প্রেম

সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

আমার সেই বয়েসে একবার প্রেমে পড়ার ভীষণ ইচ্ছে হয়েছিল। সেই বয়েসে যে বয়েসে ঠোঁটের ওপর কচি কচি গোঁফের দুর্বো জন্মায়। দাড়িতে দু-এক গাছা ছাগুলে চুল দেখা দেয়। গলাটা একটু ভারী ভারী হয়। মানুষ পাকা পাকা কথা বলতে শেখে। সবজান্তা, হামবড়া ভাব। লঘুগুরু জ্ঞানশূন্য। সব কথাতেই এক কথা, যান যান, আপনি কী বোঝেন, আপনি কী বোঝেন, আপনি কী জানেন? সেই বয়েসে।

প্রেমে পড়তে হলে একটি মেয়ে চাই। যে সে মেয়ে হলে হবে না। সুন্দরী হওয়া চাই। ডানা-কাটা না হোক, দেখলে যেন প্রেমে উদয় হয়। নায়িকাদের বর্ণনা কত উপন্যাসে পেয়েছি। ছায়াছবির পর্দায় দেখেছি। চাঁদের আলোর ঝিলিক ফুটছে। গাছের ডাল ধরে নায়িকা গান গাইছে। ঝোপে কোকিল ডাকছে কু-উ-উ।

আমার বন্ধু সুখেন সেই বয়েসেই আমার চেয়ে অনেক বেশি পেকেছিল। হিন্দি সিনেমা দুমুড়ি চালে দেখত। ইংরেজি ছবির হিরো-হিরোইনের নাম কণ্ঠস্থ ছিল। বুকপকেটে ম্যারিলিন মোনরোর ছবি পুষত। সে এক ছেলে ছিল বটে।

সুখেন বললে, সব মেয়েই তো আর প্রেমে পড়ে না। যেমন ধর, সকলের সর্দি হয় না। ন'মাসে ছ'মাসে হয়তো একবারই হল। কারুর আবার বারো মাসই সর্দি। সকাল হল তো ফ্যাঁচোর ফ্যাঁচোর হাঁচি। একে বলে সর্দির ধাত। এইরকম কারুর কাশির ধাত, কারুর পেট খারাপের ধাত। সেইরকম কোনও কোনও মেয়ের প্রেমের ধাত থাকে। ধাত বুজে এগোতে হবে।

সে আমি কী করে বুঝব ভাই?

খোঁজখবর নিতে হবে। অতই সোজা চাঁদু! ঘুরে ঘুরে বাজার দ্যাখো। তারপর ঝোপ বুঝে মারো কোপ। রাস্তায় ঘাটে, বাসে, ট্রামে যেখানেই দেখবি কোনও মেয়ে তোর দিকে পুটুস করে তাকিয়েছে, তুই ক্যাবলার মতো চোখ সরিয়ে নিবি না, তুইও তাকাবি কটমট করে। বড় বড় চোখে। মেয়েটা যদি আবার তাকায়, তোর চোখে চোখ পড়বেই। চোখে জাদু থাকে, জানিস?

না ভাই।

কী জানো তুমি? চোখের ফাঁদে আটকে ফেলবি। চোখে হাসবি। চোখে চোখে বলবি, সুন্দরী, তুমি আমার, তুমি আমার। সম্মোহিত করে ফেলবি। নিজেকে ভাববি অজগর, সামনে তোর হরিণী।

তুই চোখ মারতে বলছিস? ও ভাই অসভ্য ছেলের কাজ।

তুই একটা গর্দভ। চোখ মারা নয়। চোখে ভাবের খেলা। সুচিত্রা সেনের অভিনয় দেখেছিস? এই চোখে জল, এই চোখে হাসি, এই চোখে প্রেম, এই চোখে ঘৃণা। সব চোখে। চোখেই মনের প্রকাশ। তেমনভাবে তাকাতে পারলে রয়েল বেঙ্গল ল্যাজ গুটিয়ে পায়ের তলায় লুটিয়ে পড়ে।

ও ভাই আমি পারব না। আমার ক্ষমতায় কুলোবে না। আমি কি সুচিত্রা সেন?

দূর মড়া! সুচিত্রা সেনের মতো অভিনয় ক্ষমতা, চোখের ভাষার কথা বলছি। বাড়িতে বড় আয়না আছে?

তা আছে।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, দাঁড়িয়ে চোখের ট্রেনিং শুরু করবি। ঘরে কাউকে ঢুকতে দিবি না। হাসবি কাঁদবি গলবি চমকাবি চমকে দিবি। মুখের কিন্তু কোনও পরিবর্তন হবে না। সব চোখে। চোখকে খেলাবি। এই হল তোর প্রেমের প্রথম পাঠ। এইটে উতরে গেলে দ্বিতীয় পাঠ পাবি।

মনে মনে ব্যাপারটা চিন্তা করে সুখেন ইয়ারকি করছে বলে মনে হল না। সত্যিই তো, বশীকরণ বলে একটা ক্রিয়া অবশ্যই আছে। তা না হলে পাঁজিতে এত বিজ্ঞাপন থাকে কেন? জাদুকর পি সি সরকার হল-সুদ্ধ লোককে হিপনোটাইজ করে কত খেলাই তো দেখিয়ে গেছেন। সেইসময়ের খেলা। ন'টার সময় সাতটা বাজিয়ে ছেড়ে দিলেন।

আমাদের পাড়ার কার্তিককে মেসমেরাইজ করে এক গুণী ব্যক্তি নাম রেখে গেলেন কাকাতুয়া। বলেছিলেন ফিরে এসে ঠিক করে দোব। তিনি আর ফিরলেন না। সেই থেকে কার্তিক কাকাতুয়া। কাকাতুয়া বললে সাড়া দেয়। কার্তিক বললে সাড়া দেয় না।

দুপুরবেলা বড় বউদির ঘরে চোখের ট্রেনিং শুরু হল। কেউ যেন আবার দেখে না ফেলে। সব তাহলে কেঁচে যাবে। বাড়িতে প্রাণীর সংখ্যা নেহাত কম নয়। দুপুরের দিকে খাওয়াদাওয়ার পর সবাই ধুঁকতে থাকে। বড় বউদির নাক ডাকে। আমার ছোট বোন পিয়া কলেজ চলে যায়। এই হল সাধনার উপযুক্ত সময়।

নিজের চোখে আগে কখনও আমি অমন করে দেখিনি। কেউ দেখেছেন কি না সন্দেহ আছে। আমরা সাধারণত আয়নার সামনে দাঁড়াই, ঝট করে চুল আঁচড়াই, সট করে সরে আসি। এ একেবারে নিজের মুখোমুখি, ফেস টু ফেস। নিজেকে নিজে দেখা। কখনও প্রেমের দৃষ্টিতে, কখনও ঘৃণার দৃষ্টিতে, কখনও আমন্ত্রণের দৃষ্টিতে, আও না পেয়ার করে, লাভ করে, আও না।

দুপুরটা কয়েকদিন এইভাবেই বেশ কাটল। দৃষ্টিতে দৃষ্টি ঠেকিয়ে নিজের সঙ্গে নিজে চোখে চোখে কথা বলে। হঠাৎ একদিন পিয়ার কাছে ধরা পড়ে গেলুম। আমি জানতুম না ধরা পড়ে গেছি। পিয়া কোন সময় পিছন থেকে দেখে সরে পড়েছে। মনে হয় একটু ভয়ও পেয়েছিল। চুপি চুপি ওর বউদিকে বলেছিল, দাদা দুপুরবেলা তোমার ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কী করে বলো তো? আমাদের পুসিটাকে আয়নার সামনে বসিয়ে দিলে ঠিক ওইরকম করে। ফ্যাঁসফোঁস, থাবা-মারা।

বড় বউদি বড়ো চালাক মেয়ে। দুপুরে বিছানায় পড়ে রইলেন মটকা মেরে। সাধনার পথে বেশ কিছু দূর এগিয়েছি। একেবারে তন্ময়। চোখে চোখে হাসি চলছে। বউদি বললে, কী হচ্ছে?

চমকে উঠছিলুম। ধরা পড়ে গেছি, কী লজ্জা!

বলুলম, অভিনেতা হব তো, তাই একটু চোখ সাধছি।

সে আবার কী? লোকে তো গলা সাধে, চোখ সাধা জিনিসটা কী?

আছে, আছে। সে তুমি বুঝবে না বউদি।

কোনওরকমে পালাতে পারলে বাঁচি। ছাদের ঘরে পুরোনো বইয়ের গাদা থেকে ছেঁড়া ছেঁড়া একটা বই পেলুম, ত্র্যটক সাধনা। তিন চার হাত দূরে দেওয়ালের গায়ে সবুজ একটা বিন্দু লাগিয়ে পদ্মাসনে বসে, একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকো, যেন চোখের পলক না পড়ে। পাঁচ সেকেন্ড দশ সেকেন্ড, মিনিট এক দুই পাঁচ দশ, ঘণ্টায় চলে যাও। তারপর দিনে।

'তোমার চক্ষুদ্বয়ে জ্যোতি খেলিবে। অলৌকিক দৃশ্যসমূহ চক্ষুর সম্মুখে ভাসিয়া উঠিবে। চরাচরে তোমার দৃষ্টি প্রসারিত হইবে। উড্ডীয়মান পক্ষীর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকাইলে ভস্ম হইয়া পড়িয়া যাইবে। যাহার দিকে তাকাইবে সেই তোমার বশীভূত হইয়া কুকুর কুক্কুরীর ন্যায় পদপ্রান্তে পতিত হইবে, কম্পমান শাখার ন্যায়।'

ভজন করনা চাহি রে মনুয়া, সাধনা করনা চাহি রে মনুয়া। সেই সাধনে অ্যায়সা ফল ফলল। একদিন রাস্তা দিয়ে দুটি মেয়ে চলেছে। একটিকে মনে বড়ো ধরে গেল। মনে হল প্রেমের ধাত, সুখেন যেমন বলেছিল, সর্দির ধাত কাশির ধাত পেটের অসুখের ধাত। মিষ্টি, নরম নরম চেহারা। অবাক জলপানের মতো মুখ। মা দুর্গার মতো চোখ। ডুরে শাড়ি পরেছে। রাস্তায় যেন কাঁপন ধরেছে।

ভ্রূচাপে নিহত: কটাক্ষবিশিখো নির্ম্মাতু মর্ম্মব্যথাং

শ্যামাত্মা কুটিল: করোতু কবরীভারোহপি মারোদ্যমম।

মোহন্তাবদয়ঞ্চ তম্বি তনুতাং বিম্বাধরো রাগবান

সদবৃত্ত স্তনমণ্ডলস্তব কথং প্রাণৈর্মম ক্রীড়তি।।

টাটকা গীতগোবিন্দ ভলকে ভলকে বেরিয়ে আসতে লাগল। হে সুন্দরী, তোমার নজরোঁকা তির ভুরুর ধনুর ছিলে টেনে অমন করে আর মেরো না, আমার মর্ম ফেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তোমাকে দোষ দিচ্ছি না সখি। এ তো তোমার পক্ষে খুবই স্বাভাবিক। তোমার কালো কুটিলকেশ আমাকে প্রায় মেরে ফেলেছে, এও স্বাভাবিক। তোমার বিম্বফলতুল্য রাগযুক্ত অধর আমার মোহ উৎপাদন করছে, তাতেও দোষের কিছু নেই। কিন্তু তোমার ওই সদবৃত্তস্তনমণ্ডল কেন আমার প্রাণ নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলবে! আমি সইতে পারি, না বলা কথা, মন নিয়ে ছিনিমিনি সইব না, সইব না। গীতগোবিন্দ আবৃত্তি করে ভীষণ সাহস এসে গেল। বলো বীর নয়, তাকাও বীর। কীভাবে তাকিয়েছিলুম জানি না। একটি মেয়ে আর একটিকে বললে, দ্যাখ ভাই, পাগলটা তোর দিকে কীভাবে তাকিয়ে আছে। তারপর রাস্তায় ষাঁড় দেখে মেয়েরা যেভাবে হুটোপুটি করে পালায়, সেইভাবে দুজনে গলাগলি, টলাটলি করতে করতে পালাল। একজনের পা থেকে চটি ছিটকে নর্দমায় পড়ে গেল। অনেক দূরে গিয়ে তারা আর একবার ফিরে তাকাল ভয়ে ভয়ে। যেন দেখছে ষাঁড়টা কত দূরে!

মনে বড়ো ব্যথা পেলুম। আরও অবাক হলুম, সবাই যখন বলতে লাগল চোখ রাঙাচ্ছ কেন? তোমার চোখ রাঙানির আমরা তোয়াক্কা করি না হে। যার দিকে তাকাই তিনি একই কথা বলেন, চোখ পাকাচ্ছ কেন? মাথা ঠান্ডা কর, মাথা ঠান্ডা কর। গুরুজনের সঙ্গে কথা বলার সময় একটু সমীহ করে বলতে হয়!

বড় বউদির আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই চমকে উঠলুম, এ আবার কে রে! চোখ দেখলে মনে হয়, এখুনি গেয়ে উঠবে, 'ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে গেল যারা জীবনের জয়গান'। চোখের পাতা পড়ছে না, মণি দুটো পাথরের মতো স্থির। নিজেকে দেখে নিজেই ভয় পেয়ে যাচ্ছি। কান ধরে বলতে ইচ্ছে করছে, আর করব না স্যার।

চোখের ডাক্তার বললেন, এ কী করে এনেছ হে। একে বলে চোখ ঠিকরে যাওয়া। কী করে এরকম করলে? ভূত দেখলে এরকম হতে পারে। আমরা পড়ে এসেছি। দেখলুম এই প্রথম। তুমি বোসো, বোসো।

আউটডোরে কোনও পেশেন্ট কখনও এমন খাতির পায় না। আমাকে চেয়ারে বসিয়ে, অন্য রুগিদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে তিনি একের পর এক ছাত্র আর অন্যান্য ডাক্তারদের ডেকে এনে দেখাতে লাগলেন। এ রেয়ার কেস, পড়া ছিল, দেখা ছিল না। তাঁরা আসেন, সামনে ঝুঁকে পড়ে দেখেন, চোখে যন্ত্র লাগান, আর বলেন, রেটিনা হুপ করে বেরিয়ে আসছে। ডাক্তারি ভাষা বোঝা যায় না। রেটিনা শব্দটা চেনা-চেনা মনে হচ্ছে। হুপ শব্দ করে। তার মানে, কিছু একটা হনুমানের মতো লাফিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে।

চোখের পাওয়ার মাপতে মাপতে ডাক্তারবাবু বললেন, সত্যি করে বল তো বাবা, কী করে এমন করলে? ভূত নিশ্চয়ই দ্যাখোনি, চোখের সামনে কাউকে কি খুন হতে দেখেছ?

আজ্ঞে, ত্র্যটক সাধনা।

সেটা কী বস্তু ভাই? পিশাচ সাধনার ধরনের কিছু?

আজ্ঞে না, দেওয়ালে সাঁটা একটা সবুজ বিন্দুর দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে বসে থাকা।

সর্বনাশ! একে বলে ফিক্সড স্টেয়ার। আই বল সকেটে সেঁটে গেছে। এ দুর্বুদ্ধি তোমাকে কে দিলে?

আজ্ঞে, প্রাচীন গ্রন্থ।

সেটিকে পুড়িয়ে ফ্যালো। খবরদার, ওসব আর ভুলেও করতে যেও না। এই নাও তোমার চশমার পাওয়ার। সঙ্গে গোটাতিনেক ব্যায়াম রইল। প্রথম : চোখ নামানো। ডাইনে ঘোরাও, বাঁয়ে ঘোরাও, ওপরে তোলো, নীচে নামাও। দ্বিতীয় : ব্লিংকিং। অনবরত চোক পিটপিট কর। নন-স্টপ। তৃতীয় : কাপিং। হাতের তালু দিয়ে দু'চোখ ঢেকে, মাথা পেছনে হেলাও। শেষ উপদেশ : সুখে আছ, তাই থাকো, ভূতের কিল খেতে যেও না, কেমন?

চোখ বাঁচাতে শুরু হল চোখের ব্যায়াম। চোখ ঘোরানো, চোখ নাচানো, চোখ পিটপিট, পাতা ফেলা আর খোলা। সুখেন ঠিকই বলেছিল, চোখ বড়ো সাংঘাতিক জিনিস। সেইসময় বাজারে একটা গানও বেরিয়েছিল, বলা কি যায় সহজে, বুঝে নাও, বুঝে নাও চোখের ভাষা। চোখ ওইরকম করতে করতে এমন মুদ্রোদোষ দাঁড়িয়ে গেল, সবসময়েই করে চলেছি, অজান্তেই করে চলেছি।

পিতৃবন্ধু বিধুজ্যাঠার মাথায় তিন মেয়ে। সব কটি মেয়েই বেশ সুন্দরী। পিতৃদেব একদিন সকালে বললেন, বিধুবাবুর বাড়ি থেকে চট করে একবার গুপ্তপ্রেস পাঁজিটা নিয়ে এসো তো।

বিধুজ্যাঠার বাড়িতে কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দিল বড় মেয়ে রেখা। জিগ্যেস করলুম, বিধুজ্যাঠা আছেন, বিধুজ্যাঠা?

রেখা কেমন যেন থতমত খেয়ে গেল। আমতা আমতা করে বললে, হ্যাঁ, বাবা আছেন।

রেখা পেছোতে শুরু করেছে। চোখেমুখে একটা ভয়, একটা কেমন যেন বিস্ময়ের দৃষ্টি। আমি এক পাও এগোইনি, দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছি।

আমি বললুম, একবার ডেকে দাও তো, একবার ডেকে দাও তো।

রেখা প্রায় ছুটে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। যেতে না যেতেই বিধুজ্যাঠা এলেন, পায়ে বিদ্যাসাগরী চটি। আদুর গা। সাদা মোটা পইতে বুকের এপাশ থেকে ওপাশে চলে গেছে। চোখ দুটো ভাঁটার মতো লাল।

বাঁজখাই গলায় বললেন, কী চাই?

সাধারণত এভাবে কথা বলেন না। অবাক হলুম। বললুম, পাঁজি আছে, পাঁজি? বাবা একবার চাইলেন।

হ্যাঁ, আছে ছোকরা—বলে ঠাস করে গালে এক বিরাশি সিক্কার চড় হাঁকড়ালেন।

এ আবার কী? চড় আবার কবে থেকে পাঁজি হল! কিছু বোঝার আগেই আমার হাত ধরে হিড় হিড় করে টানতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন, চলো তোমার বাবার কাছে।

তিন মেয়ে রকে দাঁড়িয়ে বলতে লাগল, অসভ্য ছেলে।

বাড়ির সামনের হারাধন মুদি দোকানের টাটে বসে বসেই চেল্লাতে লাগল, কী করেছে জ্যাঠামশাই, কী করেছে জ্যাঠামশাই?

আমি হাঁ হয়ে গেছি। অপরাধ জানলুম না, ফাঁসিতে চলেছি।

বাবা বললেন, কী করেছিল কী, বিধুদা? জুতো পায়ে ঠাকুর ঘরে ঢুকেছিল?

তার চেয়েও অনেক, অনেক গর্হিত কাজ, চোখ দিয়ে আমার মেয়েদের অশ্লীল, কামার্ত ইংগিত করেছে।

ইজ ইট?

ডিফেন্সের কোনও সুযোগই পেলুম না। কিল, চড়, ঝাঁটা, জুতো, লাঠি। মিনিট দশেক শরীরের ওপর দিয়ে ভূমিকম্প চলে গেল। বড় বউদি এসে উদ্ধার করলেন। বড়দা বেরিয়ে এসে বললেন, কী, হয়েছে কী?

বাবা আর বিধুজ্যাঠা দুজনেই সমস্বরে আমার অপরাধ পেশ করলেন।

বড়দা বললেন, ছি ছি, না জেনেশুনেই, এত বড় একটা ছেলের গায়ে হাত তুললেন? সম্পূর্ণ নিরাপরাধ একটা ছেলের গায়ে? জানেন না, ও গুরুতর একটা চোখের অসুখে ভুগছে। মেজর মিত্রর চিকিৎসায় আছে।

দুজনেই সমস্বরে বললেন, অ্যাঁ! বলো কী? কই, তোমরা আগে তো কিছু বলোনি! ছি ছি ছি।

বিধুজ্যাঠা আমার পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, ক্ষমা করো বাবা। তুমি একবার আমার বাড়িতে চল। আমরা সবাই মিলে তোমার কাছে ক্ষমা চাই।

কাঁদো কাঁদো গলায় বললুম, 'আজ আর আমার যাওয়ার মতো অবস্থা নেই জ্যাঠামশাই।

বিকেলের দিকে ভীষণ জ্বর এসে গেল। চোখ বুজিয়ে পড়ে আছি। সর্বাঙ্গে বিষ ফোঁড়ার মতো ব্যথা। বউদি এসে কপালে হাত রেখে বললে, দ্যাখো, কে এসেছে তোমাকে দেখতে।

চোখ খুলে দেখি রেখা।

ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেললুম। যা দেখেছি তাই যথেষ্ট। এখনও হয়তো আমার চোখ সেই ভাবেই নাচছে। আবার না জুতো খেতে হয়!

বউদি বললেন, তাকিয়ে দ্যাখো কে এসেছে!

আমি ইচ্ছে করে প্রলাপ বকতে লাগলুম, না না, আমি আর যাব না, আর পাঁজি আনতে যাব না মা।

রেখা ফোঁস করে কেঁদে উঠল, বউদি, আমিই দায়ী, কিছু হবে না তো? সেরে উঠবে তো?

বউদি বললেন, সারা শরীর বিষিয়ে উঠেছে। তা ছাড়া বড়ো অভিমানী ছেলে, দেহের চেয়ে মনে বেশি লেগেছে।

চার বছর পরে মুসৌরীর এক হোটেলে আমি আর রেখা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। কাঠের মেঝের ওপর আমাদের সুটকেস তখনও খোলা হয়নি। সামনে কাচের জানালা। সকালের রোদে হিমালয়ে সোনা খেলছে। রেখার কাঁধে আমার একটা হাত। রেখার একটা হাত আমার কোমরে। রেখার মাথা আমার কাঁধে।

আমি বলছি, সেদিন জুতো খাইয়েছিলে, আজ অন্য কিছু খাওয়াও।

রেখা বলছে, আজ যদি বাবা বেঁচে থাকতেন?

আমি বলছি, আজ যদি দাদা বেঁচে থাকতেন?

চারপাশ ঝাপসা হয়ে আসছে। দরজার কাছ থেকে হোটেলবয় বলছে, কফি, মেমসাব!

সকল অধ্যায়
১.
কখগঘ
২.
মনোরঞ্জন অসুস্থ
৩.
নীপার বক
৪.
ফুল ফোটার আয়োজন
৫.
আমার বিয়ে
৬.
ট্রেন
৭.
মিলিটারি সিন্দুক
৮.
বত্রিশ নম্বর বিছানা
৯.
কাটলেট
১০.
অভয়ারণ্য
১১.
চলে যায়
১২.
শীর্ষ সম্মিলন
১৩.
যদি হই মুখ্যমন্ত্রী
১৪.
একদা 'একদিন'
১৫.
মৃত্যুর বয়স
১৬.
এক চড়েতেই রাজা
১৭.
অর্জুন
১৮.
সুন্দরী লেন
১৯.
দ্বিতীয় পক্ষ
২০.
সেই দিদি
২১.
ভালোবাসা মোরে ভিকিরি করেছে
২২.
চিড়িয়াখানা
২৩.
হনুমান টুপি
২৪.
দুই আর দুয়ে চার
২৫.
সন্ধানে কোনও ভালো ছেলে আছে
২৬.
ডা: অমৃত চৌধুরীর ডায়েরি
২৭.
কুকুরের ডাক্তারি
২৮.
পাঁচ বন্ধু
২৯.
ইঁদুর ও দাদু
৩০.
একটি মানুষ একটি বল
৩১.
দু:সাহসী দু-চাকা
৩২.
সব ভালো যার শেষ ভালো
৩৩.
পার ঘাট
৩৪.
কৃপা
৩৫.
সেতার
৩৬.
বোতাম
৩৭.
সুরঞ্জনা
৩৮.
গেল, গেল
৩৯.
বলদের গলায় গোড়ের মালা
৪০.
আর যা-ই করো,বিপজ্জনক রকমের বড়লোক হয়ো না
৪১.
ছদ্মবেশী
৪২.
চাঁদের আলো
৪৩.
বাঁদর
৪৪.
কোরা কাগজ
৪৫.
কোনওদিন শুনেছ,চোর এসে সাধ করে ধরা দিচ্ছে
৪৬.
বড়ি ও শ্বশুরমশাই
৪৭.
তাসের ঘর
৪৮.
দগ্ধ দরজা
৪৯.
গগনের মাছ
৫০.
তোয়াজ
৫১.
ফিরে আয়
৫২.
মাংস
৫৩.
পয়সা
৫৪.
বামুনের গরু
৫৫.
জলছাত
৫৬.
সাইডিং
৫৭.
শেষযাত্রা
৫৮.
বয়েসে
৫৯.
শেষ কুত্তা
৬০.
ছুটি
৬১.
অংশীদার
৬২.
কারণ
৬৩.
প্রেম
৬৪.
দু:খের আনন্দ
৬৫.
মা
৬৬.
ধড় আমার মুণ্ডু পাবলিকের
৬৭.
পুজোর আয়োজন সহজ নয়
৬৮.
'স্থান নেই কাল নেই পাত্র নেই'
৬৯.
লববর্ষের নকশা
৭০.
দক্ষিণ যেন বিলেত
৭১.
হাসি কোথায় হারিয়ে গেল
৭২.
শীত
৭৩.
গল্প লিখে কী বিপদ!
৭৪.
চিচিং ফাঁক
৭৫.
আগমনী
৭৬.
দেউলে হতেও রাজি
৭৭.
হারিয়ে গেল
৭৮.
কী জ্বালা
৭৯.
বেদনা
৮০.
বেঁচে থাকার সহজপাঠ
৮১.
প্রেম ও বিবাহ
৮২.
জীবন বেদ
৮৩.
জীবন দর্শন
৮৪.
নিজের ঢাক নিজে পেটালে
৮৫.
মরীচিকা
৮৬.
তোমার ম্যাও তুমি সামলাও
৮৭.
হাসতে মানা নেই
৮৮.
বাঙালির পুচ্ছ নৃত্য
৮৯.
যুগ যুগ জিও
৯০.
ভরাডুবি
৯১.
স্বভাব যখন অস্বাভাবিক
৯২.
ষষ্ঠীসংবাদ
৯৩.
নিমিত্তের ভাগী
৯৪.
ইচ্ছাপূরণ নগদে অথবা কিস্তিতে
৯৫.
দুই পুরুষে
৯৬.
সব জানা চাই
৯৭.
দুধের দাঁত
৯৮.
ছত্রিশটি বছর
৯৯.
বুনো ওল আর বাঘা তেঁতুল
১০০.
পদকে নই পদানত
১০১.
স্যাটা স্যাট
১০২.
গরু
১০৩.
ছাগল
১০৪.
বোকা পাঁঠা
১০৫.
হ্যাচাং করে কেতরে গেল
১০৬.
আমি আর তুমি
১০৭.
টাচ্
১০৮.
বেশ আছি রসে বসে
১০৯.
মেয়েদের ভাগ্য ফিরবে কবে!
১১০.
গিলে করা দম্পতি
১১১.
এটা কোন যুগ!
১১২.
জ্ঞানদা, মোক্ষদা
১১৩.
যাও পাখি
১১৪.
যোগসূত্র পটাং
১১৫.
কে উদার?
১১৬.
মান অপমান
১১৭.
পলায়ন নয় সম্মুখ সমর
১১৮.
আয়না
১১৯.
রোগ দুরারোগ্য
১২০.
গেল, গেল তবু যায় না
১২১.
নবীন বছরে প্রবীণ বাঙালি
১২২.
বিদায় পৃথিবী
১২৩.
বাতি জ্বলল, বাতি গলল, ভোর
১২৪.
মিলেনিয়াম
১২৫.
দীর্ঘ রজনী প্রভাত প্রায়
১২৬.
যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন
১২৭.
জীবনের কার্টুন
১২৮.
প্রেম-১
১২৯.
প্রেম-২
১৩০.
প্রতিষ্ঠিত প্রেম
১৩১.
ছেলে যেন মাছ
১৩২.
পুজোর বাজার
১৩৩.
কী চাই! (১)
১৩৪.
কী চাই! (২)
১৩৫.
ফুটবল
১৩৬.
এক দানা চাল
১৩৭.
মরিতে চাহি না আমি
১৩৮.
বিউটি পারলার
১৩৯.
ইংলিশ মিডিয়াম
১৪০.
সাগর
১৪১.
বাউল
১৪২.
জ্ঞান
১৪৩.
গৃহসুখ শাস্ত্র
১৪৪.
আশা
১৪৫.
বিশ্বাস
১৪৬.
স্বীকারোক্তি
১৪৭.
ভূতের সঙ্গে গল্প
১৪৮.
আর বোলো না ভাই!
১৪৯.
আজও দাঁড়িয়ে আছি
১৫০.
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
১৫১.
শেয়ালেও কামড়ে দিতে পারে
১৫২.
জীবনের জাতীয় সঙ্গীত
১৫৩.
মেয়েদের সৌন্দর্য
১৫৪.
বাস-মিনিবাসের লাইনেঘোষ, বোস, মিত্তির
১৫৫.
ফরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ, ফরে ফরে
১৫৬.
বাঁচতে ইচ্ছে করে না
১৫৭.
মৃত্যু একটা ড্রপসিন
১৫৮.
শান্তির সহজপাঠ
১৫৯.
বুদ্ধুকা দেশমে ধুর্তুকা রাজ
১৬০.
সকাল সকাল ভোট দিন
১৬১.
অনুসন্ধান
১৬২.
পকেটমারি
১৬৩.
কোথাকার জল কোথায় গড়ায়
১৬৪.
সবচেয়ে ভীতিপ্রদ মদতপুষ্ট কিছু মানুষ
১৬৫.
বেঁচে থাকার বিশ্রী ভয়টা আর নেই
১৬৬.
প্রেম শিকল পরায়, সংসারে ঢোকায়
১৬৭.
ভগবান হেরে গিয়েছেন
১৬৮.
যত দোষ নন্দ ঘোষ
১৬৯.
বাড়িওয়ালা
১৭০.
প্রেসার কুকার
১৭১.
সাত টাকা বারো আনা
১৭২.
আমার ভূত
১৭৩.
ভূমিকা
১৭৪.
ন্যাড়ার বেলতলা
১৭৫.
আজ আছি কাল নেই
১৭৬.
ট্রিটমেন্ট
১৭৭.
দিন আনি দিন খাই
১৭৮.
লেপ
১৭৯.
শাপে বর
১৮০.
স্পেশাল অফিসার
১৮১.
বিলিতি বাঁশ
১৮২.
টেলিফোন
১৮৩.
খ্যাঁকশিয়াল
১৮৪.
পি. এ.
১৮৫.
জরদগব
১৮৬.
মাসি
১৮৭.
গরলপুত্র
১৮৮.
শশধর হাকসলি অ্যান্ড গুজ
১৮৯.
চিন্তা
১৯০.
তুমি আমার আমি তোমার

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%