প্রেসার কুকার

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আগেকার দিনে নীলকর সাহেবরা বেগার ধরতে বেরোতেন। সাহেব চলেছেন ঘোড়ায় চেপে। হঠাৎ নজরে পড়ল এক পুরোহিত চলেছেন নামাবলি গায়ে। হাতে শালগ্রাম শিলা। রাস্তার মাঝখানে আড়াআড়ি ঘোড়া দাঁড় করিয়ে সাহেব বললে, 'পালাইতেছ কোথা, বেগার ডিটে হইবে।' ব্যস হয়ে গেল। যজমানের বাড়ি পড়ে রইল দু-ক্রোশ দূরে। সত্যনারায়ণ মাথায় উঠল। পুরোহিত চললেন, সাহেবের নীল চাষে বেগার খাটতে। না গেলেই সপাসপ চাবুক।

যুগ অনেক দূর সরে এলেও আমার সংসার চলছে বেগার প্রথায়। আমার স্ত্রী বেশ ভালো কায়দা বের করেছে। মহিলার ক্ষমতা আছে। পূর্ব জন্মে হয় নীলকর সাহেব ছিল, না হয় সাহেবের হারেমের কোনও দেশি বিবি।

আমি একটা গ্রাম গ্রাম অঞ্চলে থাকি। বাড়ির চারপাশে একটা বাগান মতো ব্যাপার আছে। প্রথম দিকে বাগানই ছিল। প্রতিবেশীদের সহৃদয় উৎপাতে সাধের বাগানে এখন নৈরাজ্য চলেছে। কিছু ফুলের গাছ স্ট্যামিনার জোরে এখনও টিকে আছে। কদিন থাকবে বলা শক্ত। বহুকাল নতুন কোনও গাছ বসানো হয়নি। এখন পাখিরাই বাগান করছে। ঠোঁটে করে বীজ এনে ফেলে। অনেক সময় পক্ষীকৃত্যের সঙ্গে দু-চারটে বদহজমের মাল বেরিয়ে আসে। জমির স্বাভাবিক ধর্মে দু-একটি নতুন গাছ গজিয়ে ওঠে। ওইভাবে বেশ ঝাঁকড়া একটি ফলসা গাছ হয়েছে। মোরগ ফুল হয়েছে। একটা জাম গাছ হয়েছে। জাম মনে হয় পাখিতে করেনি। কোনও লিভারওয়ালা কুকুরেও করতে পারে, অথবা হনুমানে।

সে যাই হোক। এবার মহিলার একটু বর্ণনা দেওয়া যাক। কারণ, এই কাহিনির তিনিই হলেন নায়িকা। এককথায় বলা চলে, একটু চেষ্টা করলে তিনি নির্বাচনে জিতে সহজেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী হতে পারতেন। আর হলে, আমাদের দেশের হাসপাতালে এই অব্যবস্থা চলতে পারত না। চাবকে ঠান্ডা করে দিতেন। দেশের দুর্ভাগ্য, এমন একটি প্রতিভা গৃহকূপে ছাইচাপা হয়ে আছে।

চেহারায় বেশ একটা কম্যান্ডার কম্যান্ডার ভাব আছে। হিটলার বেঁচে থাকলে ধরে নিয়ে গিয়ে মহিলা গেস্টাপো করে রাইনল্যান্ডে ছেড়ে দিতেন। এঁর সমস্ত কথাবার্তাই যেন মিলিটারি কম্যান্ডের মতো। অ্যায় বললে জগৎ থমকে দাঁড়ায়। দেয়ালঘড়ি বন্ধ হয়ে যায়, এ আমার নিজের দেখা। টুলে উঠে পেন্ডুলাম ঠেলতে হয়। রেডিওর গান থেমে যায়। শিল্পী বলে ওঠেন একটু আস্তে ম্যাডাম। আমি স্পষ্ট শুনেছি। প্রথম দিকে আমার সঙ্গে মাঝরাতে যখন দু-চারটে প্রেমের কথা হত, পরের দিন সকালে প্রতিবেশীরা আমাকে দেখে মুচকি মুচকি হাসতেন। কেন হাসছেন, বুঝতে পারতুম না। একদিন পাশের বাড়ির রসিক বউদি বললেন, কী ঠাকুরপো, কাল নুকিয়ে খুব কাটলেট খাওয়া হয়েছিল?

কী করে বুঝলেন?

রাত আড়াইটের সময় ঘুম ভেঙে গেল। শুনলুম, আপনার স্ত্রী বলছেন, সরে শোও, তোমার মুখে ভক ভক করছে পেঁয়াজের গন্ধ। এবার থেকে বাইরে কিছু খেলে, একটা করে বড় এলাচ খাবেন। পেঁয়াজের মুখে হাম খেলে প্রেম কেঁচে যায়। জর্দা দিয়ে পানও খেতে পারেন। প্রেমিকারা প্রাণের দায়ে সহ্য করলেও, স্ত্রীদের করা উচিত নয়।

সেই দিন বুঝেছিলুম, জীবনের অনেক কথাই গলার গুণে লিক করে বসে আছে। একদিন মাঝরাতে ভীষণ মেঘ করে ঝোড়ো বাতাস বইছিল। 'ওঠো-ওঠো, ঝড় উঠেছে' বলে কম্বুকণ্ঠে এমন একটি হাঁক ছাড়লেন, যেন কুরুক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে ম্যাডাম কৃষ্ণের পাঞ্চজন্য বাজাচ্ছেন। সারা জনপদ জেগে উঠে চিৎকার করতে লাগল, কী হয়েছে, কী হয়েছে? 'জানালা বন্ধ করে পাখাটা খুলে দাও', বলে তিনি পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন।

এ সবই তাঁর চরিত্রের গুণ। ঈশ্বর বেশ বড়সড়ো কিছু একটা করতে চেয়েছিলেন, প্রাোডাকশন লাইন থেকে মাল হাত ফসকে মহিলা হয়ে বেড়িয়ে এসেছে। বাড়িতে একবার চোর পড়েছিল। চোরের আর দোষ কী। অসময়ে বাড়ি বাড়ি ঢোকাই তার ব্যবসা।

চোর দিয়েই শুরু করা যাক।

চোরদের নিয়ম হল, চুরি করার আগে বাড়ির চৌহদ্দিতে একটা বড় আসবাব বাইরে করা। ঠিকমতো হলে বুঝতে হবে নার্ভ ঠিক আছে। এইবার পাইপ বেয়ে ওঠো, কি তালা ভাঙো অথবা গ্রিল ওপড়াও। হাত-পা কাঁপবে না, দিল হেলবে না। নিজের ওপর নিজের কনট্রোল।

আমার স্বভাব হল জেগে আছি তো বেশ আছি। একবার শুয়ে পড়লে মড়া। তখন জাগাতে হলে ঢাক ঢোল বাজাতে হবে। কিংবা ঠ্যাং ধরে খাট থেকে ফেলে দিতে হবে। কখন চোর ঢুকেছে জানি না। কীভাবে ঢুকেছে তাও জানি না। শুনেছি খোলা জানালা দিয়ে চোরেরা প্রথম গাঁজাপক্ক বিড়ির ধোঁয়া ছাড়ে। তাতে গেরস্থর ঘুম বেশ পেকে ওঠে। তার মানে আমার পাকা ঘুম আরও পাকা হয়েছিল।

আমার যখন ঘুম ভাঙল, চোর তখন মহিলার খপ্পরে। আমাদের একটা বাঘা কুকুর আছে। তার হাঁকডাকও পালিকার কনট্রোলে। যখন ডাকের দরকার নেই, তখন তাকে ঘুমের বড়ি খাওয়ানো হয়। বাঘা তখন হাত-পা ছড়িয়ে ভোঁস ভোঁস ঘুমোয়। নেশা কেটে গেলে ওঠে—উঠে ভুক ভুক ডাক ছাড়ে। তখন তার জন্যে বিস্কুট আসে, দুধ আসে। তার খাতিরই আলাদা। সংসারে তার যত্ন আমার চেয়েও বেশি। হিংসে হয়। হলে কী করব। সে কুকুর। পেয়ারের কুকুর। আমি মানুষ। হতচ্ছেদ্দার স্বামী। না মরলে আমার কদর হবে না। মরে যেদিন ছবি হয়ে ঝুলব, সেইদিনই হয়তো প্রাপ্য সম্মান পাব। দু-ফোঁটা অশ্রুজলে তখন আমি গাইব, জীবনে যারে তুমি দাওনি চা-বিস্কুট, মরণে কেন তারে দিতে এলে মশামারা ধূপ। শুনতে পাবে না। না শোনাই ভালো। শুনলেই তেড়েফুঁড়ে উঠবে, কী বললে? ভুলেই যাবে, আমি মরে ভূত হয়েছি।

না, অন্য প্রসঙ্গে সরে যাচ্ছি। এসব হল পুরুষ মানুষের অভিমানের কথা। পুরুষ বললে প্রতিবাদের ঝড় বইবে। এ হল খোকাপুরুষ। কুকুরের কথায় ফিরে আসা যাক। কুকুর এমন ট্রেনিং পেয়েছে, আমাকেও ধমকায়। মহিলার ওপর হয়তো একটু হম্বিতম্বি করে ফেলেছি, কুকুর অমনি প্রতিপক্ষের গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে গরর গরর করে জানান দিলে, বেশি বাড়াবাড়ি করছ কি, খ্যাঁক। আধপো মাংস নিয়ে নেমে যাব। সেই সময় স্ত্রী যদি আমার মাথার পেছনে সোহাগের হাত না রাখে, সারাদিন আমাকে এক জায়গায় স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। নড়াচড়া করলেই কুকুর গরগর করবে। আচ্ছা দাওয়াই পাকড়েছে যা হোক। দাম্পত্য কলহের পরিণতি, আমার করুণ মিনতি, ওগো আর করব না, এই নজরবন্দি অবস্থা থেকে আমাকে মুক্ত করো মা এলোকেশী, ভবে যন্ত্রণা পাই দিবানিশি।

কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙবার নানারকম ব্যবস্থা ছিল। কুকুরের ঘুম ভাঙাবার ব্যবস্থা খুব সহজ। নাকের কালো অংশে একটু কাঁচা লংকার রস। সেই পদ্ধতিতেই কুকুরকে জাগানো হয়েছে। চোর ঢুকেছিল খাবার ঘরে। বাসনকোসনের লোভে। বাইরে থেকে শেকল তুলে তাকে বন্দি করা হয়েছে। জানালা দিয়ে কথাবার্তা চলছে। মহিলা হাতে একটা খেঁটে লাঠি নিয়ে জানালার বাইরে। চোর ঘরের মেঝেতে উবু। বাঘা সামনের দুটো পা জানালার গ্রিলে তুলে দিয়ে ফোঁস ফোঁস করছে। এবার কী হবে বাছাধন। চোর আমাদের পরিচিত। তার নাম সোনা। সোনারচাঁদ ছেলে। সকালে খুব টেরি বাগিয়ে ঘোরে।

সেই চোর ঘর থেকে বেরিয়ে এল নাকখত দিতে দিতে। কোমরে দড়ি বাঁধা হল। এমন বুদ্ধি আমার মাথায় আসত না। মহিলা বললেন, বল কোথায় কী করেছিস?

কেঁদে বললে, পাতকোতলায়।

সেই মাল নিজে হাতে তুলে পরিষ্কার করতে হল। তারপর ঝ্যাঁটা আর ফিনাইল। ভোর হয়ে এল। নিষ্কৃতি পাওয়া অত সহজ নয়। বেলা বারোটা অবধি চোর বাঁধা রইল বারান্দার থামে, বাঘার পাহারায়। জনে জনে আসে আর দ্যাখে। ওমা! এ যে আমাদের সোনা!

মহিলা সোনাকে একটি সাইকেল রিকশা কিনে দিয়েছেন। সোনা এখন রিকশা চালায়। রোজ তিন টাকা জমা দিয়ে যায়। আর মালকিনকে হিঁয়া হুঁয়া ঘোরায়। সে বেচারা চোর থেকে সাধু হয়ে বেগার খেটে মরে। বেলা দেড়টার সময় কটকটে রোদে লাইন দিয়ে ম্যাটিনি শোয়ের টিকিট কেটে এনে মহিলা দারোগাকে সন্তুষ্ট রাখে। যিনি সোনার মতো পাকা চোরকে কলুর বলদের মতো নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাতে পারেন, তাঁর যে অসীম ক্ষমতা এ-কথা রাষ্ট্রপতিও মানবেন।

একবার হাত খুলে গেলে তাকে আর পায় কে।

ফুলগাছের কিছু অংশ পাঁচিলের বাইরে যাবেই। রাজা ক্যানিউটও শাসনে রাখতে পারবেন না। ভোরের দিকে সাজি হাতে বাচ্চা একটি মেয়ে, সবে একটা ডাল ধরে টান মেরেছে, মালকিন পাঁচিলের এপাশ থেকে আদুরে গলায় বললেন, কী রে, ফুল নিবি বুঝি?

আদরে গলে গিয়ে মেয়েটি বললে, হ্যাঁ মাসিমা।

আয় ভেতরে আয়।

আমি ভাবছি, বাবা, শরীরে বাতের মতো হঠাৎ এত দয়া হল কোথা থেকে। গাঁটে গাঁটে দয়া। মুখে টুথব্রাশ। সান্ট্রাত্রুজের গোঁফের মতো চারপাশে পেস্টের ফেনা! মেয়েটি হাসিমুখে ভেতরে এসে দাঁড়াল। ফুল চুরি করতে গিয়ে এমন অভ্যর্থনা সে কোথাও পায়নি।

দে, সাজিটা দে। মহিলা বাঁ হাতে সাজিটা নিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। ফিরে এলেন এক কুলো র‌্যাশনের চাল নিয়ে।

আয়, এই রকে বোস।

মেয়েটি অবাক হয়ে বললে, বোসবো কেন মাসিমা? আপনি যে বললেন, ফুল দেবেন, চাল দিচ্ছেন কেন?

চাল দোব কেন? চাল ক'টা এখানে বসে বেছে দে। তারপর ফুল পাবি।

মেয়েটি কাঁদো কাঁদো মুখে বললে, আমার ফুল চাই না মাসিমা। সাজিটা ফেরত দিন।

মাসিমা উত্তরে চ্যাপ, বলে অ্যায়সা এক ধমক দিলেন। বোস এখানে, চাল বাছ, তবে সাজি পাবি।

বেচারার কী গেরো। খোল নলচে দুই-ই গেল। করুণ মুখ দেখে আমি একটু সালিশি করতে গিয়ে এক ধমক খেলুম, তুমি চুপ করো। তোমার চরকায় তেল দাও, আমাদের ব্যাপারে নাক গলাতে এসো না।

মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বেশ মিহি সুরে বললেন, কতক্ষণ আর লাগবে, টুকটুক করে বেছে ফেল, এক সাজি ফুল পাবি।

ঘণ্টাখানেক লাগল সেই চাল বাছতে। তারপর হুকুম হল, নে, সব গাছে উঠে এক সাজি ফুল পাড়। সেই ফুল তিন ভাগ কর। এক ভাগ আমার, এক ভাগ তোর, আর এক ভাগ কালীবাড়িতে দিয়ে আসবি।

কালীবাড়ি যে অনেক দূরে মাসিমা। দেরি হয়ে যাবে। আমার মা বকবে!

চুউপ। একটা কথা নয়। যা বলছি তাই শুনবি। তা না হলে সাজি কেড়ে রেখে দোব, কুকুর লেলিয়ে দোব। পাঁচিলের বাইরে লকলক করে দুলছে ফুলগাছের ডাল। বড়োই লোভনীয়। তবে হাত দিয়েছ কি মরেছ। এক-একটি অক্টোপাশের শুঁড়। ভোরের বাগানে অক্টোপাশ চটি পায়ে ঘুরছেন। মুখে টুথব্রাশ। ডাল ধরে কেউ না কেউ টানবেই আর সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে যাবে সেপটোপাশের জালে। বাছো এক কুলো চাল, তবেই মিলবে এক মুঠো ফুল, নয়তো সাজিটাও যাবে।

আমাদের বাড়িতে তিন চারটে জলের কল। একটা কল কুয়োতলায়, সেখানে দুটো চৌবাচ্চা। একটা বিরাট আর একটা মাঝারি। লোডশেডিং-এর পর প্রথমে যে জল আসে সেটা টালার মিষ্টি জল। মিনিট পনেরো থাকে। তারপরেই আসে ডিপ টিউব-ওয়েলের কষা জল। এই মিষ্টি জল নেওয়ার জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। বালতি, ডেচকি, গামলি নিয়ে যত কুঁচো কাঁচা ঢুকে পড়ে বাড়িতে।

এই জল হল বেগার ধরার ফাঁদ। দৃশ্যটি বড়োই মনোরম। ফাঁদে এক সঙ্গে এত শিকার? মাকড়সার প্রাণ নেচে ওঠে। খেল শুরু হয় বালতি ভরে ওঠার পর। জল টলটলে বালতিটি তুলে নিয়ে সরে পড়ার তালে ছিল একটি কিশোর। ঘাড়ে যেন বাঘ পড়ল।

জগো, বালতি রাখ। চৌবাচ্চা দুটোর ফুটো খুলে সব জল বের করে দে।

জগো ভাবলে, বা:, এ বেশ খেলা! কলকল জল বেরচ্ছে। চৌবাচ্চা খালি হচ্ছে। জানা ছিল না ওস্তাদের মার শেষ রাত্তিরে। এই এতখানি একটা বুরুশ হাতে মালকিন এসে সামনে দাঁড়ালেন, কোমর বেঁধে নে, এইবার ঘসে ঘসে ভেতরের শ্যাওলা পরিষ্কার কর।

জগোর চক্ষু চড়কগাছ, ও ঠাম্মা, এ আমি পারব না।

তোর ঘাড় পারবে। জল নেওয়ার সময় মনে থাকে না। পরিষ্কার করলে তবেই জলের বালতি নিয়ে যেতে দোব।

এক ঘণ্টা লাগল জগোর চৌবাচ্চা সাফ করতে। তাতেও নিষ্কৃতি নেই। হুকুম হল, ভালো করে ফুটো বন্ধ করে পাইপ লাগা। চৌবাচ্চায় পাইপ লাগাবে কি, ঘসে ঘসে জগোর নড়া ছিঁড়ে গেছে। তার নাকে অক্সিজেনের নল গুঁজতে পারলে ভালো হয়। জগোর সঙ্গে জল নিতে এসে ফাঁদে পড়েছে উমা। সে আর একপাশে চিঁচিঁ করছে। বাজার থেকে চুনো মাছ এনেছিলুম। বঁটি, ছাই আর চুনো মাছ নিয়ে সে বসে আছে ছলছলে চোখে। ওই মাছ শেষ করে উঠলে তবে সে জলের গামলা তুলে নেওয়ার ছাড়পত্র পাবে।

সামনের রাস্তা দিয়ে সনাতন চলেছে নেচে নেচে। এই শোন, কোথায় যাচ্ছিস?

পাশের একটা ছোট কারখানায় সনাতন কাজ করে। কারখানার কী একটা কিনতে বাজারে ছুটছিল। হাতে লোহালক্কড়। ছেলেটা সব সময় হাসে। হাসতে হাসতে পাঁচিলের পাশে এসে বললে, বাজার যাচ্ছি মাসিমা।

তোর ওই সব লোহালক্কড় রাখ এখানে।

কেন মাসিমা?

এই যে কেরোসিনের টিন আর টাকা। ওদের দোকানে তেল দিচ্ছে। এনে দে পাঁচ লিটার।

আমি কারখানার কাজে যাচ্ছি যে।

গোলি মার তোর কাজে। এক ফোঁটা তেল নেই বাটিতে। আমরা কী অন্ধকারে থাকব!

বিরাট লাইন মাসিমা। আমি পরে এনে দোব।

হ্যাঁ, তেল তোমার জন্যে বসে থাকবে।

এখন আমি পারব না।

ঠিক আছে মনে থাকে যেন। আজ বাদ কাল শনিবার, তুমি টিভি দেখতে এসো। সরস্বতী পূজোর সময় লাইটের কানেকশন চেয়ো, তখন ভালো করে দোব।

কুইনিন খাবার মতো মুখ করে সনাতন ছুটল তেল আনতে।

ইতিমধ্যে গৌর পালাচ্ছিল পাশ দিয়ে। সেও ফাঁদে পড়ে গেল। তার ঘাড়ে চাপল র‌্যাশন। গুঁইগাঁই করছিল। যেই শুনলে, আমাদের ছেড়ে দেওয়া পামতেল ভবিষ্যতে আর পাবে না, ঘাড় হেঁট করে ছুটল র‌্যাশন তুলতে। মাঝে মাঝে আমরা চাল গম আর তেল ছেড়ে দি। গৌরের মা সেইসব পায়। গৌরের টিকি তাই মহিলার হাতে। টানলেই মাথা চলে আসে।

দাদারও দাদা আছে। এমন চেলা আছে যে গুরুকে চা বাগান বেচে দিয়ে আসতে পারে। ক'দিন থেকেই লক্ষ করছি মহিলার দাপট যেন একটু কমে এসেছে। সামান্য উদাস উদাস ভাব। মাঝে মাঝেই পাঁচিলের ধারে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। গলা তুলে তুলে কাকে যেন খুঁজছেন। যৌবন উতরে গেল, এ বয়েস তো প্রেমে পড়ার নয়। বলা যায় না, পরকীয়া কখন কীভাবে এসে পড়ে। যদি আসে মন্দ হয় না। কেউ ইলোপ করে নিয়ে চলে যায়, দিনকতক একটু শান্তিতে থাকা যায়।

পাঁচিলের কাছ থেকে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন, মুখে চুকচুক শব্দ। একেবারে আমার মুখোমুখি।

কী হল ম্যাডাম?

থাক আর রসিকতা করতে হবে না। আমার বলে নিজের ঘায়ে কুকুর-পাগল অবস্থা।

কেন, কী হল?

সনাতনকে ক'দিন হল দেখতে পাচ্ছি না।

তেল ফুরিয়েছে বুঝি?

তেল ফুরোলে তো বুঝতুম, আমাদের প্রেসার কুকারটা সারিয়ে আনতে বলেছিলুম! সে যে নিয়ে গেল, আজ সাতদিন হয়ে গেল টিকির দেখা নেই। এদিকে একটা গুজব শুনছি, সত্যিমিথ্যে জানি না।

কী গুজব? ছেলেধরার!

আরে ধুর, ও দামড়াকে কে ধরবে! শুনছি, ওই নাকি একটা মেয়েকে ধরে নিয়ে পালিয়েছে।

সে কী গো, একটা প্রেসার কুকারের যে এখন অনেক দাম।

তাই তো রাগে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে। তুমিও একটু সন্ধান করো না। ধরতে পারলে বাপের নাম ভুলিয়ে দোব।

এ পাড়ার দুজন মানুষ এখন হন্যে হয়ে দুটো জিনিস খুঁজে বেড়াচ্ছেন। একজন তালাশ করছেন তাঁর একমাত্র মেয়ের। আর একজন সন্ধান করছেন প্রেসার কুকারের। সংসার বড়ো মিইয়ে পড়েছে। জোড়া হিস না হলে তেমন জমে না। প্রেসারেরও মেল-ফিমেল আছে। মেলটা গেছে, ফিমেল তাই বড়ো মন-মরা। এই বিরহে আমি কিন্তু বড়ো মধুর আছি।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%