সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

বাজারে ঢুকেই দেখি সদানন্দবাবু। হাতে একটা চটের ব্যাগ, যার একটা হাতল নেই, একদিকে হেলে আছে। চোখে একটা রংচটা চশমা। এই সাতসকালেই সারা মুখে একটা খুঁতখুঁতে ভাব লেপ্টে আছে। ভোরের বাজার সবে বেপরীরা মালপত্র সাজিয়ে বসা শুরু করেছে। তেমন ভিড় নেই। সদানন্দবাবুকে দেখলেই আমার একটি মাত্র প্রশ্ন, কী কিছু হল? এই একটা প্রশ্ন অনেক কিছু কভার করে।
কিছু হল! মানে অনেক কিছু। যেমন সদানন্দবাবুর দুই ছেলে পাশ-টাশ করে অনেকদিন বসে আছে। তাদের চাকরির কিছু ব্যবস্থা হল কি না? বড় জামাইয়ের ফ্যাক্টরিতে লক-আউট চলছে, তার কী হল? সদানন্দবাবুর এক্সটেনশন হল কি না! স্ত্রী জনডিসে ভুগছিলেন, মালা পরেছিলেন, সেই মালা পরার পর জনডিস কমেছে কি না? সদানন্দবাবু নিজে ভীষণ কনসটিপেশন আর অর্শে কষ্ট পাচ্ছিলেন, ইসবগুলের ভূষি খেয়ে কিছু ফল পাবেন কি না? বাড়ির নীচে একঘর ভাড়াটে, বছরখানেক ভাড়া বন্ধ রেখেছে, সেই ঝামেলার কিছু হল কি না। আমার এক প্রশ্নের ঢিলে অনেক পাখি মারার চেষ্টা।
সদানন্দবাবু একটু মুচকি হাসলেন। সেই হাসিতেই সব প্রশ্নের জবাব লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ কিছুই হয়নি। যা ছিল সব একইরকম আছে। মুচকি হেসে সদানন্দবাবু পকেট থেকে একটা ছোট নস্যির ডিবে বের করে তালে তালে বার কতক টুসকি মারলেন, তারপর ঢাকনা খুলে মাঝারি ধরনের এক টিপ নস্যি নিয়ে বেশ জোরে সশব্দে নাকে টানলেন। আমার দিকে ডিবেটা এগিয়ে দিতে গিয়ে কী ভেবে হাফহাতা সাদা লংক্লথের জামার পাশ পকেটে ফেলে দিয়ে বললেন, 'নস্যি বা সিগারেট আগের মতো কাউকে অফার করতে পারছি না।' আমি বললুম, 'না-না নস্যি আমি নিই না, সিগারেটও খাই না, বদ অভ্যাসের মধ্যে চা-টাই আছে।'
'ও:, খুব বেঁচে গেছেন, অনেক পয়সা মশাই সেভিংস হয়। আমার দেখুন সারাদিনে এই ছোট এক ডিবে বরাদ্দ আর এক প্যাকেট সিগারেট।'
'আপনার এই থলের হাতলটা মেরামত করিয়ে নেন না কেন?'
'এটাও ব্যয় সঙ্কোচের একটা কৌশল।'
'কীরকম?'
'ইচ্ছে থাকলেও বেশি বাজার করতে পারব না। এক দিকটা হেলে যাবে। আমরা হলুম সেকালের মানুষ। খেয়েই ফতুর। টেরিলিন মেরিলিন বুঝি না। শ্যাম্পু সাবান, টনিক-মনিক আমাদের কালে ছিল না। সেই অভ্যাসটা রয়ে গেছে। এই ব্যাগের মেরামতিটা গিন্নির মাথা থেকে বেরিয়েছে। একখানা মাথা মশাই।'
কথা বলতে বলতে বেপারীর ঝাঁকা থেকে সদানন্দবাবু একটা বেশ বড় পটল তুলে নিয়ে দর জিগ্যেস করলেন। দু টাকা কিলো। হাত থেকে পটল পড়ে গেল। সে কি মশাই! কালও যে দেড় টাকা ছিল! সদানন্দবাবু বিস্ময়মাখা মুখে আমার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন, পটলের গায়ে একটা আঙুল আলতো করে ছুঁইয়ে রাখলেন।
আমি কী বলব? বেপারীকেই বারকতক প্রশ্ন করলুম। তার উত্তর দেওয়ার সময় কোথায়! সে তখন নানারকম তরিতরকারি সাজাতে ব্যস্ত। আমরা হলুম বাজারের মধ্যে নিতান্তই হাঘরে খদ্দের। আমরা ভেগে গেলেই সে খুশি হয়। বারবার বিরক্ত করায় সে উত্তর দিতে বাধ্য হল, বললে, 'জানেন না ভোরবেলা বৃষ্টি হল।' উত্তর শুনে সদানন্দবাবুর মুখের শক্ত ভাব নরম হয়ে হাসিতে ছেয়ে গেল, 'তাই বলো!' সদনন্দবাবু টপাটপ পাল্লায় পটল তুলে ফেললেন। এইবার আমার অবাক হওয়ার পালা। সদানন্দবাবু বললেন, দাম তো বাড়বেই, বেড়েই চলবে, তার জন্যে কেনা তো আর বন্ধ করা যায় না; কিন্তু কারণটা জানতে না পারলে মনটা খুঁতখুঁত করে। আজকে তাড়াতাড়ি পটলের দাম কিলোতে পঞ্চাশ পয়স বাড়ার কারণটা যেই জানতে পারলুম আমি খুশি হয়ে গেলুম। বিনা কারণে কিছু হয়ে যাবে সে আপনি-আমি কেউই সহ্য করবে না।'
সদানন্দবাবু পটলের পাল্লায় আমাকে ফেলে মাছের বাজারের দিকে চলে গেলেন।
বাড়ি ফিরে দ্বিতীয় কাপ চা খেতে খেতে মনে হল সদানন্দবাবু ঠিকই বলেছেন, জীবনের সবচেয়ে বড় খোঁজা হল ঈশ্বর নয়, মোক্ষ নয়, অর্থ নয়, কারণ। কারণ শব্দটা বিবিধ ভারতীর বিজ্ঞাপনের কায়দার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি হয়ে সারা ঘরে ছড়িয়ে গেল—কারণ, কারণ, কারণ। কারণটাই হল সব জানার বড় জানা। পাখার দিকে তাকিয়ে দেখলুম স্থির। আজ তো বিদ্যুৎ বন্ধের দিন নয়। কী ব্যাপার, কারণটা কী? কে বলতে পারে কারণ? ওরে আজকের কাগজটা নিয়ে আয় তো। কাগজ এল। হ্যাঁ, এই তো প্রথম পাতাতেই রয়েছে, ব্যান্ডেলে গোটাকতক বয়লার পটল তুলেছে। বয়লারের বিকল হওয়ার কারণ? হ্যাঁ সে কারণও রয়েছে, খারাপ কয়লা। কোলিয়ারি খারাপ কয়লা দিচ্ছে কী কারণে? কে বলতে পারে! দেখি রান্নাঘরে গিয়ে। 'তুমি কি আজকাল খারাপ কয়লা পাচ্ছ?' 'আমি তো কয়লায় রাঁধি না। গ্যাসে রাঁধি।' 'তাই নাকি? কয়লায় রাঁধো না কেন, কী কারণ?' 'কারণ মোটা হয়ে গেছি, কয়লায় রাঁধতে গেলে বসে বসে রাঁধতে হবে, ভুঁড়িতে লাগে!' 'বেশ! একটু চা খাওয়াবে?' 'দুধ ছাড়া খেতে হবে।' 'কারণ?' 'হরিণঘাটা আজ দুধ দেয়নি।' 'কারণ?' 'আস্ক হরিণঘাটা।' 'বাবা! ইংরেজি বলছে যে! আমার সাদামাটা স্ত্রী হঠাৎ ইংরেজি বলতে শুরু করেছে কী কারণে। কারণ আর জানা হল না। কী কারণে? বেশি বকালে অফিসের ভাত পাব না।
অত:পর চটি পায়ে গলিয়ে মিল্কবুথের দুগ্ধবালিকাদের কাছে গেলুম। 'আজ দুধ আসেনি কেন ভাই!' 'বাছুরে খেয়ে গেছে? হরিণঘাটায় বাছুর এল কোথা থেকে, সেখানে তো সবই টিনের গরু। না ভাই ঠিক বলছ না।' 'কী করব বলুন, সকাল থেকে ওই একই প্রশ্ন, মাথার ঠিক নেই। আজকের কাগজেই কারণ আছে।' আবার বাড়ি এসে কাগজ পেতে বসুলম। হ্যাঁ, এই তো রয়েছে! করপোরেশন ঘোলা জল দিচ্ছে, গুঁড়ো দুধ গোলা যাচ্ছে না। করপোরেশন ঘোলা জল দিচ্ছে কেন? ও সে তো কমিশান বসেছে বোধহয়!
স্ট্যান্ডে এসে দেখি বাস নেই, লোক থই থই করছে, সাড়ে আটটার খদ্দেরও দাঁড়িয়ে। ব্যাপার কী? দাঁড়িয়ে কেন? বাস নেই! বাস নেই কী কারণে? গুমটির স্টার্টার বেজার মুখে বললেন, কেন রোজই সেই এক প্রশ্ন! আমাকে জিগ্যেস করেন কী কারণে? স্টেট ট্রান্সপোর্টের চেয়ারম্যানকে জিগ্যেস করুন। চেয়ারম্যানকে এখন এখানে এই মুহূর্তে পাই কী করে! স্ট্যান্ডের কাছেই বন্ধুর ওষুধের দোকান। গোটাকতক চেয়ার আমাদের জন্যে পাতাই থাকে। বাস যখন থাকে না চেয়ারে কিছুক্ষণ বসা মানেই গ্যারেজে গাড়ি রাখার মতো ব্যাপার। ছোটখাটো মেরামতের কথা মনে পড়বেই। সকালে পায়খানার সময় মনে হল পেটটা যেন দুবার মোচড় দিল, গোটাকতক আমাশার বড়ি খেলে মন্দ হয় না। দাও সুশীল একপাতা অ্যান্টিএমিবিক কিছু। শরীরটা কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে, তেমন আর এনার্জি পাই না, দাও সুশীল একপাতা মাল্টিভিটামিন। আরে শরীরের মধ্যে লিভারটাই তো মেন, সেটাকেও তো একটু তোয়াজ করা দরকার। দাও সুশীল, গোটা তিরিশ ওই অ্যালোপ্যাথিক কবরেজি বড়ি। বাসের পাত্তা নেই, এদিকে দশটাকার ওষুধ গস্ত হয়ে গেল। বন্ধু হলে হবে কী! সুশীলের কম মাথা! কেমন দু'টি চেয়ার-ফাঁদ পেতে রোগ ধরেছে।
একটা বাস এল। হে-রে-রে-রে-রে করে সকলে প্রাণের মায়া ছেড়ে দৌড়লুম। ড্রাইভার, কনডাকটার সকলেই হাত পা নেড়ে বোঝাতে চাইছেন, এ বাস যাবে না। প্রচণ্ড আশাবাদী যাঁরা তাঁরা সিট আঁকড়ে বসে রইলেন। আমরা যারা ঝুলছিলুম নেমে এলুম। কনডাকটাররা গুমটির দিকে গটগট করে চলেছে—হ্যাঁ ভাই যাবেন না কেন? উত্তরে কী আর দেয়! ছোট কথা কানে ঢোকে না, শেষে বিরক্ত হয়ে একজন বললেন, 'ড্রাইভারের আজ মন খারাপ?' কনডাকটার বললেন, 'ব্যাচেলার লোক, কাল নাইট শোতে হিন্দি ছবি দেখে রেখার জন্যে মন খারাপ হয়েছে। সারারাত ঘুমোতে পারেনি, খালি এপাশ ওপাশ করেছে আর রেখা রেখা বলে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলেছে। ভিড়ের মধ্যে মায়ের মতো চেহারার এক ভদ্রমহিলা ছিলেন, এগিয়ে এলেন। 'আহারে! তা হ্যাঁ ভাই, একটা বিয়ে দিয়ে দিলে হয় না। আমার সন্ধানে ভালো মেয়ে আছে।' এক ভদ্রলোক মহিলাকে ঠেলে এগিয়ে এলেন সামনে 'কই কোথায়, পাইলটদা কোথায়?' উ:, কী খাতির, বাবাকে শালা বলে আর বাসে ড্রাইভারকে পাইলটদা। গুঁতোর চোটে রামনাম। একজন হাত তুলে চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে থাকা ঝাঁকড়াচুল জুলপিওলা গাঁট্টাগোট্টা ভদ্রলোককে দেখিয়ে বললেন, 'ওই তো পাইলটদা।' যে ভদ্রলোক পাইলটদার খোঁজ করছিলেন তিনি একটু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, তারপর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'আমি খুব মজার মজার কথা বলতে পারি। একটু হাসাবার চেষ্টা করব। ভিড়ের মধ্যে থেকে আর একজন এগিয়ে এলেন 'আমি গান গাইতে পারি।' দেখতে দেখতে সেই পাইলটদার দশ গজ দূরে একদল গুণী মানুষের জমায়েত তৈরি হল। কেউ নাচতে পারেন, কেউ গাইতে পারেন, কেউ ম্যাজিক জানেন, একজন মাথা নীচু করে পা উপর দিকে তুলে পি-কক হয়ে হাঁটতে পারেন। আমি কিছু পারি কি না একজন জিগ্যেস করলেন। 'অল্পস্বল্প অ্যাকটিং করতে পারি।' 'তাহলে দূরে দাঁড়িয়ে কেন? চলে আসুন চলে আসুন, পাইলটদার মেজাজ ঠিক করতে পারলেই বাস চলবে।'
পাইলটদা এদিকে নির্বিকার, বসে বসে সিগারেট খেয়ে চলেছেন। ইতিমধ্যে যিনি গাইতে পারেন তিনি টিফিন কৌটো বাজিয়ে গান ধরলেন, 'মেরা জুতা হ্যায় জাপানি।' যিনি নাচতে জানেন তিনি পাছা দুলিয়ে ধুমধুম করে খানিক নেচে নিলেন। ব্রিফ কেস মাটিতে রেখে জিমনাস্ট ভদ্রলোক ফুটপাতে পি-কক হয়ে পা দুটো খচাখচ নাড়তে লাগলেন। এইবার আমার পালা। গলা খাদে নামিয়ে শুরু করলুম, 'বাঙলার ভাগ্যাকাশে আজ...।' এত হট্টোগোলের মধ্যেও কান আমাদের খাড়া ছিল। যতই হোক লম্বকর্ণের জাত তো! আর একটা বাসের আওয়াজ দূরে শোনা গেল। আমরা পোজিশন নেওয়ার জন্যে হুড়মুড় করে দৌড়তে শুরু করলুম। জিমন্যাস্ট ভদ্রলোক সোজা হতে ভুলে গিয়ে হাতেই ছুটছিলেন, আমি সোজা হওয়ার কথা মনে করিয়ে দিলুম। বাস অবশেষে এল কুচকি কণ্ঠা বোঝাই হয়ে। মানুষের শরীর যেহেতু রবারের মতো আমরা আরও শ'দুয়েক ঠাসাঠাসি করে ধরে গেলুম। স্টার্টার পাইলটকে চেঁচিয়ে বললেন, 'মিউজিক'। তারপর নিজে হাতের পেনসিলটাকে কনসার্ট কনডাকটারের কায়দায় দোলাতে লাগলেন, ড্রাইভার তখন তালে তালে বাসটাকে ব্রেক করে ছেড়ে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে সমস্ত ফাঁকফোকর ময়দা গাদা করে বাসটাকে একপাশে ফেলে রেখে চা পিতে গেলেন। দেখতে দেখতে আমাদের ঘামে বাসের ভিতরে একটা জলাধার তৈরি হয়ে গেল। চোখের চশমার কাঁচ বাষ্পে ধোঁয়াটে হল। এতক্ষণ খেয়াল করিনি, জিমন্যাস্ট ভদ্রলোক আমার বুকের সঙ্গে লেপটে ছিলেন, ফিস ফিস করে বললেন, 'সরকার বাহাদুর আমাদের কত উপকার করেছেন বলুন তো। এই ধরনের সানবাথ নিতে গেলে, মিনিমাম পঞ্চাশ টাকা খরচ, আর এ দেখুন চল্লিশ পয়সায় হয়ে গেল।'
বকুলতলায় বাস থেকে নেমে বাঁচলুম। বাস টার্মিনাস থেকে ছাড়তে যত গড়িমসি। রাস্তায় একবার গড়াতে শুরু করলে আবার উলটো ব্যাপার। তখন থামানো মুশকিল। বকুলতলায় বাসটা একটু থেমেই ভীষণ ঝাঁকি মেরে এগিয়ে গেল। একটা পা রাস্তায় আর একটা পা তখনও ফুটবোর্ডে। বায়ুসেবী সন্তানদের পায়ের জটলায় জড়াজড়ি হয়ে আছে। বেশ কিছুদূর বাসের সঙ্গে জড়ানো পা নিয়ে ক্যাঙারুর মতো লাফাতে লাফাতে গেলুম। প্রথমে চোখ থেকে চশমাটা ছিটকে পড়ল তারপর এক এক করে খুচরো পয়সাগুলো পাশ পকেট থেকে ছিটকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে গড়িয়ে গেল, সবশেষে আমি পদচ্যুত হয়ে ছিটকে পড়লুম করপোরেশনের একটা ময়লা তোলা ঠেলাগাড়ির চাকার ওপর। এসব ঘটনা শহর কলকাতায় এত স্বাভাবিক, কেউই গ্রাহ্য করে না, না পথচারী, না ভুক্তভোগী, না বাসযাত্রী। চটিটা খুলে বাসের পাদানিতে আটকে ছিল, কে দয়া করে লাথি মেরে পথে ফেলে দিল। সেটা চলন্ত বাস থেকে প্রায় বিশগজ দূরে গিয়ে পড়ল চিৎপাত হয়ে। বাঁ পায়ে চটি, ডান পা খালি। কাপড়ের কাছাটা খোলা। পাঞ্জাবি ঘামে জবজবে। বুকের কাছে আবার খানিকটা জায়গা সিন্দুরে লাল। মনে হয় ধাস্তাধস্তি করে নামার সময় কারুর সিঁথির সিন্দুর মুছে দিয়ে এসেছি, এই দাগটুকুই নিট লাভ। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে গিয়ে জুতোটা উদ্ধার করে নিয়ে এলুম। ইতিমধ্যে কাছাটাও সামলে নিয়েছি। খুচরো পয়সার কিছু কুড়িয়ে পেলুম, কিছু গড়িয়ে চলে গেছে। চশমাটা নাকের ডগায় চলে এসেছে।
অফিসে তখন টেবিলে দ্বিতীয় দফায় চা পড়ে গেছে। বড়বাবু পেনসিল দিয়ে কানের গর্তে সুড়সুড়ি দিতে দিতে একচোখ আধবোজা এক চোখ খোলা রেখে প্রশ্ন করলেন, কী ব্যাপার মশাই, আজ এত দেরি, কারণ কী? চেয়ারে নিজেকে আস্তে আস্তে বসিয়ে মুখে কয়েকটা হাসির রেখা ভাসিয়ে উত্তর দিলুম, 'একাধিক'। পেনসিলটাকে কান থেকে বের করে সামনের ফাইলে একটা পদ্মফুল আঁকতে আঁকতে বড়বাবু বললেন, 'শুনি।' আমি গেঞ্জির সুতোর মতো কারণের সুতো ফড়ফড় করে খুলে গেলুম :
'ভোর সাড়ে চারটের সময় উঠে আমি এক গেলাস ত্রিফলার জল খাই, তারপর খাই এক গেলাস গরম চা, তারপর বার দশেক পেটটাকে খামচে বাথরুমে যাই। আজ হল কী, ভোরে বৃষ্টি, ঘুম ভাঙল না, যখন ভাঙল তখন সাড়ে ছটা। এই বেলায় ঘুম ভাঙলেই সর্বনাশ!' বড়বাবুকে সাসপেন্সে রেখে, একটু জল খেলুম। তারপর আবার শুরু করলুম। 'যাই আর আসি, কিছুতেই তিনি খালাস হতে চান না। কাপের পর কাপ চা। খাবার ঘরে খালি কাপের লাইন পড়ে গেল। আমার স্ত্রীকে বলাই আছে, এরকম পরিস্থিতিতে যেমন করেই হোক আমাকে একটু ভয় পাইয়ে দিতে হবে। দিলেই কাজ সারা। কারণ আমার একটু নার্ভাস ডায়েরিয়ার ধাত আছে। স্ত্রী ডালের হাতা ধরে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, তোমার মেয়ে আসছে কাল। ব্যাস সেই যে বাথরুমে ঢুকলুম, পেটে পিঠে এক হয়ে পিচবোর্ড হয়ে গেল।'
বড়বাবু পদ্মফুলের পাপড়িগুলোকে বেশ খেলাতে খেলাতে বললেন, 'সেটা আবার কী? মেয়ে আসছে বলায় ভয় পাওয়ার কারণ?'
'কারণ মেয়ে নয়, আমার নাতি। যে সকালে কাঁদে, দুপুরে কাঁদে, রাতে কাঁদে, মাঝরাতে কাঁদে। আর যখন কাঁদে না তখন সমস্ত কিছু ভাঙে। কাপ ভাঙে, ডিশ ভাঙে, কাচের গেলাস ভাঙে, চশমা ভাঙে, দেওয়াল ভাঙে, দরজা জানলা আঁচড়ায়। শেষে হাতের কাছে কিছু না পেলে যাকে পায় তাকে খামচায়।
'হুঁ, এ তো দেখছি ব্রাওনিয়ার কেস' বড়বাবু পেনসিল চিবোতে চিবোতে বললেন। ভদ্রলোক হোমিওপ্যাথি চর্চা করেন। স্ত্রী আবার শিশুরোগে বিশেষজ্ঞ। অফিসের তাবৎ মহিলা তাঁর পেশেন্ট।
বড়বাবু বললেন, 'হোমিওপ্যাথি কথা বলে, বুঝেছেন মশাই। ওই যে রেবা দত্ত'—কথাটা শেষ না করে শূন্যে ঝুলিয়ে রাখতে হল, কারণ একটু দূরেই রেবা দত্ত বসে বসে একটা ঢাউস উপন্যাস পড়ছিলেন, বই থেকে চোখ তুলে কটমট করে বড়বাবুর দিকে তাকালেন। বুঝলাম রেবা দত্তর গুহ্য তত্ব অফিসে ফাঁস হয়ে যাক, এটা তার পছন্দ নয়। বড়বাবু প্রসঙ্গ পালটে বললেন, 'আমি আপনাকে কয়েক পুরিয়া দিয়ে দেব, দেখবেন নাতি আপনার বালগোপাল বনে গেছে।' আমি আশান্বিত হয়ে বললুম, 'আপনার কাছে এমন ওষুধ আছে যা আমাদের বাসগুমটির স্টার্টারকে খাওয়ালে সহজে বাস পাওয়া যাবে? ব্রেকডাউনের প্যাঁচে ফেলে আমাদের বাপের নাম খগেন করে দেবে না?' বড়বাবু হাসি হাসি মুখে বললেন, 'সব আছে বাবা, সব আছে। তবে কী জানেন, সিমটম দেখে চিকিৎসা। কয়েকটা খবর আমার চাই, যেমন লোকটিকে দেখতে কেমন, রোগা না মোটা, কালো না ফরসা? টক খেতে ভালাবাসে, না ঝাল কিংবা মিষ্টি? ডান পাশ ফিরে শোয়, না বাঁপাশ, অথবা চিৎ হয়ে? নাক খোঁটে কি না? ফ্যামিলিতে কারুর একজিমা ছিল কি না! সামনের দাঁত দুটো কেমন? মাথার চুল পাতলা না ঘন!' বড়বাবুর ফিরিস্তি আর শেষ হল না।
সেদিন অফিস থেকে প্রায় হেঁটেই বাড়িতে ফিরতে হল। কারণ? কারণ একাধিক। ময়দানে খেলা ছিল, পথে মিছিল ছিল, রাস্তায় বৃষ্টির জল ছিল, আকাশে মেঘ ছিল, গ্যারেজে গাড়ি বসেছিল, বাস যাত্রী বহন না করে বরযাত্রী বহন করছিল, ট্রাম আউটলাইন হয়েছিল, ট্যাক্সি স্ট্রাইক করেছিল।
পাড়ায় যখন ঢুকলাম বেশ রাত। বাড়িতে আলো থাকলেও রাস্তায় একটুও আলো নেই। ঘোর ঘন অন্ধকার। রাস্তার একপাশে পর্বতপ্রমাণ মাটি। তিলোত্তমা কলকাতার অঙ্গ প্রসাধন। রাস্তার মুখটাতেই বৃদ্ধ ঘনশ্যামবাবু রাস্তার একপাশে লাঠিতে ভর দিয়ে উবু হয়ে বসে আছেন। চোখে রুপোর ডাঁটির ঘোলাটে চশমা। আমার পায়ের শব্দ পেয়ে বললেন, 'কে যায়?'
নাম বলুলম। বৃদ্ধ বললেন, 'তা বেশ, আজ কেমন?'
কুশল বিনিময়ের পর জিগ্যেস করলুম, 'ওখানে অন্ধকারে বসে কেন? বাড়ি যাবেন না?' 'যাব রে ভাই, রাত ন'টায় চাঁদ উঠবে, তখন গলিটায় একটু আলো পড়বে, সেইসময় ঠুকঠুক করে চলে যাব। তার আগে যাই কী করে অন্ধকারে!'
ঘনশ্যামবাবুকে চাঁদের আশায় গলির মুখে বসিয়ে রেখে বাড়ি ঢুকে চা খেতে খেতে দেখি আকাশে ঘন কালো মেঘ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। পুবের আকাশে চাঁদ উঁকি মেরেই মেঘের তলায় ঢুকে গেছে। দেখে ভীষণ ভয় হল। চাঁদ যদি না ওঠে ঘনশ্যামবাবু সারারাত গলিতে উবু হয়ে বসে বসে ভিজবেন সূর্য ওঠার অপেক্ষায়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন