সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বট আর অশ্বত্থ গাছ খুব রসিক। পাথর থেকেও রস আহরণ করতে পারে। পালামৌ ভ্রমণে গিয়ে সঞ্জীবচন্দ্র এই সত্যটি আবিষ্কার করেছিলেন। এখনও অনেক জরাজীর্ণ পুরোনো বাড়ি আছে যা এই বটের শিকড়ের আলিঙ্গনে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। বাঙালির সঙ্গে এই দুটি গাছের প্রাণসম্পদের তুলনা করা চলে।
আমাদের সমাজজীবন, আমাদের সাংস্কৃতিক জীবন-কাঠামো আজও বজায় আছে এই বটধর্মী বাঙালি জীবনের রস আকর্ষণী ক্ষমতার গুণে। এত ভঙ্গ বঙ্গদেশ, তবু রঙ্গে ভরা। অনুবীক্ষণী দৃষ্টিতে তাকালে গর্ব করার মতো কিছুই খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। চলেছে ওই এক স্লোগানের গুণে—'চলছে চলবে।' অনেক আগে সতেন্দ্র্যনাথ দত্ত লিখেছিলেন—মন্বন্তরে মরিনি আমরা, মারী নিয়ে ঘর করি। তার মানে প্রায় শ'খানেক বছর আগে থেকেই ভাঙনের সূত্রপাত হয়েছিল। ভেঙেও ভাঙছে না। উচ্ছন্নে যেতে গিয়েও যাচ্ছে না, কারণটা কী? একটা আরশোলাকে উত্তম-মধ্যম ঝ্যাঁটা পেটা করলেও সহজে মরে না। কেতরে কেতরে ঘুরে বেড়ায়। সেইরকম বাঙালির জীবনী-শক্তি।
হাহাকার নিত্যকার মন্ত্র। গেল গেল জাতীয় সঙ্গীত। এই পরিমণ্ডলেই প্রেম, বিবাহ এবং বিচ্ছেদ। এই পরিমণ্ডলেই বধূ নির্যাতন, গায়ে কেরোসিন। এই পরিমণ্ডলেই সন্ত্রাসবাদীদের অভ্যুত্থান। লগান অস্কার পাবে কি না সেই প্রার্থনা জানাতে কালীঘাটে পিতা, পুত্র। বালকপুত্রের পোশাক আমির খানের মতো, হাতে ক্রিকেট ব্যাট। সৌরভ যাতে সেঞ্চুরি করতে পারেন তার জন্য তারকেশ্বরে হত্যে। ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে ছেলেদের স্কুলের ছেলেরা মেয়েদের স্কুলে গিয়ে ধুম নৃত্য—'আই লাভ ইউ।' তারপরে থানা পুলিশ, বোমাবাজি, ক্ষুর চালাচালি।
দারিদ্র্য, দারিদ্র্য করে এত চিৎকার, তবু বিয়ে বাড়ির ভোজে হাজার হাজার টাকার অপচয়। আলোর মালা ঝুলিয়ে, টেপে ফাটা সানাই বাজিয়ে বিয়ে হচ্ছে। শয়ে শয়ে ভূত এসে, যত না খাচ্ছে তার থেকে বেশি ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হচ্ছে। সারারাত কুকুরের কীর্তন। বলির পাঁঠা হচ্ছেন কন্যার পিতা। স্বামী জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত, হয়তো বড়ো চাকরিও করেন, হনিমুনে গিয়ে স্ত্রীকে পেটাতে শুরু করলেন আরও পণের জন্য। ফুলশয্যার মালা গন্ধ হারাতে না হারাতেই স্ত্রীনিধন যজ্ঞ শুরু হয়ে গেল। পরের বাড়ির মেয়েটিকে সপরিবারে ছাত পেটাই, এখন আবার আত্মহত্যার নতুন কল চালু হয়েছে—মেট্রো রেল,থার্ড লাইনটা ছুঁতে পারলেই খেল খতম।
আবার ওদিকে এসে গেছে ৪৯৮-এ। ইচ্ছে করলে কোনও ভয়ংকরী শ্বশুর শাশুড়ি সমেত গোটা পরিবারটিকে হাজতবাস করাতে পারেন। একেই বলে ভ্যালেন্টাইন্স ডের চালচিত্র। বাঙালির প্রেম কোথায় গিয়ে শেষ হবে কেউ জানে না।
পরকীয়ায় বাঙালির দুর্বার মতি। বহু আগে তুলসীদাসজি একটি দোঁহায় বলেছিলেন—কলিযুগ! তোমার কোনও তুলনা নেই। গরু পুষে দুধ খাওয়াচ্ছে পোষা কুকুরকে। বাছুর দুধ পায় না। শালাকে উত্তম খাওয়াচ্ছে আর বাপের একটা শুকনো রুটি জোটে না। আর দাসীর সঙ্গে বহুত পেয়ার কিন্তু স্ত্রীর ভাগ্যে আদর জোটে না—ধন্য কলিযুগ তেরি তামাশা!
সেই ধারা ইদানীং আরও প্রবল। ছেলেটি ভারী সুন্দর। একখণ্ড জমি ম্যানেজ করেছে বিনা পয়সায়। এসব পশ্চিমবাংলায় হয়। পতাকা হাতে একটু হাঁটাহাঁটি, একটু চিৎকার চেঁচামেচি করতে পারলেই ঈশ্বরের কৃপা নয়, মানুষের কৃপা পাওয়া যায়। বাঙালির সার্কিটে একটি কথা আজকাল খুব শোনা যায়—'চালুপুরিয়া' হতে হবে। আলোচ্য চালুপুরিয়াটি একটি বাড়ি তৈরি করে ফেলল। নীচের তলায় একটি কারখানায় যন্ত্রপাতির ঘড়ঘড় শব্দ। প্রেম হল, মালা চালাচালি হল। ভূত ভোজন হল। প্রাকৃতিক নিয়মে একটি সন্তানও এল। চারপাশের মানুষের ঈর্ষা বাড়তে লাগল। একটি পরিবার কেমন গড়ে উঠছে। যাঁদের কিছুই ছিল না তাঁরা কেমন বিত্ত বৈভবে পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। অন্তরালে ভাগ্যদেবী খিলখিল করে হাসছেন। এইবার ছেলেটি তাঁর বিবাহিতা শ্যালিকাকে নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। তারপর—সেই এক পরিণতি। প্রেমের বিবাহের তরুণীটি ফ্যালফ্যাল করে ঘুরে বেড়াতে লাগলে এখানে ওখানে। সে না শ্বশুর বাড়ির, না বাপের বাড়ির। সবাই বলতে লাগল তোমার তেমন আকর্ষণ নেই, যার আছে সে নিয়ে পালিয়েছে তোমার স্বামীটিকে। সেই বধূর সন্তানটি বুঝতে পারে না তার মায়ের কী হয়েছে। তার সামনেই মাকে তিরস্কার, লাঞ্ছনা। সে কাঁদে আর তার মাও কাঁদে। বাঙালির হাসি আর কান্না এখন ধার হারিয়েছে। অনেকটা সুইচ অফ সুইচ অনের মতো। হাসতে হাসতে খুন করতে পারে, কাঁদকে কাঁদতে কাবাব খেতে পারে।
সেই বধূটি নির্যাতন ও অপমান সহ্য করতে না পেরে মুক্তির সহজ রাস্তাটি খুঁজে নিল। ঘুঘু ডাকা নির্জন দ্বিপ্রহরে টঙের ঘরে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল। কেউ দেখল না, সকলেই দিবানিদ্রায়। তার সন্তানটি মা, মা করতে করতে বাইরে থেকে দেখতে পেল তিন তলার ছাদের ঘরে তার মা দোল খাচ্ছে। সে জানে না মৃত্যু কাকে বলে। সে জানে মা চিরকালের বস্তু। সঙ্গে সঙ্গে কৌতূহলী দর্শকদের ভিড় জমে গেল। এমন দেখার মতো ঘটনা সহসা কী ঘটে! বিখ্যাত এক বাঙালি হিউমারিস্ট বলতেন—কারও সর্বনাউশ কারও পৌষ মাউস।
বাঙালি জীবনকে এখন রুদ্ধশ্বাস জীবন বলা চলে। আতঙ্কে ভরা। মেয়েকে নিয়ে মা ভোরবেলা রাস্তা পার হচ্ছেন। স্কুলের গেট দেখা যাচ্ছে, আর কয়েক পা এগোলেই প্রবেশ করা যায়। ছুটে এল উন্মাদ এক গাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে মা এবং মেয়ে দশহাত দূরের গেট নয়, পরপারের বহুদূর পথ নিমেষে অতিক্রম করলেন। এইসব ঘটনার পর বাঁধাধরা কিছু প্রতিবাদ তৈরি হয়—পথ অবরোধ। ঘণ্টা তিনেক চিৎকার, চেঁচামেচি, অ্যাম্বুলেন্সে ছিলেন হৃদরোগী। তিনি ওই অবরোধেই মুক্তি খুঁজে পেলেন। দুর্ঘটনা ঘটলেই একটি হাম্প তৈরি করা একালের মেডিসিন। এক একটা রাস্তায় হাম্প শুনলেই পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে সেখানে কটি প্রাণ পথদুর্ঘটনায় বলি হয়েছিল।
আমাদের জীবনে সেই দূর অতীত থেকেই অনুকরণ করে আসছি 'কবিতা আর কাজিয়া'। কবির লড়াই, খেউড় বাঙালি মগজের প্রকাশ প্রতিভা। সেকালে ছোট বড় নানামাপের জমিদার ছিলেন। প্রজাদের বুকে বাঁশ ডলে খাজনা আদায় করতেন। প্রক্যেকেরই লেঠেল ছিল। মাঝেমধ্যে পরস্পরের মাথা ফাটাফাটি হত। একালের সেই জমিদারদেরই রূপান্তর ঘটেছে। এখন এসেছে রাজনীতির জমিদাররা। পালাকীর্তন আর পাইপগানের সহ অবস্থান। গ্রামের সহজ সরল মানুষরা ভয়ে আড়ষ্ট। জমি থেকে রঙের নমুনা সংগ্রহ করে ডি এন এ পরীক্ষার মাধ্যমে হত্যাকারীকে চিহ্নিত করার চেষ্টা দেখলে মনে হয় এই একটি দেশ যেখানে বিজ্ঞান আর বিভ্রান্তি পাশাপাশি হাজির। মরেছে কে? আর মেরেছে কে? জানা না গেলেও এইটুকু বোঝা যায় বাঘ-ভালুক নয়, বাঙালির শত্রু বাঙালিই।
বাঙালিকে নিয়ে মনীষীরা অনেকেই কথা বলে গেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বাঙালি চরিত্র বিশ্লেষণে বিদ্যাসাগর মহাশয়কে সামনে রেখে যেসব কথা বলেছেন তা মোটেই উপাদেয় নয়। স্বামী বিবেকানন্দ অনেক তিক্ত কথা বলে গেছেন। একালের বাঘা বাঘা চিন্তাবিদরা রবীন্দ্রনাথকে কবি বলেই স্বীকার করেন না। আর স্বামী বিবেকানন্দ ও সুভাষচন্দ্রকে নানাভাবে তুচ্ছ করার বিপরীত সাধনায় মেতে উঠেছেন। যদি প্রশ্ন করা হয় আদর্শ বাঙালি কে? তাহলে একটু লাজুক হেসে বলবেন—হয়তো আমি। 'আমি'র আস্ফালন চলছে, চলবে।
একালে যেসব শিশু পড়ে তাদের সামনে এদেশের কোনও 'আদর্শ মানুষের' আদল রাখা গেল না। বিদেশ থেকে বিদেশিদের ধরে আনার নানা চেষ্টা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। এদেশে রাজনীতি এতই প্রবল মানুষ চাল, গমের বদলে 'ইজম' ভোজন করে দিন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। আমেরিকাকে গালাগাল দিলেও জিনস আর টির্শাট পরে, বারোয়ারি দুর্গাপুজোয় ছেলেমেয়েরা মায়ের কৃপা না চাইলেও বেস্ট প্যান্ডেল, বেস্ট আর্ট, বেস্ট প্রতিমা, বেস্ট লাইটিং, বিগ ফুচকা আর ইন্টারন্যাশনাল আইসক্রিমের খোঁজে কাতারে কাতারে রাস্তায়। গোঁফের রেখা দেখা দেওয়া মাত্রই প্রেমিকার অন্বেষণ, প্রেম কিন্তু কোথাও নেই। আছে শ্যাম্পু, সাবান, আছে কম্পিউটার।
বাঙালি ভারী মজার জাত। আমিও এক বাঙালি। তা না হলে এসব কেন লিখব। এসব লেখার কারণ সস্তায় বাজিমাত। সেই পুরোনো কথাটি আমরা সবাই জানি—রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি। শুনতেও ভালো লাগে, বলতেও ভালো লাগে। মানুষ কিন্তু হব না। অহঙ্কারের ফানুস হয়েই একদিন ফেঁসে যাব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন