সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

নিজেকে সবাই সুন্দর দেখতে চায়। সুন্দর না হলেও মনে করে, আমি কী কম সুন্দর। যার মাথায় বিশ্বজোড়া টাক, তার বাড়ির বৈঠকখানায় সুন্দর একটি ছবি ঝুলছে। ভালো করে দেখলে বুঝতে অসুবিধে হয় না—ছবিটি সেই টাকের অধিকারীরই। জিগ্যেস করলুম, 'ছবিটি নিশ্চয় আপনার যৌবনের।' ভদ্রলোক বললেন, 'না, না, সম্প্রতি তোলা'। আমি মাথার দিকে তাকাচ্ছি, ছবির দিকে তাকাচ্ছি। বুঝতে পারছি না, ব্যাপারটা কী। ছবিতে একমাথা চুল অথচ মানুষটির মাথা জোড়া টাক। রহস্য উন্মোচনের জন্যে প্রশ্ন করলুম, 'উইগস পরেছেন বুঝি।'
ভদ্রলোক হেসে বললেন, 'সামান্য খরচেই হয়ে গেছে স্যার।'
'কীরকম?'
'একে বলে টাচ।'
'টাচ মানে।'
'প্রথমে আমার একটা এই ছবি তোলালুম। পরিপূর্ণ টাক সমন্বিত বেলের মতো মাথা। ফেলে দিলুম আর্টিস্টের কাছে, বলে দিলুম চুলের ডিজাইন। মেরে দিলে টাচ। তৈরি হল একটা নেগেটিভ প্রিন্ট। বেরিয়ে এল হিরো। একটা উইগের দাম জানেন।
এই হল টাচের যুগ। দুটো চলন্ত গাড়ি। একটা আর একটাকে শুধু টাচ করে গেল। গড়িয়ে খাদে—হতাহতের সংখ্যা কুড়ি। একটা কাজ আদায় করতে হবে, একটু ভালোবাসার 'টাচ'। স্বার্থ মিটে গেলে মারো লাথি। এমন কেউ মারা গেছেন, যাঁর মৃত্যুতে একটু হাপুস হতেই হয়, নয়তো বলবে পাঁচজনে—ব্যাটা জানোয়ার, বাপ মারা গেল চোখে জল নেই, সঙ্গে সঙ্গে, একটু পেঁয়াজের টাচ। সিনেমার মৃত্যুদৃশ্যে নায়িকার চোখে গ্লিসারিনের টাচ।
বাসের ভিড়ে মহিলার গায়ে একটু টাচ লেগে গিয়েছিল গণ ধোলাইয়ে হাসপাতাল। ডাক্তারবাবু বুকে স্টেথিসকোপটা জাস্ট একটা টাচ করলেন, বেরিয়ে গেল একশো। গুরুকে সাষ্টাঙ্গে প্রাণিপাত, যথাযোগ্য প্রণামী। মাথাটা জাস্ট একটু টাচ করে দিলেন। তেমন, তেমন গুরু হলে, ওই এক টাচেই সমাধি। বাজারের ষাঁড় শিংটা একটু টাচ করে দিলে, তিনমাস বিছানায়।
সামান্য একটু মেকআপের টাচ। মহিলার বয়স কুড়ি কমে গেল। ঠোঁটের কোণে সামান্য একটু হাসির টাচ, ছেলেটা প্রেমে পড়ে গেল। ইস্ত্রির সামান্য টাচ হতে ফোসকা। প্রতিভার সামান্য টাচ সাধারণ অসাধারণ। শিল্পীর তুলির সামান্য টাচে ছবির নিষ্প্রাণ চোখে প্রাণ এসে গেল। পাকা রাঁধুনি অল্প একটু হিঙের ছোঁয়ায় পালংশাকের স্বাদ ফিরিয়ে দিলেন। নগ্ন বৈদ্যুতিক তারে সামান্য একটু টাচ—ভবসাগরের ওপারে।
সব শেষে ওস্তাদের ফিনিশিং টাচ। সেরা ওস্তাদ, ওস্তাদের ওস্তাদ ভগবান। মেরে দিলেন ফাইনালের টাচ। সব জারিজুরি শেষ। পড়ে রইল পেঁয়াজি। সোজা পগারপার।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন