সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

কোথাকার জল কোথায় গড়ায়! বাংলায় এই রকম একটা কথা আছে। আমি সেই কথার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পেলাম এই ক'দিন আগে। এক কেশ-বিশেষজ্ঞ বললেন, মাথার যে ক'গাছা চুল আছে যদি বাঁচাতে চান, তাহলে রোজ স্নানের আগে খুব ঘষে ঘষে তেল মাখবেন। দু-হাতের দু-আঙুল দিয়ে চুলে বিলি কেটে, খুচুর মুচুর, খুচুর, মুচুর, স্ক্যালপ মাসাজ। তেলটা অবশ্যই হবে আয়ুর্বেদিক।
বেশি চুলের আশায় এক ফাইল খুব দামি তেল কিনলুম।
এত দাম কেন ভাই!
লেবেলটা পড়ুন। আমাদের পেট যা পায় না, আপনার চুল তা পাবে। কাগজি বাদাম, কাজু, পেস্তা, কিশমিশ, জয়ত্রি, জায়ফল। তারপর ধনে, জিরে, পাঁচফোঁড়ন, গোলাপ, জবা, পদ্ম। তারপর মেহগনি গাছের ছাল। ওই গাছ বিশাল বড় হয় তো! চুল টেনে লম্বা করে দেবে। ত্বকের তলায় আলোড়ন। গভীর রাতে শুনতে পাবেন, মাথায় জলতরঙ্গ। পাকা পাকা চুলের আড়ালে কচি কচি চুলের নবজাগরণ। দাম হবেই দাদা!
সংসার চুলোচুলির জায়গা। নো ডাউট অফ ইট। চুলটা শেষকালে। চুল সমেত ছাই। এখন চুলের সাধনা। তেলটার বৈপ্লবিক নাম, 'নবজাগরণ'। শিশিটাকে নিয়ে নির্জন বাথরুমে প্রবেশ। বাথরুম হল স্টুডিও। হয় এটা পাবে, নয় ওটা। ঢোকামাত্রই গান পেল। 'জাগ রে, জাগ রে জাগ...।'
নিজেকে প্রথম বসালুম মেঝেতে। পাশে বসালুম নবজাগরণকে। ভেতরে তরল উজ্জীবনী। জবাকুসুম সঙ্কাশং। ছিপি খুলে তারপাশে। এইবার হাতের তালুতে কিঞ্চিৎ ঢেলে খুলিতে স্থাপন করে, ইলি বিলি বিলি। ফুল খিলে গুলশন, গুলশন। তেল ঢেকে মাথায় নিয়ে চলেছি।
মানুষের হাত কুকর্মে এক্সপার্ট। সবচেয়ে খতরনক হল কনুই। কনুই লেগে নবজাগরণ উলটে গেল। আঁত করে বুকটা আঁতকে উঠল। বগ বগ করে তেল উগরে নর্দমার দিকে এগোচ্ছে। 'ক্যাচ মিস' করা উইকেট কিপারের মতো বডি থ্রো করে দিলুম। কঠিনকে ধরা যায়, তরলকে ধরা যায় না। কঠিন গড়িয়ে যায়, তরল বয়ে যায়। একশো কুড়ি টাকা গড়াচ্ছে। ধরার চেষ্টা বৃথা।
আস্ত একটা বেগুনের মতো তেলে গড়াগড়ি। ওই যেমন বলে, উলটে পালটে বেগুন ভাজা। সিলমাছ যেমন সৈকতে লুটোপুটি খায়। শীর্ষাসনে যেমন মাথার চাঁদিটা মেঝেতে পাততে হয়, সেইভাবে যতটা পারা যায় চুলে ধরে নিলুম। মাথাটা যেন 'মগ'। বাথরুমটা ছোট। মেঝেতে পোর্সিলেন টাইলস। মাথা দিয়ে ঘষে চলেছি। উত্তর থেকে দক্ষিণ। পুব থেকে পশ্চিম। কিছুক্ষণ তেলে সাঁতার।
তিনের চার ভাগ তেল শেষ।
উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে হড়কে গেলুম। ওয়াশ বেসিন ধরে আত্মরক্ষার চেষ্টা। বেসিনটা স্ট্যান্ডে বসানো ছিল। দেহের ভারে একপাশে কাত হয়ে গেল। মাথাটা ঠুকে গেল কলে। ফিমার ফ্র্যাকচারের হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে গিয়ে ওয়াশ বেসিন আহত। আত্মোৎসর্গ করে বসেনি, আমার পরম ভাগ্য।
এরপর শুরু হল সাবান দিয়ে মেঝে পরিষ্কার। একেই বলে 'সিভিক সেনস'। বাথরুমে এর পরে যে 'ইনোসেন্ট কাস্টমার' আসবে সে তো পা দিয়েই সড়াৎ মোচার খোলা। তারপর হাড় নিয়ে হাড্ডির লড়াই। হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেবে 'হাড় কাকে বলে!' হাড়, হার আর Her। তিনটিই ভয়ঙ্কর। হার পরেন বলেই Her। পোড়া তিলের তেল। গুচ্ছের শাক-পাতা দিয়ে ফোটান। সহজে কী হড়হড়ে যায়! সর্বঅঙ্গ তেল চ্যাপচ্যাপে। স্নানের পর চুল আঁচড়াতে রূপ যেন আরও খোলতাই হল। যে ক'টা চুল ছিল খুলিতে সেঁটে বসে গেল। মুখটা হয়ে গেল এতটুকু। সবাই জিগ্যেস করতে লাগল, যাত্রার দল খুলেছ নাকি? সেকালে যাত্রার দলে যারা ফুলুট বাঁশি বাজাত এদের এইরকম ঘি-চপচপে চুল আর মাঝখানে সিঁথি হত।
ছাদের দড়িতে এক সাদা জামাকাপড় ঝুলছে। সেই দলে আমার গামছাটাও দোল খাচ্ছে। একদিকটা ধরে হিড় হিড় করে টানছি। পুরো দড়িটা জামাকাপড় সমেত খুলে পড়ে গেল। তলায় সার সার গোলাপ গাছের টব। খুব কায়দা করে গোলাপের কাঁটায় সুন্দরভাবে সব আটকে গেল। কাছে গিয়ে গামছাটা দুহাতে তুলে নিলে এই কাণ্ডটা হত না। ফাঁকিবাজির ফল। খুব সাবধানে সব কটাকে কাঁটামুক্ত করতে ঘণ্টাখানেক।
আমার কী দরকার ছিল সত্যেনকে জিগ্যেস করার, আজ আসতে দেরি হল কেন? আরে চোখের সামনে ঘটনাটা ঘটে গেল। দুটো মিনিবাস। রেষারেষি হচ্ছে। একবার এটা এগোচ্ছে। একবার ওটা।
সত্যেন হাত নেড়ে বোঝাচ্ছে। টেবিলের উলটো দিকে বসে।
হঠাৎ একটা স্কুটার দুটোর ফাঁক দিয়ে ফুরুর...
স্কুটার হল সত্যেনের হাত। ফুরুর। এক কাপ চা সমেত কাপ কাত। চায়ের বন্যা এগিয়ে আসছে আমার দিকে। ভাসাতে ভাসাতে আসছে। বই গেল। লেখা গেল। কলম চা চাখছে। সব ঘটছে নিমেষে। এইবার অবতরণ করবে আমর কোলে। চেয়ার থেকে এক লাফ। হাঁটুটা মোক্ষম ঠুকে গেল।
নিক্যাপ পরে ঘুরছি। সবাই জিগ্যেস করছে, 'কী হল?'
'স্কুটার অ্যাক্সিডেন্টে।'
'চাপো কেন? যাক অল্পের ওপর দিয়ে গেছে।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন