চণ্ডী লাহিড়ী
বাঙালির জাতীয় পোশাক কী হবে তা নিয়ে ঠাকুরবাড়িতে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। অবনীন্দ্রনাথ এসবের অনেকটাই প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি যা কিছু দেখেছেন, চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন।

‘ইঙ্গ-বঙ্গ সমাজে একটা পার্টি হবে। সেখানে নেমন্তন্ন। কী সাজে যাওয়া যায়? রবিকাকা বললেন, সব ধুতি চাদরে চলো। পরলুম ধুতি পাঞ্জাবি। পায়ে দিলুম শুড়তোলা পাঞ্জাবি চটি। এখন খালি পায়ে কী করে যাই। চেয়ে দেখি রবিকাকার পায়ে মোজা। আমরাও চটপট মোজা পরে নিলুম। যাক, মোজা পরে যেন অনেকটা নিশ্চিন্ত হওয়া গেল। তখনকার দিনে মোজা ছাড়া চলা যে একটা ভয়ানক অসভ্যতা। আমি, দাদা, সমরদা ও রবিকাকা সেজেগুজে রওনা হলাম। সবাই আমরা মনে মনে ভাবছি, ইঙ্গ-বঙ্গের কেল্লায় কীরকম অভ্যর্থনা হবে ভেবে একটু হৃদকম্প হচ্ছে। কিছুদূর গেছি, দেখি রবিকাকা একটানে দু-পায়ের মোজা খুলে ফেললেন এবং গাড়ির পাদানিতে ছুড়ে ফেলে দিলেন। আমাদের বললেন, ‘আর মোজা কেন। ও খুলে ফেল। আগাগোড়া দেশি সাজে যেতে হবে।’ আমরাও তাই করলুম। সেই গাড়িতে বসেই যে যার পা থেকে মোজা খুলে ফেলে দিলুম।
পার্টি বেশ জমে উঠেছে। এমন সময় আমরা চার মূর্তি গিয়ে উপস্থিত। আমাদের সাজসজ্জা দেখে সবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। কেউ আর কথা কয় না। অনেকে ছিলেন আমাদের বিশেষ বন্ধু। আমাদের পরিবারের বন্ধু। কিন্তু সবাই গম্ভীর মুখে ঘাড় সোজা করে রইলেন। আমাদের দিকে ফিরে চাইলেন না আর। রবিকাকা চুপ করে রইলেন। কিছু বললেন না।...পরে শুনেছি, ওঁরা নাকি খুব চটে গিয়েছিলেন। বলেছেন, এ কীরকম ব্যবহার! এ কী অসভ্যতা! লেডিজদের সামনে দেশি সাজে আসা—তার ওপর খালি পায়ে। মোজা পর্যন্ত না—ইত্যাদি সব। সেই যে আমাদের ন্যাশনাল ড্রেস নাম হল তা আর ঘুচল না। কিছুকাল পর দেখি, বাইরেও সবাই সেই সাজ ধরতে আরম্ভ করেছে। এমনকি বিলেত ফেরতারা ক্রমে ক্রমে ধুতি পরতে শুরু করল। আমাদের কালে বিলেত ফেরতাদের নিয়ম ছিল ধুতি বর্জন করা। আমাদের তো আর কিছু ছিল না। ছিল কেবল মোজা। তাও সেই মোজা বর্জন করলুম। আর ধরিনি কখনো। এখনো বোধহয় রবিকাকা মোজা পরেন না।’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন