সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বাঙালি এক বিচিত্র জীব! আমি বাঙালি। আয়নায় নিজেকেই দেখি। বিচারের আয়নায়। নিজেই নিজের বিচারক। কাঠগড়ায় তুলেছি নিজেকে। প্রথমে আমার চেহারা। নিজের দিকে নিজেরই তাকাতে ইচ্ছে করে না। যৌবনে মাথা ভরতি চুল ছিল। এখন চুলের তটরেখা ক্রমশই পিছনে সরে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, মানুষের কপাল কতটা আর মাথাই বা কতটা? চুলকে যদি সাগর ভাবি তাহলে সেই সীমা থেকে ভুরু পর্যন্ত হবে কপাল। চুল যত পেচোচ্ছে, কপাল তত এগোচ্ছে। এই মুহূর্তে আমি বিদ্যাসাগরী কপালের অধিকারী।
মানুষের দুটি কপাল। এক কপাল তার মাথায় সাঁটা, আর একটি অদৃশ্য কপাল। সে কপাল কোথায় আছে জানি না, শুধু এইটুকু জানি—কপাল গুণে খা ভাত, কপাল দোষে হা ভাত। ইংরেজ আমলে বাঙালির ভাগ্য-কপাল খুব খুলেছিল। চারদিকে থিক থিক করছে মোটা মোটা জমিদার। ধেড়ে ধেড়ে বাড়ি। গদাগদা থাম। গাদা গাদা গৃহভৃত্য। চৌকিতে জুড়ি গাড়ি। হুড খোলা ফোর্ড কোম্পানির মোটর গাড়ি। তার আবার পা-দানি। ডানপাশে ঝুলছে প্যাঁক প্যাঁক হর্ন। একটা লোহার স্ট্যান্ডে কাচ ঢাকা বাতি। পরনে গিলে করা ফিনফিনে পাঞ্জাবি। কোঁচা লুটানো কাঁচি ধুতি। পরিবার, পরিজন কারও সঙ্গে মেশে না। গৃহবন্দি। জমিদার পুত্ররা দেহভারে মন্থর গতি। গৃহশিক্ষক বাড়িতেই থাকেন। তেমন তেমন জমিদারের ছেলেরা বিলেত পড়তে যায়। আস্তাবলে দুর্গন্ধী ঘোড়া। বউরা সব অহংকারী। নায়েবমশাই দুষ্ট প্রকৃতির। ফতুয়া পরা, কোমরে গামছা বাঁধা, লাঠিধারী, পাঠঠা চেহারা একদল পাইক। তাদের পুণ্যকর্ম হল অন্যের মাথা ফাটানো, আর বুকে বাঁশ ডলে দরিদ্র প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়। জমিদারবাবু হলেন পেচক শ্রেণির। দিনের বেলায় বিছানয় থাকেন। দেহভার এলিয়ে। রাতের বেলায় শিকারে বেরোন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন কিছু কিছু জনহিতকর কাজ করতেন, যেমন একটা পুকুর কি দিঘি খনন, বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি। ইংরেজ সরকার রায় বাহাদুর খেতাব দিতেন। বন্দুক ছুঁড়তে না জানলেও, দেওয়ালে এক নলা, দোনলা বন্দুক ঝুলত অনেক জমিদারে পূর্বপুরুষ ছিলেন ডাকাত। মানী লোককে অপমান করে আনন্দ পেতেন। অধিকাংশই ছিলেন মামলাবাজ।
এঁদের পাশাপাশি রাজা, মহারাজারা ছিলেন। তাঁদের 'লাইফস্টাইল' ছিল আরও ভয়ংকর। সাহেব ষেঁষা। অনেকে মেম বিয়ে করতেন। বিলেতে বাড়ি রাখতেন। থেকে থেকে বিলেতে যেতেন। এঁদের পূর্বপুরুষরা নবাবি আমলে নবাবদের খয়ের খাঁ ছিলেন। ইংরেজ আমলে সাহেবদের সেবক।
স্বদেশি আমলে কেউ কেউ খদ্দর ধারণ করলেন। মাথায় গান্ধি টুপি। দেশ স্বাধীন করবেন বক্তৃতা দিয়ে। হোমরুলের পক্ষে। কলকাতা কর্পোরেশানের দখলদার। মাঝে মাঝে 'বন্দেমাতরম' ধ্বনি। দুরকম পোশাক। খদ্দর, জহরকোট, গান্ধি টুপি—মিটিং কা ড্রেস। স্বাধীনতা। যে যার চটাপট গদিতে বসে পড়লেন। চেয়ার রেসে বাঙালিরা চিৎপাত।
দেশটাকে কেক কাটার মতো টুকরো টুকরো করা হল, বিলিতি ছুরি দিয়ে। ভারতের একটা অংশের নাম হল পাকিস্তান। ছুরির ঘায়ে এতটুকু হয়ে গেল বাংলা। পুবের যতো মানুষ চলে এল পশ্চিমে। আসল লড়াইটা শুরু হল স্বাধীন হওয়ার পরে।
রক্তাক্ত রজানীতির শুরু হল। বর্তমানে তুঙ্গে জমির জমিদাররা বোতল মেরে আর বাই নাচিয়ে, রকের ভাষায় যাকে বলে ফুটে যাওয়া, তাই হলেন। পড়ে রইল মামলা জড়ানো বিশাল বিশাল বাড়ি। প্লাস্টার খসে পড়ছে। বাহারি কার্নিস ভেঙে ভেঙে পড়ছে জবরদখল। কখনও সখনও দু-একজন ফ্যাকাসে উত্তরপুরুষকে দেখা যেত। ভোগ ছাড়া যাদের অন্য কোনও শিক্ষাই ছিল না। অতি করুণ অবস্থা।
আগে এক একটি পরগনায় কয়েকজন জমিদার দেখা যেত। স্বাধীনতার কয়েকবছর পরেই পাড়ায় পাড়ায় গজিয়ে উঠল নতুন ধরনের জমিদার। জমির নয়, মানুষের মালিক। গায়ে এক ধরনের রাজনীতির জার্সি। দিশি বোমা আর কাগজ কাটা ছুরি থেকে এসে গেল বিলিতি বোমা, আমেরিকান ছুরি, আগ্নেয়াস্ত্র। ধড়াধ্বড় লাশ পড়তে লাগল। এ আবার কী? শোনা গেল—এরাই তোমাদের ভাগ্য বিধাতা। 'রাখে কেষ্ট' ভুলে যাও, হাত কাটা নেলো, গাল ফোলা গুপি, এরাই তোমাদের ভুঁইফোঁড় শিব। যার শিকড় কাশী পর্যন্ত চলে গেছে। নয়া কাশী হল ক্ষমতার কেন্দ্র। যা কখনও সাদা, কখনও লাল। দেশটা দাদনে চলে গেল। কোম্পানির আমল ফিরে এল। গেড়ে বসল। মহল্লায় মহল্লায় ছোরাছুরির খেলা। সব ছাগল হয়ে ব্যা ব্যা কর। ঘাস পাতা খাও। শিং বাগিয়ে তেড়ে এলেই মায়ের ভোগে। স্বদেশ হয়ে গেল অক্টোপাস। কেন্দ্র আর তার অসংখ্য শুঁড়। শুঁড়ের সঙ্গে কেন্দ্রের যোগ। সাদাকে ওলটাতে লাল। লালের আবার দুটো রং—ফিকে আর গাঢ়। ছোটখাটো আরও রং এসে গেল। দেশ জুড়ে ধুন্ধুমার কাণ্ড। এদিকে রক্ত, ওদিকে কালো টাকা। জমিদারের লেঠেলরা ফিরে এল। সংস্কৃতি হল হিন্দি সিনেমা সংগীত। কোমর দোলানো নৃত্য। বারোয়ারি পুজো। হাত, পা কাটা গোল গণতন্ত্র গোলেমালে চলছে ভালো। সাধারণ মানুষ জিওল মাছ।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি আর ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিই। উপায় তো নেই, তাকাতেই হয়, দাড়ি কামাচ্ছি যে। ধূর্ত শৃগালের মতো লম্বাটে একটা মুখ। ধান্দাবাজের চোখ। কী ইনটারেস্টিং একটা চরিত্র। নেতাজি, স্বামীজি, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ—আমি সেই বাঙালি। গালে একটা চড় মারতে ইচ্ছে করে। বাঙালি বলে পরিচয় দিতে তোমার লজ্জা করে না! রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ এই ধারায় তোমার স্থান কোথায়? জীবনে তুমি করলেটা কী? কী দিয়ে গেলে? কী রেখে গেলে?
স্বার্থ, স্বার্থ, স্বার্থ! নিজেরটি ছাড়া কিছু বোঝো কী? মুখে বড় বড় বুলি।
নিজের বেলায় আঁটিসুঁটি পরের বেলায় দাঁত কপাটি। আমি নিতে পারি, খেতে পারি, দিতে পারি না। কারুর ভালো দেখলে বুক ফেটে যায়। নিজের চরিত্রে অজস্র দোষ, অন্যর দোষ দেখে বেড়াই। কর্তব্যবোধ নেই, কৃতজ্ঞতা নেই। বড়োর কাছে কেঁচো, ছোটোর কাছে বাঘ।
আয়নায় এই যে মুখটা দেখছ—এ এক অভিনেতা। প্রেম নেই কিন্তু প্রেমিক। দয়া নেই তবু দয়ালু। মুখে দ্যাখায়, অন্যের জন্য কত কাতর। আসলে অপরের কথা তখনই ভাব যখন নিজের স্বার্থ থাকে। স্বার্থের কারণে পায়ে হাত, মিটে গেলেই সে হাত গলায়।
এই মুখটির যে মালিক, সে অতি ছোটো মনের মানুষ। নিজে অবিশ্বাসী তাই অন্য কারোকে বিশ্বাস করতে পারে না। সদা সন্দিগ্ধ। যত কমই হোক, এই লোকটা পৃথিবীর কিছুটা স্থান দখল করে রেখেছে কেন? কোন অধিকারে? কোনও কথারই যার দাম নেই, সব কথাই যার কথার কথা, সে বেঁচে আছে কোন অধিকারে? অধিকার, অধিকার! দূর করে দে ব্যাটাকে।
আয়নার সামনে থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলুম। সেই অসহ্য লোকটাকে দূর করে দিলুম। তার সংগ্রহে অনেক ভালো ভালো বই আছে, কিন্তু একটা বইও সে পড়ে না। তার একটা অতীত অছে, সেই অতীতের খবর সে রাখে না, আর ভবিষ্যতটা বানাতে গিয়ে বর্তমানটাকে কদর্য করে তোলে।
সে অপরকে শ্রদ্ধা করে না, নিজে শ্রদ্ধেয় হতে চায়। নিজে মিথ্যাবাদী, অপরকে সত্যবাদী দেখতে চায়। নিজে অলস অথচ অপরের আলস্য সহ্য করতে পারে না। সকলের সেবা চায়, নিজে কারুর সেবা করতে চায় না। নিজের জন্য ভোগ, অন্যের জন্য ত্যাগের বাণী।
কী করা যায়?
ওই আয়নাটা ভেঙে ফেললে এই বিরাট বাঙালিটা কি চিরতরে অদৃশ্য হবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন