চণ্ডী লাহিড়ী
বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন সম্পর্কে ঘুড়ি উড়িয়ে ঘুড়ির লেজের মারফত মেঘাচ্ছন্ন আকাশ থেকে বিদ্যুৎ আনয়নের গল্পটি মোটামুটি সবাই জানে। বেশির ভাগ পাঠক কেবল গল্পটাই জানে কিন্তু ফ্রাঙ্কলিন সম্পর্কে জানে কম। অথচ মানুষের মুক্তচিন্তার রাজ্যে এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কাজে বেঞ্জামিন ছিলেন এক উজ্জ্বল দিকচিহ্ন। এদেশে মানুষ—বেঞ্জামিন সম্পর্কে আলোচনা হয়েছে খুব কম।
মার্কিন যুক্তরাজ্য ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের হাত থেকে মুক্ত হবার পর বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন হন স্বাধীন আমেরিকার প্রথম রাষ্ট্রদূত ফ্রান্সে। তাঁর প্রধান অসুবিধে ফ্রান্সে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হলেও তিনি ফরাসি ভাষা সামান্যই জানতেন। এই বিদেশি ভাষা যাতে বুঝতে পারেন তার জন্য তিনি ফরাসি পার্লামেন্টে গিয়ে বক্তাদের ঠোঁটের গতিবিধি লক্ষ রাখতেন আর এই ঠোঁটের নড়াচড়া যাতে বুঝতে পারেন সেজন্য নিজেই বাইফোকালে চশমা আবিষ্কার করেন। একই ফ্রেমের মধ্যে দূরের ও কাছের দু-রকম দৃশ্য যাতে ভালোভাবে দেখা যায় সেজন্য এই বাইফোকাল চশমার প্রয়োজন। সুঁচে সুতো পরানোর কাজটা খুব সহজ নয়। বিশেষত বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পক্ষে। বেঞ্জামিন নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে সেসমস্যারও সমাধান করেছিলেন। সবচেয়ে মজার গল্প হল, বাড়ির ছাদে বজ্রপাত নিরোধক লোহার বাঁকানো শিক বসাবার আন্দোলন ফ্রান্সে গড়ে তোলা। বড়ির মাথায় বজ্রপাত না হয় সেজন্য লোহার বাঁকানো শিক বসানোটা বিজ্ঞানের ব্যাপার। এর সঙ্গে জাতিভেদ বা ধর্মভেদের কোনো সম্পর্ক নেই। ফান্সে লোহার শিকের অগ্রভাগ ডানদিকে বাঁকানো হল। ব্রিটেনের রাজা ৩য় জর্জ সেসময় আমেরিকার ওপর খুব রেগে আছেন। আমেরিকা বিদ্রোহ করে ব্রিটিশ শাসন থেকে নিজেকে মুক্ত করেছে। ব্রিটেনের রাজা এখন আর আমেরিকার রাজা নন। বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন ফ্রান্সের বাড়ির ছাদে বিদ্যুৎ-নিরোধক লোহার শিক ডানদিকে বসান। ব্রিটিশরাজ নির্দেশ দিলেন, ব্রিটেনে লোহার শিক বাঁ-দিকে বাঁকানো থাকবে।

প্রথম যেদিন (১৭৭৮) বেঞ্জামিন তাঁর পরিচয়পত্র ফরাসি সম্রাটের হাতে তুলে দিতে যাবেন সেদিন পোশাক নিয়েই বাধল গোলমাল। সেখানে ফ্রান্সে অভিজাতরা মাথায় ‘উইগ’ (পরচুলা) পরতেন। বেঞ্জামিন যে উইগটা পরবেন ঠিক ছিল সেটা মাথায় ফিট করল না। রেগে গিয়ে মাথায় উইগ না পরেই রাজসভায় চলে গেলেন। বেঞ্জামিন তখন এতই বিখ্যাত যে তাঁর মাথার চুল আসল না নকল তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
ফ্রান্সে সেসময় ফ্রক-প্যান্ট চালু ছিল। ঢোলা এবং হাওয়ায় ফুলে ওঠা এক ধরনের প্যান্ট যাকে ফ্রক-প্যান্ট বলা হত। সেই প্যান্ট ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। বেঞ্জামিন খুব সাধারণ মার্কিন প্যান্ট পরেই রাজসভায় যেতে শুরু করলেন। অচিরে ফ্রান্সে ফ্রক-প্যান্ট উঠে গেল।
ইলেকট্রিসিটি ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। ঘুড়িতে চাবি বেঁধে তিনি ইলেকট্রিসিটি আকাশের মেঘ থেকে নামিয়েছিলেন। তাঁর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু তাঁকে অনুসরণ করে যাঁরা একইভাবে ইলেকট্রিসিটি নামাবার চেষ্টা করছিলেন, তাঁদের কেউ কেউ দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন। বেঞ্জামিনের বক্তব্য ছিল, আকাশের মেঘের ইলেকট্রিসিটি জলপ্রবাহ থেকে তৈরি বা পেট্রলিয়ম থেকে জাত ইলেকট্রিসিটি—সবই এক জিনিস।
দীর্ঘদিন ফ্রান্সে ছিলেন এই মার্কিন নাগরিক। তাঁকে প্রগতির শরিক বলে ফরাসিরা শ্রদ্ধা করতেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন