সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

এদের কথায় কথায় কেবল খোঁটা, আমাদের কালে এই ছিল, সেই ছিল, এই হত, সেই হত।
তোমাদের কাল কি কাল ছিল! দাসীদের কাল। পায়ে জুতো নেই। এক গলা ঘোমটা। ঘোমটার আড়ালে, পেতনি আছে না উর্বশী আছে বোঝার উপায় ছিল না। বউ না কমোড! যদি জিগ্যেস করা হয়, সিমলা গেছেন, নৈনিতাল, কুলু মানালি, গোপালপুর অন সি, দাজিলিং? না। তাহলে গেছেন কোথায়? একবার তারকেশ্বরে, একবার শ্রীক্ষেত্রে আর একবার কাশীধামে। কেদার বদরী যাওয়ার কথা হয়েছিল, তা হাঁটুতে বাত এসে গেল। 'আমাদের কালে তোমাদের মতো এমন বারমুখো ছিলুম না মা। সংসারই ছিল আমাদের তীর্থক্ষেত্রে, নব বৃন্দাবন। সত্যনারায়ণ, জন্মাষ্টমী, তালের বড়া, পিঠে, শীতের বড়ি, আমের আচার, কাঁথা সেলাই, এইসব নিয়েই আমাদের জীবন আনন্দে কাটত। তোমাদের মতো এমন হ্যাটং হ্যাটং করে বাজারে গা-গতর আধখোলা করে ঘুরতে হত না! আমাদের কত ইজ্জত ছিল! বাসে ট্রামে কেউ পাছায় চিমটি, কি বুকে কনুই মারতে পারত!'
বুড়ির কথা শুনলে গা জ্বলে যায়। আমাদের মাথার চুল দেখেছ! যেন চামর! আমাদের কালে বিউটি পারলার ছিল! এতরকম শ্যাম্পু আর কন্ডিশনার ছিল! হেয়ার ড্রায়ার ছিল! গায়ের স্কিন দেখো, যেন কার্পেট! মুখ যেন ভেলভেট। পায়ের গোড়ালি দুটো যেন ছাঁচে ঢালা মোম। রাস্তায় বেরলে লোকের যদি মাথাই না ঘুরে গেল তাহলে আর কী হল! তোমাদের কালের কথা আর নাই বা বললে। পেটে ছেলে, পিঠে ছেলে, কাঁকে ছেলে, কাঁধে ছেলে। শতপুত্রের জননী হও, মা জননী। তিরিশেই যৌবন খুইয়ে হাড়ের কাঠামো। আর তোমাদের কত্তারা তখন গায়ে গতরে মেয়েছেলের লোভে স্ত্রৈণ থেকে স্ত্রৈণ।
আমাদের কালে 'হামভি মিলিটারি, তোমভি মিলিটারি।'
তাহলে মানুষ হওয়া কাকে বলে?
ওই যে! বিলেত ফেরত সাইন্টিস্ট ছেলে একদিন বৃদ্ধা মাকে বললে, 'শোনো পনেরো বছর তোমাকে পুষেছি, আর সম্ভব নয়। আমার বউ তোমাকে একদম সহ্য করতে পারছে না। তোমার যত বয়েস বাড়ছে, তুমি ততই একটা নুইসেনস হয়ে উঠছ। তুমি একটা হেলথ হাজার্ড। ম্যানার্স, এটিকেট কিছুই জানো না। সব ব্যাপারে নাক গলাতে চাও। তোমার দিকে তাকাতে ঘেন্না করে। ডাইনির মতো চেহারা! তুমি এইবার পথ দেখো।'
বৃদ্ধা মা স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন সাইন্টিস্ট ছেলের দিকে। বিরাট চাকরি, বিশাল মাইনে। যত্নে মানুষ করেছিলেন। এমন মানুষ, যে মাকেই বহিষ্কার। ছেলে বললে, 'করুণ চোখে তাকালেও আমাদের করুণা পাবে না।'
'এই বয়সে আমি যাব কোথায়?'
'যেখানে যাওয়ার সেখানে যখন যেতেই পারলে না, তখন যেদিকে দুচোখ যায় সেই দিকেই যাও।'
বৃদ্ধা চলেন তাঁর বিধবা বোনের বাড়ি। তাঁরও দুই কৃতী সন্তান, একজন ইঞ্জিনিয়ার আর একজন অধ্যাপক। দুজনেই বিদেশে। বৃদ্ধাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁরা আবিষ্কার করলেন, অত্যাচার আর অনাহারে মাসিমার টিবি হয়েছে। ভরতি করে দিলেন হাসপাতালে।
বৃদ্ধাকে মা বলে ডাকলে বিস্মিত, বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। যারা মানুষ হয় তাদের মা থাকে না। তারা সব মাতৃহারা। একালে বউও নেই। অতি আধুনিকা, শিক্ষিতা মেয়েরা আর বর বলেন না, বলেন, 'আমি অমুকের সঙ্গে থাকি।' আজ থাকি কাল নাও থাকতে পারি। আমাদের কোনও পরিবারিক বন্ধন নেই। মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পনিতে চাকরির মতো। আজ এ কোম্পানিতে তো কাল ও কোম্পানিতে।
'তাহলে যার হাত ধরে আছেন, এই শিশুটি কে?'
'ফ্রুট।'
'আলু, পটল, বেগুনের মতো?'
'কৃত-কর্মের ফল।'
স্ত্রী-পুরুষের আত্যন্তিক সান্নিধ্যে ওরা এই চিড়িয়াখানায় আসবে। ডানার জোর হলে উড়ে যাবে পাখির মতো।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন