথাও কোনও দু:খ নেই। কিন্তু রাতের বেলা কখনও কখনও আমি তাঁকে কাঁদতে দেখেছি। কোনও কোনও দিন আমার কাছে চলে আসে। এসে বলে ওই রাগটা বাজাও তো যেটা শুনলে খুব কান্না পায়। সেই যে সেই রাগিণীটা যেটাকে তুমি বলেছিলে বিচ্ছেদের রাগিণী! আমি তখন ইমন বাজাই। আর বউদি বসে বসে অঝোরে কাঁদে। এমন শ্রোতা তুই কোথায় পাবি!'
'তুই সাপ খেলানো বাঁশি শেখ না, তাহলে আমার হয়তো কিছু উপকার হতে পারে।'
'আমি তোর বাড়িতে একদিন যাব। দেখি রাজমিস্ত্রী হওয়া যায় কিনা! তোদের ফাটলে পলেস্তারা লাগানো যায় কিনা!'
'বাড়ির ফাটল সারানো যায় মনের ফাটল সারানো অসম্ভব!'
হঠাৎ এক ভদ্রলোক আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। জিগ্যেস করলেন, 'দাদা ইলিশ কি পড়ছে?'
মনোজ বললে, 'আমাদের দেখে কি মনে হচ্ছে আমরা মাছ ধরি!'
ভদ্রলোক বললেন, 'রেগে যাচ্ছেন কেন আমার যে বড় বিপদ ভাই। আমার উকিল বলেছেন এক জোড়া ইলিশ না আনলে তিনি কেসের কিছুই করবেন না। কাল তার কোর্টে অ্যাপিয়ার হওয়ার কথা।'
মনোজ বললেন, 'আপনার কী কেস? সুটকেস না ব্রিফকেস?'
ভদ্রলোক বললেন, 'আমার খুব সাংঘাতিক কেস। হাসপাতালে থেকে আমার ছেলে চুরি হয়ে গেছে।'
মনোজ বললে, 'সে আবার কী?'
ভদ্রলোক বললেন, 'একটু বসতে পারি তাহলে পরিষ্কার করে বলতে পারব।'
মনোজ বললে, 'হ্যাঁ বসুন না।'
মনোজ একটু সরে এল। ভদ্রলোক বসলেন। বসে বললেন, 'আমার পরপর তিনটে মেয়ে। এই চতুর্থটা একটা ছেলে। তারপরে সেই শ্রীকৃষ্ণ কেস! রাত্রির বেলা ছেলেটাকে মায়ের পাশ থেকে সরিয়ে নিয়ে একটা প্যান্তাখ্যাঁচা মেয়ে শুইয়ে দিয়ে চলে গেল। তার চিৎকারে মশাই বাড়িতে টেঁকা যায় না। আর আমার বউ বলছে, এটা কার মেয়ে! দু-দুবার বাড়ির বাইরে ফেলে দিয়ে এলাম দু-দুবারই পরহিতব্রতীরা সেটাকে তুলে এনে যথাস্থানে রেখে দিয়ে চলে গেল! সে বেটির তো আর কোনও কাজ নেই। সে রকে শুয়েও কাঁদে ঘরে শুয়েও কাঁদে। এইবার পার্টির লোকেরা এসে শাসিয়ে গেছে গণধোলাই দিয়ে আমার চোদ্দোপুরুষের নাম ভুলিয়ে দেবে।'
মনোজ বললে, 'আপনি কী করে বুঝলেন, আপনার ছেলে হয়েছিল?'
ভদ্রলোক বললেন, 'আমার বউ বলেছে! যার পেট ফুঁড়ে বেরিয়েছে সে জানে না!'
মনোজ বললে, 'আপনি বউয়ের কথায় নাচছেন! চার নম্বরটা মেয়ে হলে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তো তাকে মেরে ফেলবে! সেই ভয়েই তিনি হয়তো এই গল্প ফেঁদেছেন!'
ভদ্রলোক বললেন, 'আরে নারে মশাই, আমার শালি নিজে টেস্ট করে এসেছে। বললে ফুটফুটে একটা ছেলে। বললে জামাইবাবু! এ ছেলে বড় হলে বিদেশে ক্রিকেট খেলতে যাবে। শচিন তেণ্ডুলকরের মতো মাথায় কোঁচকানো চুল। গাভাসকারের মতো চোখ আর কব্জি দুটো কপিল দেবের মতো।'
মনোজ বললে, তা আপনি তখন কী করলেন?
'থানায় গিয়ে ডায়েরি করে এলাম। অনুসন্ধান শুরু হল। দেখা গেল আমার ছেলেটাকে আর একজনের কোলের কাছে শুইয়ে রেখেছে। সে আবার নন-বেঙ্গলি।'
'তা পুলিশ এখন কী বলছে।'
'পুলিশ তো কেস চালু করে দিয়েছে। তবে বড়বাবু বলছেন আপনি দু-বছর অপেক্ষা করুন ছেলেটার দিকে একটু নজর রাখুন। যেই তার কথা ফুটবে যেই সে বাংলা বলবে ক্যাঁক করে ধরবেন। তখন আর ছাড়াছাড়ি নেই। দশটি বছর ঘানি ঘুরিয়ে ছেড়ে দেব।'
'তাহলে এখন কেন ইলিশ করে উতলা হচ্ছেন?'
'আরে মশাই দু-বছর এই মেয়েটার সানাই কে শুনবে!'
'না:, আপনার সমস্যার কোনও সমাধান নেই।'
ভদ্রলোক ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন, 'তাহলে খামোখা আমার সময় নষ্ট কেন করলেন?' একটাই তো উত্তর ছিল। ইলিশ দেখেছি ইলিশ দেখিনি। বাঙালির মশাই এই এক রোগ, সব যেন খবরের কাগজের রিপোর্টার। মুখের কাছে চোঙা এগিয়ে ধরলেই হল!'
মনোল বলল, 'বাঙালির ওপর যদি আপনার এতই রাগ তাহলে আপনার ছেলেটা অবাঙালি মায়ের কাছেই মানুষ হোক না!
ভদ্রলোক হঠাৎ অসম্ভব শান্ত হয়ে গেলেন। বন্ধুত্বের গলায় বললেন, 'আচ্ছা বলতে পারেন মানুষ কী করতে জন্মায়?'
মনোজ বললে, 'মানুষ তো আর জন্মায় না মানুষ জন্মে যায়। একটা ছেলে একটা মেয়েকে বিয়ে করে। তারপর দিনকতক আদরা-আদরি চলে, তারপর ট্যাঁ করে কান্না, এ তো কিছু করার নেই মশাই। যতদিন না আদর বন্ধ হচ্ছে ততদিন মানুষের জন্মও বন্ধ হবে না। জন্মাতেই থাকবে জন্মাতেই থাকবে, দেশ ভরতি তেলাপিয়া মাছের মতো দাপাদাপি ঝাঁপাঝাঁপি মারামারি।'
ভদ্রলোক অসহায়ের মতো মুখ করে বললেন, 'কথাটা বেশ জুতসই বললেন মশাই। আচ্ছা আপনি কী করেন?'
মনোজ বললে, 'বাজনা বাজাই।'
'বাজনা বাজিয়ে আজকাল সংসার চলে?'
'ওইজন্যে তো সংসার করিনি। নো সংসার, ওনলি বাজনা। আপনি কী করেন?'
'আমার ভুঁড়িটা দেখে বুঝতে পারছেন না! আমি ক্ষীরের ব্যাবসা করি—খোয়া ক্ষীর।'
'রোজ কতটা করে ক্ষীর খান?'
'ক্ষীর খাব কেন, ক্ষীরের গন্ধ শুঁকে শুঁকে মোটা হয়ে গেছি। সব টনিকের সেরা টনিক হল ময়রা টনিক। দেখুন আমার বাবার ভুঁড়ি আমার মায়ের ভুঁড়ি আমার ভুঁড়ি আমার বউয়ের...'
মনোজ বললে, 'থাক থাক থাক। বুঝতে পেরেছি আপনার সবাই ভুঁড়িয়াল। ওই ঘড়িয়ালের মতো।'
ভদ্রলোক বললেন, 'বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেল বলুন! বেশ লাগছে না! আপনার ওই বন্ধুটি কেবল মুখ ভার করে বসে আছেন।'
মনোজ বললে, 'ও যে একটু ভারী ধরনের মানুষ। সারাদিনে গোটাচারেক কথা বলে আর একবার একটু ফিক করে হাসে। সে ওই দাড়ি কামাবার সময়ে নিজের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে একটু হেসে বলে—হাউ আর ইউ!'
ভদ্রলোক বললেন, 'উত্তরটা কে দেয়?'
'উত্তর কেউ দেয় না, নো আনসার। নো রিপ্লাই।'
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ তাকিয়ে বললেন, 'আপনার বন্ধুর জীবনে কোথাও একটা গোলমাল আছে।'
মনোজ বললে, 'কী গোলমাল বলে আপনার মনে হয়?'
ভদ্রলোক আপন মনেই বেশ তদগত ভাবে বলতে লাগলেন, 'বিয়ে উনি করেছেন, ছেলেপুলে হয়নি, স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা নেই।'
মনোজ বললে, 'কী করে বললেন?'
'অ্যায়, কী করে বললাম! সে বলতে গেলে তো আমাকে অনেক দূরের কথা বলতে হয়।'
মনোজ বললে, ঠিক হ্যায়, আপনি দূর থেকেই বলুন।'
'আরে মশাই, আমি গেছি ক্ষীরভবানীতে। আমার নাম জানেন? আমার নাম ক্ষীরমোহন। ক্ষীরমোহন গেছে ক্ষীরভবানীর কাছে। আমারও ক্ষীর তাঁরাও ক্ষীর। ক্ষীরে ক্ষীরে মিল হয়ে গেল। মন্দিরে বসে আছি কেমন একটা ঘোর লেগে গেল। হঠাৎ শুনলাম, মা আমার কানের কাছে বলছেন—বাবা ক্ষীরমোহন, তোমাকে আমি একটা শক্তি দিলুম। বললাম কী শক্তি মা? একজন এইরকম শক্তি পেয়ে বড়বাজারে মুটেগিরি করছে। তার মতো মোট বইবার শক্তি আর কোনও মুটের নেই। মা বললেন,—ভয় পাসনি বাবা, আমি তোকে এমন শক্তি দিচ্ছি যে শক্তিতে তুই মানুষের মুখ পড়তে পারবি। মশাই সেই থেকে আমি মুখ দেখলেই মন পড়ে ফেলি।'
মনোজ বললে, 'আমার মুখটা পড়ুন তো!'
ভদ্রলোক এক গাল হেসে বললেন, 'পড়তে কি আর বাকি রেখেছি ভাই!'
মনোজ বললে, 'আর একবার চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে পড়ুন পরীক্ষার পড়ার মতো।'
ভদ্রলোক বললেন, 'আপনার জীবনেও গভীর দু:খ।'
মনোজ বললে, 'ধ্যার মশাই, ও আপনি আর পাঁচটা গ্রহরত্ন মার্কা জ্যোতিষীর মতো বললেন। সব গোলমাল আপনার ওই পেটে। পেটরোগা বাঙালির পেট ছাড়া তো আর কিছু নেই!'
ভদ্রলোক মন:ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, 'এতবড় কথাটা যখন আপনি বলতে পারলেন তখন আমাকেও একটা চমকদার কিছু বলতে হয়। মশাই আপনি যে আপনার বউদিকে ভালোবেসে বসে আছেন!'
মনোজ খপ করে ভদ্রলোকের মোটা কব্জির কাছটা ধরে বললে, 'অ্যায়—কি বলছেন আপনি!'
ভদ্রলোক অন্য রকমের একটা গলায় বললেন, 'ব্রাদার, মনের খবর ফাদারও জানে না। ভালোবেসেছেন বেশ করেছেন, বাড়িছাড়া হয়েছেন সোভি আচ্ছা। লেকিন বাজনাটা ঠিক মতো শিখতে পারবেন। ভালো হবে ভালো হবে। গাছের একটা ডাল কাটলে বেশ ভালো পাতাটাতা বেরোয়।'
মনোজ বললে, 'আচ্ছা বলুন তো আমি কতদিন বাঁচব?'
ভদ্রলোক মনোজের মুখের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। রাতের আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। ভারী সুন্দর একটা আলো গঙ্গার জলে, পিচ বাঁধানো পথে, গাছের পাতায়। গঙ্গার এই দিকটা ক্রমশই আরও মোহিনী হয়ে উঠবে।
ভদ্রলোক আচমকা উঠে দাঁড়ালেন। মনোজের হাত দুটো ধরে নির্বাক তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর খুব দ্রুত জেটি পেরিয়ে একটা লঞ্চের ভেতর ঢুকে গেলেন। ভদ্রলোকের দুচোখে ছিল টলটলে জল।
আমি বললাম, 'কী হল বল তো!'
মনোজ উঠে দাঁড়িয়েছে। হাঁস যেভাবে পালক ঝেড়ে জল ঝরায় সেইভাবে শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললে, 'যা বোঝার আমি বুঝেছি। ওটা আমার কাছেই থাক পরে মেলাব। চল আজ তোর বাড়ি যাই। তোর বউয়ের সঙ্গে এক রাউন্ড রাগ-রাগিণীর কথা বলে আসি।'
মনোজের হাতে অল্প চাপ দিয়ে বললাম, 'বল না রে, ভদ্রলোক কী বলতে চাইলেন!'
মনোজ পরিবেশ ভুলে গগন ফাটান হাসি হেসে বললে, 'ডোন্ট বি সেন্টিমেন্টাল মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড। একালের জীবন টু হুইলারের জীবন, তেড়ে চালাও ঝেড়ে উঠে পড়ো। আবার চালাও অ্যান্ড ক্র্যাশ—সেতারের জীবন রে, জোড় ঝালা তেহাই সম, ব্যস আসর শেষ! দর্শকরা বাড়িতে, মঞ্চ অন্ধকার!
মনোজ হাঁটতে লাগল একটা রাগের মুখ ভাঁজতে ভাঁজতে।
বড় রাস্তা থেকে ডানদিকে বাঁক নিলেই দু-একখানা বাড়ির পরে আমাদের বাড়ি। মনোজ বললে, 'আগে এদিকটা বেশ ফাঁকা ছিল, অনেক গাছপালা, এখন দেখছি ঘিঞ্জি হতে শুরু করেছে। সেই খেলার মাঠটা কোথায় গেল রে! যে মাঠে বসে আমরা চাঁদের আলোয় গল্প করতাম!'
আমি বললাম, 'নেই রে! সব টুকরো টুকরো হয়ে দেখছিস না কত বাড়ি, কত লোক!
মনোজ বললে, 'তা তো হবেই, আমি তো অনেকদিন পরে আসছি। সেই তোর বউভাতে আর আজ।'
বাড়ির গেট খুলে ঢুকতে ঢুকতে মনে হল অস্বাভাবিক নীরবতা। যেন শ্মশান। কোথায় গেল সব! অন্যদিন ঘরে ঘরে আলো থাকে। টিভি চলে। বহু কণ্ঠস্বর শোনা যায়। আজ মাত্র একটা আলো! ভুতুড়ে অন্ধকার। আমি ভয়ে ভয়ে মনোজের মুখের দিকে তাকালাম। মনোজ জিগ্যেস করলে, 'কী হল!'
'সন্দেহ হচ্ছে, ঠিক বাড়িতে এসেছি তো!'
যাই হোক কলিংবেল টিপলাম। দূরে কোথাও বাজল। আমাদের হারানের মা দরজাটা খুলে দিয়ে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল। আমি আর মনোজ থমকে দাঁড়িয়ে আছি। প্রশ্ন করলাম, 'কী হল কাঁদছ কেন!'
হারানের মা বললে, 'কিছুক্ষণ আগে একটা ফোন এল, আপনার বাবামশাই হাসপাতালে।'
'সে কি! বাবার সঙ্গে তো আমার দেখা হল!'
'তিনি গাড়ি চাপা পড়েছেন। বউদিমণি পড়ি কি মরি করে একটা ট্যাক্সি ধরে বেরিয়ে গেছে।'
'সঙ্গে?'
'কেউ না। একা।'
'কোন হাসপাতালে, তুমি জানো?'
'হাওড়া জেনারেল হাসপাতাল।'
মনোজ আমার হাত ধরে একটান মেরে বললে, 'কুইক কুইক।'
আমরা মোড়ের মাথায় এসে সঙ্গে সঙ্গেই একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম—'ভাই একটু জোরে চালান।'
মনোজ আমার হাঁটুতে চাপ দিয়ে বললে, 'একদম উতলা হবি না। স্টেডি থাক।'
আমি বললাম, 'কেমন একটা অদ্ভুত লাগছে! বাবার সঙ্গে আজই আমার দেখা হল, কত কথা হল। অ্যাক্সিডেন্ট! আরও অবাক লাগছে দীপা দৌড়েছে ঝড়ের বেগে!'
ট্যাক্সির অন্ধকারে মনোজ একটু শব্দ করে হাসল।
জ্যাম ঠেলে হসপিটালের আউটডোরে শুনলাম বাবা এমারজেন্সিতে। আমি আর মনোজ এমারজেন্সিতে যেতেই দীপার সঙ্গে দেখা হল। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে এক পাশে। তার মুখে একটা কঠিন কঠোর ভাব।
আমি বললাম, 'দীপা!'
দীপা চাপাস্বরে বললে, 'স্কাউন্ড্রেল।'
আমি চমকে উঠলাম, 'কে স্কাউন্ড্রেল আমি!'
মনোজ আমার মনের ভাব বুঝে দীপাকে জিগ্যেস করলে, 'গুরুতর?'
দীপা বললে, 'দেহটা প্রায় চুরমার হয়ে গেছে।'
দীপার চোখ দিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে জল বেরচ্ছে। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা। দীপা আমাদের কারও সঙ্গে একটিও কথা বলল না। রাত যখন ভোর হয় হয় তখন বাবাকে অপারেশন থিয়েটার থেকে বেডে নিয়ে গেল। এক লহমার জন্যে তাঁর প্রশান্ত মুখখানি দেখতে পেলাম। ডাক্তারবাবু বললেন, 'ফিফটি ফিফটি।'
যতক্ষণ না জ্ঞান ফিরছে ততক্ষণ আমাদের যাওয়ার উপায় নেই। আমি বললাম, 'আমি আছি, মনোজ তুই দীপাকে নিয়ে বাড়ি যা।'
দীপা ঘুরে দাঁড়িয়ে বললে, 'তোমরা বাড়ি যাও। যতক্ষণ না বাবার জ্ঞান ফিরছে ততক্ষণ আমি এক পা-ও নড়ব না।'
মনোজ দৃঢ় গলায় বললে, 'আমি বলছি বাবা ভালো হয়ে যাবেন। আমি যা বলি তা মিথ্যে হয় না।'
দীপার চোখে আবার জল, 'আপনার কথা যেন সত্যি হয়। আমার একটা কথা তাঁকে শোনাতে চাই।'
মনোজ বললে, 'একটা কথা কেন তুমি অনেক কথা তাঁকে শোনাতে পারবে। আর তুমি তাঁর পাশে বসে তাঁর সেবা করবে, গল্প করবে গান শোনাবে।'
দীপা যেন স্বপ্ন দেখছে, 'আমরা পুরীতে যাব। বেলাভূমিতে বসে থাকব। সানসেট দেখব। আমাদের পায়ের কাছে ঢেউ আছড়ে আছড়ে পড়বে। ফেলে রেখে যাবে নানা রঙের ঝিনুক। বাতাসে বাবার মাথার চুল উড়বে। চশমার কাচে জলকণা জমবে। ধীরে ধীরে রাত বাড়বে। আমরা তখন হাঁটতে হাঁটতে স্বর্গদ্বারের দিকে এগিয়ে যাব। কত আলো, কত লোক, রঙিন ছাতা...' দীপার কথা শেষ হল না। সে মনোজের বুকে মুখ গুঁজে অদ্ভুত একটা কথা বলল,—'আমি যে ওই লোকটাকে ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি। আমি যে ওই লোকটাকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম, ওই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব ওই দু-চোখ ভরা প্রেম, তাই তো আমার এত প্রতিহিংসা! আমি যে একটা মেয়ে।'
মনোজ তার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললে, 'দীপা! স্বামী, পিতা, পুত্র সবই তো এক। তুমি তো মা, মা কালীর গলায় মুণ্ডু মালা দেখেছ, কত রকমের মুণ্ডু। সেইরকম তোমাদেরও এক হাতে পুত্র এক হাতে স্বামী এক হাতে পিতা, তোমরা তো জীবন্ত দশভুজা!
ঠিক একমাস পরে বাবা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে এলেন। একটা পা মনে হয় আর ভালো হবে না। একটা ক্রাচ নিয়ে হাঁটতে হচ্ছে। আর একটা হাত দীপার কাঁধে। আমার হাতে বাবার ব্যাগ সুটকেস। বৃদ্ধ নিবাসে আর নয়। তাঁর ছেড়ে যাওয়া তাঁরই বাড়িতে তিনি প্রবেশ করতে করতে বললেন, 'ফুল গাছগুলো বেশ বড় বড় হয়েছে। নারকেল গাছটা আর কয়েকদিনের মধ্যে ফল দেবে। সবই আমার দীপার যত্নে। বাড়িটাকে এবার রং করাতে হবে কী বল!'
দীপা বললে, 'আপনার জন্যে তিনতলায় একটা বড় হলঘর করব। সেখানে আপনার লাইব্রেরি হবে। আর মনোজদা এসে আমাদের সেতার শোনাবে।'
দরজার কাছে হাসি হাসি মুখে হারানের মা এসে দাঁড়িয়ে আছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বাবা আমার দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে বললেন, 'বুঝলে! সবই ভুল বোঝাবুঝি। আমরা কেউ কাউকে চিনি না। আমরা বলি, সব জানি, কিন্তু কিছুই জানি না।'
বাবা দোতলার বারান্দায় তার সেই প্রিয় ডেক চেয়ারটায় বসলেন।
মনোজ তিন-চারদিন হল আসছে না। দীপাকে বললাম, 'আমি মনোজকে ডেকে আনি। সে আজ আমাদের সঙ্গেই থাকবে।'
দীপা বললে, 'এখনই যাও। আসার সময়ে খুব ভালো বড় বড় ল্যাংড়া আম কিনে আনবে। বাবা আম খেতে খুব ভালোবাসেন।'
গৌরীবাড়ি লেনে মনোজের আস্তানায় ঢুকে দেখলাম মনোজের ঘরের দরজায় বিশাল একটা তালা ঝুলছে। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি, দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক ভদ্রমহিলা প্রশ্ন করলেন, 'কাকে চাই?'
আমি বললাম, 'মনোজকে।'
ভদ্রমহিলা বললেন, 'মনোজবাবু হাসপাতালে ভরতি হয়েছেন।'
'সে কি! কী হয়েছে?'
ভদ্রমহিলা বললেন, 'পেটে ক্যানসার।'
জিগ্যেস করলাম, 'কোন হাসপাতালে?'
ভদ্রমহিলা বললেন, 'চিত্তরঞ্জন।'
তালাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মনে হল, এ তালা আর খুলবে না। মনে পড়ল গঙ্গার ধারে সেই রাতে ক্ষীরমোহনবাবুর চোখের জল। ঘরের মধ্যে নীরবে প্রতীক্ষা করে থাকবে মনোজের সেতার।
চিত্তরঞ্জনে, ক্যানসার ওয়ার্ডে মনোজের বেডের কাছে গিয়ে দেখলাম মনোজের মাথার কাছে বসে আছেন তাঁর বউদি। তাঁর একটা হাত মনোজের কপালে। মনোজ আমাকে দেখে একগাল হেসে বললে, 'ওই টুলটা টেনে নিয়ে বস।'
আমার হতভম্ব মুখের দিকে তাকিয়ে মনোজ হাসতে হাসতে বললে, 'অনেকটা এগিয়ে গেছি রে, আর আমাকে ধরতে পারবি না। শোন, তুই একদিন দীপাকে নিয়ে আমার ওই ঘরটায় যাবি। সেখানে একজন বন্দী হয়ে আছে। তাকে মুক্ত করে তোদের বাড়িতে নিয়ে যাবি। দীপা বলেছে, একটা ভেলভেটের ঢাকনা করে দেবে। সেতারটাকে তোদের নতুন যে ঘরটা হবে তার একটা কোণে সুন্দর করে দাঁড় করিয়ে রাখবি। মনোজের সেতার। তার পাশে সুন্দর মা সরস্বতীর মূর্তি রাখবি। মায়ের মুখটা হবে দীপার মতো। দীপাকে বলেছিলুম তাকে আমি সেতার শেখাব। সে তো আর হল না ভাই। সেতারটা তার কাছে রেখে গেলাম, একজন ভালো ওস্তাদ ধরে দীপাকে সেতার শেখাবি।'
মনোজের কপালে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল পড়ল। মনোজের বউদি কাঁদছেন। মনোজ বললে, 'কান্নাকাটি আমার একদম ভালো লাগে না। আমি চাই হাসির পৃথিবী। আমি চাই ভাব ভালোবাসার পৃথিবী। আমি চাই সুরের পৃথিবী। আমি আবার আসব। আসব এইরকম একজন বউদির জন্যে, আসব এইরকম একজন বন্ধুর জন্যে। আসব ওইরকম এক ধারালো বন্ধু-স্ত্রীর জন্যে। আসব ওইরকম এক পিতার জন্যে।'
মনোজের মুখটা সামান্য বিবর্ণ হল। চোখ দুটো বিস্ফারিত হল। পরক্ষণেই বললে, 'আমার পেটে হোমের আগুন জ্বলছে রে!' ও কিছু না, আরও বড় আগুনে এ আগুন ডুবে যাবে। ভাবিস না কিছু। একটা কথা জেনে রাখ, আমরা বুঝি না বলেই এই পৃথিবীতে, এই ভালোবাসার পৃথিবীতে, এই আনন্দের পৃথিবীতে এত অশান্তি। আহা! তা হবে না কেন! আকাশের কথাই ভাব না, কখনও নীল, কখনও মেঘলা, কখনও কালো। জেনে রাখ জল ঝরে গেলেই আবার সেই নীল। সমুদ্র নীল, আকাশ নীল, আবার সাপের বিষও নীল। সবই ভাই নীলের খেলা। আমাকে একটা নীলকণ্ঠ মহাদেবের ছবি এনে দিবি?'
সিস্টার ঘরে ঢুকে বললেন, আপনারা এবার আসুন এঁকে এইবার কেমোথেরাপি করা হবে। একপাশে গিয়ে জিগ্যেস করলাম, 'চান্স?'
সিস্টার বললেন, জানলার বাইরে আকাশের দিকে আঙুল তুলে, 'তিনিই জানেন!'
আমি আর মনোজের বউদি রাস্তায় নেমে এলাম। আবার ট্যাক্সি। দুজনে উঠে পাশাপাশি বসলাম। বউদি আমায় জিগ্যেস করলেন, 'মনোজ খুব আইসক্রিম খেতে ভালোবাসে। আইসক্রিম কি দেওয়া যাবে না?'
আমি বললাম, 'ডাক্তারবাবুকে জিগ্যেস করব।'
বউদি বললেন, 'ও তো পেটে কিছু রাখতে পারছে না।'
বউদি হঠাৎ হুহু করে কাঁদতে শুরু করলেন। জড়ানো গলায় বললেন, 'একটা মেয়ে মনোজকে খুব ভালোবাসে। এখনও সে বিয়ে করেনি। মনোজ আমার জন্যেই বিয়ে করল না। আচ্ছা বলুন তো এই ভালোবাসা কি অপরাধ! মনোজ চলে গেলে আমি কী করব?'
আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। নিরেট, নির্দয় লোহার গাড়ি কলকাতার পথ পিষে উত্তর কলকাতার দিকে ছুটছে। দুপাশে ব্যস্ত লোক। কোথা থেকে কোথায় যে চলেছে। মৃত্যুর ছায়া যে দেখেছে তার কাছে এই পৃথিবী যেন মানুষের পুতুল খেলা। সেই চিরন্তন প্রশ্ন, কে খেলায় আমি খেলি বা কেন, সেই চিরন্তন প্রশ্ন, কোথা হতে আমি কোথা ভেসে যাই!
বউদি তাঁর একটা হাত আমার হাতে আলতো করে রাখলেন। লম্বা লম্বা আঙুল। একটা আঙুলে লাল পাথরের আংটি। বউদি করুণ গলায় বললেন, 'মনোজ চলে গেলেও আপনি মাঝে মাঝে আসবেন তো? আপনাকে দেখলে মনোজের কথা মনে পড়বে।'
আমি কোনও উত্তর দিতে পারলাম না। ভিজে ভিজে দুটো চোখের দিকে নির্বাক তাকিয়ে রইলাম। বর্ষার আকাশ দেখে মনোজ বলেছিল আয় পলাশ, তোকে মিঞা মল্লার শোনাই।
গাড়ি ডান দিকে বাঁক নিল। আর একটু পরেই বউদি নেমে যাবেন। তখন আমি একা। শুধু এইটুকুই বলতে ইচ্ছে করল সেই স্রষ্টাকে, কি অদ্ভুত তোমার রচনা! দ্বিপদ এই মানুষের এক পায়ে জন্ম এক পায়ে মৃত্যু! ব্র্যাভো ব্র্যাভো!—
চালক জিগ্যেস করলেন, 'কিছু বললেন?'
বউদির হাতটা আমার হাতের ওপর চেপে বসে আছে। একটা লেডিস ঘড়ি। সময়ে কাঁটা সেই ঘড়িতেও সমানে ঘুরছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন