সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

ভীষণ আনন্দের কথা। ব্যাপারটা খুব দ্রুত ঘটছে। মানুষ তার মনুষ্যত্ব হারাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ বছরের চেষ্টায় মানুষ মানুষ হয়েছিল। মাত্র কয়েক বছরের চেষ্টায় আবার অমানুষ। বাঘকে বিশ্বাস করা যায়, সাপকে বিশ্বাস করা যায়। মানুষকে আর কখনই নয়।
এই জগৎ আর জীবনে যাঁরা ছিটেফোঁটাও ভালো দেখতে পান না তাঁদের বলা হয় 'সিনিক'। আবার আর একধরনের মানুষ আছেন, যাঁরা অনবরতই বলতে থাকেন, 'আহা! পৃথিবীটা কত সুন্দর! বেশ জানেন, মোটেই সুন্দর নয়। বাইরের আবরণটা, অর্থাৎ মোড়ক বা র্যাপারটা খুব সুন্দর। নীল আকাশ। সবুজ গাছপালা, পাখির ডাক, প্রজাপতি ফুলে ফুলে বহুবর্ণের পাখা মেলে উড়ছে, ভ্রমর ভোঁ ভোঁ করছে, মৌচাকে কত মধু! ডাবের খোলে পরিস্রুত মিষ্টি জল। কতরকমের ফল। বাঘ সুন্দর, সাপ আরও সুন্দর, কী অপূর্ব ডিজাইন! তবে যতক্ষণ না মরছে। জলহস্তী যেন কম্পিউটারে ফেলে তৈরি। তা না হলে অমন একটা মুখ হয় কী করে! হিপোসুন্দরী! কুমির! তারও কী বিউটি! পেড়ে ফেলে লেজ থেকে মাথা, মাথা থেকে লেজ বারকতক পায়চারি করলেই পায়ের তলায় স্বাস্থ্যকর 'আকুপ্রেসার'। কুমির যেন কাঁঠালের আমিষ সংস্করণ। মানুষ কাঁঠাল খায় কুমির মানুষ খায়। জ্ঞানী বললেন, কাব্য, কবিতা, দর্শন, বিজ্ঞান, সব ভালো। বহত আচ্ছা ভাই। তবে পৃথিবীর প্রকৃত স্বরূপ হল—খাদ্য আর খাদক। পারস্পরিক ওই একটাই সম্পর্ক। কেউ গপ করে খায়, কেউ একটু একটু করে। সব খাদকের সেরা খাদক হল 'কাল'। সময়। মহাকালের চৌবাচ্চায় আমাদের খলরবলর। আর এইটাই হল একমাত্র দর্শন। বাঘ হালুম করে খাবে। কালে খাবে ভোগ আর দুর্ভোগের সস মাখিয়ে ছুরি, কাঁটায় একটু একটু করে গেঁথে। জীবনের ঝলকানিতে বোঝার উপায় নেই, হচ্ছেটা কী ঘটছেটা কী! একদিন দেখা যাবে খেল খতম, হজমি হজম। কী করতে এসেছিলে ভাই! একমাত্র উত্তর, মরতে। মরতে এলে কেন? সোজা উত্তর, ঠেলে পাঠিয়ে দিলে যে! সেই পুশটাই তো মাতৃগর্ভে পোরা আছে। ন-দশ মাস নিভৃত অবস্থান। তারপর এক গোঁত্তা। কাঁদতে কাঁদতে জগৎ কারাগারে প্রবেশ। তখন মানুষের ভাগ্য মানুষের হাতে। ষণ্ড সংস্কৃতিতে আগমন। কী হবে কোনও গ্যারান্টি নেই।
অতি করুণ অবস্থা মেয়েদের। ছেলেদের পাল্লায় পড়তেই হবে। এও এক কারসাজি। কার সারসাজি বলা কঠিন। পণ্ডিতমশাই বললেন—কাম। বিদেশি তাত্বিক বললেন—সেক্স। আমরা জানতুম ছেলেদের একটা বয়সে, যখন ঠোঁটের উপর কচি কচি গোঁফ গজায়, কণ্ঠস্বর রাতারাতি ভারী হয়ে যায়, দেশীয় প্রবীণরা যাকে বলেন, বয়স লাগা, ইংরেজরা যাকে বলেন, পিউবারটি, তখনই সামনের বাড়ির দোতালার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটিকে অন্য চোখে দেখা শুরু হয়। এদিক থেকে একটা মন হু হু করানো বাতাস বয়ে আসে। মা, বাবা, ভাই বোন কিচ্ছু ভালো লাগে না। মনের জ্বর! স্বেদ, পুলক, কম্প। রিমলিই হোক আর ঝিমলিই হোক—প্রাণ যায় রে হায় হায় রে! এই শুরু হল। আকর্ষণের খালা। একসময় পঞ্চাশ, ষাট বছর আগে একটি ছেলে আর একটি মেয়ের মেলামেশা একালের মতো সহজ ছিল না। মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত। একটি ছেলের গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তি। মেয়েকে বড়ো করে ঘরে রাখার অনেক ঝামেলা। হুলোর উৎপাত বাড়ে। রাতবিরেতে টিনের চালে ঢিল পড়বে। সেকালে অনেক জমিদার ছিল, যাদের কাজই ছিল, প্রজাদের বুকে বাঁশ ডলে খাজনা আদায়, আর সেই টাকায় মোসাহেব পোষা, আর পিপে পিপে মদ গেলা, আর বাই নাচানো। এরা আবার ছাতে উঠে ঘুরি ওড়াত। মোসাহেবরা, কুটনীরা সুন্দরী কুলবধূর খবর আনত। লেঠেলরা সুযোগ বুঝে তুলে আনত। ভোগের পর বাজারে ছেড়ে দিত। বধূরা হয়ে যেতে বারবধূ। এই আমাদের ট্র্যাডিশন।
এখন মেলামেশা সহজ হয়েছে। প্রেম বেড়েছে। কিন্তু প্রেমিক কোথায়! আগে তবু আদর্শ, সহিষ্ণু, কর্তব্যপরায়ণ পুরুষ দেখা যেত। একালে সব অদ্ভুত। কার হাতে মেয়ে গিয়ে পড়ছে! বিয়ের পর প্রেমে ফুরিয়ে গেলে স্বামী নামক পুরুষটির কী চেহারা দাঁড়াবে! মেয়েদের ভাগ্য কবে ফিরবে?
বেগুন নিয়ে ঝগড়া। রিভলবার বের করে স্বামী স্ত্রীর খুলি উড়িয়ে দিলে। একটি মেয়ে পড়তে বসেছে, একটা ছেলে হঠাৎ চোখ দুটো কানা করে দিয়ে গেল। অপর একটি ঘটনায় একটি ছেলে একটি মেয়ের মুখে অ্যাসিড বালব ছুড়ে মারল। ট্রামে, বাসে, ট্রেনে, মেট্রো স্টেশনে, পথেঘাটে, প্রতিক্ষণে মেয়েদের নানাভাবে নির্যাতিত হতে হয়। কর্মস্থলেও নিষ্কৃতি নেই।
খুন, ডাকাতি, হত্যা, আত্মহত্যা এত বেড়েছে কেন! কারণ একটাই, অতীতে যাঁরা সমাজের মাথা ছিলেন তাঁরা মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল জানতেন। পারিবারিক শাসন একালের মতো শিখিল হয়ে পড়েনি। একালটা যেন, কে কার ঝাড়ে বাঁশ কাটে। চতুর্দিকে লোভ আর প্রলোভনের রাজত্ব। একটি বালকও ক্রোড়পতি হতে পারে।
বিলেত ভালোটাকে বিলেতে ফেলে রেখে খারাপটাকে নিয়ে ঢুকে পড়েছে। নাইট ক্লাবে নেচে মাঝরাতে মেয়ে বাড়ি ফিরছিল, পুলিশ ধরেছে। নাচ, গান আর পোশাক খোলার যুগ পড়েছে। দূর অতীতে প্লুটাস বলেছিলেন—Man is wolf to man. মানুষ কোথায়! সবই তো নেকড়ে।
আগে অর্থাৎ অতীতে দূর পাল্লার ট্রেনে সহযাত্রীদের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হত। খাবার ভাগাভাগি করে খাওয়া। একজন আর একজনকে চা অফার করছেন। একালে চা খাওয়াতে মুখের দিকে তাকাতে হয়। মনে মনে প্রশ্ন—কতটা ঘুমের ওষুধ মিশিয়েছ মানিক। এ এমন যুগ মানুষকেও সন্দেহ হয়। কেউ গায়ে পড়ে আলাপ করতে চাইলে ভয় হয়। এরপর আলাপ কোন দিকে যাবে।
দুপুরবেলা দু-তিন জন বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে আতঙ্ক—মতলবটা কী? মেয়ের গৃহশিক্ষককেও সন্দেহ। কী পড়িয়ে দেবেন কে জানে! কয়েকদিন পরে পুরো পরিবার খুন হয়ে যাবে না তো! এরপর এমন দিন আসবে না তো মেয়ের মা অ্যালসেসিয়ানের মতো সোফা ডিভানের তলায় আগে থেকেই গুটলে পাকিয়ে বসে থাকবেন। কেউ জানতে পারবে না। তেমন কিছু দেখলে পরের দিনই ফায়ার।
কাজের লোকও রাখা যাবে না। অল্পবয়সী মেয়ে হলে মোড়ের মাথায় রোমিওর সঙ্গে কহো না পেয়ার হ্যায় করে বাড়ির কর্তাকেই হয় তো রেপ কেসে ফাঁসিয়ে দেবে, অথবা নিজেই গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির সামনে বিরাট বাহিনী, কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ি চুরমার—সাধের লাউ রে।
অপারেশনের পর মিতভাষী, গম্ভীর সার্জেনকে হাজার হাজার টাকা ধরে দিতে দিতে কুঁই কুঁই করে জিগ্যেস করতে হবে—স্যার! পেটের মধ্যে কিছু ফেলে আসেননি তো! আপনাদের ভীষণ ভুলো মন তো!
অধিকাংশ প্রফেশনের মানুষের সঙ্গে তো কথাই বলা যায় না, বড়ো ডাক্তার, কলেজের প্রিন্সিপাল, হেডমাস্টার, হেড মিস্ট্রেস, থানার ওসি, টেলিফোন বিভাগের কর্মচারী। গ্যাসের দোকানের গ্যাসদাদা। মন্ত্রীমহোদয়রা ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তাঁরা ভগবান এলেও কথা বলবেন না। পাড়ায় পাড়ায় পার্টির লোক। তাঁরাও অধম ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন না।
এমন যুগ পড়ল, চোরও কথা বলে না, পুলিশও না। সবচেয়ে সাংঘাতিক স্ত্রী স্বামীর সঙ্গে, স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন না। কমন অভিযোগ—কথা বলতে গেলেই খ্যাঁক খ্যাঁক করে। যত কথা সব প্রেম পর্যায়েই বলা হয়ে গেছে।
কথা হলে কি এই দাঁড়াল বলছেন জর্জ অগাস্টাস মুর—
Humanity is a pigsty where liars, hypocrites and the obscene in spirit congregate.
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন