সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমি।। বুঝলে, ঠিক করে ফেলেছি, এবার থেকে আমি মানুষের জয়গান গাইব।
তুমি।। কোন মানুষ! বড়ো মানুষের জয়গান তো গেয়েই আসছ চিরকাল।
আমি।। ধুর সে তো মোসায়েবি। চারপাশে ভ্যানভ্যান করলে ছিঁটেফোঁটা পাওয়া যায়। মানুষের এখন দুটো জাত—সায়েব আর মোসায়েব।
তুমি।। সায়েব পাচ্ছ কোথায়? সবই তো সাগর পারে?
আমি।। এই দ্যাখো, সায়েব মানেটাই জানো না। যে ক্ষমতাশালী সেই সায়েব। তুমি একইরকম বলতে পারো—সাদা সায়েব, বাদামি সায়েব। আচ্ছা বলো তো দাদা কাকে বলে?
তুমি।। বড়ো ভাইকে?
আমি।। ও তো হল গিয়ে শাস্ত্রসম্মত দাদা। আসল দাদারা বাইরে ছড়িয়ে আছে। গ্যাসের দোকানে গ্যাসদাদা, রেশনের দোকানে র্যাশনদাদা, অফিসের ক্যাশদাদা, ব্যাংকের কাউন্টারে কাউন্টারদাদা, পাড়ার ঘাঁটিতে দাদার দাদা। বাসে ফুটবোর্ডে ফুটবোর্ডদাদা, স্টিয়ারিং-এ পাইলটদাদা, সিটে পাশে যিনি বসে আছেন, খোঁচা দাদা, ট্যাক্সের অফিসে বাবুদাদা। এই জগৎ দাদাময়।
তুমি।। আর নিজের দাদা?
আমি।। মামলা দাদা, পার্টিশন দাদা! এদিকটা আমার, ওদিকটা তোমার।
তুমি।। বাবারা সব গেলেন কোথায়?
আমি।। গোলমাল আর খামচাখামচি দেখে সব ধর্মের আশ্রয়ে। এক বাবাতেই হাজার আট, লাখো আট। সন্তানদের ছিরি দেখে গুম মেরে বসে আছেন। কলি শেষ হলে ফিল্ডে নামবেন।
তুমি।। আর মায়েরা কোথায় গেলেন?
আমি।। সব ভাগের মা। পালা প্রতিপালন। বড়ো ছেলে তিনমাস। মেজো ছেলে তিনমাস। পোঁটলাপুঁটলি নিয়ে একবার দুর্গাপুর, একবার শিলিগুড়ি। ফ্যালফ্যালে চোখ, বিরস বদন। দেশজননী আর গর্ভধারিণীর একই অবস্থা।
তুমি।। তুমি কোন গ্রুপে?
আমি।। বাবা গ্রুপে। সুবিধে একটাই। এখন সব ক্যাটারিং। মরার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যস্ত ছেলের ত্রস্ত ফোন—হ্যালো ডেথ ক্যাটারার! হাঁ হাঁ, পিতাজি টাস গিয়া। কিচ্ছু ভাববেন না স্যার, আপনি বেরিয়ে যান, দেড় কেজি ছাই, টিকিট লাগিয়ে আপনারা কেউ বাড়িতে না থাকলেও দরজার পাশে রাখা থাকবে। এইবার কাজের মেয়েটির কী পুলক—সেই পুরোনো ছাই ফিরে এসেছে! গুঁড়ো সাবানের বদলে ছাই দিয়ে বাসন মাজা কতকাল পরে! ফাদারস অ্যাসের আদ্দেক শেষ।
তুমি।। তুমি তো ভাই মহা সিনিক।
আমি।। তাই তো ভাই আমি সব মানুষের জয় গাই। সুকুমার রায়ের সঙ্গে মিলিয়ে—
দাদা গো! দেখছি ভেবে অনেক দূর—
এই দুনিয়ার সকল ভালো,
আসল ভালো নকল ভালো
সস্তা ভলো দামিও ভালো
তুমিও ভালো আমিও ভালো।
পরমহংসদেবকে প্রশ্ন করেছিলেন শ্রীমা—পৃথিবীটা যদি ভগবানেরই হয়, তাহলে তাঁর সৃষ্টিতে এত বদলোক আসে কী করে! ওই প্রশ্ন আমারও। ঠাকুর সুন্দর উত্তর দিলেন—জমিদারের খাসতালুকে দুর্বৃত্ত লেঠেলও থাকে। জটিলে কুটিলে না থাকলে লীলা পোষ্টাই হয় না। ভালোয় মন্দয় মিশে জবরদস্ত এক খেলা। এই খেলাই হল জীবন। সংসার হল জীবনের মেলা। এ সেই রবীন্দ্রনাথের ছড়া—'হাট বসেছে শুক্রবারে বক্সিগঞ্জে পদ্মাপারে।'
ঠাকুর একজন বড়দরের কবি ছিলেন। অতবড় শিল্পী, জীবনশিল্পী আর জন্মাবে না। কেমন বললেন—বাউলের দল এল, নাচল, গাইল, চলে গেল, পড়ে রইল পোড়ো কাঠ, ভাঙা হাঁড়ি, কলসি। এই হল জীবনমেলা। আসে যায়। দুদিন কা মেলা।
মনে থাকে না এসব কথা। ছ্যাঁচড়ার এমন টেস্ট, মাছের মাথা দিয়ে, পায়েস ফেলে খেতে ইচ্ছে করে। ভালো ছেড়ে মন্দর দিকে টান বেশি হয় কেন? এর উত্তরও ঠাকুর দিচ্ছেন—সংস্কার। কুকুরের লেজ বাঁকা। টেনেটুনে কিছুক্ষণ সোজা রাখা যায়। ছেলে দিলেই যে-কে সেই।
আশ্চর্য ব্যাপার—সভাসমিতিতে গিয়ে দেখেছি, ধর্মের কথা, জ্ঞানের কথা হলে ভালো লাগে না। হাই ওঠে। প্রাণ আঁকুপাঁকু করে, পালাই পালাই করে মন। অথচ পরচর্চায় কী মতি। উঠতে ইচ্ছে করে না! ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কার মেয়ে কী করেছে, কার বউ বেরিয়ে গেছে। আদিরসাত্মক হলে তো কথাই নেই।
লেখাপড়া হল কী করে! সে তো সব কঠিন কঠিন জ্ঞানের ব্যাপার। হয়েছে গাজরের লোভে। চাকরি পাওয়া যাবে। চাকরি পেলে কী হবে? বিয়ে হবে। বিয়ে হলে সংসার হবে। বেশ সুখ। বালিশ, বিছানা, মশারি, তেলেভাজা, অম্বল। ছেলেপিলে, নাতি-নাতনি। শান্তি, অশান্তি, কলহ, বিরহ, সোহাগ। জন্ম, মৃত্যু, বৃদ্ধ, পরিত্যক্ত।
জানি সব, জ্ঞানপাপী।
ঠাকুর বললেন—শালা উট! দু'কশ বেয়ে রক্ত ঝরছে, তবু চিবোবে কাঁটাগাছের খোঁচা পাতা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন