সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

‘ব্রহ্ম অফুরন্ত আনন্দের একটি অখণ্ড আনন্দনাড়ু।' দীক্ষান্তিক ভাষণে একটি নিটোল সন্দেশ মুখে পুরে গুরুদেব আনন্দলাভের কয়েকটি গূঢ় কৌশল আমাকে শিখিয়ে দিলেন। 'জীবন বুঝেছ জনার্দন একটি গামছার মতো। নিঙড়ে নিঙড়ে জল বের করার মতো রস বের করে নেবে। সব সময় একটা কিছু নিয়ে মেতে থাকবে। মাতোয়ারা হয়ে থাকবে। সবসময় নিজেকে একটা না একটা উত্তেজনার মধ্যে তালগোল পাকিয়ে রেখে দেবে। সংসারে থাকবে ঠিক যেন বয়েমের মধ্যে আমের আচার। ধর্মটর্ম কিছু নয়। বাবা! ওটি হল একটি ধর্ম।
মানুষের ধর্মটি পুরোপুরি পালন করবে। কখনও ভগবান হওয়ার চেষ্টা করবে না। ভগবান তোমার ইষ্টদেবতার চিত্রপটে আছেন। সেই চিত্রপট আছে কুলুঙ্গির ওপর তেল, কালি আর ঝুল মেখে। ওই আদরেই তিনি সন্তুষ্ট। আদরের বাড়াবাড়িতেই তিনি রুষ্ট। আর একটি কথা শুনে রাখো বাবা, সংসারে নিজের চেয়ে বড় আর কেউ নেই।'
গুরুর বাক্য যে কত অভ্রান্ত তা এখন আমি বুঝেছি! যৌবনে মানুষের কিঞ্চিৎ মতিভ্রম হয়। অধীত বিদ্যার বদহজম, আদর্শ, মানবতাবোধ, প্রেম, কাম সব মিলিয়ে ভূতগ্রস্ত অবস্থা। বয়েস যত বাড়তে থাকে, জ্ঞানচক্ষু ততই খুলতে থাকে। বেঁচে থাকার, আনন্দে থাকার হাতে কলমে শিক্ষা। তখন প্রৌঢ় আমি, যুবক আমির দিকে তাকিয়ে বলে সেন্টিমেন্টাল ফুল। গুরু বলেছিলেন—জীবনসাধনার কথা। সময়ে সিদ্ধিলাভেরও ইঙ্গিত ছিল। 'দু:খ কোরোনা, সিদ্ধি কারুর অল্পেই হয়, কারুর একটু দেরিতে হয়। আধারের ওপর নির্ভর করে।' আমার আধার বোধহয় ভালোই ছিল। কারণ সিদ্ধি আর সিদ্ধাই দুটোই প্রায় হাতের মুঠোয় এসে গেছে। চিরকালই আমার ধারণা পৃথিবীতে আমিই সব। আমার চেয়ে বড় কেউ নেই। আমার কাছে আমার চেয়ে প্রিয় কেউ নেই। এত বড় স্বপ্রেমী বা আত্মপ্রেমী মানুষ পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় আছে কি না আমার জানা নেই। আমি মনে করি—পৃথিবীর যত আয়োজন সব আমার জন্যেই। আমার ভোগের পর উচ্ছিষ্ট যদি কিছু থাকে অন্যে পাবে। এ ব্যাপারে কোনও আপস নেই। সকালের খবরের কাগজ দিয়েই আমার এই আত্মবিশ্বাসের খেলা শুরু হয়ে যায়। জানালা গলে কাগজটি মেঝেতে পড়ামাত্র আমার আত্মবিশ্বাসী হাত এগিয়ে যায়। আমি যতক্ষণ না সেই কাগজ হাতছাড়া করছি ততক্ষণ অন্য কারুর কৌতূহল প্রকাশের অধিকার বা আগ্রহ থাকলেও উপেক্ষিত। আগে আমি তারপর অন্য সকলে।
বাথরুম ব্যবহারেও আমার সেই এক মনোভাব। একবার ঢুকলে সহজে বেরোতে চাই না। সমস্ত জানা গানের এক লাইন করে গাই। বেসুরো হলেও গ্রাহ্য করি না। দেওয়ালে জল ছিটোই। বাথরুমের চার দেওয়ালের মধ্যে নিজেকে ঘনিষ্ঠভাবে কাছে পাই। সংসারের দাবার চাল ঠিক করি। কার পশ্চাদ্দেশে কীভাবে বংশদণ্ড দেব তার পরিকল্পনা করি। বাথরুম আমার কাছে সাধনার নিরিবিলি পীঠস্থান। দরজার বাইরে আর সকলের প্রাত:কালীন গর্ভযন্ত্রণা অনুভব করলেও আমার দাবি আমি কীভাবে অস্বীকার করি?
সমাজে অন্য কোনওভাবে আমার প্রতিষ্ঠার আসন বিছোতে না পারলেও বাস কিংবা ট্রামের আসনে আমি নিজেকে ফলাও করে ছড়িয়ে রাখি! জোড়া আসনের তিনের চার ভাগই আমি দখলে রাখতে চাই। বাকি এক চতুর্থাংশে যিনি বসবেন আমার দয়ায় বসবেন। একটু সরে গুছিয়ে বসার অনুরোধ আমি রাখি না কারণ আমি কারুর ডিকটেশনে কাজ করায় কখনই অভ্যস্ত নই। সমাজে চলাফেরার ব্যাপারে মহাপুরুষের বাণী আমার চরিত্র গঠন করে দিয়েছে—লোক না পোক। আমার চোখে বিশ্বসংসারের সবাই হল কিলবিলে পোকা। আমার শরীরে তেমন পাশবিক শক্তি না থাকলেও মুখের জোরে আমার দৈহিক শক্তির অভাব আমি পূরণ করে নিয়েছি। ঝগড়া থেকে তর্কে, কথার মারাত্মক মারপ্যাঁচে আমি অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রথমে আড়চোখে প্রতিপক্ষকে একবার দেখে নিই। যেই দেখি আমারই মতো ছাপোষা, ডিসপেপটিক একজন বাঙালি, সঙ্গে সঙ্গে আমার কথার তূণ করে শাণিত সমস্ত বাক্যবাণ ছুঁড়তে থাকি। গুরুর নির্দেশ—সবসময় নিজেকে উত্তেজনার মধ্যে রাখবি, দেখবি জীবনের সমস্ত শূন্যতা কেটে গেছে। অফিস যাত্রার ঘণ্টাখানেক পথে সহযাত্রীর সঙ্গে মনোরম কলহে সময় যেন কোথা দিয়ে কেটে যায়। ঝগড়া অনেকটা তুষারের তালের মতো। জনস্থলে একবার পাকিয়ে দিতে পারলেই হল। পক্ষে বিপক্ষে সকলের অংশগ্রহণে নিমেষে জমজমাট হয়ে ওঠে। জীবনকে জমজমাট করে রাখাই তো শ্রেষ্ঠ জীবনসাধনা।
যে পাড়ায় থাকি সেখানেও আর ওই একই নীতি। একটা কিছু বাঁধিয়ে রাখো। গোটাকতক আটপৌরে প্রতিপক্ষ জিইয়ে রাখো। আশেপাশে কিছু ঝঞ্ঝাট তৈরি করে রাখালে নিজের পরিবারে বেশ একতা বজায় থাকে। সংসার চালানোও সহজ হয়ে ওঠে। নিজের সংসারের পাশাপাশি ভাইয়ের সংসার থাকলে বাঁধাতেও হয় না, আপনিই বেঁধে থাকে। বউয়ে বউয়ে, ছেলেতে ছেলেতে চুলোচুলি। মাঝে মাঝে শুধু ইন্ধন জুগিয়ে দাও। নিজের স্ত্রীকে এইভাবে জড়িয়ে রাখতে পারলে স্ত্রীর মহুর্মুহু নানা আবদার থেকে নিজের অব্যাহতি। ছুটির দিনে বেড়াতে চলো। অমুক আত্মীয়ের বাড়ি পুরো ষষ্ঠীবাবুর সংসার ট্যাঁকে বেঁধে। নয়তো সিনেমায় চলো। এইসব উটকো ঝামেলা থেকে নিষ্কৃতি। ছুটির দিন সকালে উঠে ধুম ঝগড়া বাঁধিয়ে দাও। মাঝে মাঝে একটু চা। ঝগড়ার চা স্ত্রীরা একটু পরিপাটি করে পরিবেশন করে থাকেন। করবেনই তো! চায়েতেই তো বাঙালির বল। প্রতিবেশী পরেশবাবুর সঙ্গে তা না হলে সারা সকাল স্বামী লড়বে কিসের জোরে! মুখঝামটার বহরও কিছু কম। বিপদের সময় স্বামী-স্ত্রী ইউনাইটেড। টেকো পরেশের চেয়ে ওর শুঁটকে বউটা আরও পাজি। কারুর ভালো দেখতে পারে না। হ্যাঁ গো দেখতো চিনি ঠিক হয়েছে কি না! আর চিনি! পরেশের তেলানি আজ ভাঙব। আমি পরেশটাকে ম্যানেজ করছি। তুমি ওর বউটাকে পারবে?
—কেন পারব না! ঝগড়া কী আমাকে আমার মা কম শিখিয়েছে। দাঁড়াও শাড়িটা ভালো করে কোমরে জড়াই।
—হ্যাঁ জড়াও। আজ ওর একদিন কি আমার একদিন।
ঝগড়ার দিনে উনুনে আগুন পড়ে না। খাওয়ার দিকে নজর থাকে না। বাজারের ঘটা থাকে না। খরচ কমে। একটু সেভিংস হয়। সংসারে ঝগড়া হল মা লক্ষ্মী! রবিবারটাকে কায়দা করে ঝগড়ার জুম্বাবার করতে পারলে হয়তো মেয়ের বিয়ের কি নিজের শ্রাদ্ধের টাকাটা উঠে আসে। গুরু বলেছেন—কর্মের কৌশলই হল যোগ।
গুরুই বলেছেন—ধর্ম একটি বর্ম। মন্দ বলেননি! রবিবার ছুটির বার। সকলেই একটু ভুরিভোজের আশায় থাকে। সেই আশায় দাও ধর্মের ছাই। নোলায় ধর্মের ছ্যাঁকা। রবিবার স্রেফ নিরামিষ। ঢ্যাঁড়স, কাঁচকলা, মোচা, থোড়ে সন্তুষ্ট থাকো। বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীবার, শনিবার বারের বার। সোমবার শিবের বার। পনেরো টাকার মাছ, ষোলো টাকার মাংস, মাংসের দোকানের লাইন থেকে অপূর্ব নিষ্কৃতি!
ধর্মের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল—উদাসীনতা। পাঁকাল মাছের মতো থাকবি ব্যাটা। পাঁকে থাকবে কিন্তু পাঁক মাখবে না। সংসারের কোনও ব্যাপারে মাথা ঘামাবে না। কে মরল, কে বাঁচল দেখার দরকার নেই। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে বেশি হৃদ্যতা একটা বিলাস। খরচের ধাক্কা! মাঝে মাঝে তেনাদের আগমন মানেই সময় নষ্ট, অর্থ নষ্ট। দু-একদিন থাকা মানেই জীবন অতিষ্ট। তারপর বিয়ে আছে, ভাত আছে, হ্যানা আছে, ত্যানা আছে। হলুদ চিঠি মানেই—ওরে তোর শিয়রে শমন! একমাত্র কালো বর্ডার দেওয়া চিঠিতেই সুখ। তাও আবার মাছ মাংস থাকবে না যে পরের পয়সায় বিশ পঁচিশটা ছাগা মেরে আসব! সেকালে একঘরে হয়ে থাকা ছিল সাজা, একালে আশীর্বাদ! দশ বাই দশ খুপরি ফ্ল্যাটে নিজের পরিবারটুকু সামলে থাক জনার্দন, বেশি বাড়াবাড়ি করলেই উপার্জনের সরু সুতোর ওপর তোমার ব্যালেনস হারাবে। তারপর চিৎ হয়ে পড়লে কোনও সম্বন্ধী দেখবে না।
অসুখ-বিসুখের ব্যাপারেও দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি। রাখে কেষ্ট মারে কে? মারে কেষ্ট রাখে কে! প্রথমে হোমিও, টোটকাটুটকি, নিজের জানা দু-একটা ট্যাবলেট-ম্যাবলেট। রোগ যখন বেশ গুরুপাক, একেবারে নাছোড়বান্দা তখন কম ফির সাবেক আমলের ডাক্তার। তারপর যখন খাবি খাওয়ার অবস্থা তখন প্যাঁচা মুখ করে ডাকো স্পেশালিস্ট।
তবে হ্যাঁ উদাসীনতার ওপর সামান্য একটু মেক-আপ চড়াতে হবে। এমন ভাব করতে হবে যেন তোমার চে দরদি আর কেউ নেই। স্ত্রীকে মাঝে মধ্যে একটু তোয়াজ তো করতেই হবে। সেই ভদ্রমহিলা যে বড় প্রয়োজনের জিনিস।
সকালের চা, ন'টার ভাত, দুটোর টিফিন, রাতের ডিনার, জামার বোতাম, বিছানার মশারি, সন্তানের জননী, তোমার স্ত্রী। পুত্র তোমার ইনভেস্টমেন্ট। দেড়শো টাকা পেনশন সম্বল করে তোবড়া গালে বুড়োবুড়ি যে তার কাঁধেই ভর করার আশা করে। এখন থেকেই তাকে আদর্শের টনিক খাওয়াও। ওরে মা-বাবাই যে তোর ঈশ্বর। পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম। সন্তান, লটারির টিকিট। ভাগ্য পরীক্ষা। লাগালে লেগে গেল। না লাগলে বাণপ্রস্থ।
জনার্দন স্বার্থ ছাড়া জগৎ অচল। জগৎ হল লেনা ঔর দেনা। বড়র কাছে ছোট হবে ছোটর কাছে বড়। যেখানেই স্বার্থ দেখবে সেখানেই ন্যাজ নেড়ে এগিয়ে যাবে। আত্মাভিমান রাখবে না। পৃথিবীতে বাঁচতে এসেছ, তুলোধোনা হতে আসনি। এই কুরুক্ষেত্রে আমরা সবাই অর্জুন। গাণ্ডীব-টাণ্ডীব ফেলে দিয়ে ম্যাদামারা হয়ে বসে থাকলে চামচিকিতেও লাথিয়ে যাবে! অলওয়েজ শঠে শাঠ্যং সমাচরেত। তুমি শঠ, তোমার আশেপাশে যাঁরা আছেন তাঁরাও শঠ। তবে কিনা, আমাকে কেউ পায়নি, আমিও কাউকে পাইনি। জীবনে একটা পেয়েছি, মৃত্যু অনিবার্য পরিণতি। মাঝখানে একটু ফুটবল খেলা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন