সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

তিপ্পান্ন নম্বর বাড়ির সামনে রিকশা ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল। গ্রিল-ঘেরা বারান্দায় একটা বাঁদর ঝুলছিল। সাট করে নেমে একটু ভেতরে রাখা একটা চেয়ারের পেছনে উঠে অদ্ভুত ভঙ্গিতে দাঁত খিঁচোতে লাগল। আজকাল বাঁদর পোষার রেওয়াজ হয়েছে। নিজেদের চেনা সহজ হবে বলে। মা কী ছিলেন, মা কী হইয়াছেন। যাহা ছিলেন তাহাই আছেন।
রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মেটাতে মেটাতে ঘাড় ঘুরিয়ে প্রসূন বললে, 'এ বাড়িতে এটা আবার কার আমদানি।' রিকশার হর্নের শব্দে মেজকত্তা বেরিয়ে এসেছিলেন—উত্তরটা তিনিই দিলেন, 'সেজকত্তার আমদানি। জানোই তো রতনে রতন চেনে, ভাল্লুকে চেনে শাঁকালু। এসো এসো, চলে এসো ভেতরে চলে এসো। তোমার জন্যে আমরা সব হাঁ করে বসে আছি।'
প্রসূন ভয়ে ভয়ে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলছে, 'তেড়ে এসে কামড়ে দেবে না তো! যে রকম দাঁত খিঁচোচ্ছে।'
'ঠাকুরের নাম নিয়ে চলে এসো। কামড়াবে না, তবে গালে কি ঘাড়ে টাড়ে আঁচড়ে দিতে পারে। তেমন হলে চুন আছে লাগিয়ে দেওয়া হবে।'
'বাবা, সে তো বড়ো সাংঘাতিক কথা। আমি বরং চলেই যাই। আপনারা যা পারেন করুন।'
মেজর সঙ্গে বাঁদরটার ইতিমধ্যেই বেশ খাতির হয়ে গেছে। গলার চেনটা টেনে ধরে বললেন, 'আমি ধরে আছি, তুমি ঝট করে ভেতরে চলে যাও।'
আজ এই বাড়িতে একটা ব্যাপার হবে। হেলাফেলার ব্যাপার নয়। এই বাড়িতে বিশাল একটা সিন্দুক আছে। সেই সিন্দুকটা আজ খোলা হবে সকলের সামনে। সকলে মানে—এই বাড়ির পাঁচ ভাই, পাঁচ বউ, দুই বোন আর দুই জামাই। ইতিমধ্যেই তেরো জনের বিশাল দল, বড় ঘরের মেঝেতে থেবড়ে বসে পড়েছে। প্রসূন এসে গেছে। এইবার তালায় চাবি পড়বে।
সিন্দুকটার একটা ইতিহাস আছে। মিলিটারি সিন্দুক। সিন্দুক আবার মিলিটারি হয় কী করে? এ বাড়ির কর্তা ছিলেন আর্মি অফিসার। সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন অমৃতসরে কামান দাগছিলেন সেই সময় সিন্দুকটা তিনি ব্রিজ কম্পিটিশনে জিতেছিলেন। মিলিটারিতে সব ধেড়ে ধেড়ে ব্যাপার। ভলি চ্যাম্পিয়নকে হয়তো একটা কামানই উপহার দিয়ে দিলে। ফুটবল চ্যাম্পিয়নকে তুলে দিলে একটা প্যাটন ট্যাংক। ব্যাটা, রিটায়ার করার পর বাড়ি নিয়ে যা। দেশে গিয়ে সপরিবারে চড়ে হাওয়া খেতে বেরোবি।
এতো বড় সিন্দুক সচরাচর চোখে পড়ে না। পুরো একটা পরিবার ভেতরে ঢুকে পিকনিক করতে পারে। যেমন আয়তন তেমনি মজবুত গঠন। শাবল মারলেও ভাঙবে না। চারপাশে মসৃণ স্টিলের পাত। আষ্টেপৃষ্টে লোহার গুল বসানো বিপর্যয় এক ব্যাপার। সিন্দুক না বলে দুর্গ বলাই ভালো।
এই সিন্দুক কর্তার সঙ্গে সারা ভারত ঘুরেছে। কাবুল কান্দাহারে গিয়ে আখরোট, পেস্তা, বাদাম, খেজুর, কিসমিস গর্ভে ধারণ করেছে। দক্ষিণ ভারতে নিয়ে গিয়ে পোরা হয়েছিল তেঁতুল। চট্টগ্রামে গিয়ে হয়েছিল সুপুরির গুদোম। ঐতিহাসিক সিন্দুক। এক স্বদেশিকে আবার এর ভেতর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বেশ কিছুদিন। তিনি এর মধ্যে বসে বসে অঙ্ক কষতেন। পরে তিনি মন্ত্রী হয়েছিলেন। মন্ত্রী হয়ে এ বাড়ির কর্তাকে রিপাবলিক ডে-র কুচকাওয়াজ দেখার পাস দিয়েছিলেন।
কর্তা যথাসময়ে বললে ভুল হবে, সময়ের কিছু আগেই জরুরি তলব পেয়ে ওপরে চলে গেলেন। সেই তলব এলো মাঝরাতে সোজা হৃদয়ে; তখন পৃথিবীর সব পোস্টঅফিস বন্ধ। রেখে গেলেন জাঁদরেল স্ত্রী আর পুত্রকন্যা। স্ত্রী বেশ কিছুদিন সংসার সমরাঙ্গনে কুচকাওয়াজ করলেন। যেসব ছেলেরা বিয়ে না করে প্রেম করে বেড়াচ্ছিল তাদের প্রেম চটকে দিয়ে মনোনীতা পাত্রীর পাত্রস্থ করে দিলেন। মায়ের মনোনয়নে তারা মুগ্ধ। প্রেমের বউ আর সরাসরি পিঁড়ে থেকে উঠে আসা বউয়ে তারা বিশেষ তফাৎ দেখতে পাচ্ছে না। সবাই এক। সেই পণ্ডিতমশাইয়ের গল্পের মতো—তদ্রুপ, তদবর্ণ, তদগন্ধ। বাড়তি যা, সকলেই আসার সময় বাপের বাড়ি থেকে পরিমাণ মতো জিনিসপত্র গুছিয়ে এনেছে। কেউ বেশি কেউ কম।
মা ঠাকরুন এই চিড়িয়াখানাটিকে বেশ ম্যানেজ করছিলেন। সবাই বলতো ক্ষণপ্রভার বাঙালি সার্কাস। নাম ছিল ক্ষণপ্রভা। দেখা গেল প্রভা মেলাচ্ছে না, ক্রমশই বাড়ছে; তখন পিতামাতার দেওয়া নামের ভ্রম সংশোধন করে ক্ষণ শব্দটি খসিয়ে দেওয়া হলো। প্রভা নামেই তিনি বাকি জীবন ভারতভূমে বিচরণ করে গেলেন। সবাই বলেন স্বামীর চেয়ে তাঁর পার্সোন্যালিটি হাজার গুণ বেশি ছিল। কোনওক্রমে অবস্থাটা যদি খোদার ওপর খোদকারি করে ঘুরিয়ে দেওয়া যেত, অর্থাৎ তিনি যদি স্বামী হতেন তাহলে ফিল্ড মার্শাল হয়ে রিটায়ার করতেন অবশ্যই। এক ডজন (কর্তাকে ধরলে তেরোজনের) অতালিমপ্রাপ্ত একটি ব্যাটেলিয়ানকে তিনি যে কায়দায় চালাতেন তার কোনও জবাব নেই—লা জবাব।
সেজবউ এখনও তার স্বামীকে বলে, তোমাদের গোঁফদাড়ি ছাড়া আর কোনও পুরুষের লক্ষণ নেই। এ বাড়ির শেষ পুরুষ ছিলেন মা, তোমরা সব কটা মেনি বেড়াল। ছাপকা ছাপকা লুঙ্গি পরে ভুঁড়ি বের করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কথাটা উঠেছিল—ইলেকট্রিক সাপ্লাইয়ের লাইন কাটা নিয়ে। বিল জমা পড়েনি বলে লাইন কেটে দিয়ে গেল সি-ই-এস-সির পাওনাদার। ওই ঘটনা ছেলেদের আমলেই ঘটল। মেজর ওপর দায়িত্ব ছিল বিলের পাওনা মেটাবার। ভাগাভাগির সংসার। এক ভাই মেটাবে ট্যাক্স। এক ভাই রিপেয়ার করাবে যেখানে যা কিছু ভাঙবে চুরবে। এক ভাইয়ের ঘাড়ে লোক-লৌকিকতা, অতিথি আপ্যায়ন। লাইন কেটে দিয়ে যাওয়ার পর মেজ অমায়িক হেসে বলেছিল—ভুলে গিয়েছিলুম। মেজ বউ ছাড়া কেউ বিশ্বাস করেনি এ কথা। মেজর কৃপণ বলে যৎসামান্য বদনাম আছে। ক্ষণপ্রভার জীবৎকালেও একবার এই ঘটনাটাই ঘটেছিল। মেজবাবু বিল হাপিস করে দিয়েছিলেন। ইলেকট্রিকের লোক এলেন লাইন কাটতে। ক্ষণপ্রভা এমন তেড়ে উঠলেন। তাঁরা বললেন, ঠিক আছে টাকা মিটিয়ে দিন। ক্ষণপ্রভা বললেন, দুশো ছাপান্ন টাকা কি মুখের কথা, আমরা কি কালোটাকার কারবারি যে পাশ বালিশের খোল থেকে নোট বেরোবে। কাল সকাল এগারোটার সময়ে তোমাদের দপ্তরে টাকা জমা পড়বে। যদি না পড়ে তখন তোমাদের কাঁচি এনো। ক্ষণপ্রভা সকলকেই তুমি বলে সম্বোধন করতেন। তাঁর ওই চাঁপা ফুলের মতো রং, স্পষ্ট উচ্চারণ, চোখের উজ্জ্বল দৃষ্টি দেখে, সাপ্লাইয়ের লাইন কাটা পার্টি বললে, আমরা তাহলে আসি। ক্ষণপ্রভা বললেন, দাঁড়াও। তারপর এই বিখ্যাত সিন্দুক খুলে বের করলেন ততোধিক বিখ্যাত নারকেল নাড়ুর কৌটো। জিনিসটা তিনি উপাদেয় বানাতেন। ক্ষীরটির দিয়ে সে এক পাগল করা ব্যাপার। ক্ষণপ্রভার হাতের রান্নার লোভে জামাইরা প্রায়ই ল্যাংল্যাং করে সব কাজ ছেড়ে ছুটে আসত। আর এই আকর্ষণেই মনে হয় স্ত্রীদের খুব ন্যাওটা। শোনা যায় বড়ো জামাই নাকি বউয়ের কথায় ওঠবোস করে। কান ধরে এক পায় সারারাত খাড়া থাকতে পারে। ছোট অতোটা নয়। তার কিছুটা 'একস্ট্রা কারিকুলার একটিভিটি' আছে। তবে অষ্টপ্রহর খুব নীতা নীতা করে।
প্রসূন ঘরে ঢুকতেই সকলে সমস্বরে বলে উঠল, 'কোথায় ছিলে এতক্ষণ? তোমার জন্যে আমরা সব হাঁ করে বসে আছি।' প্রসূন কারণ বলতে যাচ্ছিল, তার আগেই নীতা বলে বসল, 'কি চড়িয়ে এলে বুঝি?'
প্রসূন ভেঙচি কেটে বললে, 'হ্যাঁ, তুমি তো আমাকে সবসময় চড়াতেই দেখছ।'
'না চড়ালে পান খেয়েছ কেন?'
'কী আশ্চর্য, পান খাওয়ার সঙ্গে পান করার কী সম্পর্ক রে বাবা?'
'খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বাবা। তোমার তো আবার টেনশন সহ্য হয় না। আমি মরলে তুমি আগে দৌড়বে বোতলের সন্ধানে।'
বড় জামাই সন্দীপ বললে, 'আমাদের পাড়ার পটলদার মতো। বউ খাবি খাচ্ছে। ডাক্তার বললেন, লাস্ট স্টেজ। আর বোধহয় মিনিট পাঁচেক। পটলদা বিছানার পাশ থেকে হাওয়া। ঘণ্টা চারেক পরে ফিরে এলেন টলতে টলতে। হাতে ফুলের তোড়া। জড়ানো গলায় সে কী আবৃত্তি!' সন্দীপ আবার আবৃত্তির হিরো। আজকাল আবৃত্তি শ্রুতিনাটক খুব চলছে। একালের ভাষায় পাবলিক খুব খাচ্ছে। সন্দীপের একটু কবি কবি মেয়েলি চেহারা। এইরকম একটা ঘরভরা জমায়েত সহজে ছেড়ে দেবে। পটলদার আবৃত্তি নিজেই শুরু করে দিল :
কী গভীর দু:খে মগ্ন সমস্ত আকাশ,
সমস্ত পৃথিবী। চলিতেছি যতো দূর
শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর
'যেতে আমি দিব না তোমায়।' ধরণীর
প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্বপ্রান্ত তীর
ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে,
'যেতে নাহি দিব। যেতে নাহি দিব।'
সবে—
সন্দীপের স্ত্রী গীতা জর্দাপান ঠুসে একপাশে বসেছিল গম্ভীর মুখে। আজকের নাটকে সে-ই মুখ্য চরিত্র। ডানগাল থেকে বাঁ গালে পান ঠেলে, ঠান্ডা গলায় বললে, 'তুমি কি পুরোটাই আবৃত্তি করবে?'
সন্দীপ থতোমতো খেয়ে বললে, 'আমি কেন করব। পটলদা করেছিলেন। সন্দীপ একেবারে গ্যালপিং ট্রেনের মতো সিগন্যাল-টিগন্যাল না মেনে চালিয়ে দিল :
এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গ মর্ত ছেয়ে
সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
গভীর ক্রন্দন—'যেতে নাহি দিব।'
হায়
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।
গীতা বললে, 'পটলদার বাবা।'
সবাই হোহো করে হেসে উঠল। আজ মোটেই হাসির দিন নয়। দীর্ঘ একবছর সকলেই ভীষণ উৎকণ্ঠায় আছে। অনেক কল্পনা জল্পনা, স্বার্থের লোভের টানাপোড়েন আজ শেষ হবে। যেই সিন্দুকের ডালা খোলা হবে অমনি বেরিয়ে পড়বে সব মালমশলা। প্রভার যাবতীয় সম্পদ। কারুরই স্পষ্ট ধারণা নেই, কী আছে কী থাকতে পারে। তবে আছে। বেশ কিছু আছে! থাকতেই হবে। সাবেক কালের অনেক কিছু থাকার কথা। কাঁসার ভারী ভারী বাসন। সেযুগের সব ফলাও ডিজাইনের গহনাপত্র। রূপোর বাসন। সোনার পিলসুজ। এক বছর ধরে, এক একজনের কল্পনা অনুসারে রকমারি সব জিনিস সিন্দুকে ঢুকে পড়েছে। লোভে সব চোখ চকচক করছে। উৎকণ্ঠায় বুকের ধুকপুকুনি সব এলোমেলো হয়ে গেছে। এতো দিন খোলা হয়নি, সে তবু ছিল ভালো। আজ একেবারে মুখোমুখি। কে ভাগ করবে? কীভাবে ভাগ হবে? মহা সমস্যা। অসম্ভব টেনশন। মা মারা যাওয়ার মিনিট পনেরো আগে চাবিটি বড়ো মেয়ে গীতার হাতে দিয়ে বলেছিলেন—'রাখ তোর কাছে। ঠিক এক বছর পর খুলবি। তার আগে নয়।' সকলকে কেন এমন ঝুলিয়ে রেখে গেলেন কে জানে। রীতিমতো নাটক! গত এক বছর রোজ রাতে জোড়া জোড়া স্বামী স্ত্রী মশারির ভেতর ঢুকে ঘুম না আসা পর্যন্ত ক্ষণপ্রভার নিত্য শ্রাদ্ধ করেছে। মৃত্যুর পর মানুষের একবারই শ্রাদ্ধ হয়। ক্ষণপ্রভার মতো এমন দৈনিক শ্রাদ্ধ ক'জনের হয়। আর জীবিত শ্রাদ্ধ হয়েছে বড় মেয়ে গীতার। অ্যাঁ হ্যাঁ, সোহাগের বড় মেয়ে। মাকে কী দিয়ে বশ করেছিল কে জানে। আমরা যেন সব বানের জলে ভেসে এসেছি।
নীতা এখনও ভুলতে পারেনি। স্বামীর ওপর তার বিশ্বাস নেই। আজ লড়াইয়ের দিন। রেগুলার ফাইট করে মাল আদায় করতে হবে। আজ একটু সাদা চোখে থাকলে হত না? নেশা করে পান চিবোতে চিবোতে ঢুকলেন। পেটে দু'পাত্তর পড়লেই একেবারে দরাজ দিল, রাজা হরিশচন্দ্র, প্রয়াগের মেলায় রাজা হর্ষবর্ধন। তখন যদি কেউ বলে তোমার বউকে দিয়ে দাও, বাবু অমনি একগাল হেসে বলবেন—নেবে? বেশ তো নিয়ে যাও না। মায়ের একটা হার ছিল, সাত আটটা দামি পাথর বসানো পেন্ডান্ট। খুব ছোট ছিল! তবু চোখের সামনে মায়ের সেই রূপ ভাসছে। এক একটা রাত ভোলা যায় না। ওই এক রাতেই জীবন নাটকের টিকিটের দাম উসুল হয়ে যায়। সেই আলোর রাত। সুন্দর শহর। বাবা ড্রিংক করতেন, তবে মাত্রা রেখে। আর খেলেই বাবার ধারালো মুখ টকটকে লাল হয়ে যেত। সিনেমার নায়কের মতো দেখাত। সিল্কের শাড়ি পরা মা। পিঙ্ক শাড়ি, পিঙ্ক ব্লাউজ। আঙুলে হীরে বসানো আংটি। গলায় পেন্ডান্ট। পায়ে সাদা জুতো। মায়ের ছেলেমেয়ের সংখ্যা কম নয়। তারা কিন্তু মায়ের শরীর ভাঙতে পারেনি। আশ্চর্য কায়দায় মা যৌবন ধরে রেখেছিলেন অনেক দিন। বার্ধক্যে দেখতে হয়েছিলেন সাধিকার মতো।
নীতা বললে, 'কই, তুমি আমার মুখের কাছে হাঁ করো তো।'
প্রসূণ বললে, 'কেন অবিশ্বাস করছ। তোমার সব ভালো, ওই একটাই মারাত্মক রোগ। আমাকে বিশ্বাস করো না।
'তোমাকে বিশ্বাস। তুমি যে মাল, তা যে জানে সে জানে। মনে নেই, তোমার জন্যে মাকে আমার শেষ দেখা হল না।'
'আমার জন্যে!'
'আজ্ঞে হ্যাঁ, তোমার জন্যে।'
'তুমি তো ইভনিং শোতে অনুরাধা দেখতে চলে গেলে।'
'কেন গেলুম? তোমার জন্যেই তো গেলুম। তুমি এখানে না এসেই ধাপ্পা মেরে দিলে। কন্ডিশান অনেক ইমপ্রুভড। মিথ্যেবাদী, চিটিংবাজ। অফিস আর বার, বার আর অফিস—এই তোমার জীবনের সার হয়েছে।'
'বার বার করে আমাকে জেরবার করে দিলে।' সেজগিন্নি বললে, 'কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না! সময় চলে যাচ্ছে। আজ আবার টিভিতে খুব ভালো বই দিয়েছে।' মেজগিন্নি আর মনের ইচ্ছে চেপে রাখতে পারলে না। ইচ্ছে অনেকটা, ইচ্ছে মানেই আশা, আশা অনেকটা আমাশার মতো। চাপতে চাপতে আর চাপা যায় না। উরেব্বাস বলে বের করে দিতে হয়। শাসন মানে না।
মেজগিন্নি বললে, 'রূপোর বাসনের সেটটা মা কিন্তু আমাকে দিয়ে গেছেন!'
বাস আর যায় কোথায়? ভীমরুলের চাকে ঢিল পড়ল।
সেজগিন্নি বললে, 'তোমাকে দিয়ে গেছেন। সে কথা কে শুনেছে। কে সাক্ষী আছে?
মেজকত্তা বললে, 'আমি সাক্ষী আছি। মা বললেন, বিয়েতে তুইই সব চেয়ে বেশি ঠকেছিস। কিছছু পাসনি। কাঁসার আর রূপোর বাসন তোরা নিস।'
ছোটকত্তা বললে, 'বাবা, এ যে দেখি বাবার বাবা। তুমি আবার কাঁসাটি যোগ করে দিলে। তোমার কাজ আছে গুরু।'
মেজগিন্নির চোখ মুখ লাল হয়ে উঠেছে। ফোঁস করে উঠল, 'তুমি বিয়েতে সবচেয়ে বেশি ঠকেছ! আমার বাবা হত্তুকি দিয়ে বিয়ে দিয়েছে! বেইমান কোথাকার। ফি বছর একবার করে শ্বশুর বাড়ি যাবে, আর দেঁড়েমুসে সব নিয়ে আসবে। আজ বিশ বছর ধরে শুষছ। তবু তোমার হয় না। এবার কিছু পেলে না তাই বড়দার সাইকেলটা নিয়ে চলে এলে।'
ছোট ভাই বলে উঠল, 'স্টপ স্টপ। দি ক্যাট ইজ আউট অফ দি ব্যাগ।'
মেজকত্তা, মেজগিন্নির দিকে কষকষে একটা দৃষ্টি হেনে গটমট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
প্রসূন বললে, 'চলে গেল যে? কোরাম হবে তো?'
মেজগিন্নিও কর্তার পদাঙ্ক অনুসরণ করল।
প্রসূন বললে, 'যা:, জোড়ে খসে গেল। দুজনের কী মিল মাইরি! একেবারে চখাচখি।'
নীতা দাবড়ে উঠল, 'চুপ করো, ভদ্রসমাজে মাতলামি কোরো না!'
'যা: বাবা, মাতলামি হয়ে গেল। দুটো মাত্র জিন খেয়ে এসেছি। আমি ক'টা পর্যন্ত স্ট্যান্ড করতে পারি জানো?'
'জেনে দরকার নেই। তুমি চুপ করো।'
সেজকর্তা বললে, 'এখন তাহলে কী হবে? মানভঞ্জন পালা।'
ওপাশের ঘরে দড়াম করে খিল তোলার শব্দ হল। মেজগিন্নির গোঁসা হয়েছে। বিছানায় উপুড় হয়ে পড়েছে। দরজা দেওয়ার সময় খেয়াল করেনি, মেজকর্তাও ঘরে রয়েছে। জানলার পাশে টুলের ওপর বসে আছে চুপ করে। বসে বসে ভাবছে, বিশ বছরেও সরমার স্বভাব পালটাল না। সম্পর্ক যেন রেডিয়োর ওয়েভ ব্যান্ড। কাঁটা একচুল এপাশ ওপাশ হলেই স্টেশন কেটে যায়।
সরমা উপুড় হয়ে ফোঁস ফোঁস করছে। মেজ ফিরে তাকাল। সরমাকে যখনই সে এইভাবে শুয়ে থাকতে দেখে তখনি তার মাথা খারাপ হয়ে যায়। এতখানি বয়স হল তবু গেল না। জয় করা গেল না, গেল না। সব ঝাঁড়ফুঁক ভুলে ছুটে যেতে হয়। মেজ ধীরে ধীরে টুল ছেড়ে উঠে সরমার দিকে এগিয়ে গেল। কোমরের খোলা অংশে হাত দিতেই সরমা চমকে ধড়মড় করে উঠে বসল। স্বামীকে দেখে আবার কাটা কলাগাছের মতো বিছানায় উলটে পড়ল।
মেজ আদুরে গলায় বললে, মাথা মোটা। কবে যে আমার বউটার একটু বুদ্ধিসুদ্ধি হবে? আরে বোকা তোমার জন্যে জমি তৈরি করছিলুম। এইটুকু বুদ্ধিও তোমার ঘটে নেই। সব মাটি করে দিয়ে চলে এলে। মা কেন আমাদের দেবেন? তার তো একটা কারণ থাকবে। জোরদার কারণ। হাঁউ মাঁউ করে সব বারোটা বাজিয়ে দিল। গাধা কি আর গাছে ফলে।'
মেজ বউয়ের পিঠের ওপর ঢলে পড়ল। ভীষণ ভালোবাসা এসে গেছে। আর লাগাম টেনে ধরে রাখা যাচ্ছে না নিজেকে। এমন সময় দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা। সেজর গলা, 'কী তোমরা আসবে, না আমরাই যা পারি করে নেব।'
মেজগিন্নী স্বামীকে পিঠ থেকে পিঁপড়ের মতো ঝেড়ে ফেলে তড়াক করে উঠে বসলো। বসেই বললে, 'তার মানে আমরা কি মরে গেছি?'
সেজ বললে, 'মরোনি। এতো তাড়াতাড়ি মরবেই বা কেন? রেগে গেছ। বিষয় সম্পত্তির ওপর বিতৃষ্ণা এসে গেছে আর কি! বয়সে যা হয়। বৈরাগ্য!'
মেজগিন্নি স্বামীকে বললে, 'কী বেড়ালের মতো গায়ের সঙ্গে লেপটে আছ। এই কি সোহাগের সময়। চলো চলো শকুনিরা সব বসে আছে।'
মেজকর্তা জোড়ে সভাস্থলে প্রবেশ মাত্র প্রসূন বললে, 'খেলা তাহলে শুরু হোক। হাফ টাইম হয়ে গেছে।'
সেজগিন্নি সঙ্গে সঙ্গে বললে, 'মা আমাকেও একটা জিনিস আলাদা করে দিয়ে গেছেন!'
'কী জিনিস!' সমস্বরে সকলের প্রশ্ন।
'সোনার পিলসুজ।'
মেজগিন্নি প্রায় আঁতকে উঠলেন, 'সোনার পিলসুজ? আছে না কি?' কর্তার দিকে ফিরে প্রশ্ন করল, 'হ্যাঁ গো, আমাদের সোনার পিলসুজ ছিল?'
মেজকর্তা নাকে নস্যি ঢোকাচ্ছিল। জোরে নাক টেনে বোকা মুখে বলল, 'কী জানি।'
সরমা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল, 'তুমি জানোটা কী? নস্যি, ঘুম, আর দাবা। একটা সোনার পিলসুজের দাম জানো?'
ছোটগিন্নী বললে, 'তা এতো লোক থাকতে মা পিলসুজটা তোমাকে দিলেন কেন?'
সেজগিন্নি সাধিকার মতো হেসে বললে, 'আমি একটু পুজোপাঠ করি তো, মা তাই বলেছিলেন, ও জিনিস তোমারই কাছে মানায়। আমাদের তিনপুরুষের পিলসুজ।'
মেজগিন্নি বললে—'অ পুজোপাঠ তুমি একাই করো। তুমিই এ ফ্যামিলির একমাত্র মীরাবাঈ। রোজ এ বাড়ির সন্ধে দেখায় কে? বিশ বছর ধরে শাঁক বাজাচ্ছে কে?'
মেজকর্তা নাকি নাকি সুরে স্ত্রীকে সাপোর্ট করল, 'দ্যাখো না? যার ধন তার ধন নয়, নেপোয় মারে দই। এ বাড়িতে দীক্ষা তো শুধু তোমারই হয়েছে। কত বড় গুরুর শিষ্য তুমি।'
সেজগিন্নি ব্যঙ্গের হাসি হেসে বললে—'দীক্ষা হলেই সব হয়ে গেল। দীক্ষা তো আজকাল করপোরেশনের টিকে দেওয়ার মতো। এক এক লট ধরে আর দাগ দেয়। কোনও দিনও তো পাঁচ মিনিটের জন্যেও জপধ্যান করতে দেখি না।'
মেজগিন্নি সুর করে বললে, 'দেখবে কী করে, আমি যে অজপা করি।'
প্রসূন বললে, 'বাবা সে আবার কী? সিন্দুক থেকে কী বেরোবে জানি না, তবে তোমাদের ভেতর থেকে যে সব মাল বেরোচ্ছে।'
সেজগিন্নি বললে, 'আমরা স্বামী পরমানন্দের বংশধর। আমাদের রক্তে ধর্ম বিজবিজ করছে।'
সন্দীপ বললে, 'এ ভাবে তো হয় না। শেষ পর্যন্ত দাঙ্গাহাঙ্গামা শুরু হয়ে যাবে।'
প্রসূন বললে, 'আমার ভাই একটা জিনিসেই লোভ। নীতার মুখে শুনেছি দেখিনি কোনও দিন। শ্বশুর মশাইয়ের একটা রুপোর 'পেগ মেজার' ছিল। ফ্রান্সের তৈরি। তোমরা কেউ মালমশলা খাও না। তোমাদের কারুর কাজে লাগবে না, ওটা ভাই আমাকে দিও।'
'হ্যাঁ দেওয়াচ্ছি।' নীতা হুঙ্কার ছাড়ল। 'এতকাল বাইরে বাইরে হচ্ছিল, এইবার বাড়িতে বোতল ঢুকবে। ছুতো একটা পেয়ে যাবে। তোমার বোতল আমি ঘুচিয়ে দোব।'
'বোতলের সঙ্গে তোমার এমন ভাসুর ভাদ্রবউয়ের সম্পর্কে কেন? এও এক ধরনের অ্যালারজি।'
সন্দীপ হঠাৎ নড়েচড়ে বসে বললে, 'সকলেরই সময়ের দাম আছে। আপনারা যা শুরু করেছেন তাতে কাজের কাজ কিছুই হবে না।'
ছোটভাই বললে, 'সিন্দুক খোলার আগে আমি জানতে চাই ভাগাভাগিটা কী ভাবে হবে। কে করবে, কী জন্যে করবে। মা আমাকে একটা স্কুটার কিনে দেবেন বলেছিলেন। বলেছিলেন টাকা রাখা আছে। আমার বারো থেকে চোদ্দ হাজার টাকা চাই। আজই চাই, এখুনি চাই।'
মেজভাই বললে, 'এ সব কথা তুই কাকে বলছিস? কে তোকে দেবে?'
'এই তো পথে এসো। আমারও তো সেই একই প্রশ্ন, কে দেবে, কী বেসিসে দেবে।'
'সিন্দুক তো আর দেবে না।'
প্রসূন বললে, 'সব বের করে একটা লিস্ট করা হোক। তারপর নিজেদের মধ্যে একটা বোঝাপড়ায় এসে ভাগাভাগি করে নিলেই হয়।'
সেজ বললে, 'সে ধরনের বোঝাপড়ায় আসতে হলে শুধু লিস্ট করলেই চলবে না, প্রত্যেকটা জিনিসের ভ্যালুয়েশন করতে হবে। সব জুড়ে যতো টাকা হবে, সেইটাকে এইবার সমান ভাগে ভাগ করে নিতে হবে।'
মেজ বললে, 'সমান মানে! সমান ভাগ হবে কেন? গীতা আর নীতা একটা পার্সেন্টেজ পাবে। ওদের তো সব বিয়ে হয়ে গেছে।'
গীতা বললে, 'বিয়ে হলেই হয়ে গেল। মা-বাপের বিষয় সম্পত্তিতে মেয়েদেরও সমান অধিকার।'
মেজ অদ্ভুত এক ধরনের হেসে বললে, 'বলে বটে, তবে কোনও মেয়েই সেভাবে দাবি করে না। আর করবেই বা কেন, তাদেরও তো একটা চক্ষুলজ্জা ভদ্রতা আছে।'
নীতা বললে, 'আমাদের নেই। আমরা সমান ভাগ চাই।'
ছোট বললে, 'ব্যাপারটা তাহলে কোর্টকাছারির দিকেই চলল। সেই ভালো। সিন্দুকটা তাহলে না খোলাই ভালো!'
সন্দীপ বললে, 'কোর্ট কাছারি? সে তো বিশবাঁও জলে গিয়ে পড়া। তার চেয়ে নিজেদের মধ্যে থেকে একজনকে নেতা নির্বাচন করে তার নির্দেশ মতো ভাগাভাগি করে নেওয়াই ভালো।'
ছোট বললে, 'নির্বাচন মানেই তো ভোট। ভোট মানেই রাজনীতি। এ বাড়িতে একমাত্র আমিই অ্যাকটিভ পলিটিকস করি, বাকি সবাই তো মেনিমুখো ম্যাদামারা। নেতা হতে হলে আমাকেই হতে হয়।'
মেজ বললে, 'এ তোর রাজনীতি নয়। এসব ব্যাপারে চিরকালটা যা হয়ে আসছে তাই হবে। বড়ো যে সেই নেতা হবে তার কথা মতোই সব হবে। শাস্ত্র কি বলে জানিস, পিতার অবর্তমানে নেকস্ট যে ছেলে বড়ো সে-ই পিতার মতো। বড়দা নেই। আমি আছি। তার মানে আমিই এখন পিতার মতো। আমি সিন্দুকটা খুলব। যখন খুলব তখন ঘরে কেউ থাকবে না। এক এক করে বের করে সাজিয়ে আমি ডাকব তখন সবাই আসবে। আমি আমার খুশি মতো এক এক করে যাকে যা দোব তাইতেই সে সন্তুষ্ট হয়ে সরে পড়বে।'
'আহা রে?' নীতা সুর করে বলে উঠল। 'কী আনন্দ মেজদা! আনন্দধারা বহিছে ভুবনে। পিতার অবর্তমানে তোমার আর পিতা হয়ে কাজ নেই। আমরা অনাথই থাকতে চাই। তাইতেই আমাদের আনন্দ।'
মেজগিন্নি সঙ্গে সঙ্গে স্বামীর মামলা হাতে নিয়ে জাঁদরেল ব্যারিস্টারের মতো এগিয়ে এল। গম্ভীর মুখে বললে, 'ঠাকুরঝি বিষয় সম্পত্তি বড় না সম্পর্ক বড়? মেজদা তোমাদের চেয়ে অনেক বড়, তার একটা মানসম্মান আছে। সকলের সামনে তুমি তাকে এইভাবে অপমান করলে?'
নীতা বললে, 'বেশ করেছি। মেজদা দেশে গিয়ে ধান জমি বিক্রি করে এল। সেই টাকা কোথায়?'
'সে টাকা তোমার মেজদা গুনে গুনে সব মায়ের হাতে তুলে দিয়েছে।'
'ছটা ডিসি ফ্যান বিক্রি করা টাকা কোথায় গেল?'
'সে টাকাও মাকে দেওয়া হয়েছে!'
'এই বাড়ি তৈরির পর পাঁচ হাজার ইট, বিশ বস্তা সিমেন্ট বেঁচেছিল। সেই ইট সিমেন্ট বিক্রির টাকা কোথায় গেল?'
'সব মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিল।'
নীতা খিল খিল করে হেসে বললে, 'ভালো টেকনিক। মা তো নেই, সবই এখন মায়ের কাছে। প্রমাণের আর কোনও উপায় নেই।'
প্রসূন বললে, 'কী ছোটলোকমি হচ্ছে নীতা। তোমার তো লোভ ছিল না। হঠাৎ লোভী হয়ে উঠলে কেন?'
'তুমি থামো! বেশি বোকো না, তোমার দামি নেশা চটকে যাবে।'
মেজগিন্নি বললে, 'তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না?'
'মেজদা যদি দিয়েই থাকে সব টাকা তাহলে সিন্দুকে থাকবে।'
মেজকত্তা বেশ বড় এক টিপ নস্যি টেনে বললে, 'সেটা আমাদের জানার কথা নয়। সে জানবে মায়ের পেয়ারের মেয়ে গীতা। যত প্রাণের কথা ওর সঙ্গেই হত।'
মেজ একট চাল চালল। পুরো সন্দেহটা ঘুরিয়ে দিতে চাইল বোনের দিকে।
সিন্দুকের চাবি গীতার কাছে। গীতা সঙ্গে সঙ্গে বললে, 'সে-টাকা সিন্দুকে নেই। আছে ডানকুনিতে।'
সকলে সমস্বরে বলে উঠল, 'ডানকুনিতে? সেখানে কে আছে?'
মেজর মুখ শুকিয়ে গেল। স্ত্রীর দিকে করুণ চোখে তাকালো।
গীতা বললে, 'ডানকুনিতে কে আছে? মেজদার তিন কাঠা জমি আছে।'
প্রসূন বললে, 'তাই নাকি। মেজদা তাহলে ল্যান্ডলর্ড।'
ভাইয়েরা গুঞ্জন করে উঠলো, 'মেজদা তুমি জমি কিনেছ? কই আমাদের জানাওনি তো?'
মেজ আমতা আমতা করে বললে, 'জানিসই তো চিরকালই আমি প্রচার বিমুখ। নিজের ঢাক নিজে পেটাতে পারি না।'
ছোটভাই বললে, 'তা আর জানি নে। একেই বলে সিংকিং সিংকিং ড্রিংকিং ওয়াটার।'
মেজগিন্নি বললে, 'কেউ যদি নিজের টাকায় জমি কেনে, কিছু বলার আছে! কেউ মদ খেয়ে টাকা ওড়াচ্ছে, আর কেউ সঞ্চয় করে তিন কাঠা জমি কিনেছে। অন্যায়টা কী হয়েছে। এতে হিংসে করার কী আছে।'
নীতাকে ঠেস মারা হল। নীতা না রেগে বললে, 'হিংসে নয়, সন্দেহ। আজকাল জমি কেনা সহজ নয়। মেজদার যা রোজগার তাতে সংসার চালিয়ে দুম করে জমি কেনা যায় না।'
মেজকর্তা হঠাৎ ভীষণ রেগে গিয়ে বললেন, 'টাকাটা যদি মেরেই থাকি বেশ করেছি। কার বাপের কী?'
সন্দীপ বললে, 'হোল ব্যাপারটা ক্রমশই নোংরামির দিকে চলে যাচ্ছে।'
ছোটভাই বললে, 'তা তো যাবেই। জায়গাজমি, বিষয়-সম্পত্তি খুব একটা পরিষ্কার জিনিস নয়।'
সন্দীপ বললে, 'গীতা তুমি চাবিটা ফেলে দাও। আমরা এইবার চলে যাব। তোমার অত ইনটারেস্ট কীসের। এই পিঠে ভাগ তোমার ভালো লাগছে?'
সেজভাই বললে, 'পালালে চলবে না। মাল বুঝিয়ে দিয়ে যেতে হবে। তা না হলে আমাদের সন্দেহ হবে!'
গীতা বললে, 'কীসের সন্দেহ!'
'মাল না মিললেই মনে হবে তুই ঝেড়ে দিয়েছিস?'
'না মিললে মানে? কীসের সঙ্গে মেলাবে? ক্যাটালগ আছে?'
'লেখা নেই, তবে মাথায় আছে। আমাদের প্রত্যেকের মাথায় আছে। এই ছিল, ওই ছিল, যেমন শুনেছি মায়ের একটা হীরের আংটি ছিল। এক জোড়া নীলা বসানো সোনার সাপ তাগা ছিল।'
প্রসূন বললে, 'এ সব কেউ দেখেছে কোনও দিন?'
'এ তো দেখার জিনিস নয়, শোনার জিনিস, কানাকানির জিনিস।'
'তাহলে কানেই থাক না, চোখে দেখার প্রয়োজনটা কী? সিন্দুকটাকে আরও ভালো করে সিল করে চাবিটা বিসর্জন দেওয়া হোক।'
ছোটবউ বললে, 'সেই ভালো। এই নিয়ে অনেক দিন ধরে জল ঘোলা হচ্ছে। মন কষাকষি, মুখ ভার, বাঁকাচোরা কথা।'
সন্দীপ বললে, 'আর একবার ইন্টারভ্যাল হোক, আমরা এক কাপ করে চা খেয়ে একটু শক্তি সঞ্চয় করে নিই।' সকলের একমত, বেশ তাই হোক। সেজ আর ছোট বউ চা করতে চলে গেল। মেজকর্তা বললে, 'একটা জিনিস লক্ষ করছি, সেই নকশাল আন্দোলনের পর থেকে ছোটরা আর বড়দের তেমন মানতে চায় না। বয়েসের সম্মান দেশ থেকে উধাও। মূর্তির মাথা কাটছে, শিক্ষকদের ধরে ধরে ঠ্যাঙাচ্ছে। জ্যাঠামশাইয়ের কাছা খুলে দিচ্ছে। আমি সেই কারণেই ধার দেনা করে সেই ডানকুনিতে এক টুকরো জমি কিনে ফেললুম। খাই না খাই, শেষ জীবনটা শান্তিতেই থাকা যাবে বাবা।'
প্রসূন বললে, 'ভালো করেছেন। এ বাড়িতে গ্যাঞ্জাম ক্রমশ বাড়বে। সকলের সংসার বড় হতে শুরু করেছে।'
'আরে ভাই, এখনই বাথরুমে লাইন লাগাতে হয়।'
সন্দীপ বললে, 'এ বাড়ির অংশটা কী করবে!'
'ভাইদের মধ্যে যে কিনতে চায়, তাকে বেচে দেব!'
'যদি না চায়।'
'চাইতেই হবে। নয়তো বাইরের ভাড়াটে ঢুকে পড়বে।'
'আপনার অনেক প্যাঁচ পোঁচ জানা আছে মেজদা।'
মেজকর্তা প্রশংসা ভেবে মুচকি মুচকি হেসে জোরে জোরে নস্যি টানতে লাগল। কাপ কাপ চা এসে হাতে হাতে ঘুরে গেল। ঘর উৎকণ্ঠায় স্তব্ধ। এইবার সিন্দুক খোলা হবে। গীতার হাতে সোনালি রঙের সেই লোভনীয় লম্বা চাবি দুলছে! চাবি আড়াই পাক খুললেই খুলে যাবে সিন্দুকের জগৎ। দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার অবসান।
গীতা জানলার ধার থেকে সিন্দুকের দিকে ধীরে ধীরে এগোতে এগোতে বললে, 'আমি তাহলে খুলছি এবার।'
সকলে টান টান। জোরে জোরে নি:শ্বাস পড়ছে। মেজকর্তা নস্যির টানটি সমাপ্ত করে পাজামার পিছনে আঙুল মুচছে। গীতা সিন্দুকের মাথাটা তোয়ালে দিয়ে ঝাড়ছিল।
মেজ বললে, 'ঝাড়াঝাড়ি পরে হবে।'
সেজ বললে, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, খোলার পর ঝাড়াঝাড়ি, ঝাড়পিঠ তো হবেই।'
সময়টা ভারী সুন্দর। সূর্য সবে অস্ত গেছে। আকাশ লাল! পাখি ফিরছে বাসায়। এইরকম সময়েই ক্ষণপ্রভাও ফিরে গিয়েছিল তাঁর আবাসে। মায়ের কথা এদের আর তেমন মনে পড়ে না। মা এখন সিন্দুক।
গীতা সিন্দুকটাকে পরিষ্কার করতে করতে বললে, 'এ ঝাড়াঝাড়ি, সে ঝাড়াঝাড়ি নয়। এ হলো ধুলো ঝাড়া। তোমরা কেউ ধুলোটাও তো ঝাড়ো না।'
প্রসূন বললে, 'ধুলো ঝেড়ে কী হবে। ঝাড়তে হলে সোনাদানা ঝাড়াই ভালো।'
সন্দীপ বললে, 'মারি তো গণ্ডার, লুটি তো ভাণ্ডার।'
গীতা চাবি ঢোকাচ্ছে। সবাই চুপচাপ। চাবি ঘুরছে। এক, দুই, আধ। ডালাটা জীবন্ত প্রাণীর মতো লাফিয়ে উঠল। ক্ষণপ্রভার ঘুম ভাঙছে।
গীতা সকলের দিকে তাকিয়ে অনুমতি নিল, 'খুলি তাহলে?'
'হ্যাঁ, হ্যাঁ, আর দেরি কেন?' আর ধৈর্য নেই। এক বছরের ধৈর্যের বাঁধ এইবার ভেঙে পড়েছে। ডালাটা বেশ ভারী। খোলার সময় তিনটি কবজা, তিনটে চড়াইয়ের মতো তিনবার কিঁচ করে উঠল। অদ্ভুত একটা পুরোনো গন্ধ হালকা হয়ে ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। প্রাচীনের গন্ধ আছে। ডালাটা সম্পূর্ণ সোজা হওয়ার সময় আর একবার শব্দ হল। ক্ষণপ্রভার কণ্ঠস্বরের মতো—'কী রে, তোরা ভালো আছিস?'
দুই জামাই ছাড়া আর সবাই ঠেলাঠেলি করে এগিয়ে গেল সিন্দুকের কিনারায়। চারটে ধার নেমে গেছে গভীরে। অন্ধকার ছলছল করছে। কে একজন বললে, 'টর্চ একটা টর্চ।'
কে একজন বললে, 'টর্চ লাগবে না। ওই দেওয়ালের আলোটা জ্বেলে দাও।'
গীতা এই ফাঁকে কখন সরে এসেছে। তিন ধারে ছেলে আর বউয়েরা গুঁতোগুঁতি করছে।
মেজ বললে, 'কই কী আছে? কিছুই তো দেখছি না।'
সেজ বললে, 'একটা টিনের বাক্স পড়ে আছে তলায়,' নীচু হয়ে হাত বাড়িয়ে তুলতে গেল।
মেজ বললে, 'উঁহু, উঁহু, আমি তুলব, আমি। সব কিছুরই একটা শাস্ত্র আছে।'
মেজ ক্ষিপ্রগতিতে নীচু হল। মাথাটা ঠুকে গেল ডালায়। সামনে তেমন চুল নেই। অন্য সময় হলে এই লাগাতেই উ: করে উঠত। এখন আর দেহবোধ একেবারেই নেই বললেই চলে।
মেজ দুহাতে মাঝারি মাপের চৌকো একটা টিনের বাক্স তুলে আনল!
'টফি' ছিল কোনও কালে। ঢাকনায় নিষ্পাপ একটি শিশুর হাসি হাসি মুখ।
সমস্বরে সকলের প্রশ্ন, 'কিছু আছে? আছে কিছু? খোলো খোলো।'
ধীরে ধীরে মরচে পড়েছে। ঢাকনা সহজে খুলছে না। মেজ স্ত্রী-কে বললে, 'তোমার আঙুলে তো বড় বড় নখ।'
সবাই হই হই করে উঠল। 'আমাদেরও নখ আছে, আমাদেরও নখ আছে।'
মেজগিন্নির হাতে বাক্স। একমুখ হেসে বললে, 'আমার নখ সবচেয়ে বড়!'
মেজগিন্নি বাক্সটা নিজের কোলে ফেলে বাক্সর ঢাকনা খুলেই ভয়ে 'ওমা' করে উঠল। চারপাশ থেকে ঘিরে এল সবাই। ভিতরে নীল এক টুকরো ভেলভেট। তার ওপর পাশাপাশি পড়ে আছে দু'পাটি বাঁধানো দাঁত। হাসছে ক্ষণপ্রভার দেহহীন খিল খিল হাসি।
জেনারেটার চলতে চলতে থেমে গেলে যে ধরনের অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমে আসে, সারা ঘর সেইরকম থমথমে। জেলির মতো সব থকথকে মুখ। মেজগিন্নির কোলে বাক্স। সেই বাক্সে নীল ভেলভেটের ওপর দুপাটি সাদা দাঁত অনন্তের হাসির মতো ঝকঝক করছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন