চণ্ডী লাহিড়ী
১৪৯৫ সাল। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি গিয়েছেন মিলানে। সেখানকার গির্জার দেওয়ালে ‘দ্য লাস্ট সাপার’ ছবিটি আঁকবেন। সারা ইটালিতে খবরটা রটে গিয়েছে। মুখে মুখে আলোচনা হচ্ছে। পাদরিরা বলে দিয়েছেন, বাইবেলের বর্ণনানুসারে ছবিটা করতে হবে। সত্যকার মানুষের মধ্য থেকে মডেল খুঁজতে হবে। প্রথমেই খুঁজে পেলেন যিশুর চরিত্র। শিশুর সারল্য নিয়ে নিষ্পাপ একটি মুখ, সামান্য কিশোরসুলভ দাড়ি। ধীরে ধীরে অন্যান্য চরিত্রগুলিও জ্যান্ত মানুষদের মধ্য থেকেই বাছলেন। ইচ্ছা করলেই পাওয়া যায় না। যেমন যেমন পান, তেমনভাবে কাজ এগোয়। কাজটি যখন বহুদূর এগিয়েছে, লিওনার্দো খুঁজতে আরম্ভ করলেন বিশ্বাসঘাতক জুডাসের জন্য কোনো একজনকে। মিলানে কাউকে পাওয়া গেল না। তা ছাড়া জেনেশুনে বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকার জন্য মডেল হতে কেউ চায় না। মডেল এমন চাই যার গোপন লোভ ও বিশ্বাসঘাতকতার ছায়া যেন চোখে-মুখে ফুটে ওঠে। সারা মিলানে জুডাসের উপযুক্ত মুখ মিলল না।

অবশেষে কে যেন খবর দিল, মিলানে নেই কিন্তু রোমের কারাগারে এমন একজন বন্দি আছে যাকে জুডাসের চরিত্রে মানাবে। রোমের কারাগারে সত্যিই পাওয়া গেল তেমন একজনকে। লিওনার্দো অবাক হয়ে লক্ষ করলেন—বর্ণনামতো অবিন্যস্ত চুল, রুক্ষ চেহারা, চোখে ক্রূর দৃষ্টি। রাজাও অনুমতি দিলেন। বন্দিকে মিলানে আনা হল। তিন মাস লাগল চরিত্রটি ঠিকমতো আঁকতে। তারপর লিওনার্দো হুকুম দিলেন তাঁকে রোমের কারাগারে ফেরত নিয়ে যেতে। যাবার জন্য গাড়ি প্রস্তুত, সেই বন্দি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। রোমে যাওয়ার পরই তো তাঁর প্রাণদন্ড হবে। শিল্পীর সামনে দাঁড়িয়ে বন্দি বললেন—মহান শিল্পী লিওনার্দো, এবার আমার দিকে ভালো করে চেয়ে দেখুন তো—চিনতে পারেন কি না?
লিওনার্দো, চেয়ে দেখলেন, নতুন কিছু নয়।

বন্দিকে গাড়িতে তোলার কাজে বাধা দিয়ে সেআবার বলে উঠল, মহান শিল্পীর চোখ কাজ করছে তো? ভালো করে চেয়ে দেখুন আমার মুখের দিকে। আগে কি কখনও...
লিওনার্দো চমকে উঠলেন—আরে একেই তো আমি যিশুর চরিত্র রূপদানের জন্য আগে বেছে নিয়েছি। সেই একই মানুষ অপরাধ করে এখন রোমে বন্দি। সত্যিই তো সেই মানুষ।
মিলানের ধর্মযাজকরা ভাবতে বসে গেলেন। যিনি যিশুর ভূমিকায় চিত্রিত হয়েছেন তাকে কি ফাঁসি দেওয়া যায়! না, তাঁর আর ফাঁসি হল না।
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত ছবি ‘দ্য লাস্ট সাপার’-এ যিশুর মুখ এবং জুডাসের মুখ হুবহু এক।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন