মনোরঞ্জন অসুস্থ

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

মনোরঞ্জন নাকি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরেশই আমাকে খবরটা দিল। কী একটা কাজে সে একাউন্টস ডিপার্টমেন্টে গিয়েছিল, ফাইল সই করাতে নাকি বিল পাশ করাতে গিয়ে দেখে এসেছে চক্রবর্তী সাহেব চেয়ারে এলিয়ে পড়ে আছেন, গলার টাই আলগা করে দিয়েছে। মাথার উপর পাখা ঘুরছে তাও ঘামছেন, সকলেই বলছেন হার্টের অসুখ। মনোরঞ্জন আমার বন্ধু। এক সঙ্গেই অফিসের গাড়িতে একটু আগে অফিসে এসেছি দুজনে। আসার সময় তাকে খারাপ দেখিনি, রোজকার মতোই আসছিল, গল্প করছিল। কী হল হঠাৎ কে জানে! আমার ডিপার্টমেন্ট তিন তলায়, মনোরঞ্জনের চার তলায়। মনোরঞ্জন আমাদের কোম্পানির চিফ একাউন্টেন্ট। বিলেত থেকে সি. এ. করে এসেছে। স্বাস্থ্যও বেশ ভালো। তাড়াতাড়ি গেলাম চার তলার ঘরে। ঘষা কাচের দরজার বাইরে দেখলাম একটা ছোটখাটো জটলা। ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য সবাই এসে জমেছে। সাহেব অসুস্থ হয়েছেন। একটা কিছু অবশ্য করতে হবে বইকি। দরজা ঠেলে ঢুকে পড়লাম। ঘরও খালি নেই। দু-চারজন সিনিয়ার অফিসার খবর শুনেই ছুটে টেলিফোন করার চেষ্টা করছেন। কোথায় করতে চাইছেন বুঝতে পারা গেল না।

মনোরঞ্জন বিন বিন করে ঘামছে। টাইয়ের নটটা আলগা করা। ওর ঘরে একটা কুলার লাগানো ছিল। কে যেন বলেছিল কুলার শরীরের পক্ষে খারাপ। মনোরঞ্জন সেই কথা শুনে পরদিনই খুলিয়ে ঘরে পাখার ব্যবস্থা করেছিল। মনোরঞ্জনের চোখ আধখোলা। মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল বেশ কষ্ট হচ্ছে। হয় শ্বাস নিতে না হয় শ্বাস ছাড়তে। সারা মুখটা কেমন কালচে হয়ে উঠেছে। কোম্পানির ডাক্তার এসে ভালো করে দেখে বললেন, অবিলম্বে নার্সিংহোমে ট্রানসফার করুন। আমার খুব ভালো মনে হচ্ছে না।

আমি একবার মনোরঞ্জনের মুখের খুব কাছাকাছি এসে জিগ্যেস করলাম—কী শরীরটা খুব খারাপ লাগছে নাকি তোমার? এ প্রশ্ন করার অবশ্য মানে হয় না। প্রশ্নের জন্যই প্রশ্ন। চোখের সামনে দেখছি লোকটা ক্রমশই এলিয়ে পড়ছে। ডাক্তার একটু মৃদু ধমক দিলেন কেন অনর্থক ভিড় করছেন আপনারা। একে এখুনি নার্সিংহোমে রিমুভ করুন। এতক্ষণ যে ভদ্রলোক টেলিফোনে কসরৎ করছিলেন তিনি ফোন নামিয়ে খুব গম্ভীর গলায় বললেন—না, ওঁর স্ত্রীকে পাওয়া গেল না। স্কুলে নেই। কোথায় যেন বেরিয়েছেন, আমি মেসেজ রেখে দিয়েছি। এলেই পেয়ে যাবেন।

হঠাৎ আমার মনে হল মনোরঞ্জন যদিও আমার বন্ধু, আমার কিন্তু তাঁর জন্য সেই মুহূর্তে কিছুই করার নেই। প্রথমত ঘরে ভিড় না করাই ভালো। দ্বিতীয়ত কেউ না কেউ তাকে এখনই স্ট্রেচারে চাপিয়ে, অ্যাম্বুলেন্স করে, কোম্পানির বিরাট নার্সিংহোমে নিয়ে যাবে। তারপর সেখানে অসুখে ডাক্তারে খেলা চলবে। পাঞ্জা লড়াই হবে। এমনকী এই মুহূর্তে মনোরঞ্জনেরও কিছু করার নেই। ওই চেয়ারে শরীরটাকে এলিয়ে রাখা ছাড়া ওর পক্ষে আর কিছুই করার নেই। এমনও হতে পারে চেয়ারে আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সোজা ওই নোংরা কার্পেটেই নেমে আসবে। অথচ আমি জানি ওর মতো শৌখিন খুঁতখুঁতে লোক পৃথিবীতে খুব কমই আছে।

অনেকক্ষণ সিগারেট খাওয়া হয়নি। এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি এখানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট খাওয়া যায়। মনোরঞ্জন অসুস্থ বলে পৃথিবীর সব কাজ তো আর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। এই তো এত বড় অফিস, মনোরঞ্জনের পোজিসানওতো কিছু কম নয়। চিফ একাউন্টেট বলে কথা। অফিস শুদ্ধ সকলের টিকি বাধা তার কাছে। কিন্তু কজন সহকর্মী এসেছেন এই ভীষণ মুহূর্তে। মনোরঞ্জনের দেহের উপর এই যে জীবন মৃত্যুর খেলা চলেছে কজন এসেছে এই সময়ে! এমনকী তাঁর বউই বা কী করছে, কে বলতে পারে! বিলেত ফেরত আধুনিক মেয়ে, ববছাঁট চুল, একটা কিন্ডার গার্ডেন স্কুল চালায় সাহেব পাড়ায়। কোথায় কোন রেঁস্তোরাঁয় গিয়ে বসে আছে পার্ক স্ট্রিটে, সঙ্গে কে আছে, তাই বা কে জানে। এদিকে স্বামী যায় যায়। অনিমেষ ফোন করেছিল, মনোরঞ্জনের বউকে খবরটা দেওয়ার জন্যে। অনিমেষের ব্যবহার কি খুব স্বাভাবিক ছিল, যেন একটু বেশি গম্ভীর, একটু লোক দেখানোর ভাব ছিল। আসলে এই অফিসে, মনোরঞ্জন যদি হঠাৎ মারা যায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে অনিমেষ। চট করে দু-বছরের মধ্যেই চিফ একাউন্টেন্ট হয়ে যাবে। মনোরঞ্জনের বয়সও বেশি নয়, চাকরিও খুব বেশি দিনের নয়। সাধারণভাবে রিটায়ার করতে কি ডিরেকটারের পোস্টে প্রমোশন পেয়ে যেতে বেশ সময় লাগত। ততদিন অনিমেষকে হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হত। সেই স্কুটারের পেছনে ইয়া স্বাস্থ্যের সেই পাঞ্জাবি বউকে নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে ফ্রাসট্রেটেড হয়ে যেত। এখন গাড়ি কিনবে। স্ট্যাটাস আরও বাড়বে। বউটাকে আরও সুখে রাখতে পারবে। চেহারার জুলুস আরও খুলবে। ত্বক আরও টানটান হবে। নির্ঝঞ্ঝাটে বংশ বৃদ্ধি করবে। ওইসব ত্রিকোণ, ট্রিকোণ অস্বীকার করে। মানে একজনের মৃত্যু আর একজনের অসীম সুখের কারণ হবে।

স্ট্রেচার এসে গেল সাদা ধবধবে। তার মানে অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। ঘসা কাচের দরজাটা একজন দুহাতে ফাঁক করে দাঁড়িয়ে রইল, স্ট্রেচার বেরোবে। মনোরঞ্জন স্ট্রেচারে শুয়ে আছে। ঘড়িটা একদিকে কাত হয়ে আছে, হাত দুটো চিত হয়ে আছে। অনেক আগে আমি যখন যোগাসন করতাম তখন এইভাবে শবাসন হত। স্ট্রেচারের পিছন পিছন অনিমেষ ও আর কয়েকজন জানি যার কাছ থেকে মনোরঞ্জন অনেক টাকা পাবে। মেয়ের বিয়েতে ধার দিয়েছিল দু-তিন বছর আগে। সিগারেট প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। একেবারে শেষ করে, শেষ অংশটা টুসকি দিয়ে চারতলা থেকে একতলায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তারপর নীচে নামব। মনোরঞ্জনের ব্যাপারে আপাতত আমার কোনও ভূমিকা নেই। অনেক উপকারী জুটে গেছে। ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই। বরং সময় নষ্ট না করে হাতের কাজ সেরে ফেলাই ভালো। মনোরঞ্জন অর নো মনোরঞ্জন, ডেসপ্যাচ ডকুমেন্টগুলো আজই শেষ করতে হবে। তা না হলে মাল কাল শিপিং হবে না আর টমাস অমনি ডেকে বলবে—ইউ ম্যান, আই ডোনট লাইক, তখন মনোরঞ্জনের এক্সকিউজ কোনও কাজে লাগবে না। সার্ভিস রেকর্ড খারাপ হয়ে যাবে। বছরের শেষে ইনক্রিমেন্ট কমে গেলে ক্ষতি কার হবে? কথাটা মনে হতেই সঙ্গে সঙ্গে পা চলতে শুরু করল।

প্রায় দেড়টা বাজতে চলল, তার মানে লাঞ্চব্রেক। লাঞ্চের আগে আর কাজে হাত দিয়ে লাভ নেই। মনোরঞ্জনের অসহায় চেহারাটা চোখের সামনে ভাসতে লাগল। ঘাড়টা একদিকে কাত হয়ে নড়নড় করে নড়ছে। ঠোঁট দুটো ফাঁকা। সারা মুখে কে যেন আলকাতরা মাখিয়ে দিয়েছে। হার্ট সম্বন্ধে বেশ হুঁশিয়ার হতে হবে। বলা যায় না। কখন কী হয়। বেশি দুশ্চিন্তা চলবে না। খাওয়াদাওয়ায় ফ্যাটের অংশ কমাতে হবে, আর একটু কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। কোনওটাই খুব শক্ত কাজ না, কিন্তু করে কে নিয়ম করে।

অমল এসে সামনে দাঁড়াল। কী দাদা, চলুন লাঞ্চে যাই। কি ভাবছেন অত?

চল যাই। না বিশেষ কিছুই ভাবিনি। হার্টের অসুখ খুব হচ্ছে। ছেলেবুড়ো কাউকে বাদ দিচ্ছে না। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালুম। ক্যানটিন হল ফার্স্ট ফ্লোরে।

চক্রবর্তী সাহেব আপনার বন্ধু ছিলেন, সেই কারণেই বোধহয় আপনাকে এত বিমর্ষ দেখাচ্ছে। লিফটে নামতে নামতে অমল এই একটা কথাই বলতে পারল। মনোরঞ্জন আমার বন্ধু ছিল সত্যি, কিন্তু সে অনেক আগে। ছাত্রজীবনে। মনোরঞ্জন বড়লোকের ছেলে। ছাত্রদের কোনও জাত থাকে না তাই তখন মেলামেশায় কোনও বাধা ছিল না। চাকরি জীবনে সে আমার দু-তিন ধাপ উঁচুতে, প্রায় ডিরেকটরদের কাছাকাছি, অফিসে আমরা একটু দূরত্ব বজায় রেখেই চলতুম কারণ সেইটাই ছিল শোভনীয়।

ক্যানটিনে এই লাঞ্চের সময় সকলকেই প্রায় পাওয়া যায়। রথী-মহারথী থেকে চুনোপুঁটি। কাঁটা চামচে প্লেটে প্লেটে নাচতে থাকে, টেবিলের কানায় টাই দুলতে থাকে, পাটকরা রুমাল আলত আলগোছে মাঝে মাঝে ঠোঁট থেকে লাল কিংবা সসের উদ্ধৃত অংশ মুছে নেয়। খাওয়া আর আলোচনায় এইভাবেই লাঞ্চ ওভার হয়ে যায়। অনেকটা দূরে দেখলাম মনোরঞ্জনের স্টেনো হেসে হেসে সান্যালের সঙ্গে খুব গল্প করছে। ভদ্রমহিলা আজকাল সান্যালের সঙ্গে একটু বেশি ঢলাঢলি করছে। অফিসে এইরকম একটা ব্যাপার হয়ে গেল, তারই বস জীবন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করতে করতে নার্সিংহোমে চলে গেল, আজকের দিনটা অন্তত না হাসলেই ভালো হত। সমাজে বাস করতে হলে অনেক সময় একটুআধটু মুখোশ পরে চলতে হয়। হাসতে হাসতে এক সময় আমার দিকে চোখ পড়ল। একটু গম্ভীর হল, তারপর হঠাৎ দেখি চেয়ার ছেড়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। কী হল আবার! বেশ দামি সেন্টের গন্ধ নাকে লাগছে। সামনে চেয়ারে বসে মিস ঘোষ বললেন, আপনাকে একটা কথা জানাতে এলুম।

বলুন কী কথা?

সকাল থেকে দেখলাম অনেককে খবর দেওয়ার চেষ্টা হল, কিন্তু ওর বাবাকে একবার খবর দিলে হত না? বৃদ্ধ মানুষ আর ওই একমাত্র ছেলে?

কিন্তু যতদূর জানি দুজনেই দীর্ঘদিন ছাড়াছাড়ি আছেন। কী একটা ব্যাপারে পিতাপুত্রের বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। সে ক্ষেত্রে...।

তাতে কি, ছেলের অসুখের খবর বাবাকে জানাতে নেই?

এসব বিলেতি প্রতিষ্ঠানে, বউ ছাড়া আমাদের আর কেউ থাকতে পারে বলে মনে করে না।

প্রতিষ্ঠান যাই মনে করুন আপনারা কী মনে করেন? বৃদ্ধ মানুষ একা একটা বাড়িতে কয়েকটা ঝি-চাকরের উপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছেন, আমাদের উচিত নয় কি তাঁকে একটু খবর দেওয়া?

এখানে আমার একলার মাথা খাটানো উচিত হবে কি?

দেখুন আমার যা মনে হল আপনাকে জানালাম, বন্ধু হিসেবে যদি আপনার কিছু করার থাকে করবেন। মিস ঘোষ যেন একটু রেগেই চলে গেলেন। ভদ্রমহিলার চেহারায় বেশ একটা বাঁধুনি আছে। বেশ স্পিরিটেড, তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। হাসির আড়ালেও ব্যাপারটা নিয়ে গভীর ভাবে ভেবেছেন।

বিয়ের পরই মনোরঞ্জন বাড়ি ছাড়া। পদ্মপুকুরের অত বড় পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে স্ত্রীকে নিয়ে কোম্পানির দেওয়া কোয়ার্টারে থাকে। ব্যাপারটা ভাবতেও কেমন লাগে। কিন্তু এইটাই তো জীবনের সত্য, যেমন সত্য মনোরঞ্জনের হঠাৎ অসুস্থ হওয়া। যাকগে, কে এখন মনোরঞ্জনের বাবাকে খবর দেবে। টেলিফোন ডাইরেকটারি ঘেঁটে নম্বর বের করো, ডায়াল করো, তারপরও কি একেবারে পাওয়া যাবে? বারবার চেষ্টা করো, অত সময় কোথায়?

তিনটে নাগাদ অনিমেষ নার্সিংহোম থেকে ফিরে এল। ফিরে এসেই সোজা ডিরেক্টারের ঘরে ঢুকে গেল। কানাঘুষোও শুনলাম মনোরঞ্জনের অবস্থা বিশেষ ভালো নয়। ডাক্তাররা সন্দেহ করেছেন শরীরের একটা দিক হয়তো প্যারালাইজড হয়ে যাবে। বিকেলের চা খেতে খেতে কথাটা শুনলাম। কিন্তু ব্যাপারটা মনোরঞ্জনের এত ব্যক্তিগত যে আমার মনে কোনও রেখাপাত করল না। বরং ওই সময় আমি নিউ মার্কেটের কথা ভাবতে শুরু করলাম। ছুটির পর কিছু কেনাকাটার জন্য সুলেখাকে আসতে বলেছি। প্যারালিসিস, বিচ্ছিরি ব্যাপার, ভয়ানক পরনির্ভর হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। চা খেলে হার্টের কিছু হয় না তো। বড়বাবু ফাইল সই করাতে এসেছিলেন। জিগ্যেস করলাম। বললেন,—না-না চায়ে স্যার কেফিন আছে হার্টের পক্ষে বরং ভালোই। কথাটা শুনে খুশি হয়েই সই করে দিলুম, অন্য সময় হলে ভদ্রলোককে একটু হ্যারাস করতুম। নিজের পার্টিকে এত টাকার কাজ দিচ্ছেন। মেয়ের বিয়ে দেবেন, বুঝেছি টাকার দরকার। মেয়েটা ভালো, একবার কী একটা ফাংশানে পরিচয় হয়েছিল। ভালো লেগেছিল। ফাইলটা সই করার সময় পুরো মেয়েটা তার সেই সিল্কের শাড়ি জড়ানো সুস্পষ্ট ফিগার নিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল।

চারটে নাগাদ পরেশ একটা অর্ডারের কপি নিয়ে ঘরে এল। অনিমেষ চিফ একাউন্টেন্ট হিসেবে অফিসিয়েট করবে। অর্ডারটা পড়ে মনোরঞ্জনের উপর রাগ হল। কে বেলছিল তাকে অসুস্থ হতে। অফিস সেটআপের মধ্যে হঠাৎ এই ধরনের পরিবর্তন এলে মনের ব্যালেন্স হারিয়ে যায়। কীরকম একটা জেলাসি মনের খানিকটা অংশ যেন পুড়িয়ে দেয়। সেদিনের ছেলে অনিমেষ, একটা হামবাগ, চরিত্রহীনই বলা চলে, কেরিয়ারে তেজী ঘোড়ায় চেপে কীরকম দ্রুত দৌড়াচ্ছে। অনেকের থেকেই বয়সে ছোট অথচ তদবিরে সবার থেকে বড়।

হঠাৎ মনে হল মনোরঞ্জনও একটা ঘোড়া। ওকে চাঙ্গা করে তোলাটা যেন আমার বাজি। তা না হলে রেসে একটা ঘোড়াই বাজিমাত করে দেবে। অনিমেষের সঙ্গে দৌড়বার ক্ষমতা একমাত্র মনোরঞ্জনেরই ছিল। মনোরঞ্জনকে দেখতে যাওয়ার একটা ভীষণ তাগিদ ভিতর থেকে অনুভব করলাম, যা একটু আগে, এই অর্ডারটা পাওয়ার আগে আমি অনুভব করিনি। নিজের চোখে একবার দেখতে হবে সে সারবে কিনা। যেমন করেই হোক তাকে সারাতে হবে।

অনেকেই দেখলাম অনিমেষকে কনগ্রাচুলেশন জানাতে ছুটছে। কাপ কাপ কফি চলছে, যেন একটা সেলিব্রেশন। যতই হোক বড়কর্তা, খারাপ লাগলেও একবার যেতে হল। কব্জির কাছ থেকে হাত বাড়িয়ে কনগ্রা, কনগ্রা করে, একমুখ হেসে এককাপ কফি খেয়ে চলে এলুম। আর কাজ নয়, এবার একেবারে নার্সিংহোম। বাড়িতে ফোন করে সুলেখাকে জানিয়ে দিলাম, আজ আর মার্কেটিং নয়। অন্য কাজ আছে।

রাস্তায় নেমেই পশ্চিম আকাশ চোখে পড়ল। বেশ সমারোহ করে সূর্য ডুবতে বসেছে। বিদায়ের সময়ও কত ঘটা। একটা ট্যাক্সি ছাড়া নার্সিংহোমে যাওয়া যাবে না। অন্য কোনও কমিউনিকেশন নেই। একটা দুটো যা ট্যাক্সি গেল, সব ভরতি। যেটা ফাঁকা ছিল, সেটার মিটার ফ্লাগ ডাউন করা। কিছুতেই থামল না। আধঘণ্টা ট্যাক্সির পিছনে ছোটাছুটি করে মনোরঞ্জনকে দেখতে যাওয়ার উৎসাহে ভাটা পড়ল। মনোরঞ্জনের চেয়ারে অনিমেষকে তেমন খারাপ লাগল না। হাঁটতে হাঁটতে স্ট্র্যান্ড রোড ধরে গঙ্গাকে বাঁয়ে রেখে ফোর্টের দিকে যেতে যেতে, ছেলেবেলার কথা মনে পড়ল। জীবন যখন আরও সবুজ ছিল, চোখ যখন প্রকৃতই নীল ছিল। সেই জীবনটাকে যদি আবার ফিরে পেতুম। এখন যেন একটা বকাটে ছেলের হাত ধরে বেড়াতে বেরিয়েছি। অপবিত্র একটা কিছু যেন বাহারি মোড়কে মুড়ে ঘুরছি।

এদিকে আসার উদ্দেশ্যই ছিল, একটা খালি বেঞ্চিতে দুদণ্ড বসে মনটাকে ভিজিয়ে নেব। ওয়াটার গেটের কাছাকাছি এসে দেখলাম একটা ক্রিম রঙের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ড্রাইভারের সিটে বসে আছেন এক ভদ্রমহিলা। ঘাড়ের কাছে বব করা চুল। পিছন থেকে দেখলেও চেনা চেনা মনে হল। গাড়ির দিকে আর একটু এগোলাম। ফিগারটা এবার স্পষ্ট হল। একটু অবাকই হলাম। মনোরঞ্জনের স্ত্রীকে এখন এখানে দেখব স্বপ্নেও ভাবিনি। দু-একবার পার্টিতে দেখেছি। চিনতে ভুল হয়নি। কাছে এগিয়ে গেলাম।

মিসেস চক্রবর্তী, আপনি?

ভদ্রমহিলা প্রথমটা এমনভাবে তাকালেন, যেন দেখেও দেখছেন না। পরে যেন চিনতে পারলেন।

শুনেছেন তো, মনোরঞ্জন...।

হ্যাঁ, দেখেও এলাম।

এখানে একা একা, মন খারাপ করে কী করবেন, মানুষের তো কোনও হাত নেই।

না মন খারাপের কী আছে? হার্টের রোগতো আজকাল অনেকেরই হচ্ছে। পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানেই সবরকমের জন্যে প্রস্তুত থাকা। আর তা ছাড়া আমরা সকলেই এত ব্যস্ত যে, কোনও ঘটনাই যেন আর তেমন করে মনকে নাড়া দেয় না।

কথাটা ঠিক, সব কিছুই যেন একটা দ্রুতগামী গাড়ি থেকে দেখা। তা এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কি একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্যে, না মনটা একটু ফ্রেশ করে নেওয়ার জন্যে।

ঠিক তা নয়। আমার দুটো সমস্যা হয়েছে। প্রথম আমার গাড়িটা হঠাৎ থেমে গেছে, স্টার্ট নিচ্ছে না। সঙ্গে আমার স্কুলের একটা ছেলে ছিল তাকে পাঠিয়েছি একটা ফোন করার জন্য। দ্বিতীয় সমস্যা হল, বাড়ি ফেরার সমস্যা। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের দুটো চাবি। একটা থাকত আমার কাছে, আর একটা থাকত ওর কাছে। আমার চাবিটা সকালে কোথায় হারিয়েছে, ওর চাবিটারও কোনও হদিস পাচ্ছি না। ব্যাগে নেই, পকেটে নেই, এমনকী ও বলতেই পারছে না কোথায় রেখেছে? আমাকে একেবারে হেল্পলেস করে দিয়েছে। সারারাত যে কী হবে?

একটা ডুপ্লিকেট চাবির ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে তো মুশকিল।

এই ব্যাপারে আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন?

চলুন দেখি কী করা যায়?

একটু অপেক্ষা করুন, গাড়িটা ঠিক হয়ে যাক তা না হলে যাবেন কী করে? এমন মুশকিলে ফেলল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে।

আমি তো নার্সিংহোমেই যাচ্ছিলাম, ট্যাক্সি পেলাম না বলে যাওয়া হল না।

ওখানে গিয়ে কোনও লাভ নেই, শুধু শুধু উত্যক্ত করা। রোগী আর ডাক্তারের মধ্যে নাক গলিয়ে কোনও লাভ নেই। আমি তাই চলে এলাম।

ধৈর্যই হল সবচেয়ে বড় কথা।

পশ্চিমের আলো দপ করে নিভে গেল। আকাশের নীচে ছায়াছায়া অনেক মানুষ জলের কিনারা ঘেঁষে বসেছে। সবুজ মাঠের এখানে ওখানে এরকম সব ছায়াছায়া জটলা। আমার সামনে এখন তিনটে সমস্যা—গাড়িটা ঠিক হবে, তারপর মিসেস চক্রবর্তীকে একটু হেল্প করতে হবে, তারপর সেই দুটো হারানো চাবির বিকল্প আর একটা চাবির ব্যবস্থা করতে হবে, তা না হলে অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকা যাবে না। আর অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে না পারলে ভদ্রতার খাতিরে আমিও বাড়ি ফিরতে পারব না। নিজেকে ভীষণ ক্লান্ত মনে হল। মনে হল কতযুগ যেন অপেক্ষা করে আছি। একটা ইঁদুরের মতো জালে আটকা পড়ে গেছি। কখন যে মুক্তি পাব কে জানে। পুরো ব্যাপারটার মধ্যে যদি কোনও নিজের স্বার্থ জড়িয়ে থাকত তাহলে হয়তো এতটা খারাপ লাগত না। ঠিক সেই মুহূর্তে মিসেস চক্রবর্তী গাড়ির দরজা খুলে রাস্তায় ডান-পা রেখে নামতে চাইলেন, পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটুর উপর পর্যন্ত কাপড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়ল, সিল্কের কাপড়ের আঁচল খসে পড়ল কোলে, একবার তাকিয়ে দেখলাম। সেই মুহূর্তে মনে হল, গাড়িতে পেছন ঠেকিয়ে অনির্দিষ্টকাল দাঁড়িয়ে থাকাটা বোধহয় তেমন কষ্টকর নয়।

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%