সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

একটা প্রশ্নকে আমি ভীষণ ভয় পাই, যখন কেউ থমমারা মুখে ভারী গলায় প্রশ্ন করেন, 'কী চাই?' ছেলেবেলায় বালসুলভ কিঞ্চিৎ অবাধ্যতার শাস্তি হত, হয় বাবা, কখনও-সখনও মা কথা বন্ধ করে দিতেন। বন্ধ করার আগে সকলকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে দিতেন, 'না! অসম্ভব। ওটাকে বলে, বকে, মেরে কিছু হবে না। ওকে মানুষ করা আমাদের সাধ্যের বাইরে। ও আমাদের ছেলে নয়। ওর যা ইচ্ছে তাই করুক, দুবেলা দুটো খেতে পারে, সেটা আমাদের কর্তব্য এর বেশি কিছু যেন আশা না করে। সোহাগ ভালোবাসা ওর জন্যে নয়। ওসবের মর্যাদা ও দিতে পারবে না, কারণ ওটাকে দেখতে মানুষের মতো হলেও ওর মধ্যে মনুষ্যত্বের ছিটেফোঁটাও নেই।'
আমার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন, 'যাও যাও, ছবির মতো আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকো না। তোমাকে দেখতে এমন কিছু সুন্দর নয়। শয়তানকে আমি দেখিনি, মনে হয় তোমার মতোই দেখতে। বাল গোপালের মতো বাল শয়তান। গেট আওট গেট আওট।'
সংসারে করুণাময় করুণাময়ী অবশ্যই থাকেন। তাঁরা ইউনাইটেড নেশানসের কায়দায় চেষ্টা করেন সম্পর্কের গুমোট ভাবটা যাতে কেটে গিয়ে আবার ফুরফুরে ভাবটা ফিরে আসে। সংসার একটা বৃহৎ শরীরের মতো, তার কোথাও একটা কিছু গড়বড় হলে গোটা শরীরটাই ম্যাজম্যাজ করে। তাঁরাই পরামর্শ দেবেন, 'যাও গিয়ে বলো, আমার অন্যায় হয়ে গেছে, ক্ষমা করুন।'
ভয়ে ভয়ে ঘরে প্রবেশ করা মাত্রই, তিনি গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, 'কী চাই?'
টাকাপয়সা, জামাকাপড়, লজেনস, বিস্কুট, এসবের কোনওটাই চাই না, যা চাই, তা দিতে কোনও খরচই হবে না, তবু বুক কেঁপে উঠল। আমি ক্ষমা চাই। সে আর বলা হল না। ভয়ে পালিয়ে এলুম। তখন কেউ একজন মধ্যস্থতা করলেন। সম্পর্ক সহজ হল।
'কী চাই', সামান্য একটা প্রশ্ন, কিন্তু বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই প্রশ্ন রূপ পালটায়। একদল সমবয়সি মহিলা ঘরে বসে গল্পে মত্ত, তাদের মধ্যে আমার স্ত্রীও আছে। ঘরে ঢোকামাত্রই আমার স্ত্রীর প্রশ্ন—'কী চাই'। বেশ টেনে, খেলিয়ে, সুর করে বলা। অর্থাৎ মেয়ে মহলে কী উদ্দেশ্যে তোমার আগমন! প্রশ্নের মধ্যে প্রচ্ছন্ন একটা দুষ্টুমি। ভালোলাগা, ভালোবাসা, দুটোই আছে। একটু গর্বও আছে, দ্যাখো তোমরা, আমার স্বামী আমাকে ছাড়া থাকতেই পারে না।
আবার প্রবল মনোমালিন্য, কথা কাটাকাটি, বাক্যালাপ বন্ধ। অন্ধকার ঘরে স্ত্রী শুয়ে আছে। খাওয়াদাওয়া, মেলামেশা বন্ধ। এই অশান্তির পেছনে পরিবারের অন্য সদস্যদের মদত আছে। ফাঁক পেয়ে স্বামী চোরের মতো এসেছে। আর পারছে না, এ বিরহ অসহ্য। শীতল গলায় স্ত্রীর প্রশ্ন, 'কী চাই?' তার প্রশ্নটাই উত্তর, তোমাকে অনেক দিয়েছি, তার বদলে তুমি আমাকে কী দিয়েছ, এর পরেও আর তোমাকে আমি কী দিতে পারি নিজের প্রাণটুকু ছাড়া। কী চাই মানে আরও কী চাই! তোমাদের নিষ্ঠুরতা আরও কী দাবি করে!
তখন মনে পড়ে যেতে পারে সেই শুরুর দিনের মধুর স্মৃতি। শয্যায় দুজনে পাশাপাশি। বাইরে চাঁদনী রাতে। সেই কপট না জানার ভাব। যতবার ঘনিষ্ঠ হতে চাওয়া, ততবারই সেই প্রশ্নে আটকে যাওয়া, কী চাই? ঘুমিয়ে পড়ো। কী চাই, তুমিও জানো, আমিও জানি। তবু এই প্রশ্নের মধুর খুনসুটি।
অসহায় বৃদ্ধ অথবা বৃদ্ধা। দীর্ঘকাল শয্যাশায়ী। তাঁর প্রিয়জনেরা তিতিবিরক্ত। প্রথমে মনে মনে, পরে সোচ্চার প্রার্থনা, এইভাবে পড়ে থাকার চেয়ে যাওয়াই ভালো। ক্ষীণ গলায় তিনি যখন কারোকে ডাকেন, সে তখন পরম বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, কী চাই! এই প্রশ্নের পর চাওয়ার আর কিছুই থাকে না, এক মাত্র মৃত্যু ছাড়া।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন