সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে অনেকদিন পরে হঠাৎ দেখা। নিউমার্কেটে বউয়ের সঙ্গে দোকানে দোকানে লটর পটর করছিল। কলেজের বন্ধু। বসন্ত কেবিনে একই সঙ্গে অনেক ডবলহাফ উড়িয়েছি। ভেজিটেবল চপ মেরেছি রাই দিয়ে। কান্ট, হেগেল, হিউম, স্পিনোজা, নিৎসে চটকাচটকি করেছি। দেবব্রত বিশ্বাস বলতে অজ্ঞান হয়েছি। হেমন্তকুমারের রানার শুননে শুনতে পুলকে অস্থির। তারপর যা হয়, দুজনেই 'জব মার্কেটে' যথারীতি হারিয়ে গেছি। প্রথম প্রথম চিঠি চাপাটি। অত:পর যোগসূত্র পটাং। কোথায় কান্ট, কোথায় হেগেল। কেরিয়ারের টাট্টুতে চেপে ব্যাঙ্গালোর, বরাকর। রানার ছুটছে খবরের বোঝা নিয়ে নয়, তেলের শিশি নিয়ে।
'কী রে মানকে না।'
'আরে রে হেবো যে, বেশ মুটিয়েছিস মাইরি!'
'মুটোব না! মুটে হয়েছি যে, এতবড়ো একটা লোড ক্যারি করছি। মিট মাই গিন্নি সুনন্দা!'
শিক্ষিত বাঙালি স্ত্রীকে যখন 'ওয়াইফ' বলে, বুঝতে হবে সরকারি চাকুরে। যখন 'গিন্নি' বলে বুঝতে হবে বেসরকারি অফিসের উচ্চপদে শাঁসে-জলে আছে, পরিবার-পরিজন পরিত্যাগ করে পৃথক বসবাস, শ্বশুর বাড়ির ন্যাওটা। শালী-প্রেমে বিভোর মাতোয়ারা। ' বেটার হাফ' বললে বুঝতে হবে মাস্টারি করে। 'বউ' বললে বুঝতে হবে গ্রামে বিষয়-সম্পত্তি আছে, হাল চাষ করে। ডেফিনিটলি কাঁঠাল খায়! পুঁই কুমড়োর লাবড়া প্রিয় খাদ্য। মালসা ভোগ, পুলিপিঠে, তালের বড়ার জগতে ঘোরাফেরা আছে।
একধরনের হাসি আছে, লেটার বক্সের ডালা খোলার মতো। আগে এই ধরনের চিঠি-ড্রাম মোড়ে মোড়ে দেখা যেত। লাল, গোলাকার, মাথাটা উলটো কড়া। গভীর রাতে, নির্জন পথে একা মাতালের মতো, মদ নয় মানুষের দু:খ সুখের খবর পেটে পুরে বসে থাকত। তার একটা মুখ থাকত। একটা ডালা আলজিভের মতো ভেতরে ঝুলত লতরপতর করে। সেইটাকে চিঠি দিয়ে ঠেললে চুত করে একটু খুলেই আবার বন্ধ হয়ে যেত। কিছু হাসি আছে এইরকম পোস্টবক্স মার্কা। এইরকম হাসি দেখলেই বুঝতে হবে, বন্ধুর গিন্নিটি অর্থনীতির সেকেন্ড কি থার্ড ফ্লোর থেকে নেমেছেন। এঁর একটি 'ওভার বেয়ারিং মাদার' আছেন। বপু হয় বিশাল না হয় ক্ষীণ। কাঁচাপাকা চুলের বড়ি খোঁপা। সংসারে সর্দারি করে ঘুরে বেড়ান। কাজের কাজ তেমন কিছুই করেন না। তাঁর চোখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে একটা চালুনি, অজস্র ফুটো তার। একমাত্র তিনিই একটি নিশ্ছিদ্র হাতা। সব বিষয়েই তিনি এক্সপার্ট। এই মুহূর্তে নরসিংহের কী করা উচিত তিনি জানেন। দেবেগৌড়ার পাঁচ বছরের টিঁকে থাকার ট্যাকটিক্সে তিনি বলে দিতে পারেন। কারও অসুখ করলে সারাতে না পারুন কারণটা তাঁর চেয়ে ভালো কেউ জানেন না। আর এই যে তাঁর কত্তাটি খবরে কাগজে মুখে নিয়ে চেয়ারে বসে রয়েছেন দেবেগৌড়া হয়ে, তিনি ভেসে যেতেন ইনি না থাকলে। লেডি নরসিমা হয়ে তিনি সপাটে সাপোর্ট দিয়ে রেখেছেন—'অ্যায় আবার পা নাচাচ্ছ!' ব্যাড প্র্যাকটিস না বলে, বললেন ম্যাল প্র্যাকটিস। 'বলেছি না, পা নাচালে শনিতে ধরে। ইস্টেডি হয়ে বোসো!'
এঁরা শাশুড়ি হয়ে মেয়ের মাধ্যমে জামাই বাবাজীবনকে টাইট দিয়ে রাখেন, আর ছেলের বউয়ের কাছে উঠতে বসতে ঝ্যাঁটা খান। অবশেষে ধর্মে মতি দ্বিজে ভক্তি। অবশেষে হয় বাথরুমে, না হয় ঠাকুরের ঘরের চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে পপাত। ফেমার ফ্রাকচার। চিরশয্যা গ্রহণ। সবশেষে দেড় কেজি ভস্ম।
হেবো এইবার মানকেকে বলবে, 'একদিন আয় না, লর্ড সিনহা রোডে আমাদের ফ্ল্যাটে। সকাল থেকে সারাদিন চুটিয়ে আড্ডা মারা যাবে। সুনুর হাতের রান্না খাবি। হাঁড়ি কাবাবটা যা রাঁধে না, খেলে সগগে চলে যাবি। উর্বশীর নাচ দেখবি। বাবা ডি. এম ছিলেন তো। খাস বাবুর্চির কাছ থেকে কাবাবের কেরামতি শিখেছিল। ওর হাতে আর একটা আইটেম আছে, বুলগ্যানিন যেটা খেয়ে বিপ্লবী সি পি এম হয়েছিলেন, লেনিন যেটা স্ট্যালিনকে দিয়েছিলেন, তার নাম কিয়েভ কাটলেট। দেখতে ছোটখাট একটা মোচার মতো। পুরোটাই মুরগির খোল, ভেতরে মাখনের পুর। খুব সাবধানে খেতে হয়। ঝট করে কামড়ালে পচ করে সমস্ত মাখনটা বেরিয়ে এসে জামাকাপড়ে ল্যাপ্টালেপ্টি, যেন আজ হোলি খেলব শ্যাম তোমার সনে। কাঁটা দিয়ে সাবধানে পাংচার করে ছুরি দিয়ে কেটে কেটে খেতে হয়। হে হে ব্বাব্বা!'
এর এইটটি পার্সেন্ট বাদ দিতে হবে। প্রচার, বিজ্ঞাপন কখনও সত্য হয় না। মিথ্যাকে সত্য বলে চালাতে হলে কথাকাহিনি বা কথামালার প্রয়োজন হয়। সামান্য জিনিস নামের গুণে অসামান্য মনে হবে যেমন, স্ট্রেট হোয়াইট পিলাও, পোস্তমাখানি, পটলস পয়সার্নবে, বার্তাকু ঘাউলাশ, সিজনড উইথ সল্ট, সার্ভড উইথ এইচ টু ও! আসলে কী! ভাত, পোস্ত, দইপটল, বেগুন পোড়া, পটাপট নুন দিয়ে মেরে এক গেলাস জল।
স্বামী আয় বললেই কপ করে টোপ গিলে আইতে নাই। পার্শ্বে দণ্ডায়মান গৃহিণীর রিঅ্যাকশন আড়চোখে অবলোকন করতে হবে! কর্তা চাইলেও গিন্নিই সব। যদি দেখা যায়, তিনি অন্যদিকে চেয়ে আছেন অমাবস্যার মতো মুখ করে, তখনই বুঝে নিতে হবে সমর্থন নেই। গেলে বিপদে পড়তে হবে। চিকেন সুইট অ্যান্ড সাওয়ার, এক দিকটা মিষ্টি অন্য দিকটা টক। কর্তার ওপর মহা প্রেসার। অন্দরে গিয়ে চাপা গলায়, 'কী হল কী, সেই কখন এসেছে, তিন মাইল কাগজ পড়া হয়ে গেল, না চা, না জলখাবার!'
একটু উচ্চকণ্ঠে, 'বেলা এগারোটার সময় জলখাবার! একেবারে খেতে বসিয়ে দোব। মালটাকে তাড়াতাড়ি বিদায় করো তো। দুটোর সময় বেরোতে হবে মনে আছে তো!'
'রোব্বার একটা দিন ছুটি, দুটোর সময় যাবে কোথায়!'
'মনে নেই আজ লাবণ্যর পাকা দেখা আমাকে সাজাতে হবে।'
একটা মাকালু ছেলে যেন শাঁকালু খাবে। উড বি ওয়াইফটিকে ড্রেসড স্যালাডের মতো পরিবেশন করতে হবে। মুখে যত জিন্দাবাদ। আলো, আলো, আলো কই, সেই আলোচাল। দাগধরা কাঁঠালি কলা।
'প্রেমের বিয়েতে আবার দেখাদেখি কীসের!'
'আরে প্রেম তো কি! প্রেমের মাসি-পিসি নেই! প্রশ্নও আছে, বড়দিনের কেক আর জন্মদিনের কেকে তফাৎ কী। সারা জীবন ফাস্ট ফুড খেয়েই জীবন যাবে, তবু, মোচা, থোড়, পুঁইশাকের ছ্যাঁচড়ামিটা কী? ঘুঘুডাঙা নামটা কী করে হল, উলটো ডিঙিতে কোন শতাব্দীতে ডিঙি উলটে ছিল? নিজের বাবা ও শ্বশুর বাবা সম্পর্কে তোমার দৃষ্টিভঙ্গিটা কী? তুমি টিনের গরুতে বিশ্বাসী না বুকের গরুতে!'
কর্তা পর্দা ঠেলে অন্দর থেকে বার মহলে প্রকাশিত হলেন ফ্লপ ছবির মতো, 'মানকে এখন আর অকারণে পেটটা লোড করিসনি। একটু পরেই একেবারে...।'
স্বামী বললেই হবে না স্ত্রী যদি না তিন ধাপ তেড়ে এয়ে বোম্বাই চুলে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেছেন, 'আসুন না, আসুন না, বেশ মজা হবে, মালাইকারি—যদি বলেন, ওকে। দোতারার লাগগুমাগুম।'
আর স্ত্রী যদি নিজেই বলেন সর্বাগ্রে, 'পটলদা হয়ে যাক একদিন, তাহলে তো কথাই নেই। বুঝতে হবে চেহারা, চলন-বলন, কেরিয়ার বিলকুল পসন্দ। ক্যানেডায় থাকে, বিলিতি মাল আসবে, মুখের মাখানি, ঠোঁটের চুম্বানি, শরীরের সুগন্ধী ফুসফুসানি।
মেয়েদের একটা পছন্দ-অপছন্দ আছে। বেশি মোটা, বেশি রোগা, দুচক্ষের বিষ। কুসুম কুসুম শরীর, নেয়াপাতি ভুঁড়ি, আদুরে আদুরে চোখ, খুব পছন্দের। স্বামীর টাক ছাড়া অন্যের মাথার মোমপালিশ টাক অসহ্য। পাকা নোনার মতো ভুতভুতুম মুখ পছন্দের তালিকা থেকে বাতিল। রিভার্স ন্যাসপাতির মতো মুখ ঠিক আছে।
কলেজের বন্ধু বলেছিল, 'আয় না, একদিন চুটিয়ে হয়ে যাক পুরোনো সেই দিনের কথা, উইক এন্ডে। দুটো দিন রেলা মেরে ডিরেল হয়ে যাই।'
বোকার মতো টোপ গিলে নিলুম, একবারও খেয়াল হয়নি, গিন্নির স্যাংশন আছে কি না। পথ তুমি কার? পথিকের। আকাশ তুমি কার? জনসাধারণের। টাকা তুমি কার? পকেটের। গরু তুমি কার? গোয়ালের। মা তুমি কার? ভাগের। ছাগল তুমি কার? চোয়ালের। স্বামী তুমি কার? স্ত্রীর। স্ত্রী তুমি কার? মর্জির।
শনিবার চুটিয়ে চোটাতে গিয়ে দেখি দুজনের সকাল থেকেই চটাচটি হচ্ছে। চটি তখনও বেরোয়নি। আমি ঢুকে নিরাহ্বান পরিবেশে বসতে না বসতেই চটি শ্রীমতী চটপটর বেরিয়ে গেলেন। বেশ বাহারি একবক্সে পনির পকোড়া নিয়ে গিয়েছিলুম, পড়ে রইল সেন্টার টেবিলে।
বন্ধু আমার ঘরের মাঝখানে অর্সন ওয়েলসের মতো দাঁড়িয়ে। দু'হাত সিলিং-এর দিকে তুলে বললে, 'ম্যাড।'
পরমুহূর্তেই লিঙ্গচেতনা এল, 'ম্যাডের স্ত্রী লিঙ্গ কীরে! পাগল তো পাগলি হয়। ম্যাড কী হবে! ডিউক তো ডাচেস হয়!'
'ম্যাডের স্ত্রীলিঙ্গ মাড হবে মনে হয়। কারণ সব মাটি!'
পরের দিন ভোরে শ্রীমতিকে কইলাম, 'আমি তাহলে একটু মর্নিংওয়াক করে আসি!'
'হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভালো, ফ্রেশ এয়ার!'
আজ তিন বছর হয়ে গেল, মর্নিংওয়াকেই আছি আমি। এখনও ফিরিনি। টুথ ব্রাশ আর টুথ পেস্টটা ওখানেই পড়ে আছে।
ফিরলো পারলে, দাঁত মেজে, মুখ ধুয়ে, ফাইন এক কাপ চা নিয়ে বসব।
পুরোনো দিনের কথা সবাই মিলে কইব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন